বড়ই বেহায়া আমার কলম। তাকে যতই শাসন করি, যতই বলি—আজ আর তোমার কথা লিখব না, সে ততই অবাধ্য হয়ে ওঠে। অকারণেই কাগজের সাদা শরীর জুড়ে তোমার নামের ছায়া ফেলে। এক অদ্ভুত, নির্লজ্জ আকাঙ্ক্ষায় সে শুধু তোমাকেই লিখতে চায়; তোমাকেই আঁকতে চায় তার সমস্ত অক্ষর, সমস্ত রং, সমস্ত উন্মাদনা দিয়ে।
তোমার সেই কাজল-ডোবা গভীর চোখ—যেখানে একবার তাকালে ফিরে আসার পথটুকুও যেন হারিয়ে যায়; তোমার রেশমঘন কৃষ্ণ কেশ, যে কেশ বাতাসে দুলে উঠলে আমার সমস্ত সংযম কেমন অকারণে ভেঙে পড়ে; আর তোমার ঠোঁট—নরম, নীরব, নিষিদ্ধ কোনো স্বপ্নের মতো—যার কথা লিখতে গেলেই শব্দেরা কেমন লজ্জায় থমকে দাঁড়ায়। তোমাকে আঁকতে গিয়ে আমার কলম কখনো কখনো শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে ফেলে।
কী অদ্ভুত এই মুগ্ধতা! কখনো মনে হয়, শুধু কলম নয়—রঙ-পেন্সিলও বুঝি তোমার স্পর্শের আকাঙ্ক্ষায় কাঁপে। সাদা শাড়ির স্নিগ্ধ ভাঁজে তোমাকে আঁকতে গেলে তুমি হয়ে ওঠো সকালের কুয়াশায় ভেজা শিউলি; লাল দোপাট্টার দহনময় আবরণে তুমি যেন হঠাৎ ফুটে ওঠা কোনো রক্তিম গোলাপ। কখনো আবার মনে হয়, কৃষ্ণচূড়ার উন্মত্ত কোনো বিকেল বুঝি মানুষের রূপ ধরে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
তোমাকে লিখতে বসলে আমার ভেতরের সমস্ত শিষ্টতা, সমস্ত যুক্তি, সমস্ত সংযম কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অক্ষরগুলো তখন আর শুধু অক্ষর থাকে না—তারা হয়ে ওঠে স্পর্শের মতো, দীর্ঘশ্বাসের মতো, নিঃশব্দ কোনো স্বীকারোক্তির মতো। তোমাকে ঘিরেই তারা রচনা করে যায় এক দুর্বার মুগ্ধতার উপাখ্যান; এমন এক উপাখ্যান, যার কোনো শুরু নেই, শেষও নেই—আছে শুধু তোমার দিকে ক্রমশ ডুবে যাওয়ার এক অদ্ভুত আনন্দ।
তুমি আমার কাছে শুধু একজন মানুষ নও। তুমি আমার নীরবতার ভেতরে বাজতে থাকা অদৃশ্য কোনো সুর; একলা বিকেলের মায়া; বৃষ্টিভেজা জানালায় জমে থাকা কোনো নাম। তুমি শিউলির সুবাস, বকুলের ঘ্রাণ, জোছনা-ভেজা রাতের নরম আলো। তোমাকে মনে পড়লে আমার চারপাশের পৃথিবীটাও কেমন বদলে যায়—সাধারণ মুহূর্তগুলো অসাধারণ হয়ে ওঠে, আর নিঃশব্দ রাতগুলোও যেন তোমার নামে কোনো গোপন কবিতা লিখতে থাকে।
তাই আমার কলমের এই বেহায়াপনা থামে না। সে বারবার তোমার কাছেই ফিরে আসে। তোমাকে লিখতে লিখতে কখন যে তোমার প্রতি মুগ্ধতা আমার সমস্ত শব্দের ভেতর বাসা বেঁধেছে, আমি নিজেও জানি না।
শুধু জানি—আমার যত অপ্রকাশিত কথা, যত নীরব আকাঙ্ক্ষা, যত গোপন ভালো লাগা—সবকিছুর শেষ ঠিকানায় গিয়ে তোমার নামটিই লেখা থাকে।
তুমি আমার সেই অসমাপ্ত বাক্য, যাকে শেষ করতে চাই না কোনোদিন।
তুমি আমার কবিতার সবচেয়ে সুন্দর পঙ্ক্তি নও— তুমি সেই অনুভূতি, যার জন্য আমার সমস্ত কবিতা লেখা।

