Wednesday, November 4, 2026

অধিকারহীন মুগ্ধতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

বিকেলটা কেমন যেন ক্লান্তিতে মোড়ানো ছিল। দিনের শেষ আলো ধীরে ধীরে নদীর বুকে মিশে যাচ্ছিল। নদীর ধারে একা বসে আবির আনমনে ফেসবুকের পাতা স্ক্রল করছিল। চারপাশে মানুষের কোলাহল থাকলেও তার মনটা ছিল অনেকটা নিঃসঙ্গ। হঠাৎ স্ক্রল করতে করতে একটি ছবির ওপর এসে থেমে গেল তার আঙুল। ছবিটি স্মৃতির।

সেই চেনা মুখ, শান্ত দুটি চোখ আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মিষ্টি হাসি। কত বছর ধরে এই মুখটি দেখে আসছে আবির! কতবার ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে কত কথা বলেছে, অথচ কখনো বলা হয়ে ওঠেনি।

আবিরের মনে হলো, আজ না হয় কথাগুলো বলা যাক।

সে লিখল—

‘স্মৃতি, আপনার মতো মানুষ সত্যিই খুব কম দেখা যায়। এত বছর ধরে আপনাকে দেখে আসছি, কখনো আপনার চোখেমুখে রাগের ছাপ দেখিনি, দেখিনি কোনো কষ্ট কিংবা দুঃখের প্রকাশ। সব সময় একটা শান্ত, হাসিমাখা মুখ দেখেছি। জানি না, আপনার ভেতরের পৃথিবীটা কেমন, তবে বাইরে থেকে আপনাকে আমার ভীষণ সুন্দর মনের একজন মানুষ বলে মনে হয়েছে।’

কথাগুলো পাঠিয়ে আবির আবার নদীর দিকে তাকাল। খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করেনি। নিছকই মনের মধ্যে জমে থাকা একটি ভালো লাগার প্রকাশ।

কিছুক্ষণ পর মেসেঞ্জারে উত্তর এল।

স্মৃতি লিখেছে—

‘আপনি সুন্দর মনের মানুষ, তাই হয়তো আমাকে এত সুন্দর করে ভাবেন। সবাই অবশ্য বলে, আমি নাকি আমার মায়ের মতো হয়েছি। মা অনেক শান্ত স্বভাবের ছিলেন। কিন্তু জন্মের পর আর মাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি।’

শেষ কথাটি পড়ে আবিরের আঙুল থেমে গেল। এতক্ষণ যে মানুষটিকে সে সব সময় হাসিমুখে দেখে এসেছে, সেই হাসির আড়ালে যে এমন এক শূন্যতা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা তার জানা ছিল না।

জন্মের পর মাকে হারানো—কথাটা আবিরের বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা বিষণ্নতার রেখা টেনে দিল।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিখল—

‘আপনার কথাটা শুনে সত্যিই মন খারাপ হলো। দুঃখিত, আপনার জীবনের এই কষ্টের জায়গাটা আমার জানা ছিল না। তবে আপনার জীবনের গল্পগুলো একদিন শুনতে চাই। শুধু ভালো থাকার গল্প নয়, কষ্টের গল্পগুলোও। মানুষকে জানতে হলে তার হাসির পাশাপাশি নীরবতাকেও জানতে হয়।’

স্মৃতি উত্তর দিল—

‘বলব একসময়।’

ব্যস, সেদিনের মতো কথার ইতি।

কিন্তু সেদিনের সেই ছোট্ট কথোপকথন আবিরের মনে অনেক বড় একটা অনুভূতির জন্ম দিল।

এরপর থেকে মাঝেমধ্যে তাদের কথা হয়। কখনো জীবন নিয়ে, কখনো কাজকর্ম নিয়ে, কখনো খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে। কথার মধ্যে কোনো বিশেষ আয়োজন থাকে না। থাকে না কোনো আনুষ্ঠানিকতা। কখনো দু-একটি বাক্য, কখনো দীর্ঘ আলাপ। তবু সেই কথাগুলোর মধ্যে আবির একধরনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পায়।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত বছরের পরিচয় থাকা সত্ত্বেও আগে কখনো এভাবে কথা হয়নি তাদের। মানুষকে অনেক বছর ধরে চেনা যায়, অথচ তার সঙ্গে মনের পরিচয় হতে কখনো কখনো একটি বিকেলই যথেষ্ট।

