ফেসবুকের নীল পর্দার ওপারে নীল রঙের বাতিটা জ্বলে উঠলেই দুটোর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দোলাচল শুরু হয়। শহরের কোলাহল থেমে যাওয়া নিঝুম রাতে, যখন ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই, চারদিকের নীরবতা ভেঙে মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ওঠে কিছু শব্দ। সেই শব্দগুলোই যেন দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের মাঝে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য মায়াবী সেতু।
একজন ‘নীলকণ্ঠ’, আর অন্যজন ‘মেঘা’। দুটোই ছদ্মনাম। গত ছয়টি মাস ধরে তাদের দিন শুরু হয় একে অপরের ‘শুভ সকাল’ দিয়ে, আর রাত শেষ হয় ইনবক্সের চ্যাটবক্সে সুখ-দুঃখের গল্প বুনে। সকালের প্রথম আলো থেকে রাতের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত—অফিসের ক্লান্তি, বৃষ্টির আনন্দ, প্রিয় বইয়ের আলোচনা কিংবা হঠাৎ মন খারাপের গল্প; সবকিছুই ভাগাভাগি হয় দুজনের মধ্যে।
তারা কেউ কাউকে দেখেনি, কেউ কারও কণ্ঠও শোনেনি। জানে না একে অপরের হাঁটার ভঙ্গি, হাসির ধরন কিংবা চোখের ভাষা। প্রোফাইল পিকচারে নীলকণ্ঠের দেওয়া আছে একটা গিটারের ছবি, আর মেঘার আইডিতে একরাশ কৃষ্ণচূড়া ফুল। যতটুকু পরিচয়, যতটুকু চেনা—সবটাই ওই চ্যাটের কিবোর্ডে টাইপ হওয়া শব্দের ফ্রেমে বন্দী। অথচ প্রতিদিনের ক্লান্তি আর একাকীত্বের মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি না করলে তাদের যেন দিনটাই কাটতে চায় না।
তারা বন্ধু নাকি তার চেয়েও বেশি, কিংবা কেউ কারও প্রেমে পড়েছে কি না—তা নিজেরাও নিশ্চিত নয়। কোনো দিন কয়েক ঘণ্টা মেঘার কোনো খবর না পেলে নীলকণ্ঠ অস্থির হয়ে উঠত। আবার যখন মেঘা ফিরে এসে বলত, "আজ খুব ব্যস্ত ছিলাম", তখন অদ্ভুত এক স্বস্তি নেমে আসত তার মনে। নীলকণ্ঠ রাতে ঘুমানোর আগে ভাবত, “আজ মেঘা মেসেজ দিতে একটু দেরি করল, মেয়েটা কি আমাকে মিস করছিল?”
ওদিকে মেঘাও জানালার বাইরে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ভাবত, “ছেলেটি কি একটু বেশি ভাবছে আমাকে? কথার ফাঁকে ফাঁকে ও যেভাবে আমার সামান্য মন খারাপের কথা বুঝে ফেলে, ও কি আমার ভাবনায় হারিয়ে গেছে?”
কিন্তু তারা কেউই এই গোলকধাঁধার উত্তর খুঁজতে সাহস পেত না। বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে এই ভার্চুয়াল মায়ার শেষ কোথায়, তা তাদের দুজনেরই অজানা। অদেখা সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই অনিশ্চয়তাই।
সেদিন ছিল এক বর্ষণমুখর রাত। জানালার বাইরে ঝুম বৃষ্টি, আর ইনবক্সে জমে উঠেছে তাদের চিরচেনা কথার মেলা। কথা বলতে বলতে কখন যেন হালকা চালের আলাপটা বেশ গভীরে চলে গেল। কথার সেই গভীরতায় হঠাৎ যেন মেঘার মনে এক অদ্ভুত জড়তা ভর করল। সে একটু গম্ভীর হয়ে টাইপ করল:
“শুনুন নীলকণ্ঠ, এই যে এক অদেখা আকর্ষণ... এর পেছনে নিজেকে পুড়িয়ে খাক করবেন না প্লিজ। আমি কাউকে এভাবে পোড়াতে চাই না।”
নীলকণ্ঠ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। বুকে এক মৃদু ধাক্কা লাগল। একটি বাক্য কখনও কখনও অনেক দীর্ঘ নীরবতার জন্ম দেয়। তার মনে পড়ল, কয়েকদিন আগেই মেঘা কথায় কথায় বলেছিল, সে নাকি আজকাল একজনকে খুব মিস করে। নীলকণ্ঠ এতদিন মনে মনে নিজেকেই সেই ‘একজন’ ভেবে বসে ছিল। মেঘার এই হঠাৎ দূরত্ব তৈরির চেষ্টা দেখে নীলকণ্ঠের মনে হলো, তবে কি সে ভুল ভাবছিল?
একটু বিষণ্ণ হেসে নীলকণ্ঠ উত্তর দিল:
“তার মানে, আপনি কিছুদিন আগে যাকে মিস করার কথা বলেছিলেন... সেই ব্যক্তিটি আমি নই, তাই তো?”
মেঘা ওপাশ থেকে ‘টাইপিং...’ দেখাচ্ছিল, কিন্তু কোনো মেসেজ পাঠাল না। স্ক্রিনের ওপারে নীরবতা জমতে লাগল। নীলকণ্ঠ আবার লিখল:
“আচ্ছা, আপনি আমাকে পোড়াতে চান না বুঝলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে... আপনি নিজে কি পুড়তে চান?”
এবারও কোনো উত্তর এল না। শুধু দেখা গেল, মেঘা অনলাইনে আছে আর মেসেজটা ‘Seen’ হয়ে পড়ে আছে। সে যেন নীলকণ্ঠকে এক অদ্ভুত উত্তরের অপেক্ষায় ঝুলিয়ে রেখে দিল। ওপারে বসে মেঘা হয়তো নিজের মনের সাথেই যুদ্ধ করছিল; হয়তো উত্তর খুঁজছিল, কিংবা নিজের কাছেই কিছু স্বীকার করতে পারছিল না।
সেই ভারী নীরবতাকে ভাঙল নীলকণ্ঠই। চ্যাটবক্সে শেষবারের মতো আঙুল চালিয়ে কবিসুলভ একটা বাক্য লিখে পাঠাল সে:
“পাখিদের জানতে হয় উড়তে, আর কবিদের জানতে হয় পুড়তে।”
মেসেজটা পড়েই ওপারে মেঘার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান কিন্তু গভীর হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত টাইপ করল:
“উফ! একদম আটকে দিলেন তো। কথার জালে এভাবে আটকে দেওয়াটা অন্যায়।”
শুধু ওই দুটি শব্দ—‘আটকিয়ে দিলেন’। কিন্তু তার ভেতর কত অনুভূতি লুকিয়ে ছিল, তা কেউ জানেনা। মেঘা হয়তো সত্যিই আটকে গিয়েছিল। কথার জালে, অনুভূতির কাছে, নাকি এমন এক সত্যের সামনে—যা উচ্চারণ করলে সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে যেতে পারত?
নীলকণ্ঠ আর কথা বাড়াল না। মেঘার এই ‘আটকে যাওয়া’র মাঝেই সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পেল। রহস্যটা রহস্যই থাক, মায়াটা আরও একটু গাঢ় হোক। সে বিদায়ের একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাল:
“আজকের মতো তবে আসি। শুভরাত্রি, ভালো থাকবেন।”
ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে নীলকণ্ঠ যখন অন্ধকারের দিকে তাকাল, তখন তার ঠোঁটে একটা স্মিত হাসি। ওদিকে মেঘা ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সে ভাবল, কিছু মানুষকে না দেখেও বোধহয় এতটা গভীরভাবে চেনা যায়।
রাত আরও গভীর হলো, কিন্তু দুই মানুষের ভেতরে জন্ম নেওয়া প্রশ্নগুলো ঘুমাল না। আসলে কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয়না, কিছু অনুভূতির কোনো স্বীকৃতি লাগে না। কিছু মানুষ জীবনে আসে, খুব কাছে চলে আসে, অথচ দূরত্বের সব নিয়ম অক্ষুণ্ণ থাকে।
তারা শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়েছিল কি না, তা আজও জানা যায়নি। কিন্তু সেই রাতের পর দুজনেই বুঝেছিল—অদেখা মানুষও কখনও কখনও হৃদয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান সত্য হয়ে উঠতে পারে। আর কিছু আগুন আছে, যা জ্বলে ওঠে কোনো স্পর্শ ছাড়াই; শুধু কিছু শব্দ, কিছু অপেক্ষা আর কিছু অসমাপ্ত উত্তরের ভেতর।
এক টুকরো অদেখা আকর্ষণ আর উত্তরের অপেক্ষায় থাকা একটা প্রশ্ন নিয়ে তাদের গল্পটা আসলে চলতেই থাকল... পর্দার ওপারে, মনের গভীরে।
