মফস্বলের চেনা সকালগুলো শহরের মতো যান্ত্রিক নয়। এখানে কুয়াশা আর রোদের খেলা শেষ হতে না হতেই বাজারের শোরগোল শুরু হয়, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা চলে নিজের খেয়ালে। সরকারি সোনালী ব্যাংকের ছোট শাখাটিতে যেদিন আবিদ প্রথম পা রাখল, সেদিন তার বুকের ভেতর একটা অচেনা একাকীত্ব জেঁকে বসেছিল। শহরের ব্যস্ততম কর্পোরেট শাখা থেকে বদলি হয়ে এই শান্ত, কিছুটা অলস মফস্বলে আসাটা তার ক্যারিয়ারের জন্য হয়তো নিয়মমাফিক, কিন্তু মনের জন্য ছিল একরকম নির্বাসন।
কিন্তু সেই নির্বাসনের প্রথম দিনটাই বদলে গেল একটা চেনা চাবির গোছার শব্দে আর হালকা সুবাসে।
ম্যানেজারের রুম থেকে বের হতেই আবিদের চোখ আটকে গেল জানালার পাশে বসা ক্যাশ ইনচার্জের চেয়ারটিতে। সেখানে বসে আছেন নবনীতা। প্রথম দেখাতেই যে কারো মনে হবে, মফস্বলের ধুলোবালি আর ফাইলের স্তূপের মাঝে তিনি যেন এক টুকরো স্নিগ্ধ পদ্ম। নবনীতার রূপ কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন নয়, বরং শরৎকালের ভোরের শিউলি ফুলের মতো—যাতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে এক অদ্ভুত আত্মমর্যাদা। তার গায়ের রঙ যেন কাঁচা হলুদের সাথে সামান্য দুধ মেশালে যা হয়, ঠিক তেমন। টানা দুটো চোখ, যাতে মায়া আর পেশাদারিত্বের এক অপূর্ব সহাবস্থান। চুলে সাধারণ একটা খোঁপা, পরনে হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচলটি নিখুঁতভাবে কাঁধে পিন করা।
আবিদ খেয়াল করল, নবনীতার টেবিলের সামনে গ্রাহকদের ভিড়। কেউ টাকা তুলতে এসেছে, কেউ পেনশনের খোঁজ নিতে। নবনীতা অত্যন্ত শান্ত মুখে, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে প্রত্যেকের কাজ করে দিচ্ছেন। তার কথা বলার ধরণ এত চমৎকার যে, মনে হয় যেন ব্যাংকের জটিল হিসেব-নিকেশ নয়, তিনি কোনো কবিতার আবৃত্তি করছেন।
শাখায় কর্মকর্তা বলতে মাত্র কয়েকজন। দু-একদিনের মধ্যেই আবিদ জানতে পারল, তারা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে আবিদ চাকরিতে জয়েন করেছে এক ব্যাচ পরে, তাই সহকর্মী হিসেবে সে নবনীতার এক বছরের জুনিয়র। কিন্তু সম্প্রতি আবিদের পদোন্নতি হওয়ায় এখন দুজনেই সমপদস্থ—সিনিয়র অফিসার। এই সমতাটুকু আবিদের বুকের ভেতর একটা অজানা স্বস্তি এনে দিল। সে মনে মনে ভাবল, অন্তত পদমর্যাদার দেয়ালটা তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করতে পারবে না।
দিন যায়। মফস্বলের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো সন্ধ্যার পর পরই টিমটিম করে জ্বলতে শুরু করে। ব্যাংকের ব্যস্ততা শেষ হলে সবাই যার যার নীড়ে ফেরে।
আবিদ আবিষ্কার করল, নবনীতা একাধারে একটি ঘড়ির কাঁটা এবং একটি জলছবি। সে যেমন পেশাদারিত্বে অনড়, তেমনি সংসারী। নবনীতা বিবাহিত, তার একটি চার বছরের কন্যাসন্তান রয়েছে। লাঞ্চের বিরতিতে যখন অন্য অফিসাররা চা-সিগারেটের আড্ডায় মত্ত হয়, নবনীতা তখন ফোনের ওপাশে থাকা গৃহপরিচারিকা বা তার স্বামীর সাথে রাতের রান্নার মেন্যু কিংবা বাচ্চার স্কুলের ডায়রি নিয়ে কথা বলে। তার পৃথিবীটা এক সুতোয় বাঁধা—স্বামী, সন্তান, সংসার আর চাকরি।
আর আবিদ? আবিদ এই শহরে একেবারেই একা। একটা ছোট ছাদযুক্ত বাসা ভাড়া নিয়েছে সে। অফিস শেষ হওয়ার পর যখন মফস্বলের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়, আবিদের ঘরের একাকীত্ব তখন যেন তাকে গিলতে আসে। তার সঙ্গী বলতে কেবল কিছু পুরোনো বই, ডায়েরির পাতা আর কলমের কালি। সে কবিতা লেখে। মনের ভেতর জমে থাকা একরাশ অব্যক্ত কথা সে কাগজের বুকে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে উপশম খোঁজার চেষ্টা করে।
অফিসে প্রতিদিন আবিদ নবনীতাকে দেখে। মন ভরে দেখে। কম্পিউটারের স্ক্রিনের আড়াল থেকে, ফাইলের পাতা ওল্টানোর বাহানায়, কিংবা চা পানের মুহূর্তে। নবনীতার হাসির শব্দটা আবিদের কানে এসে লাগে বসন্তের বাতাসের মতো। যখন নবনীতা কপালে জমে থাকা চূর্ণ অলকগুলো বাম হাতের আঙুল দিয়ে কানের পিঠে গুজে দেয়, আবিদের মনে হয় দুনিয়ার সমস্ত সৌন্দর্য এই একটা ভঙ্গিমার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু আবিদ মন খুলে কথা বলতে পারে না। সমাজ, সংস্কার আর সহকর্মীর মধ্যকার অলিখিত একটা সীমারেখা তাকে আটকে রাখে। নবনীতা যখন কাজের প্রয়োজনে আবিদের ডেস্কে এসে দাঁড়ায়, গম্ভীর গলায় বলে,
"আবিদ ভাই, এই এলসি ফাইলটা একটু চেক করে দেবেন?"
তখন আবিদ শুধু মাথা নাড়ে। তার মুখের ভাষা যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে হারিয়ে যায়। সে শুধু বোঝে, নবনীতা তার খুব কাছে দাঁড়িয়েও কোটি আলোকবর্ষ দূরের এক নক্ষত্র।
অপেক্ষারও একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সেই অপেক্ষা যখন হৃদয়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে।
এক রাতে বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন আবিদের হৃদয়ের একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সে ফেসবুকে স্ক্রোল করতে করতে আচমকাই নবনীতার প্রোফাইলে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। নবনীতার একটি একক ছবি—নীল শাড়ি পরা, ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেই চেনা স্নিগ্ধ চোখ, ঠোঁটে লেগে থাকা সেই চিরচেনা মায়াবী হাসি।
আবিদের ভেতরের কবিসত্তা আর নিয়মে বাঁধা রইল না। সে ছবিটি ডাউনলোড করল। তারপর টেবিলের ল্যাম্পটি জ্বেলে খাতা কলম নিয়ে বসল। কলমের ডগা দিয়ে ঝরে পড়তে লাগল তার হৃদয়ের সমস্ত নির্যাস। সে লিখল:
ফাইলের স্তূপে ঢাকা পড়া এক আলতো প্রমোদ।
তোমার চোখের ওই শান্ত দিঘির জলে,
আমার একাকীত্বের নাও ভাসি অবহেলে।
তুমি অন্য কারোর আকাশ, অন্য কারোর ঘর,
আমি দূর হতে দেখা এক যাযাবর।"
কবিতাটি শেষ করে আবিদের বুকটা হালকা হলো, আবার এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে আর ভাবল না। মধ্যরাতের সেই মোহগ্রস্ত মুহূর্তে কবিতাটি নবনীতার ইনবক্সে পাঠিয়ে দিল।
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আবিদের পা কাঁপছিল। যদি নবনীতা রেগে যায়? যদি কথা বলা বন্ধ করে দেয়?
