Wednesday, May 6, 2026

মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মহাসড়কের ধুলোভেজা বিকেল। দূরে সারি সারি বাস—যেন স্থির নদীর ওপর থমকে থাকা নৌকা। হেডলাইটগুলো জ্বলছে, নিভছে, আবার জ্বলছে—ঠিক যেন অপেক্ষার চোখ।

তাসফিয়া জানালার পাশে বসে মোবাইল তুলে একটা ছবি তোলে। ছবির ক্যাপশনে লিখে—
“কখন যে ঢাকায় পৌঁছাতে পারবো, জানিনা...”

স্টোরি আপলোড হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই আসে—
—“আপনি কোন বাসে আছেন?”

তাসফিয়া একটু থামে। নামটা দেখে চিনতে পারে—তাওসিফ। বহুদিনের ফেসবুক ফ্রেন্ড, অথচ একটাও কথা হয়নি কখনো।
সে ছোট করে উত্তর দেয়—
—“গ্রীণ লাইন।”

ওপাশ থেকে আবার—
—“আপনি কি জ্যামে?”

—“হ্যাঁ। আপনি?”

একটু দেরি করে রিপ্লাই আসে—
—“হুম… তবে ঢাকায় যাচ্ছি না। মাঝপথে নেমে যাবো।”

এই ছোট্ট কথোপকথন—যেন একটা দরজা। অদৃশ্য, অথচ খোলা।

তারপর দিন যায়। কথাও বাড়ে।

প্রথমে খোঁজখবর, তারপর গল্প, তারপর নীরবতাও যেন কথা হয়ে ওঠে।

তাওসিফ শব্দের মানুষ। ব্যাংকের ফাইলের ভেতরে তার দিন আটকে থাকলেও, রাত হলেই সে শব্দে আশ্রয় নেয়। কবিতা লেখে। আবৃত্তি করে। তার শব্দে নদী থাকে, কুয়াশা থাকে, আর অদ্ভুত এক শূন্যতা থাকে—যেটা তাসফিয়ার খুব পরিচিত লাগে।

তাসফিয়া মানুষ গড়ার কাজ করে—শিক্ষক। ক্লাসরুমে তার কণ্ঠ দৃঢ়, কিন্তু নিজের জীবনে সে যেন একটু ভেসে থাকা মানুষ। শাড়ি তার ভালোবাসা—প্রতিটি শাড়ি যেন একেকটা ঋতু। নতুন শাড়ি পরে নতুন জায়গায় গেলে সে ছবি তোলে—আর সেই ছবির নিচে তাওসিফ লিখে ফেলে কবিতা।

“তোমার শাড়ির আঁচলে আজকে বিকেলের রোদ আটকে গেছে—
আমি দূর থেকে শুধু আলোর গন্ধ পাই…”

এমন লাইন পড়ে তাসফিয়া চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় না, কিন্তু পড়ার পর তার ভেতরে কিছু নরম হয়ে যায়।

একদিন তাওসিফ একটা কবিতা লিখলো—

“দেখা হোক কোনো এক অনির্ধারিত দুপুরে—
যেখানে সময় থেমে থাকবে চায়ের কাপের ধোঁয়ায়,
আর আমরা দু’জন—
অচেনা হয়েও পরিচিত হয়ে উঠবো…”

কবিতাটা পড়ার পর তাসফিয়া অনেকক্ষণ কিছু লেখে না। শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত ইচ্ছে জন্ম নেয়—
দেখা করার।

কিন্তু কেউ কাউকে বলে না।

হঠাৎ একদিন—
একটা শপিংমলের ভিড়ে—
দু’জনের চোখে চোখ পড়ে।

যেন গল্পের ভেতর থেকে বাস্তব হঠাৎ বের হয়ে এসেছে।

—“তাসফিয়া?”
—“তাওসিফ?”

দু’জনেই একটু হেসে ফেলে।
সময় তখন খুব কম। কথা হয় অল্প—
তবুও সেই অল্প কথার মধ্যে অদ্ভুত এক স্বাচ্ছন্দ্য।

বিদায়ের আগে তাওসিফ বলে—
“একদিন কফি খাওয়া যেতে পারে…”

তাসফিয়া মাথা নাড়ে—
“হতে পারে।”

তারপর আবার তারা ফিরে যায় নিজেদের জীবনে।
কিন্তু এবার কথাগুলো বদলে যায়।

মাঝে মাঝে কথা হয়—
কিন্তু না বললেও অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।

এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।
বন্ধুত্ব?
ভালোবাসা?
নাকি শুধু অভ্যাস?

তারা কেউই জানে না।

তবুও—
রাতের শেষে দু’জনেই অপেক্ষা করে—
একটা “অনলাইন” দেখার জন্য।


একদিন হঠাৎ তাসফিয়া জানতে পারে—
তাওসিফ যেই “মাঝপথে নেমে যাবো” বলেছিল—
সেটা শুধু বাসের কথা ছিল না।

তাওসিফ আসলে একটা সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসছিল।
একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত, ভাঙা সম্পর্ক।

আর তাসফিয়া?
সে বুঝতে পারে—
সে হয়তো তাওসিফের “শেষ গন্তব্য” না—
বরং সেই “মাঝপথ”—
যেখানে মানুষ একটু থামে, শ্বাস নেয়, আবার এগিয়ে যায়।


তাসফিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। নতুন একটা শাড়ি পরে আছে।
মোবাইলে একটা মেসেজ টাইপ করে—

“আজ কফি খাওয়া যাবে?”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই আসে—

“আজ না…
আমি একটু দূরে যাচ্ছি।”

তাসফিয়া ফোনটা নামিয়ে রাখে।
হাসে। খুব হালকা একটা হাসি।

কারণ সে জানে—
সব গল্পের শেষ একসাথে হওয়া না।
কিছু গল্প শুধু সুন্দরভাবে অসম্পূর্ণ থাকার জন্যই জন্ম নেয়।

আর দূরে কোথাও—
মহাসড়কে আবার বাসের লাইন দাঁড়িয়ে থাকে—
যেন সময় এখনও কোথাও আটকে আছে…

 

 মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Saturday, May 2, 2026

নীল ডায়েরির অমীমাংসিত পাতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নতুন স্কুল, নতুন বেঞ্চ, নতুন গন্ধ—চক আর কাগজের মিশ্র এক অচেনা সকাল। প্রথম দিন প্রথম ক্লাসে ঢুকেই চোখ আটকে গিয়েছিল। বোর্ডে তাকানোর কথা ছিল, অথচ চোখ চলে গিয়েছিল জানালার ধারে বসে থাকা মেয়েটির চোখে। অদ্ভুত শান্ত, অথচ কৌতূহলে ভরা—ঠিক যেন অপরিচিত কোনো নদী, যার দিকে তাকালে নামতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নামার সাহস নেই।

সে ছিল ইংরেজি ম্যাডামের মেয়ে।

প্রথমে কিছুই হয়নি। নাম জানা হয়নি, কথাও হয়নি। শুধু প্রতিদিন ক্লাসে ঢুকে অজান্তেই তার বেঞ্চের দিকে তাকানো—এইটুকুই। কয়েকদিন পর ম্যাডাম লক্ষ্য করলেন, ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। ইংরেজি ক্লাসে উত্তরগুলো ঠিকঠাক আসে, উচ্চারণে জড়তা নেই। সুনজরটা তখন থেকেই। ম্যাডাম কখনো হাসেন, কখনো বাড়ির কাজ ভালো হলে খাতায় লাল কালি দিয়ে “Very Good” লিখে দেন।

একদিন ম্যাডাম বললেন,

— আজ বিকেলে আমার বাসায় এসো। একটু গাইড দেব।

বাসায় গিয়ে দেখা হলো মেয়েটার সঙ্গে। স্কুলের চেয়ে বাসায় সে অন্যরকম—চুল খোলা, পায়ে শব্দহীন চটি, চোখে একই রকম নীরব আলো। পড়া শেষে খেলনা বের হলো। লুডু, ক্যারাম, কখনো লুকোচুরি। প্রথম প্রথম কথা কম, পরে হাসি বাড়ে। ছেলেটা বুঝে যায়—এই হাসিটাই সে প্রতিদিন ক্লাসে খুঁজে ফেরে।

এরপর দিনগুলো যেন এক সুতোয় গাঁথা। প্রতিদিন ক্লাসে একসাথে বসা, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, বাসায় গিয়ে পড়া—সবই স্বাভাবিক, অথচ অদ্ভুতভাবে বিশেষ। স্কুলের অন্য ছাত্রছাত্রীরা ফিসফিস করে, চোখাচোখি করে। কেউ বলে, “প্রেমিক-প্রেমিকা!” তারা দু’জন কিছু বলে না। নাম না দেওয়া সম্পর্কটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।

দুই বছর কেটে যায় এভাবেই। স্কুলের দেয়ালে নতুন পোস্টার, মাঠে নতুন দাগ, অথচ তাদের জায়গাটা একই থাকে—একই বেঞ্চ, একই জানালার আলো। কখনো ঝগড়া হয়নি, কখনো বড় করে কথা হয়নি। শুধু একধরনের নিশ্চুপ টান—যেটা না বলা ভালো, না লুকানো যায়।

তারপর হঠাৎই সব বদলে গেল।

ছেলেটাকে অন্য স্কুলে ভর্তি হতে হলো। শেষ দিন সে জানত, কিন্তু বলার সাহস পায়নি। মেয়েটা জানত কি না, সেটাও জানা হয়নি। শেষ ক্লাসে চোখাচোখি হয়েছিল মাত্র একবার। কিছু বলার ছিল, অনেক কিছু—কিন্তু ঘণ্টা বেজে উঠেছিল।

এরপর আর দেখা হয়নি। কোনো রাস্তার মোড়ে নয়, কোনো উৎসবে নয়, এমনকি স্বপ্নেও নয়। সময় এগিয়েছে, নাম ভুলে গেছে হয়তো, মুখের রেখাও ঝাপসা। তবু কোথাও একটা টান রয়ে গেছে—অকারণ, অদৃশ্য, অথচ জেদি।

আজও ইংরেজি বই খুললে প্রথম পাতায় চোখ আটকে যায়। বোর্ডে লেখা কোনো বাক্যের মাঝখানে হঠাৎ মনে পড়ে যায় জানালার ধারের সেই চোখদুটি। তখন মনে হয়—সব প্রেম পূর্ণতা পায় না। কিছু প্রেম স্কুলের বেঞ্চেই থেকে যায়, খাতার ভাঁজে, পুরনো দিনের নীরবতায়।