Sunday, October 11, 2026

ইশ, যদি তোমাকে ভালোবাসাটা বৈধ হতো -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

প্রিয় তুমি,

ইশ, যদি তোমাকে ভালোবাসাটা বৈধ হতো! ইশ, যদি তোমাকে ভালোবাসার পথে এত বাধা না থাকত! তাহলে হয়তো ভালোবাসার কথাগুলো এভাবে বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখতে হতো না। লুকোচুরি করে তোমার সঙ্গে কথা বলতে হতো না, কারও চোখে পড়ে যাওয়ার ভয়ে প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিতে হতো না। তোমাকে ভালোবাসি অথচ তোমার প্রতি আমার অনুভূতিগুলো কিছুই নয়—এমন অভিনয়ও করতে হতো না।

জানো, আমার খুব ইচ্ছে করে তোমার নামটা সবার সামনে উচ্চারণ করতে। কোনো সংকোচ ছাড়াই তোমার কথা বলতে, তোমাকে নিয়ে মনের ভেতর জমে থাকা হাজারো অনুভূতির গল্প শোনাতে। ইচ্ছে করে, তোমার পাশে বসে নির্ভয়ে কিছুটা সময় কাটাতে, তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে মনের কথাগুলো বলতে। ভবিষ্যতে কী হবে, কে কী ভাববে, আমাদের এই অনুভূতির পরিণতি কী—এসব হিসাব না কষেই তোমার সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্ত নিজের মতো করে বাঁচতে।

কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। আমাদের মাঝখানে এমন কিছু পরিস্থিতি, কিছু অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো চাইলেই অতিক্রম করা যায় না। হৃদয় যা চায়, বাস্তবতা সব সময় তা হতে দেয় না। তাই কত কথা বলার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নীরব হয়ে যাই। কতবার তোমাকে বলতে চেয়েছি, তুমি আমার কাছে কতটা বিশেষ, অথচ শেষ মুহূর্তে শব্দগুলো গলায় এসে আটকে গেছে। তোমার সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি, অথচ আমার ভেতরে তখন কত না বলা কথা নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে!

তুমি হয়তো কখনো বুঝতেও পারবে না, তোমার সঙ্গে কথা বলার পরও আমার কত কথা বাকি থেকে যায়। তোমাকে কাছে পেয়েও কতটা দূরে থাকার অভিনয় করতে হয়। তোমার প্রতি আমার অনুভূতিগুলোকে আড়াল করতে গিয়ে কতবার নিজের সঙ্গেই লড়াই করি। কখনো কখনো মনে হয়, মানুষ সবচেয়ে বেশি অসহায় তখনই হয়, যখন তার হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতিটিকেই প্রকাশ করার অধিকার থাকে না।

জানো, মাঝে মাঝে ভাবি, অন্য কোনো জন্মে যদি আমাদের আবার দেখা হতো! যদি তখন আমাদের চারপাশে এত নিয়ম, এত বাধা, এত হিসাব-নিকাশ না থাকত! যদি নির্দ্বিধায় তোমার হাত ধরে বলতে পারতাম, ‘তোমাকেই চাই, তোমাকেই ভালোবাসি।’ যদি তোমাকে বেছে নেওয়ার আগে পৃথিবীর কাছে কোনো কৈফিয়ত দিতে না হতো! যদি ভালোবাসার জন্য আমাদের এতটা সতর্ক, এতটা নীরব, এতটা অসহায় হতে না হতো!

কিন্তু এই জন্মে হয়তো আমাদের গল্পটা অন্য রকম। এখানে কিছু অনুভূতি প্রকাশের জন্য নয়, শুধু নীরবে বয়ে বেড়ানোর জন্যই জন্ম নেয়। কিছু মানুষ জীবনে আসে, হৃদয়ে গভীর জায়গা করে নেয়, অথচ তাদের নিজের করে পাওয়ার অধিকারটুকু আমাদের থাকে না। তারা থেকে যায় মনের গোপন কোনো ঘরে—যেখানে প্রতিদিন তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়, অথচ পৃথিবীর কাউকে সে কথার সাক্ষী করা যায় না।

তাই আপাতত তোমাকে আমার নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলোতে আগলে রাখব। রাতের নির্জনতায়, একাকী বিকেলের ভাবনায়, ডায়েরির পাতায় কিংবা কোনো অসমাপ্ত চিঠির প্রতিটি শব্দে তোমাকে খুঁজে নেব। যখন খুব বলতে ইচ্ছে করবে, তখন হয়তো চুপ করে থাকব। যখন খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করবে, তখন দূর থেকেই তোমার ভালো থাকার প্রার্থনা করব। আর যখন বুকের ভেতর জমে থাকা অনুভূতিগুলো আর ধরে রাখতে পারব না, তখন সেগুলোকে শব্দের আড়ালে লুকিয়ে রাখব।

তোমার কাছে আমার কোনো দাবি নেই, কোনো অভিযোগও নেই। শুধু মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে, তুমি যদি একবার আমার নীরবতার ভাষাটা বুঝতে! যদি বুঝতে পারতে, স্বাভাবিক কথার আড়ালে কতটা অনুভূতি লুকিয়ে থাকে, হাসির আড়ালে কতটা দীর্ঘশ্বাস জমে থাকে, আর কিছু না বলার মধ্যেও কত কথা বলা হয়ে যায়!

হয়তো কোনো দিন এই চিঠিটা তোমার হাতে তুলে দেওয়ার সাহসও আমার হবে না। হয়তো চিঠিটা থেকে যাবে আমার কাছেই, ঠিক আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলোর মতো। তবু লিখলাম, কারণ কিছু কথা কাউকে শোনানোর জন্য নয়, নিজের ভেতরের ভারটা একটু হালকা করার জন্য লিখতে হয়।

ইশ, যদি তোমাকে ভালোবাসাটা এত কঠিন না হতো!

যদি ভালোবাসার জন্য নিজেকে লুকিয়ে রাখতে না হতো, যদি তোমার নামের পাশে নিজের নামটা কল্পনা করতে গিয়ে বাস্তবতার কথা মনে না পড়ত, যদি তোমাকে ভালোবাসার অপরাধবোধ ছাড়াই তোমার প্রতি আমার সমস্ত মায়া উজাড় করে দিতে পারতাম!

কিন্তু সব ইচ্ছের পূর্ণতা হয় না, সব ভালোবাসার পরিণতি এক হয় না। কিছু ভালোবাসা অধিকার হয়ে ওঠে না, কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না। তবু তারা মিথ্যে হয়ে যায় না। বরং কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলোই নীরবতার ভেতর সবচেয়ে বেশি বেঁচে থাকে।

তাই তোমাকে কিছু বলতে না পারলেও, আমার না-বলা কথাগুলোর ভেতর তুমি থেকো। আমার নীরবতার মধ্যে থেকো, আমার ভাবনার গভীরে থেকো, আমার অসমাপ্ত লেখাগুলোর প্রতিটি শব্দে থেকো।

তোমাকে ভালোবাসার অনুমতি হয়তো আমার নেই, কিন্তু তোমাকে ঘিরে যে অনুভূতিগুলো আমার ভেতরে জন্ম নিয়েছে, সেগুলো অস্বীকার করার সাধ্যও আমার নেই।

ভালো থেকো। আর কোনো দিন যদি আমার নীরবতা তোমার কাছে অর্থহীন মনে হয়, মনে রেখো—কিছু নীরবতা অবহেলার নয়, কিছু দূরত্ব অনীহার নয়; কিছু ভালোবাসা শুধু পরিস্থিতির কাছে হার মেনে শব্দহীন হয়ে থাকে।

 

ইতি,

তোমাকে নীরবে ভালোবেসে যাওয়া
একজন মানুষ।

 

 

ইশ, যদি তোমাকে ভালোবাসাটা বৈধ হতো -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

 

Friday, October 9, 2026

শিউলি-ঝরা প্রেম -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

১. 

“আগে থেকে একটা টেক্সট, আমি তোমাকে কখনও দিইনি, আর দেবও না। তবুও বলি, তোমাকে ভালোবাসার নেশা আমার এ জনমে শেষ হবে না…”

ফেসবুকের নিউজফিডে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ থমকে গেল ডালিম হায়দার। পোস্টটি পড়ার পর কয়েক সেকেন্ড তার চোখ স্থির হয়ে রইল মুঠোফোনের পর্দায়। তারপর আবার পড়ল। একবার, দুবার, তিনবার।

শব্দগুলো খুব সাধারণ। অথচ কোথায় যেন একটা গভীর অভিমান লুকিয়ে আছে। এমন এক অভিমান, যার আড়ালে হয়তো অপেক্ষা আছে, ভালোবাসা আছে, আছে কারও কাছ থেকে সামান্য একটু মনোযোগ পাওয়ার আকুলতা।

ডালিমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

এই ডালিম কিন্তু কোনো রসালো ফল নয়। আবার ইতিহাসের আলোচিত মেজর ডালিমও নয়। ইনি একজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ, পেশায় কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। ছাত্রজীবন থেকেই গল্প, কবিতা আর উপন্যাসের পাতায় নিজের একটা আলাদা পৃথিবী গড়ে তুলেছে সে। মানুষের মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্না, নীরবতার ভেতরে জমে থাকা অভিমান কিংবা ভালোবাসার সূক্ষ্মতম অনুভূতিগুলো বুঝতে পারার একটা অহংকারও তার আছে।

কিন্তু আজ একটি ফেসবুক পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতিগুলোকেই চিনতে পারছে না সে।

পোস্টটি করেছেন ডালিয়া।

ডালিয়া রহমান। তিনিও সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখেন, পড়েন, কবিতার ভেতরে মানুষ খোঁজেন। তাঁর লেখায় কখনো প্রেমের মায়াবী আলো, কখনো বিরহের দীর্ঘশ্বাস, কখনোবা নারীর নীরব আত্মকথা ফুটে ওঠে। নামের সঙ্গে ডালিয়া ফুলের একটা কাব্যিক মিল থাকলেও তাঁকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে কেবল তাঁর সৌন্দর্য নয়; বরং তাঁর কথার গভীরতা, চিন্তার স্বাতন্ত্র্য আর অনুভূতির প্রকাশভঙ্গি।

ডালিম আর ডালিয়ার পরিচয় ফেসবুকে। পরিচয়ের সূত্র কবিতা, আর সম্পর্কের সেতু মেসেঞ্জার।

তবে সম্পর্কটা ঠিক কী, তা এখনো কেউ জানে না। এমনকি তারা নিজেরাও নয়।

ডালিম পোস্টটি আবার পড়ল।

তারপর মেসেঞ্জারে ঢুকে ডালিয়ার নামের ওপর আঙুল রাখল।

কিছু লিখতে গিয়েও থেমে গেল।

কী লিখবে?

“কবিতাটা সুন্দর হয়েছে”—এতটুকু বললে কি মনের কথাটা বলা হবে?

নাকি লিখবে, “কাউকে এতটা ভালোবাসলে তার অভিমান ভাঙানোর দায়িত্বও তো নিতে হয়!”

কিন্তু দ্বিতীয় কথাটি লিখতে গিয়ে তার আঙুল কেঁপে উঠল। কথাটা কি একটু বেশি ব্যক্তিগত হয়ে গেল না?

ডালিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

অবশেষে লিখল—

—কবিতার মানুষটি কি খুব অভিমানী?

মেসেজটি পাঠিয়ে সে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর জানালার বাইরে তাকাল। শরতের আকাশে তখন বিকেলের আলো নিভে আসছে। দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে বসে একটি পাখি ডাকছে। ডালিমের মনে হলো, প্রকৃতিও বুঝি আজ তাকে নিয়ে একটু মজা করছে।

কয়েক মিনিট পর মেসেঞ্জারে উত্তর এল।

—মানুষটি অভিমানী নয়। শুধু যার কাছে একটু কথা আশা করে, তার নীরবতা সহ্য করতে পারে না।

ডালিমের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

সে লিখল—

—তাহলে মানুষটির অপেক্ষা কি খুব দীর্ঘ?

উত্তর এল—

—অপেক্ষা দীর্ঘ হয় না, ডালিম সাহেব। অপেক্ষার মানুষটি নীরব থাকলে সময়টা দীর্ঘ মনে হয়।

ডালিম আর হাসতে পারল না।

কারণ, কথাগুলো কবিতার চরিত্রের জন্য লেখা হলেও কোথাও যেন তার নিজের নামটিই উচ্চারিত হচ্ছিল।

সেদিন প্রথমবার ডালিমের মনে হলো, ডালিয়ার লেখা কবিতার মানুষটি হয়তো কাল্পনিক নয়।

হয়তো সেই মানুষটি সে নিজেই।

আর যদি সত্যিই তা-ই হয়, তবে এই গল্পের শুরুটা সে জানত, কিন্তু শেষটা কোথায়—তা তার জানা নেই।

 

২. 