দুপুরের দিকে আবিদের ফোনে মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠল। বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে সে চ্যাটবক্স খুলল। নবনীতা লিখেছে:
"বাহ্ আবিদ ভাই! আপনি এত সুন্দর কবিতা লেখেন তা তো জানতাম না। ছবিটার সাথে লাইনগুলো দারুণ মানিয়েছে। ধন্যবাদ আপনার এই সুন্দর উপহারের জন্য।"
আবিদের মুখে একটা মলিন হাসি ফুটে উঠল। প্রশংসা! হ্যাঁ, নবনীতা একজন গুণী পাঠকের মতোই কবিতাটির প্রশংসা করেছে। কিন্তু আবিদের মন তাতে ভরল না। কারণ নবনীতা কবিতাটির ভেতরের হাহাকারটুকু দেখল না, বা হয়তো দেখেও না দেখার ভান করল। সে শুধু শব্দের কারুকার্য দেখল, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জলন্ত প্রেমকে স্পর্শ করল না।
এই ঘটনার পর থেকে আবিদের মুগ্ধতা যেন এক তীব্র নেশায় পরিণত হলো। সে এখন শুধু নবনীতাকে দেখেই শান্ত থাকে না, সে নবনীতার সময়ের প্রত্যাশী হয়ে ওঠে। যদি কোনোদিন নবনীতা একটু আগে আসে, কিংবা কোনো ফাইলের জটিলতা নিয়ে আবিদের ডেস্কে এসে বসে একটু বাড়তি সময় কাটায়—আবিদের মনে হয় সেই দিনটাই তার জীবনের সেরা দিন।
আবিদের ডায়েরি এখন শুধু নবনীতার উপমায় ভরা। সে এক জায়গায় লিখল:
"নবনীতা হলো সেই গোধূলি, যা ক্ষণিকের জন্য আকাশকে রাঙিয়ে দিয়ে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। আর আমি হলাম সেই অন্ধকার, যা প্রতিদিন আলোর প্রত্যাশায় মরেও আবার বেঁচে ওঠে।"
প্রেমের এই অনুভূতি যেমন সুন্দর, তেমনি এর বিরহ বড়ো ভয়ানক। যখন আবিদ দেখে অফিস শেষে নবনীতার স্বামী স্কুটি নিয়ে ব্যাংকের সামনে এসে দাঁড়ায়, নবনীতা মুখে একরাশ ক্লান্তি মুছে চওড়া হাসি নিয়ে স্বামীর পেছনে গিয়ে বসে, তখন আবিদের বুকের ভেতরটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এই বিরহ কোনো ঝড়ের মতো নয় যে সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে; এই বিরহ হলো উইপোকার মতো, যা ভেতর থেকে আস্তে আস্তে একজন মানুষকে খাবে।
আবিদ জানে তার এই চাওয়া কোনোদিন পূর্ণ হবার নয়। সমাজ একে স্বীকৃতি দেবে না, নবনীতার সাজানো সংসারে এর কোনো স্থান নেই। সে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো, যার ভাগ্যে পূর্ণতা নেই, কেবলই ক্ষয়। তবু আবিদের মন মানে না। সে কোনো অধিকার চায় না, সে নবনীতার সাজানো সংসার ভাঙতে চায় না। সে শুধু চায় তার মনের এই জমানো কথাগুলো, এই গভীর অব্যক্ত ভালোবাসা একবার নবনীতাকে মুখোমুখি বসে বলতে।
ব্যাংকের অডিট চলছে। প্রতিদিন রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে সবাইকে। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য অফিসাররা যে যার ডেস্কে ব্যস্ত।
আবিদ তার কেবিন থেকে কাঁচের দেয়ালের ওপাশে তাকাল। নবনীতা ভাউচার মেলাচ্ছে। টেবিলের ল্যাম্পের আলোটা তার মুখে এসে পড়েছে। ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো কিছুটা বুজে আসছে, কিন্তু ঠোঁটের সেই দৃঢ়তা এখনো কমেনি। কপালের টিপটা সামান্য সরে গেছে, যেন একটা চ্যুত নক্ষত্র।
আবিদ এক কাপ কফি নিয়ে নবনীতার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কফির কাপটা আলতো করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, "খুব ক্লান্ত লাগছে? একটু কফি খান।"
নবনীতা চমকে চোখ তুলল। তারপর এক গাল হেসে বলল, "ধন্যবাদ আবিদ ভাই। সত্যি খুব দরকার ছিল।"
আবিদ চেয়ার টেনে বসল। আজ তার বুকের ভেতর এক অন্যরকম সাহস কাজ করছে। সে নবনীতার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে মায়া আছে, কিন্তু সেখানে আবিদের জন্য কোনো ব্যাকুলতা নেই। সেখানে আছে কেবল একজন সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা আর সৌজন্য।
"নবনীতা," আবিদ প্রথমবার তার নামের সাথে 'আপা' বা 'দিদি' কিছুই যোগ করল না।
নবনীতা কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে থামল। কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।
আবিদ জানালার বাইরে তাকাল। মফস্বলের রাত এখন নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও একটা রাতজাগা পাখি ডাকছে। আবিদ মৃদু গলায় বলল, "কিছু কথা থাকে যা বুকের ভেতর জমতে জমতে পাথর হয়ে যায়। সেই পাথরটা বুকের ওপর চেপে বসে থাকলে নিঃশ্বাস নেওয়া যায় না।"
নবনীতা কফির কাপটা নামিয়ে রাখল। তার মুখটা গম্ভীর হলো, কিন্তু চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। সে বলল, "কিছু পাথরকে বুকেই বয়ে বেড়াতে হয় আবিদ ভাই। ওগুলো নামাতে গেলে পায়ের তলার মাটিটাই সরে যেতে পারে।"
আবিদ স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝল, নবনীতা অবুঝ নয়। একজন নারীর মন তার প্রতি তৈরি হওয়া অন্য পুরুষের ভালোলাগার সুবাস ঠিকই টের পায়। নবনীতা কবিতাটির মানে বুঝেছিল, প্রতিদিন আবিদের চেয়ে থাকার অর্থও সে জানে। কিন্তু সে তার সংসারের লক্ষ্মণরেখাটি খুব ভালো করেই চেনে।
আবিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, যা ল্যাম্পের আলোয় ধরা পড়ল না। সে হাসার চেষ্টা করে বলল, "আমি তো কিছু চাচ্ছি না নবনীতা। শুধু সময়ের অপেক্ষা করছি। এমন একটা সময়, যখন আপনি শুধুই একজন শ্রোতা হবেন, আর আমি আমার মনের সব জমানো কথা বলে হালকা হবো।"
নবনীতা উঠে দাঁড়াল। তার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "অডিট শেষ হতে আর দুদিন লাগবে। তারপর একটা রোববার দেখে লাঞ্চের পর আপনাকে আধা ঘণ্টা সময় দেবো। সেদিন অফিসের সহকর্মী হিসেবে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের বন্ধু হিসেবে আপনার সব কথা শুনবো। কেমন?"
নবনীতা চলে গেল। তার শাড়ির খশখশ শব্দ আর চাবির রিংয়ের আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল করিডোরে।
আবিদ একা বসে রইল সেই সুনসান ব্যাংকের আলো-আঁধারিতে। তার মনের অব্যক্ত ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সে আধা ঘণ্টার এক খণ্ড আকাশ পেয়েছে। সে জানে, এই আধা ঘণ্টাই তার সারাজীবনের বিরহ কাটানোর সম্বল হয়ে থাকবে। সে এখন সেই রবিবারের অপেক্ষায়, এক বুক প্রেম আর এক ফোঁটা চাতকের তৃষ্ণা নিয়ে।