আবিরের স্মৃতির প্রতি ভালো লাগা অবশ্য নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই তার প্রতি একধরনের মুগ্ধতা কাজ করত। স্মৃতির শান্ত স্বভাব, কথা বলার সরলতা, বিনয় আর হাসিমাখা উপস্থিতি তাকে আকৃষ্ট করত। তবে সেই মুগ্ধতা কখনো প্রকাশ করার প্রয়োজন অনুভব করেনি সে।

কিন্তু মানুষের মনের সব অনুভূতি কি আর চিরকাল আড়াল করে রাখা যায়?

আবির জানে, স্মৃতি তার সংসার নিয়ে সুখে আছেন। তার সন্তান আছে, স্বামী আছে, সাজানো একটি পারিবারিক জীবন আছে। সেই জীবনের প্রতি আবিরের যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। সে কখনোই চায় না, তার কোনো অনুভূতি স্মৃতির সুন্দর জীবনে অস্বস্তি কিংবা অশান্তির কারণ হয়ে উঠুক।

তবু কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলো প্রকাশের জন্য অধিকার লাগে না; লাগে শুধু মনের স্বচ্ছতা আর অন্য মানুষটির প্রতি সম্মান।

অনেক ভেবেচিন্তে একদিন আবির নিজের মনের কথাটা জানিয়ে দিল।

সে বলল, স্মৃতির প্রতি তার একটা ভালো লাগা আছে, আছে দীর্ঘদিনের মুগ্ধতা। তবে সেই ভালো লাগার মধ্যে কোনো দাবি নেই, কোনো প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। সে শুধু চায়, তাদের মধ্যে এমন একটি সুন্দর সম্পর্ক থাকুক, যেখানে দুজন মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারবে, একে অন্যের ভালো লাগা ও মন্দ লাগার জায়গাগুলো বুঝতে চেষ্টা করবে।

যে সম্পর্কে ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু অধিকার ফলানোর চেষ্টা থাকবে না। থাকবে মায়া, কিন্তু কোনো বাঁধন থাকবে না। থাকবে আন্তরিকতা, কিন্তু কোনো অস্বস্তি কিংবা জবাবদিহি থাকবে না।

আবিরের আশঙ্কা ছিল, কথাগুলো শুনে হয়তো স্মৃতি অস্বস্তিতে পড়বে। হয়তো আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে না। কিন্তু স্মৃতি বিষয়টি বেশ সহজভাবেই গ্রহণ করল। তার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় আবির স্বস্তি পেল।

ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটি সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হলো।

আবির বুঝতে পারল, সে আসলে এমন একটি সম্পর্কই চেয়েছিল। যেখানে কাউকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকবে না, অথচ মানুষটি নিজের মতো করেই জীবনের গল্পে থেকে যাবে। যেখানে প্রতিদিন কথা না হলেও একধরনের আন্তরিকতা থাকবে। যেখানে কেউ কারও ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা অতিক্রম করবে না, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে দুজন দুজনের কথা শোনার মতো মানুষ হয়ে উঠবে।

আবিরের কাছে এই সম্পর্কের সৌন্দর্য এখানেই।

সে স্মৃতিকে নিয়ে কোনো স্বপ্নের জগৎ তৈরি করতে চায় না। বরং স্মৃতি যে জগতে আছেন, সেই জগতের প্রতি সম্মান রেখেই তার জীবনের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকতে চায়।

কখনো স্মৃতির মন খারাপ হলে সে যেন আবিরকে বলতে পারেন। কখনো কোনো আনন্দের ঘটনা ঘটলে নির্দ্বিধায় ভাগ করে নিতে পারেন। কখনো নিজের জীবনের কোনো অজানা গল্প বলতে ইচ্ছে করলে আবির যেন একজন মনোযোগী শ্রোতা হয়ে থাকতে পারে।

আবির জানে, সব মানুষের জীবনে এমন কিছু কষ্ট থাকে, যেগুলো কাউকে বলা যায় না। কিছু শূন্যতা থাকে, যেগুলো কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না। স্মৃতির জীবনে মায়ের না থাকার যে শূন্যতা, সেটি হয়তো কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। তবু সে চায়, স্মৃতির জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসুক, যেখানে পুরোনো কষ্টগুলো কিছুক্ষণের জন্য হলেও আড়ালে চলে যাবে।

সে চায়, স্মৃতি হাসুক। মন খুলে কথা বলুক। নিজের জন্য একটু সময় বের করুক। সংসার, সন্তান, দায়িত্ব আর প্রতিদিনের ব্যস্ততার বাইরে নিজেরও যে একটি আলাদা মন আছে, সেই মনটাকেও একটু গুরুত্ব দিক।

আর আবির?

আবির হয়তো নদীর ধারে বসে কোনো এক ক্লান্ত বিকেলে আবারও স্মৃতির ছবি দেখবে। হয়তো মনে মনে ভাববে, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে জীবনের পথচলা হয় না, পাশাপাশি বসে গল্প করা হয় না, তবু তাদের উপস্থিতি মনের ভেতর একধরনের প্রশান্তি তৈরি করে।

সব ভালো লাগার পরিণতি ভালোবাসার অধিকার হয়ে উঠতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিছু ভালো লাগা দূরত্বের মধ্যেও সুন্দর থাকে। কিছু মুগ্ধতা প্রকাশের পরও পবিত্রতা হারায় না, যদি সেখানে সম্মান, সংযম আর সীমারেখার প্রতি শ্রদ্ধা থাকে।

আবির তাই স্মৃতিকে কোনো সম্পর্কে বাঁধতে চায় না। শুধু চায়, সম্পর্কটির যত্ন নিতে। কারণ তার কাছে স্মৃতি কেবল একজন পরিচিত মানুষ নন; তিনি দীর্ঘদিনের এক নীরব মুগ্ধতার নাম, এক শান্ত বিকেলের অনুভূতি, কিছু নির্ভার কথোপকথনের আশ্রয়।

কোনো একদিন হয়তো স্মৃতি তার জীবনের অনেক অজানা গল্প বলবেন। আবির মন দিয়ে শুনবে। হয়তো কোনো গল্পে হাসবে, কোনো গল্পে বিষণ্ন হবে। কিন্তু কোনো গল্পের শেষেই সে স্মৃতির জীবনে নিজের জন্য আলাদা কোনো জায়গা দাবি করবে না।

কারণ আবির বিশ্বাস করে—

সব সম্পর্কের নাম হয় না, সব অনুভূতির পরিণতি হয় না, আর সব ভালোবাসার গন্তব্য অধিকার হতে হয় না। কিছু মানুষকে শুধু সুন্দরভাবে মনে রাখতে হয়, কিছু সম্পর্ককে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

স্মৃতির প্রতি আবিরের চাওয়াটাও ঠিক তেমন।

স্মৃতি তাঁর নিজের পৃথিবীতে ভালো থাকুন, হাসিখুশি থাকুন। আর সেই পৃথিবীর বাইরে কোথাও একজন মানুষ থাকুক, যে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই তাঁর ভালো থাকার খবর শুনে মনে মনে স্বস্তি পাবে।

হয়তো এটাই আবিরের কাছে অধিকারহীন মুগ্ধতার সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা।


অধিকারহীন মুগ্ধতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Thursday, October 29, 2026

নীরব মুগ্ধতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আরিফের জীবনে কিছু মানুষ ছিল, যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা না হলেও মনের ভেতর কোথাও তাদের জন্য আলাদা একটা জায়গা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তারা কেউ খুব কাছের ছিল না, আবার একেবারে দূরেরও নয়। তাদের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না, কোনো দাবি ছিল না, ছিল না নিয়মিত যোগাযোগের বাধ্যবাধকতা। তবু মাঝেমধ্যে তাদের কথা মনে পড়ত। মনে হতো, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ কখনো ফুরিয়ে যায় না।

স্মৃতি ছিল তেমনই একজন।

ফেসবুকের বন্ধু হিসেবে তাদের পরিচয়ের বয়স প্রায় এক যুগ। ভার্চুয়াল জগতের সেই পরিচয় একসময় বাস্তবেও রূপ নিয়েছিল। দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল, পরিচিত হয়েছিল দুজনের মুখ, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্ব। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবন, বদলেছে অজস্র সম্পর্কের সমীকরণ। অথচ স্মৃতিকে নিয়ে আরিফের মনে জমে থাকা কিছু অনুভূতি কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।