ডালিমের সঙ্গে ডালিয়ার পরিচয় হয়েছিল কয়েক মাস আগে।

সেদিন ছিল শরতের এক শান্ত সন্ধ্যা। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে কাশফুলের ঋতুর মায়া। কলেজ থেকে ফিরে চায়ের কাপ হাতে ফেসবুকে ঢুকেছিল ডালিম। প্রতিদিনের মতোই পরিচিত লেখকদের কবিতা, গল্প আর সাহিত্যবিষয়ক পোস্ট দেখছিল।

হঠাৎ একটি কবিতায় চোখ আটকে গেল।

কবিতার নাম—‘অপেক্ষার জানালায়’।

লেখিকার নাম ডালিয়া রহমান।

কবিতাটির কয়েকটি পঙ্‌ক্তি ডালিমের মনে গভীর দাগ কাটল। সেখানে একজন মানুষ তার প্রিয় মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দাবি নেই, শুধু একটা নীরব আকাঙ্ক্ষা—কেউ একজন এসে বলুক, “আমি আছি, তোমার একাকিত্বের পাশে।”

ডালিম কবিতাটি দুবার পড়ল। তারপর লেখিকার প্রোফাইলে ঢুকল।

কবিতার সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিছু ছোট কবিতা, কয়েকটি গদ্য, আর বিচ্ছিন্ন কিছু অনুভূতির লেখা। কিন্তু প্রতিটি লেখার মধ্যে একটা নিজস্ব স্বর আছে। শব্দের কারুকাজের চেয়ে অনুভূতির সততা সেখানে বেশি।

ডালিমের ভালো লাগল।

সে কবিতাটি মেসেঞ্জারে শেয়ার করে লিখল—

—আপনার এই কবিতাটি আমার ভালো লেগেছে। বিশেষ করে অনুভূতির প্রকাশভঙ্গি। আপনার লেখায় একটা স্বাভাবিক কোমলতা আছে, যা সহজে তৈরি করা যায় না। এমন প্রতিভার সঙ্গে পরিচয় হলে সাহিত্যে নতুন নক্ষত্রের সন্ধান মিলতে পারে।

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।

—আপনার মতো একজন গুণী মানুষের কাছ থেকে এমন কথা পাওয়া সত্যিই আনন্দের। আমি তো খুব বেশি দিন ধরে লিখছি না। এখনো অনেক কিছু শেখার আছে।

ডালিম লিখল—

—লেখালেখির বয়স দিয়ে প্রতিভা বিচার করা যায় না। অনেক সময় একটি ভালো কবিতার পেছনে বহু বছরের নীরব অনুভব কাজ করে।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—কথাটা সুন্দর বলেছেন। তবে প্রতিভা থাকলেই তো হয় না, কেউ একজন পাশে থেকে উৎসাহ দিলে হয়তো সেই প্রতিভা পূর্ণতা পেত।

ডালিম সেদিন কথাটিকে নিছক সাহিত্যিক বিনয় হিসেবেই নিয়েছিল।

জানত না, একদিন এই কথাটিই তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর সত্য হয়ে উঠবে।

তারপর শুরু হলো কবিতা নিয়ে আলোচনা।

কখনো ডালিয়া নিজের লেখা পাঠাতেন, ডালিম ছন্দের দুর্বলতা ধরিয়ে দিত। কখনো ডালিম কোনো গল্পের অংশ শেয়ার করত, ডালিয়া চরিত্রের মনস্তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন।

তাদের কথোপকথনে থাকত সাহিত্য, দর্শন, জীবনবোধ, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল কিংবা সমকালীন লেখকদের প্রসঙ্গ।

কথা হতো, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নয়।

কে কোথায় থাকেন, কার জীবনে কী ঘটেছে, কে কাকে ভালোবাসেন—এসব প্রশ্নের কোনো জায়গা ছিল না।

তাদের সম্পর্কের একটি সুন্দর সীমারেখা ছিল।

ডালিম ডালিয়াকে জানত একজন কবি হিসেবে। ডালিয়া ডালিমকে চিনতেন একজন সাহিত্যপ্রেমী শিক্ষক হিসেবে।

কিন্তু মানুষকে কি কেবল তার পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যায়?

কখনো কখনো একটি কবিতার ব্যাখ্যা করতে করতে আমরা কবির হৃদয়ের কাছে পৌঁছে যাই। তারপর একসময় বুঝতে পারি, আমরা আর কবিতা পড়ছি না—আমরা মানুষটিকেই পড়ছি।

ডালিমের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটল।

 

৩. 

শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের হালকা শীত তখন বাতাসে।

সকালের জানালা দিয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে ডালিমের পড়ার টেবিলে। টেবিলের ওপর কয়েকটি বই, পাশে অর্ধেক খাওয়া চায়ের কাপ। কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে।

ঠিক তখনই মেসেঞ্জারে একটি মেসেজ এল।

ডালিয়া লিখেছেন—

—একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

ডালিম উত্তর দিল—

—জিজ্ঞেস করুন।

—আপনি কি সব সময় এত গম্ভীর থাকেন, নাকি কবিতা নিয়ে কথা বলার সময়ই শুধু এমন হন?

ডালিম হেসে ফেলল।

—কেন বলুন তো?

—আপনার কথাবার্তা দেখে মনে হয়, আপনি প্রতিটি শব্দ বলার আগে তার সাহিত্যিক মূল্য যাচাই করে নেন।

ডালিম লিখল—

—তা হলে তো বিপদ! আপনার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমাকে অভিধান নিয়ে বসতে হবে।

—না, না। আজ অভিধান বন্ধ থাকুক। আজ একটু সাধারণ মানুষের মতো কথা বলুন।

ডালিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর লিখল—

—সাধারণ মানুষের মতো কথা বলার অনুমতি দিলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?

—করুন।

—আপনি কি সব সময় এত সুন্দর করে কথা বলেন?

উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।

—এটা কি কবিতার সমালোচনা, নাকি অন্য কিছু?

ডালিমের বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।

সে লিখল—

—কিছু কিছু অনুভূতির সমালোচনা করা যায় না। শুধু অনুভব করতে হয়।

সেদিন কথোপকথনের মোড় বদলে গেল।

প্রথমবার তারা কবিতার বাইরে এসে নিজেদের নিয়ে কথা বলল। শৈশব, পড়াশোনা, পছন্দের বই, অবসর, বৃষ্টির দিন, একাকিত্ব, পছন্দের গান—একটি বিষয় থেকে আরেকটি বিষয়ে গড়িয়ে চলল আলাপ।

ডালিম জানতে পারল, ডালিয়া বই পড়তে ভালোবাসেন, বৃষ্টি হলে জানালার পাশে বসে থাকতে ভালো লাগে, আর খুব কাছের মানুষদের কাছ থেকে তাঁর প্রত্যাশা খুব সামান্য—একটু সময়, কিছু আন্তরিক কথা, আর প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে থাকার নিশ্চয়তা।

ডালিয়া জানতে পারলেন, ডালিম বাইরে থেকে যতটা গম্ভীর, ভেতরে ততটা নয়। সে অভিমান করে, মন খারাপ করে, কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই একা থাকতে চায়। নিজের অনুভূতি সহজে প্রকাশ করতে পারে না, অথচ অন্যের অনুভূতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখতে পারে।

সেদিনের কথোপকথনের শেষে ডালিয়া লিখলেন—

—আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।

ডালিম লিখল—

—আমারও।

—কবিতা নিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে?

ডালিম কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর উত্তর দিল—

—হ্যাঁ, মানুষ হিসেবে।

এই ছোট্ট কথাটির মধ্যেই যেন অদৃশ্য একটি দরজা খুলে গেল।

সেই দরজার ওপাশে ছিল এক নতুন পৃথিবী।

সেখানে সাহিত্য ছিল, কিন্তু কেবল সাহিত্য নয়। সেখানে বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু কেবল বন্ধুত্ব নয়। সেখানে কথা ছিল, অথচ কথার আড়ালে এমন কিছু অনুভূতি জমতে শুরু করেছিল, যার কোনো নাম তখনো তারা কেউ দিতে চায়নি।

 

৪. 

ব্যক্তিগত কথাবার্তা বাড়তে থাকল।

একদিন ডালিয়া নিজের পড়াশোনা, কর্মজীবন এবং জীবনের কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানালেন, বয়সের দিক থেকে তিনি ডালিমের চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড়।

ডালিম প্রথমে অবাক হয়েছিল।

সে এত দিন বয়স নিয়ে ভাবেনি। ডালিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বয়সের কোনো হিসাব তার মাথায় আসেনি। কিন্তু কথাটি জানার পর সে কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল।

ডালিয়া হয়তো তার নীরবতাকে অন্যভাবে বুঝেছিলেন।

তিনি লিখলেন—

—বয়সের কথাটা আগে বলা উচিত ছিল। জানি না, আপনি বিষয়টাকে কীভাবে নেবেন।

ডালিম উত্তর দিল—

—কেন? বয়স কি আমাদের কথোপকথনের বিষয়বস্তু বদলে দিয়েছে?

—তা নয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে এসব বিষয় তো গুরুত্বপূর্ণ।

—গুরুত্বপূর্ণ, অবশ্যই। তবে আমার কাছে মানুষের মন, চিন্তা আর ব্যক্তিত্বও গুরুত্বপূর্ণ।

ডালিয়া লিখলেন—

—আপনি কথাগুলো খুব সুন্দর করে বলতে পারেন।

ডালিম এবার একটু দুষ্টুমি করল।

—শুধু বলতে পারি, নাকি বুঝতেও পারি, সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

—বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে!

—সাহিত্য পড়াই তো আমার পেশা। মানুষের মনের অঙ্ক কষতে কষতে নিজের অঙ্কটাই কখনো কখনো ভুল হয়ে যায়।

ডালিয়া হেসে ওঠার ইমোজি পাঠালেন।

তারপর লিখলেন—

—তাহলে একটা কথা বলি? আমার বয়স আপনার চেয়ে বেশি জেনে যদি কখনো মনে হয়, এই সম্পর্কটা আর এগোনো উচিত নয়, তাহলে নির্দ্বিধায় বলবেন। আমি চাই না, কোনো মানুষ আমার কারণে অস্বস্তিতে থাকুক।

ডালিম এবার আর হাসল না।

সে লিখল—

—ডালিয়া, একটা কথা মনে রাখবেন। আমি আপনাকে কোনো বয়সের সংখ্যার মধ্যে দিয়ে চিনিনি। আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে যে মানুষটিকে চিনেছি, তার প্রতি আমার ভালো লাগা তৈরি হয়েছে। সেই অনুভূতিকে শুধু বয়সের হিসাব দিয়ে বিচার করতে পারব না।

ডালিয়া অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিলেন না।

ডালিম ভাবল, হয়তো কথাটি বেশি আবেগপূর্ণ হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণ পর মেসেজ এল—

—সবাই যদি এভাবে ভাবতে পারত!

ডালিম লিখল—

—সবাই তো কবিতা পড়ে না, আর পড়লেও সবাই কবিতার ভেতরে মানুষ খুঁজতে শেখে না।

সেদিনের কথোপকথন সেখানেই শেষ হয়েছিল।

কিন্তু ডালিয়া ফোনটা রেখে দেওয়ার পরও অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে ছিলেন।

বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে। দূরের গাছের পাতাগুলো নড়ছে ধীরে ধীরে।

তাঁর মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিন পর কেউ যেন তাঁকে শুধু একজন নারী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দেখতে শিখেছে।

যে বয়সের হিসাবের আগে অনুভূতির ভাষা বোঝার চেষ্টা করে।

যে সৌন্দর্যের প্রশংসা করার আগে মনের সৌন্দর্য খুঁজে নেয়।

আর ডালিম?

সেও সেদিন নিজের কাছে একটি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছিল।

সে ডালিয়ার সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসে।

অকারণেই ভালোবাসে।

কোনো কবিতার প্রয়োজন হয় না, কোনো সাহিত্যিক আলোচনার অজুহাত লাগে না।

শুধু ডালিয়া অনলাইনে এলে তার মন ভালো হয়ে যায়।

এটাই কি প্রেমের শুরু?

ডালিম জানত না।

তবে এটুকু বুঝেছিল, তার দিনের ভেতর একটি নতুন অপেক্ষা জন্ম নিয়েছে।

 

৫. 

তারপর থেকে তাদের দিনগুলো বদলে গেল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ডালিম ফোন হাতে নিত। ডালিয়ার কোনো মেসেজ এসেছে কি না, দেখত।

কখনো থাকত—

“ঘুম ভেঙেছে, কবি সাহেব?”

কখনো—

“আজ আকাশটা খুব সুন্দর। আপনার জন্য একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে।”

আবার কোনো দিন—

“চা খেয়েছেন? খালি পেটে সাহিত্যচর্চা করলে কিন্তু কবিতার ছন্দ নষ্ট হয়ে যেতে পারে!”

ডালিমের উত্তরও কম যেত না।

“চা খেয়েছি। তবে আপনার মেসেজটা না পেলে সকালের স্বাদটা অসম্পূর্ণ থাকত।”

কখনো ডালিয়া লিখতেন—

“আপনি কি সবার সঙ্গেই এমন মিষ্টি করে কথা বলেন?”

ডালিম উত্তর দিত—

“না। সবার জন্য আমার এত শব্দ খরচ হয় না।”

—তাহলে আমার জন্য এত শব্দ কেন?

—কিছু মানুষকে উত্তর দিতে হয় না, তাদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে।

ডালিয়া মেসেজটি পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতেন।

তারপর লিখতেন—

—আপনি জানেন, আপনার এই কথাগুলো খুব বিপজ্জনক?

—কেন?

—কারও মন ভালো করে দেওয়ার ক্ষমতা সবার থাকে না। আর যার থাকে, তার কাছ থেকেই মানুষ একসময় বেশি কিছু আশা করে বসে।

ডালিম লিখত—

—তাহলে আপনার মন ভালো রাখার দায়িত্বটা আমাকে দেওয়া যায়।

ডালিয়া উত্তর দিতেন—

—দায়িত্ব নেওয়া সহজ, দায়িত্ব পালন করা কঠিন।

ডালিম লিখত—

—দেখুন না, চেষ্টা করে।

এভাবেই তাদের কথার ভেতরে ভালোবাসা জমতে লাগল।

কখনো কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে করতে রাত গভীর হয়ে যেত। কখনো কোনো গল্পের চরিত্র নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে একজন আরেকজনকে খোঁচা দিত। কখনো দুজনেই কোনো কথা না বলে শুধু অনলাইনে থাকত।

তবু নীরবতারও একটা ভাষা ছিল।

ডালিয়া যখন মন খারাপ করতেন, তাঁর কথার দৈর্ঘ্য কমে যেত। ডালিম যখন কোনো চিন্তায় ডুবে থাকত, তখন হঠাৎ করেই কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে যেত।

ডালিয়া সেই অনুপস্থিতির কারণ বুঝতে পারতেন না।

তিনি জানতেন, ডালিমের কাজ আছে, কলেজ আছে, নিজের জীবন আছে। তবু মন কি সব সময় যুক্তির কথা শোনে?

যার একটি ছোট্ট মেসেজে সকাল সুন্দর হয়ে ওঠে, তার কয়েক ঘণ্টার নীরবতাও কখনো কখনো পুরো দিনটিকে বিষণ্ন করে দিতে পারে।

একদিন দুপুরে ডালিয়া লিখলেন—

—আপনার সঙ্গে একটা কথা বলব?

—বলুন।

—আপনি যখন আমার সঙ্গে কথা বলেন, তখন মনে হয় আমি আপনার কাছে বিশেষ কেউ। আবার হঠাৎ কোনো খবর না দিয়ে হারিয়ে গেলে মনে হয়, হয়তো আমি নিজেই ভুল বুঝছি।

ডালিম মেসেজটি পড়ে চুপ করে রইল।

কথাটা সত্যি।

সে ডালিয়াকে পছন্দ করে, কিন্তু নিজের অনুভূতিকে কীভাবে সামলাতে হয়, তা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। কখনো সে খুব কাছে চলে আসে, আবার কখনো অজানা দ্বিধায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

তার মনে হয়, অতিরিক্ত আবেগ মানুষকে দুর্বল করে দেয়। আবার ডালিয়ার সঙ্গে কথা না বললে তার নিজেরই অস্থির লাগে।

এই দ্বন্দ্বের কোনো সুন্দর সাহিত্যিক সমাধান তার জানা নেই।

সে শুধু লিখল—

—আপনি ভুল বুঝছেন না, ডালিয়া। তবে কখনো কখনো আমি নিজের মধ্যেই হারিয়ে যাই।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—নিজের মধ্যে হারিয়ে যান, তাতে আমার আপত্তি নেই। শুধু যাওয়ার আগে জানিয়ে গেলে ভালো লাগে। তাহলে অন্তত অপেক্ষা করতে করতে নিজেকে ভুল বুঝতে হয় না।

ডালিম কথাটা মনে রাখার চেষ্টা করল।

কিন্তু মানুষ অনেক সময় যে কথাগুলো সবচেয়ে ভালো বোঝে, সেগুলোই বাস্তবে সবচেয়ে বেশি ভুলে যায়।

ডালিমও তার ব্যতিক্রম হলো না।

 

৬. 

সেদিন সকাল থেকেই ডালিয়ার মন ভালো ছিল।

ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলতেই দেখেছিলেন, রাতের শিশিরে বাগানের শিউলিগুলো ভিজে আছে। সাদা পাপড়ির ওপর কমলা বোঁটা, মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা ফুলের গন্ধ—সবকিছুতেই এক ধরনের কোমল বিষণ্নতা।

তিনি ভাবলেন, আজ ডালিমকে একটা কবিতা পাঠাবেন।

কবিতার নাম দিলেন—‘তোমাকে বলিনি’।

কবিতাটি লিখতে লিখতে তাঁর মনে হচ্ছিল, কথাগুলো যেন নিজের অজান্তেই একজন নির্দিষ্ট মানুষের জন্য লেখা হয়ে যাচ্ছে।

তিনি লিখলেন—

তোমাকে বলিনি, তবু তুমি জানো, কোন কথাটুকুতে আমার মন ভালো হয়। তোমাকে ডাকিনি, তবু প্রতিটি সন্ধ্যায় কেন জানি তোমার অপেক্ষা রয়।

তুমি যদি জানতেই না, তবে এত কাছে এলে কেন? আমার নীরবতায় নিজের কথাগুলো রাখলে কেন? এখন তুমি চুপ করে থাকলে, আমার চারপাশে এত শব্দের ভিড়েও একটা শূন্যতা বাজে কেন?

কবিতাটি শেষ করে ডালিয়া ডালিমকে পাঠালেন।

লিখলেন—

—আজ সকালে লিখলাম। পড়বেন, সময় হলে।

ডালিম তখন কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মেসেজটি দেখল, কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো সময় পেল না। মনে মনে ভাবল, কলেজ থেকে ফিরে কবিতাটি পড়বে, তারপর ভালো করে মতামত জানাবে।

কিন্তু কলেজে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্লাস, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা, জরুরি কিছু কাজ—সব মিলিয়ে দিনটি কেটে গেল।

বিকেলে বাসায় ফিরেও একটি কাজে আটকে গেল সে।

এদিকে ডালিয়া বারবার ফোন দেখছেন।

সকালে পাঠানো মেসেজের কোনো উত্তর নেই।

দুপুর পেরিয়ে বিকেল হলো।

ডালিয়া নিজেকে বোঝালেন, ডালিম ব্যস্ত। নিশ্চয়ই কোনো কাজে আছে।

কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর তাঁর মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে এল।

তিনি জানেন, একজন মানুষের সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা সম্ভব নয়। তিনি এটাও জানেন, কোনো সম্পর্কের মধ্যেই সব সময় একই রকম মনোযোগ পাওয়া যায় না।

তবু তাঁর কষ্ট হচ্ছিল।

কারণ, তিনি ডালিমের কাছে শুধু নিজের কবিতার মূল্যায়ন চাননি। চেয়েছিলেন, কবিতাটি পড়ার পর মানুষটি একটু বলুক—

“ডালিয়া, আজ আপনার কবিতাটা পড়ে মনে হলো, আপনি যেন নিজের মনের কথাই লিখেছেন।”

অথবা—

“কবিতাটা সুন্দর হয়েছে। তবে আজ আপনার মন খারাপ কেন?”

কখনো কখনো ভালোবাসার চাওয়া এতটুকুই।

একটি প্রশ্ন।

একটু মনোযোগ।

নিজের অনুভূতির অস্তিত্বটুকু অন্য একজনের কাছে স্বীকার করার সুযোগ।

রাত বাড়তে লাগল।

অবশেষে ডালিয়া ফেসবুকে ঢুকলেন। অনেকক্ষণ ভাবার পর লিখলেন সেই কথাগুলো—

“আগে থেকে একটা টেক্সট, আমি তোমাকে কখনও দিইনি, আর দেবও না। তবুও বলি, তোমাকে ভালোবাসার নেশা আমার এ জনমে শেষ হবে না…”

এটি ছিল তাঁর অভিমান।

একই সঙ্গে নিজের কাছে নিজের অনুভূতির স্বীকারোক্তি।

তিনি জানতেন না, ডালিম পোস্টটি দেখবে কি না। দেখলেও বুঝবে কি না, কথাগুলোর আড়ালে কতটা অপেক্ষা জমে আছে।

কিন্তু ডালিম দেখল।

আর সেই পোস্টের সামনে দাঁড়িয়েই সে প্রথমবার নিজের অনুভূতির গভীরতা উপলব্ধি করল।

 

৭. 

ডালিম যখন মেসেঞ্জারে লিখল, তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা।

—কবিতার মানুষটি কি খুব অভিমানী?

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—মানুষটি অভিমানী নয়। শুধু যার কাছে একটু কথা আশা করে, তার নীরবতা সহ্য করতে পারে না।

ডালিম এবার আর দেরি করল না।

—আজ আপনার কবিতাটা পড়তে পারিনি। কলেজে খুব ব্যস্ত ছিলাম। তারপর বাসায় ফিরেও কাজে আটকে গিয়েছিলাম। কিন্তু সত্যি বলছি, আপনাকে অবহেলা করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না।

ডালিয়া লিখলেন—

—আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে না, ডালিম। আপনার নিজের জীবন আছে। কাজ আছে। ব্যস্ততা আছে। আমি সেসব বুঝি।

—তাহলে অভিমান?

—অভিমান তো সব সময় যুক্তি মেনে হয় না।

ডালিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর লিখল—

—একটা কথা বলি, ডালিয়া?

—বলুন।

—আপনি যখন আমার সঙ্গে কথা বলেন, আমি সত্যিই ভালো থাকি। আপনার মেসেজের জন্য অপেক্ষা করি। আপনার লেখা পড়তে ভালো লাগে। আপনি কোনো কথা বললে সারাদিন সেটা নিয়ে ভাবি। কিন্তু আমি সব সময় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি না। কখনো কখনো চুপ করে থাকি। হয়তো সেটা আমার ভুল।

ডালিয়া মেসেজটি পড়ে স্থির হয়ে গেলেন।

তিনি কি ঠিক পড়ছেন?

ডালিম, যে এত দিন কথার আড়ালে অনুভূতি লুকিয়ে রাখত, আজ নিজেই নিজের মনের দরজা খুলে দিচ্ছে?

তিনি লিখলেন—

—আপনি জানেন, আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট কোথায়?

—কোথায়?

—আপনার ব্যস্ততায় নয়। আপনার নীরবতার কারণ না জানায়। আপনি যদি বলেন, আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, তাহলেও আমার কষ্ট হবে না। কিন্তু আপনি চুপ করে থাকলে মনে হয়, আমি হয়তো আপনার জীবনে যতটা জায়গা ভেবেছি, ততটা জায়গা আমার নেই।

ডালিমের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এল।

সে লিখল—

—আপনার জায়গাটা কতটুকু, সেটা হয়তো আমি এখনো ঠিক করে বলতে পারিনি। কিন্তু আপনি যে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

ডালিয়া উত্তর দিলেন না।

ডালিম আবার লিখল—

—আজ একটা কথা স্বীকার করি?

—কী কথা?

—আমি আপনার সঙ্গে কথা বলার অজুহাত খুঁজি। কখনো কবিতা, কখনো গল্প, কখনো এমন কোনো প্রশ্ন, যার উত্তর আমার জানা আছে। শুধু আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব বলে।

ডালিয়ার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

তবু তিনি লিখলেন—

—আপনি তাহলে এত দিন আমাকে সাহিত্য শেখানোর নাম করে বিরক্ত করেছেন?

ডালিম লিখল—

—সাহিত্য শেখানো তো উপলক্ষ। আসল উদ্দেশ্যটা বলতে একটু দেরি হয়ে গেল।

—আর সেই উদ্দেশ্যটা কী?

ডালিম এবার অনেকক্ষণ ধরে লিখল। মুছল। আবার লিখল।

শেষ পর্যন্ত পাঠাল—

—আপনার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে, ডালিয়া। শুধু ভালো লাগে বললে কম বলা হয়। আপনার মেসেজ এলে আমার দিনটা অন্য রকম হয়ে যায়। আপনার মন খারাপ থাকলে আমারও অস্বস্তি হয়। আপনি হাসলে মনে হয়, কথাগুলো আরও একটু দীর্ঘ হোক। আর আপনি চুপ করে থাকলে বারবার ফোন দেখতে ইচ্ছে করে।

তারপর আরও একটি মেসেজ পাঠাল।

—আমি জানি না, এটাকে আপনি কী বলবেন। তবে আমার কাছে এই অনুভূতিটা আর সাধারণ পরিচয়ের মধ্যে নেই।

ডালিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরলেন।

জানালার বাইরে তখন রাত। দূরে কোথাও শিয়াল ডাকছে। ঘরের মধ্যে নীরবতা, আর সেই নীরবতার ভেতরে একজন নারীর বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে বহুদিনের চাপা আনন্দ।

তিনি উত্তর দিলেন—

—সব অনুভূতির নাম দিতে হয় না, ডালিম। কিছু অনুভূতি যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

ডালিম লিখল—

—তাহলে আমাদের অনুভূতিটাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখব?

ডালিয়া লিখলেন—

—রাখবেন তো?

—চেষ্টা করব।

—চেষ্টা নয়, কথা দিন।

ডালিম লিখল—

—কথা দিলাম, আপনার অভিমানকে অবহেলা করব না। আর কোনো দিন ব্যস্ততায় হারিয়ে গেলে অন্তত জানিয়ে যাব।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—আমিও কথা দিচ্ছি, আপনার নীরবতার প্রতিটি মুহূর্তকে অভিযোগ দিয়ে ভরিয়ে তুলব না। শুধু কখনো কখনো মনে করিয়ে দেব, আপনার জন্য কেউ একজন অপেক্ষা করে।

ডালিম লিখল—

—সেই অপেক্ষার মানুষটিকে আমি হারাতে চাই না।

ডালিয়া আর কিছু লিখলেন না।

শুধু একটি লাল হৃদয়ের ইমোজি পাঠালেন।

সেই রাতের কথোপকথন তাদের সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না। কেউ কাউকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়নি। কেউ ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রুতির পাহাড় গড়ে তোলেনি।

তবু দুজনেই বুঝতে পেরেছিল, তাদের সম্পর্কের ভেতরে এমন একটি অনুভূতি জন্ম নিয়েছে, যাকে আর কেবল বন্ধুত্ব বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।

সেদিন রাতেই ডালিম ডালিয়ার পাঠানো কবিতাটি পড়ল।

কবিতার শেষে সে লিখল—

—আজ আপনার কবিতার সবচেয়ে সুন্দর লাইনটি জানেন কোনটি?

—কোনটি?

—যেখানে আপনি লিখেছেন, ‘তুমি যদি জানতেই না, তবে এত কাছে এলে কেন?’

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—কেন সুন্দর?

ডালিম লিখল—

—কারণ, এই প্রশ্নটা আজ আমার নিজের কাছেও আছে।

 

৮. 

এরপর দিনগুলো যেন অন্য রকম হয়ে উঠল।

তাদের সকাল শুরু হতো শুভেচ্ছা দিয়ে, দুপুরে চলত ব্যস্ততার ফাঁকে ছোট ছোট কথোপকথন, আর সন্ধ্যা নামলে খুলে যেত অনুভূতির দীর্ঘ জানালা।

কখনো ডালিয়া ফোন করে বলতেন—

—আজ আপনার কণ্ঠ শুনতে ইচ্ছে করছে।

ডালিম মৃদু হেসে বলত—

—কবিতার কোনো লাইন শোনাব?

—না। আজ কবিতা নয়। আজ মানুষটাকে শুনব।

ডালিম তখন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকত। তারপর খুব সাধারণ কোনো কথা বলত—দিন কেমন গেল, দুপুরে খাওয়া হয়েছে কি না, কলেজে কোনো মজার ঘটনা ঘটেছে কি না।

ডালিয়া সেই সাধারণ কথাগুলোই মন দিয়ে শুনতেন।

কারণ, ভালোবাসার মানুষ সব সময় অসাধারণ কিছু বলে না। কখনো কখনো তার সবচেয়ে সাধারণ কথাটিও অসাধারণ হয়ে ওঠে।

একদিন বিকেলে বৃষ্টি নামল।

ডালিম বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ ডালিয়ার কথা মনে পড়ল। তিনি বলেছিলেন, বৃষ্টির দিনে তাঁর মন অকারণে বিষণ্ন হয়ে যায়।

ডালিম ফোন করল।

—কী করছেন?

—জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছি।

—মন খারাপ?

—একটু।

—কেন?

—জানি না। কিছু কিছু বৃষ্টি আছে, যা পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

ডালিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল—

—আমি যদি এখন আপনার পাশে থাকতাম, কী করতেন?

ডালিয়া একটু হেসে বললেন—

—প্রথমে এক কাপ চা বানিয়ে দিতাম।

—তারপর?

—তারপর আপনাকে বলতাম, এত কথা বলেন, এবার একটু চুপ করে বৃষ্টি দেখুন।

ডালিম হেসে উঠল।

—আর আপনি?

—আমি আপনার পাশে বসে থাকতাম।

—কোনো কথা না বলে?

—সব সময় কি কথা বলতে হয়, ডালিম? কখনো কখনো প্রিয় মানুষের পাশে নীরবে বসে থাকাটাও তো এক ধরনের কথা।

ডালিমের মনে হলো, এই কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন এক সুখ, যা কোনো কবিতার বইয়ে পুরোপুরি লেখা সম্ভব নয়।

সে ধীরে বলল—

—আপনি পাশে থাকলে হয়তো বৃষ্টিটা আরও সুন্দর হতো।

ডালিয়া বললেন—

—হয়তো।

তারপর দুজনেই চুপ করে রইল।

ফোনের দুই প্রান্তে দুটি আলাদা ঘর। মাঝখানে কয়েক মাইল কিংবা কয়েক শ মাইল দূরত্ব। অথচ সেই নীরবতার মধ্যে মনে হচ্ছিল, তারা একই বারান্দায় বসে আছে।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।

এক কাপ চা থেকে ধোঁয়া উঠছে।

ডালিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন, আর ডালিম তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার কল্পনা করছে।

কোনো স্পর্শ নেই।

কোনো পাশাপাশি বসা নেই।

তবু অনুভূতির পৃথিবীতে তারা একে অপরের খুব কাছে।

সেদিন রাতে ডালিম একটি কবিতা লিখল।

নাম দিল—‘দূরত্বের ওপারে তুমি’।

তুমি নেই, তবু তোমার জন্য জানালাটা খোলা রাখি, বৃষ্টি এলে তোমার কথা ভেজা বাতাসে খুঁজে থাকি।

তুমি নেই, তবু সন্ধ্যা হলে ফোনের পর্দায় চোখটি রাখি, একটি ছোট্ট মেসেজ এলে অকারণেই হাসতে থাকি।

কী নাম দেব এই অনুভবে, বন্ধুত্ব না ভালোবাসা? তোমার কথায় দিন কাটে যে, তোমার নীরবতায় সর্বনাশা!

কবিতাটি ডালিয়াকে পাঠিয়ে সে লিখল—

—কেমন হয়েছে?

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—কবিতা ভালো হয়েছে। তবে শেষের লাইনটা বদলান।

—কেন?

—ভালোবাসা কখনো সর্বনাশ নয়, ডালিম। ভালোবাসার নামে অবহেলা, অনিশ্চয়তা কিংবা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি মানুষকে কষ্ট দেয়। ভালোবাসা নিজে তো আশ্রয় হওয়ার কথা।

ডালিম দীর্ঘক্ষণ কথাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর লিখল—

—আপনি ঠিক বলেছেন। শেষের লাইনটা হবে—

তোমার নীরবতায়ও যেন তোমার ফেরার আশ্বাস পাই।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—এবার হয়েছে।

তারপর লিখলেন—

—একটা কথা বলব?

—বলুন।

—আপনি যদি কখনো সত্যিই আমার পাশে থাকেন, আমি চাইব আপনি শুধু আমার ভালো লাগার মানুষ হয়ে থাকবেন না। আমার ভালো থাকার মানুষও হবেন।

ডালিমের চোখে তখন বৃষ্টির জল নয়, অন্য এক কোমলতা জমে উঠেছিল।

সে লিখল—

—আর আমি চাইব, আপনার পাশে থাকলে যেন আমাকে কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে না হয়। আমি যেমন, তেমনভাবেই থাকতে পারি।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—তাহলে আমাদের দুজনের চাওয়াটা একই।

সেদিন তারা বুঝেছিল, ভালোবাসা মানে কেবল রোমাঞ্চ নয়। ভালোবাসা মানে এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে দুজন মানুষ নিজেদের দুর্বলতা লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয় না।

যেখানে কেউ কারও কাছে নিখুঁত হওয়ার অভিনয় করে না।

যেখানে ভালোবাসা মানে একে অপরকে বদলে দেওয়া নয়, বরং পরস্পরের সত্যিকারের মানুষটিকে চিনে নেওয়া।

 

৯. 

ডালিমের কাছে ডালিয়া ছিলেন এক মায়াবী নারী—যাঁর কথায় কবিতা ছিল, অভিমানে কোমলতা ছিল, আর ভালোবাসায় এক ধরনের পরিণত সংযম।

কিন্তু ডালিয়ারও তো একটি নিজস্ব জীবন ছিল।

সেখানে ছিল বহু বছরের অভিজ্ঞতা, কিছু পুরোনো স্মৃতি, কিছু অপূর্ণতা, কিছু না-বলা দীর্ঘশ্বাস। বয়সে বড় হওয়ার কারণে তিনি জীবনের অনেক কিছু দেখেছেন। জানতেন, আবেগের উচ্ছ্বাস আর সম্পর্কের স্থায়িত্ব এক জিনিস নয়।

তাই ডালিমের প্রতি আকর্ষণ যতই বাড়ছিল, ততই তিনি নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন—

এই অনুভূতি কি সত্যিই স্থায়ী হতে পারে?

ডালিম কি তাঁর জীবনের বাস্তবতাকে বুঝবে?

নাকি একসময় এই রোমাঞ্চের মায়া কেটে গেলে সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে?

এক রাতে ডালিয়া ডালিমকে লিখলেন—

—আপনার একটা বিষয় আমার ভালো লাগে।

—কোনটা?

—আপনি আমার বয়স নিয়ে কখনো অস্বস্তি প্রকাশ করেননি।

ডালিম লিখল—

—অস্বস্তি প্রকাশ করার মতো কিছু দেখিনি তো।

—সবাই আপনার মতো ভাবে না।

—সবাইকে তো আর ভালোবাসতে চাই না।

মেসেজটি পাঠিয়ে ডালিম নিজেই থমকে গেল।

সে কি কথাটা বলে ফেলল?

ওপাশে ডালিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর লিখলেন—

—আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন, ডালিম?

ডালিমের আঙুল স্থির হয়ে গেল।

এত দিন তারা ভালো লাগার কথা বলেছে, অপেক্ষার কথা বলেছে, অনুভূতির কথা বলেছে। কিন্তু ভালোবাসার মতো একটি সরল অথচ গভীর শব্দকে এড়িয়ে গেছে দুজনেই।

আজ ডালিয়া সরাসরি প্রশ্নটি করেছেন।

ডালিম জানালার বাইরে তাকাল।

রাতের আকাশে চাঁদ নেই। দূরের একটি বাড়ির আলো জ্বলছে। নিজের হৃদয়ের কাছে সে আর কোনো অজুহাত খুঁজে পেল না।

সে লিখল—

—আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলছি, ডালিয়া। ঠিক কখন থেকে, তা জানি না। হয়তো আপনার কবিতার ভেতর দিয়ে, হয়তো আপনার কথার ভেতর দিয়ে, হয়তো সেই দিন থেকে, যেদিন আপনার একটা মেসেজের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বুঝেছিলাম, অপেক্ষাটাই আমার ভালো লাগছে।

তারপর লিখল—

—তবে আমি চাই না, শুধু আবেগের বশে এমন কোনো কথা বলি, যার দায়িত্ব ভবিষ্যতে নিতে পারব না। আমি চাই, আপনি আমার অনুভূতিটাকে জানুন। আর আমিও আপনাকে আরও ভালো করে জানি।

ডালিয়া মেসেজটি পড়তে পড়তে চোখ বন্ধ করলেন।

কী আশ্চর্য!

একটি স্বীকারোক্তি কখনো কখনো কতখানি স্বস্তি দিতে পারে!

তিনি লিখলেন—

—আমিও আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি, ডালিম। হয়তো প্রথমে আপনার লেখার প্রতি মুগ্ধতা ছিল, তারপর কথার প্রতি ভালো লাগা। একসময় দেখলাম, আপনার সঙ্গে কথা না হলে দিনটা কেমন অসম্পূর্ণ লাগে। আপনার ভালো থাকা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিছুক্ষণ পর আরও লিখলেন—

—আমি জানি না, ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে। তবে আজকের অনুভূতিটা সত্যি। আমি সেটাকে অস্বীকার করতে চাই না।

ডালিমের মনে হলো, বুকের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের কোনো অস্থিরতা হঠাৎ থেমে গেছে।

সে লিখল—

—তাহলে আজ থেকে আমরা অন্তত নিজেদের কাছে মিথ্যে বলব না।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—হ্যাঁ। তবে একটা কথা মনে রাখবেন।

—কী?

—আমাকে শুধু আপনার ভালো লাগার মুহূর্তগুলোতে মনে রাখবেন না। আমার মন খারাপের দিনগুলোতেও পাশে থাকার চেষ্টা করবেন। আমি সব সময় সুন্দর কবিতা লিখতে পারব না, সব সময় হাসতে পারব না। কোনো দিন হয়তো অকারণেই মন খারাপ হবে, কোনো দিন হয়তো চুপ করে থাকব। তখনও আমাকে বুঝতে চেষ্টা করবেন।

ডালিম লিখল—

—আর আপনি?

—আমি আপনার নীরবতাকে বোঝার চেষ্টা করব। তবে প্রয়োজন হলে প্রশ্নও করব। কারণ, ভালোবাসার নামে কাউকে অনুমান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যেতে চাই না।

ডালিম উত্তর দিল—

—ঠিক আছে। আমাদের ভালোবাসায় কবিতা থাকবে, রোমাঞ্চ থাকবে, অভিমানও থাকবে। তবে তার সঙ্গে সত্যি কথা বলার সাহসটাও থাকবে।

ডালিয়া লিখলেন—

—এটাই চাই।

সেই রাতে তাদের সম্পর্ক একটি নতুন নাম পেল।

কিন্তু নাম পাওয়ার পরও তার সৌন্দর্য কমে গেল না।

বরং তারা বুঝতে পারল, ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হয়তো কাউকে পাওয়া নয়—কাউকে সত্যিকার অর্থে নিজের অনুভূতির কথা বলতে পারা।

 

১০. 

কয়েক দিন পর ডালিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করলেন—

—আচ্ছা, আমরা যদি কোনো দিন সামনাসামনি দেখা করি, কেমন হবে?

ডালিম লিখল—

—কেন? আপনার কি মনে হয়, আমি বাস্তবে এতটা কথা বলতে পারব না?

—তা নয়। তবে অনলাইনে আপনি অনেক সাহসী। সামনাসামনি দেখা হলে যদি একেবারে চুপ হয়ে যান?

ডালিম উত্তর দিল—

—তাহলে আপনি কথা বলবেন।

—আর আমি যদি লজ্জা পাই?

—তাহলে আমরা দুজনেই চুপ করে থাকব।

ডালিয়া হেসে লিখলেন—

—এভাবে তো দেখা করাই হবে না!

—হবে। তবে জায়গাটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।

—কোথায় দেখা করতে চান?

ডালিম কিছুক্ষণ ভেবে লিখল—

—এমন কোনো জায়গায়, যেখানে খুব বেশি শব্দ নেই। পাশে বইয়ের দোকান থাকতে পারে, একটু সবুজ থাকতে পারে, আর কাছাকাছি চায়ের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয়।

ডালিয়া লিখলেন—

—আপনি তো দেখছি একটা উপন্যাসের দৃশ্য সাজিয়ে ফেলেছেন!

—আপনি যে আমার জীবনের গল্পে এসে পড়েছেন, দৃশ্যটা একটু সুন্দর তো হতেই হবে।

ডালিয়া মেসেজটি পড়ে মৃদু হেসে ফেললেন।

তারপর লিখলেন—

—ঠিক আছে। কোনো এক বিকেলে দেখা হবে। তবে একটা শর্ত আছে।

—কী শর্ত?

—সেদিন কোনো সাহিত্যিক আলোচনা নয়।

—তাহলে কী নিয়ে কথা বলব?

—আমাদের নিয়ে।

ডালিমের বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত আলোড়ন।

সে লিখল—

—আমাদের গল্পটা তো এখনো শুরুই হলো না।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—গল্প শুরু হয়ে গেছে, ডালিম। আপনি শুধু প্রথম অধ্যায়ের নাম দিতে পারেননি।

ডালিম লিখল—

—তাহলে নাম দিন আপনি।

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

—‘শিউলি-ঝরা প্রেম’।

ডালিম অবাক হলো।

—এই নাম কেন?

ডালিয়া লিখলেন—

—কারণ, আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল শরতের এক কবিতা থেকে। আর এখন আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার প্রতিটি সকাল শিউলির গন্ধে ভরে ওঠে।

ডালিমের মনে হলো, এর চেয়ে সুন্দর নাম আর হতে পারে না।

সে লিখল—

—তাহলে গল্পটা আমরা দুজন মিলে লিখব। আপনি অনুভূতি লিখবেন, আমি শব্দ সাজাব।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—না, ডালিম। অনুভূতি দুজনের, শব্দও দুজনের। এই গল্পে কেউ লেখক নয়, কেউ পাঠক নয়। আমরা দুজনেই গল্পের চরিত্র।

ডালিম ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে হাসল।

তার মনে হলো, কিছু মানুষ জীবনে আসে কোনো ঘোষণা দিয়ে নয়। তারা আসে একটি কবিতা হয়ে, একটি প্রশ্ন হয়ে, একটি ছোট্ট মেসেজ হয়ে।

তারপর একসময় দেখা যায়, তাদের ছাড়া নিজের জীবনের বাক্যগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

ডালিয়া তাঁর জীবনে ঠিক তেমন করেই এসেছেন।

কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না।

কোনো প্রতিশ্রুতির আয়োজন ছিল না।

ছিল শুধু সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে বলতে একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের মুগ্ধ হয়ে ওঠা।

আর সেই মুগ্ধতা কখন যে ভালোবাসার নাম নিয়েছে, তা কেউ বুঝতেই পারেনি।

 

১১. 

সেই রাতেই ডালিম একটি চিঠি লিখতে বসল।

চিঠিটি ডালিয়াকে পাঠানোর জন্য নয়। অন্তত তখনই নয়।

সে নিজের ডায়েরির পাতায় লিখল—

প্রিয় ডালিয়া,

তোমাকে কী নামে ডাকব, তা আজও ঠিক করে উঠতে পারিনি। কখনো তুমি আমার কবিতার পাঠক, কখনো আমার সবচেয়ে প্রিয় কথোপকথনের মানুষ, কখনো একরাশ অভিমান নিয়ে বসে থাকা একটি বিকেল। আবার কখনো মনে হয়, তুমি আমার জীবনের সেই জানালা, যেটা খুলে দিলে বাইরে থেকে আলো আসে।

জানো, আমি আগে ভাবতাম, ভালোবাসা মানে কাউকে খুব বেশি করে মনে পড়া। এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে কাউকে মনে পড়লে তার ভালো থাকাটাও কামনা করা। তার অভিমানকে ছোট করে না দেখা। তার নীরবতার পেছনে লুকিয়ে থাকা কষ্টটুকু বোঝার চেষ্টা করা।

তোমার বয়স আমার চেয়ে বেশি—এই কথাটা প্রথম যেদিন শুনেছিলাম, সেদিনের কথা মনে আছে। কিন্তু আজ যখন তোমার কথা ভাবি, তখন কোনো সংখ্যার কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে তোমার লেখা কবিতার কথা, তোমার মিষ্টি অভিমানের কথা, তোমার সেই প্রশ্নটির কথা—‘আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?’

আমি জানি না, ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী লিখে রেখেছে। জীবন তো কোনো উপন্যাস নয়, যেখানে লেখক ইচ্ছে করলেই সব চরিত্রকে সুখী করে দিতে পারেন। এখানে বাস্তবতা আছে, দায়িত্ব আছে, এমন কিছু প্রশ্ন আছে, যাদের উত্তর শুধু আবেগ দিয়ে দেওয়া যায় না।

তবু আমি চাই, আমাদের অনুভূতিটা সত্যি থাকুক। আমরা যদি পাশাপাশি হাঁটতে পারি, তবে হাত ধরে হাঁটব। আর যদি কোনো দিন দূরত্ব আমাদের পথ আলাদা করে দেয়, তবুও যেন বলতে পারি—আমরা অন্তত একে অপরের অনুভূতিকে অসম্মান করিনি।

তোমাকে আমি শুধু সুন্দর কোনো বিকেলের জন্য চাই না। চাই, তোমার ক্লান্ত দিনগুলোর কথাও শুনতে। তোমার লেখা ভালো কবিতার প্রশংসা করতে চাই, আবার কবিতা ভালো না হলে সত্যিটাও বলতে চাই। তোমার সঙ্গে হাসতে চাই, তর্ক করতে চাই, অভিমান ভাঙাতে চাই।

সবচেয়ে বেশি চাই, তোমার সামনে নিজের মতো করে থাকতে। কোনো অভিনয় ছাড়া, কোনো অহংকার ছাড়া।

তুমি আমার জীবনে এসে আমাকে নতুন করে বুঝিয়েছ, মানুষের বয়স বাড়ে, অভিজ্ঞতা বাড়ে, দায়িত্ব বাড়ে; কিন্তু হৃদয়ের কোমল জায়গাটুকু বেঁচে থাকলে মানুষ আবার নতুন করে ভালোবাসতে পারে।

আর একটা কথা—তুমি যখন বলেছিলে, ‘আপনার নীরবতায় সময় দীর্ঘ মনে হয়’, তখন আমি বুঝতে পারিনি কথাটার গভীরতা। এখন বুঝি, যার অপেক্ষায় কেউ থাকে, তার কাছে নীরবতাও একটি দায়িত্ব।

আমি হয়তো সব সময় নিখুঁত হতে পারব না। কিন্তু চেষ্টা করব, তোমার কাছে এমন একজন মানুষ হয়ে উঠতে, যার কাছে নিজের মনের কথা বলতে তোমাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না।

ভালো থেকো, ডালিয়া। আর যদি কখনো খুব অভিমান হয়, তবে আমাকে জানিও। তোমার অভিমানকে কবিতা ভেবে শুধু পড়ে যেতে চাই না; তার কারণটাও বুঝতে চাই।

ইতি, তোমার গল্পের একজন মানুষ, ডালিম।

চিঠিটি লেখা শেষ করে ডালিম অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তারপর ডায়েরি বন্ধ করে দিল।

চিঠিটি পাঠাল না।

কিছু কথা হয়তো আগে নিজের কাছে সত্যি হয়ে উঠতে হয়, তারপর অন্য কাউকে বলা যায়।

সে শুধু মেসেঞ্জারে গিয়ে লিখল—

—ঘুমিয়েছেন?

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—না। আপনার কথা ভাবছিলাম।

ডালিমের ঠোঁটে হাসি ফুটল।

—কী ভাবছিলেন?

—ভাবছিলাম, আমাদের গল্পটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

ডালিম লিখল—

—এত তাড়াতাড়ি শেষের কথা ভাবছেন কেন? আমরা তো এখনো কত কথা বলব, কত কবিতা লিখব, কত অভিমান ভাঙাব!

ডালিয়া লিখলেন—

—সব গল্পের শেষ সুখের হয় না, ডালিম।

ডালিম কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল—

—সেটা ঠিক। তবে শেষের ভয় পেয়ে গল্পের সুন্দর অংশটুকু না পড়াও তো ঠিক নয়।

ডালিয়া লিখলেন—

—আপনি আবার সাহিত্য শুরু করলেন!

ডালিম উত্তর দিল—

—আপনি পাশে থাকলে সাহিত্য থেকে পালাব কী করে?

ডালিয়া একটি হাসির ইমোজি পাঠালেন।

তারপর লিখলেন—

—আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো। আমাকে প্রথম কবে ভালো লেগেছিল?

ডালিম লিখল—

—আপনার কবিতা পড়ার দিন?

—সত্যি?

—না। প্রথমে আপনার কবিতা ভালো লেগেছিল। তারপর আপনার কথা। তারপর আপনার অভিমান। আর একদিন বুঝলাম, আপনার মন ভালো আছে কি না, সেটা জানার জন্যও আমার মন অস্থির হয়ে থাকে। সেদিনই হয়তো আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

—আর আমার?

—আপনার কবে?

ডালিয়া লিখলেন—

—যেদিন বুঝলাম, আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার আর কোনো কবিতার অজুহাত লাগে না।

ডালিম মেসেজটি পড়ে স্থির হয়ে রইল।

কথাটি এত সহজ, অথচ এত গভীর!

ভালোবাসা কি আসলে এমনই নয়?

