Thursday, September 24, 2026

বেহায়া কলমের প্রেম -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

বড়ই বেহায়া আমার কলম। তাকে যতই শাসন করি, যতই বলি—আজ আর তোমার কথা লিখব না, সে ততই অবাধ্য হয়ে ওঠে। অকারণেই কাগজের সাদা শরীর জুড়ে তোমার নামের ছায়া ফেলে। এক অদ্ভুত, নির্লজ্জ আকাঙ্ক্ষায় সে শুধু তোমাকেই লিখতে চায়; তোমাকেই আঁকতে চায় তার সমস্ত অক্ষর, সমস্ত রং, সমস্ত উন্মাদনা দিয়ে।

তোমার সেই কাজল-ডোবা গভীর চোখ—যেখানে একবার তাকালে ফিরে আসার পথটুকুও যেন হারিয়ে যায়; তোমার রেশমঘন কৃষ্ণ কেশ, যে কেশ বাতাসে দুলে উঠলে আমার সমস্ত সংযম কেমন অকারণে ভেঙে পড়ে; আর তোমার ঠোঁট—নরম, নীরব, নিষিদ্ধ কোনো স্বপ্নের মতো—যার কথা লিখতে গেলেই শব্দেরা কেমন লজ্জায় থমকে দাঁড়ায়। তোমাকে আঁকতে গিয়ে আমার কলম কখনো কখনো শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে ফেলে।

কী অদ্ভুত এই মুগ্ধতা! কখনো মনে হয়, শুধু কলম নয়—রঙ-পেন্সিলও বুঝি তোমার স্পর্শের আকাঙ্ক্ষায় কাঁপে। সাদা শাড়ির স্নিগ্ধ ভাঁজে তোমাকে আঁকতে গেলে তুমি হয়ে ওঠো সকালের কুয়াশায় ভেজা শিউলি; লাল দোপাট্টার দহনময় আবরণে তুমি যেন হঠাৎ ফুটে ওঠা কোনো রক্তিম গোলাপ। কখনো আবার মনে হয়, কৃষ্ণচূড়ার উন্মত্ত কোনো বিকেল বুঝি মানুষের রূপ ধরে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

তোমাকে লিখতে বসলে আমার ভেতরের সমস্ত শিষ্টতা, সমস্ত যুক্তি, সমস্ত সংযম কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অক্ষরগুলো তখন আর শুধু অক্ষর থাকে না—তারা হয়ে ওঠে স্পর্শের মতো, দীর্ঘশ্বাসের মতো, নিঃশব্দ কোনো স্বীকারোক্তির মতো। তোমাকে ঘিরেই তারা রচনা করে যায় এক দুর্বার মুগ্ধতার উপাখ্যান; এমন এক উপাখ্যান, যার কোনো শুরু নেই, শেষও নেই—আছে শুধু তোমার দিকে ক্রমশ ডুবে যাওয়ার এক অদ্ভুত আনন্দ।

তুমি আমার কাছে শুধু একজন মানুষ নও। তুমি আমার নীরবতার ভেতরে বাজতে থাকা অদৃশ্য কোনো সুর; একলা বিকেলের মায়া; বৃষ্টিভেজা জানালায় জমে থাকা কোনো নাম। তুমি শিউলির সুবাস, বকুলের ঘ্রাণ, জোছনা-ভেজা রাতের নরম আলো। তোমাকে মনে পড়লে আমার চারপাশের পৃথিবীটাও কেমন বদলে যায়—সাধারণ মুহূর্তগুলো অসাধারণ হয়ে ওঠে, আর নিঃশব্দ রাতগুলোও যেন তোমার নামে কোনো গোপন কবিতা লিখতে থাকে।

তাই আমার কলমের এই বেহায়াপনা থামে না। সে বারবার তোমার কাছেই ফিরে আসে। তোমাকে লিখতে লিখতে কখন যে তোমার প্রতি মুগ্ধতা আমার সমস্ত শব্দের ভেতর বাসা বেঁধেছে, আমি নিজেও জানি না।

শুধু জানি—আমার যত অপ্রকাশিত কথা, যত নীরব আকাঙ্ক্ষা, যত গোপন ভালো লাগা—সবকিছুর শেষ ঠিকানায় গিয়ে তোমার নামটিই লেখা থাকে।

তুমি আমার সেই অসমাপ্ত বাক্য, যাকে শেষ করতে চাই না কোনোদিন।

তুমি আমার কবিতার সবচেয়ে সুন্দর পঙ্‌ক্তি নও— তুমি সেই অনুভূতি, যার জন্য আমার সমস্ত কবিতা লেখা।

Monday, September 21, 2026

বিষাক্ত মায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

রেলওয়ে স্টেশনে কুয়াশা ঢাকা একটা বিকেল। চারিদিকে মানুষের ভীড়, কোলাহল, ট্রেনের হুইসেল। অর্ণব প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল তার পরিচিত এক বন্ধুর জন্য। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের ওপর। মেয়েটি একটি লাল হিজাব আর ফুলেল কামিজ পরেছিল। সে স্থির হয়ে অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করছিল, মাঝে মাঝে স্টেশনের বড় ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল। অর্ণবের চোখ তার ওপর পড়তেই সেও যেন অনুভব করল কারো দৃষ্টি। সে মাথা ঘুরিয়ে সরাসরি অর্ণবের চোখের দিকে তাকাল।

সেই মুহূর্তে অর্ণবের মনে হল সময় যেন থেমে গেছে। সেই চোখ দুটি ছিল অত্যন্ত ধারালো আর তীক্ষ্ণ, যেন তা অর্ণবের সত্তার প্রতিটি স্তর ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করল। তার মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হতে লাগল: "তোমার ওই তীক্ষ্ণ, বিদ্ধ করা চাহনিই আমার এই অনিয়ন্ত্রিত, বেপরোয়া হৃদস্পন্দনের একমাত্র নিঃশব্দ কারণ!" সে আগে কখনো এমন তীব্র অনুভূতি পায়নি। তার হৃদপিন্ডের গতি ক্রমশ বেড়েই চলছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তার মন এবং শরীরের প্রতিটি কোষে যেন একটা বিদ্যুতের ঝলক বয়ে গেল। সে যেন ওই এক পলকেই নিজের সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।

মেয়েটি আরও কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তারপর তার দৃষ্টিতে একটা মায়াবী ও রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে জানত না অর্ণব কে, কিন্তু অর্ণবের চোখে যেন সে কিছু খুঁজে পাচ্ছিল। অর্ণব নিজের চোখ ফেরাতে পারছিল না। সে জানত, এই মোহ, এই আকর্ষণ ধ্বংসাত্মক হতে পারে। সে নিজেকে বারবার সতর্ক করছিল যে এই মায়ায় জড়ানো ঠিক হবে না। তার মনে ধ্বনিত হতে লাগল: "জানি এই চোখে চোখ রাখা মানেই সর্বনাশের হাতছানি, তবুও প্রতিবার সেই বিষাক্ত মায়ায় ডুবে গিয়ে নিজের বুকের ভেতরের অস্থিরতাকেই ভালবেসে ফেলি!" সে চাইলেও নিজের চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছিল না, বরং এই অস্থিরতাকেই অদ্ভুতভাবে ভালো লাগতে শুরু করল। এক অজ্ঞাত ভয় এবং ভালোবাসার মিশেল এক অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

পরের মুহূর্তেই ট্রেনের হর্ন তার কানে এল। মেয়েটির ট্রেন প্ল্যাটফর্মে চলে এসেছে। সে তার ব্যাগটি গুছিয়ে নিয়ে ট্রেনের দিকে এগোতে লাগল, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও চোখ অর্ণব থেকে সরাল না। ট্রেনে ওঠার আগে শেষবার অর্ণবের দিকে তাকিয়ে সে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। অর্ণব দাঁড়িয়েই রইল, তার ট্রেনের হুইসেল তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলেও তার মনের কোণে সেই লাল হিজাব পরা মেয়েটির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর রহস্যময় মায়া আজীবন গেঁথে রইল। এই সংক্ষিপ্ত, নীরব বিনিময়টি তার জীবনে এক গভীর ও অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গেল।

 

 May be an image of one or more people, train and text that says "তোমার ওই তীক্ষ্, বিদ্ধ করা চাহনিই আমার এই অনিয়ন্ত্রি, বেপরোয়া হৃদস্পন্দনের একমাত্র নিঃশব্দ কারণ! জানি এই চোখে চোখ রাখা মানেই সর্বনাশের হাতছানি, তবুও প্রতিবার সেই বিষাক্ত মায়ায় ডুবে গিয়ে নিজের বুকের ভেতরের অস্থিরতাকেই ভালবেসে ফেলি!"

 বিষাক্ত মায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন