শহরের
ব্যস্ত সিগন্যালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নীলা। চারপাশে গাড়ির হর্ন, মানুষের
তাড়া, সময়ের তীব্র চাপ—সবকিছুর মাঝেই সে ছিল অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতায় মোড়া।
পরনে কুচকুচে কালো বোরকা, চোখে গাঢ় কাজল। সিগন্যাল ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে
উল্টো দিকের একটি রিকশায় বসা আরিয়ানের সঙ্গে হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে যায় তার।
টানাটানা
সেই চোখে ছিল এক অজানা অস্থিরতা, যেন বহুদিনের চেনা কোনো অনুভব হঠাৎ সামনে
এসে দাঁড়িয়েছে। এক পলকের সেই দৃষ্টি আরিয়ানকে মুহূর্তেই থমকে দিল। মনে
হলো—এই চোখ দুটোকে সে যেন বহু বছর ধরে চেনে। সিগন্যাল বদলে গেল, রিকশা
এগিয়ে গেল, কিন্তু ওই এক পলকের দেখা আরিয়ানের মনে গভীর দাগ কেটে রেখে গেল।
নীলা
ছিল ভীষণ জেদি। আরিয়ানের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিও তাকে নাড়া দিয়েছিল গভীরভাবে।
সেদিনের পর থেকে সে চেষ্টা করতে লাগল সেই অচেনা যুবকটিকে খুঁজে পেতে। হাতে
কোনো তথ্য নেই—নাম নেই, পরিচয় নেই—শুধু স্মৃতিতে গেঁথে থাকা একটি অবয়ব।
ফেসবুকের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড, লোকেশন সার্চ আর অসংখ্য প্রোফাইল ঘেঁটে কয়েক
রাত কাটিয়ে অবশেষে সে খুঁজে পেল আরিয়ানকে। দেরি না করে পাঠিয়ে দিল ফ্রেন্ড
রিকোয়েস্ট।
আরিয়ান
প্রথমে বিস্মিত হলেও কথোপকথন শুরু হতে বেশি সময় লাগেনি। সে জানত না নীলার
জীবনের অন্য পিঠের কথা। নীলা বিবাহিত—তার স্বামী দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে
প্রবাসে। বিশাল বাড়ির ভেতর প্রতিদিন সে একা। দেয়ালের সঙ্গে কথা বলতে বলতে
ক্লান্ত নীলা আরিয়ানের মধ্যে যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া কিশোরীবেলাকে খুঁজে
পায়।
কথার পিঠে কথা জমে। প্রতিদিনের মেসেজ আর গভীর রাতের ফোন কলে তাদের মাঝে তৈরি হয় এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধন। একদিন নীলা স্বীকার করে বলে,
“জানি আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সমাজ একে পাপ বলবে। কিন্তু আমার এই একাকীত্বের মরুভূমিতে তুমি ছিলে এক পশলা বৃষ্টির মতো।”
আরিয়ান জানত—এই সম্পর্কের শেষ আছে, শুরু নেই। নীলার স্বামীর দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে আসছিল। বাস্তবতার কথা তুললেই নীলা বলত,
“ভবিষ্যৎ নেই বলে কি বর্তমানকে বাঁচতে নেই?”
তারা
জানত—তারা দুই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা। তাদের ভালোবাসা ছিল বিকেলের শেষ আলোয়
লম্বা হয়ে পড়া ছায়ার মতো—দীর্ঘ, অথচ ক্ষণস্থায়ী। সামাজিক স্বীকৃতি নেই, ঘর
বাঁধার স্বপ্ন নেই—আছে শুধু এক পশলা ভালো লাগা আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।
কালো বোরকার আড়ালের সেই চোখ দুটো আজও আরিয়ানকে কাঁদায়, তবে সে কান্না
কষ্টের নয়—প্রিয় কোনো স্মৃতি হারানোর মধুর বেদনা।
এক
গভীর রাতে ফোনের ওপাশে নীলার কান্নাভেজা কণ্ঠ আরিয়ানের বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে
দেয়। আর কয়েকদিন পরই নীলার স্বামী দেশে ফিরবে। তখন এই লুকিয়ে কথা বলা,
খুনসুটি আর মেসেজের টুনটুন শব্দ চিরতরে থেমে যাবে।
নীলা ফুঁপিয়ে বলে ওঠে,
“মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে সব ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসি। যেখানে কোনো প্রবাস নেই, কোনো একাকীত্ব নেই—শুধু তুমি আছ।”
আরিয়ান শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
“নীলা,
আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেখানে ভালোবাসার চেয়ে দায়িত্বের ওজন অনেক
বেশি। আমি চাইলেই তোমার হাত ধরতে পারি না, আর তুমি চাইলেই সব ছিঁড়ে আসতে
পারো না।”
শেষ
পর্যন্ত নীলার স্বামীর ফেরার তারিখ চূড়ান্ত হয়। সেদিন শেষবারের মতো তারা
দেখা করেছিল সেই চেনা মোড়টায়। কালো বোরকায় ঢাকা নীলার অবয়ব স্থির, শুধু
কাজল মাখা চোখ দুটো লোনা জলে ভাসছে। কাঁপা হাতে সে একটি ছোট চিরকুট
আরিয়ানের হাতে দিয়ে বলে,
“হয়তো
কোনো এক জন্মে আমি শুধু তোমারই ছিলাম। এই জন্মে না হয় তোমার স্মৃতিগুলোকেই
সঙ্গী করে নিলাম। ভালো থেকো সেই অচেনা যুবক—যে চেনা হয়েও আজ পর হয়ে
যাচ্ছে।”
তারা
কেউ কাউকে ব্লক করেনি, আবার কথাও বলেনি। আরিয়ান প্রতিদিন নীলার প্রোফাইল
ছবি দেখে, নীলা চুপচাপ আরিয়ানের স্ট্যাটাস পড়ে। মেসেজ নেই, তবু অনুভব
আছে—প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
মাঝে
মাঝে বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসে, আরিয়ান সেই মোড়টায় গিয়ে দাঁড়ায়। সে
জানে কালো বোরকা পরা মেয়েটি আর আসবে না। তবু বাতাসে আজও ভাসে সেই টানাটানা
চোখের মায়া আর এক অসমাপ্ত ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস।
ভালোবাসা হয়তো সবসময় মিলনে পূর্ণতা পায় না—কিছু ভালোবাসা অমর হয়, শুধু হৃদয়ের গভীরে থেকে যাওয়ার মধ্য দিয়েই।

