Wednesday, May 6, 2026

মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মহাসড়কের ধুলোভেজা বিকেল। দূরে সারি সারি বাস—যেন স্থির নদীর ওপর থমকে থাকা নৌকা। হেডলাইটগুলো জ্বলছে, নিভছে, আবার জ্বলছে—ঠিক যেন অপেক্ষার চোখ।

তাসফিয়া জানালার পাশে বসে মোবাইল তুলে একটা ছবি তোলে। ছবির ক্যাপশনে লিখে—
“কখন যে ঢাকায় পৌঁছাতে পারবো, জানিনা...”

স্টোরি আপলোড হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই আসে—
—“আপনি কোন বাসে আছেন?”

তাসফিয়া একটু থামে। নামটা দেখে চিনতে পারে—তাওসিফ। বহুদিনের ফেসবুক ফ্রেন্ড, অথচ একটাও কথা হয়নি কখনো।
সে ছোট করে উত্তর দেয়—
—“গ্রীণ লাইন।”

ওপাশ থেকে আবার—
—“আপনি কি জ্যামে?”

—“হ্যাঁ। আপনি?”

একটু দেরি করে রিপ্লাই আসে—
—“হুম… তবে ঢাকায় যাচ্ছি না। মাঝপথে নেমে যাবো।”

এই ছোট্ট কথোপকথন—যেন একটা দরজা। অদৃশ্য, অথচ খোলা।

তারপর দিন যায়। কথাও বাড়ে।

প্রথমে খোঁজখবর, তারপর গল্প, তারপর নীরবতাও যেন কথা হয়ে ওঠে।

তাওসিফ শব্দের মানুষ। ব্যাংকের ফাইলের ভেতরে তার দিন আটকে থাকলেও, রাত হলেই সে শব্দে আশ্রয় নেয়। কবিতা লেখে। আবৃত্তি করে। তার শব্দে নদী থাকে, কুয়াশা থাকে, আর অদ্ভুত এক শূন্যতা থাকে—যেটা তাসফিয়ার খুব পরিচিত লাগে।

তাসফিয়া মানুষ গড়ার কাজ করে—শিক্ষক। ক্লাসরুমে তার কণ্ঠ দৃঢ়, কিন্তু নিজের জীবনে সে যেন একটু ভেসে থাকা মানুষ। শাড়ি তার ভালোবাসা—প্রতিটি শাড়ি যেন একেকটা ঋতু। নতুন শাড়ি পরে নতুন জায়গায় গেলে সে ছবি তোলে—আর সেই ছবির নিচে তাওসিফ লিখে ফেলে কবিতা।

“তোমার শাড়ির আঁচলে আজকে বিকেলের রোদ আটকে গেছে—
আমি দূর থেকে শুধু আলোর গন্ধ পাই…”

এমন লাইন পড়ে তাসফিয়া চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় না, কিন্তু পড়ার পর তার ভেতরে কিছু নরম হয়ে যায়।

একদিন তাওসিফ একটা কবিতা লিখলো—

“দেখা হোক কোনো এক অনির্ধারিত দুপুরে—
যেখানে সময় থেমে থাকবে চায়ের কাপের ধোঁয়ায়,
আর আমরা দু’জন—
অচেনা হয়েও পরিচিত হয়ে উঠবো…”

কবিতাটা পড়ার পর তাসফিয়া অনেকক্ষণ কিছু লেখে না। শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত ইচ্ছে জন্ম নেয়—
দেখা করার।

কিন্তু কেউ কাউকে বলে না।

হঠাৎ একদিন—
একটা শপিংমলের ভিড়ে—
দু’জনের চোখে চোখ পড়ে।

যেন গল্পের ভেতর থেকে বাস্তব হঠাৎ বের হয়ে এসেছে।

—“তাসফিয়া?”
—“তাওসিফ?”

দু’জনেই একটু হেসে ফেলে।
সময় তখন খুব কম। কথা হয় অল্প—
তবুও সেই অল্প কথার মধ্যে অদ্ভুত এক স্বাচ্ছন্দ্য।

বিদায়ের আগে তাওসিফ বলে—
“একদিন কফি খাওয়া যেতে পারে…”

তাসফিয়া মাথা নাড়ে—
“হতে পারে।”

তারপর আবার তারা ফিরে যায় নিজেদের জীবনে।
কিন্তু এবার কথাগুলো বদলে যায়।

মাঝে মাঝে কথা হয়—
কিন্তু না বললেও অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।

এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।
বন্ধুত্ব?
ভালোবাসা?
নাকি শুধু অভ্যাস?

তারা কেউই জানে না।

তবুও—
রাতের শেষে দু’জনেই অপেক্ষা করে—
একটা “অনলাইন” দেখার জন্য।


একদিন হঠাৎ তাসফিয়া জানতে পারে—
তাওসিফ যেই “মাঝপথে নেমে যাবো” বলেছিল—
সেটা শুধু বাসের কথা ছিল না।

তাওসিফ আসলে একটা সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসছিল।
একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত, ভাঙা সম্পর্ক।

আর তাসফিয়া?
সে বুঝতে পারে—
সে হয়তো তাওসিফের “শেষ গন্তব্য” না—
বরং সেই “মাঝপথ”—
যেখানে মানুষ একটু থামে, শ্বাস নেয়, আবার এগিয়ে যায়।


তাসফিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। নতুন একটা শাড়ি পরে আছে।
মোবাইলে একটা মেসেজ টাইপ করে—

“আজ কফি খাওয়া যাবে?”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই আসে—

“আজ না…
আমি একটু দূরে যাচ্ছি।”

তাসফিয়া ফোনটা নামিয়ে রাখে।
হাসে। খুব হালকা একটা হাসি।

কারণ সে জানে—
সব গল্পের শেষ একসাথে হওয়া না।
কিছু গল্প শুধু সুন্দরভাবে অসম্পূর্ণ থাকার জন্যই জন্ম নেয়।

আর দূরে কোথাও—
মহাসড়কে আবার বাসের লাইন দাঁড়িয়ে থাকে—
যেন সময় এখনও কোথাও আটকে আছে…

 

 মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Saturday, May 2, 2026

নীল ডায়েরির অমীমাংসিত পাতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নতুন স্কুল, নতুন বেঞ্চ, নতুন গন্ধ—চক আর কাগজের মিশ্র এক অচেনা সকাল। প্রথম দিন প্রথম ক্লাসে ঢুকেই চোখ আটকে গিয়েছিল। বোর্ডে তাকানোর কথা ছিল, অথচ চোখ চলে গিয়েছিল জানালার ধারে বসে থাকা মেয়েটির চোখে। অদ্ভুত শান্ত, অথচ কৌতূহলে ভরা—ঠিক যেন অপরিচিত কোনো নদী, যার দিকে তাকালে নামতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নামার সাহস নেই।

সে ছিল ইংরেজি ম্যাডামের মেয়ে।

প্রথমে কিছুই হয়নি। নাম জানা হয়নি, কথাও হয়নি। শুধু প্রতিদিন ক্লাসে ঢুকে অজান্তেই তার বেঞ্চের দিকে তাকানো—এইটুকুই। কয়েকদিন পর ম্যাডাম লক্ষ্য করলেন, ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। ইংরেজি ক্লাসে উত্তরগুলো ঠিকঠাক আসে, উচ্চারণে জড়তা নেই। সুনজরটা তখন থেকেই। ম্যাডাম কখনো হাসেন, কখনো বাড়ির কাজ ভালো হলে খাতায় লাল কালি দিয়ে “Very Good” লিখে দেন।

একদিন ম্যাডাম বললেন,

— আজ বিকেলে আমার বাসায় এসো। একটু গাইড দেব।

বাসায় গিয়ে দেখা হলো মেয়েটার সঙ্গে। স্কুলের চেয়ে বাসায় সে অন্যরকম—চুল খোলা, পায়ে শব্দহীন চটি, চোখে একই রকম নীরব আলো। পড়া শেষে খেলনা বের হলো। লুডু, ক্যারাম, কখনো লুকোচুরি। প্রথম প্রথম কথা কম, পরে হাসি বাড়ে। ছেলেটা বুঝে যায়—এই হাসিটাই সে প্রতিদিন ক্লাসে খুঁজে ফেরে।

এরপর দিনগুলো যেন এক সুতোয় গাঁথা। প্রতিদিন ক্লাসে একসাথে বসা, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, বাসায় গিয়ে পড়া—সবই স্বাভাবিক, অথচ অদ্ভুতভাবে বিশেষ। স্কুলের অন্য ছাত্রছাত্রীরা ফিসফিস করে, চোখাচোখি করে। কেউ বলে, “প্রেমিক-প্রেমিকা!” তারা দু’জন কিছু বলে না। নাম না দেওয়া সম্পর্কটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।

দুই বছর কেটে যায় এভাবেই। স্কুলের দেয়ালে নতুন পোস্টার, মাঠে নতুন দাগ, অথচ তাদের জায়গাটা একই থাকে—একই বেঞ্চ, একই জানালার আলো। কখনো ঝগড়া হয়নি, কখনো বড় করে কথা হয়নি। শুধু একধরনের নিশ্চুপ টান—যেটা না বলা ভালো, না লুকানো যায়।

তারপর হঠাৎই সব বদলে গেল।

ছেলেটাকে অন্য স্কুলে ভর্তি হতে হলো। শেষ দিন সে জানত, কিন্তু বলার সাহস পায়নি। মেয়েটা জানত কি না, সেটাও জানা হয়নি। শেষ ক্লাসে চোখাচোখি হয়েছিল মাত্র একবার। কিছু বলার ছিল, অনেক কিছু—কিন্তু ঘণ্টা বেজে উঠেছিল।

এরপর আর দেখা হয়নি। কোনো রাস্তার মোড়ে নয়, কোনো উৎসবে নয়, এমনকি স্বপ্নেও নয়। সময় এগিয়েছে, নাম ভুলে গেছে হয়তো, মুখের রেখাও ঝাপসা। তবু কোথাও একটা টান রয়ে গেছে—অকারণ, অদৃশ্য, অথচ জেদি।

আজও ইংরেজি বই খুললে প্রথম পাতায় চোখ আটকে যায়। বোর্ডে লেখা কোনো বাক্যের মাঝখানে হঠাৎ মনে পড়ে যায় জানালার ধারের সেই চোখদুটি। তখন মনে হয়—সব প্রেম পূর্ণতা পায় না। কিছু প্রেম স্কুলের বেঞ্চেই থেকে যায়, খাতার ভাঁজে, পুরনো দিনের নীরবতায়।
 
 

নীল জলধির উপাখ্যান -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে মানুষের দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু নীলয় আজ সেখানে দাঁড়িয়েছে নিজের হাহাকার বিসর্জন দিতে। আজ পূর্ণিমা। আকাশের চাঁদটা যেন খুব নিচে নেমে এসেছে, ঠিক যেমনটা কবিতায় বলে— ‘আকাশের চাঁদ মর্ত্যে নামলো, রূপের আঁচল মেলে।’

​সামনে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। রূপালি চাঁদনি যখন ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে আছড়ে পড়ছে, নীলয়ের মনে হচ্ছে সমুদ্রটা আজ কোনো লোনা জলের পাহাড় নয়, বরং এক বিশাল আয়না। সেই শান্ত জলের দর্পণে বারবার ভেসে উঠছে একটি মুখ। চাঁদনী।

​স্মৃতির বালুচর

​নীলয় হাত বাড়িয়ে ঢেউয়ের ঝিকিমিকি ধরতে চাইল। কিন্তু আঙুলের ফাঁক দিয়ে শুধু নোনা জল গলে পড়ল। ঠিক যেমন তিন বছর আগে চাঁদনী গলে গিয়েছিল ওর জীবন থেকে। চাঁদনী এখন অনেক দূরে, হয়তো অন্য কোনো শহরের কৃত্রিম আলোয় সে ব্যস্ত। কিন্তু নীলয়ের কাছে সে আজও সেই লোনা হাওয়ায় মিশে থাকা এক চেনা ঘ্রাণ।

​চারপাশ নিঝুম। শুধু সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। নীলয় বিড়বিড় করে বলল, "জানি হবে না মেটানো কভু, এ যে বিরহের এক কৃষ্ণা।" সত্যি তো, কিছু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য কোনো জল থাকে না।

​পাথুরে নীরবতা

​সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো যখন বালুচরে আছড়ে পড়ছে, নীলয়ের বুকের ভেতরটা তখন বিদীর্ণ হচ্ছে এক তীব্র চিৎকারে। ওর ইচ্ছে করছিল আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে— “তোমায় বড় ভালোবাসি!” কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, যখনই সে মুখ খুলতে চাইল, শব্দরা যেন পাথর হয়ে গলার কাছে আটকে গেল। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ভয় থেকে যে নীরবতার জন্ম হয়েছিল, আজ সেই নীরবতাই তাকে গ্রাস করেছে। সমুদ্র সাক্ষী রইল এক ব্যর্থ প্রেমিকের, যার ঠোঁট দুটো পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে, অথচ হৃদয়ে জ্বলছে দাবানল।

​শেষ প্রহর

​রাত বাড়ে। চাঁদের আলো আরও মায়াবী হয়। নীলয় একা বালুচরে বসে থাকে। সে জানে, এই মায়াবী কায়া কেবলই তার মনের ভুল। চাঁদনী পাশে নেই, তবুও তার অস্তিত্ব এই নোনা জল আর বালুর কণে কণে মিশে আছে।

​ভালোবাসার না বলা কথাগুলো আজ দীর্ঘশ্বাস হয়ে লোনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। নীলয় বুঝল, কিছু মানুষকে আগলে রাখার চেয়েও বেশি কঠিন হলো তাদের ছাড়া বেঁচে থাকা, বিশেষ করে যখন সেই মানুষটিই হয় ‘জগতের সবচেয়ে দামি’ সম্পদ।
 
 
 

নীলার নীলে আবির -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


শহুরে কোলাহল ছেড়ে নীলা যখন শান্ত স্নিগ্ধ গ্রামে এসে পৌঁছালো, তখন তার মনে ছিল বিষণ্নতা। বাবার অসুস্থতা আর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আসার কষ্ট তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু সেই বিষণ্নতার মাঝেও নীলা ছিল এক অপূর্ব রূপবতী—দুধে-আলতা গায়ের রঙ আর মায়াবী ডাগর চোখের এক কিশোরী।

​স্কুলের প্রথম দিনটা আবিরের কাছে আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই হতে পারতো। সে ক্লাসের শান্ত আর মনোযোগী ছাত্র। কিন্তু নীলা যখন ক্লাসে পা রাখলো, আবিরের বইয়ের পাতায় থাকা জ্যামিতিক নকশাগুলো যেন হঠাৎ অর্থহীন হয়ে গেল। নীলার সেই দীঘল কালো চুল আর মায়াবী চাহনি আবিরের কিশোর মনে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে গেল।

​সেদিন থেকেই আবিরের রুটিন বদলে গেল। স্কুলের পড়া নয়, বরং নীলার এক পলক দেখা পাওয়ার জন্য তার মন ছটফট করতে থাকলো।

​আবির আর নীলার গ্রাম দুটো আলাদা। মাঝে একটা বিশাল মাঠ আর মেঠো পথ। প্রতিদিন বিকেলে আবির সেই পথ পাড়ি দিয়ে নীলাদের গ্রামের পাশে গিয়ে দাঁড়াত।

​আবিরের সাইকেলটা নিয়ে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, যেন খুব সাধারণ কোনো কাজে সেখানে আসা।

​নীলাও জানত আবির আসবে। সে বারান্দায় কিংবা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। দুজনেই জানত তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ কেউ কারো সামনে আসার সাহস পেত না।

​স্কুলের ক্লাসরুমেও চলত এক নীরব যুদ্ধ। কলম সচল থাকলেও আবিরের চোখ খুঁজত নীলাকে। মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হলে নীলা লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে নিত। এই 'চোখের ভাষা' ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব পৃথিবী। 'ভালোবাসি' শব্দটা কোনোদিন উচ্চারিত হয়নি, হয়তো হারানোর ভয়ে, কিংবা সেই অপ্রকাশিত ভালোলাগাটাকেই বেশি পবিত্র মনে হতো বলে।

​সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। গ্রামে কিশোরীদের পড়াশোনার চেয়ে বিয়ের আলাপটাই দ্রুত ডানা মেলে। আবির যখন রেজাল্টের আনন্দ আর নীলাকে নতুন করে দেখার স্বপ্ন বুনছিল, তখনই খবর এলো নীলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

​সেদিন বিকেলে আবির শেষবারের মতো সেই মেঠো পথে গিয়েছিল। নীলাদের বাড়ির উঠোনে তখন প্যান্ডেল বাঁধার তোড়জোড়। দূর থেকে সে দেখল নীলাকে—লাল শাড়িতে তাকে আরও বেশি মায়াবী লাগছে, কিন্তু সেই চোখে আজ আর সেই চঞ্চলতা নেই, আছে একরাশ বিষাদ।

​"সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, কিছু ভালোবাসা আজীবন বুকের বাম পাশে এক ফোঁটা নীল কষ্ট হয়ে বেঁচে থাকে।"

​নীলা চলে গেল নতুন শহরে, নতুন সংসারে। আর আবিরের কাছে রয়ে গেল স্কুলের সেই পুরনো বেঞ্চ, মেঠো পথ আর এক বুক না বলা কথা। সেই শান্ত গ্রামে আজও বিকেল হয়, কিন্তু সেই কিশোরীর অপেক্ষায় কোনো এক কিশোর আর মেঠো পথ পাড়ি দেয় না। তাদের সেই নীরব প্রেম এখন কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে আছে।

 

 

নীলার নীলে আবির -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

যে প্রেম ছোঁয়নি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 রাইসার জীবনে দ্বিতীয়বার বিশ্বাস শব্দটা আসেনি সহজে। ডিভোর্সের পর সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল—ক্যারিয়ার, সম্মান, আত্মনির্ভরতা। তবু রাতের বেলা জানালার পাশে দাঁড়ালে বুকের ভেতর একটা অপূর্ণ জায়গা হাহাকার করতো। সেই হাহাকার থেকেই কবিতা। শব্দের ভেতর সে নিজের শরীর নয়, নিজের মন খুলে দিত।

আদনানের সাথে পরিচয়টা তাই স্বাভাবিকের চেয়েও আলাদা ছিল। সে কবিতা লেখে না, কিন্তু কবিতা পড়ার সময় শব্দের ফাঁকে ফাঁকে মানুষ খোঁজে। রাইসার কবিতার নিচে তার মন্তব্যগুলো ছিল ছোট, কিন্তু গভীর। “এই লাইনে থেমে গিয়েছিলাম”—এই ধরনের কথা।

ইনবক্সে কথাবার্তা শুরু হয়। প্রথমে কবিতা, তারপর কাজ, তারপর জীবন। রাইসা লক্ষ করে—এই ছেলেটা তাকে জানতে চায়, পেতে চায় না। প্রশ্ন করে, কিন্তু চাপ দেয় না। ধীরে ধীরে সেই সতর্ক দেয়ালগুলোতে ফাটল ধরে।

প্রথম দেখা হয় এক বিকেলে। ক্যাফেতে বসে রাইসা একটু নার্ভাস ছিল, কিন্তু আদনান ছিল স্বাভাবিক। চোখে এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা। সে চোখে চোখ রাখে, কিন্তু দখল নিতে চায় না। সেই না-চাওয়াটাই রাইসার ভেতরে অদ্ভুত আলোড়ন তোলে।

সেদিনের পর কথা আরও বাড়ে। দেখা আরও হয়। কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো হাঁটতে হাঁটতে। একদিন বৃষ্টিতে ভিজে তারা একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়েছিল। রাইসা ঠাণ্ডায় কাঁপছিল। সে মনে মনে চেয়েছিল—আদনান অন্তত হাতটা রাখুক কাঁধে। কিন্তু আদনান শুধু জিজ্ঞেস করেছিল,

“ঠাণ্ডা লাগছে? কফি খাবেন?”

রাইসা অবাক হয়েছিল। বিরক্তও। কিন্তু তখনও সে কিছু বলেনি।

এরপর এক সন্ধ্যায়, রাইসা আর নিজেকে থামাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, সমাজের দৃষ্টি, ভাঙা সংসারের স্মৃতি—সব মিলিয়ে সে চেয়েছিল একটু ছোঁয়া। ভালোবাসার নিশ্চয়তা। সে নিজেই আদনানের কাছে এগিয়ে গিয়েছিল।

আদনান পিছিয়ে যায়নি আতঙ্কে, কিন্তু থামিয়ে দিয়েছিল দৃঢ়তায়।

সে শান্ত গলায় বলেছিল,

“রাইসা আপু, আমি চাই আমাদের সম্পর্কটা আগে মানুষ হিসেবে পাকাপোক্ত হোক। আমি আপনাকে চাই—কিন্তু দখল করে নয়। ছুঁয়ে নয়।”

সেই রাতেই রাইসা কেঁদেছিল। কারণ কেউ তাকে এত সম্মান করে প্রত্যাখ্যান করেনি কখনও।

তবু সম্পর্ক ভাঙেনি সঙ্গে সঙ্গে।

পরের কিছু দিন তারা আবার কথা বলেছে। আবার দেখা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটা দেখা রাইসার জন্য হয়ে উঠেছে পরীক্ষার মতো। সে শাড়ি পরে এসেছে একটু যত্ন করে, চুলে সুগন্ধি দিয়েছে। আদনান প্রশংসা করেছে, কিন্তু হাত বাড়ায়নি।

একদিন সিনেমা হলে অন্ধকারে বসে রাইসা ইচ্ছে করে একটু কাছে সরে এসেছিল। আদনান হালকা করে সিটের হাতলে সরে গেছে। সেই ছোট্ট সরে যাওয়াটা রাইসার বুকে বড় আঘাত করেছিল।

তার মনে হয়েছিল—

“আমি কি তবে অপ্রয়োজনীয়?

আমি কি শুধুই গল্প আর কবিতার মানুষ?”

শেষ দেখা হয় এক বিকেলে। আকাশ ভারী ছিল। রাইসা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি।

সে বলেছিল,

“তুমি জানো, আমি কী চাই। তবু তুমি ইচ্ছে করেই আমাকে ছুঁও না।”

আদনান উত্তর দিয়েছিল,

“কারণ আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”

রাইসা হেসেছিল—কঠিন, তিক্ত হাসি।

“তুমি আমাকে আগেই হারিয়েছ। যে পুরুষ ছোঁয়ার সাহস রাখে না, সে ভালোবাসার দায়িত্বও নিতে পারে না। তুমি ভিতু। কাপুরুষ।”

এই কথাগুলো বলেই সে উঠে চলে যায়। আর ফিরে তাকায়নি।

এরপর ব্লক। নীরবতা। কবিতাগুলো মুছে ফেলা। জীবন আবার আগের মতো সাজানো।

অনেকদিন পর, আদনান এক রাতে একটা পুরোনো স্ক্রিনশট খুঁজে পায়—রাইসার একটি কবিতা। সেখানে লেখা ছিল:

“যে আমাকে ছুঁতে চায় না, সে কি আমায় সত্যিই চায়?”

আদনান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। উত্তর লেখে না।

কারণ কিছু প্রেম ছোঁয়ার আগেই ভেঙে যায়।

আর কিছু মানুষ কষ্ট দিয়ে চলে যায়—শুধু এই কারণে যে, তারা ভালোবাসা আর স্পর্শকে এক করে ফেলেছিল।

 

 

যে প্রেম ছোঁয়নি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

Wednesday, April 29, 2026

মায়ার আবরণে এক চিলতে রোদ-- মোঃ হেলাল উদ্দিন


শহরের ব্যস্ত সিগন্যালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নীলা। চারপাশে গাড়ির হর্ন, মানুষের তাড়া, সময়ের তীব্র চাপ—সবকিছুর মাঝেই সে ছিল অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতায় মোড়া। পরনে কুচকুচে কালো বোরকা, চোখে গাঢ় কাজল। সিগন্যাল ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে উল্টো দিকের একটি রিকশায় বসা আরিয়ানের সঙ্গে হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে যায় তার।

টানাটানা সেই চোখে ছিল এক অজানা অস্থিরতা, যেন বহুদিনের চেনা কোনো অনুভব হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক পলকের সেই দৃষ্টি আরিয়ানকে মুহূর্তেই থমকে দিল। মনে হলো—এই চোখ দুটোকে সে যেন বহু বছর ধরে চেনে। সিগন্যাল বদলে গেল, রিকশা এগিয়ে গেল, কিন্তু ওই এক পলকের দেখা আরিয়ানের মনে গভীর দাগ কেটে রেখে গেল।

নীলা ছিল ভীষণ জেদি। আরিয়ানের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিও তাকে নাড়া দিয়েছিল গভীরভাবে। সেদিনের পর থেকে সে চেষ্টা করতে লাগল সেই অচেনা যুবকটিকে খুঁজে পেতে। হাতে কোনো তথ্য নেই—নাম নেই, পরিচয় নেই—শুধু স্মৃতিতে গেঁথে থাকা একটি অবয়ব। ফেসবুকের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড, লোকেশন সার্চ আর অসংখ্য প্রোফাইল ঘেঁটে কয়েক রাত কাটিয়ে অবশেষে সে খুঁজে পেল আরিয়ানকে। দেরি না করে পাঠিয়ে দিল ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট।

আরিয়ান প্রথমে বিস্মিত হলেও কথোপকথন শুরু হতে বেশি সময় লাগেনি। সে জানত না নীলার জীবনের অন্য পিঠের কথা। নীলা বিবাহিত—তার স্বামী দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে প্রবাসে। বিশাল বাড়ির ভেতর প্রতিদিন সে একা। দেয়ালের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত নীলা আরিয়ানের মধ্যে যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া কিশোরীবেলাকে খুঁজে পায়।

কথার পিঠে কথা জমে। প্রতিদিনের মেসেজ আর গভীর রাতের ফোন কলে তাদের মাঝে তৈরি হয় এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধন। একদিন নীলা স্বীকার করে বলে,

“জানি আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সমাজ একে পাপ বলবে। কিন্তু আমার এই একাকীত্বের মরুভূমিতে তুমি ছিলে এক পশলা বৃষ্টির মতো।”

আরিয়ান জানত—এই সম্পর্কের শেষ আছে, শুরু নেই। নীলার স্বামীর দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে আসছিল। বাস্তবতার কথা তুললেই নীলা বলত,

“ভবিষ্যৎ নেই বলে কি বর্তমানকে বাঁচতে নেই?”

তারা জানত—তারা দুই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা। তাদের ভালোবাসা ছিল বিকেলের শেষ আলোয় লম্বা হয়ে পড়া ছায়ার মতো—দীর্ঘ, অথচ ক্ষণস্থায়ী। সামাজিক স্বীকৃতি নেই, ঘর বাঁধার স্বপ্ন নেই—আছে শুধু এক পশলা ভালো লাগা আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস। কালো বোরকার আড়ালের সেই চোখ দুটো আজও আরিয়ানকে কাঁদায়, তবে সে কান্না কষ্টের নয়—প্রিয় কোনো স্মৃতি হারানোর মধুর বেদনা।

এক গভীর রাতে ফোনের ওপাশে নীলার কান্নাভেজা কণ্ঠ আরিয়ানের বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। আর কয়েকদিন পরই নীলার স্বামী দেশে ফিরবে। তখন এই লুকিয়ে কথা বলা, খুনসুটি আর মেসেজের টুনটুন শব্দ চিরতরে থেমে যাবে।

নীলা ফুঁপিয়ে বলে ওঠে,

“মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে সব ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসি। যেখানে কোনো প্রবাস নেই, কোনো একাকীত্ব নেই—শুধু তুমি আছ।”

আরিয়ান শান্ত গলায় উত্তর দেয়,

“নীলা, আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেখানে ভালোবাসার চেয়ে দায়িত্বের ওজন অনেক বেশি। আমি চাইলেই তোমার হাত ধরতে পারি না, আর তুমি চাইলেই সব ছিঁড়ে আসতে পারো না।”

শেষ পর্যন্ত নীলার স্বামীর ফেরার তারিখ চূড়ান্ত হয়। সেদিন শেষবারের মতো তারা দেখা করেছিল সেই চেনা মোড়টায়। কালো বোরকায় ঢাকা নীলার অবয়ব স্থির, শুধু কাজল মাখা চোখ দুটো লোনা জলে ভাসছে। কাঁপা হাতে সে একটি ছোট চিরকুট আরিয়ানের হাতে দিয়ে বলে,

“হয়তো কোনো এক জন্মে আমি শুধু তোমারই ছিলাম। এই জন্মে না হয় তোমার স্মৃতিগুলোকেই সঙ্গী করে নিলাম। ভালো থেকো সেই অচেনা যুবক—যে চেনা হয়েও আজ পর হয়ে যাচ্ছে।”

তারা কেউ কাউকে ব্লক করেনি, আবার কথাও বলেনি। আরিয়ান প্রতিদিন নীলার প্রোফাইল ছবি দেখে, নীলা চুপচাপ আরিয়ানের স্ট্যাটাস পড়ে। মেসেজ নেই, তবু অনুভব আছে—প্রতিটি নিঃশ্বাসে।

মাঝে মাঝে বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসে, আরিয়ান সেই মোড়টায় গিয়ে দাঁড়ায়। সে জানে কালো বোরকা পরা মেয়েটি আর আসবে না। তবু বাতাসে আজও ভাসে সেই টানাটানা চোখের মায়া আর এক অসমাপ্ত ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস। 

ভালোবাসা হয়তো সবসময় মিলনে পূর্ণতা পায় না—কিছু ভালোবাসা অমর হয়, শুধু হৃদয়ের গভীরে থেকে যাওয়ার মধ্য দিয়েই।

 

 May be an image of one or more people

Sunday, April 26, 2026

লকেটের সেই সোনালী ঝিলিক -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আকাশের বয়স তখন একুশ। টিউশনি শেষ করে ফেরার পথে বিকেলটা কেমন যেন মায়াবী হয়ে উঠত। রাস্তার মোড়ে পুরনো লাইব্রেরিটার সামনে সেদিন প্রথম ওকে দেখল সে। মেয়েটির নাম নীলা, সবে ষোড়শীতে পা দিয়েছে।

