Saturday, June 6, 2026

'যাপিত জীবনের কথা' বইয়ের ভূমিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


ভূমিকা: স্মৃতির ক্যানভাসে ফিরে দেখা

সময় এক বহমান নদী। তার কোনো থমকে যাওয়া নেই, ক্লান্তি নেই। নদীর বুকে যেমন পলি জমে, মানুষের বুকেও তেমনি জমে ওঠে অজস্র স্মৃতির রেণু। জীবনের একটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়—এই যে চেনা-অচেনা, আলো-ছায়ার দিনগুলো পার করে এলাম, তার সবটুকুই কি কেবলই সময় পার করা? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে কোনো অলিখিত মহাকাব্য, যা একান্তই আমার, অথচ যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এই চেনা সমাজ, চেনা মানুষ আর চেনা প্রকৃতি?

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সেই অমিয় বাণী—"নিজেকে জানো"—আমার জীবনের এক পরম নির্দেশক। যুগে যুগে মানুষ নিজেকে খোঁজার জন্য কত পথ পাড়ি দেয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, নিজেকে জানার সেই নিরন্তর প্রচেষ্টারই একটি লিখিত রূপ হলো এই আত্মজীবনী। নিজের ভেতরের আলো-আঁধারিকে চেনা, নিজের সীমাবদ্ধতা আর সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করার এই যে মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা, 'যাপিত জীবনের কথা' মূলত তারই এক বিনীত প্রকাশ।

তাই এটি কোনো আত্মশ্লাঘা বা নিজের মহিমা কীর্তনের দলিল নয়। এটি যেমন আমার আত্মআবিষ্কারের জার্নি, তেমনি আমার জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের গল্প। এই দীর্ঘ পথে আমি যেমন সফলতার দেখা পেয়েছি, তেমনি মুখোমুখি হয়েছি চরম সংকট, হতাশা আর কঠিনতম সময়ের। কিন্তু সেই কষ্টের দিনগুলোতে কীভাবে ধৈর্যের হাতটি শক্ত করে ধরে রাখতে হয়, কীভাবে ঝড়ের মধ্যেও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমি খুব কাছ থেকে অর্জন করেছি। আমার বিশ্বাস, জীবনের এই যন্ত্রণাদগ্ধ অধ্যায়গুলো এবং তা থেকে উত্তরণের গল্পগুলো যদি সততার সাথে প্রকাশ করা যায়, তবে তা হয়তো অন্য কোনো পথহারা বা সংগ্রামী মানুষকে একটুখানি আলো দেবে, একটুখানি ধৈর্য ধরার সাহস জোগাবে। অন্যের জীবনের লড়াইয়ে যদি আমার এই অভিজ্ঞতা বিন্দুমাত্র সহায় হতে পারে, তবেই এই লেখার মূল সার্থকতা।

১৯৯০ সালের সেই চেনা মফস্বল বা গ্রামের চাদরে মোড়ানো শৈশব থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সেই মুখরিত করিডোর, হল জীবনের মধ্যরাতের আড্ডা, লাইব্রেরির বইয়ের গন্ধ—সবকিছুই আমার মনন ও চিন্তার জগতকে গড়ে তুলেছে। পরবর্তীতে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের একজন সদস্য হিসেবে ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের চোখে যখন সম্ভাবনার আলো দেখেছি, তখন বারবার মনে হয়েছে—শিক্ষা কেবল পেশা নয়, এটি এক পরম ব্রত।

একদিকে ক্লাসরুমের দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে সৃজনশীলতার তাগিদে কবিতার শব্দবুনন কিংবা সামাজিক বাস্তবতার পটভূমিতে উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টি—এই দুইয়ের দোলাচলেই কেটেছে আমার দিনরাত্রি। কখনো লালন সাঁইয়ের পরম সত্যের সন্ধান, কখনো এ দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের জটিল বাঁকগুলো নিয়ে গবেষণার টেবিলে নির্ঘুম রাত পার করা—সবকিছুই এই যাপিত জীবনের একেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই পথচলায় আমার মা-বাবা, আমার জীবনসঙ্গী, এবং আমার সন্তানেরা আমাকে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে ভালোবাসার বন্ধনে, তা ছাড়া আমি আজ যা কিছু, তার কোনো কিছুই পূর্ণতা পেত না।

স্মৃতি বড়ই প্রবঞ্চক। মাঝে মাঝে সে বড় বেশি ধূসর হয়ে যায়, আবার কখনো কখনো এক ফালি রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে মনের জানালায় এসে কড়া নাড়ে। সেই কড়া নাড়ার শব্দগুলোকেই, নিজের ভেতরের সত্যকে চেনার প্রয়াস আর জীবনদর্শনকেই এক মলাটের ভেতর ধরে রাখার চেষ্টা করেছি এখানে।

সবাইকে আমন্ত্রন আমার যাপিত জীবনের অন্দরমহলে। আসুন, এই স্মৃতির পথ ধরে আমরা সবাই একবার নিজের ভেতরে তাকাই।



'যাপিত জীবনের কথা' বইয়ের ভূমিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Thursday, June 4, 2026

অদেখার আগুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ফেসবুকের নীল পর্দার ওপারে নীল রঙের বাতিটা জ্বলে উঠলেই দুটোর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দোলাচল শুরু হয়। শহরের কোলাহল থেমে যাওয়া নিঝুম রাতে, যখন ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই, চারদিকের নীরবতা ভেঙে মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ওঠে কিছু শব্দ। সেই শব্দগুলোই যেন দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের মাঝে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য মায়াবী সেতু।

একজন ‘নীলকণ্ঠ’, আর অন্যজন ‘মেঘা’। দুটোই ছদ্মনাম। গত ছয়টি মাস ধরে তাদের দিন শুরু হয় একে অপরের ‘শুভ সকাল’ দিয়ে, আর রাত শেষ হয় ইনবক্সের চ্যাটবক্সে সুখ-দুঃখের গল্প বুনে। সকালের প্রথম আলো থেকে রাতের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত—অফিসের ক্লান্তি, বৃষ্টির আনন্দ, প্রিয় বইয়ের আলোচনা কিংবা হঠাৎ মন খারাপের গল্প; সবকিছুই ভাগাভাগি হয় দুজনের মধ্যে।

তারা কেউ কাউকে দেখেনি, কেউ কারও কণ্ঠও শোনেনি। জানে না একে অপরের হাঁটার ভঙ্গি, হাসির ধরন কিংবা চোখের ভাষা। প্রোফাইল পিকচারে নীলকণ্ঠের দেওয়া আছে একটা গিটারের ছবি, আর মেঘার আইডিতে একরাশ কৃষ্ণচূড়া ফুল। যতটুকু পরিচয়, যতটুকু চেনা—সবটাই ওই চ্যাটের কিবোর্ডে টাইপ হওয়া শব্দের ফ্রেমে বন্দী। অথচ প্রতিদিনের ক্লান্তি আর একাকীত্বের মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি না করলে তাদের যেন দিনটাই কাটতে চায় না।

তারা বন্ধু নাকি তার চেয়েও বেশি, কিংবা কেউ কারও প্রেমে পড়েছে কি না—তা নিজেরাও নিশ্চিত নয়। কোনো দিন কয়েক ঘণ্টা মেঘার কোনো খবর না পেলে নীলকণ্ঠ অস্থির হয়ে উঠত। আবার যখন মেঘা ফিরে এসে বলত, "আজ খুব ব্যস্ত ছিলাম", তখন অদ্ভুত এক স্বস্তি নেমে আসত তার মনে। নীলকণ্ঠ রাতে ঘুমানোর আগে ভাবত, “আজ মেঘা মেসেজ দিতে একটু দেরি করল, মেয়েটা কি আমাকে মিস করছিল?”

ওদিকে মেঘাও জানালার বাইরে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ভাবত, “ছেলেটি কি একটু বেশি ভাবছে আমাকে? কথার ফাঁকে ফাঁকে ও যেভাবে আমার সামান্য মন খারাপের কথা বুঝে ফেলে, ও কি আমার ভাবনায় হারিয়ে গেছে?”

কিন্তু তারা কেউই এই গোলকধাঁধার উত্তর খুঁজতে সাহস পেত না। বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে এই ভার্চুয়াল মায়ার শেষ কোথায়, তা তাদের দুজনেরই অজানা। অদেখা সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই অনিশ্চয়তাই।

সেদিন ছিল এক বর্ষণমুখর রাত। জানালার বাইরে ঝুম বৃষ্টি, আর ইনবক্সে জমে উঠেছে তাদের চিরচেনা কথার মেলা। কথা বলতে বলতে কখন যেন হালকা চালের আলাপটা বেশ গভীরে চলে গেল। কথার সেই গভীরতায় হঠাৎ যেন মেঘার মনে এক অদ্ভুত জড়তা ভর করল। সে একটু গম্ভীর হয়ে টাইপ করল:

 “শুনুন নীলকণ্ঠ, এই যে এক অদেখা আকর্ষণ... এর পেছনে নিজেকে পুড়িয়ে খাক করবেন না প্লিজ। আমি কাউকে এভাবে পোড়াতে চাই না।”

নীলকণ্ঠ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। বুকে এক মৃদু ধাক্কা লাগল। একটি বাক্য কখনও কখনও অনেক দীর্ঘ নীরবতার জন্ম দেয়। তার মনে পড়ল, কয়েকদিন আগেই মেঘা কথায় কথায় বলেছিল, সে নাকি আজকাল একজনকে খুব মিস করে। নীলকণ্ঠ এতদিন মনে মনে নিজেকেই সেই ‘একজন’ ভেবে বসে ছিল। মেঘার এই হঠাৎ দূরত্ব তৈরির চেষ্টা দেখে নীলকণ্ঠের মনে হলো, তবে কি সে ভুল ভাবছিল?

