Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Wednesday, March 11, 2026

আবদ্ধ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

কোথাও আলো-বাতাস নেই—এমন একটি বদ্ধ ঘরে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় বসে আছে সুনয়না। বসে আছে বলা ঠিক নয়; জোর করে তুলে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। শেষ বিকেলে বাড়ির পাশের সবুজ মাঠে একা একা পায়চারি করছিল সে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ চোখ বেঁধে নেয়, তারপর আর কিছু মনে নেই।

চোখ খুলতেই অন্ধকার। কোথায় আছে, কয়টা বাজে—কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ভয়ে কান্না শুরু করে সে, কিন্তু মুখ বাঁধা। চোখের জল গড়িয়ে পড়লেও শব্দ শোনার সুযোগ নেই। প্রাণপণে চিৎকার করতে চাইছে, ঠিক তখনই চোখে পড়ল এক চিলতে নিয়ন আলো।

আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল একটি পরিচিত মুখ—রায়হান।

মুহূর্তের জন্য সাহস ফিরে পেল সুনয়না। কিন্তু রায়হানের কণ্ঠ শুনেই আবার কুঁকড়ে গেল সে।

—ভয় পেয়ো না, সুনয়না। তোমার কোনো ক্ষতি করব না।

সে একই কথা বারবার বলে যাচ্ছে। সুনয়না কান্না করতে করতে বাঁধন খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু কোনো লাভ নেই। রায়হান এগিয়ে এসে মুখের বাঁধন খুলে দিলে সে চিৎকার করে ওঠে—

আর ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে যায়।

ভয়ে তখনও শরীর কাঁপছে। শীতের সকাল, অথচ কপালে জমে আছে ঘাম।

অনেকক্ষণ বিছানায় বসে থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে সুনয়না ধীরে ধীরে কিচেনে যায়। প্রচণ্ড চায়ের তৃষ্ণা। সাধারণত সে আটটার আগে ওঠে না, আর নিজ হাতে চা বানানো তো দূরের কথা। কিন্তু আজ নিজেই এক মগ চা বানিয়ে গায়ে চাদর জড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।

শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের রক্তিম আলো শিশিরভেজা ঘাসে পড়ে ঝিলমিল করছে। নামাজ শেষে মুসল্লিরা ঘরে ফিরছে, আর কুয়াশার চাদর গায়ে মেখে খেটে খাওয়া মানুষগুলো বেরিয়ে পড়ছে কাজে। রাস্তায় হাঁটতে থাকা দু-একটি কুকুর মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ করছে।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে সুনয়না ভাবছে তার স্বপ্নের কথা। ভাবলেই শরীর শিহরিয়ে ওঠে।

কেন এমন স্বপ্ন দেখল?
রায়হানের সঙ্গে তো তার সম্পর্ক ভালো। কোনো রাগ, কোনো অশোভন কথা—কিছুই নয়। তাহলে এমন ভয়ংকর স্বপ্ন কেন?

দাদীর কথা মনে পড়ে। স্বপ্নের কথা বললে দাদী বলতেন—
“স্বপ্ন তো স্বপ্নই মা, বেশি ভাবিস না।”

ঠিক তখনই মোবাইলের টুং টাং শব্দ। রায়হানের মেসেজ—
Good morning.

সুনয়না রিপ্লাই দেয়। আজ অকারণেই কথোপকথন একটু দীর্ঘ হয়। স্বপ্নের কথা জানালে রায়হান আগ্রহ দেখালেও সে এড়িয়ে যায়।

দিন গড়িয়ে যায়। দুপুরে পরিবারের সঙ্গে খাওয়া, আড্ডা—সবই স্বাভাবিক। কিন্তু সুনয়নার ভেতরে কোথাও যেন একটা অদৃশ্য অস্বস্তি জমে থাকে।

রাতে আবার রায়হানের মেসেজ আসে। সে জানায়, কয়েকদিনের জন্য গ্রামে যাচ্ছে। নিয়মমাফিক কথাবার্তা শেষ হয়।

প্রায় পনের দিন পর রায়হান ফিরে এসে দেখা করার প্রস্তাব দেয়।

প্রস্তাবটা পড়েই সুনয়নার মনে আবার স্বপ্নটা ফিরে আসে।

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর সে স্বপ্নের কথা বলে ফেলে।

রায়হানের উত্তরের মেসেজটা যেন হঠাৎ অন্ধকার ঘরের দরজা খুলে দেয়—

“ভয়ের কী আছে সুনয়না? সুন্দর স্বপ্নই তো দেখেছো। সত্যি যদি তোমাকে এমন করে কাছে রাখতে পারতাম, সারাক্ষণ দেখতে পারতাম—কতো ভালো হতো।”

সুনয়নার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। বুকের ভেতর কেমন একটা চাপ।

সে আর কোনো রিপ্লাই দেয় না। মোবাইলটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করে।

কিন্তু ঘুম আসে না।

পরের কয়েকদিন সুনয়না ইচ্ছে করেই রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। নিজেকেই বোঝাতে থাকে—
“ও এমন না। আমি অযথা ভাবছি।”

কিন্তু রায়হানের প্রতিটি নতুন মেসেজে কোথাও যেন অদ্ভুত এক অধিকারবোধ টের পায় সে।

—তুমি কোথায় গেলে বললে না কেন?
—আজ সারাদিন অনলাইনে ছিলে না কেন?
—তুমি কি আমাকে এড়িয়ে চলছো?

এই প্রশ্নগুলো সরাসরি অভিযোগ নয়, কিন্তু প্রশ্নের ভেতরে একটা অদৃশ্য চাপ আছে।

একদিন সাহস করে সুনয়না লিখে ফেলে—
“রায়হান, তুমি কি কখনো ভেবেছো, কাউকে খুব ভালোবাসার মানে তাকে বন্দি করে রাখা নয়?”

অনেকক্ষণ কোনো রিপ্লাই আসে না।

তারপর আসে মাত্র এক লাইন—

“আমি শুধু তোমাকে হারাতে চাই না।”

সুনয়না বুঝে যায়, সমস্যাটা ঠিক এখানেই।
ভালোবাসা হারানোর ভয় থেকেই জন্ম নেয় দখলদারিত্ব।
আর দখলদারিত্ব শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাকে কারাগারে পরিণত করে।

সেদিন রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুক্ত আকাশ। কোথাও কোনো দেয়াল নেই।

হঠাৎ মনে হয়—
সে আর আবদ্ধ থাকতে চায় না।
না স্বপ্নে, না বাস্তবে।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে শেষবারের মতো টাইপ করে—

“রায়হান, আমি বিশ্বাসে বাঁচতে চাই, ভয় নিয়ে নয়।”

পাঠানোর পর এক অদ্ভুত হালকা অনুভূতি আসে তার ভেতরে।

সুনয়না জানে না সামনে কী হবে।
কিন্তু সে এটুকু জানে—
ভালোবাসা কখনো তালাবদ্ধ ঘরের ভেতর জন্মায় না।

 

 

    আবদ্ধ 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

মরীচিকার ছায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নীলার ঘরটা সবসময় একটু অগোছালো থাকতো। বইয়ের ওপর বই, আধখাওয়া কফির কাপ, আর জানালার পাশে স্তূপ হয়ে থাকা না পড়া খবরের কাগজ। বন্ধুরা বলতো, "নীলা, একটু গুছিয়ে রাখিস তো!" নীলা হাসত। মনে মনে বলত, ‘একজন আসবে। সে এসে সবকিছু তার নিজের মতো করে সাজিয়ে দেবে। আমার অগোছালো জীবনটা তার ছোঁয়ায় পরিপাটি হয়ে উঠবে।’

​সেই একজনের নাম ছিল আরিশ। আরিশের জন্য নীলা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছে। নিজের ক্যারিয়ার, নিজের শখ, এমনকি নিজের ভালো লাগাগুলোকেও সে তুচ্ছ করেছিল আরিশের খুশির কাছে। ভেবেছিল, আরিশ যখন আসবে, তখন তার হাত ধরেই নীলার সব শূন্যতা পূর্ণ হবে।

​দশ বছর পর একদিন আরিশ এলো। কিন্তু সে এলো অন্য এক পৃথিবী নিয়ে। তার চোখেমুখে নীলার জন্য কোনো মায়া ছিল না, ছিল কেবল নিজের সাফল্যের গল্প। নীলা অবাক হয়ে দেখল, যে মানুষটার অপেক্ষায় সে নিজের ঘরটা অগোছালো রেখেছিল, সেই মানুষটার ডায়েরিতে নীলার জন্য এক ইঞ্চি জায়গাও নেই। আরিশ তার নিজের গোছানো জীবনে এতটাই মগ্ন যে, নীলার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকুও তার নজরে এলো না।

​সেদিন বিকেলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীলা এক অদ্ভুত সত্য আবিষ্কার করল। সে যার অপেক্ষায় নিজের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছিল, সে আসলে কোনোদিন নীলার ছিলই না। মানুষ আসলে বড় একা। কেউ কারো ভাঙা ঘর তিলে তিলে গড়ে দেয় না। বরং কেউ কেউ আসে ঘরটাকে আরও একটু এলোমেলো করে দিয়ে যাওয়ার জন্য।

​নীলা আয়নার সামনে দাঁড়াল। অনেকদিন পর নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেখানে এক ক্লান্ত নারী দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারল, এই পৃথিবীতে মানুষ কেবল জন্ম আর মৃত্যুর জন্যই কারো অপেক্ষায় থাকে। জন্মের সময় মা অপেক্ষা করেন, আর মৃত্যুর সময় অপেক্ষা করে কবরের নিস্তব্ধতা। মাঝখানের এই দীর্ঘ পথটা নিজেকেই পাড়ি দিতে হয়।

​সেদিন সন্ধ্যায় নীলা প্রথমবার নিজের ঘরটা একা হাতে গোছাতে শুরু করল। পর্দাগুলো টেনে দিল, ধুলোবালি ঝাড়ল। সে বুঝে গেছে, তার ভালো থাকার দায়িত্ব আর কেউ নেবে না। নিজের ভালো থাকাটা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়।

 
 May be an image of text that says "মরীচিকার ছায়া মোঃ হেলাল উদ্দিন"
মরীচিকার ছায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

এক যুগ পরের রূপালি পর্দা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

অয়ন আর নীলার সম্পর্কটা কোনো সংজ্ঞায় বাঁধা ছিল না। তারা কাজিন, কিন্তু তাদের মাঝের টানটা ছিল তার চেয়েও গভীর। ছোটবেলায় তারা ছিল অবিচ্ছেদ্য। এক সাথে টিভি দেখা, রিমোট নিয়ে কামড়াকামড়ি, আর ঝগড়ার পর আবার এক প্লেটে খাওয়া—এসবই ছিল নিত্যদিনের চিত্র।

​সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তাদের সেই সিনেমার সময়গুলো। ড্রয়িংরুমের সেই চওড়া সোফায় বা এক চেয়ারে গুটিসুটি মেরে বসে যখন তারা সিনেমা দেখত, তখন পর্দা আর বাস্তবের মাঝের দেয়ালটা মুছে যেত। পর্দার নায়ক-নায়িকা যখন প্রেমে পড়ত, অয়ন আর নীলাও কিশোর বয়সের অবুঝ আবেগে একে অপরের হাত ধরত, কপালে কপাল ঠেকাত। সেই রোমাঞ্চকর দৃশ্যগুলো ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব একটা পৃথিবী।
​তারপর জীবন তার আপন গতিতে চলে গেল। নীলার বিয়ে হয়ে গেল অন্য শহরে, আর অয়ন চলে গেল সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ে। যোগাযোগ থাকল না, শুধু স্মৃতির অ্যালবামে কিছু ঝাপসা ছবি রয়ে গেল।

​আজ বারো বছর পর স্টেশনে হঠাৎ দেখা। অয়ন ফিরছিল প্রবাস থেকে, আর নীলা হয়তো কোথাও যাচ্ছিল। কেউ কাউকে চিনতে ভুল করেনি। নীল রঙের শাড়িতে নীলাকে অনেক বেশি পরিণত আর গম্ভীর লাগছিল, কিন্তু তার চোখে সেই পুরনো চঞ্চলতাটা যেন এখনো লুকানো।

​"অয়ন! তুই এখানে?" নীলার কণ্ঠে সেই পরিচিত সুর।

দুজন অনেক কথা বলল। হারানো দিনগুলো, প্রবাসের একাকিত্ব, নীলার সংসার—সবই উঠে এল কথায় কথায়। কিন্তু অবচেতনেই দুজন এড়িয়ে যাচ্ছিল সেই কৈশোরের সেইসব নিষিদ্ধ মায়ার মুহূর্তগুলোকে।

