Thursday, October 29, 2026

নীরব মুগ্ধতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আরিফের জীবনে কিছু মানুষ ছিল, যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা না হলেও মনের ভেতর কোথাও তাদের জন্য আলাদা একটা জায়গা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তারা কেউ খুব কাছের ছিল না, আবার একেবারে দূরেরও নয়। তাদের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না, কোনো দাবি ছিল না, ছিল না নিয়মিত যোগাযোগের বাধ্যবাধকতা। তবু মাঝেমধ্যে তাদের কথা মনে পড়ত। মনে হতো, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ কখনো ফুরিয়ে যায় না।

স্মৃতি ছিল তেমনই একজন।

ফেসবুকের বন্ধু হিসেবে তাদের পরিচয়ের বয়স প্রায় এক যুগ। ভার্চুয়াল জগতের সেই পরিচয় একসময় বাস্তবেও রূপ নিয়েছিল। দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল, পরিচিত হয়েছিল দুজনের মুখ, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্ব। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবন, বদলেছে অজস্র সম্পর্কের সমীকরণ। অথচ স্মৃতিকে নিয়ে আরিফের মনে জমে থাকা কিছু অনুভূতি কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।

সেই অনুভূতির শুরু অবশ্য আরও আগে।

তখন আরিফের জীবনে বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে পরিবারের মধ্যে নানা আলোচনা চলছিল। মা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন মেয়ের ছবি দেখতেন, তাঁদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। একদিন তেমনই একটি ছবি দেখতে দেখতে তিনি থমকে গেলেন।

ছবিটি ছিল স্মৃতির।

মা ছবিটির দিকে তাকিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মেয়েটিকে সে চেনে কি না, তার সম্পর্কে কিছু জানে কি না।

আরিফ তখন স্মৃতিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনত না। তবে ছবিটি দেখার পর এবং মায়ের আগ্রহের সূত্র ধরে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনেছিল। সেদিনের সেই সামান্য ঘটনা যে বহু বছর পর তার মনে এমনভাবে ফিরে আসবে, তা তখন সে কল্পনাও করেনি।

জীবনের গল্পগুলো বোধ হয় এভাবেই তৈরি হয়। কোনো একটি মুহূর্ত তখন তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, অথচ সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই মুহূর্তই স্মৃতির পাতায় অন্য অর্থ নিয়ে ফিরে আসে।

পরবর্তী সময়ে স্মৃতির সঙ্গে আরিফের দেখা হয়েছিল। কথা হয়েছিল একাধিকবার। পরিচয়ের পরিধিও ধীরে ধীরে বেড়েছিল। কিন্তু সেই পুরোনো ঘটনাটির কথা আর বলা হয়নি। বলা হয়নি, একসময় তার ছবিটি আরিফের মায়ের চোখেও পড়েছিল। বলা হয়নি, পরিচয়ের শুরু হওয়ার আগেই তাকে ঘিরে একটি সম্ভাবনার গল্প তৈরি হয়েছিল অন্য কারও মনে।

কেন বলা হয়নি, তার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর আরিফের কাছে ছিল না। হয়তো সময় উপযুক্ত ছিল না, হয়তো কথাটি অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল। কিংবা কিছু কিছু কথা মানুষ নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখে, কারণ সেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে স্মৃতির অংশ করে রাখাই তার কাছে সহজ মনে হয়।

এভাবেই কেটে গেল বহু বছর।

স্মৃতিকে যতবার দেখেছে, যতবার কথা বলেছে, আরিফের মনে হয়েছে—এই নারীকে শুধু তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর সৌন্দর্যের বাইরেও এমন কিছু আছে, যা মানুষকে ধীরে ধীরে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে।

তিনি আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু আত্মম্ভরী নন। সাহসী, কিন্তু অমার্জিত নন। তাঁর কথাবার্তায় একটা সংযম আছে, আচরণে আছে পরিমিতিবোধ। পোশাক-পরিচ্ছদ, কথা বলার ধরন কিংবা অন্যের সঙ্গে মেলামেশার মধ্যে একধরনের স্বাভাবিক রুচিশীলতা প্রকাশ পায়।

তবে আরিফকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল স্মৃতির নীরবতা।

তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না। তাঁর হাসিও ছিল মৃদু—যেন খুব সামান্য একটু আলো এসে মুখের ওপর পড়ে আবার সরে গেছে। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কৃত্রিমতার কোনো চিহ্ন ছিল না। তিনি যখন হাসতেন, তখন মনে হতো, মানুষের সৌন্দর্য সব সময় উচ্চকণ্ঠে নিজেকে প্রকাশ করে না; কখনো কখনো তা নীরবতার মধ্যেও গভীরভাবে উপস্থিত থাকে।

আরিফ প্রায়ই ভাবত, মানুষের সৌন্দর্য নিয়ে পৃথিবীতে কত কথা হয়, অথচ মানুষের ভেতরের সৌন্দর্য নিয়ে কথা হয় খুব কম। অথচ যে সৌন্দর্য মানুষকে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো করে তোলে, তা কেবল মুখাবয়বে থাকে না; থাকে তার আচরণে, মননে, সাহসে, অন্যকে বোঝার ক্ষমতায়।

স্মৃতির মধ্যে আরিফ সেই সৌন্দর্যেরই উপস্থিতি অনুভব করেছিল।

তার মনে হতো, এই নারীকে বিশ্বাস করা যায়। নিজের মনের কথা বলা যায়। জীবনের কোনো জটিল অভিজ্ঞতা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা কোনো কষ্টের কথা বলতে গেলে তিনি হয়তো তাড়াহুড়ো করে বিচার করবেন না। মন দিয়ে শুনবেন, বোঝার চেষ্টা করবেন।

অবশ্য এই বিশ্বাসের পেছনে কোনো নাটকীয় ঘটনা ছিল না। ছিল না কোনো বিশেষ প্রতিশ্রুতি কিংবা আবেগঘন মুহূর্ত। ছিল কেবল দীর্ঘদিন ধরে দেখা একজন মানুষের আচরণ থেকে তৈরি হওয়া ব্যক্তিগত উপলব্ধি।

আরিফ জানত, কাউকে ভালো মানুষ মনে হওয়া আর সেই মানুষটির সমস্ত অন্তর্জগৎ জেনে ফেলা এক কথা নয়। তবু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা নির্ভরতার অনুভূতি থাকে, যা অন্যের মনে অজান্তেই বিশ্বাসের জন্ম দেয়।

স্মৃতি তার কাছে তেমনই একজন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।

কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিচয় মানেই কাউকে সম্পূর্ণভাবে জানা নয়।

আরিফ একসময় উপলব্ধি করেছিল, স্মৃতির জীবনের অনেক অধ্যায় তার অজানা রয়ে গেছে। তাঁকে যতটা বাইরে থেকে দেখা যায়, তাঁর ভেতরের মানুষটি হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। হাসিমুখের আড়ালে কী ধরনের অভিজ্ঞতা জমে আছে, কোন কোন দুঃখ তাঁকে নীরবে বদলে দিয়েছে, কী কী অপ্রাপ্তি তাঁকে শক্ত হতে শিখিয়েছে—এসব বিষয়ে তার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না।

তারপর একদিন, অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর, আরিফ সাহস করে স্মৃতির জীবনের কিছু কথা জানতে চেয়েছিল।

স্মৃতি যতটুকু বলেছিলেন, ততটুকুই আরিফের কাছে নতুন এক জগৎ উন্মোচন করেছিল।

সেই কথাগুলোর মধ্যে ছিল জীবনের বাস্তবতা, কিছু কঠিন অভিজ্ঞতা, কিছু না-পাওয়ার বেদনা। সবকিছু হয়তো বলা হয়নি, সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণও আরিফ জানতে পারেনি। কিন্তু সামান্য কিছু কথার মধ্য দিয়েই সে বুঝতে পেরেছিল, মানুষের জীবনকে বাইরে থেকে দেখে বিচার করা কতটা কঠিন।