​নীলা যখন চশমাটা ঠিক করতে করতে সামনের দিকে তাকাল, আকাশের মনে হলো সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। ওর টানাটানা বড় বড় দুটো চোখ, যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা গভীর দিঘি। সেই চোখে এক অদ্ভুত সারল্য, যা একুশ বছরের যুবকের বুকে প্রথমবার এক অজানা ঢেউ তুলল। ওর মাথায় রাশীকৃত কালো চুল, বাতাসের ঝাপটায় যা বারবার কপালে এসে পড়ছে।

​সবচেয়ে নিখুঁত ছিল ওর নাকটি। ঠিক যেন বাঁশির মতো তীক্ষ্ণ আর সুডৌল। হাসলে সেই নাকের পাটা হালকা একটু ফুলে ওঠে, যা দেখে আকাশের মনে হলো এ কোনো মানবী নয়, বরং জীবন্ত কোনো কবিতা। কিন্তু আকাশের নজর আটকে গেল নীলার গলার কাছে। ওর বুকের ওপর ঝুলছে একটি ছোট্ট সোনার লকেট। বিকেলের মরা রোদ সেই লকেটে ঠিকরে পড়ে আকাশের চোখে এসে লাগছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে লকেটটি আলতো করে দুলছে, আর সেই দুলুনি যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করছে আকাশের হৃদপিণ্ডে।

​আকাশের হাতপা কাঁপছিল। একুশ বছর বয়সে সে অনেক মেয়েই দেখেছে, কিন্তু এই লকেটের ঝিলিক আর টানা চোখের চাহনি কেন জানি তাকে সম্মোহন করে ফেলল। নীলা হয়তো বুঝতে পেরেছিল কেউ তাকে দেখছে। সে একটু আড়চোখে তাকিয়ে হালকা হাসল। সেই হাসিতে যেন এক হাজারটা বসন্তের ফুল একসাথে ফুটে উঠল।

​নীলা চলে গেল তার রিকশায় চড়ে, কিন্তু একুশ বছরের সেই যুবকটি লাইব্রেরির সামনে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে তখনও বাজছে নীলার গলার চুড়ির রিনরিন শব্দ আর চোখে ভাসছে সেই বাঁশির মতো নাক আর সোনার লকেটের নাচন। ভালোবাসা কি এভাবেই আসে? কোনো ভূমিকা ছাড়াই, শুধু এক পলকের একটু সোনালী ঝিলিক দিয়ে?

​আকাশ জানত না ওর নাম কী, কিন্তু ওই দিন থেকে একুশ বছরের যুবকটি বুঝতে পারল— তার মনের ডায়েরিতে এক ষোড়শী বালিকা স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

May be an image of jewellery 

লকেটের সেই সোনালী ঝিলিক -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Sunday, April 19, 2026

বিস্মৃতির ওপারে সুখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নীলিমার ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়িটা টিকটিক শব্দ করছিল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বহু বছর পর অয়ন আর নীলিমা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। অয়ন খেয়াল করল, নীলিমার চোখে আগের সেই চঞ্চলতা নেই, সেখানে এখন এক থিতু হওয়া প্রশান্তি।

​অয়ন আলতো করে হাসল। "জানতাম, তুমি আমার চেহারাটা ভুলে যাবে।"

​নীলিমা কিছুটা থতমত খেল। অপরাধবোধের সুর নিয়ে বলল, "আসলে সময়টা এত দ্রুত চলে গেল যে..."

​"ভুলে তো যাবেই, তাতে আমি অবাক হইনি," অয়ন মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।

​নীলিমা জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কেন অবাক হওনি? তবে কি আমায় কোনোদিন ভালোবাসনি?"

​অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার কাঁচে জমে থাকা বৃষ্টির বিন্দুর দিকে তাকিয়ে সে বলল, "ভালোবাসা আর প্রয়োজন এক নয় নীলিমা। তুমি সেদিন আমার কাছে এসেছিলে স্রেফ এক সাময়িক শূন্যতা থেকে। তোমার জীবনে তখন কেউ ছিল না, একটা আশ্রয়ের খুব দরকার ছিল। আমি শুধু সেই সময়টুকুর সঙ্গী ছিলাম। আমি সেদিনই বলেছিলাম, সময় পূর্ণ হলে তুমি আমায় ভুলে যাবে।"

​নীলিমা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো গলায় আটকে গেল। অয়ন আবার বলতে শুরু করল, "আজ তোমার বুকে অপেক্ষার প্রিয় মানুষ আছে। তোমার ঘর আছে, সংসার আছে। সেই সুখের ভিড়ে আমার ঝাপসা হয়ে যাওয়া চেহারার স্মৃতি মনে না থাকাই তো স্বাভাবিক। আর সেটাই ভালো।"

​নীলিমার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। ধরা গলায় সে শুধাল, "তাহলে কি আর কোনোদিন মনে রাখব না? একদমই না?"

​অয়ন দরজার দিকে পা বাড়াল। চলে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসল। "দরকার নেই নীলিমা। কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়াই মুক্তির নামান্তর। তুমি সুখে থাকো, আমি সেটাই চেয়েছিলাম।"

​অয়ন বৃষ্টির শব্দে মিলিয়ে গেল। নীলিমা বুঝতে পারল, কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধু নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলোকিত করার জন্য। অয়ন ছিল সেই মরীচিকা, যে তাকে মরুভূমি পার করে সবুজ বনানীর খোঁজ দিয়ে নিজে হারিয়ে গেছে।

 

অপ্রাপ্তির মায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিলেন শফিক সাহেব। মেঘগুলো নিজের ইচ্ছেমতো ভেসে বেড়াচ্ছে, কেউ কাউকে জোর করে ধরে রাখছে না। অথচ মানুষের জীবনে এই সহজ সত্যটা মেনে নেওয়া কত কঠিন।

পাশের টেবিলে বসা তরুণ কলিগ সজীব আজ খুব অস্থির। ওর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা বিয়ে করতে রাজি নয়, আর সজীব চাইছে যেকোনো উপায়ে—পরিবারের চাপে হোক বা আবেগ দিয়ে—মেয়েটিকে রাজি করাতে। সজীবের এই ছটফটানি দেখে শফিক সাহেব মৃদু হেসে বললেন, "সজীব, এক গ্লাস জল যদি তুমি তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পাও, তবেই তার স্বাদ অনুভব করবে। আর যদি কারো মুখে জোর করে জল ঢেলে দাও, সে শুধু দমবন্ধ হয়ে আসার কষ্টই পাবে।"

সজীব অবাক হয়ে তাকালো। শফিক সাহেব ধীরস্থির কণ্ঠে নিজের জীবনের মূলমন্ত্র নিয়ে বলতে শুরু করলেন। "আমার জীবনের একটা বড় নীতি হলো—আমি কখনো কোনো কিছু জোর করে আদায় করতে চাইনি। সেটা পদোন্নতি হোক, কিংবা মানুষের ভালোবাসা। লোকে বলে আমি উচ্চাকাঙ্ক্ষী নই, কিন্তু আমি জানি, জবরদস্তিতে পাওয়া বিজয়ের মধ্যে এক ধরণের পরাজিত আত্মা লুকিয়ে থাকে। জোর করে পাওয়া সঙ্গ সৌন্দর্য হারায়, গভীরতা হারায়।"

তিনি বলতে থাকলেন, "একবার একটা বড় প্রজেক্টের দায়িত্ব আমার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখলাম, কর্তৃপক্ষ অন্য একজনকে সেই জায়গা দিতে চাইছে। আমি চাইলেই ওপর মহলে তদ্বির করতে পারতাম। কিন্তু আমি এক মুহূর্তের জন্যও তা করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যে চেয়ার আমার যোগ্যতার সম্মানে আমায় ডাকবে না, সেই চেয়ারে বসে আমি শান্তি পাব না। ঠিক একইভাবে, অনেক আগে একজনকে খুব ভালোবেসেছিলাম। সে যখন জানালো তার পথ অন্য দিকে, আমি তাকে আটকে রাখার জন্য কোনো নাটকীয়তা করিনি। কারণ আমি জানতাম, শরীর ধরে রাখা যায়, মন নয়।"

কথাগুলো শেষ করে শফিক সাহেব জানালার দিকে ফিরলেন। বাইরে তখন গোধূলির আলো নিভে আসছে, আকাশটা কেমন ঘোলাটে বেগুনী রঙ ধারণ করেছে। সজীব খেয়াল করল, শফিক সাহেবের ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত, ম্লান হাসি লেপ্টে আছে—যা ঠিক সুখের নয়, আবার বিষাদেরও নয়।

"সবাই মনে করে আমি হেরে গেছি, সজীব," শফিক সাহেব ফিসফিস করে বললেন, যেন নিজের সাথেই কথা বলছেন। "কিন্তু তারা জানে না, ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও একটা প্রচণ্ড ক্ষমতা থাকে। যে চলে যেতে চায়, তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে বিদায় করার পর যে নিঃশব্দ হাহাকার জন্মায়, তার চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আর নেই।"

সজীবের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে লক্ষ্য করল শফিক সাহেবের টেবিলের ওপর একটা পুরনো কাঁচের জার। তাতে কোনো প্রজাপতি নেই, কোনো ফুল নেই—শুধু একমুঠো ছাই।

শফিক সাহেব জারের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "তুমি জানো তো, জোর করে কাউকে আগলে রাখলে সে একটা সময় মরে যায়। কিন্তু তাকে যদি তুমি নিজের ইচ্ছায় মরতে দাও, তবে সে তোমার স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকে। আমি কাউকে পাইনি ঠিকই, কিন্তু কাউকে হারাইওনি। কারণ যা আমার ছিল না, তাকে হারানোর শোক আমার সাজে না।"

হঠাৎ অফিসের করিডোরের বাতিটা একবার জ্বলে উঠেই দপ করে নিভে গেল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই শফিক সাহেবের অবয়বটা কেমন ঝাপসা হয়ে এল। সজীবের মনে হলো, শফিক সাহেব যেন এই ঘরের কোনো রক্তমাংসের মানুষ নন, বরং বহু বছর ধরে জমে থাকা কোনো ত্যাগের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

শফিক সাহেব অন্ধকারেই ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলেন, "পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার রহস্য অনেক বেশি গভীর, সজীব। পূর্ণিমার চাঁদকে ছোঁয়া যায় না বলেই মানুষ আজও তার দিকে তাকিয়ে কবিতা লেখে। যেদিন মানুষ চাঁদকে হাতের মুঠোয় আনবে, সেদিন থেকে চাঁদ তার রূপ হারাবে। আদায়ের নেশা ছেড়ে দিতে শেখো, দেখবে জগতটা তোমার পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়েছে—ঠিক যেমন এই ছায়াগুলো এখন আমার পিছু নিয়েছে।"

শফিক সাহেব বেরিয়ে গেলেন। সজীব দেখল, করিডোরের টিমটিমে আলোয় শফিক সাহেবের কোনো ছায়া পড়ছে না। তিনি যেন অন্ধকারের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছেন। সজীব সেই শূন্য ঘরে একা দাঁড়িয়ে রইল, আর তার কানের কাছে বারবার বাজতে লাগল—“জোর করে পাওয়া সঙ্গ সৌন্দর্য হারায়, গভীরতা হারায়... আর যা হারায়, তা কোনোদিন ফিরে আসে না।”

 


 অপ্রাপ্তির মায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Tuesday, April 14, 2026

মানসী স্টুডিও -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

 "মানসী স্টুডিও"—হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের নস্টালজিয়া, না পাওয়া প্রেমের হাহাকার আর প্রযুক্তির বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির এক জীবন্ত দলিল।

 

উপন্যাসটি পড়তে বইয়ের নামের উপড় ক্লিক করুন-

মানসী স্টুডিও

 


 

মানসী স্টুডিও -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Thursday, April 9, 2026

'মানসী স্টুডিও' উপন্যাসের মূল কথা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

সময়টা ২০০০-এর দশকের শুরু। গ্রামবাংলার শান্ত জনপদে তখন প্রযুক্তির প্রথম ছোঁয়া লেগেছে। একদিকে এনালগ ক্যামেরার নেগেটিভ ধোলাই করার সেই ব্যাকুল অপেক্ষা, অন্যদিকে পকেটে নতুন আসা মোবাইল ফোনের এন্টেনা টেনে নেটওয়ার্ক খোঁজার রোমাঞ্চ।

শিবপুর বাজারের একমাত্র ছবি তোলার ঘর 'মানসী স্টুডিও'। এটি কেবল ছবি তোলার জায়গা ছিল না; এটি ছিল এক জোড়া তরুণ-তরুণীর অলিখিত অভয়ারণ্য। ডিগ্রি পড়ুয়া আরিফ আর একাদশ শ্রেণির চঞ্চল মেয়ে নীলা—তাদের প্রেমের সেতুবন্ধন হয়ে দাঁড়ায় একটি নোকিয়া ফোন আর রহমান মিঞার স্টুডিওর সেই অন্ধকার ডার্করুম।

কিন্তু প্রযুক্তির সিগন্যাল কি সবসময় হৃদয়ের টানে স্থির থাকে? সমাজ, পরিবার আর পরিস্থিতির ঝড়ে যখন সেই সিগন্যাল 'আউট অফ নেটওয়ার্ক' হয়ে যায়, তখন অবশিষ্ট থাকে কেবল এক টুকরো ঝাপসা ছবি আর একটি ভাঙা শাঁখা।

দশ বছর পর, যখন পৃথিবী বদলে গেছে, হাতে হাতে স্মার্টফোন আর হাই-স্পিড ইন্টারনেট—তখন সেই পুরনো ডার্করুমের ঝাপসা ছবিটা কি আজও হৃদয়ে রঙ ছড়ায়?

"মানসী স্টুডিও"—হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের নস্টালজিয়া, না পাওয়া প্রেমের হাহাকার আর প্রযুক্তির বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির এক জীবন্ত দলিল।


 মানসী স্টুডিও

মোঃ হেলাল উদ্দিন

'মানসী স্টুডিও' উপন্যাসের কিছু উক্তি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 "লোকে বলে সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সময় যেন এক নিষ্ঠুর লবণ, যা প্রতিদিন আমার ক্ষতটাকে আরও টাটকা করে তোলে। প্রতিটা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে আমি আজও নীলার নূপুরের রিনঝিন আওয়াজ পাই। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় আমি আজও সেই চেনা ঘ্রাণ খুঁজি, যা এক সময় মানসী স্টুডিওর সেই নীল পর্দার আড়ালে আমার অস্তিত্বকে অবশ করে দিত।"

 

“কিছু ঝড়ে শুধু গাছ ভাঙে না, ভেঙে যায় হৃদয়ের সেই সব সূক্ষ্ম তরঙ্গ—যা দিয়ে মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে।”

 

“পৃথিবীতে প্রতিদিন কোটি কোটি ছবি তোলা হয়, কিন্তু কিছু ছবি আছে যা শুধু সিলভার হ্যালাইডের কাগজে নয়, সরাসরি সময়ের বুকের ওপর খোদাই হয়ে যায়। 'মানসী স্টুডিও'র সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের ফ্ল্যাশটি ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে সাহসী আর সুন্দর মুহূর্ত।”

 


 মানসী স্টুডিও
মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Wednesday, April 8, 2026

"মানসী স্টুডিও" উপন্যাসে লেখকের কথা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

"মানসী স্টুডিও" কেবল একটি কাল্পনিক উপন্যাস নয়, এটি একটি সময়ের দলিল। বিংশ শতাব্দীর শেষ আর একবিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই উত্তাল দিনগুলো, যখন প্রযুক্তি আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছিল, সেই সময়টাকে ফ্রেমে বন্দি করার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস এই বই।

আমরা এমন এক প্রজন্মের সাক্ষী, যারা চিঠির যুগ থেকে সরাসরি স্মার্টফোনের যুগে প্রবেশ করেছি। আমাদের কৈশোর আর তারুণ্যের সন্ধিক্ষণে ছিল অ্যানালগ ক্যামেরার রিল আর এনালগ ফোনের সাদাকালো স্ক্রিন। সেই সময়ে একটি ছবি তোলার জন্য ডার্করুমের লাল আলোয় যে প্রতীক্ষা ছিল, কিংবা একটি প্রিয় মানুষের কণ্ঠ শোনার জন্য নেটওয়ার্কের পেছনে যে হাহাকার ছিল—তা আজকের এই 'ইনস্ট্যান্ট' যুগে কল্পনা করাও কঠিন।

শিবপুর বাজার বা মানসী স্টুডিও হয়তো একটি কাল্পনিক নাম, কিন্তু এর ভেতরের আবেগগুলো ধ্রুব সত্য। আরিফ আর নীলার এই গল্পটি আসলে সেই হাজারো নাম না জানা প্রেমিক যুগলের, যাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি ঠিকই, কিন্তু স্মৃতির গ্যালারিতে তারা আজও উজ্জ্বল। প্রযুক্তির বিবর্তনে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু ডার্করুমের সেই মায়া আর প্রতীক্ষার সেই গভীরতা বোধহয় চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি।

এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে আমি বারবার নিজের অজান্তেই সেই পুরনো দিনগুলোতে ফিরে গেছি। যারা সেই সময়টাকে যাপন করেছেন, আশা করি তারা বইটির পাতায় পাতায় নিজেদের খুঁজে পাবেন। আর যারা নতুন প্রজন্মের পাঠক, তারা হয়তো অনুভব করতে পারবেন কেন তখনকার প্রেমগুলো এত বেশি গভীর আর কাব্যিক ছিল।

পরিশেষে, যারা এই পাণ্ডুলিপিটি তৈরিতে এবং উৎসাহ দিয়ে পাশে ছিলেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। পাঠকদের হৃদয়ে 'মানসী স্টুডিও'র জন্য একটুখানি জায়গা হলে আমার এই শ্রম সার্থক হবে।

সবাই ভালো থাকুন, স্মৃতির ডার্করুমে ভালোবাসা বেঁচে থাকুক।

 

 

মোঃ হেলাল উদ্দিন

এপ্রিল, ২০২৬