একটু বিষণ্ণ হেসে নীলকণ্ঠ উত্তর দিল:

“তার মানে, আপনি কিছুদিন আগে যাকে মিস করার কথা বলেছিলেন... সেই ব্যক্তিটি আমি নই, তাই তো?”

মেঘা ওপাশ থেকে ‘টাইপিং...’ দেখাচ্ছিল, কিন্তু কোনো মেসেজ পাঠাল না। স্ক্রিনের ওপারে নীরবতা জমতে লাগল। নীলকণ্ঠ আবার লিখল:

“আচ্ছা, আপনি আমাকে পোড়াতে চান না বুঝলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে... আপনি নিজে কি পুড়তে চান?”

এবারও কোনো উত্তর এল না। শুধু দেখা গেল, মেঘা অনলাইনে আছে আর মেসেজটা ‘Seen’ হয়ে পড়ে আছে। সে যেন নীলকণ্ঠকে এক অদ্ভুত উত্তরের অপেক্ষায় ঝুলিয়ে রেখে দিল। ওপারে বসে মেঘা হয়তো নিজের মনের সাথেই যুদ্ধ করছিল; হয়তো উত্তর খুঁজছিল, কিংবা নিজের কাছেই কিছু স্বীকার করতে পারছিল না।

সেই ভারী নীরবতাকে ভাঙল নীলকণ্ঠই। চ্যাটবক্সে শেষবারের মতো আঙুল চালিয়ে কবিসুলভ একটা বাক্য লিখে পাঠাল সে:

  “পাখিদের জানতে হয় উড়তে, আর কবিদের জানতে হয় পুড়তে।”

মেসেজটা পড়েই ওপারে মেঘার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান কিন্তু গভীর হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত টাইপ করল:

“উফ! একদম আটকে দিলেন তো। কথার জালে এভাবে আটকে দেওয়াটা অন্যায়।”

শুধু ওই দুটি শব্দ—‘আটকিয়ে দিলেন’। কিন্তু তার ভেতর কত অনুভূতি লুকিয়ে ছিল, তা কেউ জানেনা। মেঘা হয়তো সত্যিই আটকে গিয়েছিল। কথার জালে, অনুভূতির কাছে, নাকি এমন এক সত্যের সামনে—যা উচ্চারণ করলে সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে যেতে পারত?

নীলকণ্ঠ আর কথা বাড়াল না। মেঘার এই ‘আটকে যাওয়া’র মাঝেই সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পেল। রহস্যটা রহস্যই থাক, মায়াটা আরও একটু গাঢ় হোক। সে বিদায়ের একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাল:

“আজকের মতো তবে আসি। শুভরাত্রি, ভালো থাকবেন।”

ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে নীলকণ্ঠ যখন অন্ধকারের দিকে তাকাল, তখন তার ঠোঁটে একটা স্মিত হাসি। ওদিকে মেঘা ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সে ভাবল, কিছু মানুষকে না দেখেও বোধহয় এতটা গভীরভাবে চেনা যায়।

রাত আরও গভীর হলো, কিন্তু দুই মানুষের ভেতরে জন্ম নেওয়া প্রশ্নগুলো ঘুমাল না। আসলে কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয়না, কিছু অনুভূতির কোনো স্বীকৃতি লাগে না। কিছু মানুষ জীবনে আসে, খুব কাছে চলে আসে, অথচ দূরত্বের সব নিয়ম অক্ষুণ্ণ থাকে।

তারা শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়েছিল কি না, তা আজও জানা যায়নি। কিন্তু সেই রাতের পর দুজনেই বুঝেছিল—অদেখা মানুষও কখনও কখনও হৃদয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান সত্য হয়ে উঠতে পারে। আর কিছু আগুন আছে, যা জ্বলে ওঠে কোনো স্পর্শ ছাড়াই; শুধু কিছু শব্দ, কিছু অপেক্ষা আর কিছু অসমাপ্ত উত্তরের ভেতর।

এক টুকরো অদেখা আকর্ষণ আর উত্তরের অপেক্ষায় থাকা একটা প্রশ্ন নিয়ে তাদের গল্পটা আসলে চলতেই থাকল... পর্দার ওপারে, মনের গভীরে।





অদেখার আগুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন