ভূমিকা: স্মৃতির ক্যানভাসে ফিরে দেখা
সময় এক বহমান নদী। তার কোনো থমকে যাওয়া নেই, ক্লান্তি নেই। নদীর বুকে যেমন পলি জমে, মানুষের বুকেও তেমনি জমে ওঠে অজস্র স্মৃতির রেণু। জীবনের একটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়—এই যে চেনা-অচেনা, আলো-ছায়ার দিনগুলো পার করে এলাম, তার সবটুকুই কি কেবলই সময় পার করা? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে কোনো অলিখিত মহাকাব্য, যা একান্তই আমার, অথচ যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এই চেনা সমাজ, চেনা মানুষ আর চেনা প্রকৃতি?
গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সেই অমিয় বাণী—"নিজেকে জানো"—আমার জীবনের এক পরম নির্দেশক। যুগে যুগে মানুষ নিজেকে খোঁজার জন্য কত পথ পাড়ি দেয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, নিজেকে জানার সেই নিরন্তর প্রচেষ্টারই একটি লিখিত রূপ হলো এই আত্মজীবনী। নিজের ভেতরের আলো-আঁধারিকে চেনা, নিজের সীমাবদ্ধতা আর সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করার এই যে মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা, 'যাপিত জীবনের কথা' মূলত তারই এক বিনীত প্রকাশ।
তাই এটি কোনো আত্মশ্লাঘা বা নিজের মহিমা কীর্তনের দলিল নয়। এটি যেমন আমার আত্মআবিষ্কারের জার্নি, তেমনি আমার জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের গল্প। এই দীর্ঘ পথে আমি যেমন সফলতার দেখা পেয়েছি, তেমনি মুখোমুখি হয়েছি চরম সংকট, হতাশা আর কঠিনতম সময়ের। কিন্তু সেই কষ্টের দিনগুলোতে কীভাবে ধৈর্যের হাতটি শক্ত করে ধরে রাখতে হয়, কীভাবে ঝড়ের মধ্যেও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমি খুব কাছ থেকে অর্জন করেছি। আমার বিশ্বাস, জীবনের এই যন্ত্রণাদগ্ধ অধ্যায়গুলো এবং তা থেকে উত্তরণের গল্পগুলো যদি সততার সাথে প্রকাশ করা যায়, তবে তা হয়তো অন্য কোনো পথহারা বা সংগ্রামী মানুষকে একটুখানি আলো দেবে, একটুখানি ধৈর্য ধরার সাহস জোগাবে। অন্যের জীবনের লড়াইয়ে যদি আমার এই অভিজ্ঞতা বিন্দুমাত্র সহায় হতে পারে, তবেই এই লেখার মূল সার্থকতা।
১৯৯০ সালের সেই চেনা মফস্বল বা গ্রামের চাদরে মোড়ানো শৈশব থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সেই মুখরিত করিডোর, হল জীবনের মধ্যরাতের আড্ডা, লাইব্রেরির বইয়ের গন্ধ—সবকিছুই আমার মনন ও চিন্তার জগতকে গড়ে তুলেছে। পরবর্তীতে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের একজন সদস্য হিসেবে ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের চোখে যখন সম্ভাবনার আলো দেখেছি, তখন বারবার মনে হয়েছে—শিক্ষা কেবল পেশা নয়, এটি এক পরম ব্রত।
একদিকে ক্লাসরুমের দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে সৃজনশীলতার তাগিদে কবিতার শব্দবুনন কিংবা সামাজিক বাস্তবতার পটভূমিতে উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টি—এই দুইয়ের দোলাচলেই কেটেছে আমার দিনরাত্রি। কখনো লালন সাঁইয়ের পরম সত্যের সন্ধান, কখনো এ দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের জটিল বাঁকগুলো নিয়ে গবেষণার টেবিলে নির্ঘুম রাত পার করা—সবকিছুই এই যাপিত জীবনের একেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই পথচলায় আমার মা-বাবা, আমার জীবনসঙ্গী, এবং আমার সন্তানেরা আমাকে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে ভালোবাসার বন্ধনে, তা ছাড়া আমি আজ যা কিছু, তার কোনো কিছুই পূর্ণতা পেত না।
স্মৃতি বড়ই প্রবঞ্চক। মাঝে মাঝে সে বড় বেশি ধূসর হয়ে যায়, আবার কখনো কখনো এক ফালি রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে মনের জানালায় এসে কড়া নাড়ে। সেই কড়া নাড়ার শব্দগুলোকেই, নিজের ভেতরের সত্যকে চেনার প্রয়াস আর জীবনদর্শনকেই এক মলাটের ভেতর ধরে রাখার চেষ্টা করেছি এখানে।
সবাইকে আমন্ত্রন আমার যাপিত জীবনের অন্দরমহলে। আসুন, এই স্মৃতির পথ ধরে আমরা সবাই একবার নিজের ভেতরে তাকাই।

No comments:
Post a Comment