Sunday, June 21, 2026

বাঁশঝাড়ের পেত্নী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাঁশঝাড়টা দিনের বেলাতেও কেমন যেন একটা থমথমে ছায়া ফেলে রাখত। সন্ধ্যার পর সেখানে অন্ধকার জমাট বাঁধলে মনে হতো, ওটা আর কেবল গাছের ঝাড় নয়—জীবন্ত কোনো রহস্যের আস্তানা।

ঠিক সেইরকম এক অন্ধকার রাতে নানু আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে বারান্দায় বসতেন। কাঁসার থালায় দুধকলা দিয়ে ভাত মেখে যখন আমাদের মুখে লোকমা তুলে দিতেন, তখনই শুরু হতো আসল জাদু। নানু তার বড় বড় চোখ জোড়া আরও বড় করে বলতেন, "শোন, তোদের বড়ব্বা হারিকেন জ্বালিয়ে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াতেন..."

কথাটা শোনা মাত্রই আমাদের তলপেটে একটা কঠিন মোচড় দিতো। মুখের খাবার চিবোতে ভুলে গিয়ে আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। পরের লাইনে কী আছে, তা জিজ্ঞেস করতেও বুক কাঁপত। নানু আমাদের মনের অবস্থা বুঝে একটু হাসতেন, তারপর বিশাল এক ভাব নিয়ে বলতেন, "একটু খানি বোস, একটা পান মুখে দিয়ে আসি।"

আমরা তখন প্রমাদ গুনতাম। হায় হায়! গল্পের এই মোক্ষম সময়েই নানুর পান পিপাসা পেতে হলো?

নানু ঘরের কোণ থেকে তার চেনা পানের বাটাটা টেনে নিতেন। তারপর বিখ্যাত হাকিমপুরী জর্দা দিয়ে একটা ঢাউস সাইজের পান মুখে পুরে পুনরায় গল্পের আঞ্জাম দিতেন, "কোথায় যেন ছিলাম?"

আমরা ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিতাম, "বড়ব্বা হারিকেন নিয়ে..."

"হ হ, মনে পড়ছে," নানু জর্দামিশ্রিত পান চিবোতে চিবোতে শুরু করতেন, "তোদের বড়ব্বা যেইনা নদীর পাড়ের ওই বাঁশঝাড়ের নিচে পা বাড়িয়েছেন, অমনি চারপাশটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বন্ধ, হারিকেনের আলোটাও দপ করে একটু কমে গেল। বড়ব্বা ওপরের দিকে তাকাতেই দেখলেন—এক পেত্নী বাঁশঝাড়ের একদম মগডালে বসে আছে! তার কুচকুচে কালো লম্বা চুল ওপর থেকে একদম মাটি পর্যন্ত বিছানো!"

আমরা তখন ভয়ে একজন আরেকজনের গায়ে গা লাগিয়ে লেপ্টে বসতাম। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত। কোনোমতে ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করতাম, "বড়ব্বা... বড়ব্বা ভয় পায়নি নানু?"

নানু তখন পিক ফেলার জন্য একটু থামতেন। মুখে একটা বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে খুব গর্ব করে বলতেন, "আরে না! তোদের বড়ব্বা কি তেমন তেমন লোক? ওনার কোমরে গোঁজা থাকত খাঁটি লোহার একটা ছোরা। ভূত-পেত্নী নাকি লোহা দেখলে যমের মতো ভয় পায়!"

নানু বলতে লাগলেন, "বড়ব্বা এক চুলও না নড়ে গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন, 'কে রে ওখানে? ভালো চাস তো রাস্তা ছাড়!' কিন্তু পেত্নী কি আর অত সহজে শোনে? সে ওপর থেকে এক খিলখিল হাসিতে চারপাশ কাঁপিয়ে তুলল, আর নিজের লম্বা চুলগুলো দিয়ে বড়ব্বার হারিকেনটা আড়াল করার চেষ্টা করল।"

আমরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। নানু বলে চললেন, "বড়ব্বা তখন আর দেরি করলেন না। কোমর থেকে চট করে সেই লোহার ছোরাটা বের করে হারিকেনের আলোয় চকচকে ফলাটা পেত্নীর দিকে তাক করলেন। লোহা দেখামাত্রই পেত্নীর সেই খিলখিল হাসি কান্নায় মোড় নিল। সে এক ঝটকায় তার চুলগুলো গুটিয়ে নিয়ে শাঁ করে বাঁশঝাড়ের ওপারে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিকের বাঁশগুলো মটমট করে এমনভাবে নড়ে উঠেছিল, যেন এখনই ভেঙে পড়বে! কিন্তু তোদের বড়ব্বা বুক ফুলিয়ে, সেই হারিকেন দুলিয়ে দুলিয়ে হেঁটে ঠিক বাড়ি ফিরে এলেন।"

গল্প শেষ হতো, কিন্তু আমাদের বুকের ধকধকানি থামত না। ভাত খাওয়া শেষে যখন শোবার ঘরে যেতাম, জানালার ফাঁক দিয়ে দূরের সেই বাঁশঝাড়ের দিকে তাকালে মনে হতো—সত্যিই বুঝি কোনো এক জোছনা রাতে বা অমাবস্যার অন্ধকারে সেখানে কেউ চুল মেলে বসে আছে।

আজ এত বছর পরও, নানু নেই, সেই শৈশবও নেই। কিন্তু ঘরের কোণে রাখা এই ছোট্ট বাঁশঝাড়ের মিনিয়েচারটার দিকে তাকালে এখনো কানে বাজে নানুর সেই জর্দা চিবানোর আওয়াজ আর খিলখিল করে ওঠা পেত্নীর গল্প।



 বাঁশঝাড়ের পেত্নী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

No comments:

Post a Comment