Showing posts with label সামাজিক গবেষণা পদ্ধতির সহজপাঠ. Show all posts
Showing posts with label সামাজিক গবেষণা পদ্ধতির সহজপাঠ. Show all posts

Thursday, July 17, 2025

একটি গবেষণা প্রস্তাব লেখার পদ্ধতি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

একটি গবেষণা প্রস্তাব লেখার পদ্ধতি

গবেষণা প্রস্তাব হলো একজন গবেষক যে বিষয়ে গবেষণা করতে চায় তার একটি পরিকল্পিত লিখিত রুপ। যেখানে গবেষণার বিষয়, উদ্দেশ্য, গুরুত্ব, অনুমিত সিদ্ধান্ত, কর্ম পরিকল্পনা ইত্যাদি বর্ণনা করা হয়ে থাকে। একজন গবেষককে তার গবেষণাকর্ম শুরুর পূর্বে গবেষণা প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হয়। একজন নতুন গবেষকের গবেষণার প্রতি আগ্রহ থাকলেও প্রথম বাধার সম্মুখীন হতে হয় এই গবেষণা প্রস্তাব লেখা নিয়ে। কেননা, গবেষণা প্রস্তাব লেখার বিশেষ কিছু নিয়ম ও ধাপ অনুসরণ করতে হয়। গবেষণা প্রস্তাব লেখার এই পদ্ধতি নিয়েই আজকের আলোচনা।

১। শিরোনাম (Title):

শিরোনাম দ্বারা আপনার কাজ কোন বিষয়ে এবং আপনি আপনার কাজে কি কি বিষয়ে তুলে ধরতে চান তার একটি সামগ্রিক ধারনা পাওয়া যাবে। আরো সহজ করে বললে বলা যায় যে, আপনার গবেষনার ঊদ্দেশ্য সমূহের স্পষ্ট প্রতিফলন হবে শিরোনামে। গবেষণার শিরোনাম এমন হতে হবে যাতে শিরনামকে ভাঙ্গলে গবেষণার উদ্দেশ্য পাওয়া যায় আবার গবেষণার উদ্দেশ্য সমূহকে জোড়া দিলে শিরোনাম পাওয়া যায়। তাই শিরোনাম নির্ধারনের ক্ষেত্রে দুইটি পন্থা অবলম্বন করতে পারেন। প্রথমত, সাহিত্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে ঊদ্দেশ্য নির্ধারন করে গবেষণার একটি প্রাথমিক শিরোনাম দেয়া যেতে পারে । যা পরবর্তী  কাজের উপর ভিত্তি করে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে। আর দ্বিতীয়ত হল সব কাজ শেষ করার পর কাজের সাথে সংশ্লিষ্টতা রেখে একটি শিরোনাম দেয়া। তবে শিরোনাম হতে হবে সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ। শিরোনাম মূলত ১৪ -১৮ শব্দের মধ্যে হতে হয়। শিরোনাম দুইভাবে লেখা যেতে পারে। প্রথমটি হল, এক লাইনে পুরো শিরোনাম দিয়ে দেয়া। আর অন্যটি হল কোলন ( : ) ব্যবহারের মাধ্যমে শিরোনামকে দুইভাগে ভাগ করে লেখা। একটি বিষয় লক্ষনীয় কোলন ( : ) ব্যবহারের পর কখনো প্রেক্ষিত শব্দটি ব্যবহার না করাই উচিত। কারন কোলন ( : ) এবং প্রেক্ষিতএর অর্থ একই। সবশেষ কথা, শিরোনাম হবে মূলত আপনার গবেষণার মূলবিষয় সূচক শব্দের (Keyword) সংমিশ্রণ।

২। ভূমিকা (Introduction):

গবেষণা প্রস্তাবনার প্রথম ও গুরুত্বপূর্ন ধাপ হলো ভূমিকা। এই ভূমিকার মাধ্যমে একজন পাঠক আপনার গবেষণা সম্পর্কে স্পস্ট ধারনা লাভ করতে পারবেন। তাই এই ভূমিকা অংশটি অত্যন্ত যত্নের সাথে লেখা উচিত এবং সবার শেষে লেখা উচিত। ভূমিকা অংশটি যতটুকু পারা যায় সহজ ও সরল রাখতে হবে যাতে কেউ তা পড়া মাত্র বুঝে যেতে পারে। তাই ভূমিকা লিখতে যে যে বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে সেগুলো হলোঃ প্রথমত, শুরুতেই আপনার গবেষণার জন্য নির্বাচিত বিষয়ের একটি সার্বজনীন ধারনা দিতে হবে। ধরুন, কেউ উচ্চ শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে চায় , তাহলে তাকে দেখাতে হবে বিশ্বব্যাপি উচ্চ শিক্ষাকে কিভাবে দেখা হচ্ছে এবং ইহার বর্তমান অবস্থা কি তা তুলে ধরতে হবে। ঠিক এরপরেই চলে আসতে হবে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার বর্তমান অবস্থা কিরূপ তার একটি সার্বিক ধারনা দিতে হবে। ঠিক এরপরেই গবেষণার জন্য যে যে উদ্দেশ্য নির্ধারন করা হয়েছে তার সাথে বর্তমান অবস্থার কি কি ধরনের সামঞ্জস্যতা এবং ার্থক্য রয়েছে তা দেখাতে হবে এবং একই সাথে যে বিষয়ে জোড় (Focus) দেয়া হয়েছে তা উল্লেখ করতে হবে। উদ্দেশ্যর সাথে সংশ্লিষ্ট তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের সম্পর্ক আলোচনা করতে হবে। আর এই সার্বিক ধারনা, সামঞ্জস্যতা ও পার্থক্য - এইসব কিছু সাহিত্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে দিতে হবে। তথ্যসূত্র উল্লেখপূর্বক আপনাকে আপনার যুক্তি প্রদর্শন করতে হবে। মোটকথা, ভূমিকা হবে গবেষণা প্রস্তাবটির সারসংক্ষেপ।

৩। বিষয় বিবৃতিকরন বা সমস্যা নির্ধারণ (Statement of the Problem / Issue):

একজন গবেষক যে বিষয়ে গবেষণা করবেন তার সামাজিক প্রেক্ষাপট কিরূপ এবং বর্তমানে তার অবস্থা কি, এই সংক্রান্ত কি কি তথ্য/ উপাত্ত রয়েছে এসব যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে এই অংশে। গবেষণার বিষয়টি কি সামাজিক সমস্যা নাকি এমন এক সামাজিক বিষয় যা কিনা সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন দিক এবং যে বিষয়ের দিকে নজর দেয়া উচিত এবং যে বিষয় নিয়ে গবেষণা করে সে বিষয়ের বিভিন্ন দিক তুলে ধরাটা জরুরি। এই সকল আলোচনা থাকবে এই অংশে।

গবেষণার উদ্দেশ্য (Research Objectives):

গবেষণার উদ্দেশ্য হল গবেষণার প্রাণ। গবেষণার উদ্দেশ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুইটি পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রথমত, গবেষণার যে বিষয় নির্বাচন করা হবে সে বিষয়ের ক্ষেত্রে কি কি বিষয় দেখতে চাওয়া হবে তা উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহন করাদ্বিতীয়ত, সাহিত্য পর্যালোচনার ক্ষেত্রে যে সব রিসার্চ গ্যাপ পাওয়া গিয়েছে সেগুলোকে গবেষণার উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারন করা যেতে পারে। তবে যে পদ্ধতিতেই গবেষণার উদ্দেশ্য নির্ধারন করা হোক না কেন, উদ্দেশ্য দ্বারা যাতে গবেষণার নির্ধারিত বিষয়ের উপর নতুন নতুন দিক উঠে আসে সেদিকে নজর দিতে হবে। গবেষণার উদ্দেশ্য হতে হবে খুব স্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট। গবেষণার উদ্দেশ্য নির্বাচনের দুইটি পন্থা আছে। প্রথম পন্থা হল একটি বৃহৎ উদ্দেশ্য ( Broad Objective) এবং দ্বিতীয়টি হল, ৩-৫ টি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য (Specific Objective) নিয়ে কাজ করা। 

৫। সাহিত্য পর্যালোচনা (Literature Review):

একটি গবেষণা শুরু করার জন্য সাহিত্য পর্যালোচনা অতীব জরুরি। গবেষণা শুরু পূর্বে গবেষককে বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে আর এই কার্যটি সর্বপ্রথমে করতে হয়। সাহিত্য পর্যালচনার জন্য একজন গবেষককে যা করতে হবে-

(I)     গবেষককে গবেষণার বিষয় সংশ্লিষ্ট সাহিত্য খুঁজে বের করতে হবে। সেটি হতে পারে বই, জার্নাল, আর্টিকেল, পত্রিকার লেখনী, ওয়েবসাইট, তথ্যচিত্র ইত্যাদি।

(II)     যে কোন সাহিত্য পর্যালোচনার ক্ষেত্রে যে সব বিষয় লক্ষ্য করতে হবে তা হল - সাহিত্যটির উদ্দেশ্যসমূহ কি কি, কোন গবেষনা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, কোন তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কি ধরনের ফলাফল এসেছে, কোন রিসার্চ গ্যাপ আছে কি না। এই সব বিষয়কে গবেষককে গবেষণার উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্কিত করে সুন্দর করে উপস্থাপন করতে হবে।

(III)   সাহিত্য পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য হল আপনার গবেষনার বিষয় সম্পর্কে খুব ভালভাবে জানা। তাই যত বেশি সাহিত্য পর্যালোচনা করা যায় তত ভাল। সাধারণত গবেষনা প্রস্তাবনায় সাহিত্য পর্যালোচনা ৫-৬ টি দিলেই যথেষ্ট।

৬। তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট (Theoretical Framework):

তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট মূলত গবেষকের গবেষণা ও গবেষণা প্রস্তাবনাকে একটি বৈধতা (Valid Platform) প্রদান করে। তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট প্রদানের পূর্বে যে বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে তা হল, গবেষক যে তত্ত্ব ব্যবহার করবেন তা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারনা থাকতে হবে এবং তত্ত্বটি গবেষণা বিষয়ের সাথে কিভাবে সম্পর্কযুক্ত তাও জানতে হবে। গবেষক যে ধরনের তত্ত্বই ব্যবহার করুক না কেন যখনই তিনি তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট লিখবেন তখন তাকে তিনটি ধাপ মেনে চলতে হবে।

(I)      গবেষক যে তত্ত্ব ব্যবহার করবেন সে তত্ত্বটি তিনি তাত্ত্বিকের ভাষায় বয়ান করবেন

(II)     এই তত্ত্বের ক্ষেত্রে গবেষকের যে বোধগম্যতা (Understanding) তা বয়ান করবেন এবং

(III)   এই তত্ত্বটি গবেষকের বিষয়ের সাথে কিভাবে সম্পর্কিত এবং কিভাবে এই তত্ত্ব দিয়ে গবেষকের গবেষণার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা যাবে তা তুলে ধরতে হবে।

তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে কয়টি তত্ত্ব দেয়া যাবে এরকম প্রশ্ন প্রায় সবার মনে আসে। তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রে গবেষক একটি থেকে সর্বোচ্চ তিনটি তত্ত্ব দিতে পারবেন। যত তত্ত্ব ব্যবহার কম হবে গবেষকের জন্য তত সুবিধা, কারন যত বেশি তত্ত্ব দিবেন গবেষকের বিষয়টি ব্যাখা করার ক্ষেত্রে তত বেশি অসুবিধা । 

৭। গবেষনা পদ্ধতি (Research Methodology):

গবেষণা পদ্ধতির ক্ষেত্রে গবেষককে যে সব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে তা হলো সঠিক গবেষণা যন্ত্র ও কৌশল (Research Tool & Techniques)। গবেষণার দুইটি ধারা আছে। যথাঃ গুনগত (Qualitative Approach) ও পরিমাণগত (Quantitative Approach)এখন গবেষক যদি গবেষণার জন্য গুনগত ধারা নির্ধারিত করলেন কিন্তু নির্বাচন করলেন পরিমানগত ধারার গবেষণা যন্ত্র ও কৌশল তবে তা বড় ভুল হিসেবে হবে এবং গবেষণা প্রস্তাবনাটি বাতিল হয়ে যাবে। একটি গুনগত ধারার গবেষণা পদ্ধতিতে যে সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে তা হলো-

গবেষনা প্রস্তাবনার গবেষনা পদ্ধতি অংশে যা যা বিষয় থাকবে

·   গবেষণার এলাকা নির্বাচন (Research Area)

·   নমুনা নির্বাচন (Sampling) 

গুনগত ধারায় গবেষণায় নমুনার আকার (Sample Size) ১ জন থেকে সর্বোচ্চ ৫০ জন পর্যন্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে ৩০-৩৫ জন হল আদর্শ নমুনার আকার (Sample size)

·   তথ্য উৎ (Sources of Data) 

                               I. মুখ্য উপাত্ত (Primary Data)

                              II. গৌন উপাত্ত (Secondary Data)

মুখ্য উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষন (Observation), নিবিড় সাক্ষাৎকার (In-depth Interview), মূল তথ্যদাতা সাক্ষাৎকার (Key Informant Interview), ফোকাস বা দলগত আলোচনা (Focus/Group discussion), কেস স্টাডি (Case Study) এই ৫ টি পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

গৌণ উপাত্তের ক্ষেত্রে আসবে বিভিন্ন বই, জার্নাল, আর্টিকেল, পত্রিকার লেখনী, ওয়েবসাইট, তথ্যচিত্র ইত্যাদি থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

·   ব্যবহৃত পরিসংখ্যানগত কৌশল (Used statistical strategies) 

৮। গবেষনার যৌক্তিকতা (Research Rationality):

এই অংশে মূলত গবেষক যেই বিষয়ে গবেষণা করতে চায় কেন সে এই বিষয়ে আগ্রহী, কোন ঘটনা বা অভিজ্ঞতার কারনে গবেষক এই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন এবং এই বিষয়ে কাজ করার ফলে গবেষক নিজে ও অন্যান্যরা কিভাবে লাভবান হবে তা লিখতে হবে। এই যৌক্তিকতা লিখতে হলে গবেষককে কিছু যুক্তি প্রদর্শন, যেমনঃ গবেষণার বিষয় সম্পর্কিত সাম্প্রতিক কিছু তথ্য/ উপাত্ত দেখাতে হবে যা গবেষককে আগ্রহী করে তুলেছে উক্ত গবেষণা কাজটি করার জন্য।

৯। কর্মপরিকল্পনা (Work Plan):

কর্মপরিকল্পনায় মুলত সাহিত্য পর্যালোচনা, মাঠকর্ম, তথ্য বিশ্লেষন, খসড়া গবেষণাপত্র তৈরি, মূল গবেষণাপত্র তৈরি এই ৫ টি কার্য সম্পদান করতে কতো সময় লাগবে তার একটি বর্ণনা দিতে হয়। এই পাঁচটি কার্য সম্পন্ন করতে মোট ৫-৬ মাস সময়ের উল্লেখ থাকে। প্রত্যেকটি কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে কতটুকু সময় লাগবে তাও কর্মপরিকল্পনায় নির্ধারন করে দিতে হবে।

১০। অধ্যায় বিভাজন (Chapter Division):

গবেষক তার গবেষণাকর্মটি কয়টি অধ্যায়ে সম্পন্ন করবেন তা এখানে উল্লেখ করবেন। অধ্যায় বিভাজন লেখার ক্ষেত্রে প্রথম অধ্যায় থেকে শুরু করে শেষ অধ্যায় পর্যন্ত প্রতিটি অধ্যায়ের শিরোনাম উল্লেখ করতে হবে।

১১। তথ্যসূত্র (Reference):

তথ্যসূত্র বর্ণনায় একজন গবেষক AAA (American Anthropological Association) এবং APA (American Psychological Association)এই দুইটি ধারায় তথ্যসূত্র প্রদান করতে পারেন।

 

একজন গবেষককে তার গবেষণাকর্মের প্রথম ধাপ হিসাবে গবেষণা প্রস্তাব লিখতে হয়। এই গবেষণা প্রস্তাবই বলে দিতে পারে মূল গবেষণার বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য, গুরুত্ব, ফলাফল, গবেষণার সময়কাল ইত্যাদি। তাই গবেষণা প্রস্তাবটি অত্যন্ত সুন্দর ভাবে সম্পন্ন করতে উল্লেখিত ধাপগুলো অনুসরণ করলে কাংখিত ফলাফল পাওয়া যাবে।

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

Crane, J. G. and Michael V. A. (1992). Field Projects in Anthropology: A Student Handbook. Prospect Heights, IL: Waveland Press.

Kumar, R. (2011). Research Methodology: A step-by-step guide for beginners. London: SAGE publications

মাসুম, সেখ গোলাম। কামারান এম কে মন্ডল (২০২১)। সামাজিক গবেষণা পদ্ধতির ভূমিকা। ঢাকাঃ অনিন্দ্য প্রকাশ।

 

 একটি গবেষণা প্রস্তাব লেখার পদ্ধতি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন




Friday, December 13, 2024

থিসিস লেখার নিয়ম ও সম্পাদনা পদ্ধতি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

থিসিস লেখার নিয়ম ও সম্পাদনা পদ্ধতি

যে কোন বিষয়ে গবেষণা পরিচালনার শেষ ধাপ হলো থিসিস লেখা এবং তা সম্পাদনা করে জমা দেয়া। থিসিস লেখা ও সম্পাদনার কাজটি যদি সুন্দর ও সফলভাবে না করা যায় তাহলে পুরো গবেষণার কষ্টটাই বিফলে চলে যাবে, কেননা গবেষণার ফলাফল এই থিসিসের মাধ্যমেই সকলের সামনে তুলে ধরা হয়। তাই থিসিস লেখার সঠিক ও সুন্দর নিয়ম সম্পর্কে ধারণা নেয়া প্রত্যেক গবেষকের জন্য দরকারি। আজকের এই লেখায় থিসিস লেখার নিয়ম ও থিসিস সম্পাদনা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা তলে ধরা হলো।

 

১। থিসিস কি

থিসিস বা অভিসন্দর্ভ হল একটি দীর্ঘ পরীক্ষামূলক, তাত্ত্বিক প্রতিবেদন, যার একটি সমস্যা, পদ্ধতি, ফলাফল, এবং আলোচনার কাঠামো রয়েছে। 

অক্সফোর্ড ডিকশনারী অনুসারে, থিসিস হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির জন্য লিখিত দীর্ঘ প্রবন্ধ। একটি থিসিস লেখার মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য একই থাকে। তবে থিসিস লেখার পরিধি, দৈর্ঘ্য ও প্রকৃতি ভিন্নতা থাকতে পারে।

থিসিস (Thesis) হল দীর্ঘ একাডেমিক লেখা যার সাথে ব্যক্তিগত গবেষণা জড়িত। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ার ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা পাওয়ার জন্য লেখা হয়ে থাকে। 

থিসিস লেখা সম্পন্ন হলে, তা কমিটি, সুপারভাইজার, অন্যান্য অধ্যাপকের সামনে প্রেজেন্টেশন আকারে উপস্থাপন করা হয়। সবশেষে, ভাইভা নেওয়ার মাধ্যমে থিসিস এর ফলাফল দেওয়া হয়।

 

২। থিসিস লেখার নিয়ম

একটি থিসিস নিম্মোক্ত উপাদানগুলো নিয়ে গঠিত। যেমন-

           1.      শিরোনাম পাতা (Title page)

           2.     থিসিসের প্রধান অংশ

           3.    থিসেসের শেষ অংশ (End)

 

৩। শিরোনাম পাতা (Title page)

থিসিস পেপারের শুরুতে টাইটেল পেজ বা শিরোনাম পাতা থাকে যেখানে থিসিসের আনুসাঙ্গিক বিষয়বস্তু লেখা হয়। এটিতে নিম্মলিখিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন-

  • থিসিসের শিরোনাম
  • লেখকের নাম
  • থিসিস সুপারভাইজার নাম
  • স্থান বা প্রতিষ্ঠান
  • ডিগ্রীর নাম
  • তারিখ

শিরোনাম পৃষ্ঠায় একটি স্বাক্ষরিত ঘোষণা থাকা উচিত যে, থিসিসে উপস্থাপিত কাজ প্রার্থীর একান্ত নিজস্ব। যেমন-

‘‘আমি, [সম্পূর্ণ নাম] নিশ্চিত করছি যে এই থিসিসে উপস্থাপিত কাজটি আমার নিজস্ব। এটি করতে অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে, এবং আমি নিশ্চিত করছি যে এটি থিসিসে নির্দেশিত হয়েছে।’’

৩.১। সারাংশ (Abstract)

এখাবে থিসিসের সারাংশ যথাসম্ভব সংক্ষেপে করতে হয়। একটি সারাংশে থিসিসের বিষয় বা সমস্যা, পদ্ধতি, ফলাফল এবং উপসংহার এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সারাংশ সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ শব্দের মধ্যে হলে ভালো হয়।

৩.২ । সুচিপত্র (Table of contents)

থিসিসের মূল বিষয় শিরোনাম এবং উপশিরোনাম পৃষ্ঠা নম্বর সহ তালিকাভুক্ত করতে। সূচিপত্রে স্বীকৃতি, পরিশিষ্ট, এবং গ্রন্থপঞ্জি ইত্যাদিও তালিকাভুক্ত করতে হয়। এছাড়া থিসিসের পরিসংখ্যান তালিকা, চিত্র সংখ্যা, চিত্র শিরোনাম এবং পৃষ্ঠা সংখ্যা ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত করতে হয়।

 

৪। থিসিসের প্রধান অংশ

৪.১। ভূমিকা (Introduction)

থিসিসের ভূমিকায় বর্ণনা যে বিষয়গুলো নিয়ে আসতে হয়- (১) গবেষণার/ তদন্তের উদ্দেশ্য, (২) যে সমস্যাটি গবেষণা/ তদন্ত করা হচ্ছে, (৩) সমস্যার পটভূমি (প্রসঙ্গ এবং গুরুত্ব), (৪) থিসিস পদ্ধতি, এবং (৫) অধ্যয়নের সাফল্যের মানদণ্ড ইত্যাদি।

৪.২। সমস্যা অনুসন্ধান (Problem Search)

সমস্যা অনেক ভাবেই খুঁজে পাওয়া যায়। তবে আপনি যে বিষয়  নিয়ে কাজ করতে চান ঐ বিষয়ে প্রচুর আর্টিকেল (কনফারেন্স/জার্নাল) ইত্যাদি পড়ুন, এটা সহজে সমস্যা খুঁজে পাওয়ার প্রথাগত নিয়ম। প্রথমে অনেক বড় বড় সমস্যা আসতে পারে সেখান থেকে সবচেয়ে narrow পার্ট নিয়ে কাজটি এগিয়ে নেন। আগে পছন্দের টপিকের জন্য কারেন্ট পেপারগুলো পড়ুন এবং সেগুলো থেকে শর্ট রিভিউ করে রাখুন। এটি সবচেয়ে কম সময়ে ভালো একটি সমস্যা খুঁজে পাওয়ার সহজ উপায়।

যেমন ধরুন, বাংলাদেশের শিক্ষার সমস্যা নিয়ে একটি স্টাডি করবেন বলে স্থির করছেন। তখন শিক্ষার কোন স্তরের সমস্যা নিয়ে থিসিস করবেন তা চিন্তা করুন। এক্ষেত্রে ভালো হবে একটি মাত্র টাইপ নিয়ে কাজ করা। যেমন- প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা, অথবা মাধ্যমিক শিক্ষার, অথবা কারিগরি শিক্ষার সমস্যা, এগুলোর যেকোন একটি বিষয় নিয়ে থিসিস করতে পারেন।

