Saturday, July 11, 2026

অনামিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 অনামিকা  বইটি ডাউনলোড করতে/ পড়তে নিচে লেখা বইয়ের নামের উপর ক্লিক করুন এবং বইটি ফ্রি ডাউনলোড করুন- 

 

অনামিকা 

 

মানুষের জীবন মূলত অনুভূতির এক অনন্ত যাত্রা। এই যাত্রাপথে ভালোবাসা, মায়া, স্বপ্ন, অপেক্ষা, প্রাপ্তি, বেদনা, স্মৃতি ও আত্মঅন্বেষণ পরস্পরের সঙ্গে মিশে জীবনের এক বহুরঙা ক্যানভাস নির্মাণ করে। কবিতা সেই ক্যানভাসেরই শব্দরূপ—যেখানে ভাষা শুধু প্রকাশের মাধ্যম নয়, অনুভূতিরও আশ্রয়।

এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো কোনো কল্পলোকের নির্মিত গল্প নয়; বরং জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করার আন্তরিক প্রয়াস। কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতির আলো-ছায়া, কখনো চারপাশের মানুষের জীবন, কখনো সময়ের নির্মম বাস্তবতা, আবার কখনো ভালোবাসার নীরব অথচ গভীর স্পন্দন— এসবই বিভিন্ন কবিতায় নানা রূপে প্রতিফলিত হয়েছে।

গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা স্বতন্ত্র হলেও, অন্তর্নিহিত সুর একটিই—মানুষ এবং তার হৃদয়ের গল্প। ‘ভালোবাসার প্রকাশ’, ‘মায়াবিনী’, ‘তুমি আমার কবিতা’, ‘ভালোবাসার গল্প’, ‘জীবন’, ‘জীবনের স্বপ্ন ও বাস্তবতা’ সহ প্রতিটি কবিতাই পাঠককে অনুভূতির ভিন্ন ভিন্ন স্তরে নিয়ে যাবে। কোথাও প্রেমের কোমলতা, কোথাও বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস, কোথাও সময়ের গভীর দর্শন, আবার কোথাও আত্মপরিচয়ের নিরন্তর অনুসন্ধান—এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাই কাব্যগ্রন্থটির মূল সুর।

আমি বিশ্বাস করি, কবিতা কেবল অলংকারমণ্ডিত শব্দের সমাহার নয়; এটি মানুষের আত্মার ভাষা। একটি কবিতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা পাঠকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে নতুন অর্থ সৃষ্টি করে। সেই বিশ্বাস থেকেই এই কাব্যগ্রন্থ পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার সাহস করেছি।

এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা পাঠকের হৃদয়ে সামান্য হলেও যদি চিন্তার আলো জ্বালাতে পারে, কোনো বিস্মৃত স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে, কিংবা ভালোবাসা ও জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার অনুপ্রেরণা দেয়—তবেই এই প্রয়াস সার্থক বলে মনে করব।

যাঁরা কবিতার ভেতরে নিজেদের খুঁজে নিতে ভালোবাসেন, অনুভূতির সূক্ষ্মতম কম্পনকে শব্দের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে চান, তাঁদের প্রতি এই কাব্যগ্রন্থ সশ্রদ্ধ নিবেদন।

 

মোঃ হেলাল উদ্দিন
শিক্ষক | লেখক | গবেষক

 


 

This summary provides an overview of the poetry collection Onamika by Md. Helal Uddin. Book Overview

  • Title: Onamika
  • Author: Md. Helal Uddin
  • Publisher: Gyanbangla Prokash
  • Publication Date: July, 2026
  • ISBN: 978-984-35-9507-2
  • Price: 200 Taka
Content Summary
  • Dedication: The book is dedicated to the author's wife, Saiyadatusnesa Tania, described as his "manoskanya" (muse) and the inspiration behind the poems.
  • Themes: The collection explores a wide range of human emotions, including love, dreams, anticipation, loss, memories, and self-discovery. The author describes poetry not merely as a collection of decorative words, but as the language of the soul that reflects the joys and realities of life.
  • Structure: The book contains numerous poems, including titles such as "Valobashar Prokash," "Mayabini," "Onamika," "Tumi Amar Kobita," "Jibon," and "Jiboner Swapno O Bastobota".
Author Profile
  • Background: Md. Helal Uddin is a teacher, author, and researcher. Born in 1990 in Bakerganj, Barishal, he holds a master's degree in Political Science from the University of Dhaka and is currently a member of the BCS General Education cadre.
  • Other Works: His previous publications include books on social research methods, the constitution, and various poetry and story collections like Ami Kobi Hote Chai, Madhabilota, Abodho, and Manosi Studio.
  • Vision: He aims to contribute to a knowledge-based society through his writing and hopes to open new horizons of thought for his readers.
 

Tuesday, July 7, 2026

আমার জন্ম ও শৈশবের দিনলিপি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


অফিসিয়াল সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমার জন্ম ১৯৯০ সালের ১লা জানুয়ারি। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে পৃথিবীর আলো দেখার একটা অন্যরকম আনন্দ আছে কাগজে-কলমে, তবে আমার জন্মের আসল সময়টা লুকিয়ে আছে মায়ের স্মৃতির ধূসর পাতায়। মায়ের ভাষ্য মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর বছর (১৯৮১ সাল) আমার বড় ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল। তার দীর্ঘ আট বছর পর এই পৃথিবীতে আমার আগমন। মাঝে মেজ ভাইয়ের জন্ম। সেই হিসেবে আমার জন্মের প্রকৃত সালটি সম্ভবত ১৯৮৯ সালের শেষের দিককার কোনো এক সময়। তবে দিনক্ষণ বা সালের এই দোলাচল ছাপিয়ে আমার অস্তিত্বের আসল সত্যটি জড়িয়ে আছে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার রামনগর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সাথে।

আজকের আধুনিক যুগের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আর চাকচিক্যের সাথে সেদিনের রামনগর গ্রামের কোনো মিল ছিল না। আমাদের শৈশবে সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, ছিল না কোনো পাকা রাস্তা। পিচঢালা পথের চাদরহীন সেই মেঠো পথেই কেটেছে আমার শুরুর দিনগুলো। সূর্যাস্তের পর যখন চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যেত, তখন আমাদের রাত্রিবেলা পার হতো কুপি কিংবা হারিকেনের টিমটিমে আলোয়। সেই মৃদু আলোর নিচে বসেই চলত আমাদের পড়ালেখা। আর গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন শরীর জুড়িয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতো, তখন যান্ত্রিক এসি বা বৈদ্যুতিক পাখা ছিল কল্পনার অতীত; তালপাতার পাখা আর প্রকৃতির অকৃপণ বাতাসই ছিল একটুখানি স্বস্তি ও ঠাণ্ডা পাওয়ার একমাত্র ভরসা।

আমাদের বংশের ইতিহাস নিয়ে গ্রামের লোকমুখে একটি প্রচলিত কথা আছে। আমার দাদার বাবা, সোনামদ্দি সাহেবের নাকি এককালে অঢেল জমিজমা ছিল। কিন্তু সময়ের আবর্তে আমার বাবা কিংবা চাচারা সেই বৈভব ধরে রাখতে পারেননি। এর পেছনে অবশ্য এক বেদনাদায়ক ইতিহাস আছে। আমার দাদা জয়েনউদ্দিন সাহেব ছিলেন ভীষণ সহজ-সরল ও নিরহংকার একজন মানুষ। তার ওপর, বাবার বয়স যখন মাত্র বছর দশেক, ঠিক তখনই দাদা মারা যান। এত কম বয়সে পিতৃহীন হওয়ায় সংসারের গুরুভার এসে পড়ে বাবার কাঁধে। আর সেই নাবালক বয়সে সংসার চালাতে গিয়েই ধীরে ধীরে আমাদের পারিবারিক সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যায়।

সংসার ও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে বাবা প্রথমে গ্রামেই কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে যখন কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না, তখন এক বুক আশা নিয়ে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। সেখানে শুরুতে তীব্র সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে, কাজ করেছেন রাজমিস্ত্রী হিসেবে। তবে বাবার সততা আর কঠোর পরিশ্রমের ফল তিনি পেয়েছিলেন। একসময় একটি স্বনামধন্য কনস্ট্রাকশন ফার্মে তাঁর স্থায়ী চাকরি হয় এবং দীর্ঘকাল নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে ২০১৫ সালে তিনি সেখান থেকে অবসরে যান।

