Friday, September 11, 2026

আদ্রিতা এবং অপেক্ষা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আদ্রিতা,

কিছু মানুষ জীবনে আসে খুব নিঃশব্দে। কোনো ঘোষণা থাকে না, কোনো প্রতিশ্রুতিও নয়। অথচ একসময় টের পাওয়া যায়—মানুষটি আমাদের প্রতিদিনের ভাবনার ভেতর, নীরবতার ভেতর, এমনকি একাকিত্বের ভেতরও কোথাও স্থায়ী হয়ে গেছে।

তুমি তেমনই একজন।

আমি অপেক্ষায় থাকি বহুদূরে, তুমি হয়তো অপেক্ষায় থাকো আরও দূরে। আমাদের মধ্যে হয়তো অনেক পথ, অনেক বাস্তবতা, অনেক অদৃশ্য দেয়াল। অথচ এই দূরত্বের মধ্যেই আমাদের সবচেয়ে আশ্চর্য মিল—আমরা দুজনেই অপেক্ষা করি।

কিসের অপেক্ষা?

তোমাকে পাওয়ার নয়। তোমাকে ছুঁয়ে দেখারও নয়। শুধু কোনো এক নির্জন সময়ে তোমার পাশে বসে মন খুলে কথা বলার। তোমার মনের সেই দরজাটি একবার খুলে যেতে দেখার, যার ওপারে হয়তো জমে আছে অনেকদিনের না-বলা কথা, কিছু অভিমান, কিছু দুঃখ আর অল্প কিছু স্বপ্ন।

আমি সেসব শুনতে চাই।

তোমার সুখের গল্প শুনতে চাই, আবার তোমার দুঃখের নীরবতাও বুঝতে চাই। তুমি যখন হাসো, তখন সেই হাসির আড়ালে কোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে কি না—সেটুকুও জানতে ইচ্ছে করে। কারণ ভালোবাসা বোধহয় শুধু কাউকে সুখী দেখতে চাওয়ার নাম নয়; ভালোবাসা হলো তার অন্ধকারটুকুকেও ভয় না পাওয়া।

কখনো কখনো মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ককে খুব অদ্ভুতভাবে লিখে দেন। যাকে কাছে রাখেন, সে হয়তো হৃদয়ের গভীরে পৌঁছাতে পারে না। আর যে মানুষটি মনের গোপন অলিগলি চিনে ফেলে, তার জন্য বাস্তব জীবনে কোনো সহজ পথ খোলা থাকে না।

তুমি আমার কাছে সেই অসম্ভবের মতো।

তোমাকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছে আছে, কিন্তু তোমাকে পাওয়ার দাবি নেই। তোমার হাত ধরার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু তোমার জীবনের কোনো অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে নেই। তোমার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলতে মন চায়, অথচ জানি—সব ইচ্ছের পূর্ণতা সুন্দর হয় না।

কিছু ইচ্ছেকে অপূর্ণ রাখাও কখনো কখনো ভালোবাসারই একটি রূপ।

সমাজের চোখ আছে, সংসারের দায় আছে, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ব আছে। আমাদের চারপাশে এমন কিছু অদৃশ্য সীমারেখা আছে, যেগুলো অতিক্রম করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু অতিক্রম করার পর যে মানুষগুলো আহত হবে, তাদের মুখ আমরা কীভাবে ভুলে থাকব?

তাই থেমে যাই।

কাছে আসার ঠিক আগেই ফিরে যাই নিজের নিজের জীবনে।

অথচ কী অদ্ভুত—দূরে সরে গেলেই তোমাকে আরও বেশি কাছে অনুভব করি।

তোমার সঙ্গে কয়েকটি কথা কখনো কখনো সারাদিনের ক্লান্তির চেয়েও বড় সুখ হয়ে আসে। একটি ছোট্ট বার্তা, কয়েকটি আন্তরিক বাক্য, কিংবা তোমার নীরবতার মধ্যেও কোনো এক অদৃশ্য সাড়া—এসবই আমার কাছে কখনো কখনো অনেক বড় প্রাপ্তি।

হয়তো এটাই আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মল জায়গা।

এখানে কোনো দাবি নেই।
কোনো হিসাব নেই।
কোনো পাওনা নেই।
শুধু অনুভব আছে।

আর সেই অনুভবের সঙ্গে মিশে আছে এক গভীর দুঃখ—তোমাকে অনুভব করতে পারি, কিন্তু তোমাকে নিজের করে নিতে পারি না।

এই না-পারার মধ্যেই হয়তো আমাদের গল্পের সৌন্দর্য।

তাই আদ্রিতা, আমি এই চিঠির শেষ লিখতে চাই না।

কারণ শেষ মানেই যেন একটি দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। আর আমি চাই না আমাদের না-বলা কথাগুলোর দরজাটি কোনোদিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাক।

কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না। তারা কোনো সামাজিক পরিচয়ের দাবি করে না। তারা শুধু মানুষের মনের ভেতর একটি নীরব আলো জ্বেলে রাখে।

তুমিও তেমন একটি আলো হয়ে থেকো।

দূরে থেকো, তবু মনে থেকো।

যদি কোনোদিন খুব একা লাগে, যদি চারপাশের এত মানুষের মধ্যেও মনে হয়—তোমার কথা সত্যিকার অর্থে শোনার মতো কেউ নেই, তখন মনে করো, কোথাও একজন মানুষ আছে যে তোমার কথার অপেক্ষায় থাকে। তোমার সুখ শুনে যে আনন্দ পায়, তোমার দুঃখ শুনে যার নিজেরও মন ভারী হয়ে আসে।

সে তোমাকে কিছু দিতে চায় না।

শুধু তোমার না-বলা কথাগুলোর জন্য একটু জায়গা দিতে চায়।

হয়তো কোনোদিন তোমার মাথা আমার কাঁধে রাখা হবে না। কোনো সন্ধ্যায় পাশাপাশি হাঁটা হবে না। কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে তোমাকে ছাতা এগিয়ে দিয়ে বলা হবে না—“ভিজো না, অসুস্থ হয়ে যাবে।”

হয়তো কোনোদিন হাত ছুঁয়ে বলাও হবে না—

“তুমি পাশে থাকলে আর কিছুই আমার চাই না।”

তবু কিছু কথা না বলেও সত্যি থাকে।

কিছু ভালোবাসা স্পর্শ ছাড়াই গভীর হয়।

কিছু মানুষ কাছে না থেকেও জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে থাকে।

তোমার জমানো দুঃখ আর আমার বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট হয়তো কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না। তারা আমাদের নিজস্ব অন্ধকারেই নীরবে বেঁচে থাকুক। কারণ সব অনুভূতির পরিণতি প্রয়োজন নেই; কিছু অনুভূতি শুধু অনুভূত হয়েই সুন্দর।

আর আমাদের গল্প?

সে গল্প অসমাপ্তই থাকুক।

কারণ হয়তো পূর্ণতা পেলে আমরা তাকে হারিয়ে ফেলতাম। অসমাপ্ত বলেই সে আমাদের মনে এতটা জীবন্ত।

তাই তোমাকে পাওয়ার কোনো প্রার্থনা করব না।

শুধু প্রার্থনা করব—
তুমি ভালো থেকো।
তোমার মুখের হাসিটুকু অক্ষত থাকুক।
তোমার দুঃখগুলো একদিন একটু একটু করে হালকা হয়ে যাক।
আর কোনো এক নিঃশব্দ রাতে যদি আমার কথা মনে পড়ে, মনে কোরো—দূরত্বের ওপারে কেউ একজন এখনও তোমার মনের কথাগুলো শুনতে চায়।

আমি চিঠিটা এখানেই শেষ করতে পারতাম।

কিন্তু করব না।

কিছু চিঠি শেষ করার জন্য লেখা হয় না;
কিছু চিঠি শুধু প্রমাণ করে—
কেউ একজন কোনো একসময় কাউকে গভীরভাবে অনুভব করেছিল।

তুমিও তাই থেকো—
আমার কাছে নয়,
আমার ভেতরে।

অধরা হয়ে,
অপ্রকাশিত হয়ে,
অসমাপ্ত হয়ে।

অসীমের মতো—
যার কোনো শেষ নেই।

ভালো থেকো, আদ্রিতা।


ইতি,
তোমার দূরত্বের ওপারে অপেক্ষায় থাকা একজন।



আদ্রিতা এবং অপেক্ষা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Saturday, September 5, 2026

আদ্রিতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ল্যাব সুপারভাইজার আশিক প্রতিদিনের মতো সেদিনও নির্দিষ্ট সময়ে কম্পিউটার ল্যাবে ঢুকেছিল। নতুন চাকরি। মাত্র কয়েকদিন হলো এই ল্যাবে যোগ দিয়েছে। কাজের প্রতি তার এক ধরনের অদ্ভুত মনোযোগ—ল্যাবে ঢুকেই একে একে প্রতিটি ডেস্ক ঘুরে দেখা, শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না খেয়াল করা, কারও কোনো সমস্যা হলে পাশে দাঁড়ানো।

সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।

এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে যেতে যেতে হঠাৎ ল্যাবের একেবারে শেষ প্রান্তের ডেস্কটিতে গিয়ে তার চোখ আটকে গেল।

একটি মেয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে।

মেয়েটিকে আশিক আগে কখনো দেখেনি।

অবশ্য দেখবে কী করে? সে তো মাত্র কয়েকদিন হলো এখানে এসেছে। মেয়েটিও হয়তো আগের দিনগুলোতে অন্য কোনো সময়ে এসেছে, কিংবা কোনো কারণে তার চোখে পড়েনি।

আশিক মেয়েটির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

—তোমার নাম কী?

মেয়েটি চমকে তাকাল। চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়। তারপর খুব নিচু, নরম স্বরে বলল—

—আমি আদ্রিতা।

কণ্ঠস্বরটাও যেন মেয়েটির স্বভাবের মতো—নরম, ধীর, নিঃশব্দ।

আশিক জিজ্ঞেস করল,

—কতদিন হলো এখানে আসছ?

—দুই মাস।

—গত সপ্তাহে তোমাকে দেখিনি।

মেয়েটি একটু থেমে বলল,

—শেষ সপ্তাহে ল্যাবে আসতে পারিনি।

আশিক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু বলল,

—ল্যাব শেষ হলে আমার অফিসে একবার দেখা করে যেও।

মেয়েটি মাথা নেড়ে আবার কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে গেল।

কিন্তু সেদিন ল্যাব শেষ হওয়ার পর আদ্রিতা আর আশিকের অফিসে গেল না।

চুপচাপ চলে গেল।

পরদিন আশিক তাকে কয়েকবার দেখল। কিন্তু ডাকল না। শুধু দূর থেকে দেখল।

কেন জানি মেয়েটিকে দেখে তার মনে হচ্ছিল—এই মেয়েটির নীরবতার মধ্যে কিছু একটা আছে।

কিন্তু সেটা কী?

জানার কোনো কারণও ছিল না, অধিকারও ছিল না।

তবু কৌতূহলটা থেকে গেল।

সপ্তাহের শেষ দিন। এরপর দুদিন ল্যাব বন্ধ থাকবে। তাই সেদিন আশিক আবার আদ্রিতাকে বলল,

—আজ কিন্তু ল্যাব শেষে আমার সঙ্গে দেখা করবে।

এবার আদ্রিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

ল্যাব শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর দরজায় মৃদু শব্দ হলো।

আশিক তাকিয়ে দেখল—আদ্রিতা দাঁড়িয়ে আছে।

—ভেতরে আসো।

আদ্রিতা এসে চুপচাপ একটা চেয়ারে বসল।

কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।

আশিকই নীরবতা ভাঙল।

—তুমি প্রথম দিন আমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে গিয়েছিলে।

আদ্রিতা মৃদু হাসল।

—ভয় পেয়েছিলাম।

—আমাকে?

—না। আসলে... কথা বলতে ভালো লাগে না আমার।

আশিক একটু অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

প্রশ্নটা শুনেই মেয়েটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে কিছু বলল না।

আশিক আবার বলল,

—তুমি সবসময় এত চুপচাপ থাকো কেন?

এবার আদ্রিতা মুখ তুলে তাকাল।

আশিক সেই চোখ দুটো প্রথমবার এত কাছ থেকে দেখল।

টানাটানা চোখ।

চোখের ভেতরে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা।

মুহূর্তের মধ্যেই চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল।

আশিক অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

—আরে! আমি কি কোনো ভুল কথা বললাম?

আদ্রিতা মাথা নাড়ল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—আমার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। তখন আমরা দুই বোন খুব ছোট।

আশিক চুপ করে শুনতে লাগল।

—বাবা থাকলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো। আমি পড়াশোনা করতে চেয়েছিলাম। অনেক দূর যেতে চেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সবকিছু তো ইচ্ছেমতো হয় না।

একটু থেমে আদ্রিতা জানালার বাইরে তাকাল।

—সংসার, দায়িত্ব... তারপর নিজের জীবন। একসময় বুঝলাম, কিছু স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়েই থাকে।

আশিকের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে গেল।

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—তোমার কষ্টের জন্য সত্যিই দুঃখিত। তবে একটা কথা মনে রেখো, জীবনে সব স্বপ্ন পূরণ না হলেও মানুষ তার ভেতরের আলোটা ধরে রাখতে পারে।

আদ্রিতা তাকাল।

মৃদু একটা হাসি ফুটল তার ঠোঁটে।

—সবসময় পারে?

আশিক উত্তর দিতে পারল না।

সেদিন আদ্রিতা চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ আশিক তার অফিসে বসে রইল।

তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

এত সুন্দর একটা মেয়ের চোখে এত দুঃখ কেন?

আদ্রিতার চোখ ছিল টানাটানা, মায়াবী। তার দোহারা গড়ন আশিকের মনে করিয়ে দিত পুরোনো কোনো বাংলা গল্পের চরিত্রকে। দুধে-আলতা গায়ের রং, মুখে এক ধরনের সতেজতা—দেখলে মনে হয় জীবন তাকে এখনো পুরোপুরি ক্লান্ত করতে পারেনি।

অথচ চোখ দুটো বলত অন্য কথা।

চোখ যেন জানত এমন কিছু, যা মুখ জানে না।


এরপর থেকে আশিক আর আদ্রিতার মধ্যে অল্পস্বল্প কথা হতে লাগল।

কখনো কম্পিউটারের কোনো সমস্যা নিয়ে।

কখনো কোর্সের পড়াশোনা নিয়ে।

কখনো একেবারে সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে।

কথা খুব বেশি নয়।

তবু আশিক বুঝতে পারল, তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।

এটা বন্ধুত্ব নয়।

প্রেম তো নয়ই।

তবু কোথাও যেন এক ধরনের আপনত্ব আছে।

আদ্রিতার কোনো প্রয়োজন হলে আশিক সাহায্য করতে চায়। আদ্রিতা কোনো সমস্যায় পড়লে আশিকের মনে হয়, তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।

কিন্তু কেন?

সে নিজেও জানে না।

হয়তো কিছু মানুষকে জীবনে ভালোবাসতে হয় না, বন্ধু বানাতেও হয় না—শুধু তাদের ভালো থাকা কামনা করতে ইচ্ছে করে।

আদ্রিতা ছিল তেমনই একজন।

একদিন কথায় কথায় আশিক জানতে পারল, আদ্রিতা বিবাহিত।

তার একটি ছোট সন্তানও আছে।

সংসারও সুখের।

আশিক অবাক হলো না, বরং এক ধরনের স্বস্তি পেল।

সে মনে মনে বলল—

ভালোই তো। মেয়েটা সুখে আছে।

কিন্তু তারপরও একটা প্রশ্ন তাকে ছাড়ল না।

তাহলে দুঃখটা কোথায়?

একজন মানুষের জীবনে সংসার থাকতে পারে, স্বামী থাকতে পারে, সন্তান থাকতে পারে, হাসি থাকতে পারে—তবু তার ভেতরে এমন কোনো ঘর থাকতে পারে কি, যেখানে কেউ কোনোদিন ঢোকে না?

আশিকের মনে হতে লাগল, আদ্রিতার ভেতরেও তেমন একটা ঘর আছে।

যে ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ।


দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।

কম্পিউটার কোর্সের শেষ পর্যায়।

আর কিছুদিন পর আদ্রিতা চলে যাবে।

আশিক জানে, তারপর হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না।

একদিন ল্যাবে বসে আশিক দূর থেকে আদ্রিতার দিকে তাকিয়ে ছিল।

মেয়েটি কম্পিউটারে কাজ করছে।

মাঝে মাঝে চুল ঠিক করছে।

কখনো কপাল কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে।

কখনো পাশের মেয়েটির সঙ্গে মৃদু হেসে কথা বলছে।

আশিক হঠাৎ ভাবল—

এই মেয়েটা কি সত্যিই সুখী?

তার সংসার আছে।

স্বামী আছে।

সন্তান আছে।

জীবন আছে।

তবু কেন তার চোখে মাঝে মাঝে এমন এক শূন্যতা নেমে আসে, যা কোনো শব্দে ধরা যায় না?

আশিকের মনে হলো, মানুষের সবচেয়ে গভীর দুঃখগুলো বোধহয় বলা যায় না।

কিছু ব্যথা ভাষা পায় না।

কিছু অভিমান কাউকে বলা যায় না।

কিছু স্মৃতি মানুষের সঙ্গে একই ঘরে থাকে, একই বিছানায় ঘুমায়, একই সংসারে হাঁটে—তবু কারও সঙ্গে তার পরিচয় হয় না।

হয়তো আদ্রিতার ভেতরেও তেমন কোনো গল্প আছে।

কিন্তু সেই গল্পের শেষ পাতাটা আশিক পড়তে পারছে না।


শেষ দিনের আগের দিন।

ল্যাব প্রায় ফাঁকা।

আশিক কাজ শেষ করে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে আদ্রিতার কণ্ঠ শুনতে পেল—

—আশিক ভাই...

আশিক ফিরে তাকাল।

—হ্যাঁ?

আদ্রিতা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল,

—আপনি কি আমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবেন?

আশিক অবাক।

—কী কথা?

আদ্রিতা মৃদু হেসে বলল,

—যেটা আপনি অনেকদিন ধরে জানতে চাইছেন।

আশিকের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।

সে বুঝতে পারল—আদ্রিতা তার চোখ এড়িয়ে যায়নি।

সে বুঝেছে আশিকের প্রশ্নগুলো।

তার নীরবতা নিয়ে আশিকের কৌতূহলও সে বুঝেছে।

আশিক ধীরে ধীরে বলল,

—তোমার মনে এত দুঃখ কেন?

আদ্রিতা কিছু বলল না।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে।

কম্পিউটার ল্যাবের কাচের জানালায় শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে।

আদ্রিতার চোখে সেই আলো পড়ে অদ্ভুত এক দীপ্তি তৈরি করল।

কিন্তু সেই দীপ্তির নিচে লুকিয়ে রইল অশ্রু।

অনেকক্ষণ পর সে বলল,

—সব দুঃখের গল্প বলা যায় না, আশিক ভাই।

আশিক নীরব।

—কিছু দুঃখ বললে মানুষ ছোট হয়ে যায়। কিছু দুঃখ বললে সংসার ছোট হয়ে যায়। আর কিছু দুঃখ আছে... যেগুলো বলার মতো মানুষই পাওয়া যায় না।

আশিক ধীরে ধীরে বলল,

—তাহলে আমি?

আদ্রিতা এবার তার দিকে তাকাল।

দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—আপনি হয়তো শুনতে পারবেন। কিন্তু আমার ভয় হয়... শুনলে হয়তো আমার মতো আপনিও এই দুঃখের অংশ হয়ে যাবেন।

আশিকের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে বুঝতে পারল, এতদিন যে নীরবতার দিকে তাকিয়ে ছিল, সেটি কেবল বিষণ্ণতা নয়।

তার ভেতরে একটা গল্প আছে।

একটা অসমাপ্ত গল্প।

একটা ব্যথা।

হয়তো কোনো পুরোনো ক্ষত।

হয়তো কোনো অপূর্ণতা।

হয়তো এমন কোনো সত্য, যা আদ্রিতা নিজের কাছেও পুরোপুরি স্বীকার করতে পারেনি।

আশিক কিছু বলল না।

শুধু বলল,

—তুমি চাইলে বলবে। না চাইলে কোনোদিন বলবে না। আমি জানতে চাই বলে তোমাকে বলতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

আদ্রিতা মৃদু হাসল।

—এই জন্যই হয়তো আপনাকে এতটা আপন মনে হয়।

আশিকও হাসল।

কিন্তু সেই হাসির ভেতর অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা ছিল।


পরদিন আদ্রিতার কোর্স শেষ হলো।

সবাই বিদায় নিচ্ছে।

হাসি, ছবি, শুভেচ্ছা—সবকিছুর ভিড়ে আদ্রিতা একবার আশিকের সামনে এসে দাঁড়াল।

—ভালো থাকবেন।

আশিক বলল,

—তুমিও।

—আমার জন্য দোয়া করবেন।

—সবসময়।

আদ্রিতা চলে গেল।

দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকাল।

আশিক তখনও দাঁড়িয়ে।

তাদের চোখাচোখি হলো।

কোনো কথা হলো না।

কথার প্রয়োজনও ছিল না।

কারণ কিছু সম্পর্ক কথায় তৈরি হয় না।

কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না।

কিছু মানুষ জীবনে আসে খুব অল্প সময়ের জন্য, অথচ তাদের নীরবতা অনেক বছর ধরে মনের ভেতর কথা বলে যায়।

আদ্রিতা চলে গেল।

কিন্তু তার সেই মায়াবী চোখ দুটো আশিকের মনে থেকে গেল।

আর থেকে গেল একটা প্রশ্ন—

আদ্রিতার সেই গোপন ব্যথাটা আসলে কী?

আশিক জানত না।

হয়তো কোনোদিন জানবেও না।

তবু তার মনে হলো, মানুষের জীবনে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য নয়—বয়ে বেড়ানোর জন্য আসে।

আদ্রিতার নীরবতারও হয়তো তেমনই কোনো উত্তর আছে।

আর যদি কোনোদিন, বহুদিন পর, আদ্রিতা ফিরে এসে বলে—

“আশিক ভাই, আজ আমি আমার গল্পটা বলতে চাই...”

তাহলে আশিক হয়তো কোনো প্রশ্ন করবে না।

শুধু চুপচাপ শুনবে।

কারণ সে জানে—

কখনো কখনো একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো সমাধান নয়;

শুধু এমন একজন মানুষ, যার সামনে সে নিজের গোপন ব্যথাটুকু নিরাপদে রেখে যেতে পারে।

আর আশিক হয়তো সেই মানুষটিই হতে চায়।

ভালোবাসার জন্য নয়।

অধিকার পাওয়ার জন্য নয়।

শুধু একজন মানুষের নীরবতার পাশে আরেকজন মানুষের নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য।

কারণ কিছু সম্পর্কের নাম না থাকাই হয়তো তাদের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়।



আদ্রিতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন