একটা সময় ছিল, তাওসিফ আর তাসফিয়ার গল্প যেন শেষই হতে চাইত না। দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে রাত নামত, শহর ঘুমিয়ে পড়ত, জানালার ওপাশে চাঁদ তার জায়গা বদলাত—কিন্তু তাদের কথা ফুরাত না।
কখনো খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে শুরু হতো গল্প, আর কখন যে সেই গল্প জীবনের গভীর কোনো অনুভূতিতে গিয়ে পৌঁছাত, তারা নিজেরাও বুঝতে পারত না। অভিমান, স্বপ্ন, ভয়, ভবিষ্যৎ—সবকিছুই তারা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিত।
কিন্তু ইদানীং কেমন যেন বদলে গেছে সব।
কথা হয়, তবে আগের মতো নয়। হুটহাট দু-চারটা কথা, তারপর নীরবতা। কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না—কী হয়েছে? কেন এমন হলো?
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো অভিযোগও নেই। দূরত্বটা যেন কোনো এক অদৃশ্য সন্ধ্যায় এসে তাদের মাঝখানে বসে পড়েছে।
তাওসিফ মাঝে মাঝে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাসফিয়ার নামটা অনলাইনে দেখলেও মেসেজ লিখতে পারে না। আবার তাসফিয়াও হয়তো একইভাবে অপেক্ষা করে—কিন্তু কেউই প্রথম কথাটা শুরু করতে পারে না।
শ্রাবণের এক বৃষ্টিস্নাত বিকেল।
আকাশটা সকাল থেকেই মেঘে ঢাকা। বিকেলের দিকে হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি। জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ পানি নামছে। তাওসিফ চুপচাপ বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।
তাসফিয়ার মেসেজ।
“আজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম।”
একটা ছোট্ট বাক্য।
কিন্তু তাওসিফের কাছে যেন বহুদিনের নীরবতার দরজা হঠাৎ খুলে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“কী দেখেছ?”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
“বলব না।”
“কেন?”
“বললে তুমি খুব বেশি খুশি হয়ে যাবে।”
তাওসিফ হেসে লিখল—
“তাহলে তো আরও শুনতে ইচ্ছে করছে।”
তারপর শুরু হলো সেই পুরোনো গল্প।
একটা মেসেজ থেকে আরেকটা মেসেজ। হাসি, অভিমান, পুরোনো স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া কথাগুলো—সব যেন একে একে ফিরে আসতে লাগল।
রাত কখন গভীর হয়ে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি।
বিদায় নেওয়ার আগে তাসফিয়া লিখল—
“আজ অনেকদিন পর ভালো লাগল কথা বলে।”
তাওসিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল—
“আমারও।”
আরও কিছু বলতে চেয়েও সে থেমে গেল।
কখনো কখনো কিছু অনুভূতি শব্দে বললে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।
মাঝরাত।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি।
টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন একটানা কোনো অচেনা কবিতা লিখে চলেছে। দূরে কোথাও মেঘ ডাকছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকে অন্ধকার ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠছে।
তাওসিফ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো—তাসফিয়া যদি এখন পাশে থাকত!
ভাবনাটা আসতেই সে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
তারপর কল্পনার ভেতর ধীরে ধীরে তৈরি হলো অন্য এক পৃথিবী।
তাসফিয়া পরেছে নীল শাড়ি।
বৃষ্টিভেজা চুল কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। চোখে সেই চিরচেনা মায়া।
তাওসিফ তার পাশে হাঁটছে।
শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে তারা দুজন গিয়ে বসেছে রাস্তার ধারের ছোট্ট এক টং দোকানে। চারপাশে বৃষ্টি। দোকানের টিনের চাল থেকে ধারার মতো পানি পড়ছে।
দোকানদার দুটো ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।
তাসফিয়া কাপ হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বলল,
—“জানো, বৃষ্টিতে চা খাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ আছে।”
তাওসিফ তাকিয়ে বলল,
—“তোমার সঙ্গে হলে সবকিছুরই আলাদা আনন্দ।”
তাসফিয়া চোখ নামিয়ে নিল।
বৃষ্টির শব্দের আড়ালে লুকিয়ে গেল তার লাজুক হাসি।
চা শেষ হলো।
কিন্তু বৃষ্টি থামল না।
বরং আরও বেড়ে গেল।
ফিরতে গিয়ে দুজনই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর তাসফিয়া হঠাৎ বলল,
—“এভাবে গেলে তো পুরো ভিজে যাব।”
তাওসিফ চারপাশে তাকিয়ে দূরে একটা ছোট্ট কুড়েঘর দেখতে পেল।
—“ওখানে একটু আশ্রয় নিই?”
তাসফিয়া মাথা নাড়ল।
দুজন ছুটে গিয়ে কুড়েঘরটার নিচে দাঁড়াল।
বাইরে তখন শ্রাবণের উন্মত্ত বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, দূরে মেঘের গর্জন আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো—সব মিলিয়ে পৃথিবীটা যেন হঠাৎ তাদের দুজনের জন্য থেমে গেছে।
তাসফিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
তাওসিফ তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
কথা ছিল অনেক।
কিন্তু কোনো কথাই মুখে আসছিল না।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
সেই চোখে ছিল বহুদিনের জমে থাকা প্রশ্ন, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা আর না-বলা ভালোবাসা।
তাসফিয়া ধীরে ধীরে বলল,
—“আমাদের এত দূরত্ব কেন হলো, তাওসিফ?”
তাওসিফ মৃদুস্বরে বলল,
—“জানি না।”
—“আমরা তো কোনোদিন ঝগড়াই করিনি।”
—“তবু দূরে চলে গিয়েছিলাম।”
—“আবার কি কাছে আসা যায়?”
তাওসিফ কোনো উত্তর দিল না।
শুধু তাসফিয়ার হাতটা আলতো করে ধরল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি।
মেঘ ডাকছে।
আর সেই শব্দের আড়ালে দুজন মানুষের দীর্ঘদিনের নীরবতা ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে।
তাসফিয়া মাথাটা তাওসিফের কাঁধে রাখল।
তাওসিফ তাকে আরও কাছে টেনে নিল।
সেই মুহূর্তে কোনো প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন ছিল না, কোনো বড় বড় কথা প্রয়োজন ছিল না।
শুধু অনুভব করাই যথেষ্ট ছিল—তারা এখনও একে অপরের কাছে অচেনা হয়ে যায়নি।
চোখে চোখে জমে থাকা কথাগুলো ধীরে ধীরে নীরবতায় মিশে গেল।
তাদের ঠোঁটে ফুটে উঠল বহুদিনের গোপন ভালোবাসার এক কোমল স্বীকারোক্তি।
বাইরে শ্রাবণের বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে নামল।
মনে হলো, আকাশও বুঝি তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প জানে।
হঠাৎ তাওসিফের ঘুম ভেঙে গেল।
জানালার বাইরে সত্যিই বৃষ্টি হচ্ছে।
ঘরটা অন্ধকার।
ফোনটা পাশে পড়ে আছে।
সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল।
স্বপ্নটা এতটাই বাস্তব ছিল যে তার বুকের ভেতর এখনও তাসফিয়ার উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে।
সে ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিনে তাসফিয়ার নাম।
কিছুক্ষণ দ্বিধা করে একটি মেসেজ লিখল—
“তুমি যে স্বপ্নের কথা বলেছিলে, আজ আমিও তোমাকে একটা স্বপ্নে দেখলাম।”
কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এল—
“কী দেখেছ?”
তাওসিফ জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তারপর লিখল—
“বলব না। বললে তুমি খুব বেশি খুশি হয়ে যাবে।”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল—
“তাহলে আজ রাতটা আবার গল্প করেই কাটাই।”
তাওসিফের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
বাইরে তখনও শ্রাবণের বৃষ্টি।
আর গভীর নিশিরাতে, দুই প্রান্তের দুটি মানুষ আবার ফিরে গেল সেই পুরোনো কথার পৃথিবীতে—যেখানে রাত ফুরিয়ে যায়, কিন্তু গল্প ফুরোয় না।
হয়তো কিছু সম্পর্ক কখনো হারিয়ে যায় না।
শুধু কিছুদিন নীরব হয়ে থাকে।
একটা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা, একটা স্বপ্ন কিংবা একটি ছোট্ট মেসেজ—
“আজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম।”
আবার তাদের ফিরিয়ে দিতে পারে সেই অসমাপ্ত কাব্যের কাছে।
সেই কাব্যের নাম—
নিশিরাতের কাব্য।

মোঃ হেলাল উদ্দিন