বাবা জীবিকার তাগিদে ঢাকাতে থাকলেও, রামনগরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে আমাদের চার ভাই-বোনের (আমরা তিন ভাই ও এক বোন) পড়াশোনা এবং পুরো সংসার মা এক শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন। বাবা ঢাকা থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে টাকা পাঠাতেন, মা তাঁর অসাধারণ দূরদর্শিতা দিয়ে তার সর্বোত্তম ব্যবহার করতেন। মা ও বাবা কেবল নিজেদের নাম ও ঠিকানা লিখতে পারার মতো যৎসামান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু শিক্ষার আলো যে কতটা প্রখর হতে পারে, তা তাঁরা মজ্জায় মজ্জায় উপলব্ধি করেছিলেন। মা আমাদের সবসময় কঠোর নিয়মের মধ্যে রাখতেন এবং পড়াশোনাকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গড়ে তোলার প্রেরণা দিতেন। মায়ের তীক্ষ্ণ মেধা আর দূরদর্শিতাই আজ আমাদের এই সুন্দর চলার পথ তৈরি করে দিয়েছে। মা কেবল জন্মদাত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের পরম বন্ধু, অভিভাবক আর জীবনের শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক। আর অন্যদিকে, দূর প্রবাসে বা ঢাকা শহরে একা থাকা বাবা ছিলেন আমাদের কাছে সততা ও নিষ্ঠার এক জীবন্ত ও বড় উদাহরণ।

আমাদের বংশের আদিপুরুষ সেই সোনামদ্দি সাহেব থেকে শুরু করে আজ অব্দি এই বংশে অনেক বিস্তার ঘটেছে। আমার দাদারা ছিলেন দুই ভাই। সেখান থেকে আমার চাচারা হলেন চারজন। আর বর্তমান সময়ে এসে সোনামদ্দির বংশধরের তালিকায় আটজন পুরুষ সদস্য রয়েছেন। মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী এবং বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ ও দোয়ায়, আজ সেই আটজনের মধ্যে আমার অবস্থান আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো। আলহামদুলিল্লাহ। শৈশবের সেই হারিকেনের আলো আর তালপাতার পাখার বাতাস পেরিয়ে আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, তার প্রতিচ্ছবিই হলো আমার এই যাপিত জীবন।

আমার জন্ম ও শৈশবের দিনলিপি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

নীলার নীলে আবির -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


শহুরে কোলাহল ছেড়ে নীলা যখন শান্ত স্নিগ্ধ গ্রামে এসে পৌঁছালো, তখন তার মনে ছিল বিষণ্নতা। বাবার অসুস্থতা আর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আসার কষ্ট তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু সেই বিষণ্নতার মাঝেও নীলা ছিল এক অপূর্ব রূপবতী—দুধে-আলতা গায়ের রঙ আর মায়াবী ডাগর চোখের এক কিশোরী।

​স্কুলের প্রথম দিনটা আবিরের কাছে আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই হতে পারতো। সে ক্লাসের শান্ত আর মনোযোগী ছাত্র। কিন্তু নীলা যখন ক্লাসে পা রাখলো, আবিরের বইয়ের পাতায় থাকা জ্যামিতিক নকশাগুলো যেন হঠাৎ অর্থহীন হয়ে গেল। নীলার সেই দীঘল কালো চুল আর মায়াবী চাহনি আবিরের কিশোর মনে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে গেল।

​সেদিন থেকেই আবিরের রুটিন বদলে গেল। স্কুলের পড়া নয়, বরং নীলার এক পলক দেখা পাওয়ার জন্য তার মন ছটফট করতে থাকলো।

​আবির আর নীলার গ্রাম দুটো আলাদা। মাঝে একটা বিশাল মাঠ আর মেঠো পথ। প্রতিদিন বিকেলে আবির সেই পথ পাড়ি দিয়ে নীলাদের গ্রামের পাশে গিয়ে দাঁড়াত।

​আবিরের সাইকেলটা নিয়ে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, যেন খুব সাধারণ কোনো কাজে সেখানে আসা।

​নীলাও জানত আবির আসবে। সে বারান্দায় কিংবা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। দুজনেই জানত তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ কেউ কারো সামনে আসার সাহস পেত না।

​স্কুলের ক্লাসরুমেও চলত এক নীরব যুদ্ধ। কলম সচল থাকলেও আবিরের চোখ খুঁজত নীলাকে। মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হলে নীলা লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে নিত। এই 'চোখের ভাষা' ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব পৃথিবী। 'ভালোবাসি' শব্দটা কোনোদিন উচ্চারিত হয়নি, হয়তো হারানোর ভয়ে, কিংবা সেই অপ্রকাশিত ভালোলাগাটাকেই বেশি পবিত্র মনে হতো বলে।

​সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। গ্রামে কিশোরীদের পড়াশোনার চেয়ে বিয়ের আলাপটাই দ্রুত ডানা মেলে। আবির যখন রেজাল্টের আনন্দ আর নীলাকে নতুন করে দেখার স্বপ্ন বুনছিল, তখনই খবর এলো নীলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

​সেদিন বিকেলে আবির শেষবারের মতো সেই মেঠো পথে গিয়েছিল। নীলাদের বাড়ির উঠোনে তখন প্যান্ডেল বাঁধার তোড়জোড়। দূর থেকে সে দেখল নীলাকে—লাল শাড়িতে তাকে আরও বেশি মায়াবী লাগছে, কিন্তু সেই চোখে আজ আর সেই চঞ্চলতা নেই, আছে একরাশ বিষাদ।

​"সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, কিছু ভালোবাসা আজীবন বুকের বাম পাশে এক ফোঁটা নীল কষ্ট হয়ে বেঁচে থাকে।"

​নীলা চলে গেল নতুন শহরে, নতুন সংসারে। আর আবিরের কাছে রয়ে গেল স্কুলের সেই পুরনো বেঞ্চ, মেঠো পথ আর এক বুক না বলা কথা। সেই শান্ত গ্রামে আজও বিকেল হয়, কিন্তু সেই কিশোরীর অপেক্ষায় কোনো এক কিশোর আর মেঠো পথ পাড়ি দেয় না। তাদের সেই নীরব প্রেম এখন কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে আছে।

 

 

নীলার নীলে আবির -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

Thursday, July 2, 2026

আবদ্ধ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

বইটি পড়তে কিংবা ফ্রি পিডিএফ কপি ডাউনলোড দিতে নিচে দেয়া বইয়ের নামের উপর ক্লিক করুন- 

 

 আবদ্ধ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

জীবন মানেই কিছু প্রাপ্তি আর এক আকাশ অপ্রাপ্তির গল্প। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশের চেনা-অচেনা সম্পর্কের মাঝে নিজেকে খুঁজে ফিরি। কখনও সেই খোঁজ শেষ হয় ‘নীল জলধির উপাখ্যান’-এ, আবার কখনও তা থমকে দাঁড়ায় ‘নীল ডায়েরির অমীমাংসিত পাতায়’। “আবদ্ধ” বইটির প্রতিটি গল্প আসলে আমাদের হৃদয়ের সেই গোপন কক্ষের প্রতিধ্বনি, যেখানে আমরা অজান্তেই নিজেদের বন্দি করে রাখি।

এই সংকলনের গল্পগুলো কেবল নিছক শব্দমালার বিন্যাস নয়; বরং এটি সমসাময়িক জীবন আর রোমান্টিক বিরহের এক নিবিড় দস্তাবেজ। কখনও ‘কল্পিত নবান্ন’-এর মতো এখানে সুখের মরীচিকা হানা দেয়, কখনও ‘কালো টিপের ঘ্রাণ’ পুরনো কোনো স্মৃতির দুয়ার খুলে দেয়। ‘এক যুগ পরের রূপালি পর্দা’ কিংবা ‘নীল খামে বেদনার চিঠি’—প্রতিটি বাঁকেই পাঠক খুঁজে পাবেন এক চিলতে রোদ আর অনেকটা ছায়ার খেলা।

আমরা কখনও ‘নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প’ বুনি, কখনও ‘নীরবতার ভেতর তুমি’-কে খুঁজে হাহাকার করি। আমাদের প্রিয় মানুষগুলো কখনও ‘বিস্মৃতির ওপারে সুখ’ হয়ে হারিয়ে যায়, আবার কখনও ‘একটি আনব্লকড ভালোবাসা’ হয়ে ডিজিটাল পর্দার ওপাশে নতুন করে ধরা দেয়। জীবনের এই ‘অপ্রাপ্তির মায়া’ আর ‘মরীচিকার ছায়া’ থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে—দিনশেষে নিজেকে ভালোবাসাই হলো সবচেয়ে বড় মুক্তি।

‘নীলার নীলে আবির’ মাখানো এই গল্পগুলো পড়তে পড়তে কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে হয়তো আপনারও মনে হবে, ‘যে প্রেম ছোঁয়নি’ আপনাকে, তার রেশ রয়ে গেছে আপনারই কোনো এক ফেলে আসা দীর্ঘশ্বাসে।