যখন একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য আর কোনো অজুহাতের প্রয়োজন হয় না, যখন তার নীরবতাও নিজের ভেতরে প্রশ্ন জাগায়, যখন তার আনন্দে নিজের দিন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে—তখনই হয়তো হৃদয় নিজের অজান্তে কাউকে আপন করে নেয়।

সেদিন রাতেও তাদের কথোপকথন শেষ হলো না সহজে।

একটি বিষয় থেকে আরেকটি বিষয়, একটি স্মৃতি থেকে আরেকটি স্বপ্ন, একটি অভিমান থেকে আরেকটি মিষ্টি হাসি।

রাত গভীর হলো।

দুজনের চোখেই ঘুম নেমে এল।

কিন্তু ঘুমানোর আগে ডালিয়া একটি শেষ মেসেজ পাঠালেন—

“শুভরাত্রি, ডালিম। স্বপ্নে দেখা হলে কিন্তু কবিতা নিয়ে কথা বলা যাবে না।”

ডালিম লিখল—

“কেন?”

ডালিয়া উত্তর দিলেন—

“কারণ, স্বপ্নে আমি আপনার কবিতা হতে চাই না। আপনার পাশে বসে থাকা মানুষটি হতে চাই।”

ডালিম মেসেজটি পড়ে ফোনটা বুকে চেপে ধরল।

তারপর লিখল—

“তাহলে স্বপ্নে দেখা হলে আপনাকে পাশে বসিয়ে রাখব। আর যদি ঘুম ভেঙে যায়, তবে সকালে একটা মেসেজ দেব। যাতে বুঝতে পারেন, স্বপ্ন শেষ হলেও আপনাকে ভুলে যাইনি।”

ডালিয়া আর কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু একটি লাল হৃদয়ের চিহ্ন পাঠালেন।

সেই ছোট্ট চিহ্নটির দিকে তাকিয়ে ডালিমের মনে হলো, জীবনে কিছু কিছু প্রাপ্তি এত ছোট হয় যে, হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায় না; অথচ এত গভীর হয় যে, সমস্ত হৃদয় জুড়ে থাকে।

বাইরে তখন রাতের শেষ প্রহর।

হয়তো কোথাও কোনো শিউলি গাছের নিচে ফুল ঝরে পড়ছে নিঃশব্দে।

হয়তো ভোরের আলো আসতে এখনো অনেক দেরি।

কিন্তু ডালিম জানে, আগামীকাল সকালে তার ফোনের পর্দায় আবার একটি মেসেজ ভেসে উঠতে পারে।

হয়তো ডালিয়া লিখবেন—

“ঘুম ভেঙেছে, কবি সাহেব?”

আর ডালিম উত্তর দেবে—

“ঘুম ভেঙেছে। তবে আমার সকালটা এখনো আপনার মেসেজের অপেক্ষায়।”

এভাবেই চলতে থাকবে তাদের গল্প।

কবিতার ভেতর দিয়ে, কথার ভেতর দিয়ে, অভিমানের ভেতর দিয়ে, স্বপ্নের ভেতর দিয়ে।

কেউ জানে না, তাদের গল্পের শেষ কোথায়।

তারা নিজেরাও জানে না।

শুধু জানে, কোনো এক শরতের সন্ধ্যায় একটি কবিতা তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তারপর একটি শিউলি-ঝরা সকালে ভালো লাগা এসে দাঁড়িয়েছিল দরজায়। আর এক অভিমানী রাত তাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, কিছু অনুভূতি এত দিন নামহীন থাকলেও একসময় হৃদয়ের কাছে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে দেয়।

ডালিম আর ডালিয়ার গল্পে ভালোবাসা এসেছিল কোনো বড় ঘোষণা দিয়ে নয়; এসেছিল একটি মেসেজের অপেক্ষায়, একটি নীরবতার কষ্টে, আর একটি ছোট্ট প্রশ্নের উত্তরে।

“আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?”

সেই প্রশ্নের উত্তরেই শুরু হয়েছিল তাদের নতুন অধ্যায়।

আর ডালিমের মনে হয়েছিল, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটি হয়তো সে এত দিন কাগজে লিখে এসেছে। অথচ সেই কবিতার সবচেয়ে মায়াবী পঙ্‌ক্তিটি লেখা ছিল একজন মানুষের হৃদয়ে।

সেই মানুষটির নাম—ডালিয়া।

আর তাদের ভালোবাসার নাম—

শিউলি-ঝরা প্রেম। 

 


 শিউলি-ঝরা প্রেম -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

সংস্কৃতি-কথাঃ মুক্তবুদ্ধি, সৌন্দর্য ও মানবিক জীবনের অন্বেষণ

বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে মোতাহার হোসেন চৌধুরীর ‘সংস্কৃতি-কথা’ একটি অনন্য ও মননশীল সংযোজন। এটি নিছক সংস্কৃতি-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন নয়; বরং মানুষের জীবন, চিন্তা, সৌন্দর্যবোধ, ধর্ম, নৈতিকতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ঘিরে এক মুক্তবুদ্ধির দার্শনিক অনুসন্ধান। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের আবহে রচিত এই গ্রন্থ বাঙালির চিন্তার জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তার আবেদন আজও অম্লান। প্রাবন্ধিক অন্নদাশঙ্কর রায় গ্রন্থটিকে বাংলা ভাষার একটি ‘বাতিঘর’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন—যে অভিধা গ্রন্থটির মননশীল তাৎপর্যকে যথার্থভাবেই নির্দেশ করে।


সংস্কৃতি কী?

‘সংস্কৃতি-কথা’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান সম্ভবত—সংস্কৃতি আসলে কী? মোতাহার হোসেন চৌধুরীর কাছে সংস্কৃতি কোনো বাহ্যিক আচার, পোশাক-পরিচ্ছদ কিংবা কেবল বিদ্যাশিক্ষার নাম নয়। তাঁর ভাষায়, “সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা।” অর্থাৎ সংস্কৃতি মানুষের জীবনকে কেবল নিয়ন্ত্রিত করে না, তাকে পূর্ণতা দেয়; জীবনকে করে তোলে অর্থবহ, সুন্দর ও আনন্দময়।


এই ভাবনাটিই তিনি আরও গভীরভাবে প্রকাশ করেছেন তাঁর বহুল উদ্ধৃত উক্তিতে—

“এ জীবনে যা না হলে আমরা বাঁচি না, তা–ই আমাদের সভ্যতা, আর যার জন্য বাঁচি তাই সংস্কৃতি।”


সভ্যতা যেখানে মানুষের জীবনধারণের প্রয়োজন মেটায়, সংস্কৃতি সেখানে জীবনের অর্থ ও সৌন্দর্য অনুসন্ধান করে। ফলে সংস্কৃতি মানুষের বেঁচে থাকার উপকরণ নয়, বরং বেঁচে থাকার গভীরতর তাৎপর্য।


ধর্ম ও সংস্কৃতি: দুটি পথ, এক মানবিক অনুসন্ধান:

গ্রন্থটির অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো ধর্ম ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ। তিনি ধর্ম ও সংস্কৃতিকে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিশীলিত করার দুটি ভিন্ন পথ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য—

“ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার এবং কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম।”


এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ধর্মের সামাজিক ভূমিকা এবং সংস্কৃতির ব্যক্তিমানসিক ভূমিকার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। ধর্ম সাধারণ মানুষের জীবনকে বাহ্যিক বিধি-নিষেধ, বিশ্বাস ও পরকালচেতনার মাধ্যমে পরিচালিত করে; অন্যদিকে সংস্কৃতি মানুষের ভেতরে এমন এক বিবেক ও সৌন্দর্যচেতনা সৃষ্টি করে, যা তাকে বাইরের আদেশের অপেক্ষা না করে নিজের অন্তর্গত বোধ দ্বারা পরিচালিত হতে শেখায়।


সংস্কৃতিবান মানুষের কাছে তাই নৈতিকতা কোনো চাপিয়ে দেওয়া বিধান নয়; তা তার অন্তর্গত চেতনার স্বাভাবিক প্রকাশ। প্রেম, সৌন্দর্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে সে জীবনের অর্থ আবিষ্কার করতে চায়।


আদেশ নয়, অনুপ্রেরণার জীবন:

মোতাহার হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতিবান মানুষ আদেশের অনুগত মানুষ নন; তিনি অনুপ্রেরণায় পরিচালিত মানুষ। তাঁর নৈতিকতা ভয়ভিত্তিক নয়, মানবিক চেতনাভিত্তিক। তিনি অন্যায়কে ভয় করেন না শুধু শাস্তির কারণে; বরং অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করেন নিজের বিবেকের তাড়নায়।


এই মানুষ অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে অন্য মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ খুঁজে নেয়। তার কাছে জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতিযোগিতা নয়—বরং অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক, সৌন্দর্যের অনুভব এবং মানবিক আনন্দের অংশীদার হওয়ার একটি সুযোগ।


লক্ষ্য নয়, উপায়েরও মূল্য আছে:

গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক বক্তব্য হলো—লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে লক্ষ্য অর্জনের উপায়ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ মানুষ যে পথে নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছায়, সেই পথই তার চরিত্র নির্মাণ করে। কোনো মহৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনৈতিক বা নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করলে শেষ পর্যন্ত সেই অর্জন মানুষের নৈতিক সত্তাকে সমৃদ্ধ করতে পারে না।


অর্থাৎ সংস্কৃতি শুধু কী অর্জন করছি—এই প্রশ্ন করে না; একই সঙ্গে প্রশ্ন করে, কীভাবে অর্জন করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিজীবন থেকে সামাজিক জীবন—সব ক্ষেত্রেই গভীর তাৎপর্য বহন করে।


ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মবিকাশ:

মোতাহার হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতিচিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিমানুষের মুক্তি ও আত্মবিকাশ। সমাজ কী বলছে, অন্যেরা কী করছে কিংবা প্রচলিত রীতি কী নির্দেশ করছে—এসবের অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং নিজের প্রতিভা, রুচি ও সৌন্দর্যবোধকে আবিষ্কার করাই তাঁর কাছে সংস্কৃতিমান হওয়ার অন্যতম শর্ত।


তাঁর চিন্তায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কখনো স্বার্থপরতার সমার্থক নয়। বরং নিজের স্বকীয়তাকে বিকশিত করে মানুষকে আরও মানবিক, উদার ও সৌন্দর্যসচেতন করে তোলাই এর লক্ষ্য। তাই ব্যক্তির মুক্তি শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর মানবমুক্তির সঙ্গেই যুক্ত।


মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদের দীপ্তি:

মোতাহার হোসেন চৌধুরী ছিলেন ‘শিখা’ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত—যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের মূল চেতনা ছিল জ্ঞান, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার বিকাশ। সেই মুক্তবুদ্ধির দীপ্তি তাঁর প্রবন্ধে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। অন্ধ অনুকরণ, কুসংস্কার কিংবা প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ না করে তিনি মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন।


তাঁর চিন্তায় উদার মানবতাবাদ, যুক্তিবোধ, সৌন্দর্যপ্রীতি এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। দেশি-বিদেশি নানা মনীষীর চিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তাঁর মননকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ক্লাইভ বেল ও বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো চিন্তকের প্রভাব তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভাবনায় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।


ভাষা ও শিল্পরীতি:

মোতাহার হোসেন চৌধুরীর প্রবন্ধের আরেকটি বড় শক্তি তাঁর ভাষা ও উপস্থাপনভঙ্গি। তাঁর ভাষা একদিকে মার্জিত ও বুদ্ধিদীপ্ত, অন্যদিকে স্বচ্ছ ও সহজবোধ্য। জটিল দার্শনিক প্রশ্নকে তিনি এমন সাবলীল ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন যে তা নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা হয়ে ওঠেনি; বরং পাঠকের ব্যক্তিগত জীবন ও চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।


রচনাশৈলীতে প্রমথ চৌধুরীর মুক্তবুদ্ধি, বৈদগ্ধ্য ও রসবোধের প্রভাবও লক্ষ করা যায়। ফলে তাঁর প্রবন্ধে যুক্তি যেমন আছে, তেমনি আছে সাহিত্যিক সৌন্দর্য; দর্শন যেমন আছে, তেমনি আছে জীবনের উষ্ণতা।


আজকের পাঠকের কাছে ‘সংস্কৃতি-কথা’:

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তি, সামাজিক সম্পর্ক ও জীবনদর্শনের অনেক উপাদান। কিন্তু মানুষ কীভাবে সুন্দরভাবে বাঁচবে, কীভাবে নিজের বিবেক ও সৌন্দর্যবোধকে বিকশিত করবে, কীভাবে মুক্তভাবে চিন্তা করবে এবং কীভাবে মানবিক হয়ে উঠবে—এই প্রশ্নগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক।


এই জায়গাতেই ‘সংস্কৃতি-কথা’র চিরকালীন গুরুত্ব। গ্রন্থটি সংস্কৃতির একটি সংজ্ঞা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পাঠককে নিজের জীবন, বিশ্বাস, নৈতিকতা ও চিন্তাকে নতুন করে পরীক্ষা করতে শেখায়। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে মানুষকে প্রেম, সৌন্দর্য, আনন্দ, যুক্তি ও মানবিকতার আলোকে জীবনকে দেখার আহ্বান জানায়।


সব মিলিয়ে, ‘সংস্কৃতি-কথা’ বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মননশীল গ্রন্থ, যার আবেদন কেবল তার সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে দর্শনের গ্রন্থ, জীবনবোধের গ্রন্থ এবং আত্মজিজ্ঞাসার গ্রন্থ। যে পাঠক বইটি পড়েন, তিনি কেবল ‘সংস্কৃতি’ সম্পর্কে কিছু ধারণা লাভ করেন না—বরং নিজের জীবনযাপন, চিন্তা ও মানবিকতার অর্থ নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। আর এখানেই মোতাহার হোসেন চৌধুরীর প্রবন্ধের স্থায়ী সার্থকতা।


বই: সংস্কৃতি-কথা

লেখক: মোতাহার হোসেন চৌধুরী



পর্যালোচনায়: Md. Helal Uddin



পুতুল নাচের ইতিকথাঃ নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ ও অন্তর্জগতের অনিবার্য পরাজয় -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য একান্তই জীবনঘনিষ্ঠ। তাঁর লেখায় কল্পনার রোমান্টিক আবরণ নয়, বরং জীবনের কাঁচা, রুক্ষ ও নিরাভরণ বাস্তবতাই প্রধান হয়ে ওঠে। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসটি সেই জীবনবাস্তবতারই এক অনন্য দলিল। এখানে মানুষ যেন পুতুল—নিজের ইচ্ছায় নয়, সমাজ, নিয়তি, পারিপার্শ্বিকতা এবং নিজের অন্তর্জগতের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে তারা নাচে। পুতুল যেমন নিজের ইচ্ছায় হাত-পা নাড়তে পারে না, তেমনি এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর জীবনও নিয়ন্ত্রিত হয় বহুমাত্রিক সামাজিক ও মানসিক শক্তির দ্বারা।


উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র শশী। নগরজীবনের সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে সে গ্রামীণ মানুষের সেবা করার আদর্শ নিয়ে নিজের গ্রাম গাওদিয়ায় ফিরে আসে। তার এই প্রত্যাবর্তনের মধ্যে রয়েছে মানবকল্যাণের আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শবাদী আবেগ। কিন্তু শশীর ব্যক্তিত্বের ভেতরে যে দ্বন্দ্ব, সংশয় ও সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করে, তা ক্রমেই তাকে এক ধরনের মানসিক পরাজয়ের দিকে ঠেলে দেয়। হারুর মৃত্যু দিয়ে উপন্যাসের যে আবেগঘন সূচনা, তা নিছক একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, মানুষের অসহায়ত্ব এবং নিয়তির নির্মমতাই প্রথম থেকেই পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়।


শশীর চরিত্র নির্মাণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের অন্তর্জগতে চলমান এক গভীর ও অন্তহীন দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন। শশী ভালোবাসতে চায়, দায়িত্ব নিতে চায়, প্রতিবাদ করতে চায়; কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বারবার থমকে যায়। মতিকে সে ভালোবাসে, অথচ মতির আকাঙ্ক্ষা অন্যদিকে। অন্যদিকে কুসুম তাকে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসার গভীরতা শশী যথাসময়ে উপলব্ধি করতে পারে না। যখন সে কুসুমের অনুভূতির সত্যতা বুঝতে শেখে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে; দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও অবহেলায় কুসুমের হৃদয় ততদিনে ক্লান্ত ও অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়েছে।


কুসুমের একটি সংলাপ—

“চিরদিন কি একরকম যায়? মানুষ কি লোহার গড়া যে চিরকাল একরকম থাকবে, বদলাবে না?”

—উপন্যাসের জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে প্রকাশ করে। মানুষ পরিবর্তনশীল, সম্পর্ক পরিবর্তনশীল, এমনকি ভালোবাসার অনুভূতিও সময়ের সঙ্গে রূপ বদলায়। দীর্ঘ অপেক্ষা যেমন ভালোবাসাকে গভীর করতে পারে, তেমনি অবহেলা ও অপূর্ণতা একসময় সেই ভালোবাসাকেই নিঃশেষ করে দিতে পারে।


শশীর প্রেমের ব্যর্থতা, পলায়নপর মানসিকতা এবং প্রতিবাদ করতে না পারার প্রবণতা তাকে নিছক দুর্বল চরিত্রে পরিণত করে না; বরং বাস্তব জীবনের এক গভীর সত্যকে ধারণ করে। সে তার বাবার শঠতা দেখে, বোন বিন্দুর অবনমন দেখে, চারপাশের মানুষের অসহায়ত্ব প্রত্যক্ষ করে—কিন্তু চাইলেও সবকিছু বদলে দিতে পারে না। তার ভেতরে জমতে থাকে অপরাধবোধ, গ্লানি, হতাশা ও আত্মদ্বন্দ্ব। এই অর্থে শশীর সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি এমন এক মানুষের সংকট, যে অনেক কিছু বুঝতে পারে, অনেক কিছু পরিবর্তন করতে চায়, কিন্তু বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে বারবার থেমে যায়।


এই জায়গাতেই ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-র প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত। উপন্যাসটির শক্তি কেবল ঘটনাপ্রবাহে নয়; বরং চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায়। শশীকে কেউ ব্যক্তিত্বহীন বা সিদ্ধান্তহীন মানুষ হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতার আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, সে আমাদের চারপাশের অগণিত মানুষেরই প্রতিচ্ছবি—যারা মনে মনে অনেক কিছু চায়, অনেক কিছু বোঝে, অনেক কিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়; অথচ সামাজিক সম্পর্ক, দায়িত্ব, পরিস্থিতি ও নিজের দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত তা করে উঠতে পারে না।


কুসুমের চরিত্রও একমাত্রিকভাবে বিচার করার সুযোগ নেই। তাকে শুধু ‘পরকীয়া’ বা নৈতিক বিচ্যুতির সরল কাঠামোয় দেখলে তার অন্তর্গত যন্ত্রণা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাসটি আড়াল হয়ে যায়। কুসুম ভালোবাসতে জানে, অপেক্ষা করতে জানে, নিজের অনুভূতিকে উজাড় করে দিতে জানে। কিন্তু শশীর অবহেলা ও দ্বিধা তার সেই ভালোবাসাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। দীর্ঘ সাত বছরের প্রতীক্ষার পর শশী যখন ভালোবাসার কথা বলে, তখন কুসুমের কাছে সেই স্বীকারোক্তি প্রায় অবিশ্বাস্য, এমনকি বোকামির মতো মনে হয়। যে নারী একসময় নিজেকে ভালোবাসার কাছে সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করতে চেয়েছিল, দীর্ঘ অবহেলা তাকে শেষ পর্যন্ত গুটিয়ে নেয়। তার এই পরিবর্তন আসলে দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্লান্ত একটি আত্মার নির্মম পরিণতি।


বিন্দুর চরিত্রে ফুটে ওঠে নারীর সামাজিক অসহায়ত্ব ও পতনের আরেকটি নির্মম চিত্র। সমাজ অনেক সময় নারীর দুর্দশার কারণ অনুসন্ধান না করে তার ওপরই ‘নষ্ট’ বা ‘পতিতা’র তকমা এঁটে দেয়। শশী বিন্দুকে শহর থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, কিন্তু তার জীবনের গভীরে গেঁথে যাওয়া আসক্তি, অভিজ্ঞতা ও মানসিক ক্ষতকে মুছে দিতে পারে না। ফলে বিন্দুর ফিরে আসা পূর্ণ মুক্তি হয়ে ওঠে না; বরং তার জীবন আরও এক ট্র্যাজেডির সাক্ষ্য বহন করে।


সোনাদিদি, যাদব পণ্ডিত প্রমুখ উপ-চরিত্রও উপন্যাসের মূল ভাবনাকে আরও গভীর করে। যাদবের তৈরি হাসপাতাল, শশীর আদর্শ, দায়িত্ব ও প্রতিজ্ঞা—সবকিছু মিলিয়ে জীবন যেন শেষ পর্যন্ত তাকে আবার সেই গাওদিয়ার কাছেই ফিরিয়ে আনে, যেখান থেকে সে বারবার দূরে সরে যেতে চেয়েছিল। এই ফিরে আসা কেবল ভৌগোলিক প্রত্যাবর্তন নয়; এটি এক ধরনের মানসিক ও অস্তিত্বগত আত্মসমর্পণ।


মানুষের জীবনে এমন আত্মসমর্পণের অভিজ্ঞতা অচেনা নয়। আমরা কত স্বপ্ন দেখি, কত সিদ্ধান্ত নিই, কত প্রতিজ্ঞা করি—কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবার, সমাজ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সম্পর্ক, দায়িত্ব কিংবা নিজের অন্তর্গত দুর্বলতার কাছে অনেক সময় আমাদের সেই সিদ্ধান্তগুলো পরাজিত হয়। আমরা মনে করি আমরা জীবনকে পরিচালনা করছি; অথচ কখনো কখনো জীবনই আমাদের অদৃশ্য সুতোয় টেনে নিয়ে চলে।


এই কারণেই ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-তে পুতুলের কোনো মঞ্চনাটক নেই, কিন্তু আছে পুতুলের মতো মানুষের নীরব নাচ। কেউ নাচে প্রেমের টানে, কেউ দায়িত্বের চাপে, কেউ সামাজিক বিধিনিষেধে, কেউ আবার নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বের কাছে পরাজিত হয়ে। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আর নিয়তির অদৃশ্য শক্তির এই দ্বন্দ্বই উপন্যাসটিকে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য দিয়েছে।


উপসংহার


‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি মানুষ, সমাজ ও নিয়তির সম্পর্কের এক নির্মোহ মনস্তাত্ত্বিক দলিল। এখানে মানুষ পুতুলের মতো নড়ে, হাসে, ভালোবাসে, কাঁদে, স্বপ্ন দেখে এবং শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। কিন্তু সবসময় নিজের জীবনের সুতো নিজের হাতে রাখতে পারে না।


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামবাংলার মাটি, মানুষ ও তাদের অন্তর্জীবনকে যে নির্মোহতা ও মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতায় তুলে ধরেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। শশীর দ্বিধা, কুসুমের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নিঃশেষিত ভালোবাসা, বিন্দুর অসহায়তা এবং অন্যান্য চরিত্রের জীবনসংগ্রাম—সব মিলিয়ে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর পাঠ।


পাঠক যখন শশীর ব্যর্থতা, কুসুমের নির্লিপ্ততা কিংবা বিন্দুর যন্ত্রণার মুখোমুখি হন, তখন কেবল উপন্যাসের চরিত্রদের নয়, নিজের ভেতরের কিছু পরাজয়কেও যেন দেখতে পান। তখন উপলব্ধি হয়—আমরাও হয়তো প্রত্যেকে কোনো না কোনো অদৃশ্য সুতোর টানে বাঁধা। কেউ প্রেমের সুতোয়, কেউ দায়িত্বের শিকলে, কেউ সামাজিক বাস্তবতার বন্ধনে, আবার কেউ নিজের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের কাছে।


‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু শশী-কুসুম-বিন্দুর গল্প নয়; এটি আমাদের প্রত্যেকের জীবনেরই এক সম্ভাব্য ‘ইতিকথা’।


Md. Helal Uddin 


📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ

২৫ জুন, ২০২৫

Monday, September 28, 2026

তুমি আমার উত্তর হয়ে থেকো -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


প্রিয়,

জানো, জীবনে আমি কখনো এমন কাউকে চাইনি, যে আমার প্রতিটি কথার হিসাব রাখবে। আমি চেয়েছি এমন একজনকে, যার কাছে আমার নীরবতাও একটি সম্পূর্ণ বাক্য হয়ে পৌঁছাবে।

এমন একজন, যে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নেবে—আজ আমার ভেতরে খুব বেশি শব্দ জমেছে, অথচ আমি কোনো শব্দই উচ্চারণ করতে পারছি না।

আমি চেয়েছিলাম তোমাকে এমনভাবে, যেভাবে সন্ধ্যার শেষে মানুষ একটু শান্তি চায়। যেভাবে দীর্ঘ ক্লান্তির পর কেউ চায় পরিচিত একটি কণ্ঠ শুনতে। যেভাবে অনেক মানুষের ভিড় পেরিয়ে একজন মানুষ শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে চায় শুধু একজনের কাছেই।

তোমার কাছে এসে আমি যেন আর কিছুই লুকাতে না চাই।

আমার ভয়, আমার দুর্বলতা, আমার অভিমান, আমার অকারণ মন খারাপ—কিছুই না।

আমি চাই, কোনো একদিন তুমি আমার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেলো, আজ আমার ভেতরটা ভালো নেই। আমার ঠোঁটে হাসি থাকলেও তুমি যেন সেই হাসির আড়ালে জমে থাকা বিষণ্নতাটুকু দেখতে পাও। আমার দীর্ঘশ্বাস শুনে প্রশ্ন না করে শুধু একটু কাছে এসে বসো।

কিছুক্ষণ চুপ থেকো।

কারণ সব কষ্টের ভাষা হয় না, আর সব ভালোবাসারও কোনো উচ্চারণ লাগে না।

আমি এমন একজন মানুষ চেয়েছি, যার কাছে আমাকে বারবার প্রমাণ করতে হবে না যে আমি তাকে ভালোবাসি। যে আমার একদিনের নীরবতাকে এক জীবনের অবহেলা ভেবে নেবে না। যে আমার কোনো ভুলকে আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র বানাবে না।

আমি ভুল করব, অভিমান করব, কখনো হয়তো অকারণে দূরে সরে যাব। তবু তুমি আমার হাতটা ছেড়ে দিও না।

শুধু মনে রেখো—কখনো কখনো মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তখনই, যখন সে সবচেয়ে বেশি চুপ করে থাকে।

আমি চাই, তুমি আমার অসম্পূর্ণতাগুলোকে ভালোবাসো। আমার অগোছালো কথাগুলোকে, আমার অকারণ চুপ হয়ে যাওয়াকে, আমার হঠাৎ মন খারাপকে। আমার যে অংশগুলো পৃথিবীর কাছে ব্যাখ্যাতীত, সেগুলোর কাছেও যেন তোমার ভালোবাসা পৌঁছে যায়।

আর যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই নিজের ভেতরেই, আমাকে জেরা করো না।

শুধু আমার জন্য একটু জায়গা রেখো।

কারণ আমি জানি, পৃথিবীর সব পথ শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো ঘরে গিয়ে থামে। আর আমার সমস্ত ক্লান্তির পর আমি যে ঘরটিতে ফিরে আসতে চাই, সেটি কোনো ইট-পাথরের ঘর নয়—

সেটি তুমি।

তোমার কাছে এসে আমি পৃথিবীর কাছে আর কিছু হতে চাই না। না সফল, না শক্ত, না নিখুঁত। শুধু তোমার মানুষ হয়ে থাকতে চাই।

যেখানে আমার ব্যর্থতারও জায়গা থাকবে, কান্নারও জায়গা থাকবে, নীরবতারও জায়গা থাকবে।

তুমি শুধু আমার জীবনের প্রশ্নপত্র হয়ো না, প্রিয়তমা।

আমার উত্তর হয়ে থেকো।

যখন পৃথিবী আমাকে বুঝতে চাইবে না, তখন তুমি আমাকে বুঝতে চেয়ো। যখন সবাই আমার কথার অর্থ খুঁজবে, তখন তুমি আমার নীরবতাটুকু পড়ো। যখন আমি নিজেকেই বুঝতে পারব না, তখনও তুমি আমার পাশে থেকো।

আর যদি কোনোদিন তোমার মনে হয় আমি বদলে গেছি, একটু কাছে এসে আমার চোখের দিকে তাকিয়ো।

হয়তো দেখবে, মানুষটা বদলায়নি—

শুধু অনেক কথা জমে গিয়ে চুপ হয়ে গেছে।

তখন আমার হাতটা ধরে নিও।

কিছু জিজ্ঞেস কোরো না।

শুধু বলো—

“আমি আছি।”

বিশ্বাস করো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দুটি শব্দ হয়তো এটাই।

আমি আছি।

তোমার এই থাকা যদি সত্যি হয়, তবে জীবনের আর কোনো উত্তর আমার দরকার নেই।

কারণ শেষ পর্যন্ত আমি এমন একজনকেই চেয়েছিলাম—

যার কাছে গিয়ে আমার সমস্ত অস্থিরতা থেমে যাবে,
যার নীরবতায় আমি শান্তি খুঁজে পাব,
যার চোখে নিজেকে হারিয়ে ফেলেও
আবার নিজেকেই খুঁজে পাব।

তুমি থেকো।

খুব কাছে নয়, খুব দূরেও নয়—
শুধু এতটা কাছে, যেন আমার নীরবতাও তোমার কাছে পৌঁছে যায়।

 

ইতি, 

ব্যাখ্যা দিতে না-চাওয়া মানুষটি।

 

 

তুমি আমার উত্তর হয়ে থেকো -- মোঃ হেলাল উদ্দিন  


Friday, September 25, 2026

নীরব ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

প্রিয়তমা,

তুমি আমার দূরে থাকা এক পবিত্র ভালোবাসা।
দূরত্বের ওপারে থেকেও তুমি কীভাবে যেন প্রতিদিন আমার খুব কাছে এসে দাঁড়াও—আমার ভাবনায়, আমার নীরবতায়, আমার একান্ত অনুভূতিগুলোতে। তোমাকে চোখের সামনে দেখতে না পেলেও, মনে হয় তুমি আছো—খুব গভীরে, আমার হৃদয়ের এমন এক জায়গায়, যেখানে দূরত্বের কোনো হিসাব চলে না।

জানো, অনেক কথা আছে যা তোমাকে মুখোমুখি বসে বলতে ইচ্ছে করে। তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছে করে—তোমাকে আমি কতটা ভালোবাসি। তোমার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কোনো কথা নয়, কোনো ব্যাখ্যাও নয়—শুধু তোমার পাশে থাকার অনুভূতিটুকু উপভোগ করতে চাই।

কিন্তু বাস্তবতা আমাদের মাঝে দূরত্ব এঁকে দিয়েছে। তুমি তোমার পৃথিবীতে, আমি আমার পৃথিবীতে। মাঝখানে কত পথ, কত ব্যস্ততা, কত অনুচ্চারিত কথা। তবুও আশ্চর্য, এই দূরত্ব আমার ভালোবাসাকে একটুও দূরে সরাতে পারেনি। বরং কখনো কখনো মনে হয়, দূরত্বই আমাকে আরও গভীরভাবে বুঝিয়েছে—কাউকে কাছে পাওয়ার চেয়ে, কাউকে হৃদয়ের মধ্যে ধারণ করে রাখাটাই হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে সত্য রূপ।

আমার প্রতিটি সকাল যেন তোমাকে ভেবেই শুরু হয়। ঘুম ভাঙার পর অকারণে তোমার কথা মনে পড়ে। দিনের ব্যস্ততার ভিড়েও হঠাৎ তোমার কোনো কথা, কোনো হাসি, কোনো স্মৃতি এসে আমার মনটাকে থামিয়ে দেয়। আর রাত যখন চারপাশের সব শব্দকে ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ করে দেয়, তখন তোমাকে আরও বেশি মনে পড়ে। মনে হয়, পৃথিবীর সবাই যখন ঘুমিয়ে আছে, তখন আমার মন একা তোমার সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে।

তোমাকে আমি প্রতিদিন মিস করি।
খুব মিস করি।
কখনো কোনো কারণ ছাড়াই।
কখনো কোনো গান শুনে।
কখনো কোনো পরিচিত গন্ধে।
কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে।
আবার কখনো শুধু নিজের নীরবতার মধ্যেই।

এমন কোনো দিন নেই, এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যখন তুমি একবারও আমার মনে আসো না। তুমি হয়তো জানো না, তোমাকে ঘিরে আমার কত অদৃশ্য কথোপকথন হয়। কত কথা মনে মনে তোমাকে বলি, কত প্রশ্ন করি, কত উত্তর নিজেই কল্পনা করি। কখনো মনে হয়, তুমি ঠিক আমার পাশেই বসে আছো আর আমি নির্ভয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলছি।

কখনো হঠাৎ বাতাস এসে মুখ ছুঁয়ে যায়। তখন মনে হয়—এ বুঝি তোমারই কোনো অদৃশ্য স্পর্শ।
কখনো বৃষ্টির শব্দ শুনে মনে হয়—এই শব্দ তুমি-ও কি শুনছো?
কখনো চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবি—এই একই চাঁদ তো তোমার জানালাতেও আলো ফেলছে।
কখনো বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিই—দূরত্ব যতই হোক, আমরা তো একই আকাশের নিচেই আছি।

এই ভাবনাগুলোই আমাকে তোমার কাছাকাছি রাখে।

তুমি আমার জীবনের এমন একজন মানুষ, যাকে হয়তো প্রতিদিন ছুঁতে পারি না, কিন্তু প্রতিদিন অনুভব করি। তোমার সঙ্গে প্রতিদিন কথা না হলেও, আমার মনের ভেতর তোমার সঙ্গে প্রতিদিনই যেন কোনো না কোনো কথা হয়। তুমি আমার কাছে শুধু একজন মানুষ নও; তুমি একটি অনুভূতি, একটি অপেক্ষা, একটি মায়া, একটি নীরব সুখ—যাকে শব্দ দিয়ে পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

কখনো কখনো ভয় হয়—সময় যদি বদলে যায়? মানুষ যদি বদলে যায়? দূরত্ব যদি আরও বেড়ে যায়? কিন্তু তারপরও হৃদয়ের ভেতর থেকে একটি কথাই আসে—সত্যিকারের অনুভূতি দূরত্বে মরে না। বরং সময় আর দূরত্ব পেরিয়েই তার সত্যতা বোঝা যায়।

আমি তোমার কাছে কোনো প্রতিশ্রুতির বোঝা রাখতে চাই না। শুধু চাই, তুমি জানো—কোথাও একজন মানুষ আছে, যে তোমাকে খুব নিঃশব্দে, খুব গভীরভাবে ভালোবাসে। যে তোমার ভালো থাকাকে নিজের আনন্দ মনে করে। যে তোমার হাসির কথা ভাবলে নিজের অজান্তেই হাসে। যে তোমার মন খারাপের কথা ভাবলে দূরে থেকেও অস্থির হয়ে ওঠে।

তুমি ভালো থেকো—এই প্রার্থনাটুকু আমার প্রতিদিনের।
তোমার সকালগুলো শান্ত হোক, তোমার দিনগুলো সুন্দর হোক, তোমার রাতগুলো নিশ্চিন্ত হোক। তুমি যখন একা হয়ে যাবে, তখন হয়তো আমাকে মনে পড়বে না; তবুও জেনে রেখো, সেই মুহূর্তেও কেউ একজন তোমাকে মনে করছে।

হয়তো কোনোদিন তোমার হাত ধরে দীর্ঘ পথ হাঁটার সুযোগ হবে, হয়তো কোনো সন্ধ্যায় পাশাপাশি বসে সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখব। হয়তো কোনো এক নির্জন বিকেলে তোমাকে সামনে বসিয়ে এতদিনের জমে থাকা কথাগুলো একে একে বলব। আবার হয়তো সেই দিনটি কখনোই আসবে না। জীবন সব ইচ্ছের পূর্ণতা দেয় না—কিছু অনুভূতি শুধু হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকে।

তবুও তোমাকে ভালোবাসার জন্য আমার কোনো আফসোস নেই।

কারণ তোমাকে ভালোবাসা আমার কাছে কোনো দাবি নয়, কোনো পাওয়ার হিসাব নয়। এটা আমার মনের এক নির্মল অনুভূতি—যার বিনিময়ে আমি কিছু চাই না। শুধু চাই, তুমি ভালো থেকো। তুমি সুখী থেকো। আর কখনো যদি কোনো নির্জন রাতে হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে, তখন মনে করবে—দূরে কোথাও একজন মানুষ আছে, যে হয়তো আজও তোমাকে একইভাবে মনে করছে।

তুমি আমার দূরত্বের মানুষ, অথচ হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের।
তুমি আমার নাগালের বাইরে, অথচ অনুভূতির সবচেয়ে ভেতরে।
তুমি আমার প্রতিদিনের জীবনে অনুপস্থিত, অথচ আমার প্রতিটি দিনের গল্পে উপস্থিত।

জানি না ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে। জানি না সময় আমাদের জন্য কী লিখে রেখেছে। শুধু এটুকু জানি—তোমার জন্য আমার হৃদয়ে যে জায়গাটি তৈরি হয়েছে, সেখানে তোমার স্মৃতি খুব যত্নে থাকবে।

যতদিন নিঃশ্বাস আছে, ততদিন হয়তো তোমাকে মনে পড়বে।
যতদিন হৃদয় অনুভব করতে জানে, ততদিন তোমার জন্য এই মায়া বেঁচে থাকবে।
আর যতদিন ভালোবাসতে পারব, ততদিন তুমি আমার সেই দূরে থাকা মানুষ হয়েই থাকবে—যাকে কাছে না পেয়েও হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে রাখা যায়।

ভালো থেকো, প্রিয়।
দূরে থেকো, তবুও আমার অনুভূতির কাছেই থেকো।
কখনো যদি আকাশের দিকে তাকাও, মনে রেখো—এই একই আকাশের নিচে আমিও আছি।
আর হয়তো সেই মুহূর্তে, নিঃশব্দে, তোমাকেই ভাবছি।

তোমাকে খুব মিস করি।
খুব, খুব বেশি। 


ইতি,
তোমার এক নীরব ভালোবাসা।