সেই অনুভূতির শুরু অবশ্য আরও আগে।

তখন আরিফের জীবনে বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে পরিবারের মধ্যে নানা আলোচনা চলছিল। মা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন মেয়ের ছবি দেখতেন, তাঁদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। একদিন তেমনই একটি ছবি দেখতে দেখতে তিনি থমকে গেলেন।

ছবিটি ছিল স্মৃতির।

মা ছবিটির দিকে তাকিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মেয়েটিকে সে চেনে কি না, তার সম্পর্কে কিছু জানে কি না।

আরিফ তখন স্মৃতিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনত না। তবে ছবিটি দেখার পর এবং মায়ের আগ্রহের সূত্র ধরে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনেছিল। সেদিনের সেই সামান্য ঘটনা যে বহু বছর পর তার মনে এমনভাবে ফিরে আসবে, তা তখন সে কল্পনাও করেনি।

জীবনের গল্পগুলো বোধ হয় এভাবেই তৈরি হয়। কোনো একটি মুহূর্ত তখন তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, অথচ সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই মুহূর্তই স্মৃতির পাতায় অন্য অর্থ নিয়ে ফিরে আসে।

পরবর্তী সময়ে স্মৃতির সঙ্গে আরিফের দেখা হয়েছিল। কথা হয়েছিল একাধিকবার। পরিচয়ের পরিধিও ধীরে ধীরে বেড়েছিল। কিন্তু সেই পুরোনো ঘটনাটির কথা আর বলা হয়নি। বলা হয়নি, একসময় তার ছবিটি আরিফের মায়ের চোখেও পড়েছিল। বলা হয়নি, পরিচয়ের শুরু হওয়ার আগেই তাকে ঘিরে একটি সম্ভাবনার গল্প তৈরি হয়েছিল অন্য কারও মনে।

কেন বলা হয়নি, তার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর আরিফের কাছে ছিল না। হয়তো সময় উপযুক্ত ছিল না, হয়তো কথাটি অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল। কিংবা কিছু কিছু কথা মানুষ নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখে, কারণ সেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে স্মৃতির অংশ করে রাখাই তার কাছে সহজ মনে হয়।

এভাবেই কেটে গেল বহু বছর।

স্মৃতিকে যতবার দেখেছে, যতবার কথা বলেছে, আরিফের মনে হয়েছে—এই নারীকে শুধু তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর সৌন্দর্যের বাইরেও এমন কিছু আছে, যা মানুষকে ধীরে ধীরে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে।

তিনি আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু আত্মম্ভরী নন। সাহসী, কিন্তু অমার্জিত নন। তাঁর কথাবার্তায় একটা সংযম আছে, আচরণে আছে পরিমিতিবোধ। পোশাক-পরিচ্ছদ, কথা বলার ধরন কিংবা অন্যের সঙ্গে মেলামেশার মধ্যে একধরনের স্বাভাবিক রুচিশীলতা প্রকাশ পায়।

তবে আরিফকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল স্মৃতির নীরবতা।

তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না। তাঁর হাসিও ছিল মৃদু—যেন খুব সামান্য একটু আলো এসে মুখের ওপর পড়ে আবার সরে গেছে। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কৃত্রিমতার কোনো চিহ্ন ছিল না। তিনি যখন হাসতেন, তখন মনে হতো, মানুষের সৌন্দর্য সব সময় উচ্চকণ্ঠে নিজেকে প্রকাশ করে না; কখনো কখনো তা নীরবতার মধ্যেও গভীরভাবে উপস্থিত থাকে।

আরিফ প্রায়ই ভাবত, মানুষের সৌন্দর্য নিয়ে পৃথিবীতে কত কথা হয়, অথচ মানুষের ভেতরের সৌন্দর্য নিয়ে কথা হয় খুব কম। অথচ যে সৌন্দর্য মানুষকে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো করে তোলে, তা কেবল মুখাবয়বে থাকে না; থাকে তার আচরণে, মননে, সাহসে, অন্যকে বোঝার ক্ষমতায়।

