Friday, October 16, 2026

শেষ বিকেলের অপেক্ষা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

রেললাইনের ওপারে সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। বিকেলের শেষ আলো এসে পড়েছে দুজন মানুষের মুখে। পাশাপাশি বসে আছে তারা। লোকচক্ষুর কাছে খুব সাধারণ একটি দৃশ্য—একজন পুরুষ, একজন নারী, আর তাদের সামনে ছুটে যাওয়া রেললাইন। অথচ তাদের দুজনের মাঝখানে যে গল্পটা জমে আছে, তা কোনো উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।

পুরুষটির নাম অর্ণব। আর মেয়েটির নাম মায়া।

অর্ণবের চোখ দূরের দিকে স্থির। মনে হয়, সে যেন অনেক দূরে কিছু একটা খুঁজছে। হয়তো হারিয়ে যাওয়া কোনো সময়, হয়তো এমন কোনো জীবন—যেখানে কিছু সিদ্ধান্ত অন্যভাবে নেওয়া যেত।

পাশে বসে থাকা মায়া থুতনিতে হাত রেখে তাকিয়ে আছে দিগন্তের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। সেই হাসিতে আনন্দ আছে, অভিমান আছে, আবার এমন এক বিষণ্নতাও আছে, যার অর্থ শুধু অর্ণবই জানে।

অর্ণব হঠাৎ বলল,

— আচ্ছা মায়া, মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে কেন বলো তো?

মায়া মুখ না ফিরিয়েই উত্তর দিল,

— ভালো রাখার জন্য।

— সবাই কি ভালো রাখতে পারে?

এবার মায়া তার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

— না। কেউ কেউ ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসে, তারপর সারাজীবনের জন্য একটা শূন্যতা রেখে চলে যায়।

কথাটা শুনে অর্ণব আর কিছু বলল না।

কারণ, এই শূন্যতার জন্মদাতা সে নিজেই।


তাদের পরিচয় হয়েছিল আট বছর আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সেমিনারে। মায়া তখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী। অর্ণব সদ্য শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছে। প্রথম পরিচয়েই মায়ার মনে হয়েছিল, মানুষটা বড্ড গম্ভীর। প্রয়োজনের বাইরে কথা বলে না, হাসে কম, আর চোখে কেমন একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা।

অর্ণবের কাছে মায়া ছিল ঠিক তার উল্টো। প্রাণবন্ত, চঞ্চল, আর কথার মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন লুকিয়ে রাখার এক আশ্চর্য ক্ষমতা তার।

পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে নির্ভরতা। আর নির্ভরতা কখন যে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছিল, তা কেউই ঠিক বুঝতে পারেনি।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি নামল। দুজন দাঁড়িয়ে ছিল একটি চায়ের দোকানের সামনে। মায়ার কাছে ছাতা ছিল না। অর্ণব নিজের ছাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল,

— তুমি যাও। আমি বৃষ্টি থামলে যাব।

মায়া ছাতাটা নেয়নি।

— আপনি কী সব সময় এমন করেন?

— কেমন?

— নিজের ভেজার ভয় নেই, অন্যকে বাঁচাতে ব্যস্ত!

অর্ণব হেসে বলেছিল,

— সবাইকে তো আর বাঁচানো যায় না, মায়া।

মায়া সেদিন কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি। শুধু মনে হয়েছিল, মানুষটার হাসির আড়ালে এমন কিছু কষ্ট আছে, যা সে কাউকে বলতে পারে না।

সেই দিনই মায়া মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—অর্ণবের না-বলা কথাগুলোও একদিন সে বুঝতে শিখবে।

কিন্তু মানুষ কখনো কখনো অন্যের হৃদয় বুঝতে গিয়ে নিজের হৃদয়টাই হারিয়ে ফেলে।


দিন যেতে লাগল। তাদের কথার পরিমাণ বাড়ল, দূরত্ব কমল। মায়া এখন অর্ণবের নীরবতা বুঝতে পারে। অর্ণব বুঝতে পারে মায়ার হাসির আড়ালে জমে থাকা অভিমান।

রাতে ঘুমানোর আগে মায়া অর্ণবকে একটা বার্তা দিত—

“আজ তোমার কথা খুব মনে পড়ছে।”

অর্ণব উত্তর দিত,

“আমিও তোমাকে মনে করছি।”

মায়া তখন লিখত,

“মনে করা আর মনে জায়গা দেওয়া এক কথা নয়, অর্ণব।”

অর্ণব আর কোনো উত্তর দিতে পারত না।

কারণ, সে জানত মায়া কী চাইছে। মায়া কোনো দামি উপহার চায়নি, কোনো আকাশছোঁয়া প্রতিশ্রুতিও নয়। সে শুধু চেয়েছিল অর্ণব একদিন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলুক, ‘তুমি আমার জীবনের মানুষ।’

কিন্তু অর্ণবের জীবনে তখন দায়িত্বের পাহাড়। পরিবার, সামাজিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াই—সবকিছুর ভিড়ে ভালোবাসার জন্য আলাদা করে জায়গা করে নেওয়ার সাহস তার ছিল না।

অথচ মায়া জানত না, সাহসের অভাবও একধরনের সিদ্ধান্ত।

এক রাতে মায়া জিজ্ঞেস করেছিল,

— অর্ণব, আমি যদি একদিন তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যাই, তুমি কি আমাকে খুঁজবে?

অর্ণব বলেছিল,

— হারিয়ে যাবে কেন?

— মানুষ তো সব সময় নিজের ইচ্ছায় হারিয়ে যায় না। কখনো কখনো পরিস্থিতি তাকে হারিয়ে যেতে বাধ্য করে।

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল,

— তোমাকে হারাতে চাই না।

মায়া মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিল,

— তাহলে আমাকে ধরে রাখার মতো একটা কারণ দাও।

অর্ণব সেদিনও চুপ করে ছিল।

আর সেই নীরবতার ভেতরেই তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরাজয়টা ঘটে গিয়েছিল।


আজ আট বছর পর তারা আবার পাশাপাশি বসেছে এই পুরোনো রেলস্টেশনে।

মায়ার বিয়ে হয়েছে তিন বছর আগে। তার স্বামী ভালো মানুষ, সংসারও সুন্দর। অর্ণবও নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত। বাইরে থেকে দেখলে দুজনের কারও জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই।

শুধু কিছু গল্প থাকে, যাদের শেষ দৃশ্য লেখা হয়ে গেলেও শেষ বাক্যটা কখনো লেখা হয় না।

মায়া হঠাৎ বলল,

— তোমার মনে আছে, একদিন বলেছিলাম, আমি হারিয়ে গেলে খুঁজবে কি না?

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

— মনে আছে।

— খুঁজেছিলে?

অর্ণব এবার মায়ার দিকে তাকাল।

— প্রতিদিন।

— কোথায়?

— মানুষের ভিড়ে, পুরোনো বইয়ের পাতায়, বৃষ্টির শব্দে, সন্ধ্যার আকাশে। কখনো কোনো মেয়ের হাসিতে তোমার ছায়া দেখেছি। কখনো অচেনা কারও চোখে তোমার অভিমান খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও তোমাকে পাইনি।

মায়ার চোখ দুটো ভিজে উঠল। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন অর্ণব তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলতে না পারে।

কিছুক্ষণ পর বলল,

— অথচ আমি তো খুব সহজেই তোমার কাছে থাকতে পারতাম।

— জানি।

— শুধু একবার বলতে হতো, ‘মায়া, থেকো।’

অর্ণবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

— আমি ভয় পেয়েছিলাম।

— কিসের ভয়?

— তোমাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে যদি ব্যর্থ হই!

মায়া এবার তার দিকে ফিরল। তার চোখে কান্না, কিন্তু কণ্ঠে অদ্ভুত শান্তি।

— অর্ণব, তুমি জানো, আমি তোমার কাছে কখনো সফল জীবনের নিশ্চয়তা চাইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে তুমি আমার হাতটা ধরে হাঁটো। আমরা একসঙ্গে ব্যর্থ হলেও অন্তত বলতে পারতাম, চেষ্টা তো করেছিলাম।

অর্ণব মাথা নিচু করল।

মায়া আবার বলল,

— তুমি আমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলে বলে কখনো নিজের করে পাওয়ার সাহস করোনি। অথচ শেষ পর্যন্ত আমাকে হারিয়েছ ঠিকই।

কথাগুলো অর্ণবের বুকের ভেতর কোথাও একটা ভাঙচুর করে দিল।

কিন্তু কিছু সত্য এত দেরিতে সামনে আসে যে, সেগুলো মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।


দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

মায়া উঠে দাঁড়াল। তার ট্রেন আসার সময় হয়েছে।

অর্ণবও উঠে দাঁড়াল। কত কথা যে তার বলার ছিল! বলতে চেয়েছিল, আজও সে মায়াকে ভালোবাসে। বলতে চেয়েছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা সে করেছে। বলতে চেয়েছিল, কিছু মানুষের অনুপস্থিতি নিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।

কিন্তু সে কিছুই বলল না।

মায়া কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

— অর্ণব?

— বলো।

— তুমি কি এখনো আমাকে ভালোবাসো?

প্রশ্নটা শুনে অর্ণবের মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ যেন এক মুহূর্তে থেমে গেছে।

সে ধীরে বলল,

— ভালোবাসি।

মায়া চোখ বন্ধ করল। ঠোঁটের কোণে একটা বিষণ্ন হাসি ফুটে উঠল।

— জানো, এই কথাটা শোনার জন্য একসময় আমি কত রাত জেগেছি! কতবার ফোনের পর্দায় তোমার নাম দেখে অপেক্ষা করেছি! কতবার ভেবেছি, আজ হয়তো তুমি বলবে!

অর্ণবের চোখেও জল জমল।

মায়া বলল,

— আজ কথাটা শুনে ভালো লাগছে। কিন্তু জানো, কিছু কথা সময়মতো না বললে পরে শুধু কষ্ট বাড়ায়। ভালোবাসা সব সময় মানুষকে একসঙ্গে রাখে না, অর্ণব। কখনো কখনো ভালোবাসা মানুষকে ছেড়ে দিতেও শেখায়।

ট্রেন এসে থামল।

মায়া উঠে গেল ট্রেনে। জানালার পাশে বসে আবার তাকাল অর্ণবের দিকে।

অর্ণব দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, এইমাত্র শুধু একজন মানুষ ট্রেনে উঠল না—তার জীবনের একটি সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

মায়া জানালার পাশে হাত রাখল। অর্ণবও হাত তুলল। দুজনের মাঝখানে কাচের জানালা, দূরত্বের রেললাইন, আর আট বছরের জমে থাকা না-বলা কথারা দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনটা দিগন্তে মিলিয়ে গেল।

অর্ণব একা হয়ে গেল।

ঠিক যেমন আট বছর আগে হয়েছিল। শুধু তখন তার পাশে মায়া ছিল না, আর আজ মায়া চলে যাওয়ার পর তার কাছে নিজের ভুলগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
 

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রেলস্টেশনের বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে।

অর্ণব ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। তার মনে পড়ল মায়ার সেই পুরোনো কথাটা—

“মানুষ সব সময় নিজের ইচ্ছায় হারিয়ে যায় না। কখনো কখনো পরিস্থিতি তাকে হারিয়ে যেতে বাধ্য করে।”

আজ অর্ণব বুঝতে পারল, পরিস্থিতি সব সময় মানুষকে আলাদা করে না। কখনো কখনো মানুষ নিজের ভয়, দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতা দিয়ে পরিস্থিতিকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়।

সে পকেট থেকে ফোন বের করল। মায়ার নামটা এখনো সেখানে আছে। অনেক দিন ধরে কোনো বার্তা পাঠানো হয়নি।

অর্ণব লিখল—

“মায়া, তোমাকে আমি হারাইনি সেদিন, যেদিন তুমি অন্য কারও জীবনের অংশ হয়েছিলে। তোমাকে হারিয়েছিলাম তারও অনেক আগে—যেদিন তুমি আমার কাছে একটু সাহস চেয়েছিলে, আর আমি তোমাকে শুধু নীরবতা দিয়েছিলাম। আজ বুঝি, ভালোবাসা শুধু অনুভব করার নাম নয়; কখনো কখনো ভালোবাসার দায়িত্ব নেওয়ার নামও ভালোবাসা।”

অনেকক্ষণ বার্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে।

তারপর পাঠাল না। মুছে দিল।

কারণ, এখন আর মায়ার জীবনে নতুন কোনো অভিমান যোগ করার অধিকার তার নেই।

আকাশে তখন শেষ আলোটুকুও নিভে গেছে।

অর্ণব বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, জীবনে কিছু মানুষ আসে আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য, আর কিছু মানুষ আসে আমাদের এমন কিছু শেখানোর জন্য, যা আমরা সারাজীবনেও ভুলতে পারি না।

মায়া তার জীবনে এসেছিল ভালোবাসতে শেখাতে।

আর চলে গিয়ে শিখিয়ে দিয়ে গেছে—সবচেয়ে গভীর ভালোবাসাও কখনো কখনো অপূর্ণ থেকে যায়, যদি তার পাশে দাঁড়ানোর মতো সাহস না থাকে।

সেদিন রাতে অর্ণব ডায়েরির শেষ পাতায় লিখেছিল—

“সব ভালোবাসার পরিণতি একসঙ্গে থাকা নয়। কিছু ভালোবাসা দূরে থেকেও বেঁচে থাকে—পুরোনো রেলস্টেশনের গোধূলিতে, বৃষ্টিভেজা জানালায়, কিংবা কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতে হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া একটি নামের ভেতর।

আর কিছু মানুষকে হারানোর পর বোঝা যায়, তারা আমাদের জীবনে কতটা মূল্যবান ছিল। কিন্তু তখন আর ফিরে গিয়ে বলা যায় না—‘থেকো, তোমাকে ছাড়া আমার গল্পটা অসম্পূর্ণ।’”

ডায়েরি বন্ধ করে অর্ণব জানালার বাইরে তাকাল।

বাইরে তখন নিস্তব্ধ রাত।

শুধু দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছিল।

অর্ণবের মনে হলো, ট্রেনটা যেন আবার সেই পুরোনো স্টেশন থেকে চলে যাচ্ছে। জানালার পাশে বসে আছে মায়া। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হাসি।

আর অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে প্ল্যাটফর্মে—একটি কথা বলার জন্য, যে কথাটি বলার সময় সে বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছে।

“ইশ, যদি সেদিন তোমাকে একটু সাহস করে বলতাম—মায়া, তোমাকে ভালোবাসি। থেকো আমার জীবনে!”

কিন্তু জীবনের ট্রেন একবার ছেড়ে গেলে সব স্টেশনে আর ফিরে আসে না।

কিছু অপেক্ষা তাই সারাজীবন অপেক্ষাই থেকে যায়।
 


South of the Border, West of the Sun বই পর্যালোচনা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

হারুকি মুরাকামির South of the Border, West of the Sun এমন এক উপন্যাস, যেখানে প্রেমের আখ্যানের অন্তরালে উন্মোচিত হয়েছে মানুষের অন্তর্গত শূন্যতা, হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতি আকর্ষণ, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মপরিচয়ের সংকট। মুরাকামির অন্যান্য অনেক রচনার তুলনায় এই উপন্যাসটি অপেক্ষাকৃত বাস্তবধর্মী, সংযত ও আবেগনির্ভর। এখানে অতিপ্রাকৃতের চেয়ে মানুষের মনোজগতই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় রহস্য।


🌿 কাহিনির সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাজিমে। শৈশবে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল শিমামোতো—এক শান্ত, সংবেদনশীল ও রহস্যময় মেয়ে। দুজনই ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। এই অভিন্ন অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে তৈরি করেছিল এক গভীর মানসিক বন্ধন।


কিন্তু সময়ের প্রবাহে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জীবন এগিয়ে চলে নিজস্ব গতিতে। একসময় হাজিমে বিবাহিত হয়, সন্তান-সংসার গড়ে তোলে এবং নিজের ব্যবসায়িক জীবনেও প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আপাতদৃষ্টিতে তার জীবন পরিপূর্ণ।


কিন্তু বহু বছর পর হঠাৎ শিমামোতো আবার তার জীবনে ফিরে আসে। তার এই রহস্যময় প্রত্যাবর্তন হাজিমের সাজানো বর্তমানকে নাড়িয়ে দেয়। অতীতের প্রেম, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা এবং বর্তমানের দায়িত্ব—সবকিছু মিলেমিশে তার ভেতরে তৈরি করে এক গভীর অস্তিত্বগত দ্বন্দ্ব।


✨ উপন্যাসের প্রধান শক্তি


১. অপূর্ণতার দর্শন:

মুরাকামি দেখিয়েছেন, মানুষ অনেক সময় যা অর্জন করেছে তার চেয়ে যা হারিয়েছে বা পায়নি, তার প্রতিই বেশি আকৃষ্ট থাকে। হাজিমের কাছে শিমামোতো কেবল একজন নারী নয়; সে তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব, যৌবন, স্বপ্ন এবং অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।


এখানেই উপন্যাসটি প্রেমের সাধারণ গল্পকে অতিক্রম করে মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করেছে।


২. স্মৃতি বনাম বাস্তবতা:

উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই কোনো মানুষকে ভালোবাসি, নাকি ভালোবাসি তার স্মৃতিতে তৈরি একটি কল্পিত রূপকে?


হাজিমের শিমামোতোর প্রতি আকর্ষণের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। বাস্তব শিমামোতো এবং তার স্মৃতিতে নির্মিত শিমামোতো—এই দুইয়ের মধ্যে সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।


৩. অতীতের প্রতি মানুষের আকর্ষণ:

অতীত কখনো কেবল অতীত হয়ে থাকে না। কিছু স্মৃতি সময় পেরিয়ে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যে সম্পর্কের কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিণতি হয়নি, তার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কখনো কখনো বর্তমানের বাস্তব সম্পর্কের চেয়েও প্রবল হয়ে উঠতে পারে।


মুরাকামি এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেছেন।


৪. মুরাকামির ভাষাশৈলী:

মুরাকামির ভাষা সরল, সংযত এবং মেদহীন; অথচ তার ভেতরে রয়েছে গভীর বিষণ্নতা ও আবেগ। সংগীত, নীরবতা, রাত, বৃষ্টি, স্মৃতি ও একাকিত্বের আবহ উপন্যাসটিকে দিয়েছে এক ধরনের মায়াময় সৌন্দর্য।


এখানে বড় কোনো নাটকীয়তার প্রয়োজন হয়নি; ছোট ছোট অনুভূতি, নীরব মুহূর্ত এবং চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বই কাহিনির আবেগকে বহন করেছে।


🤔 যে প্রশ্নগুলো পাঠককে ভাবাবে:

উপন্যাসটি পড়তে পড়তে কয়েকটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—


- সাফল্য কি সত্যিই মানুষকে পরিপূর্ণ করে?

- অতীতের প্রেম কি বর্তমানের বাস্তবতার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়?

- আমরা কি মানুষকে ভালোবাসি, নাকি তাকে ঘিরে তৈরি করা স্মৃতিকে?

- অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা কি কখনো পুরোপুরি মুছে যায়?

- ব্যক্তিগত সুখের জন্য একজন মানুষ কতটা দূর যেতে পারে?

- অতীতের কাছে ফিরে যাওয়া কি সত্যিই মুক্তি, নাকি নতুন এক বন্দিত্ব?


মুরাকামি এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন না। বরং পাঠককে নিজের জীবন, সম্পর্ক ও আকাঙ্ক্ষার দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করেন।


📌 ব্যক্তিগত মূল্যায়ন:

South of the Border, West of the Sun মূলত প্রেমের উপন্যাস হলেও এর গভীরে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া সময়, স্মৃতি, অপূর্ণতা, আকাঙ্ক্ষা এবং মানবমনের নিঃসঙ্গতার গল্প।


এটি দ্রুতগতির বা ঘটনাবহুল কোনো কাহিনি নয়। বরং ধীরে ধীরে পাঠকের মনের ভেতরে প্রবেশ করা এক বিষণ্ন সুরের মতো। উপন্যাসটি শেষ করার পরও এর চরিত্র ও প্রশ্নগুলো দীর্ঘসময় মনে থেকে যায়।


আমার কাছে বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—এটি প্রেমকে কেবল দুজন মানুষের সম্পর্ক হিসেবে দেখেনি; বরং প্রেমের সঙ্গে স্মৃতি, একাকিত্ব, অপরাধবোধ, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয়ের যে জটিল সম্পর্ক, সেটিই সামনে এনেছে।


শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হয়তো শিমামোতোকে নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হাজিমেকে নিয়েই—মানুষ তার বর্তমান জীবনের ভেতরে থেকেও কতটা অতীতের মানুষ হয়ে থাকতে পারে?


যারা মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও আবেগনির্ভর সাহিত্য পছন্দ করেন, তাদের জন্য South of the Border, West of the Sun নিঃসন্দেহে একটি চিন্তাশীল ও হৃদয়স্পর্শী পাঠ। এটি এমন একটি বই, যার গল্প শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার অনুভূতি সহজে শেষ হয় না।

 

South of the Border, West of the Sun 

লেখক: হারুকি মুরাকামি

ধরণ: মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, প্রেম ও অস্তিত্ববাদী সাহিত্য

প্রকাশকাল: ১৯৯২

 


Md. Helal Uddin