প্রিয় পাঠক, এই বইয়ের প্রতিটি চরিত্র আপনার খুব চেনা। আমি কেবল চেষ্টা করেছি তাদের মনের অব্যক্ত কথাগুলোকে কাগজের পাতায় শব্দে রূপ দিতে। আশা করি, ‘লকেটের সেই সোনালী ঝিলিক’-এর মতোই এই গল্পগুলো আপনার হৃদয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও এক মায়াবী আভা ছড়িয়ে যাবে।

 

মোঃ হেলাল উদ্দিন

ঢাকা, বাংলাদেশ

জুলাই, ২০২৬

 

'আবদ্ধ' গল্পের বই 

অপেক্ষার নির্জনতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

পাখির বুকের ভেতর অনেক দিন ধরেই একটি অদ্ভুত ইচ্ছে বাসা বেঁধেছে। শহরের কোলাহল, মানুষের ভিড় আর হাজারো দায়িত্বের বাইরে—কোনো এক নির্জন পাহাড়, নদীর ধারে কিংবা জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় একটি রাত কাটাতে চায় সে। সেই রাতের আকাশে থাকবে অসংখ্য তারা, চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর পাশে থাকবে একজন মানুষ—যাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে খুব অপ্রত্যাশিতভাবে।

এই গল্পের শুরু মাত্র ছয় মাস আগে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান। চারদিকে রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, রঙিন শাড়িতে সেজে ওঠা শিক্ষার্থীরা। ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী পাখিও সেদিন শাড়ি পরে এসেছিল। ইতিহাসের ছাত্রী হলেও তার চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য, যা প্রথম দর্শনেই নজর কাড়ে বাংলা সাহিত্যের এক তরুণ শিক্ষকের।

লোকটি দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রেখেছে—সে বিয়ে করবে না। সাহিত্য, বই, গবেষণা আর শিক্ষার্থীদের নিয়েই কাটিয়ে দেবে জীবন।

কিন্তু মানুষের সব প্রতিজ্ঞা কি হৃদয়ের কাছে টেকে?

অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে তিনি পাখির সঙ্গে কথা বললেন।

—"রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, 'প্রেমের আনন্দ থাকে স্বল্পক্ষণ, কিন্তু বেদনা থাকে সারাটি জীবন।' বলো তো, ইতিহাসের ছাত্রী হয়ে প্রেমকে কীভাবে দেখো?"

পাখি একটু হেসে বলেছিল,

—"ইতিহাস শেখায়, মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বাইরের নয়, নিজের ভেতরের।"

সেদিনের সেই কয়েক মিনিটের কথোপকথন দুজনের মনেই অদ্ভুত এক রেখা এঁকে দিয়েছিল।

তারপর সময় চলে যায়।

ক্যাম্পাসে আর দেখা হয় না।

একদিন পাখিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে খুঁজে নেয়।

প্রথমে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা, তারপর বই নিয়ে আলোচনা, কবিতা, ইতিহাস, জীবনদর্শন, রাত জেগে দীর্ঘ কথোপকথন। ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে—তাদের ভাবনার জগৎ আশ্চর্য রকমের মিল।

তবু তাদের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

পাখি বিবাহিত।

আর মানুষটি নিজের প্রতিজ্ঞার কাছে আজও দায়বদ্ধ।

কেউ কারও সীমা অতিক্রম করে না।

তবু কিছু সম্পর্কের জন্ম হয়, যাদের কোনো সামাজিক পরিচয় থাকে না—থাকে শুধু অনুভব।

একদিন গভীর রাতে পাখি লিখল—

"জানো, আমার খুব ইচ্ছে কোনো এক নির্জন জায়গায় তোমার পাশে বসে একটি রাত কাটাই। কোনো দাবি থাকবে না, কোনো স্পর্শের প্রয়োজনও নেই। শুধু গল্প করব, আকাশ দেখব, আর মনে রাখব—জীবনে এমন একটি রাত ছিল।"

অনেকক্ষণ উত্তর এল না।

শেষ পর্যন্ত তিনি লিখলেন—

"ইচ্ছেটা সুন্দর। কিন্তু সুন্দর সব ইচ্ছে পূরণ করা যায় না।"

পাখি লিখল—

"তাহলে তুমি চাও না?"

তিনি দীর্ঘক্ষণ অনলাইনে থেকেও কিছু লিখলেন না।

অবশেষে শুধু একটি বাক্য ভেসে এল—

"চাই বলেই ভয় পাই।"

পাখির চোখ ভিজে উঠল।

সে বুঝল, মানুষটি তাকে অস্বীকার করেনি।

বরং সম্মান করেছে।

ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন রূপ হয়তো এটাই—যেখানে নিজের চাওয়ার চেয়ে প্রিয় মানুষের মর্যাদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তারপরও তাদের কথা হয়।

কবিতা নিয়ে, জীবন নিয়ে, ইতিহাস আর সাহিত্য নিয়ে।

মাঝেমধ্যে পাখি নির্জন পাহাড়ের ছবি পাঠায়।

লিখে—

"একদিন যদি..."

তিনি উত্তর দেন—

"কিছু স্বপ্ন বাস্তবে পূরণ না হলেও হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকুক। সব ভালোবাসার ঠিকানা একসঙ্গে থাকা নয়; কিছু ভালোবাসার ঠিকানা শুধু স্মৃতি।"

আজও তারা অপেক্ষা করে।

কেউ কারও জন্য নয়, বরং এমন এক সময়ের জন্য—যেখানে ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখতে হবে না, আবার ভালোবাসার নামে কাউকে আঘাতও করতে হবে না।

হয়তো সেই নির্জন রাত কোনো দিন আসবে না।

কিন্তু সেই রাতের স্বপ্ন—তাদের দুজনের হৃদয়ে নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকবে, নীরবে, দূরত্ব বজায় রেখেই।

কারণ সব প্রেমের পরিণতি মিলন নয়।

কিছু প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি হলো—সংযম, সম্মান, আর নীরব অপেক্ষা।



অপেক্ষার নির্জনতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Sunday, June 21, 2026

বাঁশঝাড়ের পেত্নী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাঁশঝাড়টা দিনের বেলাতেও কেমন যেন একটা থমথমে ছায়া ফেলে রাখত। সন্ধ্যার পর সেখানে অন্ধকার জমাট বাঁধলে মনে হতো, ওটা আর কেবল গাছের ঝাড় নয়—জীবন্ত কোনো রহস্যের আস্তানা।

ঠিক সেইরকম এক অন্ধকার রাতে নানু আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে বারান্দায় বসতেন। কাঁসার থালায় দুধকলা দিয়ে ভাত মেখে যখন আমাদের মুখে লোকমা তুলে দিতেন, তখনই শুরু হতো আসল জাদু। নানু তার বড় বড় চোখ জোড়া আরও বড় করে বলতেন, "শোন, তোদের বড়ব্বা হারিকেন জ্বালিয়ে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াতেন..."

কথাটা শোনা মাত্রই আমাদের তলপেটে একটা কঠিন মোচড় দিতো। মুখের খাবার চিবোতে ভুলে গিয়ে আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। পরের লাইনে কী আছে, তা জিজ্ঞেস করতেও বুক কাঁপত। নানু আমাদের মনের অবস্থা বুঝে একটু হাসতেন, তারপর বিশাল এক ভাব নিয়ে বলতেন, "একটু খানি বোস, একটা পান মুখে দিয়ে আসি।"

আমরা তখন প্রমাদ গুনতাম। হায় হায়! গল্পের এই মোক্ষম সময়েই নানুর পান পিপাসা পেতে হলো?

নানু ঘরের কোণ থেকে তার চেনা পানের বাটাটা টেনে নিতেন। তারপর বিখ্যাত হাকিমপুরী জর্দা দিয়ে একটা ঢাউস সাইজের পান মুখে পুরে পুনরায় গল্পের আঞ্জাম দিতেন, "কোথায় যেন ছিলাম?"

আমরা ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিতাম, "বড়ব্বা হারিকেন নিয়ে..."

"হ হ, মনে পড়ছে," নানু জর্দামিশ্রিত পান চিবোতে চিবোতে শুরু করতেন, "তোদের বড়ব্বা যেইনা নদীর পাড়ের ওই বাঁশঝাড়ের নিচে পা বাড়িয়েছেন, অমনি চারপাশটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বন্ধ, হারিকেনের আলোটাও দপ করে একটু কমে গেল। বড়ব্বা ওপরের দিকে তাকাতেই দেখলেন—এক পেত্নী বাঁশঝাড়ের একদম মগডালে বসে আছে! তার কুচকুচে কালো লম্বা চুল ওপর থেকে একদম মাটি পর্যন্ত বিছানো!"

আমরা তখন ভয়ে একজন আরেকজনের গায়ে গা লাগিয়ে লেপ্টে বসতাম। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত। কোনোমতে ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করতাম, "বড়ব্বা... বড়ব্বা ভয় পায়নি নানু?"

নানু তখন পিক ফেলার জন্য একটু থামতেন। মুখে একটা বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে খুব গর্ব করে বলতেন, "আরে না! তোদের বড়ব্বা কি তেমন তেমন লোক? ওনার কোমরে গোঁজা থাকত খাঁটি লোহার একটা ছোরা। ভূত-পেত্নী নাকি লোহা দেখলে যমের মতো ভয় পায়!"

নানু বলতে লাগলেন, "বড়ব্বা এক চুলও না নড়ে গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন, 'কে রে ওখানে? ভালো চাস তো রাস্তা ছাড়!' কিন্তু পেত্নী কি আর অত সহজে শোনে? সে ওপর থেকে এক খিলখিল হাসিতে চারপাশ কাঁপিয়ে তুলল, আর নিজের লম্বা চুলগুলো দিয়ে বড়ব্বার হারিকেনটা আড়াল করার চেষ্টা করল।"

আমরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। নানু বলে চললেন, "বড়ব্বা তখন আর দেরি করলেন না। কোমর থেকে চট করে সেই লোহার ছোরাটা বের করে হারিকেনের আলোয় চকচকে ফলাটা পেত্নীর দিকে তাক করলেন। লোহা দেখামাত্রই পেত্নীর সেই খিলখিল হাসি কান্নায় মোড় নিল। সে এক ঝটকায় তার চুলগুলো গুটিয়ে নিয়ে শাঁ করে বাঁশঝাড়ের ওপারে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিকের বাঁশগুলো মটমট করে এমনভাবে নড়ে উঠেছিল, যেন এখনই ভেঙে পড়বে! কিন্তু তোদের বড়ব্বা বুক ফুলিয়ে, সেই হারিকেন দুলিয়ে দুলিয়ে হেঁটে ঠিক বাড়ি ফিরে এলেন।"

গল্প শেষ হতো, কিন্তু আমাদের বুকের ধকধকানি থামত না। ভাত খাওয়া শেষে যখন শোবার ঘরে যেতাম, জানালার ফাঁক দিয়ে দূরের সেই বাঁশঝাড়ের দিকে তাকালে মনে হতো—সত্যিই বুঝি কোনো এক জোছনা রাতে বা অমাবস্যার অন্ধকারে সেখানে কেউ চুল মেলে বসে আছে।

আজ এত বছর পরও, নানু নেই, সেই শৈশবও নেই। কিন্তু ঘরের কোণে রাখা এই ছোট্ট বাঁশঝাড়ের মিনিয়েচারটার দিকে তাকালে এখনো কানে বাজে নানুর সেই জর্দা চিবানোর আওয়াজ আর খিলখিল করে ওঠা পেত্নীর গল্প।



 বাঁশঝাড়ের পেত্নী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Wednesday, June 17, 2026

অব্যক্ত গোধূলি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মফস্বলের চেনা সকালগুলো শহরের মতো যান্ত্রিক নয়। এখানে কুয়াশা আর রোদের খেলা শেষ হতে না হতেই বাজারের শোরগোল শুরু হয়, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা চলে নিজের খেয়ালে। সরকারি সোনালী ব্যাংকের ছোট শাখাটিতে যেদিন আবিদ প্রথম পা রাখল, সেদিন তার বুকের ভেতর একটা অচেনা একাকীত্ব জেঁকে বসেছিল। শহরের ব্যস্ততম কর্পোরেট শাখা থেকে বদলি হয়ে এই শান্ত, কিছুটা অলস মফস্বলে আসাটা তার ক্যারিয়ারের জন্য হয়তো নিয়মমাফিক, কিন্তু মনের জন্য ছিল একরকম নির্বাসন।

কিন্তু সেই নির্বাসনের প্রথম দিনটাই বদলে গেল একটা চেনা চাবির গোছার শব্দে আর হালকা সুবাসে।

ম্যানেজারের রুম থেকে বের হতেই আবিদের চোখ আটকে গেল জানালার পাশে বসা ক্যাশ ইনচার্জের চেয়ারটিতে। সেখানে বসে আছেন নবনীতা। প্রথম দেখাতেই যে কারো মনে হবে, মফস্বলের ধুলোবালি আর ফাইলের স্তূপের মাঝে তিনি যেন এক টুকরো স্নিগ্ধ পদ্ম। নবনীতার রূপ কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন নয়, বরং শরৎকালের ভোরের শিউলি ফুলের মতো—যাতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে এক অদ্ভুত আত্মমর্যাদা। তার গায়ের রঙ যেন কাঁচা হলুদের সাথে সামান্য দুধ মেশালে যা হয়, ঠিক তেমন। টানা দুটো চোখ, যাতে মায়া আর পেশাদারিত্বের এক অপূর্ব সহাবস্থান। চুলে সাধারণ একটা খোঁপা, পরনে হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচলটি নিখুঁতভাবে কাঁধে পিন করা।

আবিদ খেয়াল করল, নবনীতার টেবিলের সামনে গ্রাহকদের ভিড়। কেউ টাকা তুলতে এসেছে, কেউ পেনশনের খোঁজ নিতে। নবনীতা অত্যন্ত শান্ত মুখে, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে প্রত্যেকের কাজ করে দিচ্ছেন। তার কথা বলার ধরণ এত চমৎকার যে, মনে হয় যেন ব্যাংকের জটিল হিসেব-নিকেশ নয়, তিনি কোনো কবিতার আবৃত্তি করছেন।

শাখায় কর্মকর্তা বলতে মাত্র কয়েকজন। দু-একদিনের মধ্যেই আবিদ জানতে পারল, তারা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে আবিদ চাকরিতে জয়েন করেছে এক ব্যাচ পরে, তাই সহকর্মী হিসেবে সে নবনীতার এক বছরের জুনিয়র। কিন্তু সম্প্রতি আবিদের পদোন্নতি হওয়ায় এখন দুজনেই সমপদস্থ—সিনিয়র অফিসার। এই সমতাটুকু আবিদের বুকের ভেতর একটা অজানা স্বস্তি এনে দিল। সে মনে মনে ভাবল, অন্তত পদমর্যাদার দেয়ালটা তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করতে পারবে না।

দিন যায়। মফস্বলের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো সন্ধ্যার পর পরই টিমটিম করে জ্বলতে শুরু করে। ব্যাংকের ব্যস্ততা শেষ হলে সবাই যার যার নীড়ে ফেরে।

আবিদ আবিষ্কার করল, নবনীতা একাধারে একটি ঘড়ির কাঁটা এবং একটি জলছবি। সে যেমন পেশাদারিত্বে অনড়, তেমনি সংসারী। নবনীতা বিবাহিত, তার একটি চার বছরের কন্যাসন্তান রয়েছে। লাঞ্চের বিরতিতে যখন অন্য অফিসাররা চা-সিগারেটের আড্ডায় মত্ত হয়, নবনীতা তখন ফোনের ওপাশে থাকা গৃহপরিচারিকা বা তার স্বামীর সাথে রাতের রান্নার মেন্যু কিংবা বাচ্চার স্কুলের ডায়রি নিয়ে কথা বলে। তার পৃথিবীটা এক সুতোয় বাঁধা—স্বামী, সন্তান, সংসার আর চাকরি।

আর আবিদ? আবিদ এই শহরে একেবারেই একা। একটা ছোট ছাদযুক্ত বাসা ভাড়া নিয়েছে সে। অফিস শেষ হওয়ার পর যখন মফস্বলের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়, আবিদের ঘরের একাকীত্ব তখন যেন তাকে গিলতে আসে। তার সঙ্গী বলতে কেবল কিছু পুরোনো বই, ডায়েরির পাতা আর কলমের কালি। সে কবিতা লেখে। মনের ভেতর জমে থাকা একরাশ অব্যক্ত কথা সে কাগজের বুকে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে উপশম খোঁজার চেষ্টা করে।

অফিসে প্রতিদিন আবিদ নবনীতাকে দেখে। মন ভরে দেখে। কম্পিউটারের স্ক্রিনের আড়াল থেকে, ফাইলের পাতা ওল্টানোর বাহানায়, কিংবা চা পানের মুহূর্তে। নবনীতার হাসির শব্দটা আবিদের কানে এসে লাগে বসন্তের বাতাসের মতো। যখন নবনীতা কপালে জমে থাকা চূর্ণ অলকগুলো বাম হাতের আঙুল দিয়ে কানের পিঠে গুজে দেয়, আবিদের মনে হয় দুনিয়ার সমস্ত সৌন্দর্য এই একটা ভঙ্গিমার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু আবিদ মন খুলে কথা বলতে পারে না। সমাজ, সংস্কার আর সহকর্মীর মধ্যকার অলিখিত একটা সীমারেখা তাকে আটকে রাখে। নবনীতা যখন কাজের প্রয়োজনে আবিদের ডেস্কে এসে দাঁড়ায়, গম্ভীর গলায় বলে,

 "আবিদ ভাই, এই এলসি ফাইলটা একটু চেক করে দেবেন?"

তখন আবিদ শুধু মাথা নাড়ে। তার মুখের ভাষা যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে হারিয়ে যায়। সে শুধু বোঝে, নবনীতা তার খুব কাছে দাঁড়িয়েও কোটি আলোকবর্ষ দূরের এক নক্ষত্র।

অপেক্ষারও একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সেই অপেক্ষা যখন হৃদয়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে।

এক রাতে বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন আবিদের হৃদয়ের একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সে ফেসবুকে স্ক্রোল করতে করতে আচমকাই নবনীতার প্রোফাইলে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। নবনীতার একটি একক ছবি—নীল শাড়ি পরা, ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেই চেনা স্নিগ্ধ চোখ, ঠোঁটে লেগে থাকা সেই চিরচেনা মায়াবী হাসি।

আবিদের ভেতরের কবিসত্তা আর নিয়মে বাঁধা রইল না। সে ছবিটি ডাউনলোড করল। তারপর টেবিলের ল্যাম্পটি জ্বেলে খাতা কলম নিয়ে বসল। কলমের ডগা দিয়ে ঝরে পড়তে লাগল তার হৃদয়ের সমস্ত নির্যাস। সে লিখল:

 "তুমি যেন মফস্বলের এক চিলতে রোদ,
ফাইলের স্তূপে ঢাকা পড়া এক আলতো প্রমোদ।
 তোমার চোখের ওই শান্ত দিঘির জলে,
 আমার একাকীত্বের নাও ভাসি অবহেলে।
 তুমি অন্য কারোর আকাশ, অন্য কারোর ঘর,
 আমি দূর হতে দেখা এক যাযাবর।"

কবিতাটি শেষ করে আবিদের বুকটা হালকা হলো, আবার এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে আর ভাবল না। মধ্যরাতের সেই মোহগ্রস্ত মুহূর্তে কবিতাটি নবনীতার ইনবক্সে পাঠিয়ে দিল।

পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আবিদের পা কাঁপছিল। যদি নবনীতা রেগে যায়? যদি কথা বলা বন্ধ করে দেয়?

দুপুরের দিকে আবিদের ফোনে মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠল। বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে সে চ্যাটবক্স খুলল। নবনীতা লিখেছে:

 "বাহ্ আবিদ ভাই! আপনি এত সুন্দর কবিতা লেখেন তা তো জানতাম না। ছবিটার সাথে লাইনগুলো দারুণ মানিয়েছে। ধন্যবাদ আপনার এই সুন্দর উপহারের জন্য।"

আবিদের মুখে একটা মলিন হাসি ফুটে উঠল। প্রশংসা! হ্যাঁ, নবনীতা একজন গুণী পাঠকের মতোই কবিতাটির প্রশংসা করেছে। কিন্তু আবিদের মন তাতে ভরল না। কারণ নবনীতা কবিতাটির ভেতরের হাহাকারটুকু দেখল না, বা হয়তো দেখেও না দেখার ভান করল। সে শুধু শব্দের কারুকার্য দেখল, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জলন্ত প্রেমকে স্পর্শ করল না।

এই ঘটনার পর থেকে আবিদের মুগ্ধতা যেন এক তীব্র নেশায় পরিণত হলো। সে এখন শুধু নবনীতাকে দেখেই শান্ত থাকে না, সে নবনীতার সময়ের প্রত্যাশী হয়ে ওঠে। যদি কোনোদিন নবনীতা একটু আগে আসে, কিংবা কোনো ফাইলের জটিলতা নিয়ে আবিদের ডেস্কে এসে বসে একটু বাড়তি সময় কাটায়—আবিদের মনে হয় সেই দিনটাই তার জীবনের সেরা দিন।

আবিদের ডায়েরি এখন শুধু নবনীতার উপমায় ভরা। সে এক জায়গায় লিখল:

 "নবনীতা হলো সেই গোধূলি, যা ক্ষণিকের জন্য আকাশকে রাঙিয়ে দিয়ে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। আর আমি হলাম সেই অন্ধকার, যা প্রতিদিন আলোর প্রত্যাশায় মরেও আবার বেঁচে ওঠে।"

প্রেমের এই অনুভূতি যেমন সুন্দর, তেমনি এর বিরহ বড়ো ভয়ানক। যখন আবিদ দেখে অফিস শেষে নবনীতার স্বামী স্কুটি নিয়ে ব্যাংকের সামনে এসে দাঁড়ায়, নবনীতা মুখে একরাশ ক্লান্তি মুছে চওড়া হাসি নিয়ে স্বামীর পেছনে গিয়ে বসে, তখন আবিদের বুকের ভেতরটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এই বিরহ কোনো ঝড়ের মতো নয় যে সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে; এই বিরহ হলো উইপোকার মতো, যা ভেতর থেকে আস্তে আস্তে একজন মানুষকে খাবে।

আবিদ জানে তার এই চাওয়া কোনোদিন পূর্ণ হবার নয়। সমাজ একে স্বীকৃতি দেবে না, নবনীতার সাজানো সংসারে এর কোনো স্থান নেই। সে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো, যার ভাগ্যে পূর্ণতা নেই, কেবলই ক্ষয়। তবু আবিদের মন মানে না। সে কোনো অধিকার চায় না, সে নবনীতার সাজানো সংসার ভাঙতে চায় না। সে শুধু চায় তার মনের এই জমানো কথাগুলো, এই গভীর অব্যক্ত ভালোবাসা একবার নবনীতাকে মুখোমুখি বসে বলতে।


ব্যাংকের অডিট চলছে। প্রতিদিন রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে সবাইকে। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য অফিসাররা যে যার ডেস্কে ব্যস্ত।

আবিদ তার কেবিন থেকে কাঁচের দেয়ালের ওপাশে তাকাল। নবনীতা ভাউচার মেলাচ্ছে। টেবিলের ল্যাম্পের আলোটা তার মুখে এসে পড়েছে। ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো কিছুটা বুজে আসছে, কিন্তু ঠোঁটের সেই দৃঢ়তা এখনো কমেনি। কপালের টিপটা সামান্য সরে গেছে, যেন একটা চ্যুত নক্ষত্র।

আবিদ এক কাপ কফি নিয়ে নবনীতার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কফির কাপটা আলতো করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, "খুব ক্লান্ত লাগছে? একটু কফি খান।"

নবনীতা চমকে চোখ তুলল। তারপর এক গাল হেসে বলল, "ধন্যবাদ আবিদ ভাই। সত্যি খুব দরকার ছিল।"

আবিদ চেয়ার টেনে বসল। আজ তার বুকের ভেতর এক অন্যরকম সাহস কাজ করছে। সে নবনীতার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে মায়া আছে, কিন্তু সেখানে আবিদের জন্য কোনো ব্যাকুলতা নেই। সেখানে আছে কেবল একজন সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা আর সৌজন্য।

"নবনীতা," আবিদ প্রথমবার তার নামের সাথে 'আপা' বা 'দিদি' কিছুই যোগ করল না।

নবনীতা কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে থামল। কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।

আবিদ জানালার বাইরে তাকাল। মফস্বলের রাত এখন নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও একটা রাতজাগা পাখি ডাকছে। আবিদ মৃদু গলায় বলল, "কিছু কথা থাকে যা বুকের ভেতর জমতে জমতে পাথর হয়ে যায়। সেই পাথরটা বুকের ওপর চেপে বসে থাকলে নিঃশ্বাস নেওয়া যায় না।"

নবনীতা কফির কাপটা নামিয়ে রাখল। তার মুখটা গম্ভীর হলো, কিন্তু চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। সে বলল, "কিছু পাথরকে বুকেই বয়ে বেড়াতে হয় আবিদ ভাই। ওগুলো নামাতে গেলে পায়ের তলার মাটিটাই সরে যেতে পারে।"

আবিদ স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝল, নবনীতা অবুঝ নয়। একজন নারীর মন তার প্রতি তৈরি হওয়া অন্য পুরুষের ভালোলাগার সুবাস ঠিকই টের পায়। নবনীতা কবিতাটির মানে বুঝেছিল, প্রতিদিন আবিদের চেয়ে থাকার অর্থও সে জানে। কিন্তু সে তার সংসারের লক্ষ্মণরেখাটি খুব ভালো করেই চেনে।

আবিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, যা ল্যাম্পের আলোয় ধরা পড়ল না। সে হাসার চেষ্টা করে বলল, "আমি তো কিছু চাচ্ছি না নবনীতা। শুধু সময়ের অপেক্ষা করছি। এমন একটা সময়, যখন আপনি শুধুই একজন শ্রোতা হবেন, আর আমি আমার মনের সব জমানো কথা বলে হালকা হবো।"

নবনীতা উঠে দাঁড়াল। তার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "অডিট শেষ হতে আর দুদিন লাগবে। তারপর একটা রোববার দেখে লাঞ্চের পর আপনাকে আধা ঘণ্টা সময় দেবো। সেদিন অফিসের সহকর্মী হিসেবে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের বন্ধু হিসেবে আপনার সব কথা শুনবো। কেমন?"

নবনীতা চলে গেল। তার শাড়ির খশখশ শব্দ আর চাবির রিংয়ের আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল করিডোরে।

আবিদ একা বসে রইল সেই সুনসান ব্যাংকের আলো-আঁধারিতে। তার মনের অব্যক্ত ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সে আধা ঘণ্টার এক খণ্ড আকাশ পেয়েছে। সে জানে, এই আধা ঘণ্টাই তার সারাজীবনের বিরহ কাটানোর সম্বল হয়ে থাকবে। সে এখন সেই রবিবারের অপেক্ষায়, এক বুক প্রেম আর এক ফোঁটা চাতকের তৃষ্ণা নিয়ে।



Saturday, June 6, 2026

'যাপিত জীবনের কথা' বইয়ের ভূমিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


ভূমিকা: স্মৃতির ক্যানভাসে ফিরে দেখা

সময় এক বহমান নদী। তার কোনো থমকে যাওয়া নেই, ক্লান্তি নেই। নদীর বুকে যেমন পলি জমে, মানুষের বুকেও তেমনি জমে ওঠে অজস্র স্মৃতির রেণু। জীবনের একটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়—এই যে চেনা-অচেনা, আলো-ছায়ার দিনগুলো পার করে এলাম, তার সবটুকুই কি কেবলই সময় পার করা? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে কোনো অলিখিত মহাকাব্য, যা একান্তই আমার, অথচ যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এই চেনা সমাজ, চেনা মানুষ আর চেনা প্রকৃতি?

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সেই অমিয় বাণী—"নিজেকে জানো"—আমার জীবনের এক পরম নির্দেশক। যুগে যুগে মানুষ নিজেকে খোঁজার জন্য কত পথ পাড়ি দেয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, নিজেকে জানার সেই নিরন্তর প্রচেষ্টারই একটি লিখিত রূপ হলো এই আত্মজীবনী। নিজের ভেতরের আলো-আঁধারিকে চেনা, নিজের সীমাবদ্ধতা আর সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করার এই যে মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা, 'যাপিত জীবনের কথা' মূলত তারই এক বিনীত প্রকাশ।

তাই এটি কোনো আত্মশ্লাঘা বা নিজের মহিমা কীর্তনের দলিল নয়। এটি যেমন আমার আত্মআবিষ্কারের জার্নি, তেমনি আমার জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের গল্প। এই দীর্ঘ পথে আমি যেমন সফলতার দেখা পেয়েছি, তেমনি মুখোমুখি হয়েছি চরম সংকট, হতাশা আর কঠিনতম সময়ের। কিন্তু সেই কষ্টের দিনগুলোতে কীভাবে ধৈর্যের হাতটি শক্ত করে ধরে রাখতে হয়, কীভাবে ঝড়ের মধ্যেও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমি খুব কাছ থেকে অর্জন করেছি। আমার বিশ্বাস, জীবনের এই যন্ত্রণাদগ্ধ অধ্যায়গুলো এবং তা থেকে উত্তরণের গল্পগুলো যদি সততার সাথে প্রকাশ করা যায়, তবে তা হয়তো অন্য কোনো পথহারা বা সংগ্রামী মানুষকে একটুখানি আলো দেবে, একটুখানি ধৈর্য ধরার সাহস জোগাবে। অন্যের জীবনের লড়াইয়ে যদি আমার এই অভিজ্ঞতা বিন্দুমাত্র সহায় হতে পারে, তবেই এই লেখার মূল সার্থকতা।

১৯৯০ সালের সেই চেনা মফস্বল বা গ্রামের চাদরে মোড়ানো শৈশব থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সেই মুখরিত করিডোর, হল জীবনের মধ্যরাতের আড্ডা, লাইব্রেরির বইয়ের গন্ধ—সবকিছুই আমার মনন ও চিন্তার জগতকে গড়ে তুলেছে। পরবর্তীতে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের একজন সদস্য হিসেবে ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের চোখে যখন সম্ভাবনার আলো দেখেছি, তখন বারবার মনে হয়েছে—শিক্ষা কেবল পেশা নয়, এটি এক পরম ব্রত।

একদিকে ক্লাসরুমের দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে সৃজনশীলতার তাগিদে কবিতার শব্দবুনন কিংবা সামাজিক বাস্তবতার পটভূমিতে উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টি—এই দুইয়ের দোলাচলেই কেটেছে আমার দিনরাত্রি। কখনো লালন সাঁইয়ের পরম সত্যের সন্ধান, কখনো এ দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের জটিল বাঁকগুলো নিয়ে গবেষণার টেবিলে নির্ঘুম রাত পার করা—সবকিছুই এই যাপিত জীবনের একেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই পথচলায় আমার মা-বাবা, আমার জীবনসঙ্গী, এবং আমার সন্তানেরা আমাকে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে ভালোবাসার বন্ধনে, তা ছাড়া আমি আজ যা কিছু, তার কোনো কিছুই পূর্ণতা পেত না।

স্মৃতি বড়ই প্রবঞ্চক। মাঝে মাঝে সে বড় বেশি ধূসর হয়ে যায়, আবার কখনো কখনো এক ফালি রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে মনের জানালায় এসে কড়া নাড়ে। সেই কড়া নাড়ার শব্দগুলোকেই, নিজের ভেতরের সত্যকে চেনার প্রয়াস আর জীবনদর্শনকেই এক মলাটের ভেতর ধরে রাখার চেষ্টা করেছি এখানে।

সবাইকে আমন্ত্রন আমার যাপিত জীবনের অন্দরমহলে। আসুন, এই স্মৃতির পথ ধরে আমরা সবাই একবার নিজের ভেতরে তাকাই।



'যাপিত জীবনের কথা' বইয়ের ভূমিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Thursday, June 4, 2026

অদেখার আগুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ফেসবুকের নীল পর্দার ওপারে নীল রঙের বাতিটা জ্বলে উঠলেই দুটোর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দোলাচল শুরু হয়। শহরের কোলাহল থেমে যাওয়া নিঝুম রাতে, যখন ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই, চারদিকের নীরবতা ভেঙে মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ওঠে কিছু শব্দ। সেই শব্দগুলোই যেন দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের মাঝে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য মায়াবী সেতু।

একজন ‘নীলকণ্ঠ’, আর অন্যজন ‘মেঘা’। দুটোই ছদ্মনাম। গত ছয়টি মাস ধরে তাদের দিন শুরু হয় একে অপরের ‘শুভ সকাল’ দিয়ে, আর রাত শেষ হয় ইনবক্সের চ্যাটবক্সে সুখ-দুঃখের গল্প বুনে। সকালের প্রথম আলো থেকে রাতের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত—অফিসের ক্লান্তি, বৃষ্টির আনন্দ, প্রিয় বইয়ের আলোচনা কিংবা হঠাৎ মন খারাপের গল্প; সবকিছুই ভাগাভাগি হয় দুজনের মধ্যে।

তারা কেউ কাউকে দেখেনি, কেউ কারও কণ্ঠও শোনেনি। জানে না একে অপরের হাঁটার ভঙ্গি, হাসির ধরন কিংবা চোখের ভাষা। প্রোফাইল পিকচারে নীলকণ্ঠের দেওয়া আছে একটা গিটারের ছবি, আর মেঘার আইডিতে একরাশ কৃষ্ণচূড়া ফুল। যতটুকু পরিচয়, যতটুকু চেনা—সবটাই ওই চ্যাটের কিবোর্ডে টাইপ হওয়া শব্দের ফ্রেমে বন্দী। অথচ প্রতিদিনের ক্লান্তি আর একাকীত্বের মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি না করলে তাদের যেন দিনটাই কাটতে চায় না।

তারা বন্ধু নাকি তার চেয়েও বেশি, কিংবা কেউ কারও প্রেমে পড়েছে কি না—তা নিজেরাও নিশ্চিত নয়। কোনো দিন কয়েক ঘণ্টা মেঘার কোনো খবর না পেলে নীলকণ্ঠ অস্থির হয়ে উঠত। আবার যখন মেঘা ফিরে এসে বলত, "আজ খুব ব্যস্ত ছিলাম", তখন অদ্ভুত এক স্বস্তি নেমে আসত তার মনে। নীলকণ্ঠ রাতে ঘুমানোর আগে ভাবত, “আজ মেঘা মেসেজ দিতে একটু দেরি করল, মেয়েটা কি আমাকে মিস করছিল?”

ওদিকে মেঘাও জানালার বাইরে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ভাবত, “ছেলেটি কি একটু বেশি ভাবছে আমাকে? কথার ফাঁকে ফাঁকে ও যেভাবে আমার সামান্য মন খারাপের কথা বুঝে ফেলে, ও কি আমার ভাবনায় হারিয়ে গেছে?”

কিন্তু তারা কেউই এই গোলকধাঁধার উত্তর খুঁজতে সাহস পেত না। বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে এই ভার্চুয়াল মায়ার শেষ কোথায়, তা তাদের দুজনেরই অজানা। অদেখা সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই অনিশ্চয়তাই।

সেদিন ছিল এক বর্ষণমুখর রাত। জানালার বাইরে ঝুম বৃষ্টি, আর ইনবক্সে জমে উঠেছে তাদের চিরচেনা কথার মেলা। কথা বলতে বলতে কখন যেন হালকা চালের আলাপটা বেশ গভীরে চলে গেল। কথার সেই গভীরতায় হঠাৎ যেন মেঘার মনে এক অদ্ভুত জড়তা ভর করল। সে একটু গম্ভীর হয়ে টাইপ করল:

 “শুনুন নীলকণ্ঠ, এই যে এক অদেখা আকর্ষণ... এর পেছনে নিজেকে পুড়িয়ে খাক করবেন না প্লিজ। আমি কাউকে এভাবে পোড়াতে চাই না।”

নীলকণ্ঠ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। বুকে এক মৃদু ধাক্কা লাগল। একটি বাক্য কখনও কখনও অনেক দীর্ঘ নীরবতার জন্ম দেয়। তার মনে পড়ল, কয়েকদিন আগেই মেঘা কথায় কথায় বলেছিল, সে নাকি আজকাল একজনকে খুব মিস করে। নীলকণ্ঠ এতদিন মনে মনে নিজেকেই সেই ‘একজন’ ভেবে বসে ছিল। মেঘার এই হঠাৎ দূরত্ব তৈরির চেষ্টা দেখে নীলকণ্ঠের মনে হলো, তবে কি সে ভুল ভাবছিল?

একটু বিষণ্ণ হেসে নীলকণ্ঠ উত্তর দিল:

“তার মানে, আপনি কিছুদিন আগে যাকে মিস করার কথা বলেছিলেন... সেই ব্যক্তিটি আমি নই, তাই তো?”

মেঘা ওপাশ থেকে ‘টাইপিং...’ দেখাচ্ছিল, কিন্তু কোনো মেসেজ পাঠাল না। স্ক্রিনের ওপারে নীরবতা জমতে লাগল। নীলকণ্ঠ আবার লিখল:

“আচ্ছা, আপনি আমাকে পোড়াতে চান না বুঝলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে... আপনি নিজে কি পুড়তে চান?”

এবারও কোনো উত্তর এল না। শুধু দেখা গেল, মেঘা অনলাইনে আছে আর মেসেজটা ‘Seen’ হয়ে পড়ে আছে। সে যেন নীলকণ্ঠকে এক অদ্ভুত উত্তরের অপেক্ষায় ঝুলিয়ে রেখে দিল। ওপারে বসে মেঘা হয়তো নিজের মনের সাথেই যুদ্ধ করছিল; হয়তো উত্তর খুঁজছিল, কিংবা নিজের কাছেই কিছু স্বীকার করতে পারছিল না।

সেই ভারী নীরবতাকে ভাঙল নীলকণ্ঠই। চ্যাটবক্সে শেষবারের মতো আঙুল চালিয়ে কবিসুলভ একটা বাক্য লিখে পাঠাল সে:

  “পাখিদের জানতে হয় উড়তে, আর কবিদের জানতে হয় পুড়তে।”

মেসেজটা পড়েই ওপারে মেঘার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান কিন্তু গভীর হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত টাইপ করল:

“উফ! একদম আটকে দিলেন তো। কথার জালে এভাবে আটকে দেওয়াটা অন্যায়।”

শুধু ওই দুটি শব্দ—‘আটকিয়ে দিলেন’। কিন্তু তার ভেতর কত অনুভূতি লুকিয়ে ছিল, তা কেউ জানেনা। মেঘা হয়তো সত্যিই আটকে গিয়েছিল। কথার জালে, অনুভূতির কাছে, নাকি এমন এক সত্যের সামনে—যা উচ্চারণ করলে সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে যেতে পারত?

নীলকণ্ঠ আর কথা বাড়াল না। মেঘার এই ‘আটকে যাওয়া’র মাঝেই সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পেল। রহস্যটা রহস্যই থাক, মায়াটা আরও একটু গাঢ় হোক। সে বিদায়ের একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাল:

“আজকের মতো তবে আসি। শুভরাত্রি, ভালো থাকবেন।”

ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে নীলকণ্ঠ যখন অন্ধকারের দিকে তাকাল, তখন তার ঠোঁটে একটা স্মিত হাসি। ওদিকে মেঘা ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সে ভাবল, কিছু মানুষকে না দেখেও বোধহয় এতটা গভীরভাবে চেনা যায়।

রাত আরও গভীর হলো, কিন্তু দুই মানুষের ভেতরে জন্ম নেওয়া প্রশ্নগুলো ঘুমাল না। আসলে কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয়না, কিছু অনুভূতির কোনো স্বীকৃতি লাগে না। কিছু মানুষ জীবনে আসে, খুব কাছে চলে আসে, অথচ দূরত্বের সব নিয়ম অক্ষুণ্ণ থাকে।

তারা শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়েছিল কি না, তা আজও জানা যায়নি। কিন্তু সেই রাতের পর দুজনেই বুঝেছিল—অদেখা মানুষও কখনও কখনও হৃদয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান সত্য হয়ে উঠতে পারে। আর কিছু আগুন আছে, যা জ্বলে ওঠে কোনো স্পর্শ ছাড়াই; শুধু কিছু শব্দ, কিছু অপেক্ষা আর কিছু অসমাপ্ত উত্তরের ভেতর।

এক টুকরো অদেখা আকর্ষণ আর উত্তরের অপেক্ষায় থাকা একটা প্রশ্ন নিয়ে তাদের গল্পটা আসলে চলতেই থাকল... পর্দার ওপারে, মনের গভীরে।





অদেখার আগুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Wednesday, May 6, 2026

মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মহাসড়কের ধুলোভেজা বিকেল। দূরে সারি সারি বাস—যেন স্থির নদীর ওপর থমকে থাকা নৌকা। হেডলাইটগুলো জ্বলছে, নিভছে, আবার জ্বলছে—ঠিক যেন অপেক্ষার চোখ।

তাসফিয়া জানালার পাশে বসে মোবাইল তুলে একটা ছবি তোলে। ছবির ক্যাপশনে লিখে—
“কখন যে ঢাকায় পৌঁছাতে পারবো, জানিনা...”

স্টোরি আপলোড হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই আসে—
—“আপনি কোন বাসে আছেন?”

তাসফিয়া একটু থামে। নামটা দেখে চিনতে পারে—তাওসিফ। বহুদিনের ফেসবুক ফ্রেন্ড, অথচ একটাও কথা হয়নি কখনো।
সে ছোট করে উত্তর দেয়—
—“গ্রীণ লাইন।”

ওপাশ থেকে আবার—
—“আপনি কি জ্যামে?”

—“হ্যাঁ। আপনি?”

একটু দেরি করে রিপ্লাই আসে—
—“হুম… তবে ঢাকায় যাচ্ছি না। মাঝপথে নেমে যাবো।”

এই ছোট্ট কথোপকথন—যেন একটা দরজা। অদৃশ্য, অথচ খোলা।

তারপর দিন যায়। কথাও বাড়ে।

প্রথমে খোঁজখবর, তারপর গল্প, তারপর নীরবতাও যেন কথা হয়ে ওঠে।

তাওসিফ শব্দের মানুষ। ব্যাংকের ফাইলের ভেতরে তার দিন আটকে থাকলেও, রাত হলেই সে শব্দে আশ্রয় নেয়। কবিতা লেখে। আবৃত্তি করে। তার শব্দে নদী থাকে, কুয়াশা থাকে, আর অদ্ভুত এক শূন্যতা থাকে—যেটা তাসফিয়ার খুব পরিচিত লাগে।

তাসফিয়া মানুষ গড়ার কাজ করে—শিক্ষক। ক্লাসরুমে তার কণ্ঠ দৃঢ়, কিন্তু নিজের জীবনে সে যেন একটু ভেসে থাকা মানুষ। শাড়ি তার ভালোবাসা—প্রতিটি শাড়ি যেন একেকটা ঋতু। নতুন শাড়ি পরে নতুন জায়গায় গেলে সে ছবি তোলে—আর সেই ছবির নিচে তাওসিফ লিখে ফেলে কবিতা।

“তোমার শাড়ির আঁচলে আজকে বিকেলের রোদ আটকে গেছে—
আমি দূর থেকে শুধু আলোর গন্ধ পাই…”

এমন লাইন পড়ে তাসফিয়া চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় না, কিন্তু পড়ার পর তার ভেতরে কিছু নরম হয়ে যায়।

একদিন তাওসিফ একটা কবিতা লিখলো—

“দেখা হোক কোনো এক অনির্ধারিত দুপুরে—
যেখানে সময় থেমে থাকবে চায়ের কাপের ধোঁয়ায়,
আর আমরা দু’জন—
অচেনা হয়েও পরিচিত হয়ে উঠবো…”

কবিতাটা পড়ার পর তাসফিয়া অনেকক্ষণ কিছু লেখে না। শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত ইচ্ছে জন্ম নেয়—
দেখা করার।

কিন্তু কেউ কাউকে বলে না।

হঠাৎ একদিন—
একটা শপিংমলের ভিড়ে—
দু’জনের চোখে চোখ পড়ে।

যেন গল্পের ভেতর থেকে বাস্তব হঠাৎ বের হয়ে এসেছে।

—“তাসফিয়া?”
—“তাওসিফ?”

দু’জনেই একটু হেসে ফেলে।
সময় তখন খুব কম। কথা হয় অল্প—
তবুও সেই অল্প কথার মধ্যে অদ্ভুত এক স্বাচ্ছন্দ্য।

বিদায়ের আগে তাওসিফ বলে—
“একদিন কফি খাওয়া যেতে পারে…”

তাসফিয়া মাথা নাড়ে—
“হতে পারে।”

তারপর আবার তারা ফিরে যায় নিজেদের জীবনে।
কিন্তু এবার কথাগুলো বদলে যায়।

মাঝে মাঝে কথা হয়—
কিন্তু না বললেও অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।

এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।
বন্ধুত্ব?
ভালোবাসা?
নাকি শুধু অভ্যাস?

তারা কেউই জানে না।

তবুও—
রাতের শেষে দু’জনেই অপেক্ষা করে—
একটা “অনলাইন” দেখার জন্য।


একদিন হঠাৎ তাসফিয়া জানতে পারে—
তাওসিফ যেই “মাঝপথে নেমে যাবো” বলেছিল—
সেটা শুধু বাসের কথা ছিল না।

তাওসিফ আসলে একটা সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসছিল।
একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত, ভাঙা সম্পর্ক।

আর তাসফিয়া?
সে বুঝতে পারে—
সে হয়তো তাওসিফের “শেষ গন্তব্য” না—
বরং সেই “মাঝপথ”—
যেখানে মানুষ একটু থামে, শ্বাস নেয়, আবার এগিয়ে যায়।


তাসফিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। নতুন একটা শাড়ি পরে আছে।
মোবাইলে একটা মেসেজ টাইপ করে—

“আজ কফি খাওয়া যাবে?”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই আসে—

“আজ না…
আমি একটু দূরে যাচ্ছি।”

তাসফিয়া ফোনটা নামিয়ে রাখে।
হাসে। খুব হালকা একটা হাসি।

কারণ সে জানে—
সব গল্পের শেষ একসাথে হওয়া না।
কিছু গল্প শুধু সুন্দরভাবে অসম্পূর্ণ থাকার জন্যই জন্ম নেয়।

আর দূরে কোথাও—
মহাসড়কে আবার বাসের লাইন দাঁড়িয়ে থাকে—
যেন সময় এখনও কোথাও আটকে আছে…

 

 মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Saturday, May 2, 2026

নীল ডায়েরির অমীমাংসিত পাতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নতুন স্কুল, নতুন বেঞ্চ, নতুন গন্ধ—চক আর কাগজের মিশ্র এক অচেনা সকাল। প্রথম দিন প্রথম ক্লাসে ঢুকেই চোখ আটকে গিয়েছিল। বোর্ডে তাকানোর কথা ছিল, অথচ চোখ চলে গিয়েছিল জানালার ধারে বসে থাকা মেয়েটির চোখে। অদ্ভুত শান্ত, অথচ কৌতূহলে ভরা—ঠিক যেন অপরিচিত কোনো নদী, যার দিকে তাকালে নামতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নামার সাহস নেই।

সে ছিল ইংরেজি ম্যাডামের মেয়ে।

প্রথমে কিছুই হয়নি। নাম জানা হয়নি, কথাও হয়নি। শুধু প্রতিদিন ক্লাসে ঢুকে অজান্তেই তার বেঞ্চের দিকে তাকানো—এইটুকুই। কয়েকদিন পর ম্যাডাম লক্ষ্য করলেন, ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। ইংরেজি ক্লাসে উত্তরগুলো ঠিকঠাক আসে, উচ্চারণে জড়তা নেই। সুনজরটা তখন থেকেই। ম্যাডাম কখনো হাসেন, কখনো বাড়ির কাজ ভালো হলে খাতায় লাল কালি দিয়ে “Very Good” লিখে দেন।

একদিন ম্যাডাম বললেন,

— আজ বিকেলে আমার বাসায় এসো। একটু গাইড দেব।

বাসায় গিয়ে দেখা হলো মেয়েটার সঙ্গে। স্কুলের চেয়ে বাসায় সে অন্যরকম—চুল খোলা, পায়ে শব্দহীন চটি, চোখে একই রকম নীরব আলো। পড়া শেষে খেলনা বের হলো। লুডু, ক্যারাম, কখনো লুকোচুরি। প্রথম প্রথম কথা কম, পরে হাসি বাড়ে। ছেলেটা বুঝে যায়—এই হাসিটাই সে প্রতিদিন ক্লাসে খুঁজে ফেরে।

এরপর দিনগুলো যেন এক সুতোয় গাঁথা। প্রতিদিন ক্লাসে একসাথে বসা, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, বাসায় গিয়ে পড়া—সবই স্বাভাবিক, অথচ অদ্ভুতভাবে বিশেষ। স্কুলের অন্য ছাত্রছাত্রীরা ফিসফিস করে, চোখাচোখি করে। কেউ বলে, “প্রেমিক-প্রেমিকা!” তারা দু’জন কিছু বলে না। নাম না দেওয়া সম্পর্কটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।

দুই বছর কেটে যায় এভাবেই। স্কুলের দেয়ালে নতুন পোস্টার, মাঠে নতুন দাগ, অথচ তাদের জায়গাটা একই থাকে—একই বেঞ্চ, একই জানালার আলো। কখনো ঝগড়া হয়নি, কখনো বড় করে কথা হয়নি। শুধু একধরনের নিশ্চুপ টান—যেটা না বলা ভালো, না লুকানো যায়।

তারপর হঠাৎই সব বদলে গেল।

ছেলেটাকে অন্য স্কুলে ভর্তি হতে হলো। শেষ দিন সে জানত, কিন্তু বলার সাহস পায়নি। মেয়েটা জানত কি না, সেটাও জানা হয়নি। শেষ ক্লাসে চোখাচোখি হয়েছিল মাত্র একবার। কিছু বলার ছিল, অনেক কিছু—কিন্তু ঘণ্টা বেজে উঠেছিল।

এরপর আর দেখা হয়নি। কোনো রাস্তার মোড়ে নয়, কোনো উৎসবে নয়, এমনকি স্বপ্নেও নয়। সময় এগিয়েছে, নাম ভুলে গেছে হয়তো, মুখের রেখাও ঝাপসা। তবু কোথাও একটা টান রয়ে গেছে—অকারণ, অদৃশ্য, অথচ জেদি।

আজও ইংরেজি বই খুললে প্রথম পাতায় চোখ আটকে যায়। বোর্ডে লেখা কোনো বাক্যের মাঝখানে হঠাৎ মনে পড়ে যায় জানালার ধারের সেই চোখদুটি। তখন মনে হয়—সব প্রেম পূর্ণতা পায় না। কিছু প্রেম স্কুলের বেঞ্চেই থেকে যায়, খাতার ভাঁজে, পুরনো দিনের নীরবতায়।