Sunday, June 21, 2026

বাঁশঝাড়ের পেত্নী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাঁশঝাড়টা দিনের বেলাতেও কেমন যেন একটা থমথমে ছায়া ফেলে রাখত। সন্ধ্যার পর সেখানে অন্ধকার জমাট বাঁধলে মনে হতো, ওটা আর কেবল গাছের ঝাড় নয়—জীবন্ত কোনো রহস্যের আস্তানা।

ঠিক সেইরকম এক অন্ধকার রাতে নানু আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে বারান্দায় বসতেন। কাঁসার থালায় দুধকলা দিয়ে ভাত মেখে যখন আমাদের মুখে লোকমা তুলে দিতেন, তখনই শুরু হতো আসল জাদু। নানু তার বড় বড় চোখ জোড়া আরও বড় করে বলতেন, "শোন, তোদের বড়ব্বা হারিকেন জ্বালিয়ে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াতেন..."

কথাটা শোনা মাত্রই আমাদের তলপেটে একটা কঠিন মোচড় দিতো। মুখের খাবার চিবোতে ভুলে গিয়ে আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। পরের লাইনে কী আছে, তা জিজ্ঞেস করতেও বুক কাঁপত। নানু আমাদের মনের অবস্থা বুঝে একটু হাসতেন, তারপর বিশাল এক ভাব নিয়ে বলতেন, "একটু খানি বোস, একটা পান মুখে দিয়ে আসি।"

আমরা তখন প্রমাদ গুনতাম। হায় হায়! গল্পের এই মোক্ষম সময়েই নানুর পান পিপাসা পেতে হলো?

নানু ঘরের কোণ থেকে তার চেনা পানের বাটাটা টেনে নিতেন। তারপর বিখ্যাত হাকিমপুরী জর্দা দিয়ে একটা ঢাউস সাইজের পান মুখে পুরে পুনরায় গল্পের আঞ্জাম দিতেন, "কোথায় যেন ছিলাম?"

আমরা ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিতাম, "বড়ব্বা হারিকেন নিয়ে..."

"হ হ, মনে পড়ছে," নানু জর্দামিশ্রিত পান চিবোতে চিবোতে শুরু করতেন, "তোদের বড়ব্বা যেইনা নদীর পাড়ের ওই বাঁশঝাড়ের নিচে পা বাড়িয়েছেন, অমনি চারপাশটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বন্ধ, হারিকেনের আলোটাও দপ করে একটু কমে গেল। বড়ব্বা ওপরের দিকে তাকাতেই দেখলেন—এক পেত্নী বাঁশঝাড়ের একদম মগডালে বসে আছে! তার কুচকুচে কালো লম্বা চুল ওপর থেকে একদম মাটি পর্যন্ত বিছানো!"

আমরা তখন ভয়ে একজন আরেকজনের গায়ে গা লাগিয়ে লেপ্টে বসতাম। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত। কোনোমতে ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করতাম, "বড়ব্বা... বড়ব্বা ভয় পায়নি নানু?"

নানু তখন পিক ফেলার জন্য একটু থামতেন। মুখে একটা বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে খুব গর্ব করে বলতেন, "আরে না! তোদের বড়ব্বা কি তেমন তেমন লোক? ওনার কোমরে গোঁজা থাকত খাঁটি লোহার একটা ছোরা। ভূত-পেত্নী নাকি লোহা দেখলে যমের মতো ভয় পায়!"

নানু বলতে লাগলেন, "বড়ব্বা এক চুলও না নড়ে গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন, 'কে রে ওখানে? ভালো চাস তো রাস্তা ছাড়!' কিন্তু পেত্নী কি আর অত সহজে শোনে? সে ওপর থেকে এক খিলখিল হাসিতে চারপাশ কাঁপিয়ে তুলল, আর নিজের লম্বা চুলগুলো দিয়ে বড়ব্বার হারিকেনটা আড়াল করার চেষ্টা করল।"

আমরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। নানু বলে চললেন, "বড়ব্বা তখন আর দেরি করলেন না। কোমর থেকে চট করে সেই লোহার ছোরাটা বের করে হারিকেনের আলোয় চকচকে ফলাটা পেত্নীর দিকে তাক করলেন। লোহা দেখামাত্রই পেত্নীর সেই খিলখিল হাসি কান্নায় মোড় নিল। সে এক ঝটকায় তার চুলগুলো গুটিয়ে নিয়ে শাঁ করে বাঁশঝাড়ের ওপারে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিকের বাঁশগুলো মটমট করে এমনভাবে নড়ে উঠেছিল, যেন এখনই ভেঙে পড়বে! কিন্তু তোদের বড়ব্বা বুক ফুলিয়ে, সেই হারিকেন দুলিয়ে দুলিয়ে হেঁটে ঠিক বাড়ি ফিরে এলেন।"

গল্প শেষ হতো, কিন্তু আমাদের বুকের ধকধকানি থামত না। ভাত খাওয়া শেষে যখন শোবার ঘরে যেতাম, জানালার ফাঁক দিয়ে দূরের সেই বাঁশঝাড়ের দিকে তাকালে মনে হতো—সত্যিই বুঝি কোনো এক জোছনা রাতে বা অমাবস্যার অন্ধকারে সেখানে কেউ চুল মেলে বসে আছে।

আজ এত বছর পরও, নানু নেই, সেই শৈশবও নেই। কিন্তু ঘরের কোণে রাখা এই ছোট্ট বাঁশঝাড়ের মিনিয়েচারটার দিকে তাকালে এখনো কানে বাজে নানুর সেই জর্দা চিবানোর আওয়াজ আর খিলখিল করে ওঠা পেত্নীর গল্প।



 বাঁশঝাড়ের পেত্নী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Wednesday, June 17, 2026

অব্যক্ত গোধূলি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মফস্বলের চেনা সকালগুলো শহরের মতো যান্ত্রিক নয়। এখানে কুয়াশা আর রোদের খেলা শেষ হতে না হতেই বাজারের শোরগোল শুরু হয়, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা চলে নিজের খেয়ালে। সরকারি সোনালী ব্যাংকের ছোট শাখাটিতে যেদিন আবিদ প্রথম পা রাখল, সেদিন তার বুকের ভেতর একটা অচেনা একাকীত্ব জেঁকে বসেছিল। শহরের ব্যস্ততম কর্পোরেট শাখা থেকে বদলি হয়ে এই শান্ত, কিছুটা অলস মফস্বলে আসাটা তার ক্যারিয়ারের জন্য হয়তো নিয়মমাফিক, কিন্তু মনের জন্য ছিল একরকম নির্বাসন।

কিন্তু সেই নির্বাসনের প্রথম দিনটাই বদলে গেল একটা চেনা চাবির গোছার শব্দে আর হালকা সুবাসে।

ম্যানেজারের রুম থেকে বের হতেই আবিদের চোখ আটকে গেল জানালার পাশে বসা ক্যাশ ইনচার্জের চেয়ারটিতে। সেখানে বসে আছেন নবনীতা। প্রথম দেখাতেই যে কারো মনে হবে, মফস্বলের ধুলোবালি আর ফাইলের স্তূপের মাঝে তিনি যেন এক টুকরো স্নিগ্ধ পদ্ম। নবনীতার রূপ কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন নয়, বরং শরৎকালের ভোরের শিউলি ফুলের মতো—যাতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে এক অদ্ভুত আত্মমর্যাদা। তার গায়ের রঙ যেন কাঁচা হলুদের সাথে সামান্য দুধ মেশালে যা হয়, ঠিক তেমন। টানা দুটো চোখ, যাতে মায়া আর পেশাদারিত্বের এক অপূর্ব সহাবস্থান। চুলে সাধারণ একটা খোঁপা, পরনে হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচলটি নিখুঁতভাবে কাঁধে পিন করা।

আবিদ খেয়াল করল, নবনীতার টেবিলের সামনে গ্রাহকদের ভিড়। কেউ টাকা তুলতে এসেছে, কেউ পেনশনের খোঁজ নিতে। নবনীতা অত্যন্ত শান্ত মুখে, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে প্রত্যেকের কাজ করে দিচ্ছেন। তার কথা বলার ধরণ এত চমৎকার যে, মনে হয় যেন ব্যাংকের জটিল হিসেব-নিকেশ নয়, তিনি কোনো কবিতার আবৃত্তি করছেন।

শাখায় কর্মকর্তা বলতে মাত্র কয়েকজন। দু-একদিনের মধ্যেই আবিদ জানতে পারল, তারা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে আবিদ চাকরিতে জয়েন করেছে এক ব্যাচ পরে, তাই সহকর্মী হিসেবে সে নবনীতার এক বছরের জুনিয়র। কিন্তু সম্প্রতি আবিদের পদোন্নতি হওয়ায় এখন দুজনেই সমপদস্থ—সিনিয়র অফিসার। এই সমতাটুকু আবিদের বুকের ভেতর একটা অজানা স্বস্তি এনে দিল। সে মনে মনে ভাবল, অন্তত পদমর্যাদার দেয়ালটা তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করতে পারবে না।

দিন যায়। মফস্বলের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো সন্ধ্যার পর পরই টিমটিম করে জ্বলতে শুরু করে। ব্যাংকের ব্যস্ততা শেষ হলে সবাই যার যার নীড়ে ফেরে।

আবিদ আবিষ্কার করল, নবনীতা একাধারে একটি ঘড়ির কাঁটা এবং একটি জলছবি। সে যেমন পেশাদারিত্বে অনড়, তেমনি সংসারী। নবনীতা বিবাহিত, তার একটি চার বছরের কন্যাসন্তান রয়েছে। লাঞ্চের বিরতিতে যখন অন্য অফিসাররা চা-সিগারেটের আড্ডায় মত্ত হয়, নবনীতা তখন ফোনের ওপাশে থাকা গৃহপরিচারিকা বা তার স্বামীর সাথে রাতের রান্নার মেন্যু কিংবা বাচ্চার স্কুলের ডায়রি নিয়ে কথা বলে। তার পৃথিবীটা এক সুতোয় বাঁধা—স্বামী, সন্তান, সংসার আর চাকরি।

আর আবিদ? আবিদ এই শহরে একেবারেই একা। একটা ছোট ছাদযুক্ত বাসা ভাড়া নিয়েছে সে। অফিস শেষ হওয়ার পর যখন মফস্বলের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়, আবিদের ঘরের একাকীত্ব তখন যেন তাকে গিলতে আসে। তার সঙ্গী বলতে কেবল কিছু পুরোনো বই, ডায়েরির পাতা আর কলমের কালি। সে কবিতা লেখে। মনের ভেতর জমে থাকা একরাশ অব্যক্ত কথা সে কাগজের বুকে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে উপশম খোঁজার চেষ্টা করে।

অফিসে প্রতিদিন আবিদ নবনীতাকে দেখে। মন ভরে দেখে। কম্পিউটারের স্ক্রিনের আড়াল থেকে, ফাইলের পাতা ওল্টানোর বাহানায়, কিংবা চা পানের মুহূর্তে। নবনীতার হাসির শব্দটা আবিদের কানে এসে লাগে বসন্তের বাতাসের মতো। যখন নবনীতা কপালে জমে থাকা চূর্ণ অলকগুলো বাম হাতের আঙুল দিয়ে কানের পিঠে গুজে দেয়, আবিদের মনে হয় দুনিয়ার সমস্ত সৌন্দর্য এই একটা ভঙ্গিমার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু আবিদ মন খুলে কথা বলতে পারে না। সমাজ, সংস্কার আর সহকর্মীর মধ্যকার অলিখিত একটা সীমারেখা তাকে আটকে রাখে। নবনীতা যখন কাজের প্রয়োজনে আবিদের ডেস্কে এসে দাঁড়ায়, গম্ভীর গলায় বলে,

 "আবিদ ভাই, এই এলসি ফাইলটা একটু চেক করে দেবেন?"

তখন আবিদ শুধু মাথা নাড়ে। তার মুখের ভাষা যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে হারিয়ে যায়। সে শুধু বোঝে, নবনীতা তার খুব কাছে দাঁড়িয়েও কোটি আলোকবর্ষ দূরের এক নক্ষত্র।

অপেক্ষারও একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সেই অপেক্ষা যখন হৃদয়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে।

এক রাতে বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন আবিদের হৃদয়ের একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সে ফেসবুকে স্ক্রোল করতে করতে আচমকাই নবনীতার প্রোফাইলে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। নবনীতার একটি একক ছবি—নীল শাড়ি পরা, ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেই চেনা স্নিগ্ধ চোখ, ঠোঁটে লেগে থাকা সেই চিরচেনা মায়াবী হাসি।

আবিদের ভেতরের কবিসত্তা আর নিয়মে বাঁধা রইল না। সে ছবিটি ডাউনলোড করল। তারপর টেবিলের ল্যাম্পটি জ্বেলে খাতা কলম নিয়ে বসল। কলমের ডগা দিয়ে ঝরে পড়তে লাগল তার হৃদয়ের সমস্ত নির্যাস। সে লিখল:

 "তুমি যেন মফস্বলের এক চিলতে রোদ,
ফাইলের স্তূপে ঢাকা পড়া এক আলতো প্রমোদ।
 তোমার চোখের ওই শান্ত দিঘির জলে,
 আমার একাকীত্বের নাও ভাসি অবহেলে।
 তুমি অন্য কারোর আকাশ, অন্য কারোর ঘর,
 আমি দূর হতে দেখা এক যাযাবর।"

কবিতাটি শেষ করে আবিদের বুকটা হালকা হলো, আবার এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে আর ভাবল না। মধ্যরাতের সেই মোহগ্রস্ত মুহূর্তে কবিতাটি নবনীতার ইনবক্সে পাঠিয়ে দিল।

পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আবিদের পা কাঁপছিল। যদি নবনীতা রেগে যায়? যদি কথা বলা বন্ধ করে দেয়?

দুপুরের দিকে আবিদের ফোনে মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠল। বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে সে চ্যাটবক্স খুলল। নবনীতা লিখেছে:

 "বাহ্ আবিদ ভাই! আপনি এত সুন্দর কবিতা লেখেন তা তো জানতাম না। ছবিটার সাথে লাইনগুলো দারুণ মানিয়েছে। ধন্যবাদ আপনার এই সুন্দর উপহারের জন্য।"

আবিদের মুখে একটা মলিন হাসি ফুটে উঠল। প্রশংসা! হ্যাঁ, নবনীতা একজন গুণী পাঠকের মতোই কবিতাটির প্রশংসা করেছে। কিন্তু আবিদের মন তাতে ভরল না। কারণ নবনীতা কবিতাটির ভেতরের হাহাকারটুকু দেখল না, বা হয়তো দেখেও না দেখার ভান করল। সে শুধু শব্দের কারুকার্য দেখল, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জলন্ত প্রেমকে স্পর্শ করল না।

এই ঘটনার পর থেকে আবিদের মুগ্ধতা যেন এক তীব্র নেশায় পরিণত হলো। সে এখন শুধু নবনীতাকে দেখেই শান্ত থাকে না, সে নবনীতার সময়ের প্রত্যাশী হয়ে ওঠে। যদি কোনোদিন নবনীতা একটু আগে আসে, কিংবা কোনো ফাইলের জটিলতা নিয়ে আবিদের ডেস্কে এসে বসে একটু বাড়তি সময় কাটায়—আবিদের মনে হয় সেই দিনটাই তার জীবনের সেরা দিন।

আবিদের ডায়েরি এখন শুধু নবনীতার উপমায় ভরা। সে এক জায়গায় লিখল:

 "নবনীতা হলো সেই গোধূলি, যা ক্ষণিকের জন্য আকাশকে রাঙিয়ে দিয়ে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। আর আমি হলাম সেই অন্ধকার, যা প্রতিদিন আলোর প্রত্যাশায় মরেও আবার বেঁচে ওঠে।"

প্রেমের এই অনুভূতি যেমন সুন্দর, তেমনি এর বিরহ বড়ো ভয়ানক। যখন আবিদ দেখে অফিস শেষে নবনীতার স্বামী স্কুটি নিয়ে ব্যাংকের সামনে এসে দাঁড়ায়, নবনীতা মুখে একরাশ ক্লান্তি মুছে চওড়া হাসি নিয়ে স্বামীর পেছনে গিয়ে বসে, তখন আবিদের বুকের ভেতরটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এই বিরহ কোনো ঝড়ের মতো নয় যে সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে; এই বিরহ হলো উইপোকার মতো, যা ভেতর থেকে আস্তে আস্তে একজন মানুষকে খাবে।

আবিদ জানে তার এই চাওয়া কোনোদিন পূর্ণ হবার নয়। সমাজ একে স্বীকৃতি দেবে না, নবনীতার সাজানো সংসারে এর কোনো স্থান নেই। সে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো, যার ভাগ্যে পূর্ণতা নেই, কেবলই ক্ষয়। তবু আবিদের মন মানে না। সে কোনো অধিকার চায় না, সে নবনীতার সাজানো সংসার ভাঙতে চায় না। সে শুধু চায় তার মনের এই জমানো কথাগুলো, এই গভীর অব্যক্ত ভালোবাসা একবার নবনীতাকে মুখোমুখি বসে বলতে।


ব্যাংকের অডিট চলছে। প্রতিদিন রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে সবাইকে। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য অফিসাররা যে যার ডেস্কে ব্যস্ত।

আবিদ তার কেবিন থেকে কাঁচের দেয়ালের ওপাশে তাকাল। নবনীতা ভাউচার মেলাচ্ছে। টেবিলের ল্যাম্পের আলোটা তার মুখে এসে পড়েছে। ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো কিছুটা বুজে আসছে, কিন্তু ঠোঁটের সেই দৃঢ়তা এখনো কমেনি। কপালের টিপটা সামান্য সরে গেছে, যেন একটা চ্যুত নক্ষত্র।

আবিদ এক কাপ কফি নিয়ে নবনীতার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কফির কাপটা আলতো করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, "খুব ক্লান্ত লাগছে? একটু কফি খান।"

নবনীতা চমকে চোখ তুলল। তারপর এক গাল হেসে বলল, "ধন্যবাদ আবিদ ভাই। সত্যি খুব দরকার ছিল।"

আবিদ চেয়ার টেনে বসল। আজ তার বুকের ভেতর এক অন্যরকম সাহস কাজ করছে। সে নবনীতার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে মায়া আছে, কিন্তু সেখানে আবিদের জন্য কোনো ব্যাকুলতা নেই। সেখানে আছে কেবল একজন সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা আর সৌজন্য।

"নবনীতা," আবিদ প্রথমবার তার নামের সাথে 'আপা' বা 'দিদি' কিছুই যোগ করল না।

নবনীতা কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে থামল। কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।

আবিদ জানালার বাইরে তাকাল। মফস্বলের রাত এখন নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও একটা রাতজাগা পাখি ডাকছে। আবিদ মৃদু গলায় বলল, "কিছু কথা থাকে যা বুকের ভেতর জমতে জমতে পাথর হয়ে যায়। সেই পাথরটা বুকের ওপর চেপে বসে থাকলে নিঃশ্বাস নেওয়া যায় না।"

নবনীতা কফির কাপটা নামিয়ে রাখল। তার মুখটা গম্ভীর হলো, কিন্তু চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। সে বলল, "কিছু পাথরকে বুকেই বয়ে বেড়াতে হয় আবিদ ভাই। ওগুলো নামাতে গেলে পায়ের তলার মাটিটাই সরে যেতে পারে।"

আবিদ স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝল, নবনীতা অবুঝ নয়। একজন নারীর মন তার প্রতি তৈরি হওয়া অন্য পুরুষের ভালোলাগার সুবাস ঠিকই টের পায়। নবনীতা কবিতাটির মানে বুঝেছিল, প্রতিদিন আবিদের চেয়ে থাকার অর্থও সে জানে। কিন্তু সে তার সংসারের লক্ষ্মণরেখাটি খুব ভালো করেই চেনে।

আবিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, যা ল্যাম্পের আলোয় ধরা পড়ল না। সে হাসার চেষ্টা করে বলল, "আমি তো কিছু চাচ্ছি না নবনীতা। শুধু সময়ের অপেক্ষা করছি। এমন একটা সময়, যখন আপনি শুধুই একজন শ্রোতা হবেন, আর আমি আমার মনের সব জমানো কথা বলে হালকা হবো।"

নবনীতা উঠে দাঁড়াল। তার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "অডিট শেষ হতে আর দুদিন লাগবে। তারপর একটা রোববার দেখে লাঞ্চের পর আপনাকে আধা ঘণ্টা সময় দেবো। সেদিন অফিসের সহকর্মী হিসেবে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের বন্ধু হিসেবে আপনার সব কথা শুনবো। কেমন?"

নবনীতা চলে গেল। তার শাড়ির খশখশ শব্দ আর চাবির রিংয়ের আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল করিডোরে।

আবিদ একা বসে রইল সেই সুনসান ব্যাংকের আলো-আঁধারিতে। তার মনের অব্যক্ত ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সে আধা ঘণ্টার এক খণ্ড আকাশ পেয়েছে। সে জানে, এই আধা ঘণ্টাই তার সারাজীবনের বিরহ কাটানোর সম্বল হয়ে থাকবে। সে এখন সেই রবিবারের অপেক্ষায়, এক বুক প্রেম আর এক ফোঁটা চাতকের তৃষ্ণা নিয়ে।



Saturday, June 6, 2026

'যাপিত জীবনের কথা' বইয়ের ভূমিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


ভূমিকা: স্মৃতির ক্যানভাসে ফিরে দেখা

সময় এক বহমান নদী। তার কোনো থমকে যাওয়া নেই, ক্লান্তি নেই। নদীর বুকে যেমন পলি জমে, মানুষের বুকেও তেমনি জমে ওঠে অজস্র স্মৃতির রেণু। জীবনের একটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়—এই যে চেনা-অচেনা, আলো-ছায়ার দিনগুলো পার করে এলাম, তার সবটুকুই কি কেবলই সময় পার করা? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে কোনো অলিখিত মহাকাব্য, যা একান্তই আমার, অথচ যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এই চেনা সমাজ, চেনা মানুষ আর চেনা প্রকৃতি?

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সেই অমিয় বাণী—"নিজেকে জানো"—আমার জীবনের এক পরম নির্দেশক। যুগে যুগে মানুষ নিজেকে খোঁজার জন্য কত পথ পাড়ি দেয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, নিজেকে জানার সেই নিরন্তর প্রচেষ্টারই একটি লিখিত রূপ হলো এই আত্মজীবনী। নিজের ভেতরের আলো-আঁধারিকে চেনা, নিজের সীমাবদ্ধতা আর সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করার এই যে মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা, 'যাপিত জীবনের কথা' মূলত তারই এক বিনীত প্রকাশ।

তাই এটি কোনো আত্মশ্লাঘা বা নিজের মহিমা কীর্তনের দলিল নয়। এটি যেমন আমার আত্মআবিষ্কারের জার্নি, তেমনি আমার জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের গল্প। এই দীর্ঘ পথে আমি যেমন সফলতার দেখা পেয়েছি, তেমনি মুখোমুখি হয়েছি চরম সংকট, হতাশা আর কঠিনতম সময়ের। কিন্তু সেই কষ্টের দিনগুলোতে কীভাবে ধৈর্যের হাতটি শক্ত করে ধরে রাখতে হয়, কীভাবে ঝড়ের মধ্যেও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমি খুব কাছ থেকে অর্জন করেছি। আমার বিশ্বাস, জীবনের এই যন্ত্রণাদগ্ধ অধ্যায়গুলো এবং তা থেকে উত্তরণের গল্পগুলো যদি সততার সাথে প্রকাশ করা যায়, তবে তা হয়তো অন্য কোনো পথহারা বা সংগ্রামী মানুষকে একটুখানি আলো দেবে, একটুখানি ধৈর্য ধরার সাহস জোগাবে। অন্যের জীবনের লড়াইয়ে যদি আমার এই অভিজ্ঞতা বিন্দুমাত্র সহায় হতে পারে, তবেই এই লেখার মূল সার্থকতা।

১৯৯০ সালের সেই চেনা মফস্বল বা গ্রামের চাদরে মোড়ানো শৈশব থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সেই মুখরিত করিডোর, হল জীবনের মধ্যরাতের আড্ডা, লাইব্রেরির বইয়ের গন্ধ—সবকিছুই আমার মনন ও চিন্তার জগতকে গড়ে তুলেছে। পরবর্তীতে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের একজন সদস্য হিসেবে ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের চোখে যখন সম্ভাবনার আলো দেখেছি, তখন বারবার মনে হয়েছে—শিক্ষা কেবল পেশা নয়, এটি এক পরম ব্রত।

একদিকে ক্লাসরুমের দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে সৃজনশীলতার তাগিদে কবিতার শব্দবুনন কিংবা সামাজিক বাস্তবতার পটভূমিতে উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টি—এই দুইয়ের দোলাচলেই কেটেছে আমার দিনরাত্রি। কখনো লালন সাঁইয়ের পরম সত্যের সন্ধান, কখনো এ দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের জটিল বাঁকগুলো নিয়ে গবেষণার টেবিলে নির্ঘুম রাত পার করা—সবকিছুই এই যাপিত জীবনের একেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই পথচলায় আমার মা-বাবা, আমার জীবনসঙ্গী, এবং আমার সন্তানেরা আমাকে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে ভালোবাসার বন্ধনে, তা ছাড়া আমি আজ যা কিছু, তার কোনো কিছুই পূর্ণতা পেত না।

স্মৃতি বড়ই প্রবঞ্চক। মাঝে মাঝে সে বড় বেশি ধূসর হয়ে যায়, আবার কখনো কখনো এক ফালি রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে মনের জানালায় এসে কড়া নাড়ে। সেই কড়া নাড়ার শব্দগুলোকেই, নিজের ভেতরের সত্যকে চেনার প্রয়াস আর জীবনদর্শনকেই এক মলাটের ভেতর ধরে রাখার চেষ্টা করেছি এখানে।

সবাইকে আমন্ত্রন আমার যাপিত জীবনের অন্দরমহলে। আসুন, এই স্মৃতির পথ ধরে আমরা সবাই একবার নিজের ভেতরে তাকাই।



'যাপিত জীবনের কথা' বইয়ের ভূমিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Thursday, June 4, 2026

অদেখার আগুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ফেসবুকের নীল পর্দার ওপারে নীল রঙের বাতিটা জ্বলে উঠলেই দুটোর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দোলাচল শুরু হয়। শহরের কোলাহল থেমে যাওয়া নিঝুম রাতে, যখন ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই, চারদিকের নীরবতা ভেঙে মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ওঠে কিছু শব্দ। সেই শব্দগুলোই যেন দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের মাঝে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য মায়াবী সেতু।

একজন ‘নীলকণ্ঠ’, আর অন্যজন ‘মেঘা’। দুটোই ছদ্মনাম। গত ছয়টি মাস ধরে তাদের দিন শুরু হয় একে অপরের ‘শুভ সকাল’ দিয়ে, আর রাত শেষ হয় ইনবক্সের চ্যাটবক্সে সুখ-দুঃখের গল্প বুনে। সকালের প্রথম আলো থেকে রাতের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত—অফিসের ক্লান্তি, বৃষ্টির আনন্দ, প্রিয় বইয়ের আলোচনা কিংবা হঠাৎ মন খারাপের গল্প; সবকিছুই ভাগাভাগি হয় দুজনের মধ্যে।

তারা কেউ কাউকে দেখেনি, কেউ কারও কণ্ঠও শোনেনি। জানে না একে অপরের হাঁটার ভঙ্গি, হাসির ধরন কিংবা চোখের ভাষা। প্রোফাইল পিকচারে নীলকণ্ঠের দেওয়া আছে একটা গিটারের ছবি, আর মেঘার আইডিতে একরাশ কৃষ্ণচূড়া ফুল। যতটুকু পরিচয়, যতটুকু চেনা—সবটাই ওই চ্যাটের কিবোর্ডে টাইপ হওয়া শব্দের ফ্রেমে বন্দী। অথচ প্রতিদিনের ক্লান্তি আর একাকীত্বের মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি না করলে তাদের যেন দিনটাই কাটতে চায় না।

তারা বন্ধু নাকি তার চেয়েও বেশি, কিংবা কেউ কারও প্রেমে পড়েছে কি না—তা নিজেরাও নিশ্চিত নয়। কোনো দিন কয়েক ঘণ্টা মেঘার কোনো খবর না পেলে নীলকণ্ঠ অস্থির হয়ে উঠত। আবার যখন মেঘা ফিরে এসে বলত, "আজ খুব ব্যস্ত ছিলাম", তখন অদ্ভুত এক স্বস্তি নেমে আসত তার মনে। নীলকণ্ঠ রাতে ঘুমানোর আগে ভাবত, “আজ মেঘা মেসেজ দিতে একটু দেরি করল, মেয়েটা কি আমাকে মিস করছিল?”

ওদিকে মেঘাও জানালার বাইরে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ভাবত, “ছেলেটি কি একটু বেশি ভাবছে আমাকে? কথার ফাঁকে ফাঁকে ও যেভাবে আমার সামান্য মন খারাপের কথা বুঝে ফেলে, ও কি আমার ভাবনায় হারিয়ে গেছে?”

কিন্তু তারা কেউই এই গোলকধাঁধার উত্তর খুঁজতে সাহস পেত না। বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে এই ভার্চুয়াল মায়ার শেষ কোথায়, তা তাদের দুজনেরই অজানা। অদেখা সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই অনিশ্চয়তাই।

সেদিন ছিল এক বর্ষণমুখর রাত। জানালার বাইরে ঝুম বৃষ্টি, আর ইনবক্সে জমে উঠেছে তাদের চিরচেনা কথার মেলা। কথা বলতে বলতে কখন যেন হালকা চালের আলাপটা বেশ গভীরে চলে গেল। কথার সেই গভীরতায় হঠাৎ যেন মেঘার মনে এক অদ্ভুত জড়তা ভর করল। সে একটু গম্ভীর হয়ে টাইপ করল:

 “শুনুন নীলকণ্ঠ, এই যে এক অদেখা আকর্ষণ... এর পেছনে নিজেকে পুড়িয়ে খাক করবেন না প্লিজ। আমি কাউকে এভাবে পোড়াতে চাই না।”

নীলকণ্ঠ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। বুকে এক মৃদু ধাক্কা লাগল। একটি বাক্য কখনও কখনও অনেক দীর্ঘ নীরবতার জন্ম দেয়। তার মনে পড়ল, কয়েকদিন আগেই মেঘা কথায় কথায় বলেছিল, সে নাকি আজকাল একজনকে খুব মিস করে। নীলকণ্ঠ এতদিন মনে মনে নিজেকেই সেই ‘একজন’ ভেবে বসে ছিল। মেঘার এই হঠাৎ দূরত্ব তৈরির চেষ্টা দেখে নীলকণ্ঠের মনে হলো, তবে কি সে ভুল ভাবছিল?

একটু বিষণ্ণ হেসে নীলকণ্ঠ উত্তর দিল:

“তার মানে, আপনি কিছুদিন আগে যাকে মিস করার কথা বলেছিলেন... সেই ব্যক্তিটি আমি নই, তাই তো?”

মেঘা ওপাশ থেকে ‘টাইপিং...’ দেখাচ্ছিল, কিন্তু কোনো মেসেজ পাঠাল না। স্ক্রিনের ওপারে নীরবতা জমতে লাগল। নীলকণ্ঠ আবার লিখল:

“আচ্ছা, আপনি আমাকে পোড়াতে চান না বুঝলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে... আপনি নিজে কি পুড়তে চান?”

এবারও কোনো উত্তর এল না। শুধু দেখা গেল, মেঘা অনলাইনে আছে আর মেসেজটা ‘Seen’ হয়ে পড়ে আছে। সে যেন নীলকণ্ঠকে এক অদ্ভুত উত্তরের অপেক্ষায় ঝুলিয়ে রেখে দিল। ওপারে বসে মেঘা হয়তো নিজের মনের সাথেই যুদ্ধ করছিল; হয়তো উত্তর খুঁজছিল, কিংবা নিজের কাছেই কিছু স্বীকার করতে পারছিল না।

সেই ভারী নীরবতাকে ভাঙল নীলকণ্ঠই। চ্যাটবক্সে শেষবারের মতো আঙুল চালিয়ে কবিসুলভ একটা বাক্য লিখে পাঠাল সে:

  “পাখিদের জানতে হয় উড়তে, আর কবিদের জানতে হয় পুড়তে।”

মেসেজটা পড়েই ওপারে মেঘার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান কিন্তু গভীর হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত টাইপ করল:

“উফ! একদম আটকে দিলেন তো। কথার জালে এভাবে আটকে দেওয়াটা অন্যায়।”

শুধু ওই দুটি শব্দ—‘আটকিয়ে দিলেন’। কিন্তু তার ভেতর কত অনুভূতি লুকিয়ে ছিল, তা কেউ জানেনা। মেঘা হয়তো সত্যিই আটকে গিয়েছিল। কথার জালে, অনুভূতির কাছে, নাকি এমন এক সত্যের সামনে—যা উচ্চারণ করলে সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে যেতে পারত?

নীলকণ্ঠ আর কথা বাড়াল না। মেঘার এই ‘আটকে যাওয়া’র মাঝেই সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পেল। রহস্যটা রহস্যই থাক, মায়াটা আরও একটু গাঢ় হোক। সে বিদায়ের একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাল:

“আজকের মতো তবে আসি। শুভরাত্রি, ভালো থাকবেন।”

ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে নীলকণ্ঠ যখন অন্ধকারের দিকে তাকাল, তখন তার ঠোঁটে একটা স্মিত হাসি। ওদিকে মেঘা ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সে ভাবল, কিছু মানুষকে না দেখেও বোধহয় এতটা গভীরভাবে চেনা যায়।

রাত আরও গভীর হলো, কিন্তু দুই মানুষের ভেতরে জন্ম নেওয়া প্রশ্নগুলো ঘুমাল না। আসলে কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয়না, কিছু অনুভূতির কোনো স্বীকৃতি লাগে না। কিছু মানুষ জীবনে আসে, খুব কাছে চলে আসে, অথচ দূরত্বের সব নিয়ম অক্ষুণ্ণ থাকে।

তারা শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়েছিল কি না, তা আজও জানা যায়নি। কিন্তু সেই রাতের পর দুজনেই বুঝেছিল—অদেখা মানুষও কখনও কখনও হৃদয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান সত্য হয়ে উঠতে পারে। আর কিছু আগুন আছে, যা জ্বলে ওঠে কোনো স্পর্শ ছাড়াই; শুধু কিছু শব্দ, কিছু অপেক্ষা আর কিছু অসমাপ্ত উত্তরের ভেতর।

এক টুকরো অদেখা আকর্ষণ আর উত্তরের অপেক্ষায় থাকা একটা প্রশ্ন নিয়ে তাদের গল্পটা আসলে চলতেই থাকল... পর্দার ওপারে, মনের গভীরে।





অদেখার আগুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Monday, June 1, 2026

আমার জন্ম ও পরিচয় -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

১৯৯০ সালের জানুয়ারী মাসের ১তারিখ সার্টিফিকেট অনুযায়ী জন্ম।