১.
“আগে থেকে একটা টেক্সট, আমি তোমাকে কখনও দিইনি, আর দেবও না। তবুও বলি, তোমাকে ভালোবাসার নেশা আমার এ জনমে শেষ হবে না…”
ফেসবুকের নিউজফিডে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ থমকে গেল ডালিম হায়দার। পোস্টটি পড়ার পর কয়েক সেকেন্ড তার চোখ স্থির হয়ে রইল মুঠোফোনের পর্দায়। তারপর আবার পড়ল। একবার, দুবার, তিনবার।
শব্দগুলো খুব সাধারণ। অথচ কোথায় যেন একটা গভীর অভিমান লুকিয়ে আছে। এমন এক অভিমান, যার আড়ালে হয়তো অপেক্ষা আছে, ভালোবাসা আছে, আছে কারও কাছ থেকে সামান্য একটু মনোযোগ পাওয়ার আকুলতা।
ডালিমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
এই ডালিম কিন্তু কোনো রসালো ফল নয়। আবার ইতিহাসের আলোচিত মেজর ডালিমও নয়। ইনি একজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ, পেশায় কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। ছাত্রজীবন থেকেই গল্প, কবিতা আর উপন্যাসের পাতায় নিজের একটা আলাদা পৃথিবী গড়ে তুলেছে সে। মানুষের মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্না, নীরবতার ভেতরে জমে থাকা অভিমান কিংবা ভালোবাসার সূক্ষ্মতম অনুভূতিগুলো বুঝতে পারার একটা অহংকারও তার আছে।
কিন্তু আজ একটি ফেসবুক পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতিগুলোকেই চিনতে পারছে না সে।
পোস্টটি করেছেন ডালিয়া।
ডালিয়া রহমান। তিনিও সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখেন, পড়েন, কবিতার ভেতরে মানুষ খোঁজেন। তাঁর লেখায় কখনো প্রেমের মায়াবী আলো, কখনো বিরহের দীর্ঘশ্বাস, কখনোবা নারীর নীরব আত্মকথা ফুটে ওঠে। নামের সঙ্গে ডালিয়া ফুলের একটা কাব্যিক মিল থাকলেও তাঁকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে কেবল তাঁর সৌন্দর্য নয়; বরং তাঁর কথার গভীরতা, চিন্তার স্বাতন্ত্র্য আর অনুভূতির প্রকাশভঙ্গি।
ডালিম আর ডালিয়ার পরিচয় ফেসবুকে। পরিচয়ের সূত্র কবিতা, আর সম্পর্কের সেতু মেসেঞ্জার।
তবে সম্পর্কটা ঠিক কী, তা এখনো কেউ জানে না। এমনকি তারা নিজেরাও নয়।
ডালিম পোস্টটি আবার পড়ল।
তারপর মেসেঞ্জারে ঢুকে ডালিয়ার নামের ওপর আঙুল রাখল।
কিছু লিখতে গিয়েও থেমে গেল।
কী লিখবে?
“কবিতাটা সুন্দর হয়েছে”—এতটুকু বললে কি মনের কথাটা বলা হবে?
নাকি লিখবে, “কাউকে এতটা ভালোবাসলে তার অভিমান ভাঙানোর দায়িত্বও তো নিতে হয়!”
কিন্তু দ্বিতীয় কথাটি লিখতে গিয়ে তার আঙুল কেঁপে উঠল। কথাটা কি একটু বেশি ব্যক্তিগত হয়ে গেল না?
ডালিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
অবশেষে লিখল—
—কবিতার মানুষটি কি খুব অভিমানী?
মেসেজটি পাঠিয়ে সে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর জানালার বাইরে তাকাল। শরতের আকাশে তখন বিকেলের আলো নিভে আসছে। দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে বসে একটি পাখি ডাকছে। ডালিমের মনে হলো, প্রকৃতিও বুঝি আজ তাকে নিয়ে একটু মজা করছে।
কয়েক মিনিট পর মেসেঞ্জারে উত্তর এল।
—মানুষটি অভিমানী নয়। শুধু যার কাছে একটু কথা আশা করে, তার নীরবতা সহ্য করতে পারে না।
ডালিমের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সে লিখল—
—তাহলে মানুষটির অপেক্ষা কি খুব দীর্ঘ?
উত্তর এল—
—অপেক্ষা দীর্ঘ হয় না, ডালিম সাহেব। অপেক্ষার মানুষটি নীরব থাকলে সময়টা দীর্ঘ মনে হয়।
ডালিম আর হাসতে পারল না।
কারণ, কথাগুলো কবিতার চরিত্রের জন্য লেখা হলেও কোথাও যেন তার নিজের নামটিই উচ্চারিত হচ্ছিল।
সেদিন প্রথমবার ডালিমের মনে হলো, ডালিয়ার লেখা কবিতার মানুষটি হয়তো কাল্পনিক নয়।
হয়তো সেই মানুষটি সে নিজেই।
আর যদি সত্যিই তা-ই হয়, তবে এই গল্পের শুরুটা সে জানত, কিন্তু শেষটা কোথায়—তা তার জানা নেই।
২.
ডালিমের সঙ্গে ডালিয়ার পরিচয় হয়েছিল কয়েক মাস আগে।
সেদিন ছিল শরতের এক শান্ত সন্ধ্যা। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে কাশফুলের ঋতুর মায়া। কলেজ থেকে ফিরে চায়ের কাপ হাতে ফেসবুকে ঢুকেছিল ডালিম। প্রতিদিনের মতোই পরিচিত লেখকদের কবিতা, গল্প আর সাহিত্যবিষয়ক পোস্ট দেখছিল।
হঠাৎ একটি কবিতায় চোখ আটকে গেল।
কবিতার নাম—‘অপেক্ষার জানালায়’।
লেখিকার নাম ডালিয়া রহমান।
কবিতাটির কয়েকটি পঙ্ক্তি ডালিমের মনে গভীর দাগ কাটল। সেখানে একজন মানুষ তার প্রিয় মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দাবি নেই, শুধু একটা নীরব আকাঙ্ক্ষা—কেউ একজন এসে বলুক, “আমি আছি, তোমার একাকিত্বের পাশে।”
ডালিম কবিতাটি দুবার পড়ল। তারপর লেখিকার প্রোফাইলে ঢুকল।
কবিতার সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিছু ছোট কবিতা, কয়েকটি গদ্য, আর বিচ্ছিন্ন কিছু অনুভূতির লেখা। কিন্তু প্রতিটি লেখার মধ্যে একটা নিজস্ব স্বর আছে। শব্দের কারুকাজের চেয়ে অনুভূতির সততা সেখানে বেশি।
ডালিমের ভালো লাগল।
সে কবিতাটি মেসেঞ্জারে শেয়ার করে লিখল—
—আপনার এই কবিতাটি আমার ভালো লেগেছে। বিশেষ করে অনুভূতির প্রকাশভঙ্গি। আপনার লেখায় একটা স্বাভাবিক কোমলতা আছে, যা সহজে তৈরি করা যায় না। এমন প্রতিভার সঙ্গে পরিচয় হলে সাহিত্যে নতুন নক্ষত্রের সন্ধান মিলতে পারে।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
—আপনার মতো একজন গুণী মানুষের কাছ থেকে এমন কথা পাওয়া সত্যিই আনন্দের। আমি তো খুব বেশি দিন ধরে লিখছি না। এখনো অনেক কিছু শেখার আছে।
ডালিম লিখল—
—লেখালেখির বয়স দিয়ে প্রতিভা বিচার করা যায় না। অনেক সময় একটি ভালো কবিতার পেছনে বহু বছরের নীরব অনুভব কাজ করে।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—কথাটা সুন্দর বলেছেন। তবে প্রতিভা থাকলেই তো হয় না, কেউ একজন পাশে থেকে উৎসাহ দিলে হয়তো সেই প্রতিভা পূর্ণতা পেত।
ডালিম সেদিন কথাটিকে নিছক সাহিত্যিক বিনয় হিসেবেই নিয়েছিল।
জানত না, একদিন এই কথাটিই তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর সত্য হয়ে উঠবে।
তারপর শুরু হলো কবিতা নিয়ে আলোচনা।
কখনো ডালিয়া নিজের লেখা পাঠাতেন, ডালিম ছন্দের দুর্বলতা ধরিয়ে দিত। কখনো ডালিম কোনো গল্পের অংশ শেয়ার করত, ডালিয়া চরিত্রের মনস্তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন।
তাদের কথোপকথনে থাকত সাহিত্য, দর্শন, জীবনবোধ, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল কিংবা সমকালীন লেখকদের প্রসঙ্গ।
কথা হতো, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নয়।
কে কোথায় থাকেন, কার জীবনে কী ঘটেছে, কে কাকে ভালোবাসেন—এসব প্রশ্নের কোনো জায়গা ছিল না।
তাদের সম্পর্কের একটি সুন্দর সীমারেখা ছিল।
ডালিম ডালিয়াকে জানত একজন কবি হিসেবে। ডালিয়া ডালিমকে চিনতেন একজন সাহিত্যপ্রেমী শিক্ষক হিসেবে।
কিন্তু মানুষকে কি কেবল তার পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যায়?
