Monday, August 24, 2026

শরতের সেই মায়াবী চোখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


শরতের বিকেলটা এমনিতেই অন্যরকম।

আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে হালকা শীতের আগমনী বার্তা, দূরের মাঠজুড়ে কাশফুলের দোলা। ঈশ্বরদী শহরের ব্যস্ততার মাঝেও সেদিন বিকেলটা যেন অদ্ভুত এক নীরবতায় মোড়া ছিল।

ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল হিমেল।

হিমেল বহু বছর ধরে এই শহরে থাকে। প্রতিদিন কতবার যে এই কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করেছে, তার হিসাব নেই। অথচ সেদিনের আগে কখনো কলেজের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা হয়নি তার।

কেন যেন সেদিন দাঁড়িয়েছিল।

হয়তো কোনো অজানা গল্পের শুরুতেই মানুষকে কোথাও দাঁড় করিয়ে দেয় নিয়তি।

হিমেল অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল কলেজের মূল ফটকের দিকে।

এক তরুণী ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।

দুধে-আলতা মেশানো গায়ের রং। পরনে কাশফুলের মতো শুভ্রতার সঙ্গে হালকা নকশার শাড়ি। কোমর ছুঁয়ে নামা এলোমেলো চুল। আর সেই চোখ—

হিমেল জীবনে অনেক সুন্দর চোখ দেখেছে। কিন্তু এমন চোখ কখনো দেখেনি।

এক পলক দেখেই তার মনে হলো, তামিল কোনো সিনেমার নায়িকা বুঝি শুটিং করতে এসে ভুল করে এই ছোট্ট শহরের কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে গেছে।

মেয়েটি একবার তাকিয়েছিল।

শুধু একবার।

কিন্তু সেই একবারেই হিমেলের পৃথিবী যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

হিমেল তাকিয়েই রইল।

চোখের নেশা কাটিয়ে যখন নিজের চারপাশে ফিরে এল, তখন মেয়েটি আর নেই।

গেটের ভিড়ের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

হিমেল কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিজের মনেই বলল,

— কে মেয়েটা?

সেদিন রাতে ঘুম এলো না।

একটি অচেনা মুখ, অথচ চেনা চেনা এক জোড়া চোখ বারবার মনে পড়তে লাগল।

পরদিন হিমেল খোঁজ শুরু করল।

জানতে পারল, মেয়েটি এই কলেজের ছাত্রী নয়। গ্রামের একটি কলেজে পড়ে। পরীক্ষা দিতে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে এসেছিল।

ব্যস, এতটুকুই।

নাম জানা হলো না।

বাড়ি কোথায় জানা হলো না।

কোন গ্রামের মেয়ে, তাও জানা হলো না।

তবু হিমেলের মনে হলো, সে মেয়েটিকে আবার দেখবেই।

দিন গেল।

পরীক্ষা শেষ হলো।

মেয়েটি আর এল না।

হিমেলও তার খোঁজ পেল না।

কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। যুক্তি যেখানে বলে, ‘ভুলে যাও’, মন সেখানে বলে, ‘অপেক্ষা করো।’

হিমেল অপেক্ষা করতে শুরু করল।

প্রতিদিন বিকেল নামলেই সে কলেজ গেটের কাছে এসে দাঁড়াত। কখনো দশ মিনিট, কখনো আধঘণ্টা। কোনো দিন এক ঘণ্টাও কেটে যেত।

কেউ জানত না সে কীসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।

বন্ধুরা হাসত।

— কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে কী করিস?

হিমেল হেসে বলত,

— এমনিই।

কিন্তু সে জানত, ‘এমনিই’ নয়।

সে অপেক্ষা করছিল সেই মায়াবী চোখের জন্য।

এভাবে কেটে গেল প্রায় এক বছর।

এক বছর পর আবার শরৎ এলো।

আবার আকাশে সাদা মেঘ।

আবার বাতাসে কাশফুলের গন্ধ।

আবার সেই কলেজের গেট।

সেদিনও হিমেল দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ—

চোখ দুটো যেন বিশ্বাস করতে চাইল না।

সামনে সেই মেয়েটি।

একই মায়াবী চোখ।

হিমেলের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।

সে মনে মনে বলল,

‘এবার যদি হারিয়ে যায়?’

কিছুক্ষণ দ্বিধা করে অবশেষে সাহস সঞ্চয় করল।

মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

— একটু শুনবেন?

মেয়েটি থেমে তাকাল।

সেই চোখ।

এক বছর ধরে যে চোখের অপেক্ষায় ছিল হিমেল, আজ সেই চোখ তার সামনে।

মেয়েটি মৃদুস্বরে বলল,

— জি?

হিমেল কিছুক্ষণ কথা খুঁজে পেল না।

শেষ পর্যন্ত বলল,

— আপনার নামটা জানতে পারি?

মেয়েটি একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

— সাথী।

একটি নাম।

মাত্র দুটি অক্ষরের মতো ছোট্ট একটি পরিচয়।

কিন্তু হিমেলের কাছে সেদিন মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দটি বুঝি ‘সাথী’।

সেদিন খুব বেশি কথা হয়নি।

সাথী জানাল, পরীক্ষার জন্য সে শহরে একা থাকছে।

হিমেল শুধু বলল,

— আপনাকে এক বছর আগে দেখেছিলাম।

সাথী অবাক হয়ে বলল,

— এক বছর আগে?

— জি। এই কলেজ গেটে।

— তারপর?

হিমেল একটু হেসে বলল,

— তারপর আপনাকে খুঁজেছি।

সাথী কিছু বলল না।

শুধু চোখের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।

সেদিন বিদায়ের সময় দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ।

তারপর সাথী চলে গেল।

কিন্তু এবার আর সে হারিয়ে গেল না।

কয়েক দিন পর আবার দেখা হলো।

তারপর ফোন নম্বর নেওয়া হলো।

ফেসবুকে বন্ধুত্ব হলো।

আর ধীরে ধীরে অচেনা দুজন মানুষ পরিচিত হতে শুরু করল।

সকালের ‘কেমন আছেন?’ থেকে রাতের ‘ঘুমাবেন না?’—কথার পরিধি বাড়তে লাগল।

সাথী জানল হিমেলের পছন্দের বইয়ের কথা।

হিমেল জানল সাথী বৃষ্টি ভালোবাসে।

সাথী জানল হিমেল চা ছাড়া সকাল শুরু করতে পারে না।

হিমেল জানল, সাথী মন খারাপ করলে খুব চুপ হয়ে যায়।

তারা নিজেদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, অভিমান, স্বপ্ন—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে লাগল।

কখন যে কথার ফাঁকে ফাঁকে ভালোবাসা ঢুকে পড়েছিল, তারা কেউ জানল না।

কেউ কাউকে ‘ভালোবাসি’ বলেনি।

তবু তারা দুজনেই বুঝে গিয়েছিল—

ভালোবাসা সবসময় মুখে বলতে হয় না।

কখনো কখনো ভালোবাসা মানুষের অপেক্ষায় থাকে।

কখনো একটি ফোনকলের ওপাশে থাকে।

কখনো ‘খেয়েছ?’ প্রশ্নটির ভেতরে লুকিয়ে থাকে।

আর কখনো একটি মায়াবী চোখের মধ্যে সারাজীবনের জন্য ঘর বানিয়ে নেয়।

একদিন সাথী হঠাৎ বলেছিল,

— হিমেল, আমাদের এই সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

হিমেল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,

— যেখানে তুমি থাকবে, আমি সেখানেই থাকতে চাই।

সাথী মৃদু হেসেছিল।

— কথাটা খুব সহজে বললে।

— কারণ সত্যি কথাগুলো বলতে বেশি ভাবতে হয় না।

তারপর একদিন হিমেল নিজের পরিবারের কাছে সবকিছু জানাল।

হিমেল সরকারি চাকরিজীবী। ভালো পরিবার। সুনাম আছে।

অন্যদিকে সাথীর বাবাও গ্রামের সম্মানিত মানুষ। পরিবারে ঐতিহ্য ও সামাজিক মর্যাদা আছে।

দুই পরিবারের মধ্যে কথা হলো।

প্রথমে সাথীর বাবা-মা হিমেলকে দেখলেন।

তারপর হিমেলের পরিবার দেখল সাথীকে।

দুই পরিবারের সম্মতিতে সম্পর্কটি পেল নতুন একটি নাম।

বিয়ে।

তারিখ ঠিক হলো শরতের এক দিনে।

যে শরতে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।

বিয়ের দিন সকাল থেকেই আকাশে সাদা মেঘ।

দূরের মাঠে কাশফুল দুলছে।

সন্ধ্যায় হিমেল যখন সাথীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তার মনে হলো—এক বছর আগের সেই বিকেলটা আবার ফিরে এসেছে।

সেই চোখ।

সেই মুখ।

সেই মায়া।

শুধু আজ আর মেয়েটি অচেনা নয়।

আজ সে তার জীবনের মানুষ।

হিমেল মৃদুস্বরে বলল,

— জানো, তোমাকে প্রথম দেখার দিন আমি ভাবিনি তুমি কোনোদিন আমার হবে।

সাথী হাসল।

— আমিও ভাবিনি, কলেজের একটা গেট আমার জীবনের গল্প বদলে দেবে।

হিমেল বলল,

— তোমাকে খুঁজতে গিয়ে বুঝেছিলাম, কিছু মানুষকে পাওয়ার আগে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

সাথী নিচু চোখে বলল,

— আর আমি বুঝেছিলাম, কেউ একজন সত্যিই এক বছর ধরে অপেক্ষা করতে পারে।

বাইরে তখন শরতের বাতাস।

দূরে কাশফুলের সারি।

আকাশে জ্যোৎস্নার আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।

হিমেল সাথীর হাতটা আলতো করে ধরল।

মনে হলো, এক বছর আগে যে গল্পটি একটি মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে শুরু হয়েছিল, আজ সেই গল্প পূর্ণতা পেল।

হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক—

কখনো কখনো মানুষকে ভালোবাসতে শুরু করার জন্য কোনো ঘোষণা লাগে না।

লাগে শুধু এক পলক দেখা।

একটু অপেক্ষা।

কিছু অকারণ কথা।

আর একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলব—এই ভয়।

হিমেল হারায়নি।

সাথীও হারায়নি।

বরং শরতের সেই বিকেলে যে দুটি চোখ একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত একে অপরের জীবনের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেল।

যে শরতে প্রথম দেখা,
সেই শরতেই কাছে পাওয়া।

আর তাদের ভালোবাসার গল্পে শরৎ হয়ে রইল চিরন্তন সাক্ষী।



Friday, August 14, 2026

নিশিরাতের কাব্য -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

একটা সময় ছিল, তাওসিফ আর তাসফিয়ার গল্প যেন শেষই হতে চাইত না। দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে রাত নামত, শহর ঘুমিয়ে পড়ত, জানালার ওপাশে চাঁদ তার জায়গা বদলাত—কিন্তু তাদের কথা ফুরাত না।

কখনো খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে শুরু হতো গল্প, আর কখন যে সেই গল্প জীবনের গভীর কোনো অনুভূতিতে গিয়ে পৌঁছাত, তারা নিজেরাও বুঝতে পারত না। অভিমান, স্বপ্ন, ভয়, ভবিষ্যৎ—সবকিছুই তারা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিত।

কিন্তু ইদানীং কেমন যেন বদলে গেছে সব।

কথা হয়, তবে আগের মতো নয়। হুটহাট দু-চারটা কথা, তারপর নীরবতা। কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না—কী হয়েছে? কেন এমন হলো?

অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো অভিযোগও নেই। দূরত্বটা যেন কোনো এক অদৃশ্য সন্ধ্যায় এসে তাদের মাঝখানে বসে পড়েছে।

তাওসিফ মাঝে মাঝে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাসফিয়ার নামটা অনলাইনে দেখলেও মেসেজ লিখতে পারে না। আবার তাসফিয়াও হয়তো একইভাবে অপেক্ষা করে—কিন্তু কেউই প্রথম কথাটা শুরু করতে পারে না।

শ্রাবণের এক বৃষ্টিস্নাত বিকেল।

আকাশটা সকাল থেকেই মেঘে ঢাকা। বিকেলের দিকে হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি। জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ পানি নামছে। তাওসিফ চুপচাপ বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।

তাসফিয়ার মেসেজ।

“আজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম।”

একটা ছোট্ট বাক্য।

কিন্তু তাওসিফের কাছে যেন বহুদিনের নীরবতার দরজা হঠাৎ খুলে গেল।

সে কয়েক সেকেন্ড মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“কী দেখেছ?”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

“বলব না।”

“কেন?”

“বললে তুমি খুব বেশি খুশি হয়ে যাবে।”

তাওসিফ হেসে লিখল—

“তাহলে তো আরও শুনতে ইচ্ছে করছে।”

তারপর শুরু হলো সেই পুরোনো গল্প।

একটা মেসেজ থেকে আরেকটা মেসেজ। হাসি, অভিমান, পুরোনো স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া কথাগুলো—সব যেন একে একে ফিরে আসতে লাগল।

রাত কখন গভীর হয়ে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি।

বিদায় নেওয়ার আগে তাসফিয়া লিখল—

“আজ অনেকদিন পর ভালো লাগল কথা বলে।”

তাওসিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল—

“আমারও।”

আরও কিছু বলতে চেয়েও সে থেমে গেল।

কখনো কখনো কিছু অনুভূতি শব্দে বললে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।


মাঝরাত।

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি।

টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন একটানা কোনো অচেনা কবিতা লিখে চলেছে। দূরে কোথাও মেঘ ডাকছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকে অন্ধকার ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠছে।

তাওসিফ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।

হঠাৎ তার মনে হলো—তাসফিয়া যদি এখন পাশে থাকত!

ভাবনাটা আসতেই সে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।

তারপর কল্পনার ভেতর ধীরে ধীরে তৈরি হলো অন্য এক পৃথিবী।

তাসফিয়া পরেছে নীল শাড়ি।

বৃষ্টিভেজা চুল কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। চোখে সেই চিরচেনা মায়া।

তাওসিফ তার পাশে হাঁটছে।

শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে তারা দুজন গিয়ে বসেছে রাস্তার ধারের ছোট্ট এক টং দোকানে। চারপাশে বৃষ্টি। দোকানের টিনের চাল থেকে ধারার মতো পানি পড়ছে।

দোকানদার দুটো ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।

তাসফিয়া কাপ হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বলল,

—“জানো, বৃষ্টিতে চা খাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ আছে।”

তাওসিফ তাকিয়ে বলল,

—“তোমার সঙ্গে হলে সবকিছুরই আলাদা আনন্দ।”

তাসফিয়া চোখ নামিয়ে নিল।

বৃষ্টির শব্দের আড়ালে লুকিয়ে গেল তার লাজুক হাসি।

চা শেষ হলো।

কিন্তু বৃষ্টি থামল না।

বরং আরও বেড়ে গেল।

ফিরতে গিয়ে দুজনই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর তাসফিয়া হঠাৎ বলল,

—“এভাবে গেলে তো পুরো ভিজে যাব।”

তাওসিফ চারপাশে তাকিয়ে দূরে একটা ছোট্ট কুড়েঘর দেখতে পেল।

—“ওখানে একটু আশ্রয় নিই?”

তাসফিয়া মাথা নাড়ল।

দুজন ছুটে গিয়ে কুড়েঘরটার নিচে দাঁড়াল।

বাইরে তখন শ্রাবণের উন্মত্ত বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, দূরে মেঘের গর্জন আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো—সব মিলিয়ে পৃথিবীটা যেন হঠাৎ তাদের দুজনের জন্য থেমে গেছে।

তাসফিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

তাওসিফ তাকিয়ে ছিল তার দিকে।

কথা ছিল অনেক।

কিন্তু কোনো কথাই মুখে আসছিল না।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

সেই চোখে ছিল বহুদিনের জমে থাকা প্রশ্ন, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা আর না-বলা ভালোবাসা।

তাসফিয়া ধীরে ধীরে বলল,

—“আমাদের এত দূরত্ব কেন হলো, তাওসিফ?”

তাওসিফ মৃদুস্বরে বলল,

—“জানি না।”

—“আমরা তো কোনোদিন ঝগড়াই করিনি।”

—“তবু দূরে চলে গিয়েছিলাম।”

—“আবার কি কাছে আসা যায়?”

তাওসিফ কোনো উত্তর দিল না।

শুধু তাসফিয়ার হাতটা আলতো করে ধরল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি।

মেঘ ডাকছে।

আর সেই শব্দের আড়ালে দুজন মানুষের দীর্ঘদিনের নীরবতা ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে।

তাসফিয়া মাথাটা তাওসিফের কাঁধে রাখল।

তাওসিফ তাকে আরও কাছে টেনে নিল।

সেই মুহূর্তে কোনো প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন ছিল না, কোনো বড় বড় কথা প্রয়োজন ছিল না।

শুধু অনুভব করাই যথেষ্ট ছিল—তারা এখনও একে অপরের কাছে অচেনা হয়ে যায়নি।

চোখে চোখে জমে থাকা কথাগুলো ধীরে ধীরে নীরবতায় মিশে গেল।

তাদের ঠোঁটে ফুটে উঠল বহুদিনের গোপন ভালোবাসার এক কোমল স্বীকারোক্তি।

বাইরে শ্রাবণের বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে নামল।

মনে হলো, আকাশও বুঝি তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প জানে।


হঠাৎ তাওসিফের ঘুম ভেঙে গেল।

জানালার বাইরে সত্যিই বৃষ্টি হচ্ছে।

ঘরটা অন্ধকার।

ফোনটা পাশে পড়ে আছে।

সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল।

স্বপ্নটা এতটাই বাস্তব ছিল যে তার বুকের ভেতর এখনও তাসফিয়ার উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে।

সে ফোনটা হাতে নিল।

স্ক্রিনে তাসফিয়ার নাম।

কিছুক্ষণ দ্বিধা করে একটি মেসেজ লিখল—

“তুমি যে স্বপ্নের কথা বলেছিলে, আজ আমিও তোমাকে একটা স্বপ্নে দেখলাম।”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এল—

“কী দেখেছ?”

তাওসিফ জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর লিখল—

“বলব না। বললে তুমি খুব বেশি খুশি হয়ে যাবে।”

ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল—

“তাহলে আজ রাতটা আবার গল্প করেই কাটাই।”

তাওসিফের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

বাইরে তখনও শ্রাবণের বৃষ্টি।

আর গভীর নিশিরাতে, দুই প্রান্তের দুটি মানুষ আবার ফিরে গেল সেই পুরোনো কথার পৃথিবীতে—যেখানে রাত ফুরিয়ে যায়, কিন্তু গল্প ফুরোয় না।

হয়তো কিছু সম্পর্ক কখনো হারিয়ে যায় না।

শুধু কিছুদিন নীরব হয়ে থাকে।

একটা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা, একটা স্বপ্ন কিংবা একটি ছোট্ট মেসেজ—

“আজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম।”

আবার তাদের ফিরিয়ে দিতে পারে সেই অসমাপ্ত কাব্যের কাছে।

সেই কাব্যের নাম—

নিশিরাতের কাব্য।



নিশিরাতের কাব্য -- মোঃ হেলাল উদ্দিন