স্মৃতির মধ্যে আরিফ সেই সৌন্দর্যেরই উপস্থিতি অনুভব করেছিল।

তার মনে হতো, এই নারীকে বিশ্বাস করা যায়। নিজের মনের কথা বলা যায়। জীবনের কোনো জটিল অভিজ্ঞতা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা কোনো কষ্টের কথা বলতে গেলে তিনি হয়তো তাড়াহুড়ো করে বিচার করবেন না। মন দিয়ে শুনবেন, বোঝার চেষ্টা করবেন।

অবশ্য এই বিশ্বাসের পেছনে কোনো নাটকীয় ঘটনা ছিল না। ছিল না কোনো বিশেষ প্রতিশ্রুতি কিংবা আবেগঘন মুহূর্ত। ছিল কেবল দীর্ঘদিন ধরে দেখা একজন মানুষের আচরণ থেকে তৈরি হওয়া ব্যক্তিগত উপলব্ধি।

আরিফ জানত, কাউকে ভালো মানুষ মনে হওয়া আর সেই মানুষটির সমস্ত অন্তর্জগৎ জেনে ফেলা এক কথা নয়। তবু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা নির্ভরতার অনুভূতি থাকে, যা অন্যের মনে অজান্তেই বিশ্বাসের জন্ম দেয়।

স্মৃতি তার কাছে তেমনই একজন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।

কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিচয় মানেই কাউকে সম্পূর্ণভাবে জানা নয়।

আরিফ একসময় উপলব্ধি করেছিল, স্মৃতির জীবনের অনেক অধ্যায় তার অজানা রয়ে গেছে। তাঁকে যতটা বাইরে থেকে দেখা যায়, তাঁর ভেতরের মানুষটি হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। হাসিমুখের আড়ালে কী ধরনের অভিজ্ঞতা জমে আছে, কোন কোন দুঃখ তাঁকে নীরবে বদলে দিয়েছে, কী কী অপ্রাপ্তি তাঁকে শক্ত হতে শিখিয়েছে—এসব বিষয়ে তার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না।

তারপর একদিন, অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর, আরিফ সাহস করে স্মৃতির জীবনের কিছু কথা জানতে চেয়েছিল।

স্মৃতি যতটুকু বলেছিলেন, ততটুকুই আরিফের কাছে নতুন এক জগৎ উন্মোচন করেছিল।

সেই কথাগুলোর মধ্যে ছিল জীবনের বাস্তবতা, কিছু কঠিন অভিজ্ঞতা, কিছু না-পাওয়ার বেদনা। সবকিছু হয়তো বলা হয়নি, সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণও আরিফ জানতে পারেনি। কিন্তু সামান্য কিছু কথার মধ্য দিয়েই সে বুঝতে পেরেছিল, মানুষের জীবনকে বাইরে থেকে দেখে বিচার করা কতটা কঠিন।

কিছু ব্যথা আছে, যেগুলো মানুষকে ভেঙে দেয়। আবার কিছু ব্যথা মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলে, যার গভীরতা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। মানুষ তখন হাসতে শেখে, নিজের দায়িত্ব পালন করতে শেখে, অন্যের সামনে স্বাভাবিক থাকতে শেখে; অথচ তার ভেতরে এমন কিছু স্মৃতি রয়ে যায়, যেগুলোর সঙ্গে তাকে প্রতিনিয়ত একা বসবাস করতে হয়।

স্মৃতির কথা শুনতে শুনতে আরিফের মন ভারী হয়ে এসেছিল।

তার কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু সেই কষ্টের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল অন্য রকম এক অনুভূতি। স্মৃতির প্রতি তার মুগ্ধতা আরও গভীর হয়েছিল। সে উপলব্ধি করেছিল, কোনো মানুষকে শ্রদ্ধা করার একটি বড় কারণ হতে পারে তার জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেকে ধরে রাখার ক্ষমতা।

যে মানুষটি নীরবে নিজের জীবনের ভার বহন করেন, অথচ নিজের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যটুকু হারিয়ে ফেলেন না, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জন্মানো অস্বাভাবিক নয়।

সেদিনের পর থেকে স্মৃতিকে নিয়ে আরিফের ভাবনাগুলো যেন নতুন মাত্রা পেল।

মাঝেমধ্যে তার কথা বলতে ইচ্ছে করত। জানতে ইচ্ছে করত, তিনি কেমন আছেন, তাঁর দিনগুলো কেমন কাটছে। কখনো কোনো সাধারণ বিষয় নিয়ে কথা বলার ইচ্ছা হতো, কখনো মনে হতো নিজের জীবনের কিছু কথাও তাঁকে বলা যায়।

কিন্তু আরিফের মনে একটি দ্বিধা কাজ করত।

স্মৃতি কি তার এই যোগাযোগকে স্বাভাবিকভাবে নেবেন? নাকি মনে করবেন, দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে সে অকারণে বিরক্ত করছে?

মানুষের জীবনে ব্যক্তিগত পরিসর বলে একটা বিষয় আছে। পরিচিত হলেই কারও জীবনে ইচ্ছেমতো প্রবেশের অধিকার তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের সম্পর্কও সব সময় ঘনিষ্ঠতার নিশ্চয়তা দেয় না। এই সত্য আরিফ বুঝত।

তাই কথা বলতে ইচ্ছে করলেও সে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করত। কখনো বার্তা পাঠাত, কখনো অপেক্ষা করত। উত্তর পেলে ভালো লাগত, না পেলে নিজের মতো করে বিষয়টি মেনে নিত।

তার মনে হতো, কাউকে ভালো লাগার অর্থ তার কাছ থেকে প্রতিনিয়ত সময় দাবি করা নয়। কাউকে শ্রদ্ধা করার অর্থ তার ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করতে শেখা।

আরিফের অনুভূতিগুলো সে কারণেই কোনো দাবির ভাষা খুঁজে পেত না।

স্মৃতির প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল, ভালো লাগা ছিল, মায়া ছিল। সেই অনুভূতিকে ভালোবাসা বলা যায় কি না, সে প্রশ্নেরও কোনো চূড়ান্ত উত্তর সে খুঁজতে চায়নি। কারণ সব অনুভূতিকে একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বাঁধতে গেলে কখনো কখনো অনুভূতির নিজস্ব সৌন্দর্যটুকুই হারিয়ে যায়।

কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলো কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্মায় না। বরং কাউকে মানুষ হিসেবে জানার পর তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জন্মায়, তার সুখ-দুঃখের প্রতি মমতা তৈরি হয়, তার ভালো থাকার জন্য মন থেকে শুভকামনা আসে।

আরিফ নিজের অনুভূতিকে সেভাবেই দেখতে চেয়েছিল।

সে স্মৃতির জীবনে কোনো অস্বস্তির কারণ হতে চায়নি। চায়নি তার কথায় কিংবা আচরণে এমন কোনো প্রত্যাশা তৈরি হোক, যা বহন করা স্মৃতির পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। সে শুধু চেয়েছিল, স্মৃতি যেন বুঝতে পারেন—পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষও আছেন, যাঁরা তাঁকে কোনো প্রয়োজনের কারণে নয়, তাঁর নিজের গুণের কারণেই শ্রদ্ধা করেন।

যাঁরা তাঁর সৌন্দর্য দেখেন, কিন্তু শুধু সৌন্দর্যেই আটকে থাকেন না।

যাঁরা তাঁর সাহসকে সম্মান করেন, তাঁর সংযমকে মূল্য দেন, তাঁর মৃদু হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটিকে জানার আগ্রহ অনুভব করেন।

একদিন আরিফের মনে হলো, স্মৃতিকে এসব কথা জানানো দরকার।

এত দীর্ঘদিনের পরিচয়। অথচ তাঁকে নিয়ে তার মনের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো কখনো বলা হয়নি। হয়তো কথাগুলো বলার জন্য কোনো বিশেষ উপলক্ষের প্রয়োজন ছিল না। হয়তো সময়ের একটি নির্দিষ্ট সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষ বুঝতে শেখে, কিছু কথা চিরকাল নিজের ভেতরে রেখে দেওয়ার কোনো অর্থ নেই।

সেদিন রাতে আরিফ লিখতে বসেছিল।

প্রথমে লিখল পরিচয়ের কথা। তারপর সেই পুরোনো দিনের কথা, যেদিন তার মা স্মৃতির ছবি দেখে তাঁর সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। লিখল দীর্ঘদিনের মুগ্ধতার কথা, তাঁর আত্মবিশ্বাস, সৌন্দর্য, সাহস ও মার্জিত ব্যক্তিত্বের কথা।

লিখতে লিখতে তার মনে হলো, স্মৃতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই যে, তিনি নিজের সম্পর্কে কতটা জানেন, তার চেয়েও বেশি কিছু অন্যের মনে রেখে যেতে পারেন।

তারপর লিখল সেই কথাগুলো, যা এত দিন বলতে পারেনি।

লিখল, স্মৃতির কাছে তার নিজের জীবনের কিছু বাস্তব কথা ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করে। কিছু ব্যথা আছে, যেগুলো মানুষের সামনে বলা যায় না; অথচ কোনো একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের কাছে বলতে পারলে বুকের ভার কিছুটা কমে আসে।

সে জানত না, স্মৃতি তার কথাগুলো পড়ে কী ভাববেন।

হয়তো অবাক হবেন। হয়তো তাঁর কাছে লেখাটি অপ্রত্যাশিত মনে হবে। হয়তো কিছু কথা তাঁকে ভাবাবে। আরিফের মনে সামান্য ভয়ও ছিল—এত দিনের পরিচিত একজন মানুষকে নিয়ে এত কথা বলা কি ঠিক হলো?

কিন্তু সেই ভয়কে অতিক্রম করে সে লিখে গেল।

শেষ পর্যন্ত সে শুধু একটি কথাই বলতে চেয়েছিল—স্মৃতি তার কাছে এমন একজন মানুষ, যাঁকে শ্রদ্ধা করতে কোনো কারণ খুঁজতে হয় না; বরং তাঁর সঙ্গে যতটুকু পরিচয় হয়েছে, ততটুকুই তাঁকে আরও বেশি শ্রদ্ধা করার কারণ হয়ে উঠেছে।

লেখা শেষ করে আরিফ অনেকক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মনে হলো, কিছু কথা বলা মানেই কোনো উত্তর দাবি করা নয়। সব আন্তরিকতারই প্রতিদান প্রয়োজন হয় না। কোনো কোনো অনুভূতি প্রকাশ করার পরই মানুষ একধরনের স্বস্তি পায়, কারণ এত দিন ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো অবশেষে নিজের জায়গা খুঁজে পায়।

সে বার্তাটি পাঠিয়ে দিল।

পাঠানোর পর তার মনে কোনো নাটকীয় প্রত্যাশা তৈরি হলো না। সে শুধু চাইল, স্মৃতি যেন কথাগুলো ভুল না বোঝেন। যেন তাঁর মনে না হয়, এই দীর্ঘ চিঠির আড়ালে কোনো দাবি লুকিয়ে আছে।

কারণ আরিফের কাছে স্মৃতির ভালো থাকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেন নিজের মতো করে বাঁচতে পারেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, নিজের জীবনের গল্প নিজের মতো করে লিখতে পারেন—এই ছিল তার আন্তরিক কামনা।

রাত আরও গভীর হলো।

আরিফ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে নীরবতা। দূরে কোথাও দু-একটি আলোর বিন্দু। আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, মানুষের জীবনে কত বিচিত্র সম্পর্ক তৈরি হয়! কিছু সম্পর্কের নাম থাকে, কিছু সম্পর্কের নিয়ম থাকে, কিছু সম্পর্ককে সমাজ সহজেই বুঝতে পারে। আবার কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলোকে কোনো পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলা যায় না।

স্মৃতির সঙ্গে তার পরিচয়ও তেমন এক অদ্ভুত অধ্যায়।

এক যুগের বন্ধুত্ব, প্রায় এক দশকের চেনাজানা, আর তারও আগে শুরু হওয়া এক অজানা গল্প—সব মিলিয়ে স্মৃতি তার জীবনের এমন একটি নাম, যার সঙ্গে অনেক না-বলা কথা জড়িয়ে আছে।

আরিফ জানত, জীবনের সব গল্পের শেষ এক রকম হয় না। সব মুগ্ধতা ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছায় না, সব ভালো লাগা সম্পর্কের নাম পায় না, আর সব আন্তরিকতার উত্তরও সমানভাবে ফিরে আসে না।

তবু তাতে প্রতিটি অনুভূতির মূল্য কমে যায় না।

কিছু মানুষকে কাছে পাওয়া যায়, কিছু মানুষকে দূর থেকে সম্মান করতে হয়। কারও সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলা যায়, কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আবার কেউ কেউ থাকেন, যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ অনিয়মিত হলেও তাঁদের প্রতি মমতা ও শ্রদ্ধা মনের মধ্যে নীরবে বেঁচে থাকে।

স্মৃতি হয়তো আরিফের জীবনে তেমনই একজন হয়ে থাকবেন।

এমন একজন নারী, যাঁর মৃদু হাসি মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে সৌন্দর্য এখনো কোমল হতে পারে। যাঁর সাহস শেখায়—প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের ব্যক্তিত্ব ধরে রাখা যায়। যাঁর মার্জিত আচরণ মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার উচ্চারণে নয়, তার ব্যবহারেও প্রকাশ পায়।

আর যাঁর জীবনের কিছু অজানা অধ্যায় আরিফকে বুঝিয়েছে, মানুষের প্রতি মুগ্ধ হওয়ার আগে তাকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখা কতটা জরুরি।

রাতের শেষ প্রহরে আরিফের মনে একটি বাক্য ভেসে উঠল।

সব মানুষ জীবনে এসে ভালোবাসার গল্প হয়ে ওঠেন না। কেউ কেউ হয়ে ওঠেন শ্রদ্ধার, মুগ্ধতার আর নীরবে ভালো চেয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ অধ্যায়।

স্মৃতি তার কাছে তেমনই এক অধ্যায়।

যার শুরুটা হয়েছিল বহু আগে, যার অনেক কথাই আজও অজানা, আর যার শেষ কোথায়—তা জানার কোনো তাড়া আরিফের নেই।

সে শুধু চায়, স্মৃতি ভালো থাকুন।

তাঁর মৃদু হাসিটুকু অটুট থাকুক। তাঁর জীবনের পুরোনো ব্যথাগুলো একদিন প্রশান্তিতে রূপ নিক। যে মানুষটি নিজের সাহস আর সংযম দিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন, তাঁর আগামী দিনগুলো হোক আরও সুন্দর, আরও স্বস্তির।

আর যদি কোনো একদিন স্মৃতি ফিরে তাকিয়ে আরিফের সেই দীর্ঘ বার্তাটির কথা মনে করেন, তাহলে যেন তাঁর মনে হয়—একজন মানুষ তাঁকে কোনো প্রত্যাশার ভারে বাঁধতে চাননি; শুধু তাঁর ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যটুকু অনুভব করে কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন।

হয়তো সেটুকুই যথেষ্ট।

কারণ জীবনের সব সুন্দর অনুভূতির পরিণতি একসঙ্গে পথ চলা নয়।

কিছু অনুভূতির পরিণতি হলো—দূরত্ব বজায় রেখেও কারও প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখা, তার স্বাধীনতাকে সম্মান করা এবং নিজের মনের গভীরে তার জন্য একটুকরো শুভকামনা বাঁচিয়ে রাখা।

এক যুগের পরিচয়ের পর আরিফ অবশেষে বুঝেছিল, কাউকে সত্যিকার অর্থে মূল্য দেওয়া মানে শুধু তার কাছে যেতে চাওয়া নয়; কখনো কখনো তার স্বস্তি, স্বাধীনতা আর ভালো থাকাকেও নিজের অনুভূতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখা।

স্মৃতি হয়তো কখনো জানবেন, হয়তো কোনো দিন ভুলেও যাবেন। কিন্তু আরিফের কাছে এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি থেকে যাবে—একজন নীরব, মৃদু হাসির, সাদা মনের নারীকে দীর্ঘদিন ধরে দেখে, জেনে এবং তাঁর জীবনের কিছু অজানা কথা শুনে যে শ্রদ্ধা জন্মেছিল, তা শেষ পর্যন্ত শব্দ খুঁজে পেয়েছিল।

আর কিছু না-বলা কথা শব্দ খুঁজে পেলেই, অনেক সময় মানুষের মন হালকা হয়ে যায়।

সেই রাতেও হয়েছিল ঠিক তাই।

 

নীরব মুগ্ধতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন