কোথাও আলো-বাতাস নেই—এমন একটি বদ্ধ ঘরে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় বসে আছে সুনয়না। বসে আছে বলা ঠিক নয়; জোর করে তুলে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। শেষ বিকেলে বাড়ির পাশের সবুজ মাঠে একা একা পায়চারি করছিল সে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ চোখ বেঁধে নেয়, তারপর আর কিছু মনে নেই।
চোখ খুলতেই অন্ধকার। কোথায় আছে, কয়টা বাজে—কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ভয়ে কান্না শুরু করে সে, কিন্তু মুখ বাঁধা। চোখের জল গড়িয়ে পড়লেও শব্দ শোনার সুযোগ নেই। প্রাণপণে চিৎকার করতে চাইছে, ঠিক তখনই চোখে পড়ল এক চিলতে নিয়ন আলো।
আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল একটি পরিচিত মুখ—রায়হান।
মুহূর্তের জন্য সাহস ফিরে পেল সুনয়না। কিন্তু রায়হানের কণ্ঠ শুনেই আবার কুঁকড়ে গেল সে।
—ভয় পেয়ো না, সুনয়না। তোমার কোনো ক্ষতি করব না।
সে একই কথা বারবার বলে যাচ্ছে। সুনয়না কান্না করতে করতে বাঁধন খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু কোনো লাভ নেই। রায়হান এগিয়ে এসে মুখের বাঁধন খুলে দিলে সে চিৎকার করে ওঠে—
আর ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে যায়।
ভয়ে তখনও শরীর কাঁপছে। শীতের সকাল, অথচ কপালে জমে আছে ঘাম।
অনেকক্ষণ বিছানায় বসে থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে সুনয়না ধীরে ধীরে কিচেনে যায়। প্রচণ্ড চায়ের তৃষ্ণা। সাধারণত সে আটটার আগে ওঠে না, আর নিজ হাতে চা বানানো তো দূরের কথা। কিন্তু আজ নিজেই এক মগ চা বানিয়ে গায়ে চাদর জড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের রক্তিম আলো শিশিরভেজা ঘাসে পড়ে ঝিলমিল করছে। নামাজ শেষে মুসল্লিরা ঘরে ফিরছে, আর কুয়াশার চাদর গায়ে মেখে খেটে খাওয়া মানুষগুলো বেরিয়ে পড়ছে কাজে। রাস্তায় হাঁটতে থাকা দু-একটি কুকুর মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ করছে।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে সুনয়না ভাবছে তার স্বপ্নের কথা। ভাবলেই শরীর শিহরিয়ে ওঠে।
কেন এমন স্বপ্ন দেখল?
রায়হানের সঙ্গে তো তার সম্পর্ক ভালো। কোনো রাগ, কোনো অশোভন কথা—কিছুই নয়। তাহলে এমন ভয়ংকর স্বপ্ন কেন?
দাদীর কথা মনে পড়ে। স্বপ্নের কথা বললে দাদী বলতেন—
“স্বপ্ন তো স্বপ্নই মা, বেশি ভাবিস না।”
ঠিক তখনই মোবাইলের টুং টাং শব্দ। রায়হানের মেসেজ—
Good morning.
সুনয়না রিপ্লাই দেয়। আজ অকারণেই কথোপকথন একটু দীর্ঘ হয়। স্বপ্নের কথা জানালে রায়হান আগ্রহ দেখালেও সে এড়িয়ে যায়।
দিন গড়িয়ে যায়। দুপুরে পরিবারের সঙ্গে খাওয়া, আড্ডা—সবই স্বাভাবিক। কিন্তু সুনয়নার ভেতরে কোথাও যেন একটা অদৃশ্য অস্বস্তি জমে থাকে।
রাতে আবার রায়হানের মেসেজ আসে। সে জানায়, কয়েকদিনের জন্য গ্রামে যাচ্ছে। নিয়মমাফিক কথাবার্তা শেষ হয়।
প্রায় পনের দিন পর রায়হান ফিরে এসে দেখা করার প্রস্তাব দেয়।
প্রস্তাবটা পড়েই সুনয়নার মনে আবার স্বপ্নটা ফিরে আসে।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর সে স্বপ্নের কথা বলে ফেলে।
রায়হানের উত্তরের মেসেজটা যেন হঠাৎ অন্ধকার ঘরের দরজা খুলে দেয়—
“ভয়ের কী আছে সুনয়না? সুন্দর স্বপ্নই তো দেখেছো। সত্যি যদি তোমাকে এমন করে কাছে রাখতে পারতাম, সারাক্ষণ দেখতে পারতাম—কতো ভালো হতো।”
সুনয়নার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। বুকের ভেতর কেমন একটা চাপ।
সে আর কোনো রিপ্লাই দেয় না। মোবাইলটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করে।
কিন্তু ঘুম আসে না।
পরের কয়েকদিন সুনয়না ইচ্ছে করেই রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। নিজেকেই বোঝাতে থাকে—
“ও এমন না। আমি অযথা ভাবছি।”
কিন্তু রায়হানের প্রতিটি নতুন মেসেজে কোথাও যেন অদ্ভুত এক অধিকারবোধ টের পায় সে।
—তুমি কোথায় গেলে বললে না কেন?
—আজ সারাদিন অনলাইনে ছিলে না কেন?
—তুমি কি আমাকে এড়িয়ে চলছো?
এই প্রশ্নগুলো সরাসরি অভিযোগ নয়, কিন্তু প্রশ্নের ভেতরে একটা অদৃশ্য চাপ আছে।
একদিন সাহস করে সুনয়না লিখে ফেলে—
“রায়হান, তুমি কি কখনো ভেবেছো, কাউকে খুব ভালোবাসার মানে তাকে বন্দি করে রাখা নয়?”
অনেকক্ষণ কোনো রিপ্লাই আসে না।
তারপর আসে মাত্র এক লাইন—
“আমি শুধু তোমাকে হারাতে চাই না।”
সুনয়না বুঝে যায়, সমস্যাটা ঠিক এখানেই।
ভালোবাসা হারানোর ভয় থেকেই জন্ম নেয় দখলদারিত্ব।
আর দখলদারিত্ব শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাকে কারাগারে পরিণত করে।
সেদিন রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুক্ত আকাশ। কোথাও কোনো দেয়াল নেই।
হঠাৎ মনে হয়—
সে আর আবদ্ধ থাকতে চায় না।
না স্বপ্নে, না বাস্তবে।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে শেষবারের মতো টাইপ করে—
“রায়হান, আমি বিশ্বাসে বাঁচতে চাই, ভয় নিয়ে নয়।”
পাঠানোর পর এক অদ্ভুত হালকা অনুভূতি আসে তার ভেতরে।
সুনয়না জানে না সামনে কী হবে।
কিন্তু সে এটুকু জানে—
ভালোবাসা কখনো তালাবদ্ধ ঘরের ভেতর জন্মায় না।
আবদ্ধ
ভালোবাসা মুক্ত করে দিতে হয়। পরের পর্ব কবে পড়তে পারবো?
ReplyDelete