Saturday, May 2, 2026

নীল ডায়েরির অমীমাংসিত পাতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নতুন স্কুল, নতুন বেঞ্চ, নতুন গন্ধ—চক আর কাগজের মিশ্র এক অচেনা সকাল। প্রথম দিন প্রথম ক্লাসে ঢুকেই চোখ আটকে গিয়েছিল। বোর্ডে তাকানোর কথা ছিল, অথচ চোখ চলে গিয়েছিল জানালার ধারে বসে থাকা মেয়েটির চোখে। অদ্ভুত শান্ত, অথচ কৌতূহলে ভরা—ঠিক যেন অপরিচিত কোনো নদী, যার দিকে তাকালে নামতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নামার সাহস নেই।

সে ছিল ইংরেজি ম্যাডামের মেয়ে।

প্রথমে কিছুই হয়নি। নাম জানা হয়নি, কথাও হয়নি। শুধু প্রতিদিন ক্লাসে ঢুকে অজান্তেই তার বেঞ্চের দিকে তাকানো—এইটুকুই। কয়েকদিন পর ম্যাডাম লক্ষ্য করলেন, ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। ইংরেজি ক্লাসে উত্তরগুলো ঠিকঠাক আসে, উচ্চারণে জড়তা নেই। সুনজরটা তখন থেকেই। ম্যাডাম কখনো হাসেন, কখনো বাড়ির কাজ ভালো হলে খাতায় লাল কালি দিয়ে “Very Good” লিখে দেন।

একদিন ম্যাডাম বললেন,

— আজ বিকেলে আমার বাসায় এসো। একটু গাইড দেব।

বাসায় গিয়ে দেখা হলো মেয়েটার সঙ্গে। স্কুলের চেয়ে বাসায় সে অন্যরকম—চুল খোলা, পায়ে শব্দহীন চটি, চোখে একই রকম নীরব আলো। পড়া শেষে খেলনা বের হলো। লুডু, ক্যারাম, কখনো লুকোচুরি। প্রথম প্রথম কথা কম, পরে হাসি বাড়ে। ছেলেটা বুঝে যায়—এই হাসিটাই সে প্রতিদিন ক্লাসে খুঁজে ফেরে।

এরপর দিনগুলো যেন এক সুতোয় গাঁথা। প্রতিদিন ক্লাসে একসাথে বসা, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, বাসায় গিয়ে পড়া—সবই স্বাভাবিক, অথচ অদ্ভুতভাবে বিশেষ। স্কুলের অন্য ছাত্রছাত্রীরা ফিসফিস করে, চোখাচোখি করে। কেউ বলে, “প্রেমিক-প্রেমিকা!” তারা দু’জন কিছু বলে না। নাম না দেওয়া সম্পর্কটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।

দুই বছর কেটে যায় এভাবেই। স্কুলের দেয়ালে নতুন পোস্টার, মাঠে নতুন দাগ, অথচ তাদের জায়গাটা একই থাকে—একই বেঞ্চ, একই জানালার আলো। কখনো ঝগড়া হয়নি, কখনো বড় করে কথা হয়নি। শুধু একধরনের নিশ্চুপ টান—যেটা না বলা ভালো, না লুকানো যায়।

তারপর হঠাৎই সব বদলে গেল।

ছেলেটাকে অন্য স্কুলে ভর্তি হতে হলো। শেষ দিন সে জানত, কিন্তু বলার সাহস পায়নি। মেয়েটা জানত কি না, সেটাও জানা হয়নি। শেষ ক্লাসে চোখাচোখি হয়েছিল মাত্র একবার। কিছু বলার ছিল, অনেক কিছু—কিন্তু ঘণ্টা বেজে উঠেছিল।

এরপর আর দেখা হয়নি। কোনো রাস্তার মোড়ে নয়, কোনো উৎসবে নয়, এমনকি স্বপ্নেও নয়। সময় এগিয়েছে, নাম ভুলে গেছে হয়তো, মুখের রেখাও ঝাপসা। তবু কোথাও একটা টান রয়ে গেছে—অকারণ, অদৃশ্য, অথচ জেদি।

আজও ইংরেজি বই খুললে প্রথম পাতায় চোখ আটকে যায়। বোর্ডে লেখা কোনো বাক্যের মাঝখানে হঠাৎ মনে পড়ে যায় জানালার ধারের সেই চোখদুটি। তখন মনে হয়—সব প্রেম পূর্ণতা পায় না। কিছু প্রেম স্কুলের বেঞ্চেই থেকে যায়, খাতার ভাঁজে, পুরনো দিনের নীরবতায়।
 
 

নীল জলধির উপাখ্যান -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে মানুষের দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু নীলয় আজ সেখানে দাঁড়িয়েছে নিজের হাহাকার বিসর্জন দিতে। আজ পূর্ণিমা। আকাশের চাঁদটা যেন খুব নিচে নেমে এসেছে, ঠিক যেমনটা কবিতায় বলে— ‘আকাশের চাঁদ মর্ত্যে নামলো, রূপের আঁচল মেলে।’

​সামনে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। রূপালি চাঁদনি যখন ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে আছড়ে পড়ছে, নীলয়ের মনে হচ্ছে সমুদ্রটা আজ কোনো লোনা জলের পাহাড় নয়, বরং এক বিশাল আয়না। সেই শান্ত জলের দর্পণে বারবার ভেসে উঠছে একটি মুখ। চাঁদনী।

​স্মৃতির বালুচর

​নীলয় হাত বাড়িয়ে ঢেউয়ের ঝিকিমিকি ধরতে চাইল। কিন্তু আঙুলের ফাঁক দিয়ে শুধু নোনা জল গলে পড়ল। ঠিক যেমন তিন বছর আগে চাঁদনী গলে গিয়েছিল ওর জীবন থেকে। চাঁদনী এখন অনেক দূরে, হয়তো অন্য কোনো শহরের কৃত্রিম আলোয় সে ব্যস্ত। কিন্তু নীলয়ের কাছে সে আজও সেই লোনা হাওয়ায় মিশে থাকা এক চেনা ঘ্রাণ।

​চারপাশ নিঝুম। শুধু সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। নীলয় বিড়বিড় করে বলল, "জানি হবে না মেটানো কভু, এ যে বিরহের এক কৃষ্ণা।" সত্যি তো, কিছু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য কোনো জল থাকে না।

​পাথুরে নীরবতা

​সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো যখন বালুচরে আছড়ে পড়ছে, নীলয়ের বুকের ভেতরটা তখন বিদীর্ণ হচ্ছে এক তীব্র চিৎকারে। ওর ইচ্ছে করছিল আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে— “তোমায় বড় ভালোবাসি!” কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, যখনই সে মুখ খুলতে চাইল, শব্দরা যেন পাথর হয়ে গলার কাছে আটকে গেল। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ভয় থেকে যে নীরবতার জন্ম হয়েছিল, আজ সেই নীরবতাই তাকে গ্রাস করেছে। সমুদ্র সাক্ষী রইল এক ব্যর্থ প্রেমিকের, যার ঠোঁট দুটো পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে, অথচ হৃদয়ে জ্বলছে দাবানল।

​শেষ প্রহর

​রাত বাড়ে। চাঁদের আলো আরও মায়াবী হয়। নীলয় একা বালুচরে বসে থাকে। সে জানে, এই মায়াবী কায়া কেবলই তার মনের ভুল। চাঁদনী পাশে নেই, তবুও তার অস্তিত্ব এই নোনা জল আর বালুর কণে কণে মিশে আছে।

​ভালোবাসার না বলা কথাগুলো আজ দীর্ঘশ্বাস হয়ে লোনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। নীলয় বুঝল, কিছু মানুষকে আগলে রাখার চেয়েও বেশি কঠিন হলো তাদের ছাড়া বেঁচে থাকা, বিশেষ করে যখন সেই মানুষটিই হয় ‘জগতের সবচেয়ে দামি’ সম্পদ।