কিছু ব্যথা আছে, যেগুলো মানুষকে ভেঙে দেয়। আবার কিছু ব্যথা মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলে, যার গভীরতা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। মানুষ তখন হাসতে শেখে, নিজের দায়িত্ব পালন করতে শেখে, অন্যের সামনে স্বাভাবিক থাকতে শেখে; অথচ তার ভেতরে এমন কিছু স্মৃতি রয়ে যায়, যেগুলোর সঙ্গে তাকে প্রতিনিয়ত একা বসবাস করতে হয়।

স্মৃতির কথা শুনতে শুনতে আরিফের মন ভারী হয়ে এসেছিল।

তার কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু সেই কষ্টের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল অন্য রকম এক অনুভূতি। স্মৃতির প্রতি তার মুগ্ধতা আরও গভীর হয়েছিল। সে উপলব্ধি করেছিল, কোনো মানুষকে শ্রদ্ধা করার একটি বড় কারণ হতে পারে তার জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেকে ধরে রাখার ক্ষমতা।

যে মানুষটি নীরবে নিজের জীবনের ভার বহন করেন, অথচ নিজের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যটুকু হারিয়ে ফেলেন না, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জন্মানো অস্বাভাবিক নয়।

সেদিনের পর থেকে স্মৃতিকে নিয়ে আরিফের ভাবনাগুলো যেন নতুন মাত্রা পেল।

মাঝেমধ্যে তার কথা বলতে ইচ্ছে করত। জানতে ইচ্ছে করত, তিনি কেমন আছেন, তাঁর দিনগুলো কেমন কাটছে। কখনো কোনো সাধারণ বিষয় নিয়ে কথা বলার ইচ্ছা হতো, কখনো মনে হতো নিজের জীবনের কিছু কথাও তাঁকে বলা যায়।

কিন্তু আরিফের মনে একটি দ্বিধা কাজ করত।

স্মৃতি কি তার এই যোগাযোগকে স্বাভাবিকভাবে নেবেন? নাকি মনে করবেন, দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে সে অকারণে বিরক্ত করছে?

মানুষের জীবনে ব্যক্তিগত পরিসর বলে একটা বিষয় আছে। পরিচিত হলেই কারও জীবনে ইচ্ছেমতো প্রবেশের অধিকার তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের সম্পর্কও সব সময় ঘনিষ্ঠতার নিশ্চয়তা দেয় না। এই সত্য আরিফ বুঝত।

তাই কথা বলতে ইচ্ছে করলেও সে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করত। কখনো বার্তা পাঠাত, কখনো অপেক্ষা করত। উত্তর পেলে ভালো লাগত, না পেলে নিজের মতো করে বিষয়টি মেনে নিত।

তার মনে হতো, কাউকে ভালো লাগার অর্থ তার কাছ থেকে প্রতিনিয়ত সময় দাবি করা নয়। কাউকে শ্রদ্ধা করার অর্থ তার ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করতে শেখা।

আরিফের অনুভূতিগুলো সে কারণেই কোনো দাবির ভাষা খুঁজে পেত না।

স্মৃতির প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল, ভালো লাগা ছিল, মায়া ছিল। সেই অনুভূতিকে ভালোবাসা বলা যায় কি না, সে প্রশ্নেরও কোনো চূড়ান্ত উত্তর সে খুঁজতে চায়নি। কারণ সব অনুভূতিকে একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বাঁধতে গেলে কখনো কখনো অনুভূতির নিজস্ব সৌন্দর্যটুকুই হারিয়ে যায়।

কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলো কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্মায় না। বরং কাউকে মানুষ হিসেবে জানার পর তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জন্মায়, তার সুখ-দুঃখের প্রতি মমতা তৈরি হয়, তার ভালো থাকার জন্য মন থেকে শুভকামনা আসে।

আরিফ নিজের অনুভূতিকে সেভাবেই দেখতে চেয়েছিল।

সে স্মৃতির জীবনে কোনো অস্বস্তির কারণ হতে চায়নি। চায়নি তার কথায় কিংবা আচরণে এমন কোনো প্রত্যাশা তৈরি হোক, যা বহন করা স্মৃতির পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। সে শুধু চেয়েছিল, স্মৃতি যেন বুঝতে পারেন—পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষও আছেন, যাঁরা তাঁকে কোনো প্রয়োজনের কারণে নয়, তাঁর নিজের গুণের কারণেই শ্রদ্ধা করেন।

যাঁরা তাঁর সৌন্দর্য দেখেন, কিন্তু শুধু সৌন্দর্যেই আটকে থাকেন না।

যাঁরা তাঁর সাহসকে সম্মান করেন, তাঁর সংযমকে মূল্য দেন, তাঁর মৃদু হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটিকে জানার আগ্রহ অনুভব করেন।

একদিন আরিফের মনে হলো, স্মৃতিকে এসব কথা জানানো দরকার।

এত দীর্ঘদিনের পরিচয়। অথচ তাঁকে নিয়ে তার মনের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো কখনো বলা হয়নি। হয়তো কথাগুলো বলার জন্য কোনো বিশেষ উপলক্ষের প্রয়োজন ছিল না। হয়তো সময়ের একটি নির্দিষ্ট সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষ বুঝতে শেখে, কিছু কথা চিরকাল নিজের ভেতরে রেখে দেওয়ার কোনো অর্থ নেই।

সেদিন রাতে আরিফ লিখতে বসেছিল।

প্রথমে লিখল পরিচয়ের কথা। তারপর সেই পুরোনো দিনের কথা, যেদিন তার মা স্মৃতির ছবি দেখে তাঁর সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। লিখল দীর্ঘদিনের মুগ্ধতার কথা, তাঁর আত্মবিশ্বাস, সৌন্দর্য, সাহস ও মার্জিত ব্যক্তিত্বের কথা।

লিখতে লিখতে তার মনে হলো, স্মৃতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই যে, তিনি নিজের সম্পর্কে কতটা জানেন, তার চেয়েও বেশি কিছু অন্যের মনে রেখে যেতে পারেন।

তারপর লিখল সেই কথাগুলো, যা এত দিন বলতে পারেনি।

লিখল, স্মৃতির কাছে তার নিজের জীবনের কিছু বাস্তব কথা ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করে। কিছু ব্যথা আছে, যেগুলো মানুষের সামনে বলা যায় না; অথচ কোনো একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের কাছে বলতে পারলে বুকের ভার কিছুটা কমে আসে।

সে জানত না, স্মৃতি তার কথাগুলো পড়ে কী ভাববেন।

হয়তো অবাক হবেন। হয়তো তাঁর কাছে লেখাটি অপ্রত্যাশিত মনে হবে। হয়তো কিছু কথা তাঁকে ভাবাবে। আরিফের মনে সামান্য ভয়ও ছিল—এত দিনের পরিচিত একজন মানুষকে নিয়ে এত কথা বলা কি ঠিক হলো?

কিন্তু সেই ভয়কে অতিক্রম করে সে লিখে গেল।

শেষ পর্যন্ত সে শুধু একটি কথাই বলতে চেয়েছিল—স্মৃতি তার কাছে এমন একজন মানুষ, যাঁকে শ্রদ্ধা করতে কোনো কারণ খুঁজতে হয় না; বরং তাঁর সঙ্গে যতটুকু পরিচয় হয়েছে, ততটুকুই তাঁকে আরও বেশি শ্রদ্ধা করার কারণ হয়ে উঠেছে।

লেখা শেষ করে আরিফ অনেকক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মনে হলো, কিছু কথা বলা মানেই কোনো উত্তর দাবি করা নয়। সব আন্তরিকতারই প্রতিদান প্রয়োজন হয় না। কোনো কোনো অনুভূতি প্রকাশ করার পরই মানুষ একধরনের স্বস্তি পায়, কারণ এত দিন ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো অবশেষে নিজের জায়গা খুঁজে পায়।

সে বার্তাটি পাঠিয়ে দিল।

পাঠানোর পর তার মনে কোনো নাটকীয় প্রত্যাশা তৈরি হলো না। সে শুধু চাইল, স্মৃতি যেন কথাগুলো ভুল না বোঝেন। যেন তাঁর মনে না হয়, এই দীর্ঘ চিঠির আড়ালে কোনো দাবি লুকিয়ে আছে।

কারণ আরিফের কাছে স্মৃতির ভালো থাকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেন নিজের মতো করে বাঁচতে পারেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, নিজের জীবনের গল্প নিজের মতো করে লিখতে পারেন—এই ছিল তার আন্তরিক কামনা।

রাত আরও গভীর হলো।

আরিফ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে নীরবতা। দূরে কোথাও দু-একটি আলোর বিন্দু। আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, মানুষের জীবনে কত বিচিত্র সম্পর্ক তৈরি হয়! কিছু সম্পর্কের নাম থাকে, কিছু সম্পর্কের নিয়ম থাকে, কিছু সম্পর্ককে সমাজ সহজেই বুঝতে পারে। আবার কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলোকে কোনো পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলা যায় না।

স্মৃতির সঙ্গে তার পরিচয়ও তেমন এক অদ্ভুত অধ্যায়।

এক যুগের বন্ধুত্ব, প্রায় এক দশকের চেনাজানা, আর তারও আগে শুরু হওয়া এক অজানা গল্প—সব মিলিয়ে স্মৃতি তার জীবনের এমন একটি নাম, যার সঙ্গে অনেক না-বলা কথা জড়িয়ে আছে।

আরিফ জানত, জীবনের সব গল্পের শেষ এক রকম হয় না। সব মুগ্ধতা ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছায় না, সব ভালো লাগা সম্পর্কের নাম পায় না, আর সব আন্তরিকতার উত্তরও সমানভাবে ফিরে আসে না।

তবু তাতে প্রতিটি অনুভূতির মূল্য কমে যায় না।

কিছু মানুষকে কাছে পাওয়া যায়, কিছু মানুষকে দূর থেকে সম্মান করতে হয়। কারও সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলা যায়, কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আবার কেউ কেউ থাকেন, যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ অনিয়মিত হলেও তাঁদের প্রতি মমতা ও শ্রদ্ধা মনের মধ্যে নীরবে বেঁচে থাকে।

স্মৃতি হয়তো আরিফের জীবনে তেমনই একজন হয়ে থাকবেন।

এমন একজন নারী, যাঁর মৃদু হাসি মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে সৌন্দর্য এখনো কোমল হতে পারে। যাঁর সাহস শেখায়—প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের ব্যক্তিত্ব ধরে রাখা যায়। যাঁর মার্জিত আচরণ মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার উচ্চারণে নয়, তার ব্যবহারেও প্রকাশ পায়।

আর যাঁর জীবনের কিছু অজানা অধ্যায় আরিফকে বুঝিয়েছে, মানুষের প্রতি মুগ্ধ হওয়ার আগে তাকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখা কতটা জরুরি।

রাতের শেষ প্রহরে আরিফের মনে একটি বাক্য ভেসে উঠল।

সব মানুষ জীবনে এসে ভালোবাসার গল্প হয়ে ওঠেন না। কেউ কেউ হয়ে ওঠেন শ্রদ্ধার, মুগ্ধতার আর নীরবে ভালো চেয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ অধ্যায়।

স্মৃতি তার কাছে তেমনই এক অধ্যায়।

যার শুরুটা হয়েছিল বহু আগে, যার অনেক কথাই আজও অজানা, আর যার শেষ কোথায়—তা জানার কোনো তাড়া আরিফের নেই।

সে শুধু চায়, স্মৃতি ভালো থাকুন।

তাঁর মৃদু হাসিটুকু অটুট থাকুক। তাঁর জীবনের পুরোনো ব্যথাগুলো একদিন প্রশান্তিতে রূপ নিক। যে মানুষটি নিজের সাহস আর সংযম দিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন, তাঁর আগামী দিনগুলো হোক আরও সুন্দর, আরও স্বস্তির।

আর যদি কোনো একদিন স্মৃতি ফিরে তাকিয়ে আরিফের সেই দীর্ঘ বার্তাটির কথা মনে করেন, তাহলে যেন তাঁর মনে হয়—একজন মানুষ তাঁকে কোনো প্রত্যাশার ভারে বাঁধতে চাননি; শুধু তাঁর ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যটুকু অনুভব করে কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন।

হয়তো সেটুকুই যথেষ্ট।

কারণ জীবনের সব সুন্দর অনুভূতির পরিণতি একসঙ্গে পথ চলা নয়।

কিছু অনুভূতির পরিণতি হলো—দূরত্ব বজায় রেখেও কারও প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখা, তার স্বাধীনতাকে সম্মান করা এবং নিজের মনের গভীরে তার জন্য একটুকরো শুভকামনা বাঁচিয়ে রাখা।

এক যুগের পরিচয়ের পর আরিফ অবশেষে বুঝেছিল, কাউকে সত্যিকার অর্থে মূল্য দেওয়া মানে শুধু তার কাছে যেতে চাওয়া নয়; কখনো কখনো তার স্বস্তি, স্বাধীনতা আর ভালো থাকাকেও নিজের অনুভূতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখা।

স্মৃতি হয়তো কখনো জানবেন, হয়তো কোনো দিন ভুলেও যাবেন। কিন্তু আরিফের কাছে এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি থেকে যাবে—একজন নীরব, মৃদু হাসির, সাদা মনের নারীকে দীর্ঘদিন ধরে দেখে, জেনে এবং তাঁর জীবনের কিছু অজানা কথা শুনে যে শ্রদ্ধা জন্মেছিল, তা শেষ পর্যন্ত শব্দ খুঁজে পেয়েছিল।

আর কিছু না-বলা কথা শব্দ খুঁজে পেলেই, অনেক সময় মানুষের মন হালকা হয়ে যায়।

সেই রাতেও হয়েছিল ঠিক তাই।

 

নীরব মুগ্ধতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Wednesday, October 28, 2026

'পরকীয়া' বইয়ের ভূমিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

বিশ্বাসের প্রাচীর এবং মানব মনের দোলাচল

মানুষের সামাজিক জীবনের সবচেয়ে পবিত্র, সংবেদনশীল এবং সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠান হলো ‘দাম্পত্য’। দুটি ভিন্ন পরিবার, ভিন্ন সংস্কৃতি ও আলাদা চিন্তার মানুষ যখন জীবনের পথ একসঙ্গে চলার পবিত্র চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তখন তাদের সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে গড়ে ওঠে নিখাদ বিশ্বাস, পারস্পরিক সম্মান এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার এক অলঙ্ঘনীয় সুউচ্চ প্রাচীর। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনধারা, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, যান্ত্রিক ব্যস্ততা এবং নৈতিকতার অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে আজ সেই সুদৃঢ় প্রাচীরেই ফাটল ধরাতে শুরু করেছে এক ধ্বংসাত্মক ছায়া—‘পরকীয়া’ বা বৈবাহিক আস্থার চরম লঙ্ঘন।

পরকীয়া কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ভুল কিংবা ক্ষণিক রোমান্টিক স্বাধীনতা নয়; এটি এমন এক বহুমুখী মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাধি, যা একটি সুখী পরিবারকে নিমেষেই ছাই করে দিতে পারে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই আমাদের সমাজে পরকীয়ার মতো জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়টিকে কেবল সামাজিক বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন গালি হিসেবে না দেখে, এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি, আইনি কাঠামো, ট্রমার অভিঘাত এবং উত্তরণের বৈজ্ঞানিক পথগুলো নিয়ে একটি সুসংহত ও গভীর গবেষণার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল। এই গ্রন্থটি সেই সুগভীর অনুসন্ধানেরই একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।

বইটির পরতে পরতে আমরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও যৌক্তিক বিন্যাসে এই বহুমাত্রিক বিষয়টিকে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছি:

·         প্রথম থেকে পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা অন্বেষণ করেছি পরকীয়ার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি, মানুষের অবচেতন মনের গোপন প্রবৃত্তি, আত্মপক্ষ সমর্থনের জটিল ফাঁদ এবং আধুনিক ডিজিটাল যুগ ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগান্তকারী প্রভাব—কীভাবে একটি ভার্চুয়াল চ্যাট বা সামান্য অবহেলা মানুষের বিশ্বাসের জগৎকে তছনছ করে দিতে পারে।

·         ষষ্ঠ অধ্যায়ে আমরা পর্যালোচনা করেছি এর রাষ্ট্রীয় আইনগত পরিণতি, পারিবারিক আইনের বিধান এবং সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর বিভিন্ন দ্বিমুখী নীতি ও অন্যায্য বিচারব্যবস্থাকে।

·         সপ্তম অধ্যায়ে এসেছে অত্যন্ত সংবেদনশীল এক অধ্যায়—সত্য উন্মোচনের পরবর্তী চরম সংকটকাল (Crisis Management) সামলানোর উপায়, ভুক্তভোগীর ট্রমা নিরাময়, অপরাধীর সত্যিকারের অনুশোচনা, কাপল থেরাপির মাধ্যমে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা এবং অবশেষ কোনো উপায় না থাকলে একটি ‘সুস্থ বিচ্ছেদ’ বা কনশাস আনকপলিং-এর মাধ্যমে আত্মসম্মান রক্ষার সাহসী সিদ্ধান্ত।

·         এবং অষ্টম অধ্যায়ে আমরা তুলে ধরেছি প্রতিরোধের সুমহান বাণী—‘প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ প্রতিকার’। উন্মুক্ত যোগাযোগ, একে অপরের প্রতি নিখাদ সম্মান, ব্যস্ততার ভিড়েও কোয়ালিটি টাইম বের করা এবং কর্মক্ষেত্র ও ডিজিটাল দুনিয়ায় কঠোর ব্যক্তিগত সীমা বা বাউন্ডারি (Boundaries) বজায় রাখার মধ্য দিয়েই কীভাবে একটি পরিবারকে চিরকালের মতো নিরাপদ রাখা যায়, তার দিকনির্দেশনা।

পরিশেষে বলা যায়, ভালোবাসা কোনো স্থবির বা সয়ংক্রিয় অনুভূতি নয়; এটি প্রতিদিনের সচেতন অনুশীলন এবং আস্থার এক কঠোর সাধনা। অন্ধ মোহ বা ক্ষণিক উত্তেজনার মোহে পড়ে বিশ্বাসের প্রাসাদকে ভেঙে ফেলার চেয়ে, সততা, প্রজ্ঞা ও পারস্পরিক মর্যাদার আলোয় জীবনকে সাজানোই মানুষের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। এই বইটি কেবল পরকীয়ার অন্ধকার দিকগুলোই উন্মোচন করে না, বরং পাঠককে এক আলোকোজ্জ্বল, নিরাপদ এবং ট্রামামুক্ত পারিবারিক জীবনের সন্ধান দিতে সচেষ্ট হয়। আশা করি, এই গ্রন্থটি প্রতিটি সচেতন পাঠকের মনন ও ভাবনায় এক গভীর রেখাপাত করবে এবং একটি সুন্দর সমাজ গঠনে পথপ্রদীপের কাজ করবে।

 

মোঃ হেলাল উদ্দিন

বরগুনা, বাংলাদেশ

সেপ্টেম্বর, ২০২৬

'পরকীয়া' বইয়ের প্রচ্ছদ