কখনো কখনো একটি কবিতার ব্যাখ্যা করতে করতে আমরা কবির হৃদয়ের কাছে পৌঁছে যাই। তারপর একসময় বুঝতে পারি, আমরা আর কবিতা পড়ছি না—আমরা মানুষটিকেই পড়ছি।
ডালিমের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটল।
৩.
শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের হালকা শীত তখন বাতাসে।
সকালের জানালা দিয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে ডালিমের পড়ার টেবিলে। টেবিলের ওপর কয়েকটি বই, পাশে অর্ধেক খাওয়া চায়ের কাপ। কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে।
ঠিক তখনই মেসেঞ্জারে একটি মেসেজ এল।
ডালিয়া লিখেছেন—
—একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
ডালিম উত্তর দিল—
—জিজ্ঞেস করুন।
—আপনি কি সব সময় এত গম্ভীর থাকেন, নাকি কবিতা নিয়ে কথা বলার সময়ই শুধু এমন হন?
ডালিম হেসে ফেলল।
—কেন বলুন তো?
—আপনার কথাবার্তা দেখে মনে হয়, আপনি প্রতিটি শব্দ বলার আগে তার সাহিত্যিক মূল্য যাচাই করে নেন।
ডালিম লিখল—
—তা হলে তো বিপদ! আপনার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমাকে অভিধান নিয়ে বসতে হবে।
—না, না। আজ অভিধান বন্ধ থাকুক। আজ একটু সাধারণ মানুষের মতো কথা বলুন।
ডালিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর লিখল—
—সাধারণ মানুষের মতো কথা বলার অনুমতি দিলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
—করুন।
—আপনি কি সব সময় এত সুন্দর করে কথা বলেন?
উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।
—এটা কি কবিতার সমালোচনা, নাকি অন্য কিছু?
ডালিমের বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
সে লিখল—
—কিছু কিছু অনুভূতির সমালোচনা করা যায় না। শুধু অনুভব করতে হয়।
সেদিন কথোপকথনের মোড় বদলে গেল।
প্রথমবার তারা কবিতার বাইরে এসে নিজেদের নিয়ে কথা বলল। শৈশব, পড়াশোনা, পছন্দের বই, অবসর, বৃষ্টির দিন, একাকিত্ব, পছন্দের গান—একটি বিষয় থেকে আরেকটি বিষয়ে গড়িয়ে চলল আলাপ।
ডালিম জানতে পারল, ডালিয়া বই পড়তে ভালোবাসেন, বৃষ্টি হলে জানালার পাশে বসে থাকতে ভালো লাগে, আর খুব কাছের মানুষদের কাছ থেকে তাঁর প্রত্যাশা খুব সামান্য—একটু সময়, কিছু আন্তরিক কথা, আর প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
ডালিয়া জানতে পারলেন, ডালিম বাইরে থেকে যতটা গম্ভীর, ভেতরে ততটা নয়। সে অভিমান করে, মন খারাপ করে, কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই একা থাকতে চায়। নিজের অনুভূতি সহজে প্রকাশ করতে পারে না, অথচ অন্যের অনুভূতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখতে পারে।
সেদিনের কথোপকথনের শেষে ডালিয়া লিখলেন—
—আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।
ডালিম লিখল—
—আমারও।
—কবিতা নিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে?
ডালিম কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর উত্তর দিল—
—হ্যাঁ, মানুষ হিসেবে।
এই ছোট্ট কথাটির মধ্যেই যেন অদৃশ্য একটি দরজা খুলে গেল।
সেই দরজার ওপাশে ছিল এক নতুন পৃথিবী।
সেখানে সাহিত্য ছিল, কিন্তু কেবল সাহিত্য নয়। সেখানে বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু কেবল বন্ধুত্ব নয়। সেখানে কথা ছিল, অথচ কথার আড়ালে এমন কিছু অনুভূতি জমতে শুরু করেছিল, যার কোনো নাম তখনো তারা কেউ দিতে চায়নি।
৪.
ব্যক্তিগত কথাবার্তা বাড়তে থাকল।
একদিন ডালিয়া নিজের পড়াশোনা, কর্মজীবন এবং জীবনের কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানালেন, বয়সের দিক থেকে তিনি ডালিমের চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড়।
ডালিম প্রথমে অবাক হয়েছিল।
সে এত দিন বয়স নিয়ে ভাবেনি। ডালিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বয়সের কোনো হিসাব তার মাথায় আসেনি। কিন্তু কথাটি জানার পর সে কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল।
ডালিয়া হয়তো তার নীরবতাকে অন্যভাবে বুঝেছিলেন।
তিনি লিখলেন—
—বয়সের কথাটা আগে বলা উচিত ছিল। জানি না, আপনি বিষয়টাকে কীভাবে নেবেন।
ডালিম উত্তর দিল—
—কেন? বয়স কি আমাদের কথোপকথনের বিষয়বস্তু বদলে দিয়েছে?
—তা নয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে এসব বিষয় তো গুরুত্বপূর্ণ।
—গুরুত্বপূর্ণ, অবশ্যই। তবে আমার কাছে মানুষের মন, চিন্তা আর ব্যক্তিত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
ডালিয়া লিখলেন—
—আপনি কথাগুলো খুব সুন্দর করে বলতে পারেন।
ডালিম এবার একটু দুষ্টুমি করল।
—শুধু বলতে পারি, নাকি বুঝতেও পারি, সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
—বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে!
—সাহিত্য পড়াই তো আমার পেশা। মানুষের মনের অঙ্ক কষতে কষতে নিজের অঙ্কটাই কখনো কখনো ভুল হয়ে যায়।
ডালিয়া হেসে ওঠার ইমোজি পাঠালেন।
তারপর লিখলেন—
—তাহলে একটা কথা বলি? আমার বয়স আপনার চেয়ে বেশি জেনে যদি কখনো মনে হয়, এই সম্পর্কটা আর এগোনো উচিত নয়, তাহলে নির্দ্বিধায় বলবেন। আমি চাই না, কোনো মানুষ আমার কারণে অস্বস্তিতে থাকুক।
ডালিম এবার আর হাসল না।
সে লিখল—
—ডালিয়া, একটা কথা মনে রাখবেন। আমি আপনাকে কোনো বয়সের সংখ্যার মধ্যে দিয়ে চিনিনি। আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে যে মানুষটিকে চিনেছি, তার প্রতি আমার ভালো লাগা তৈরি হয়েছে। সেই অনুভূতিকে শুধু বয়সের হিসাব দিয়ে বিচার করতে পারব না।
ডালিয়া অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিলেন না।
ডালিম ভাবল, হয়তো কথাটি বেশি আবেগপূর্ণ হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর মেসেজ এল—
—সবাই যদি এভাবে ভাবতে পারত!
ডালিম লিখল—
—সবাই তো কবিতা পড়ে না, আর পড়লেও সবাই কবিতার ভেতরে মানুষ খুঁজতে শেখে না।
সেদিনের কথোপকথন সেখানেই শেষ হয়েছিল।
কিন্তু ডালিয়া ফোনটা রেখে দেওয়ার পরও অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে ছিলেন।
বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে। দূরের গাছের পাতাগুলো নড়ছে ধীরে ধীরে।
তাঁর মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিন পর কেউ যেন তাঁকে শুধু একজন নারী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দেখতে শিখেছে।
যে বয়সের হিসাবের আগে অনুভূতির ভাষা বোঝার চেষ্টা করে।
যে সৌন্দর্যের প্রশংসা করার আগে মনের সৌন্দর্য খুঁজে নেয়।
আর ডালিম?
সেও সেদিন নিজের কাছে একটি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছিল।
সে ডালিয়ার সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসে।
অকারণেই ভালোবাসে।
কোনো কবিতার প্রয়োজন হয় না, কোনো সাহিত্যিক আলোচনার অজুহাত লাগে না।
শুধু ডালিয়া অনলাইনে এলে তার মন ভালো হয়ে যায়।
এটাই কি প্রেমের শুরু?
ডালিম জানত না।
তবে এটুকু বুঝেছিল, তার দিনের ভেতর একটি নতুন অপেক্ষা জন্ম নিয়েছে।
৫.
তারপর থেকে তাদের দিনগুলো বদলে গেল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ডালিম ফোন হাতে নিত। ডালিয়ার কোনো মেসেজ এসেছে কি না, দেখত।
কখনো থাকত—
“ঘুম ভেঙেছে, কবি সাহেব?”
কখনো—
“আজ আকাশটা খুব সুন্দর। আপনার জন্য একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে।”
আবার কোনো দিন—
“চা খেয়েছেন? খালি পেটে সাহিত্যচর্চা করলে কিন্তু কবিতার ছন্দ নষ্ট হয়ে যেতে পারে!”
ডালিমের উত্তরও কম যেত না।
“চা খেয়েছি। তবে আপনার মেসেজটা না পেলে সকালের স্বাদটা অসম্পূর্ণ থাকত।”
কখনো ডালিয়া লিখতেন—
“আপনি কি সবার সঙ্গেই এমন মিষ্টি করে কথা বলেন?”
ডালিম উত্তর দিত—
“না। সবার জন্য আমার এত শব্দ খরচ হয় না।”
—তাহলে আমার জন্য এত শব্দ কেন?
—কিছু মানুষকে উত্তর দিতে হয় না, তাদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে।
ডালিয়া মেসেজটি পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতেন।
তারপর লিখতেন—
—আপনি জানেন, আপনার এই কথাগুলো খুব বিপজ্জনক?
—কেন?
—কারও মন ভালো করে দেওয়ার ক্ষমতা সবার থাকে না। আর যার থাকে, তার কাছ থেকেই মানুষ একসময় বেশি কিছু আশা করে বসে।
ডালিম লিখত—
—তাহলে আপনার মন ভালো রাখার দায়িত্বটা আমাকে দেওয়া যায়।
ডালিয়া উত্তর দিতেন—
—দায়িত্ব নেওয়া সহজ, দায়িত্ব পালন করা কঠিন।
ডালিম লিখত—
—দেখুন না, চেষ্টা করে।
এভাবেই তাদের কথার ভেতরে ভালোবাসা জমতে লাগল।
কখনো কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে করতে রাত গভীর হয়ে যেত। কখনো কোনো গল্পের চরিত্র নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে একজন আরেকজনকে খোঁচা দিত। কখনো দুজনেই কোনো কথা না বলে শুধু অনলাইনে থাকত।
তবু নীরবতারও একটা ভাষা ছিল।
ডালিয়া যখন মন খারাপ করতেন, তাঁর কথার দৈর্ঘ্য কমে যেত। ডালিম যখন কোনো চিন্তায় ডুবে থাকত, তখন হঠাৎ করেই কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে যেত।
ডালিয়া সেই অনুপস্থিতির কারণ বুঝতে পারতেন না।
তিনি জানতেন, ডালিমের কাজ আছে, কলেজ আছে, নিজের জীবন আছে। তবু মন কি সব সময় যুক্তির কথা শোনে?
যার একটি ছোট্ট মেসেজে সকাল সুন্দর হয়ে ওঠে, তার কয়েক ঘণ্টার নীরবতাও কখনো কখনো পুরো দিনটিকে বিষণ্ন করে দিতে পারে।
একদিন দুপুরে ডালিয়া লিখলেন—
—আপনার সঙ্গে একটা কথা বলব?
—বলুন।
—আপনি যখন আমার সঙ্গে কথা বলেন, তখন মনে হয় আমি আপনার কাছে বিশেষ কেউ। আবার হঠাৎ কোনো খবর না দিয়ে হারিয়ে গেলে মনে হয়, হয়তো আমি নিজেই ভুল বুঝছি।
ডালিম মেসেজটি পড়ে চুপ করে রইল।
কথাটা সত্যি।
সে ডালিয়াকে পছন্দ করে, কিন্তু নিজের অনুভূতিকে কীভাবে সামলাতে হয়, তা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। কখনো সে খুব কাছে চলে আসে, আবার কখনো অজানা দ্বিধায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
তার মনে হয়, অতিরিক্ত আবেগ মানুষকে দুর্বল করে দেয়। আবার ডালিয়ার সঙ্গে কথা না বললে তার নিজেরই অস্থির লাগে।
এই দ্বন্দ্বের কোনো সুন্দর সাহিত্যিক সমাধান তার জানা নেই।
সে শুধু লিখল—
—আপনি ভুল বুঝছেন না, ডালিয়া। তবে কখনো কখনো আমি নিজের মধ্যেই হারিয়ে যাই।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—নিজের মধ্যে হারিয়ে যান, তাতে আমার আপত্তি নেই। শুধু যাওয়ার আগে জানিয়ে গেলে ভালো লাগে। তাহলে অন্তত অপেক্ষা করতে করতে নিজেকে ভুল বুঝতে হয় না।
ডালিম কথাটা মনে রাখার চেষ্টা করল।
কিন্তু মানুষ অনেক সময় যে কথাগুলো সবচেয়ে ভালো বোঝে, সেগুলোই বাস্তবে সবচেয়ে বেশি ভুলে যায়।
ডালিমও তার ব্যতিক্রম হলো না।
৬.
সেদিন সকাল থেকেই ডালিয়ার মন ভালো ছিল।
ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলতেই দেখেছিলেন, রাতের শিশিরে বাগানের শিউলিগুলো ভিজে আছে। সাদা পাপড়ির ওপর কমলা বোঁটা, মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা ফুলের গন্ধ—সবকিছুতেই এক ধরনের কোমল বিষণ্নতা।
তিনি ভাবলেন, আজ ডালিমকে একটা কবিতা পাঠাবেন।
কবিতার নাম দিলেন—‘তোমাকে বলিনি’।
কবিতাটি লিখতে লিখতে তাঁর মনে হচ্ছিল, কথাগুলো যেন নিজের অজান্তেই একজন নির্দিষ্ট মানুষের জন্য লেখা হয়ে যাচ্ছে।
তিনি লিখলেন—
তোমাকে বলিনি, তবু তুমি জানো, কোন কথাটুকুতে আমার মন ভালো হয়। তোমাকে ডাকিনি, তবু প্রতিটি সন্ধ্যায় কেন জানি তোমার অপেক্ষা রয়।
তুমি যদি জানতেই না, তবে এত কাছে এলে কেন? আমার নীরবতায় নিজের কথাগুলো রাখলে কেন? এখন তুমি চুপ করে থাকলে, আমার চারপাশে এত শব্দের ভিড়েও একটা শূন্যতা বাজে কেন?
কবিতাটি শেষ করে ডালিয়া ডালিমকে পাঠালেন।
লিখলেন—
—আজ সকালে লিখলাম। পড়বেন, সময় হলে।
ডালিম তখন কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মেসেজটি দেখল, কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো সময় পেল না। মনে মনে ভাবল, কলেজ থেকে ফিরে কবিতাটি পড়বে, তারপর ভালো করে মতামত জানাবে।
কিন্তু কলেজে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্লাস, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা, জরুরি কিছু কাজ—সব মিলিয়ে দিনটি কেটে গেল।
বিকেলে বাসায় ফিরেও একটি কাজে আটকে গেল সে।
এদিকে ডালিয়া বারবার ফোন দেখছেন।
সকালে পাঠানো মেসেজের কোনো উত্তর নেই।
দুপুর পেরিয়ে বিকেল হলো।
ডালিয়া নিজেকে বোঝালেন, ডালিম ব্যস্ত। নিশ্চয়ই কোনো কাজে আছে।
কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর তাঁর মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে এল।
তিনি জানেন, একজন মানুষের সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা সম্ভব নয়। তিনি এটাও জানেন, কোনো সম্পর্কের মধ্যেই সব সময় একই রকম মনোযোগ পাওয়া যায় না।
তবু তাঁর কষ্ট হচ্ছিল।
কারণ, তিনি ডালিমের কাছে শুধু নিজের কবিতার মূল্যায়ন চাননি। চেয়েছিলেন, কবিতাটি পড়ার পর মানুষটি একটু বলুক—
“ডালিয়া, আজ আপনার কবিতাটা পড়ে মনে হলো, আপনি যেন নিজের মনের কথাই লিখেছেন।”
অথবা—
“কবিতাটা সুন্দর হয়েছে। তবে আজ আপনার মন খারাপ কেন?”
কখনো কখনো ভালোবাসার চাওয়া এতটুকুই।
একটি প্রশ্ন।
একটু মনোযোগ।
নিজের অনুভূতির অস্তিত্বটুকু অন্য একজনের কাছে স্বীকার করার সুযোগ।
রাত বাড়তে লাগল।
অবশেষে ডালিয়া ফেসবুকে ঢুকলেন। অনেকক্ষণ ভাবার পর লিখলেন সেই কথাগুলো—
“আগে থেকে একটা টেক্সট, আমি তোমাকে কখনও দিইনি, আর দেবও না। তবুও বলি, তোমাকে ভালোবাসার নেশা আমার এ জনমে শেষ হবে না…”
এটি ছিল তাঁর অভিমান।
একই সঙ্গে নিজের কাছে নিজের অনুভূতির স্বীকারোক্তি।
তিনি জানতেন না, ডালিম পোস্টটি দেখবে কি না। দেখলেও বুঝবে কি না, কথাগুলোর আড়ালে কতটা অপেক্ষা জমে আছে।
কিন্তু ডালিম দেখল।
আর সেই পোস্টের সামনে দাঁড়িয়েই সে প্রথমবার নিজের অনুভূতির গভীরতা উপলব্ধি করল।
৭.
ডালিম যখন মেসেঞ্জারে লিখল, তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
—কবিতার মানুষটি কি খুব অভিমানী?
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—মানুষটি অভিমানী নয়। শুধু যার কাছে একটু কথা আশা করে, তার নীরবতা সহ্য করতে পারে না।
ডালিম এবার আর দেরি করল না।
—আজ আপনার কবিতাটা পড়তে পারিনি। কলেজে খুব ব্যস্ত ছিলাম। তারপর বাসায় ফিরেও কাজে আটকে গিয়েছিলাম। কিন্তু সত্যি বলছি, আপনাকে অবহেলা করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না।
ডালিয়া লিখলেন—
—আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে না, ডালিম। আপনার নিজের জীবন আছে। কাজ আছে। ব্যস্ততা আছে। আমি সেসব বুঝি।
—তাহলে অভিমান?
—অভিমান তো সব সময় যুক্তি মেনে হয় না।
ডালিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর লিখল—
—একটা কথা বলি, ডালিয়া?
—বলুন।
—আপনি যখন আমার সঙ্গে কথা বলেন, আমি সত্যিই ভালো থাকি। আপনার মেসেজের জন্য অপেক্ষা করি। আপনার লেখা পড়তে ভালো লাগে। আপনি কোনো কথা বললে সারাদিন সেটা নিয়ে ভাবি। কিন্তু আমি সব সময় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি না। কখনো কখনো চুপ করে থাকি। হয়তো সেটা আমার ভুল।
ডালিয়া মেসেজটি পড়ে স্থির হয়ে গেলেন।
তিনি কি ঠিক পড়ছেন?
ডালিম, যে এত দিন কথার আড়ালে অনুভূতি লুকিয়ে রাখত, আজ নিজেই নিজের মনের দরজা খুলে দিচ্ছে?
তিনি লিখলেন—
—আপনি জানেন, আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট কোথায়?
—কোথায়?
—আপনার ব্যস্ততায় নয়। আপনার নীরবতার কারণ না জানায়। আপনি যদি বলেন, আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, তাহলেও আমার কষ্ট হবে না। কিন্তু আপনি চুপ করে থাকলে মনে হয়, আমি হয়তো আপনার জীবনে যতটা জায়গা ভেবেছি, ততটা জায়গা আমার নেই।
ডালিমের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এল।
সে লিখল—
—আপনার জায়গাটা কতটুকু, সেটা হয়তো আমি এখনো ঠিক করে বলতে পারিনি। কিন্তু আপনি যে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
ডালিয়া উত্তর দিলেন না।
ডালিম আবার লিখল—
—আজ একটা কথা স্বীকার করি?
—কী কথা?
—আমি আপনার সঙ্গে কথা বলার অজুহাত খুঁজি। কখনো কবিতা, কখনো গল্প, কখনো এমন কোনো প্রশ্ন, যার উত্তর আমার জানা আছে। শুধু আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব বলে।
ডালিয়ার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
তবু তিনি লিখলেন—
—আপনি তাহলে এত দিন আমাকে সাহিত্য শেখানোর নাম করে বিরক্ত করেছেন?
ডালিম লিখল—
—সাহিত্য শেখানো তো উপলক্ষ। আসল উদ্দেশ্যটা বলতে একটু দেরি হয়ে গেল।
—আর সেই উদ্দেশ্যটা কী?
ডালিম এবার অনেকক্ষণ ধরে লিখল। মুছল। আবার লিখল।
শেষ পর্যন্ত পাঠাল—
—আপনার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে, ডালিয়া। শুধু ভালো লাগে বললে কম বলা হয়। আপনার মেসেজ এলে আমার দিনটা অন্য রকম হয়ে যায়। আপনার মন খারাপ থাকলে আমারও অস্বস্তি হয়। আপনি হাসলে মনে হয়, কথাগুলো আরও একটু দীর্ঘ হোক। আর আপনি চুপ করে থাকলে বারবার ফোন দেখতে ইচ্ছে করে।
তারপর আরও একটি মেসেজ পাঠাল।
—আমি জানি না, এটাকে আপনি কী বলবেন। তবে আমার কাছে এই অনুভূতিটা আর সাধারণ পরিচয়ের মধ্যে নেই।
ডালিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরলেন।
জানালার বাইরে তখন রাত। দূরে কোথাও শিয়াল ডাকছে। ঘরের মধ্যে নীরবতা, আর সেই নীরবতার ভেতরে একজন নারীর বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে বহুদিনের চাপা আনন্দ।
তিনি উত্তর দিলেন—
—সব অনুভূতির নাম দিতে হয় না, ডালিম। কিছু অনুভূতি যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
ডালিম লিখল—
—তাহলে আমাদের অনুভূতিটাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখব?
ডালিয়া লিখলেন—
—রাখবেন তো?
—চেষ্টা করব।
—চেষ্টা নয়, কথা দিন।
ডালিম লিখল—
—কথা দিলাম, আপনার অভিমানকে অবহেলা করব না। আর কোনো দিন ব্যস্ততায় হারিয়ে গেলে অন্তত জানিয়ে যাব।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—আমিও কথা দিচ্ছি, আপনার নীরবতার প্রতিটি মুহূর্তকে অভিযোগ দিয়ে ভরিয়ে তুলব না। শুধু কখনো কখনো মনে করিয়ে দেব, আপনার জন্য কেউ একজন অপেক্ষা করে।
ডালিম লিখল—
—সেই অপেক্ষার মানুষটিকে আমি হারাতে চাই না।
ডালিয়া আর কিছু লিখলেন না।
শুধু একটি লাল হৃদয়ের ইমোজি পাঠালেন।
সেই রাতের কথোপকথন তাদের সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না। কেউ কাউকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়নি। কেউ ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রুতির পাহাড় গড়ে তোলেনি।
তবু দুজনেই বুঝতে পেরেছিল, তাদের সম্পর্কের ভেতরে এমন একটি অনুভূতি জন্ম নিয়েছে, যাকে আর কেবল বন্ধুত্ব বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।
সেদিন রাতেই ডালিম ডালিয়ার পাঠানো কবিতাটি পড়ল।
কবিতার শেষে সে লিখল—
—আজ আপনার কবিতার সবচেয়ে সুন্দর লাইনটি জানেন কোনটি?
—কোনটি?
—যেখানে আপনি লিখেছেন, ‘তুমি যদি জানতেই না, তবে এত কাছে এলে কেন?’
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—কেন সুন্দর?
ডালিম লিখল—
—কারণ, এই প্রশ্নটা আজ আমার নিজের কাছেও আছে।
৮.
এরপর দিনগুলো যেন অন্য রকম হয়ে উঠল।
তাদের সকাল শুরু হতো শুভেচ্ছা দিয়ে, দুপুরে চলত ব্যস্ততার ফাঁকে ছোট ছোট কথোপকথন, আর সন্ধ্যা নামলে খুলে যেত অনুভূতির দীর্ঘ জানালা।
কখনো ডালিয়া ফোন করে বলতেন—
—আজ আপনার কণ্ঠ শুনতে ইচ্ছে করছে।
ডালিম মৃদু হেসে বলত—
—কবিতার কোনো লাইন শোনাব?
—না। আজ কবিতা নয়। আজ মানুষটাকে শুনব।
ডালিম তখন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকত। তারপর খুব সাধারণ কোনো কথা বলত—দিন কেমন গেল, দুপুরে খাওয়া হয়েছে কি না, কলেজে কোনো মজার ঘটনা ঘটেছে কি না।
ডালিয়া সেই সাধারণ কথাগুলোই মন দিয়ে শুনতেন।
কারণ, ভালোবাসার মানুষ সব সময় অসাধারণ কিছু বলে না। কখনো কখনো তার সবচেয়ে সাধারণ কথাটিও অসাধারণ হয়ে ওঠে।
একদিন বিকেলে বৃষ্টি নামল।
ডালিম বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ ডালিয়ার কথা মনে পড়ল। তিনি বলেছিলেন, বৃষ্টির দিনে তাঁর মন অকারণে বিষণ্ন হয়ে যায়।
ডালিম ফোন করল।
—কী করছেন?
—জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছি।
—মন খারাপ?
—একটু।
—কেন?
—জানি না। কিছু কিছু বৃষ্টি আছে, যা পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
ডালিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
—আমি যদি এখন আপনার পাশে থাকতাম, কী করতেন?
ডালিয়া একটু হেসে বললেন—
—প্রথমে এক কাপ চা বানিয়ে দিতাম।
—তারপর?
—তারপর আপনাকে বলতাম, এত কথা বলেন, এবার একটু চুপ করে বৃষ্টি দেখুন।
ডালিম হেসে উঠল।
—আর আপনি?
—আমি আপনার পাশে বসে থাকতাম।
—কোনো কথা না বলে?
—সব সময় কি কথা বলতে হয়, ডালিম? কখনো কখনো প্রিয় মানুষের পাশে নীরবে বসে থাকাটাও তো এক ধরনের কথা।
ডালিমের মনে হলো, এই কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন এক সুখ, যা কোনো কবিতার বইয়ে পুরোপুরি লেখা সম্ভব নয়।
সে ধীরে বলল—
—আপনি পাশে থাকলে হয়তো বৃষ্টিটা আরও সুন্দর হতো।
ডালিয়া বললেন—
—হয়তো।
তারপর দুজনেই চুপ করে রইল।
ফোনের দুই প্রান্তে দুটি আলাদা ঘর। মাঝখানে কয়েক মাইল কিংবা কয়েক শ মাইল দূরত্ব। অথচ সেই নীরবতার মধ্যে মনে হচ্ছিল, তারা একই বারান্দায় বসে আছে।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
এক কাপ চা থেকে ধোঁয়া উঠছে।
ডালিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন, আর ডালিম তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার কল্পনা করছে।
কোনো স্পর্শ নেই।
কোনো পাশাপাশি বসা নেই।
তবু অনুভূতির পৃথিবীতে তারা একে অপরের খুব কাছে।
সেদিন রাতে ডালিম একটি কবিতা লিখল।
নাম দিল—‘দূরত্বের ওপারে তুমি’।
তুমি নেই, তবু তোমার জন্য জানালাটা খোলা রাখি, বৃষ্টি এলে তোমার কথা ভেজা বাতাসে খুঁজে থাকি।
তুমি নেই, তবু সন্ধ্যা হলে ফোনের পর্দায় চোখটি রাখি, একটি ছোট্ট মেসেজ এলে অকারণেই হাসতে থাকি।
কী নাম দেব এই অনুভবে, বন্ধুত্ব না ভালোবাসা? তোমার কথায় দিন কাটে যে, তোমার নীরবতায় সর্বনাশা!
কবিতাটি ডালিয়াকে পাঠিয়ে সে লিখল—
—কেমন হয়েছে?
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—কবিতা ভালো হয়েছে। তবে শেষের লাইনটা বদলান।
—কেন?
—ভালোবাসা কখনো সর্বনাশ নয়, ডালিম। ভালোবাসার নামে অবহেলা, অনিশ্চয়তা কিংবা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি মানুষকে কষ্ট দেয়। ভালোবাসা নিজে তো আশ্রয় হওয়ার কথা।
ডালিম দীর্ঘক্ষণ কথাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
—আপনি ঠিক বলেছেন। শেষের লাইনটা হবে—
তোমার নীরবতায়ও যেন তোমার ফেরার আশ্বাস পাই।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—এবার হয়েছে।
তারপর লিখলেন—
—একটা কথা বলব?
—বলুন।
—আপনি যদি কখনো সত্যিই আমার পাশে থাকেন, আমি চাইব আপনি শুধু আমার ভালো লাগার মানুষ হয়ে থাকবেন না। আমার ভালো থাকার মানুষও হবেন।
ডালিমের চোখে তখন বৃষ্টির জল নয়, অন্য এক কোমলতা জমে উঠেছিল।
সে লিখল—
—আর আমি চাইব, আপনার পাশে থাকলে যেন আমাকে কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে না হয়। আমি যেমন, তেমনভাবেই থাকতে পারি।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—তাহলে আমাদের দুজনের চাওয়াটা একই।
সেদিন তারা বুঝেছিল, ভালোবাসা মানে কেবল রোমাঞ্চ নয়। ভালোবাসা মানে এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে দুজন মানুষ নিজেদের দুর্বলতা লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয় না।
যেখানে কেউ কারও কাছে নিখুঁত হওয়ার অভিনয় করে না।
যেখানে ভালোবাসা মানে একে অপরকে বদলে দেওয়া নয়, বরং পরস্পরের সত্যিকারের মানুষটিকে চিনে নেওয়া।
৯.
ডালিমের কাছে ডালিয়া ছিলেন এক মায়াবী নারী—যাঁর কথায় কবিতা ছিল, অভিমানে কোমলতা ছিল, আর ভালোবাসায় এক ধরনের পরিণত সংযম।
কিন্তু ডালিয়ারও তো একটি নিজস্ব জীবন ছিল।
সেখানে ছিল বহু বছরের অভিজ্ঞতা, কিছু পুরোনো স্মৃতি, কিছু অপূর্ণতা, কিছু না-বলা দীর্ঘশ্বাস। বয়সে বড় হওয়ার কারণে তিনি জীবনের অনেক কিছু দেখেছেন। জানতেন, আবেগের উচ্ছ্বাস আর সম্পর্কের স্থায়িত্ব এক জিনিস নয়।
তাই ডালিমের প্রতি আকর্ষণ যতই বাড়ছিল, ততই তিনি নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন—
এই অনুভূতি কি সত্যিই স্থায়ী হতে পারে?
ডালিম কি তাঁর জীবনের বাস্তবতাকে বুঝবে?
নাকি একসময় এই রোমাঞ্চের মায়া কেটে গেলে সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে?
এক রাতে ডালিয়া ডালিমকে লিখলেন—
—আপনার একটা বিষয় আমার ভালো লাগে।
—কোনটা?
—আপনি আমার বয়স নিয়ে কখনো অস্বস্তি প্রকাশ করেননি।
ডালিম লিখল—
—অস্বস্তি প্রকাশ করার মতো কিছু দেখিনি তো।
—সবাই আপনার মতো ভাবে না।
—সবাইকে তো আর ভালোবাসতে চাই না।
মেসেজটি পাঠিয়ে ডালিম নিজেই থমকে গেল।
সে কি কথাটা বলে ফেলল?
ওপাশে ডালিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর লিখলেন—
—আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন, ডালিম?
ডালিমের আঙুল স্থির হয়ে গেল।
এত দিন তারা ভালো লাগার কথা বলেছে, অপেক্ষার কথা বলেছে, অনুভূতির কথা বলেছে। কিন্তু ভালোবাসার মতো একটি সরল অথচ গভীর শব্দকে এড়িয়ে গেছে দুজনেই।
আজ ডালিয়া সরাসরি প্রশ্নটি করেছেন।
ডালিম জানালার বাইরে তাকাল।
রাতের আকাশে চাঁদ নেই। দূরের একটি বাড়ির আলো জ্বলছে। নিজের হৃদয়ের কাছে সে আর কোনো অজুহাত খুঁজে পেল না।
সে লিখল—
—আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলছি, ডালিয়া। ঠিক কখন থেকে, তা জানি না। হয়তো আপনার কবিতার ভেতর দিয়ে, হয়তো আপনার কথার ভেতর দিয়ে, হয়তো সেই দিন থেকে, যেদিন আপনার একটা মেসেজের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বুঝেছিলাম, অপেক্ষাটাই আমার ভালো লাগছে।
তারপর লিখল—
—তবে আমি চাই না, শুধু আবেগের বশে এমন কোনো কথা বলি, যার দায়িত্ব ভবিষ্যতে নিতে পারব না। আমি চাই, আপনি আমার অনুভূতিটাকে জানুন। আর আমিও আপনাকে আরও ভালো করে জানি।
ডালিয়া মেসেজটি পড়তে পড়তে চোখ বন্ধ করলেন।
কী আশ্চর্য!
একটি স্বীকারোক্তি কখনো কখনো কতখানি স্বস্তি দিতে পারে!
তিনি লিখলেন—
—আমিও আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি, ডালিম। হয়তো প্রথমে আপনার লেখার প্রতি মুগ্ধতা ছিল, তারপর কথার প্রতি ভালো লাগা। একসময় দেখলাম, আপনার সঙ্গে কথা না হলে দিনটা কেমন অসম্পূর্ণ লাগে। আপনার ভালো থাকা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিছুক্ষণ পর আরও লিখলেন—
—আমি জানি না, ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে। তবে আজকের অনুভূতিটা সত্যি। আমি সেটাকে অস্বীকার করতে চাই না।
ডালিমের মনে হলো, বুকের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের কোনো অস্থিরতা হঠাৎ থেমে গেছে।
সে লিখল—
—তাহলে আজ থেকে আমরা অন্তত নিজেদের কাছে মিথ্যে বলব না।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—হ্যাঁ। তবে একটা কথা মনে রাখবেন।
—কী?
—আমাকে শুধু আপনার ভালো লাগার মুহূর্তগুলোতে মনে রাখবেন না। আমার মন খারাপের দিনগুলোতেও পাশে থাকার চেষ্টা করবেন। আমি সব সময় সুন্দর কবিতা লিখতে পারব না, সব সময় হাসতে পারব না। কোনো দিন হয়তো অকারণেই মন খারাপ হবে, কোনো দিন হয়তো চুপ করে থাকব। তখনও আমাকে বুঝতে চেষ্টা করবেন।
ডালিম লিখল—
—আর আপনি?
—আমি আপনার নীরবতাকে বোঝার চেষ্টা করব। তবে প্রয়োজন হলে প্রশ্নও করব। কারণ, ভালোবাসার নামে কাউকে অনুমান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যেতে চাই না।
ডালিম উত্তর দিল—
—ঠিক আছে। আমাদের ভালোবাসায় কবিতা থাকবে, রোমাঞ্চ থাকবে, অভিমানও থাকবে। তবে তার সঙ্গে সত্যি কথা বলার সাহসটাও থাকবে।
ডালিয়া লিখলেন—
—এটাই চাই।
সেই রাতে তাদের সম্পর্ক একটি নতুন নাম পেল।
কিন্তু নাম পাওয়ার পরও তার সৌন্দর্য কমে গেল না।
বরং তারা বুঝতে পারল, ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হয়তো কাউকে পাওয়া নয়—কাউকে সত্যিকার অর্থে নিজের অনুভূতির কথা বলতে পারা।
১০.
কয়েক দিন পর ডালিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করলেন—
—আচ্ছা, আমরা যদি কোনো দিন সামনাসামনি দেখা করি, কেমন হবে?
ডালিম লিখল—
—কেন? আপনার কি মনে হয়, আমি বাস্তবে এতটা কথা বলতে পারব না?
—তা নয়। তবে অনলাইনে আপনি অনেক সাহসী। সামনাসামনি দেখা হলে যদি একেবারে চুপ হয়ে যান?
ডালিম উত্তর দিল—
—তাহলে আপনি কথা বলবেন।
—আর আমি যদি লজ্জা পাই?
—তাহলে আমরা দুজনেই চুপ করে থাকব।
ডালিয়া হেসে লিখলেন—
—এভাবে তো দেখা করাই হবে না!
—হবে। তবে জায়গাটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।
—কোথায় দেখা করতে চান?
ডালিম কিছুক্ষণ ভেবে লিখল—
—এমন কোনো জায়গায়, যেখানে খুব বেশি শব্দ নেই। পাশে বইয়ের দোকান থাকতে পারে, একটু সবুজ থাকতে পারে, আর কাছাকাছি চায়ের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয়।
ডালিয়া লিখলেন—
—আপনি তো দেখছি একটা উপন্যাসের দৃশ্য সাজিয়ে ফেলেছেন!
—আপনি যে আমার জীবনের গল্পে এসে পড়েছেন, দৃশ্যটা একটু সুন্দর তো হতেই হবে।
ডালিয়া মেসেজটি পড়ে মৃদু হেসে ফেললেন।
তারপর লিখলেন—
—ঠিক আছে। কোনো এক বিকেলে দেখা হবে। তবে একটা শর্ত আছে।
—কী শর্ত?
—সেদিন কোনো সাহিত্যিক আলোচনা নয়।
—তাহলে কী নিয়ে কথা বলব?
—আমাদের নিয়ে।
ডালিমের বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত আলোড়ন।
সে লিখল—
—আমাদের গল্পটা তো এখনো শুরুই হলো না।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—গল্প শুরু হয়ে গেছে, ডালিম। আপনি শুধু প্রথম অধ্যায়ের নাম দিতে পারেননি।
ডালিম লিখল—
—তাহলে নাম দিন আপনি।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
—‘শিউলি-ঝরা প্রেম’।
ডালিম অবাক হলো।
—এই নাম কেন?
ডালিয়া লিখলেন—
—কারণ, আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল শরতের এক কবিতা থেকে। আর এখন আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার প্রতিটি সকাল শিউলির গন্ধে ভরে ওঠে।
ডালিমের মনে হলো, এর চেয়ে সুন্দর নাম আর হতে পারে না।
সে লিখল—
—তাহলে গল্পটা আমরা দুজন মিলে লিখব। আপনি অনুভূতি লিখবেন, আমি শব্দ সাজাব।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—না, ডালিম। অনুভূতি দুজনের, শব্দও দুজনের। এই গল্পে কেউ লেখক নয়, কেউ পাঠক নয়। আমরা দুজনেই গল্পের চরিত্র।
ডালিম ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে হাসল।
তার মনে হলো, কিছু মানুষ জীবনে আসে কোনো ঘোষণা দিয়ে নয়। তারা আসে একটি কবিতা হয়ে, একটি প্রশ্ন হয়ে, একটি ছোট্ট মেসেজ হয়ে।
তারপর একসময় দেখা যায়, তাদের ছাড়া নিজের জীবনের বাক্যগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
ডালিয়া তাঁর জীবনে ঠিক তেমন করেই এসেছেন।
কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না।
কোনো প্রতিশ্রুতির আয়োজন ছিল না।
ছিল শুধু সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে বলতে একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের মুগ্ধ হয়ে ওঠা।
আর সেই মুগ্ধতা কখন যে ভালোবাসার নাম নিয়েছে, তা কেউ বুঝতেই পারেনি।
১১.
সেই রাতেই ডালিম একটি চিঠি লিখতে বসল।
চিঠিটি ডালিয়াকে পাঠানোর জন্য নয়। অন্তত তখনই নয়।
সে নিজের ডায়েরির পাতায় লিখল—
প্রিয় ডালিয়া,
তোমাকে কী নামে ডাকব, তা আজও ঠিক করে উঠতে পারিনি। কখনো তুমি আমার কবিতার পাঠক, কখনো আমার সবচেয়ে প্রিয় কথোপকথনের মানুষ, কখনো একরাশ অভিমান নিয়ে বসে থাকা একটি বিকেল। আবার কখনো মনে হয়, তুমি আমার জীবনের সেই জানালা, যেটা খুলে দিলে বাইরে থেকে আলো আসে।
জানো, আমি আগে ভাবতাম, ভালোবাসা মানে কাউকে খুব বেশি করে মনে পড়া। এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে কাউকে মনে পড়লে তার ভালো থাকাটাও কামনা করা। তার অভিমানকে ছোট করে না দেখা। তার নীরবতার পেছনে লুকিয়ে থাকা কষ্টটুকু বোঝার চেষ্টা করা।
তোমার বয়স আমার চেয়ে বেশি—এই কথাটা প্রথম যেদিন শুনেছিলাম, সেদিনের কথা মনে আছে। কিন্তু আজ যখন তোমার কথা ভাবি, তখন কোনো সংখ্যার কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে তোমার লেখা কবিতার কথা, তোমার মিষ্টি অভিমানের কথা, তোমার সেই প্রশ্নটির কথা—‘আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?’
আমি জানি না, ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী লিখে রেখেছে। জীবন তো কোনো উপন্যাস নয়, যেখানে লেখক ইচ্ছে করলেই সব চরিত্রকে সুখী করে দিতে পারেন। এখানে বাস্তবতা আছে, দায়িত্ব আছে, এমন কিছু প্রশ্ন আছে, যাদের উত্তর শুধু আবেগ দিয়ে দেওয়া যায় না।
তবু আমি চাই, আমাদের অনুভূতিটা সত্যি থাকুক। আমরা যদি পাশাপাশি হাঁটতে পারি, তবে হাত ধরে হাঁটব। আর যদি কোনো দিন দূরত্ব আমাদের পথ আলাদা করে দেয়, তবুও যেন বলতে পারি—আমরা অন্তত একে অপরের অনুভূতিকে অসম্মান করিনি।
তোমাকে আমি শুধু সুন্দর কোনো বিকেলের জন্য চাই না। চাই, তোমার ক্লান্ত দিনগুলোর কথাও শুনতে। তোমার লেখা ভালো কবিতার প্রশংসা করতে চাই, আবার কবিতা ভালো না হলে সত্যিটাও বলতে চাই। তোমার সঙ্গে হাসতে চাই, তর্ক করতে চাই, অভিমান ভাঙাতে চাই।
সবচেয়ে বেশি চাই, তোমার সামনে নিজের মতো করে থাকতে। কোনো অভিনয় ছাড়া, কোনো অহংকার ছাড়া।
তুমি আমার জীবনে এসে আমাকে নতুন করে বুঝিয়েছ, মানুষের বয়স বাড়ে, অভিজ্ঞতা বাড়ে, দায়িত্ব বাড়ে; কিন্তু হৃদয়ের কোমল জায়গাটুকু বেঁচে থাকলে মানুষ আবার নতুন করে ভালোবাসতে পারে।
আর একটা কথা—তুমি যখন বলেছিলে, ‘আপনার নীরবতায় সময় দীর্ঘ মনে হয়’, তখন আমি বুঝতে পারিনি কথাটার গভীরতা। এখন বুঝি, যার অপেক্ষায় কেউ থাকে, তার কাছে নীরবতাও একটি দায়িত্ব।
আমি হয়তো সব সময় নিখুঁত হতে পারব না। কিন্তু চেষ্টা করব, তোমার কাছে এমন একজন মানুষ হয়ে উঠতে, যার কাছে নিজের মনের কথা বলতে তোমাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না।
ভালো থেকো, ডালিয়া। আর যদি কখনো খুব অভিমান হয়, তবে আমাকে জানিও। তোমার অভিমানকে কবিতা ভেবে শুধু পড়ে যেতে চাই না; তার কারণটাও বুঝতে চাই।
ইতি, তোমার গল্পের একজন মানুষ, ডালিম।
চিঠিটি লেখা শেষ করে ডালিম অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর ডায়েরি বন্ধ করে দিল।
চিঠিটি পাঠাল না।
কিছু কথা হয়তো আগে নিজের কাছে সত্যি হয়ে উঠতে হয়, তারপর অন্য কাউকে বলা যায়।
সে শুধু মেসেঞ্জারে গিয়ে লিখল—
—ঘুমিয়েছেন?
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—না। আপনার কথা ভাবছিলাম।
ডালিমের ঠোঁটে হাসি ফুটল।
—কী ভাবছিলেন?
—ভাবছিলাম, আমাদের গল্পটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
ডালিম লিখল—
—এত তাড়াতাড়ি শেষের কথা ভাবছেন কেন? আমরা তো এখনো কত কথা বলব, কত কবিতা লিখব, কত অভিমান ভাঙাব!
ডালিয়া লিখলেন—
—সব গল্পের শেষ সুখের হয় না, ডালিম।
ডালিম কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল—
—সেটা ঠিক। তবে শেষের ভয় পেয়ে গল্পের সুন্দর অংশটুকু না পড়াও তো ঠিক নয়।
ডালিয়া লিখলেন—
—আপনি আবার সাহিত্য শুরু করলেন!
ডালিম উত্তর দিল—
—আপনি পাশে থাকলে সাহিত্য থেকে পালাব কী করে?
ডালিয়া একটি হাসির ইমোজি পাঠালেন।
তারপর লিখলেন—
—আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো। আমাকে প্রথম কবে ভালো লেগেছিল?
ডালিম লিখল—
—আপনার কবিতা পড়ার দিন?
—সত্যি?
—না। প্রথমে আপনার কবিতা ভালো লেগেছিল। তারপর আপনার কথা। তারপর আপনার অভিমান। আর একদিন বুঝলাম, আপনার মন ভালো আছে কি না, সেটা জানার জন্যও আমার মন অস্থির হয়ে থাকে। সেদিনই হয়তো আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
—আর আমার?
—আপনার কবে?
ডালিয়া লিখলেন—
—যেদিন বুঝলাম, আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার আর কোনো কবিতার অজুহাত লাগে না।
ডালিম মেসেজটি পড়ে স্থির হয়ে রইল।
কথাটি এত সহজ, অথচ এত গভীর!
ভালোবাসা কি আসলে এমনই নয়?
যখন একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য আর কোনো অজুহাতের প্রয়োজন হয় না, যখন তার নীরবতাও নিজের ভেতরে প্রশ্ন জাগায়, যখন তার আনন্দে নিজের দিন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে—তখনই হয়তো হৃদয় নিজের অজান্তে কাউকে আপন করে নেয়।
সেদিন রাতেও তাদের কথোপকথন শেষ হলো না সহজে।
একটি বিষয় থেকে আরেকটি বিষয়, একটি স্মৃতি থেকে আরেকটি স্বপ্ন, একটি অভিমান থেকে আরেকটি মিষ্টি হাসি।
রাত গভীর হলো।
দুজনের চোখেই ঘুম নেমে এল।
কিন্তু ঘুমানোর আগে ডালিয়া একটি শেষ মেসেজ পাঠালেন—
“শুভরাত্রি, ডালিম। স্বপ্নে দেখা হলে কিন্তু কবিতা নিয়ে কথা বলা যাবে না।”
ডালিম লিখল—
“কেন?”
ডালিয়া উত্তর দিলেন—
“কারণ, স্বপ্নে আমি আপনার কবিতা হতে চাই না। আপনার পাশে বসে থাকা মানুষটি হতে চাই।”
ডালিম মেসেজটি পড়ে ফোনটা বুকে চেপে ধরল।
তারপর লিখল—
“তাহলে স্বপ্নে দেখা হলে আপনাকে পাশে বসিয়ে রাখব। আর যদি ঘুম ভেঙে যায়, তবে সকালে একটা মেসেজ দেব। যাতে বুঝতে পারেন, স্বপ্ন শেষ হলেও আপনাকে ভুলে যাইনি।”
ডালিয়া আর কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু একটি লাল হৃদয়ের চিহ্ন পাঠালেন।
সেই ছোট্ট চিহ্নটির দিকে তাকিয়ে ডালিমের মনে হলো, জীবনে কিছু কিছু প্রাপ্তি এত ছোট হয় যে, হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায় না; অথচ এত গভীর হয় যে, সমস্ত হৃদয় জুড়ে থাকে।
বাইরে তখন রাতের শেষ প্রহর।
হয়তো কোথাও কোনো শিউলি গাছের নিচে ফুল ঝরে পড়ছে নিঃশব্দে।
হয়তো ভোরের আলো আসতে এখনো অনেক দেরি।
কিন্তু ডালিম জানে, আগামীকাল সকালে তার ফোনের পর্দায় আবার একটি মেসেজ ভেসে উঠতে পারে।
হয়তো ডালিয়া লিখবেন—
“ঘুম ভেঙেছে, কবি সাহেব?”
আর ডালিম উত্তর দেবে—
“ঘুম ভেঙেছে। তবে আমার সকালটা এখনো আপনার মেসেজের অপেক্ষায়।”
এভাবেই চলতে থাকবে তাদের গল্প।
কবিতার ভেতর দিয়ে, কথার ভেতর দিয়ে, অভিমানের ভেতর দিয়ে, স্বপ্নের ভেতর দিয়ে।
কেউ জানে না, তাদের গল্পের শেষ কোথায়।
তারা নিজেরাও জানে না।
শুধু জানে, কোনো এক শরতের সন্ধ্যায় একটি কবিতা তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তারপর একটি শিউলি-ঝরা সকালে ভালো লাগা এসে দাঁড়িয়েছিল দরজায়। আর এক অভিমানী রাত তাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, কিছু অনুভূতি এত দিন নামহীন থাকলেও একসময় হৃদয়ের কাছে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে দেয়।
ডালিম আর ডালিয়ার গল্পে ভালোবাসা এসেছিল কোনো বড় ঘোষণা দিয়ে নয়; এসেছিল একটি মেসেজের অপেক্ষায়, একটি নীরবতার কষ্টে, আর একটি ছোট্ট প্রশ্নের উত্তরে।
“আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?”
সেই প্রশ্নের উত্তরেই শুরু হয়েছিল তাদের নতুন অধ্যায়।
আর ডালিমের মনে হয়েছিল, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটি হয়তো সে এত দিন কাগজে লিখে এসেছে। অথচ সেই কবিতার সবচেয়ে মায়াবী পঙ্ক্তিটি লেখা ছিল একজন মানুষের হৃদয়ে।
সেই মানুষটির নাম—ডালিয়া।
আর তাদের ভালোবাসার নাম—
শিউলি-ঝরা প্রেম।
শিউলি-ঝরা প্রেম -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

