Sunday, April 19, 2026

বিস্মৃতির ওপারে সুখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নীলিমার ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়িটা টিকটিক শব্দ করছিল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বহু বছর পর অয়ন আর নীলিমা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। অয়ন খেয়াল করল, নীলিমার চোখে আগের সেই চঞ্চলতা নেই, সেখানে এখন এক থিতু হওয়া প্রশান্তি।

​অয়ন আলতো করে হাসল। "জানতাম, তুমি আমার চেহারাটা ভুলে যাবে।"

​নীলিমা কিছুটা থতমত খেল। অপরাধবোধের সুর নিয়ে বলল, "আসলে সময়টা এত দ্রুত চলে গেল যে..."

​"ভুলে তো যাবেই, তাতে আমি অবাক হইনি," অয়ন মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।

​নীলিমা জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কেন অবাক হওনি? তবে কি আমায় কোনোদিন ভালোবাসনি?"

​অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার কাঁচে জমে থাকা বৃষ্টির বিন্দুর দিকে তাকিয়ে সে বলল, "ভালোবাসা আর প্রয়োজন এক নয় নীলিমা। তুমি সেদিন আমার কাছে এসেছিলে স্রেফ এক সাময়িক শূন্যতা থেকে। তোমার জীবনে তখন কেউ ছিল না, একটা আশ্রয়ের খুব দরকার ছিল। আমি শুধু সেই সময়টুকুর সঙ্গী ছিলাম। আমি সেদিনই বলেছিলাম, সময় পূর্ণ হলে তুমি আমায় ভুলে যাবে।"

​নীলিমা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো গলায় আটকে গেল। অয়ন আবার বলতে শুরু করল, "আজ তোমার বুকে অপেক্ষার প্রিয় মানুষ আছে। তোমার ঘর আছে, সংসার আছে। সেই সুখের ভিড়ে আমার ঝাপসা হয়ে যাওয়া চেহারার স্মৃতি মনে না থাকাই তো স্বাভাবিক। আর সেটাই ভালো।"

​নীলিমার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। ধরা গলায় সে শুধাল, "তাহলে কি আর কোনোদিন মনে রাখব না? একদমই না?"

​অয়ন দরজার দিকে পা বাড়াল। চলে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসল। "দরকার নেই নীলিমা। কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়াই মুক্তির নামান্তর। তুমি সুখে থাকো, আমি সেটাই চেয়েছিলাম।"

​অয়ন বৃষ্টির শব্দে মিলিয়ে গেল। নীলিমা বুঝতে পারল, কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধু নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলোকিত করার জন্য। অয়ন ছিল সেই মরীচিকা, যে তাকে মরুভূমি পার করে সবুজ বনানীর খোঁজ দিয়ে নিজে হারিয়ে গেছে।

 

অপ্রাপ্তির মায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিলেন শফিক সাহেব। মেঘগুলো নিজের ইচ্ছেমতো ভেসে বেড়াচ্ছে, কেউ কাউকে জোর করে ধরে রাখছে না। অথচ মানুষের জীবনে এই সহজ সত্যটা মেনে নেওয়া কত কঠিন।

পাশের টেবিলে বসা তরুণ কলিগ সজীব আজ খুব অস্থির। ওর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা বিয়ে করতে রাজি নয়, আর সজীব চাইছে যেকোনো উপায়ে—পরিবারের চাপে হোক বা আবেগ দিয়ে—মেয়েটিকে রাজি করাতে। সজীবের এই ছটফটানি দেখে শফিক সাহেব মৃদু হেসে বললেন, "সজীব, এক গ্লাস জল যদি তুমি তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পাও, তবেই তার স্বাদ অনুভব করবে। আর যদি কারো মুখে জোর করে জল ঢেলে দাও, সে শুধু দমবন্ধ হয়ে আসার কষ্টই পাবে।"

সজীব অবাক হয়ে তাকালো। শফিক সাহেব ধীরস্থির কণ্ঠে নিজের জীবনের মূলমন্ত্র নিয়ে বলতে শুরু করলেন। "আমার জীবনের একটা বড় নীতি হলো—আমি কখনো কোনো কিছু জোর করে আদায় করতে চাইনি। সেটা পদোন্নতি হোক, কিংবা মানুষের ভালোবাসা। লোকে বলে আমি উচ্চাকাঙ্ক্ষী নই, কিন্তু আমি জানি, জবরদস্তিতে পাওয়া বিজয়ের মধ্যে এক ধরণের পরাজিত আত্মা লুকিয়ে থাকে। জোর করে পাওয়া সঙ্গ সৌন্দর্য হারায়, গভীরতা হারায়।"

তিনি বলতে থাকলেন, "একবার একটা বড় প্রজেক্টের দায়িত্ব আমার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখলাম, কর্তৃপক্ষ অন্য একজনকে সেই জায়গা দিতে চাইছে। আমি চাইলেই ওপর মহলে তদ্বির করতে পারতাম। কিন্তু আমি এক মুহূর্তের জন্যও তা করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যে চেয়ার আমার যোগ্যতার সম্মানে আমায় ডাকবে না, সেই চেয়ারে বসে আমি শান্তি পাব না। ঠিক একইভাবে, অনেক আগে একজনকে খুব ভালোবেসেছিলাম। সে যখন জানালো তার পথ অন্য দিকে, আমি তাকে আটকে রাখার জন্য কোনো নাটকীয়তা করিনি। কারণ আমি জানতাম, শরীর ধরে রাখা যায়, মন নয়।"

কথাগুলো শেষ করে শফিক সাহেব জানালার দিকে ফিরলেন। বাইরে তখন গোধূলির আলো নিভে আসছে, আকাশটা কেমন ঘোলাটে বেগুনী রঙ ধারণ করেছে। সজীব খেয়াল করল, শফিক সাহেবের ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত, ম্লান হাসি লেপ্টে আছে—যা ঠিক সুখের নয়, আবার বিষাদেরও নয়।

"সবাই মনে করে আমি হেরে গেছি, সজীব," শফিক সাহেব ফিসফিস করে বললেন, যেন নিজের সাথেই কথা বলছেন। "কিন্তু তারা জানে না, ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও একটা প্রচণ্ড ক্ষমতা থাকে। যে চলে যেতে চায়, তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে বিদায় করার পর যে নিঃশব্দ হাহাকার জন্মায়, তার চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আর নেই।"

সজীবের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে লক্ষ্য করল শফিক সাহেবের টেবিলের ওপর একটা পুরনো কাঁচের জার। তাতে কোনো প্রজাপতি নেই, কোনো ফুল নেই—শুধু একমুঠো ছাই।

শফিক সাহেব জারের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "তুমি জানো তো, জোর করে কাউকে আগলে রাখলে সে একটা সময় মরে যায়। কিন্তু তাকে যদি তুমি নিজের ইচ্ছায় মরতে দাও, তবে সে তোমার স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকে। আমি কাউকে পাইনি ঠিকই, কিন্তু কাউকে হারাইওনি। কারণ যা আমার ছিল না, তাকে হারানোর শোক আমার সাজে না।"

হঠাৎ অফিসের করিডোরের বাতিটা একবার জ্বলে উঠেই দপ করে নিভে গেল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই শফিক সাহেবের অবয়বটা কেমন ঝাপসা হয়ে এল। সজীবের মনে হলো, শফিক সাহেব যেন এই ঘরের কোনো রক্তমাংসের মানুষ নন, বরং বহু বছর ধরে জমে থাকা কোনো ত্যাগের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

শফিক সাহেব অন্ধকারেই ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলেন, "পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার রহস্য অনেক বেশি গভীর, সজীব। পূর্ণিমার চাঁদকে ছোঁয়া যায় না বলেই মানুষ আজও তার দিকে তাকিয়ে কবিতা লেখে। যেদিন মানুষ চাঁদকে হাতের মুঠোয় আনবে, সেদিন থেকে চাঁদ তার রূপ হারাবে। আদায়ের নেশা ছেড়ে দিতে শেখো, দেখবে জগতটা তোমার পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়েছে—ঠিক যেমন এই ছায়াগুলো এখন আমার পিছু নিয়েছে।"

শফিক সাহেব বেরিয়ে গেলেন। সজীব দেখল, করিডোরের টিমটিমে আলোয় শফিক সাহেবের কোনো ছায়া পড়ছে না। তিনি যেন অন্ধকারের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছেন। সজীব সেই শূন্য ঘরে একা দাঁড়িয়ে রইল, আর তার কানের কাছে বারবার বাজতে লাগল—“জোর করে পাওয়া সঙ্গ সৌন্দর্য হারায়, গভীরতা হারায়... আর যা হারায়, তা কোনোদিন ফিরে আসে না।”

 


 অপ্রাপ্তির মায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন