Tuesday, August 25, 2026

জীবনের হিসাব: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বনাম বাস্তব জ্ঞান-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

'হিসাব'—খুব ছোট একটা শব্দ, কিন্তু জীবন চলার পথে এর গভীরতা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একটু চিন্তা করলেই আমরা এর ভয়াবহ প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে পারি। তবে আফসোসের বিষয় হলো, অনেক সময় এই উপলব্ধিটা আমাদের জীবনে বড্ড দেরিতে আসে। ততক্ষণে জীবনের অনেক মূল্যবান সময় পেরিয়ে যায় এবং বাস্তবতার কঠিন সমীকরণে জীবনের অনেক 'হিসাব' আর মিলানো সম্ভব হয় না।

আমরা অনেকেই সুকুমার রায়ের বিখ্যাত 'জীবনের হিসাব' কবিতাটি পড়েছি। সেই কবিতার পণ্ডিত মশাই এবং মাঝির কথোপকথন থেকে আমরা একটি বড় শিক্ষা পাই—কেবলমাত্র একাডেমিক বা পুঁথিগত শিক্ষাই জীবনের আসল শিক্ষা নয়। ডিগ্রির মোড়কে ঢাকা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আমাদের চাকরি বা পেশাগত জীবনে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু জীবনের জটিল ও কুটিল হিসাব মেলাতে তা অনেক সময়ই অপ্রতুল।

বাস্তব জীবনের কঠিন পরীক্ষাগুলোতে পাস করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও অনেক শিক্ষার প্রয়োজন আছে। এই শিক্ষা কোনো ক্লাসরুমে বা বইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না; বরং এটি অর্জন করতে হয় আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অভিজ্ঞতা, মানুষের সাথে মেলামেশা এবং চড়াই-উতরাই থেকে। একেই আমরা বলি 'বাস্তব জ্ঞান' বা 'জীবনমুখী শিক্ষা'।

যে ব্যক্তি এই বাস্তব শিক্ষাটা সঠিক সময়ে গ্রহণ করতে পারেন এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্কতার সাথে 'হিসাব' কষে চলতে পারেন, তাঁর জন্য জীবনের সব জটিল সমীকরণ সহজেই মিলে যায়। শুধু তাই নয়, সঠিক হিসাব ও পরিকল্পনা মেনে চলতে পারলে জীবনে খুব সহজেই সফলতা অর্জন করা যায় এবং সুখী হওয়া সম্ভব হয়।

পরিশেষে বলা যায়, আমাদের কর্ম, আচরণ এবং সিদ্ধান্তের সূক্ষ্ম হিসাবই নির্ধারণ করে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভালো থাকবে নাকি খারাপ হবে। তাই আসুন, পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি জীবনের বাস্তব পাঠশালা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করি, যেন শেষ বয়সে এসে আফসোস করতে না হয় যে, 'জীবনের কোনো হিসাবই মিলল না'।

 

জীবনের হিসাব

 -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

বৃষ্টিভেজা দিনে -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

আজ আকাশের মন খারাপ

নইলে রাঙা প্রভাতেই কেন এতো জল

মেঘ মাতাল আকাশ ভেঙ্গে

বৃষ্টির জলধারা আকাশের কান্না হলেও

আমাকে মনে করিয়ে দেয় তোমার কথা।

বৃষ্টিভেজা বাতাসে খুঁজে পাই

তোমার ভেজা চুলের পাগল করা ঘ্রাণ

এমন বৃষ্টিমুখর ক্ষণে 

তোমাকে বুকের মাঝে পেতে ইচ্ছে করে।

বৃষ্টি পদ্ম পাতার সাথে যেমন খেলা করে

ইচ্ছে করে তেমনি জলজ খেলা করি তুমি আমি

বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মতই 

তোমার চুড়ির শব্দ কানে বাজুক

তোমার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস দূর করে দিক

বৃষ্টিভেজা শীতল বাতাস

পরিতৃপ্ত করুক অবাধ্য মনের গোপন ইচ্ছা।

খোলা চুলে লাল টিপে শাড়ির আচঁলে বক্ষ জড়িয়ে

তুমি চলে এসো আমার কাছে।

এমন ইচ্ছের ক্ষণে কেন তুমি দূরে?

তুমি চলে এসো

চলে এসো আমার বক্ষ পিঞ্জরে

আমার ভালোবাসার ছোট ঘরে।।

 

বৃষ্টিভেজা দিনে 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন



অধরা ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 ______

ভালোবাস!

সত্যিই কি অধরা?

না কি শুধুই আমার কাছেই

চির অধরা।

_________

তারে ধরতে গেলে

যায় না ধরা,

কাছে যেতেই অনেক বাধা

এই কি তবে ভালোবাসা।

_______

ভালোবাসা

সত্যিই কি থেকে যাবে

আজও অধরা।

____________

©মোঃ হেলাল উদ্দিন®

 ০৫/০৪/২০১৬

শরতের মেঘ ও মায়াবী চোখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নিঝুম রাতের নীরবতা চিরে বারবার দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটাই ভেসে আসছে। তোহা ঘড়ির দিকে তাকাল—রাত তিনটে বাজে। বালিশে এপাশ-ওপাশ করে রাত পার করাটা ইদানিং তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। আর এই রাতজাগা অঘুমের একমাত্র নেপথ্য কারিগর—তুলি।

তুলির চোখের দিকে তাকানো আর আগুনে হাত দেওয়া একই কথা—এ সত্যটা তোহা ভালো করেই জানে। কিন্তু সেই চোখের মোহ এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার কখনোই ছিল না। সেদিন ক্যাম্পাসের করিডোরে যখন তুলি এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল, তখন তার ওই তীক্ষ্ণ, বিদ্ধ করা চাহনি তোহার বুকের ভেতরে কালবৈশাখী ঝড় তুলে দিয়েছিল। ও চোখে চোখ রাখা মানেই যে সর্বনাশের হাতছানি, তা জেনেও তোহা প্রতিবার সেই বিষাক্ত মায়ায় ডুবে যায়। নিজের বুকের ভেতরের অনিয়ন্ত্রিত, বেপরোয়া হৃদস্পন্দন আর ব্যাকুল অস্থিরতাকেই সে ভালোবেসে ফেলেছে।

টেবিলের ওপর হালকা আলোয় তুলির ডায়েরির ফাঁকে লুকিয়ে রাখা স্কেচ খাতাটা খুলে বসল তোহা। খাতার পাতায় তুলির সেই অপার্থিব মায়াবী চোখ জোড়া আঁকা। রাত যতই গভীর হয়, ওই চাহনির মায়াজাল যেন ঘর জুড়ে আরও বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।

দিন পেরিয়ে শহরের বুকে তখন শরতের স্নিগ্ধ আগমন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শিউলি ফোটার দিনগুলোতে তোহা আর তুলির সম্পর্কের সমীকরণটা যেন এক অব্যাখ্যনীয় মায়ায় জড়িয়ে থাকে। ওরা দুজন দূরের নক্ষত্রের মতো—কাছাকাছি আসার অনুমতি নেই, অথচ অদৃশ্য এক টান দুজনকে বেঁধে রাখে একই সুতোয়।

এক নির্জন শরতের বিকেলে ক্লাসের কোলাহল শেষে তোহা আর তুলি পাশাপাশি হাঁটছিল। চারপাশে শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস ছড়ানো, আর মাথার ওপর শরতের আকাশ জুড়ে জমাট বেঁধেছে শুভ্র ও কালো মেঘের আলপনা। দিন ফুরিয়ে আসার গোধূলির নরম আলো এসে পড়েছে তুলির চোখে।

তোহা থমকে দাঁড়াল। নীল আকাশের নির্জন বুকের নিচে, নীরবতার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তোহা তুলির চোখে রেখে দিল তার সমস্ত না-বলা কথা। মুখে ফুটে কিছু বলা হলো না, কিন্তু চোখের ভাষাতেই যেন জমা হলো জমে থাকা সব আবেগ।

তোহা গভীরভাবে অনুভব করল—জীবন তো শেষ পর্যন্ত কিছু অমূল্য স্মৃতি আর দীর্ঘ অপেক্ষার সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। শরতের মেঘের মতো তাদের ভালোবাসার গল্পেও হয়তো কখনো আলোর শুভ্রতা আসবে, কখনো নামবে না-পাওয়ার কালো ছায়া; তবুও তারা একই আকাশের নিচে বেঁচে থাকবে। এই ঘুমহীন রাত, স্কেচ খাতার মায়াবী চোখ আর শিউলিঝরা বিকেলে গোধূলির নীরবতাই তোহা আর তুলির অপ্রকাশিত ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।

শরতের মেঘ ও মায়াবী চোখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Monday, August 24, 2026

শরতের সেই মায়াবী চোখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

শরতের বিকেলটা এমনিতেই অন্যরকম।

আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে হালকা শীতের আগমনী বার্তা, দূরের মাঠজুড়ে কাশফুলের দোলা। ঈশ্বরদী শহরের ব্যস্ততার মাঝেও সেদিন বিকেলটা যেন অদ্ভুত এক নীরবতায় মোড়া ছিল।

ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল হিমেল।

হিমেল বহু বছর ধরে এই শহরে থাকে। প্রতিদিন কতবার যে এই কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করেছে, তার হিসাব নেই। অথচ সেদিনের আগে কখনো কলেজের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা হয়নি তার।

কেন যেন সেদিন দাঁড়িয়েছিল।

হয়তো কোনো অজানা গল্পের শুরুতেই মানুষকে কোথাও দাঁড় করিয়ে দেয় নিয়তি।

হিমেল অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল কলেজের মূল ফটকের দিকে।

এক তরুণী ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।

দুধে-আলতা মেশানো গায়ের রং। পরনে কাশফুলের মতো শুভ্রতার সঙ্গে হালকা নকশার শাড়ি। কোমর ছুঁয়ে নামা এলোমেলো চুল। আর সেই চোখ—

হিমেল জীবনে অনেক সুন্দর চোখ দেখেছে। কিন্তু এমন চোখ কখনো দেখেনি।

এক পলক দেখেই তার মনে হলো, তামিল কোনো সিনেমার নায়িকা বুঝি শুটিং করতে এসে ভুল করে এই ছোট্ট শহরের কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে গেছে।

মেয়েটি একবার তাকিয়েছিল।

শুধু একবার।

কিন্তু সেই একবারেই হিমেলের পৃথিবী যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

হিমেল তাকিয়েই রইল।

চোখের নেশা কাটিয়ে যখন নিজের চারপাশে ফিরে এল, তখন মেয়েটি আর নেই।

গেটের ভিড়ের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

হিমেল কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিজের মনেই বলল,

— কে মেয়েটা?

সেদিন রাতে ঘুম এলো না।

একটি অচেনা মুখ, অথচ চেনা চেনা এক জোড়া চোখ বারবার মনে পড়তে লাগল।

পরদিন হিমেল খোঁজ শুরু করল।

জানতে পারল, মেয়েটি এই কলেজের ছাত্রী নয়। গ্রামের একটি কলেজে পড়ে। পরীক্ষা দিতে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে এসেছিল।

ব্যস, এতটুকুই।

নাম জানা হলো না।

বাড়ি কোথায় জানা হলো না।

কোন গ্রামের মেয়ে, তাও জানা হলো না।

তবু হিমেলের মনে হলো, সে মেয়েটিকে আবার দেখবেই।

দিন গেল।

পরীক্ষা শেষ হলো।

মেয়েটি আর এল না।

হিমেলও তার খোঁজ পেল না।

কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। যুক্তি যেখানে বলে, ‘ভুলে যাও’, মন সেখানে বলে, ‘অপেক্ষা করো।’

হিমেল অপেক্ষা করতে শুরু করল।

প্রতিদিন বিকেল নামলেই সে কলেজ গেটের কাছে এসে দাঁড়াত। কখনো দশ মিনিট, কখনো আধঘণ্টা। কোনো দিন এক ঘণ্টাও কেটে যেত।

কেউ জানত না সে কীসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।

বন্ধুরা হাসত।

— কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে কী করিস?

হিমেল হেসে বলত,

— এমনিই।

কিন্তু সে জানত, ‘এমনিই’ নয়।

সে অপেক্ষা করছিল সেই মায়াবী চোখের জন্য।

এভাবে কেটে গেল প্রায় এক বছর।

এক বছর পর আবার শরৎ এলো।

আবার আকাশে সাদা মেঘ।

আবার বাতাসে কাশফুলের গন্ধ।

আবার সেই কলেজের গেট।

সেদিনও হিমেল দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ—

চোখ দুটো যেন বিশ্বাস করতে চাইল না।

সামনে সেই মেয়েটি।

একই মায়াবী চোখ।

হিমেলের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।

সে মনে মনে বলল,

‘এবার যদি হারিয়ে যায়?’

কিছুক্ষণ দ্বিধা করে অবশেষে সাহস সঞ্চয় করল।

মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

— একটু শুনবেন?

মেয়েটি থেমে তাকাল।

সেই চোখ।

এক বছর ধরে যে চোখের অপেক্ষায় ছিল হিমেল, আজ সেই চোখ তার সামনে।

মেয়েটি মৃদুস্বরে বলল,

— জি?

হিমেল কিছুক্ষণ কথা খুঁজে পেল না।

শেষ পর্যন্ত বলল,

— আপনার নামটা জানতে পারি?

মেয়েটি একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

— সাথী।

একটি নাম।

মাত্র দুটি অক্ষরের মতো ছোট্ট একটি পরিচয়।

কিন্তু হিমেলের কাছে সেদিন মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দটি বুঝি ‘সাথী’।

সেদিন খুব বেশি কথা হয়নি।

সাথী জানাল, পরীক্ষার জন্য সে শহরে একা থাকছে।

হিমেল শুধু বলল,

— আপনাকে এক বছর আগে দেখেছিলাম।

সাথী অবাক হয়ে বলল,

— এক বছর আগে?

— জি। এই কলেজ গেটে।

— তারপর?

হিমেল একটু হেসে বলল,

— তারপর আপনাকে খুঁজেছি।

সাথী কিছু বলল না।

শুধু চোখের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।

সেদিন বিদায়ের সময় দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ।

তারপর সাথী চলে গেল।

কিন্তু এবার আর সে হারিয়ে গেল না।

কয়েক দিন পর আবার দেখা হলো।

তারপর ফোন নম্বর নেওয়া হলো।

ফেসবুকে বন্ধুত্ব হলো।

আর ধীরে ধীরে অচেনা দুজন মানুষ পরিচিত হতে শুরু করল।

সকালের ‘কেমন আছেন?’ থেকে রাতের ‘ঘুমাবেন না?’—কথার পরিধি বাড়তে লাগল।

সাথী জানল হিমেলের পছন্দের বইয়ের কথা।

হিমেল জানল সাথী বৃষ্টি ভালোবাসে।

সাথী জানল হিমেল চা ছাড়া সকাল শুরু করতে পারে না।

হিমেল জানল, সাথী মন খারাপ করলে খুব চুপ হয়ে যায়।

তারা নিজেদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, অভিমান, স্বপ্ন—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে লাগল।

কখন যে কথার ফাঁকে ফাঁকে ভালোবাসা ঢুকে পড়েছিল, তারা কেউ জানল না।

কেউ কাউকে ‘ভালোবাসি’ বলেনি।

তবু তারা দুজনেই বুঝে গিয়েছিল—

ভালোবাসা সবসময় মুখে বলতে হয় না।

কখনো কখনো ভালোবাসা মানুষের অপেক্ষায় থাকে।

কখনো একটি ফোনকলের ওপাশে থাকে।

কখনো ‘খেয়েছ?’ প্রশ্নটির ভেতরে লুকিয়ে থাকে।

আর কখনো একটি মায়াবী চোখের মধ্যে সারাজীবনের জন্য ঘর বানিয়ে নেয়।

একদিন সাথী হঠাৎ বলেছিল,

— হিমেল, আমাদের এই সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

হিমেল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,

— যেখানে তুমি থাকবে, আমি সেখানেই থাকতে চাই।

সাথী মৃদু হেসেছিল।

— কথাটা খুব সহজে বললে।

— কারণ সত্যি কথাগুলো বলতে বেশি ভাবতে হয় না।

তারপর একদিন হিমেল নিজের পরিবারের কাছে সবকিছু জানাল।

হিমেল সরকারি চাকরিজীবী। ভালো পরিবার। সুনাম আছে।

অন্যদিকে সাথীর বাবাও গ্রামের সম্মানিত মানুষ। পরিবারে ঐতিহ্য ও সামাজিক মর্যাদা আছে।

দুই পরিবারের মধ্যে কথা হলো।

প্রথমে সাথীর বাবা-মা হিমেলকে দেখলেন।

তারপর হিমেলের পরিবার দেখল সাথীকে।

দুই পরিবারের সম্মতিতে সম্পর্কটি পেল নতুন একটি নাম।

বিয়ে।

তারিখ ঠিক হলো শরতের এক দিনে।

যে শরতে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।

বিয়ের দিন সকাল থেকেই আকাশে সাদা মেঘ।

দূরের মাঠে কাশফুল দুলছে।

সন্ধ্যায় হিমেল যখন সাথীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তার মনে হলো—এক বছর আগের সেই বিকেলটা আবার ফিরে এসেছে।

সেই চোখ।

সেই মুখ।

সেই মায়া।

শুধু আজ আর মেয়েটি অচেনা নয়।

আজ সে তার জীবনের মানুষ।

হিমেল মৃদুস্বরে বলল,

— জানো, তোমাকে প্রথম দেখার দিন আমি ভাবিনি তুমি কোনোদিন আমার হবে।

সাথী হাসল।

— আমিও ভাবিনি, কলেজের একটা গেট আমার জীবনের গল্প বদলে দেবে।

হিমেল বলল,

— তোমাকে খুঁজতে গিয়ে বুঝেছিলাম, কিছু মানুষকে পাওয়ার আগে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

সাথী নিচু চোখে বলল,

— আর আমি বুঝেছিলাম, কেউ একজন সত্যিই এক বছর ধরে অপেক্ষা করতে পারে।

বাইরে তখন শরতের বাতাস।

দূরে কাশফুলের সারি।

আকাশে জ্যোৎস্নার আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।

হিমেল সাথীর হাতটা আলতো করে ধরল।

মনে হলো, এক বছর আগে যে গল্পটি একটি মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে শুরু হয়েছিল, আজ সেই গল্প পূর্ণতা পেল।

হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক—

কখনো কখনো মানুষকে ভালোবাসতে শুরু করার জন্য কোনো ঘোষণা লাগে না।

লাগে শুধু এক পলক দেখা।

একটু অপেক্ষা।

কিছু অকারণ কথা।

আর একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলব—এই ভয়।

হিমেল হারায়নি।

সাথীও হারায়নি।

বরং শরতের সেই বিকেলে যে দুটি চোখ একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত একে অপরের জীবনের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেল।


Friday, August 14, 2026

নিশিরাতের কাব্য -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

একটা সময় ছিল, তাওসিফ আর তাসফিয়ার গল্প যেন শেষই হতে চাইত না। দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে রাত নামত, শহর ঘুমিয়ে পড়ত, জানালার ওপাশে চাঁদ তার জায়গা বদলাত—কিন্তু তাদের কথা ফুরাত না।

কখনো খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে শুরু হতো গল্প, আর কখন যে সেই গল্প জীবনের গভীর কোনো অনুভূতিতে গিয়ে পৌঁছাত, তারা নিজেরাও বুঝতে পারত না। অভিমান, স্বপ্ন, ভয়, ভবিষ্যৎ—সবকিছুই তারা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিত।

কিন্তু ইদানীং কেমন যেন বদলে গেছে সব।

কথা হয়, তবে আগের মতো নয়। হুটহাট দু-চারটা কথা, তারপর নীরবতা। কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না—কী হয়েছে? কেন এমন হলো?

অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো অভিযোগও নেই। দূরত্বটা যেন কোনো এক অদৃশ্য সন্ধ্যায় এসে তাদের মাঝখানে বসে পড়েছে।

তাওসিফ মাঝে মাঝে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাসফিয়ার নামটা অনলাইনে দেখলেও মেসেজ লিখতে পারে না। আবার তাসফিয়াও হয়তো একইভাবে অপেক্ষা করে—কিন্তু কেউই প্রথম কথাটা শুরু করতে পারে না।

শ্রাবণের এক বৃষ্টিস্নাত বিকেল।

আকাশটা সকাল থেকেই মেঘে ঢাকা। বিকেলের দিকে হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি। জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ পানি নামছে। তাওসিফ চুপচাপ বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।

তাসফিয়ার মেসেজ।

“আজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম।”

একটা ছোট্ট বাক্য।

কিন্তু তাওসিফের কাছে যেন বহুদিনের নীরবতার দরজা হঠাৎ খুলে গেল।

সে কয়েক সেকেন্ড মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“কী দেখেছ?”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

“বলব না।”

“কেন?”

“বললে তুমি খুব বেশি খুশি হয়ে যাবে।”

তাওসিফ হেসে লিখল—

“তাহলে তো আরও শুনতে ইচ্ছে করছে।”

তারপর শুরু হলো সেই পুরোনো গল্প।

একটা মেসেজ থেকে আরেকটা মেসেজ। হাসি, অভিমান, পুরোনো স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া কথাগুলো—সব যেন একে একে ফিরে আসতে লাগল।

রাত কখন গভীর হয়ে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি।

বিদায় নেওয়ার আগে তাসফিয়া লিখল—

“আজ অনেকদিন পর ভালো লাগল কথা বলে।”

তাওসিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল—

“আমারও।”

আরও কিছু বলতে চেয়েও সে থেমে গেল।

কখনো কখনো কিছু অনুভূতি শব্দে বললে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।


মাঝরাত।

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি।

টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন একটানা কোনো অচেনা কবিতা লিখে চলেছে। দূরে কোথাও মেঘ ডাকছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকে অন্ধকার ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠছে।

তাওসিফ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।

হঠাৎ তার মনে হলো—তাসফিয়া যদি এখন পাশে থাকত!

ভাবনাটা আসতেই সে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।

তারপর কল্পনার ভেতর ধীরে ধীরে তৈরি হলো অন্য এক পৃথিবী।

তাসফিয়া পরেছে নীল শাড়ি।

বৃষ্টিভেজা চুল কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। চোখে সেই চিরচেনা মায়া।

তাওসিফ তার পাশে হাঁটছে।

শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে তারা দুজন গিয়ে বসেছে রাস্তার ধারের ছোট্ট এক টং দোকানে। চারপাশে বৃষ্টি। দোকানের টিনের চাল থেকে ধারার মতো পানি পড়ছে।

দোকানদার দুটো ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।

তাসফিয়া কাপ হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বলল,

—“জানো, বৃষ্টিতে চা খাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ আছে।”

তাওসিফ তাকিয়ে বলল,

—“তোমার সঙ্গে হলে সবকিছুরই আলাদা আনন্দ।”

তাসফিয়া চোখ নামিয়ে নিল।

বৃষ্টির শব্দের আড়ালে লুকিয়ে গেল তার লাজুক হাসি।

চা শেষ হলো।

কিন্তু বৃষ্টি থামল না।

বরং আরও বেড়ে গেল।

ফিরতে গিয়ে দুজনই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর তাসফিয়া হঠাৎ বলল,

—“এভাবে গেলে তো পুরো ভিজে যাব।”

তাওসিফ চারপাশে তাকিয়ে দূরে একটা ছোট্ট কুড়েঘর দেখতে পেল।

—“ওখানে একটু আশ্রয় নিই?”

তাসফিয়া মাথা নাড়ল।

দুজন ছুটে গিয়ে কুড়েঘরটার নিচে দাঁড়াল।

বাইরে তখন শ্রাবণের উন্মত্ত বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, দূরে মেঘের গর্জন আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো—সব মিলিয়ে পৃথিবীটা যেন হঠাৎ তাদের দুজনের জন্য থেমে গেছে।

তাসফিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

তাওসিফ তাকিয়ে ছিল তার দিকে।

কথা ছিল অনেক।

কিন্তু কোনো কথাই মুখে আসছিল না।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

সেই চোখে ছিল বহুদিনের জমে থাকা প্রশ্ন, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা আর না-বলা ভালোবাসা।

তাসফিয়া ধীরে ধীরে বলল,

—“আমাদের এত দূরত্ব কেন হলো, তাওসিফ?”

তাওসিফ মৃদুস্বরে বলল,

—“জানি না।”

—“আমরা তো কোনোদিন ঝগড়াই করিনি।”

—“তবু দূরে চলে গিয়েছিলাম।”

—“আবার কি কাছে আসা যায়?”

তাওসিফ কোনো উত্তর দিল না।

শুধু তাসফিয়ার হাতটা আলতো করে ধরল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি।

মেঘ ডাকছে।

আর সেই শব্দের আড়ালে দুজন মানুষের দীর্ঘদিনের নীরবতা ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে।

তাসফিয়া মাথাটা তাওসিফের কাঁধে রাখল।

তাওসিফ তাকে আরও কাছে টেনে নিল।

সেই মুহূর্তে কোনো প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন ছিল না, কোনো বড় বড় কথা প্রয়োজন ছিল না।

শুধু অনুভব করাই যথেষ্ট ছিল—তারা এখনও একে অপরের কাছে অচেনা হয়ে যায়নি।

চোখে চোখে জমে থাকা কথাগুলো ধীরে ধীরে নীরবতায় মিশে গেল।

তাদের ঠোঁটে ফুটে উঠল বহুদিনের গোপন ভালোবাসার এক কোমল স্বীকারোক্তি।

বাইরে শ্রাবণের বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে নামল।

মনে হলো, আকাশও বুঝি তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প জানে।


হঠাৎ তাওসিফের ঘুম ভেঙে গেল।

জানালার বাইরে সত্যিই বৃষ্টি হচ্ছে।

ঘরটা অন্ধকার।

ফোনটা পাশে পড়ে আছে।

সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল।

স্বপ্নটা এতটাই বাস্তব ছিল যে তার বুকের ভেতর এখনও তাসফিয়ার উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে।

সে ফোনটা হাতে নিল।

স্ক্রিনে তাসফিয়ার নাম।

কিছুক্ষণ দ্বিধা করে একটি মেসেজ লিখল—

“তুমি যে স্বপ্নের কথা বলেছিলে, আজ আমিও তোমাকে একটা স্বপ্নে দেখলাম।”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এল—

“কী দেখেছ?”

তাওসিফ জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর লিখল—

“বলব না। বললে তুমি খুব বেশি খুশি হয়ে যাবে।”

ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল—

“তাহলে আজ রাতটা আবার গল্প করেই কাটাই।”

তাওসিফের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

বাইরে তখনও শ্রাবণের বৃষ্টি।

আর গভীর নিশিরাতে, দুই প্রান্তের দুটি মানুষ আবার ফিরে গেল সেই পুরোনো কথার পৃথিবীতে—যেখানে রাত ফুরিয়ে যায়, কিন্তু গল্প ফুরোয় না।

হয়তো কিছু সম্পর্ক কখনো হারিয়ে যায় না।

শুধু কিছুদিন নীরব হয়ে থাকে।

একটা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা, একটা স্বপ্ন কিংবা একটি ছোট্ট মেসেজ—

“আজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম।”

আবার তাদের ফিরিয়ে দিতে পারে সেই অসমাপ্ত কাব্যের কাছে।

সেই কাব্যের নাম—

নিশিরাতের কাব্য।



নিশিরাতের কাব্য -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Friday, July 24, 2026

"নিজেকে জানো"— সক্রেটিসের অমিয় বাণী এবং আত্ম-অন্বেষণের দর্শন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নিজেকে জানার যাত্রাই মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন। কারণ যে ব্যক্তি নিজেকে জানতে শেখে, সে-ই পৃথিবীকে সঠিকভাবে বুঝতে শেখে; আর যে নিজেকে জয় করতে পারে, তার কাছে বাহ্যিক জয় আর কঠিন থাকে না।

 

"Know Thyself"— "নিজেকে জানো"— মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ আহ্বানগুলোর একটি। এই বাণীটি গ্রিসের ডেলফির অ্যাপোলোর মন্দিরে উৎকীর্ণ ছিল, আর দার্শনিক সক্রেটিস এটিকে মানুষের জীবনদর্শনের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যে মানুষ নিজেকে জানে না, সে প্রকৃত অর্থে পৃথিবী, মানুষ কিংবা জীবনকেও জানতে পারে না।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমি কি নিজেকে সত্যিই জানতে পেরেছি?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো "হ্যাঁ" বা "না" দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ নিজেকে জানা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়; এটি একটি আজীবনের যাত্রা। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে।


আমি কতটুকু নিজেকে জানতে পেরেছি?

আমরা অধিকাংশ সময় অন্যদের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হই, কিন্তু নিজের মন, চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা কিংবা দুর্বলতাকে জানার জন্য খুব কম সময় ব্যয় করি।

নিজেকে জানতে পারা মানে হলো—

  • আমি আসলে কে?

  • আমার মূল্যবোধ কী?

  • আমার শক্তি ও দুর্বলতা কোথায়?

  • আমি কী চাই এবং কেন চাই?

  • কোন বিষয় আমাকে আনন্দ দেয়, কোন বিষয় আমাকে কষ্ট দেয়?

  • আমি কীসের জন্য বেঁচে থাকতে চাই?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না। বরং প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমাদের উত্তরকে আরও পরিণত করে।


কেন নিজেকে জানা জরুরি?

যে ব্যক্তি নিজেকে চেনে না, সে অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলে।

অন্যদিকে, যে ব্যক্তি নিজেকে জানে—

  • সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ় হয়।

  • আত্মবিশ্বাসী হয়।

  • অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয় না।

  • নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে উন্নতির চেষ্টা করে।

  • জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করে।

নিজেকে জানা মানে অহংকার করা নয়; বরং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস অর্জন করা।


নিজেকে জানার জন্য কী কী করা দরকার?

১. প্রতিদিন আত্মসমালোচনা করা

দিনের শেষে নিজেকে প্রশ্ন করুন—

  • আজ আমি কী ভালো করেছি?

  • কোথায় ভুল করেছি?

  • আগামীকাল কীভাবে আরও ভালো হতে পারি?


২. নিজের শক্তি ও দুর্বলতার তালিকা তৈরি করা

নিজের ভালো দিকগুলো যেমন জানা জরুরি, তেমনি দুর্বলতাগুলোও স্বীকার করা দরকার।

যে ব্যক্তি নিজের দুর্বলতা জানে, সে-ই উন্নতির পথে এগোতে পারে।


৩. নির্জনে কিছু সময় কাটানো

নিঃশব্দে নিজের সঙ্গে সময় কাটান।

মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা কোলাহল থেকে দূরে থেকে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনুন।


৪. ডায়েরি লেখা

প্রতিদিনের অনুভূতি লিখে রাখুন।

লেখা মানুষকে নিজের মনের গভীরে পৌঁছাতে সাহায্য করে।


৫. পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চা

দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মীয় গ্রন্থ মানুষকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভাবতে শেখায়।

জ্ঞান আত্মপরিচয়ের দরজা খুলে দেয়।


৬. সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করা

সব সমালোচনা ভুল নয়।

কখনো কখনো অন্যের চোখে নিজের যে প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, তা আমাদের অজানা সত্যকে প্রকাশ করে।


৭. ধ্যান ও মননচর্চা

ধ্যান মনকে স্থির করে।

স্থির মনই নিজের প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করতে পারে।


৮. জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা

যার জীবনের লক্ষ্য নেই, সে নিজেকেও পুরোপুরি জানতে পারে না।

লক্ষ্য মানুষকে নিজের সামর্থ্য চিনতে শেখায়।


৯. ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া

ব্যর্থতা কোনো পরাজয় নয়।

প্রতিটি ভুল নিজের অজানা একটি দিককে সামনে নিয়ে আসে।


১০. মানুষের সেবায় নিজেকে যুক্ত করা

মানুষের কল্যাণে কাজ করলে নিজের মানবিক সত্তার পরিচয় স্পষ্ট হয়।

সেবা মানুষকে নিজের প্রকৃত মহত্ত্ব উপলব্ধি করতে শেখায়।


আত্মজ্ঞান অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা

  • অহংকার

  • আত্মপ্রবঞ্চনা

  • অন্যের সঙ্গে অযথা তুলনা

  • সামাজিক স্বীকৃতির অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা

  • নিজের ভুল স্বীকার না করা

  • আত্মসমালোচনার অভাব


আত্মজ্ঞান কি কখনো সম্পূর্ণ হয়?

সম্ভবত না।

মানুষ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়।

তাই নিজেকে জানাও একটি চলমান প্রক্রিয়া।

আজ যে মানুষটিকে আমি চিনি, পাঁচ বছর পরে সে আরও পরিণত, আরও অভিজ্ঞ এবং আরও গভীর হতে পারে।


উপসংহার

সক্রেটিসের "নিজেকে জানো" কেবল একটি দার্শনিক বাণী নয়; এটি একটি জীবনব্যাপী সাধনা। আমরা হয়তো কখনোই সম্পূর্ণভাবে নিজেকে জানতে পারব না, কিন্তু প্রতিদিনের আত্মসমালোচনা, জ্ঞানচর্চা, সততা, ধ্যান, মানবসেবা এবং ভুল থেকে শেখার মাধ্যমে নিজের প্রকৃত সত্তার আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারি।

 

"নিজেকে জানো"— সক্রেটিসের অমিয় বাণী এবং আত্ম-অন্বেষণের দর্শন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Saturday, July 11, 2026

অনামিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 অনামিকা  বইটি ডাউনলোড করতে/ পড়তে নিচে লেখা বইয়ের নামের উপর ক্লিক করুন এবং বইটি ফ্রি ডাউনলোড করুন- 

 

অনামিকা 

 

মানুষের জীবন মূলত অনুভূতির এক অনন্ত যাত্রা। এই যাত্রাপথে ভালোবাসা, মায়া, স্বপ্ন, অপেক্ষা, প্রাপ্তি, বেদনা, স্মৃতি ও আত্মঅন্বেষণ পরস্পরের সঙ্গে মিশে জীবনের এক বহুরঙা ক্যানভাস নির্মাণ করে। কবিতা সেই ক্যানভাসেরই শব্দরূপ—যেখানে ভাষা শুধু প্রকাশের মাধ্যম নয়, অনুভূতিরও আশ্রয়।

এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো কোনো কল্পলোকের নির্মিত গল্প নয়; বরং জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করার আন্তরিক প্রয়াস। কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতির আলো-ছায়া, কখনো চারপাশের মানুষের জীবন, কখনো সময়ের নির্মম বাস্তবতা, আবার কখনো ভালোবাসার নীরব অথচ গভীর স্পন্দন— এসবই বিভিন্ন কবিতায় নানা রূপে প্রতিফলিত হয়েছে।

গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা স্বতন্ত্র হলেও, অন্তর্নিহিত সুর একটিই—মানুষ এবং তার হৃদয়ের গল্প। ‘ভালোবাসার প্রকাশ’, ‘মায়াবিনী’, ‘তুমি আমার কবিতা’, ‘ভালোবাসার গল্প’, ‘জীবন’, ‘জীবনের স্বপ্ন ও বাস্তবতা’ সহ প্রতিটি কবিতাই পাঠককে অনুভূতির ভিন্ন ভিন্ন স্তরে নিয়ে যাবে। কোথাও প্রেমের কোমলতা, কোথাও বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস, কোথাও সময়ের গভীর দর্শন, আবার কোথাও আত্মপরিচয়ের নিরন্তর অনুসন্ধান—এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাই কাব্যগ্রন্থটির মূল সুর।

আমি বিশ্বাস করি, কবিতা কেবল অলংকারমণ্ডিত শব্দের সমাহার নয়; এটি মানুষের আত্মার ভাষা। একটি কবিতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা পাঠকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে নতুন অর্থ সৃষ্টি করে। সেই বিশ্বাস থেকেই এই কাব্যগ্রন্থ পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার সাহস করেছি।

এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা পাঠকের হৃদয়ে সামান্য হলেও যদি চিন্তার আলো জ্বালাতে পারে, কোনো বিস্মৃত স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে, কিংবা ভালোবাসা ও জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার অনুপ্রেরণা দেয়—তবেই এই প্রয়াস সার্থক বলে মনে করব।

যাঁরা কবিতার ভেতরে নিজেদের খুঁজে নিতে ভালোবাসেন, অনুভূতির সূক্ষ্মতম কম্পনকে শব্দের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে চান, তাঁদের প্রতি এই কাব্যগ্রন্থ সশ্রদ্ধ নিবেদন।

 

মোঃ হেলাল উদ্দিন
শিক্ষক | লেখক | গবেষক

 


 

This summary provides an overview of the poetry collection Onamika by Md. Helal Uddin. Book Overview

  • Title: Onamika
  • Author: Md. Helal Uddin
  • Publisher: Gyanbangla Prokash
  • Publication Date: July, 2026
  • ISBN: 978-984-35-9507-2
  • Price: 200 Taka
Content Summary
  • Dedication: The book is dedicated to the author's wife, Saiyadatusnesa Tania, described as his "manoskanya" (muse) and the inspiration behind the poems.
  • Themes: The collection explores a wide range of human emotions, including love, dreams, anticipation, loss, memories, and self-discovery. The author describes poetry not merely as a collection of decorative words, but as the language of the soul that reflects the joys and realities of life.
  • Structure: The book contains numerous poems, including titles such as "Valobashar Prokash," "Mayabini," "Onamika," "Tumi Amar Kobita," "Jibon," and "Jiboner Swapno O Bastobota".
Author Profile
  • Background: Md. Helal Uddin is a teacher, author, and researcher. Born in 1990 in Bakerganj, Barishal, he holds a master's degree in Political Science from the University of Dhaka and is currently a member of the BCS General Education cadre.
  • Other Works: His previous publications include books on social research methods, the constitution, and various poetry and story collections like Ami Kobi Hote Chai, Madhabilota, Abodho, and Manosi Studio.
  • Vision: He aims to contribute to a knowledge-based society through his writing and hopes to open new horizons of thought for his readers.
 

Tuesday, July 7, 2026

আমার জন্ম ও শৈশবের দিনলিপি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


অফিসিয়াল সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমার জন্ম ১৯৯০ সালের ১লা জানুয়ারি। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে পৃথিবীর আলো দেখার একটা অন্যরকম আনন্দ আছে কাগজে-কলমে, তবে আমার জন্মের আসল সময়টা লুকিয়ে আছে মায়ের স্মৃতির ধূসর পাতায়। মায়ের ভাষ্য মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর বছর (১৯৮১ সাল) আমার বড় ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল। তার দীর্ঘ আট বছর পর এই পৃথিবীতে আমার আগমন। মাঝে মেজ ভাইয়ের জন্ম। সেই হিসেবে আমার জন্মের প্রকৃত সালটি সম্ভবত ১৯৮৯ সালের শেষের দিককার কোনো এক সময়। তবে দিনক্ষণ বা সালের এই দোলাচল ছাপিয়ে আমার অস্তিত্বের আসল সত্যটি জড়িয়ে আছে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার রামনগর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সাথে।

আজকের আধুনিক যুগের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আর চাকচিক্যের সাথে সেদিনের রামনগর গ্রামের কোনো মিল ছিল না। আমাদের শৈশবে সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, ছিল না কোনো পাকা রাস্তা। পিচঢালা পথের চাদরহীন সেই মেঠো পথেই কেটেছে আমার শুরুর দিনগুলো। সূর্যাস্তের পর যখন চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যেত, তখন আমাদের রাত্রিবেলা পার হতো কুপি কিংবা হারিকেনের টিমটিমে আলোয়। সেই মৃদু আলোর নিচে বসেই চলত আমাদের পড়ালেখা। আর গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন শরীর জুড়িয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতো, তখন যান্ত্রিক এসি বা বৈদ্যুতিক পাখা ছিল কল্পনার অতীত; তালপাতার পাখা আর প্রকৃতির অকৃপণ বাতাসই ছিল একটুখানি স্বস্তি ও ঠাণ্ডা পাওয়ার একমাত্র ভরসা।

আমাদের বংশের ইতিহাস নিয়ে গ্রামের লোকমুখে একটি প্রচলিত কথা আছে। আমার দাদার বাবা, সোনামদ্দি সাহেবের নাকি এককালে অঢেল জমিজমা ছিল। কিন্তু সময়ের আবর্তে আমার বাবা কিংবা চাচারা সেই বৈভব ধরে রাখতে পারেননি। এর পেছনে অবশ্য এক বেদনাদায়ক ইতিহাস আছে। আমার দাদা জয়েনউদ্দিন সাহেব ছিলেন ভীষণ সহজ-সরল ও নিরহংকার একজন মানুষ। তার ওপর, বাবার বয়স যখন মাত্র বছর দশেক, ঠিক তখনই দাদা মারা যান। এত কম বয়সে পিতৃহীন হওয়ায় সংসারের গুরুভার এসে পড়ে বাবার কাঁধে। আর সেই নাবালক বয়সে সংসার চালাতে গিয়েই ধীরে ধীরে আমাদের পারিবারিক সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যায়।

সংসার ও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে বাবা প্রথমে গ্রামেই কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে যখন কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না, তখন এক বুক আশা নিয়ে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। সেখানে শুরুতে তীব্র সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে, কাজ করেছেন রাজমিস্ত্রী হিসেবে। তবে বাবার সততা আর কঠোর পরিশ্রমের ফল তিনি পেয়েছিলেন। একসময় একটি স্বনামধন্য কনস্ট্রাকশন ফার্মে তাঁর স্থায়ী চাকরি হয় এবং দীর্ঘকাল নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে ২০১৫ সালে তিনি সেখান থেকে অবসরে যান।

বাবা জীবিকার তাগিদে ঢাকাতে থাকলেও, রামনগরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে আমাদের চার ভাই-বোনের (আমরা তিন ভাই ও এক বোন) পড়াশোনা এবং পুরো সংসার মা এক শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন। বাবা ঢাকা থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে টাকা পাঠাতেন, মা তাঁর অসাধারণ দূরদর্শিতা দিয়ে তার সর্বোত্তম ব্যবহার করতেন। মা ও বাবা কেবল নিজেদের নাম ও ঠিকানা লিখতে পারার মতো যৎসামান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু শিক্ষার আলো যে কতটা প্রখর হতে পারে, তা তাঁরা মজ্জায় মজ্জায় উপলব্ধি করেছিলেন। মা আমাদের সবসময় কঠোর নিয়মের মধ্যে রাখতেন এবং পড়াশোনাকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গড়ে তোলার প্রেরণা দিতেন। মায়ের তীক্ষ্ণ মেধা আর দূরদর্শিতাই আজ আমাদের এই সুন্দর চলার পথ তৈরি করে দিয়েছে। মা কেবল জন্মদাত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের পরম বন্ধু, অভিভাবক আর জীবনের শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক। আর অন্যদিকে, দূর প্রবাসে বা ঢাকা শহরে একা থাকা বাবা ছিলেন আমাদের কাছে সততা ও নিষ্ঠার এক জীবন্ত ও বড় উদাহরণ।

আমাদের বংশের আদিপুরুষ সেই সোনামদ্দি সাহেব থেকে শুরু করে আজ অব্দি এই বংশে অনেক বিস্তার ঘটেছে। আমার দাদারা ছিলেন দুই ভাই। সেখান থেকে আমার চাচারা হলেন চারজন। আর বর্তমান সময়ে এসে সোনামদ্দির বংশধরের তালিকায় আটজন পুরুষ সদস্য রয়েছেন। মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী এবং বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ ও দোয়ায়, আজ সেই আটজনের মধ্যে আমার অবস্থান আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো। আলহামদুলিল্লাহ। শৈশবের সেই হারিকেনের আলো আর তালপাতার পাখার বাতাস পেরিয়ে আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, তার প্রতিচ্ছবিই হলো আমার এই যাপিত জীবন।

আমার জন্ম ও শৈশবের দিনলিপি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

নীলার নীলে আবির -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


শহুরে কোলাহল ছেড়ে নীলা যখন শান্ত স্নিগ্ধ গ্রামে এসে পৌঁছালো, তখন তার মনে ছিল বিষণ্নতা। বাবার অসুস্থতা আর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আসার কষ্ট তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু সেই বিষণ্নতার মাঝেও নীলা ছিল এক অপূর্ব রূপবতী—দুধে-আলতা গায়ের রঙ আর মায়াবী ডাগর চোখের এক কিশোরী।

​স্কুলের প্রথম দিনটা আবিরের কাছে আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই হতে পারতো। সে ক্লাসের শান্ত আর মনোযোগী ছাত্র। কিন্তু নীলা যখন ক্লাসে পা রাখলো, আবিরের বইয়ের পাতায় থাকা জ্যামিতিক নকশাগুলো যেন হঠাৎ অর্থহীন হয়ে গেল। নীলার সেই দীঘল কালো চুল আর মায়াবী চাহনি আবিরের কিশোর মনে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে গেল।

​সেদিন থেকেই আবিরের রুটিন বদলে গেল। স্কুলের পড়া নয়, বরং নীলার এক পলক দেখা পাওয়ার জন্য তার মন ছটফট করতে থাকলো।

​আবির আর নীলার গ্রাম দুটো আলাদা। মাঝে একটা বিশাল মাঠ আর মেঠো পথ। প্রতিদিন বিকেলে আবির সেই পথ পাড়ি দিয়ে নীলাদের গ্রামের পাশে গিয়ে দাঁড়াত।

​আবিরের সাইকেলটা নিয়ে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, যেন খুব সাধারণ কোনো কাজে সেখানে আসা।

​নীলাও জানত আবির আসবে। সে বারান্দায় কিংবা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। দুজনেই জানত তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ কেউ কারো সামনে আসার সাহস পেত না।

​স্কুলের ক্লাসরুমেও চলত এক নীরব যুদ্ধ। কলম সচল থাকলেও আবিরের চোখ খুঁজত নীলাকে। মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হলে নীলা লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে নিত। এই 'চোখের ভাষা' ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব পৃথিবী। 'ভালোবাসি' শব্দটা কোনোদিন উচ্চারিত হয়নি, হয়তো হারানোর ভয়ে, কিংবা সেই অপ্রকাশিত ভালোলাগাটাকেই বেশি পবিত্র মনে হতো বলে।

​সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। গ্রামে কিশোরীদের পড়াশোনার চেয়ে বিয়ের আলাপটাই দ্রুত ডানা মেলে। আবির যখন রেজাল্টের আনন্দ আর নীলাকে নতুন করে দেখার স্বপ্ন বুনছিল, তখনই খবর এলো নীলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

​সেদিন বিকেলে আবির শেষবারের মতো সেই মেঠো পথে গিয়েছিল। নীলাদের বাড়ির উঠোনে তখন প্যান্ডেল বাঁধার তোড়জোড়। দূর থেকে সে দেখল নীলাকে—লাল শাড়িতে তাকে আরও বেশি মায়াবী লাগছে, কিন্তু সেই চোখে আজ আর সেই চঞ্চলতা নেই, আছে একরাশ বিষাদ।

​"সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, কিছু ভালোবাসা আজীবন বুকের বাম পাশে এক ফোঁটা নীল কষ্ট হয়ে বেঁচে থাকে।"

​নীলা চলে গেল নতুন শহরে, নতুন সংসারে। আর আবিরের কাছে রয়ে গেল স্কুলের সেই পুরনো বেঞ্চ, মেঠো পথ আর এক বুক না বলা কথা। সেই শান্ত গ্রামে আজও বিকেল হয়, কিন্তু সেই কিশোরীর অপেক্ষায় কোনো এক কিশোর আর মেঠো পথ পাড়ি দেয় না। তাদের সেই নীরব প্রেম এখন কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে আছে।

 

 

নীলার নীলে আবির -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

Thursday, July 2, 2026

আবদ্ধ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

বইটি পড়তে কিংবা ফ্রি পিডিএফ কপি ডাউনলোড দিতে নিচে দেয়া বইয়ের নামের উপর ক্লিক করুন- 

 

 আবদ্ধ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

জীবন মানেই কিছু প্রাপ্তি আর এক আকাশ অপ্রাপ্তির গল্প। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশের চেনা-অচেনা সম্পর্কের মাঝে নিজেকে খুঁজে ফিরি। কখনও সেই খোঁজ শেষ হয় ‘নীল জলধির উপাখ্যান’-এ, আবার কখনও তা থমকে দাঁড়ায় ‘নীল ডায়েরির অমীমাংসিত পাতায়’। “আবদ্ধ” বইটির প্রতিটি গল্প আসলে আমাদের হৃদয়ের সেই গোপন কক্ষের প্রতিধ্বনি, যেখানে আমরা অজান্তেই নিজেদের বন্দি করে রাখি।

এই সংকলনের গল্পগুলো কেবল নিছক শব্দমালার বিন্যাস নয়; বরং এটি সমসাময়িক জীবন আর রোমান্টিক বিরহের এক নিবিড় দস্তাবেজ। কখনও ‘কল্পিত নবান্ন’-এর মতো এখানে সুখের মরীচিকা হানা দেয়, কখনও ‘কালো টিপের ঘ্রাণ’ পুরনো কোনো স্মৃতির দুয়ার খুলে দেয়। ‘এক যুগ পরের রূপালি পর্দা’ কিংবা ‘নীল খামে বেদনার চিঠি’—প্রতিটি বাঁকেই পাঠক খুঁজে পাবেন এক চিলতে রোদ আর অনেকটা ছায়ার খেলা।

আমরা কখনও ‘নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প’ বুনি, কখনও ‘নীরবতার ভেতর তুমি’-কে খুঁজে হাহাকার করি। আমাদের প্রিয় মানুষগুলো কখনও ‘বিস্মৃতির ওপারে সুখ’ হয়ে হারিয়ে যায়, আবার কখনও ‘একটি আনব্লকড ভালোবাসা’ হয়ে ডিজিটাল পর্দার ওপাশে নতুন করে ধরা দেয়। জীবনের এই ‘অপ্রাপ্তির মায়া’ আর ‘মরীচিকার ছায়া’ থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে—দিনশেষে নিজেকে ভালোবাসাই হলো সবচেয়ে বড় মুক্তি।

‘নীলার নীলে আবির’ মাখানো এই গল্পগুলো পড়তে পড়তে কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে হয়তো আপনারও মনে হবে, ‘যে প্রেম ছোঁয়নি’ আপনাকে, তার রেশ রয়ে গেছে আপনারই কোনো এক ফেলে আসা দীর্ঘশ্বাসে।

প্রিয় পাঠক, এই বইয়ের প্রতিটি চরিত্র আপনার খুব চেনা। আমি কেবল চেষ্টা করেছি তাদের মনের অব্যক্ত কথাগুলোকে কাগজের পাতায় শব্দে রূপ দিতে। আশা করি, ‘লকেটের সেই সোনালী ঝিলিক’-এর মতোই এই গল্পগুলো আপনার হৃদয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও এক মায়াবী আভা ছড়িয়ে যাবে।

 

মোঃ হেলাল উদ্দিন

ঢাকা, বাংলাদেশ

জুলাই, ২০২৬

 

'আবদ্ধ' গল্পের বই