4.3। গ্রন্থ পর্যালোচনা (Literature Review)

 গবেষণা প্রধানত তিন ধরণের হয়ে থাকে। যথা- মৌলিক গবেষণা, রিভিউ বা পর্যালোচনা এবং সার্ভে/জরিপ গবেষণা। মৌলিক গবেষণা লেখা হয় মূল গবেষণার উপর ভিত্তি করে। আর মূল গবেষণার মধ্যে পরে, ল্যাবরেটরী ভিত্তিক গবেষণা, ডাটা সাইন্স ফিল্ড এবং সিমুলেশন রিসার্চ। মোট কথা হচ্ছে, যে কাজ করে আমি কোন ডাটা পাবো, তাই হচ্ছে মূল গবেষণা। এই কারণে এই সব ডাটাকে বলা হয় প্রাইমারি ডাটা। কিন্তু এইসব ডাটা যখন কোন জার্নালে বা বই আকারে প্রকাশিত হয়, তখন অন্য কেউ যদি এই একই ডাটা দিয়ে তার ডাটার সাথে কাজে করে, তখন তা হয়ে যায় সেকেন্ডারি ডাটা। এই সেকেন্ডারি ডাটা দিয়েই মূলত রিভিউ পেপারের কাজ করতে হয়। যখন আপনি সমস্যা বের বের করতে পারবেন তখন আপনাকে দেখাতে হবে আপনার গবেষণাটি কেন দরকার। অর্থাৎ আপনাকে বোঝাতে হবে আপনার রিসার্চের মোটিভেশন কী? সেজন্য এই সমস্যার উপর ইতোপূর্বে কীরকম কাজ হয়েছে এবং কাজগুলোকে আপনার রিভিউ করতে হবে। লিটারেচার রিভিউ সময় নিয়ে করতে হয় এবং রেফেরেন্স পেপারের জার্নালের মান, এবং তাঁরা কতটা রিলায়েবল এটি মাথায় রাখতে হয়।

৪.৪। পদ্ধতি (Methodology)

একজন গবেষক নানা ভাবে তার গবেষণা করতে পারেন। যে কোন গবেষণার জন্য অনেক ধরণের পরীক্ষিত কৌশল থাকে। কৌশলগুলো লেখার সময় উদাহরণ হিসেবে নিজের গবেষণার কোন উদাহরণ দিয়ে তা বিস্তারিত কোথায়, কোন সেকশনে, কোন চ্যাপ্টারে আছে সেটা উল্লেখ করে একটি সংযোগ তৈরি করে দিতে হয়। এই অংশে মূলত একটি পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ করা হয়।

৪.৫। ফলাফল (Results)

গবেষণার ফলাফলগুলো টেবিল এবং গ্রাফসহকারে উপস্থাপন করতে হয়। ফলাফলের নিদর্শন এবং গুণমান চিহ্নিত করতে হয় এবং এর নির্ভুলতা অনুমান করতে।

৪.৬। আলোচনা (Discussion)

ফলাফলের অর্থ এবং এটির তাৎপর্য কী তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়। তাত্ত্বিক প্রত্যাশার সাথে ফলাফলের তুলনা এবং অপ্রত্যাশিত কিছুর জন্য জবাবদিহি করতে।

৪.৭। উপসংহার (Conclusions)

উপসংহারে মূল সমস্যা বিবৃতি সম্পর্কিত ফলাফল পর্যালোচনা করতে। ভূমিকায় যে সাফল্যের মানদণ্ড দেয়া হয় তার আলোকে অধ্যয়নের সাফল্যের মূল্যায়ন করতে।

৪.৮। সুপারিশ (Recommendations)

থিসিসের এই অংশে ভবিষ্যতের কাজের জন্য নির্দেশনা সুপারিশ করতে হয়।

 

৫। থিসেসের শেষ অংশ (End)

৫.১। স্বীকৃতি (Acknowledgments)

এখানে আপনার উপদেষ্টা, পৃষ্ঠপোষক, তহবিল সংস্থা, সহকর্মী, প্রযুক্তিবিদ এবং আরও অনেকের সহায়তার স্বীকার করুন।

৫.২। পরিশিষ্ট (Appendixes)

পরিশিষ্টে বিস্তারিত গণনা, পদ্ধতি, ছক, সারণী, তালিকা ইত্যাদি স্থান পায়। পাঠক এটি ব্যবহার করে মূল বিষয়ের গভীরে যেতে সক্ষম হবে।

৫.৩। গ্রন্থপঞ্জি (Bibliography)

আপনার অধ্যয়নে উল্লেখ করা যেকোনো সংগ্রহীত তথ্য বা কাজকে বর্ণানুক্রমিকভাবে তালিকাভুক্ত করুন। এটি করতে গ্রন্থপঞ্জী এবং ফুটনোট এর ফর্ম্যাটগুলো অনুসরণ করুন।

 

৬। থিসিস সম্পাদনা পদ্ধতি

৬.১। ফন্ট (font)

থিসিস টাইপ করার সময় এটির ইংরেজি ফন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে হয় টাইমস নিউ রোমান (Times New Roman)। তবে বাংলা টাইপ করতে অবশ্য ফন্ট হিসেবে সুটুনি এমজে (SutonnyMJ) ব্যবহার করতে হয়। ইংরেজির জন্য ১২ এবং বাংলা জন্য ১৪ ফন্টের আকার বা সাইজকে স্টান্ডার্ড ফন্ট সাইজ হিসেবে ধরা হয়।

৬.২। কাগজ (paper)

থিসিসের কাগজ অবশ্যই A4 (210 x 297 মিমি) সাইজের ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ ভালো মানের এবং পর্যাপ্ত অস্বচ্ছতার সাদা কাগজ ব্যবহার করতে হবে।

৬.৩। মার্জিন (Margin)

থিসিসের বাঁধাই প্রান্তে মার্জিন ৪০ মিমি (১.৫ ইঞ্চি) এবং অন্য তিন অংশে মার্জিন ২০ মিমি (.৭৫ ​​ইঞ্চি) এর কম হওয়া উচিত নয়।

৬.৪। পৃষ্ঠা সংখ্যা (Page no.)

সমস্ত পৃষ্ঠাগুলো একটি অবিচ্ছিন্ন ক্রমানুসারে সংখ্যা করা আবশ্যক অর্থাৎ প্রথম খণ্ডের শিরোনাম পৃষ্ঠা থেকে থিসিসের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ধারাবাহিক সংখ্যা দিতে হবে। এই ক্রমটিতে মানচিত্র, ডায়াগ্রাম, ফাঁকা পৃষ্ঠা ইত্যাদি সহ ভলিউমের মধ্যে আবদ্ধ সমস্ত কিছু অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

৬.৫। থিসিস বাঁধানো (Thesis binding)

থিসিস প্রিন্ট আউট করার পর একটি সুন্দর মাঝারি নীল কাপড় কাভার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে। কাপড়টিতে যেন জল-প্রতিরোধী উপাদান থাকে এবং কাভার যথেস্ট শক্ত হতে হবে। কাভার পেজের উপরে না লিখে বরং থিসিসের বাম পাশে মেরুদন্ডে 16 বা 18 পয়েন্ট ফন্টে ডিগ্রী, বছর এর নাম সোনার অক্ষরে লিখতে হয়।

 

একটি গবেষণাকর্ম পরিচালনা শেষে থিসিস লেখা এবং তা উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে গবেষণার পরিসমাপ্তি ঘটে। বলা হয়ে থাকে, ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’ তাই গবেষণার শেষ কাজ হিসাবে থিসিস লেখা এবং তা সম্পাদনার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া খুবই জরুরি তাহলেই একটি গবেষণাকর্মের সুন্দর ও সফল সমাপ্তি হবে। 

 

থিসিস লেখার নিয়ম ও সম্পাদনা পদ্ধতি 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন