Sunday, April 26, 2026

লকেটের সেই সোনালী ঝিলিক -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আকাশের বয়স তখন একুশ। টিউশনি শেষ করে ফেরার পথে বিকেলটা কেমন যেন মায়াবী হয়ে উঠত। রাস্তার মোড়ে পুরনো লাইব্রেরিটার সামনে সেদিন প্রথম ওকে দেখল সে। মেয়েটির নাম নীলা, সবে ষোড়শীতে পা দিয়েছে।

​নীলা যখন চশমাটা ঠিক করতে করতে সামনের দিকে তাকাল, আকাশের মনে হলো সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। ওর টানাটানা বড় বড় দুটো চোখ, যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা গভীর দিঘি। সেই চোখে এক অদ্ভুত সারল্য, যা একুশ বছরের যুবকের বুকে প্রথমবার এক অজানা ঢেউ তুলল। ওর মাথায় রাশীকৃত কালো চুল, বাতাসের ঝাপটায় যা বারবার কপালে এসে পড়ছে।

​সবচেয়ে নিখুঁত ছিল ওর নাকটি। ঠিক যেন বাঁশির মতো তীক্ষ্ণ আর সুডৌল। হাসলে সেই নাকের পাটা হালকা একটু ফুলে ওঠে, যা দেখে আকাশের মনে হলো এ কোনো মানবী নয়, বরং জীবন্ত কোনো কবিতা। কিন্তু আকাশের নজর আটকে গেল নীলার গলার কাছে। ওর বুকের ওপর ঝুলছে একটি ছোট্ট সোনার লকেট। বিকেলের মরা রোদ সেই লকেটে ঠিকরে পড়ে আকাশের চোখে এসে লাগছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে লকেটটি আলতো করে দুলছে, আর সেই দুলুনি যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করছে আকাশের হৃদপিণ্ডে।

​আকাশের হাতপা কাঁপছিল। একুশ বছর বয়সে সে অনেক মেয়েই দেখেছে, কিন্তু এই লকেটের ঝিলিক আর টানা চোখের চাহনি কেন জানি তাকে সম্মোহন করে ফেলল। নীলা হয়তো বুঝতে পেরেছিল কেউ তাকে দেখছে। সে একটু আড়চোখে তাকিয়ে হালকা হাসল। সেই হাসিতে যেন এক হাজারটা বসন্তের ফুল একসাথে ফুটে উঠল।

​নীলা চলে গেল তার রিকশায় চড়ে, কিন্তু একুশ বছরের সেই যুবকটি লাইব্রেরির সামনে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে তখনও বাজছে নীলার গলার চুড়ির রিনরিন শব্দ আর চোখে ভাসছে সেই বাঁশির মতো নাক আর সোনার লকেটের নাচন। ভালোবাসা কি এভাবেই আসে? কোনো ভূমিকা ছাড়াই, শুধু এক পলকের একটু সোনালী ঝিলিক দিয়ে?

​আকাশ জানত না ওর নাম কী, কিন্তু ওই দিন থেকে একুশ বছরের যুবকটি বুঝতে পারল— তার মনের ডায়েরিতে এক ষোড়শী বালিকা স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

May be an image of jewellery 

লকেটের সেই সোনালী ঝিলিক -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Sunday, April 19, 2026

বিস্মৃতির ওপারে সুখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নীলিমার ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়িটা টিকটিক শব্দ করছিল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বহু বছর পর অয়ন আর নীলিমা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। অয়ন খেয়াল করল, নীলিমার চোখে আগের সেই চঞ্চলতা নেই, সেখানে এখন এক থিতু হওয়া প্রশান্তি।

​অয়ন আলতো করে হাসল। "জানতাম, তুমি আমার চেহারাটা ভুলে যাবে।"

​নীলিমা কিছুটা থতমত খেল। অপরাধবোধের সুর নিয়ে বলল, "আসলে সময়টা এত দ্রুত চলে গেল যে..."

​"ভুলে তো যাবেই, তাতে আমি অবাক হইনি," অয়ন মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।

​নীলিমা জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কেন অবাক হওনি? তবে কি আমায় কোনোদিন ভালোবাসনি?"

​অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার কাঁচে জমে থাকা বৃষ্টির বিন্দুর দিকে তাকিয়ে সে বলল, "ভালোবাসা আর প্রয়োজন এক নয় নীলিমা। তুমি সেদিন আমার কাছে এসেছিলে স্রেফ এক সাময়িক শূন্যতা থেকে। তোমার জীবনে তখন কেউ ছিল না, একটা আশ্রয়ের খুব দরকার ছিল। আমি শুধু সেই সময়টুকুর সঙ্গী ছিলাম। আমি সেদিনই বলেছিলাম, সময় পূর্ণ হলে তুমি আমায় ভুলে যাবে।"

​নীলিমা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো গলায় আটকে গেল। অয়ন আবার বলতে শুরু করল, "আজ তোমার বুকে অপেক্ষার প্রিয় মানুষ আছে। তোমার ঘর আছে, সংসার আছে। সেই সুখের ভিড়ে আমার ঝাপসা হয়ে যাওয়া চেহারার স্মৃতি মনে না থাকাই তো স্বাভাবিক। আর সেটাই ভালো।"

​নীলিমার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। ধরা গলায় সে শুধাল, "তাহলে কি আর কোনোদিন মনে রাখব না? একদমই না?"

​অয়ন দরজার দিকে পা বাড়াল। চলে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসল। "দরকার নেই নীলিমা। কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়াই মুক্তির নামান্তর। তুমি সুখে থাকো, আমি সেটাই চেয়েছিলাম।"

​অয়ন বৃষ্টির শব্দে মিলিয়ে গেল। নীলিমা বুঝতে পারল, কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধু নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলোকিত করার জন্য। অয়ন ছিল সেই মরীচিকা, যে তাকে মরুভূমি পার করে সবুজ বনানীর খোঁজ দিয়ে নিজে হারিয়ে গেছে।