​ট্রেন আসার সময় হলো। অয়ন ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নীলার সামনে দাঁড়াল। আজ তার মনে এক বিচিত্র অপরাধবোধ কাজ করছিল। সে নীলার হাতটা আলতো করে ধরে বলল, "নীলা, ছোটবেলায় কত দুষ্টুমি করেছি, কতবার হয়তো তোকে বিব্রত করেছি... সিনেমার মতো সেইসব আদিখ্যেতা আর রোমাঞ্চকর স্মৃতির জন্য আজ ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি রে। জানি না আর দেখা হবে কি না।"

​অয়ন একটু ঝুঁকে বিদায়বেলায় নীলার কপালে একটা পবিত্র আদরের চিহ্ন এঁকে দিল। সে ভেবেছিল এটাই হয়তো শেষ।

​কিন্তু নীলা সরে গেল না। তার চোখে তখন জল টলমল করছে, আর ঠোঁটে এক মায়াবী হাসি। সে অয়নের হাতটা চেপে ধরে খুব কাছে এগিয়ে এল। ফিসফিস করে বলল, "শুধু কপালে কেন? বড় হয়ে গেছি বলে কি অধিকার বদলে গেছে? আমি গালেও আদর চাই।"

​অয়ন থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো স্টেশনের কোলাহল থেমে গেছে, ট্রেনের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। তারা আবার সেই এক যুগ আগের সিনেমার নায়ক-নায়িকা হয়ে গেছে। অয়ন নীলার দুই গালে আলতো করে হাত রাখল। সেই স্পর্শে মিশে ছিল এক যুগের দীর্ঘশ্বাস আর অপূর্ণ ইচ্ছা। তারা দুজনেই যেন হারিয়ে গেল সেই রোমাঞ্চকর ঘোরে।

​ট্রেন ছেড়ে দিল। অয়ন দাঁড়িয়ে দেখল নীলা জানলার পাশে বসে হাত নাড়ছে। ট্রেনটা ধোঁয়া উড়িয়ে দূরে চলে যাচ্ছে, কিন্তু বাতাসে রয়ে গেছে এক যুগ আগের সেই পুরনো সিনেমার সুবাস।

 

 
May be an image of one or more people, train and text that says "এক যুগ পরের রুপালি পর্দা মোঃ হেলাল উদ্দিন উজड" 
এক যুগ পরের রূপালি পর্দা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নীরবতা ও একটি আনব্লকড ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


ঢাকার ঘিঞ্জি গলির এক চিলতে মেসে যখন আশা প্রথম পা রাখে, তার চোখে তখন কেবল টিকে থাকার লড়াই। মধ্যবিত্ত বাবার কাঁধের ওপর থেকে পড়াশোনার খরচটা নামিয়ে নিতেই পাশের বাড়ির টিউশনিটা সে হাতে নেয়। সেখানেই তার পরিচয় অর্ক-র সাথে, যদিও সেই পরিচয় ছিল দীর্ঘ তিন বছরের এক অদ্ভুত নীরবতার।

​আশা যখন পড়াতে আসত, অর্ক তখন প্রায়ই চা আর বিস্কুটের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকত। তাদের মধ্যে কখনো কোনো কথা হয়নি। অথচ প্রতিবার ট্রে নামিয়ে রাখার সময় চার চোখের পলকহীন একটা মুহূর্ত থমকে থাকত। আশা দেখত অর্কর মার্জিত ভঙ্গি, আর অর্ক দেখত মেয়েটির চোখে লেগে থাকা একরাশ ক্লান্তি আর দায়িত্বের ছাপ। সপ্তাহে চার দিন, এভাবে কেটে গেল তিন-তিনটি বছর।

​বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হলো, অর্কর একটা ভালো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি হয়ে গেল। আশাও টিউশনি ছেড়ে দিল। কিন্তু অর্ক সেই নীরবতাটাকে আর বয়ে বেড়াতে পারছিল না। অনেক খুঁজে ফেসবুকে সে আশাকে ইনবক্স করল। প্রথম প্রথম আশা খুব জড়োসড়ো থাকলেও, ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে কথার পাহাড় জমতে শুরু করল। অর্ক তার সবটুকু আবেগ দিয়ে একদিন বলেই ফেলল— "আমি তোমাকে সেই প্রথম দিন থেকেই ভালোবাসি।"

​এক রাতে তাদের সেই আলাপন ছিল যেন তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো এক কষ্টকর অভিজ্ঞতা। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল, আর ফোনের নীল আলোয় দুই প্রান্তে দুটি মানুষ হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিচ্ছিল। রাত তখন ২টো বেজে ১৫ মিনিট। চারপাশ নিঝুম।

​অর্ক: "আশা, তুমি কি জানো সেই তিন বছর আমি শুধু তোমার পড়ানো শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতাম? এক কাপ চা হাতে তোমার সামনে যাওয়াটা ছিল আমার দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। অথচ আজ যখন সব আছে, তখন তুমি কেন বারবার আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছ?"

​আশা: "অর্ক, আমি একজন বড় মেয়ে যার পেছনে একটা ভাঙাচোরা পরিবার দাঁড়িয়ে আছে। আমার বাবার কাঁধটা এখন খুব ক্লান্ত। আমার ভাইবোনের ভবিষ্যৎ আমার ওপর। আমি যদি এখন আবেগের পিছে ছুটি, তবে ওদের স্বপ্নগুলো মরে যাবে।"

​অর্ক: "আমি তো তোমাকে ছেড়ে যেতে বলছি না! আমি তোমার পরিবারের দায়িত্ব নেব। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে রাজপুত্রী করে না রাখি, অন্তত কখনো চোখের জল পড়তে দেব না।"

​আশা: "ভালোবাসার মানুষটার কাছে ঋণী হয়ে বেঁচে থাকাটা খুব কষ্টের অর্ক। তুমি আমাকে দয়া করবে, কিন্তু আমার আত্মসম্মান তাতে ক্ষতবিক্ষত হবে। আমাদের মাঝে যে সামাজিক আর আর্থিক দেয়াল, সেটা টপকানোর শক্তি আমার নেই।"

​অর্ক: "দেয়ালটা তুমি তুলছো আশা, আমি না! আমি শুধু তোমাকে চাই। প্লিজ, একবার বলো যে তুমিও আমাকে ভালোবাসো। একবার বলো যে তুমি চেষ্টা করবে।"

​আশা চোখের জল মুছে টাইপ করল— "হ্যাঁ অর্ক, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু এই ভালোবাসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।" মুহূর্তেই অর্কর ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল— “You can't reply to this conversation.” আশা তার সিম কার্ডটা খুলে জানালার বাইরে বৃষ্টির আঁধারে ছুড়ে ফেলে দিল।

​ব্লক করে দেওয়ার পর অর্কর জীবনটা যেন এক থমকে যাওয়া ঘড়ির কাঁটা। সে পাগলের মতো আশাকে খুঁজেছে:

​পরদিন সকালেই অর্ক ছুটে গিয়েছিল সেই গলিতে, কিন্তু বাসার মালিক জানালেন, আশা মাসখানেক আগেই মেস ছেড়ে দিয়েছে।

​অফিসের লাঞ্চ ব্রেক চুরি করে সে ক্যাম্পাসে গিয়ে বসে থাকত। লাইব্রেরি, ক্যানটিন বা ডিপার্টমেন্টের করিডোরে অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে আশা যেন এক ফোঁটা জল হয়ে সমুদ্রে মিশে গিয়েছিল।

​অর্ক এখন আর চা খেতে পারে না। চায়ের কাপ হাতে নিলেই সেই পুরনো বিকেলের কথা মনে পড়ে যায়। মাঝে মাঝে সে নিজের অজান্তেই আশার সেই বন্ধ নম্বরে ফোন দেয়, আর ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে— "নম্বরটি আর ব্যবহৃত হচ্ছে না।"

​সময় পেরিয়ে গেছে সাত বছর। অর্ক এখন বড় কর্মকর্তা, কিন্তু আজও একা। সেদিন বনানীতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। সুপারশপের সামনে অর্কর নজর গেল এক মহিলার দিকে। হাতে পুরনো ছাতা, এক হাতে বাজারের ব্যাগ। অর্কর হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

​অর্ক গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গেল। "আশা?"

মেয়েটি চমকে তাকাল। সেই পরিচিত চোখ, তবে তাতে এখন গভীর স্থবিরতা।

"অর্ক? আপনি এখানে?"

​সেদিন কফিশপে বসে সাত বছরের জমানো কথাগুলো বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো এল। আশা জানাল, সে তার ভাইবোনদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। অর্ক আশার হাতটা শক্ত করে ধরল।

"সাত বছর আগে তুমি আমাকে ব্লক করেছিলে আশা, কিন্তু আমার মন থেকে তোমাকে সরাতে পারোনি। এবার কি আমার হাতটা ধরা যায় না?"

আশা এবার আর মুখ ফিরিয়ে নিল না। অর্কর চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল।

​মাসখানেক পর, খুব সাদামাটাভাবে তাদের বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের পর প্রথম বৃষ্টির দিন অর্ক রান্নাঘরে ঢুকল। ট্রে-তে করে দু'কাপ চা আর বিস্কুট নিয়ে সে বারান্দায় গেল।

অর্ক হাসিমুখে ট্রে-টা সামনে ধরল— "সেদিন টিউশনিতে চা নিয়ে আসতাম, কথা হতো না। আজ আমি তোমার স্বামী, আজ কি চা খেতে খেতে সাত বছরের সব গল্প করা যাবে?"

 

​আশা অর্কর কাঁধে মাথা রাখল। যে ভালোবাসা এক রাতে ব্লক হয়ে গিয়েছিল, তা আজ সারাজীবনের জন্য আনব্লক হয়ে গেল।
 
 
 May be an image of one or more people, people smiling and text that says "UT নীরবতা 3 একটি আনব্লকড ভালোবাসা মোঃ হেলালি উদ্দিন"

নীরবতা ও একটি আনব্লকড ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Friday, February 20, 2026

নীরবতার ভেতর তুমি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আমি জানি না কেন সেদিন হঠাৎ করে তোমার নম্বরটা খুঁজে বের করলাম।
এক যুগ হয়ে গেছে—এত বছরে মানুষ ভুলে যায়, অভ্যস্ত হয়, নিজেকে বোঝায়। আমিও বোঝাতাম। সংসার, সন্তান, দায়িত্ব—সবই আছে। তবু কিছু রাতে বুকের ভেতর এমন এক শূন্যতা জমে, যার কোনো নাম নেই।

সেদিন বিকেলে আকাশটা খুব শান্ত ছিল। অকারণ শান্ত।
হাত কাঁপছিল ফোন ডায়াল করার সময়। মনে হচ্ছিল—আমি কি কোনো সীমা লঙ্ঘন করছি?
তবু কলটা চলে গিয়েছিল।

রিং গেল।
একবার।
দু’বার।

যখন তুমি “হ্যালো” বললে, আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিলাম।
কারণ তোমার গলা আমার কল্পনার মতো বদলায়নি।
একটু ভারী, একটু ক্লান্ত—তবু চেনা।

“আমি… কেমন আছো জানতে চাচ্ছিলাম।”
এইটুকু বলার জন্য এত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল!

তুমি ভদ্র ছিলে। খুব ভদ্র।
আমিও।

কথা এগোয়নি।
যেন দু’জনেই জানতাম—কিছু কথা আছে, যেগুলো বলা মানেই বিপদ।

ফোনটা কাটার পর অনেকক্ষণ বসে ছিলাম।
ঘরের মানুষজনের কোলাহল, রান্নাঘরের শব্দ—সবই হচ্ছিল, অথচ আমার ভেতরে কেবল একটা পুরোনো বিকেল আটকে ছিল, যেখানে আমি আর তুমি পাশাপাশি হাঁটছিলাম।

দু’দিন পর আবার কথা হলো।

এবার ভয় কম ছিল, দ্বিধা ছিল বেশি।
আমি জানতে চাইলাম—তুমি সুখী কি না।
তুমি জানতে চাওনি আমি সুখী কি না।
হয়তো ভেবেছিলে, প্রশ্নটা করলে উত্তর শোনার সাহস থাকবে না।

আমরা সন্তানদের কথা বললাম, কাজের কথা বললাম, সময়ের অভাবের কথা বললাম।
কিন্তু প্রতিটা কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি শুনছিলাম—
যে মানুষটাকে আমি একদিন অসম্ভব ভালোবেসেছিলাম, সে এখনো কোথাও রয়ে গেছে।

একসময় আমি বলে ফেললাম,
“আমরা কি ভুল মানুষকে বিয়ে করেছি?”

বলেই ভয় পেয়ে গেলাম।
এই প্রশ্নের উত্তর নেই—শুধু ক্ষতি আছে।

তুমি অনেকক্ষণ চুপ ছিলে।
তারপর বললে,
“আমরা হয়তো সঠিকটা করার চেষ্টা করেছি।”

এই কথার মধ্যে কোনো অভিযোগ ছিল না।
কিন্তু শান্ত স্বীকারোক্তি ছিল—ভালোবাসা আর জীবন এক জিনিস নয়।

এরপর আর কিছু বলা যায়নি।
আমি জানতাম, এখানেই থামা উচিত।
কিছু সম্পর্ক দূর থেকেই সুন্দর।

শেষবার কথা বলার সময় আমি বলেছিলাম,
“তোমার কণ্ঠটা শুনে ভালো লাগল।”

তুমি শুধু বলেছিলে,
“তুমিও ভালো থেকো।”

এই ‘ভালো থেকো’-র মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো আশা নেই।
শুধু একরাশ অতীতকে সাবধানে নামিয়ে রাখার চেষ্টা।

ফোন কেটে যাওয়ার পর আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।
বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। আলো জ্বলছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।

শুধু আমার ভেতরে কোথাও একজন দাঁড়িয়ে ছিল—
যে এখনো জানে,
কিছু মানুষ জীবনে ফিরে আসে না,
শুধু একবার নীরবে এসে মনে করিয়ে দিয়ে যায়—
তুমি একসময় খুব গভীরভাবে ভালোবেসেছিলে।

আর সেই স্মৃতিটুকুই
আজীবন চুপ করে বহন করতে হয়।

 কিছুমিছু - #কবিতা নীরবতার ভেতর তুমি মুন্নি নূরুল হুদা ১৪/০১/২০২৫ তোমার সাথে  আমার কোনো গল্প নেই, শুধু কিছু অসমাপ্ত বাক্য, সেই সব কথা মনে এলেই ...

নীরবতার ভেতর তুমি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Saturday, February 14, 2026

কালো টিপের ঘ্রাণ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


আমি শহরের এক পুরনো এলাকায় নতুন ফ্ল্যাটে উঠলাম। ফ্ল্যাটটা বড় নয়, তবে নিরিবিলি। চারদিকে নির্জনতা, স্যাঁতসেঁতে বাতাস আর পুরনো কাঠের ফার্নিচারের গন্ধ। সব ঠিকঠাকই চলছিল, যতক্ষণ না আমি ভেসিনের পাশে রাখা ছোট্ট গ্লাসে পড়ে থাকা একটা কালো টিপ খুঁজে পাই।

টিপটা দেখে অদ্ভুত অনুভূতি হয়। মনে হলো, আমি একা নেই। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মাঝেমাঝে মনে হয়, কেউ ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।

---

প্রথম কয়েকদিন রাতে ঘুম ভেঙে যেত অকারণে। বাথরুমের দরজাটা একটু খোলা থাকত, কখনো কখনো দরজার নিচ দিয়ে আলো গলে আসত—যা আমি নিভিয়েই রেখেছিলাম। এক রাতে দেখি, আয়নায় কোনো প্রতিফলন নেই আমার। শুধু একটা টিপ আর একজোড়া চোখ যেন আয়নার ভেতর থেকে আমায় দেখছে।

আমি বিষয়টা বাড়িওয়ালাকে জানালে তিনি চুপ করে গেলেন। শুধু বললেন,
“বাড়িটা পুরনো। কারও কারও মনে হতে পারে কিছু আছে…”

আমি বিষয়টিকে কুসংস্কার ভেবে এড়িয়ে গেলাম। কিন্তু সত্যি কি তা এড়ানো যায়?

---
তদন্ত শুরু করলাম। আশেপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বললাম। এক বৃদ্ধা বললেন,
“আগে এখানে এক মেয়ে থাকত। তার স্বামী মারা যায় বিয়ের পরদিনই। মেয়েটা ভেঙে পড়ে। ওকে সবাই ‘বৌদি’ বলে ডাকত। খুব চুপচাপ ছিল। ঠিক যেমন ভালোবাসার অতিরিক্ত গভীরতা মানুষকে পুড়িয়ে ফেলে...”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর?”

তিনি ধীরে বললেন,
“হঠাৎ একদিন সে নিখোঁজ হয়ে যায়। খোঁজাখুঁজি করেও কিছু পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘরে যা পাওয়া গিয়েছিল, তা আজও আমরা ভুলতে পারিনি—বাথরুমের আয়নায় লেখা ছিল রক্ত দিয়ে: ‘সে ফিরে আসবে টিপের ছায়ায়।’”

---
আমি স্থানীয় পুরনো এক ইতিহাসবিদের কাছে গেলাম। তাকে কালো টিপের কথা বলতেই সে থমকে গেল।

“এই রকম এক কালো টিপের কিংবদন্তি আছে,” সে বলল, “কোনো এক কালে, এক নববধূ নিজের স্বামীকে হারিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল। সে আয়নার সামনে বসে প্রতিদিন সেই টিপ পরত, কপালে লাগিয়ে বলত, ‘তুমি ফিরে এসো, আমি এখানেই আছি।’ একদিন সে আয়নার ভিতরেই হারিয়ে যায়। বলা হয়, তার আত্মা সেই টিপের ভেতর বন্দি। যে সেই টিপ ছোঁবে, সে তার গল্পের পরবর্তী চরিত্র হয়ে যাবে।”

আমি ভয় পেলাম। মনে পড়ল—আমি টিপটা একবার ছুঁয়ে ছিলাম।

---
এক রাতে আয়নার সামনে সেই নারীকে আবার দেখলাম। এবার সে স্পষ্ট। চোখে জল, ঠোঁটে বিষণ্নতা।

সে বলল,
“আমি ফিরে এসেছি… কিন্তু কেউ আমাকে শোনেনি। আমার গল্প কেউ লেখেনি। তুমি কি পারবে আমাকে শেষ করতে?”

আমি চুপ করে থাকলাম। সে এগিয়ে এলো, হাতে সেই টিপ।

"এই টিপটা শুধু সাজ নয়," সে বলল, "এটা আমার অভিশাপ। যে এটা ছোঁবে, সে আমার কাহিনী বহন করবে... মৃত্যুর ওপারে, আয়নার অন্যপারে।"

আমি জ্ঞান হারালাম।

---
তিন দিন পর আমার জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে। ডাক্তার বলল, আমি নিজের ঘরের আয়নার সামনে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলাম। মুখে একটাও শব্দ ছিল না, কিন্তু হাতে আঁকা ছিল রক্ত দিয়ে—"শেষ হয়নি এখনো..."

বাসায় ফিরে দেখি—টিপটা নেই।

কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ালে, এখনও মাঝেমাঝে মনে হয়… পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে, চুপচাপ তাকিয়ে আছে।

অসাধারণ! প্রথম পর্বের রহস্যময়, ভয় আর বেদনার গল্পকে আমরা এখন এগিয়ে নিয়ে যাবো দ্বিতীয় পর্বে — যেখানে প্রধান চরিত্র নিজেই টিপের প্রভাবে নতুন এক অজানা জগতে পা রাখে। এখানে থাকবে অতিপ্রাকৃত ঘটনার বিস্তার, অতীতের ইতিহাস উন্মোচন, আর নতুন এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ছায়া...

---
ঘটনার পর তিন মাস কেটে গেছে। আমি বাসা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু মুক্তি মেলেনি।

রাতে ঘুমালে একই স্বপ্ন দেখি—এক আয়না, আর তার ভিতরে বৌদির মতো দেখতে আরেকজন, কিন্তু মুখটা পুরো আলাদা। তার কপালেও সেই একই কালো টিপ।

সে শুধু বলে,
“তুমি টিপ ছুঁয়েছো। তুমি এখন আয়নার ঋণী।”

একদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি, ঘরের দেয়ালে আঁচড়ের দাগে লেখা—

“তুমি কি সত্যিই মুক্ত?”

---
ঘটনা থেকে মুক্তি পেতে আমি পুরনো এলাকার এক তান্ত্রিক দোকানে যাই। দোকানের নাম "আয়নার ঘর"। বৃদ্ধ দোকানদার আমার দিকে না তাকিয়ে বলল—

“তোমার চোখে আয়নার ছায়া আছে। তুমি টিপ ছুঁয়েছো, তাই আয়নার ভেতরের ‘তৃতীয় নারী’ এখন তোমার ছায়া চায়।”

আমি বিস্মিত: “তৃতীয় নারী? বৌদি তো একজনই ছিল!”

বৃদ্ধ হেসে উঠল,
“প্রথম নারী সেই নববধূ, যে আয়নার মধ্যে হারিয়ে যায়। দ্বিতীয় নারী, যাকে তুমি বৌদি বলো, সে ছিল তার উত্তরসূরি—যাকে টিপ বেছে নেয়। আর এখন তুমি—তৃতীয় নারী নয়, তৃতীয় বাহক। টিপ তার গল্প বলায় বিশ্বাস করে। আর গল্প কখনো শেষ হয় না, যতক্ষণ না... কেউ শেষ করে দেয়।”

---
সেই রাতে, আমি আবার ঘুমোতে পারলাম না। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই বাতি নিভে গেল। এক ঝলক হাওয়া, আয়নার কাচ কুয়াশার মতো ধূসর হয়ে উঠল।

হঠাৎই, আয়নার ভিতর থেকে হাত বাড়িয়ে এলো এক নারী। ধীরে ধীরে আমি আয়নার দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছিলাম।

চোখ খুলতেই দেখি—আমি আর আমার ঘরে নেই।

আমি আয়নার ভেতরে।

চারদিক কুয়াশা, অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে অস্পষ্ট ছায়া, প্রত্যেকের কপালে টিপ। তারা ফিসফিস করে বলছে—

“তুমি আমাদের শেষ না করলে, আমরাই তোমাকে শেষ করবো।”

---
হেঁটে হেঁটে আমি পৌঁছালাম এক পুরনো ঘরে—একখানা চেয়ারে বসে আছে সেই প্রথম নারী। চোখ ফাঁকা, ঠোঁটে ছোপ ছোপ রক্ত।

সে বলল,
“আমি টিপের স্রষ্টা। একটিমাত্র আবেগ আমাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল—প্রেম। কিন্তু সে প্রতারণা করেছিল। আমি আয়নাকে বানিয়েছিলাম প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে। যারা টিপ ছোঁবে, তারা আমার দুঃখ বহন করবে।”

আমি কাঁপা কণ্ঠে বলি, “তাহলে আমাকে মুক্তি দাও!”

সে হাসে,
“তুমি চাইলে আমাকে থামাতে পারো। শুধু তোমাকে দিতে হবে একটি আত্মা... একটি প্রেম।”

---
সে বলল,
“তুমি যদি কাউকে এই টিপ দাও, আর সে তা ছোঁয়, তাহলে তুমি মুক্ত। তবে সে সেই চক্রে ঢুকে পড়বে।”

আমি ধাক্কা খেলাম—এক নিষ্পাপ কাউকে এই অভিশাপে ঠেলে দিতে হবে?

আমার হাতে তুলে দেওয়া হলো সেই টিপ। কালো, চকচকে, আর অদ্ভুত গরম।

আমি আয়নার বাইরে ফিরে এলাম।

---
আমি এখন আর আগের আমি নই। আয়নার ছায়া আমার চোখে। আমি বুঝে গেছি—এ গল্প আমার একার না, এটা সময়ের গল্প, অভিশপ্ত প্রেমের গল্প।

আমার ডেস্কে রাখা আছে সেই টিপ।

বন্ধুরা আসে, আড্ডা দেয়। একদিন একজন বলল, “এই টিপটা দারুণ সুন্দর! আমি একটু ছুঁই?”

আমি চুপ করে থাকি।

হয়তো আমি আর মুক্তি চাই না।

হয়তো আমি নিজেই এখন আয়নার প্রহরী।

হয়তো…

 No photo description available.

কালো টিপের ঘ্রাণ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন  

Thursday, January 22, 2026

নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


সেদিন কোচিং সেন্টারে নতুন ম্যাডাম মেহজাবিন রহমানের প্রথম ক্লাস।

ক্লাসে ঢুকেই যেন ঘরটা অন্যরকম হয়ে গেল। শান্ত গলা, পরিমিত হাসি, চোখে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা। বেঞ্চের এক কোণে বসে থাকা ছাত্রটি—আরিয়ান চৌধুরী, ক্লাসের পড়া ভুলে শুধু তাকিয়েই ছিল। সেই প্রথম দেখাতেই, অজান্তেই, তার ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠেছিল।

ক্লাস শেষ হলে আরিয়ান আর দশজনের মতো বেরিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু মনটা রয়ে গেল ম্যাডামের কণ্ঠে, তার চোখের গভীরতায়।

সেদিন রাতেই ফেসবুকে সার্চ—
“Mehjabin Rahman”
রিকোয়েস্ট পাঠানো হলো।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়—রিকোয়েস্টের কোনো উত্তর নেই। কোচিংয়ে সুযোগ পেলেই আরিয়ান সাহস করে বলে,
— “ম্যাডাম, ফেসবুকে একটা রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি…”
মেহজাবিন ভদ্র কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে দেন,
— “আমি স্টুডেন্টদের ফেসবুকে ফেন্ড রিকোয়েস্ট একসেন্ট করি না। আর ম্যাসেঞ্জারেও টেক্সটে কথা বলি না।”

আরিয়ান চুপ করে যায়। অপমান নয়, বরং এক ধরনের কষ্ট নিয়ে।

সবকিছু এভাবেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু এক সন্ধ্যায় বদলে যায় গল্প।

আরিয়ানের ফেসবুক স্টোরিতে একটি ছবি—বৃষ্টিভেজা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছায়া।
ক্যাপশন: “কিছু একাকীত্ব শব্দ চায় না।”

রাত এগারোটায় হঠাৎ ম্যাসেঞ্জারে একটি নোটিফিকেশন—
Mehjabin Rahman:
“ছবিটা সুন্দর। লেখাটাও।”

আরিয়ান বিশ্বাসই করতে পারেনি।
সেই একটুখানি কথাই যেন বাঁধ ভেঙে দিল। কথা হলো—কবিতা নিয়ে, বই নিয়ে, জীবনের ছোট ছোট শূন্যতা নিয়ে। মেহজাবিন জানালেন, তার স্বামী বিদেশে। মাসের পর মাস একা থাকা, দায়িত্বের ভিড়ে নিজের অনুভূতিগুলো চাপা পড়ে থাকা—সব কথা।

আরিয়ান শুনতো। খুব মন দিয়ে। খুব যত্ন করে।
সে এমনভাবে কথা বলতো, যেন শব্দ দিয়েই আগলে রাখতে চায়।

ধীরে ধীরে মেহজাবিন দুর্বল হয়ে পড়লেন।
একাকীত্বের রাতগুলোতে আরিয়ানের কথাই হয়ে উঠলো আশ্রয়।

তারা দেখা করতো না প্রায়ই। কারণ মেহজাবিন একা থাকতেন না—বাচ্চা, শ্বশুর-শাশুড়ি, সংসারের চোখ—সব সময় নজরে রাখতো তাকে।
তবু কোনো কোনো বিকেলে, কোচিং শেষ হলে, একটু দূরে চায়ের দোকানে বসে দু’মিনিট নীরব থাকা—সেটুকুই ছিল তাদের দেখা।

সব সময় কথা বলা যেতো না।
কখনো হঠাৎ কয়েকদিন নীরবতা।
তারপর আবার ফিরে আসা—
— “খুব মিস করছিলাম।”

এই সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না।
ছিল শুধু ভয়, অপরাধবোধ আর অদ্ভুত টান।

একদিন মেহজাবিন নিজেই লিখলেন—
— “আরিয়ান, এটা ঠিক না। আমি জানি।”
আরিয়ান উত্তর দিল—
— “আমি জানি ম্যাডাম। তাই তো এটাকে প্রেম বলি না… অনুভূতি বলি।”

নিষিদ্ধ বলেই হয়তো এই অনুভূতি এত গভীর ছিল।

নিষিদ্ধ বলেই তারা জানতো—এই গল্পের কোনো সুন্দর শেষ নেই।

তবু কিছু গল্প শেষের জন্য লেখা হয় না।

কিছু গল্প শুধু মনে থেকে যায়—

একটি অসম্ভব ভালোবাসার মতো,

একটি নিষিদ্ধ স্মৃতির মতো।

 No photo description available.

নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

চুলের বেগুনী ব্যান্ড -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

সাব্বির সদ্যই ঢাকায় এসেছে পড়ালেখার জন্য। ছোট শহর থেকে আসা ছেলেটা নতুন শহরের কোলাহল, যানজট আর একাকিত্বের ভেতর একটু জায়গা খুঁজে নিচ্ছে নিজের মতো করে। থাকার জন্য একটা পুরনো মেস পেয়েছে, যার একটা রুম ফাঁকা ছিল কিছুদিন ধরে। সাব্বিরকেই দেওয়া হলো সেই রুমটা।

রুমে ঢুকেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় তার। যেন দেয়ালের গায়ে হালকা কোনো সুগন্ধ রয়ে গেছে, জানালার ধারে রাখা পুরনো আয়নায় এখনো কারো চোখের প্রতিচ্ছবি লেগে আছে। টেবিলের এক কোনায় ধুলোমাখা একটা ছোট বাক্স, খুলতেই বের হয়ে আসে একটা বেগুনি রঙের চুল বাঁধার ব্যান্ড। একদম সাধারণ, কিন্তু অদ্ভুত এক কোমল সৌন্দর্যে ভরা।

সেই রাতেই সাব্বির প্রথম স্বপ্নটা দেখে।

স্বপ্নে সে দেখে – জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে, হালকা হলুদ কামিজ পরা, চোখে মায়া আর চুলে বাঁধা সেই বেগুনি ব্যান্ড। মেয়েটা ঘুরে তাকায়, হেসে বলে, "তুমি কি আমার জায়গায় উঠেছো?"

ঘুম ভাঙে, কিন্তু সেই হাসি যেন ভেসে থাকে চোখের সামনে।

এরপর প্রতিরাতেই স্বপ্নে আসে সে মেয়ে। কখনও চায়ের কাপ হাতে বারান্দায়, কখনও রেইনকোট ছাড়া ভিজতে থাকা বৃষ্টিতে, কখনও এক টুকরো চিঠি লিখে রেখে যাচ্ছে টেবিলে — কিন্তু সবসময়ই তার চুলে বাঁধা সেই বেগুনি ব্যান্ড।

সাব্বির ধীরে ধীরে তার প্রতি এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে পড়ে। তার পড়ালেখায় মন বসে না, বন্ধুদের সঙ্গে কথায় তাল মেলে না। সে স্বপ্নে বাস করা একটা অচেনা মেয়েকে ভালোবেসে ফেলে—যার নামও সে জানে না, বাস্তবে যাকে কখনো দেখেওনি।

একদিন হঠাৎ করেই মেস মালিকের স্ত্রী এসে সাব্বিরকে বলে,
"ওই রুমে তো আগে নীলা থাকত, খুব চুপচাপ মেয়ে ছিল। ওর তো ঢাকাতেই কোথাও চাকরি হয়ে গেছে, এখন আর আসে না। তোমার রুমে কিছু রেখে গিয়েছিল বুঝি?"

সাব্বির একটু থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"আপু… নীলা কি… বেগুনি ব্যান্ড ব্যবহার করত?"

"হুম! ওর প্রিয় ছিল ওটা। কী, পেয়েছো নাকি?"

সেই রাতে সাব্বির প্রথমবার নিজের মনের মধ্যে একটা আলো দেখতে পায়। স্বপ্নের মেয়ের নাম এখন তার জানা — নীলা।

সে ভাবে, হয়তো এ ভালোবাসা একতরফা, হয়তো কখনো দেখা হবে না, তবু এই ব্যান্ডের মধ্য দিয়ে সে এক অনন্ত সংযোগ পেয়ে গেছে। সে ঠিক করে, একদিন তাকে খুঁজবেই। সেই নীলাকে — যে স্বপ্নে আসে, বৃষ্টিতে হাসে, আর চুলে বাঁধে বেগুনি ব্যান্ড।

 হিজাবের নিচে মাথার চুল বেধে রাখার জন্যে অবশ্যই এমন কিছু চাই যেটা বেশ লং  টাইমের জন্যে আমাদের হেয়ারকে টাই করে রাখবে।ভেলভেট এই ব্যান্ডগুলো ...

  চুলের বেগুনী ব্যান্ড -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Friday, July 12, 2024

'গল্প হলেও স্বপ্ন' -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

বাড়ি ভর্তি মেহমান। সবাই তাদের মেহমানদারি করাতে ব্যস্ত, কিন্তু তরু আর শশী মত্ত আছে তাদের গল্পের মাঝে। বলে রাখা ভালো এই তরু আর শশী হলো সদ্য বিবাহিত এক দম্পতি। তাই এদের গল্পের সময় আর অসময় নেই। আজও তেমনি গল্পের মাঝেই হঠাৎ শশী বলে উঠলো এই তরু, তুমি কি জানো আমি কে?
এই কথা শুনে তরু হাসতে লাগলো আর বললো জানবো না কেন? তুমিতো আমার শশী।
শশী এবার সিরিয়াসলি বললো, না তরু, না। আমি শশী না। শশীর আড়ালেও আমার একটা আলাদা পরিচয় আছে, যা অনেকেই জানে না, তুমি জানো না।
এবাব তরু সত্যিই অবাক হয়ে যায়। সে বিস্মিত চোখে শশীর কাছে জানতে চাই তার আসল পরিচয় কি? শশী আস্তে আস্তে বলতে শুরু করে তার জীবনের সত্যিটা।
আমার আসল নাম ঋতু ঘোষ। আমার বয়স যখন দশ বছরের মতো হবে, তখন রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই। এখন যাদের মা বাবা বলে ডাকি, তারাই আমাকে আশ্রয় দেয়, লেখা-পড়া করায়, তাদের কারনেই আজ আমি প্রতিষ্ঠিত। এখন তাদের পরিচয় ই আমার বড় পরিচয়।
তরু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শশীর মুখের দিকে। এ কি বলছে শশী, এটা কি করে সম্ভব? এতো বড় সত্যিই কিভাবে গোপন রেখেছিল এতো দিন? এর কোন উত্তর খুজে পায় না তরু। তবুও তরু প্রশ্ন করে শশীকে, আচ্ছা তোমার আসল মা-বাবা কোন দিন কি তোমাকে খুজেনি?
শশী সাবলীল ভাষায় উত্তর দেয়, জানতাম মা আমাকে খুঁজতে মাঝে মাঝেই পাশের এলাকাতে, এমনকি পাশের বাড়ি পর্যন্ত আসত যদি আমার দেখা পায়, কিন্তু কখনো আমার দেখা পায়নি আর আমিও কখনো মায়ের সাথে দেখা করিনি।
একথা শুনে তরু আরো অবাক হয়ে যায় এবং শশীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে, তুমিতো দেখি ছোট বেলা থেকেই অনেক পাষাণ, অনেক নিষ্ঠুর।
তরুর একথা শুনে শশী অট্ট হাসিতে ফেটে পরে আর তার হাসির শব্দে তরুর ঘুম ভেঙ্গে যায়, সে চোখ খুলে দেখে একি শশীতো দিব্যি ঘুমাচ্ছে। তরুর মনে বার বার প্রশ্ন এ কি দেখলো সে?? এটাই কি সত্যিই?? কি করে তা শশীকে জিজ্ঞাস করবে, এই ভাবতে ভাবতে তরু আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
 
 
'গল্প হলেও স্বপ্ন' 

Saturday, February 4, 2023

নীল খামে বেদনার চিঠি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


বেদনার রঙ নীল কিংবা নীল রঙের বেদনা এমন একটা কথা আমাদের সকলেরই জানা।

এই কথা বিশ্বাস করে সাথী। তাই নীল খাম আর নীল কলম নিয়ে নিস্তব্ধ নিশিতে সাথী চেয়ারে বসেছে তার মনে জমে থাকা বেদনার কথাগুলো লিখতে।

কিন্তু কি লিখবে সাথী? শুরু করবে কোথা থেকে তার মনে জমে থাকা বেদনার কথাগুলো এমন ভাবতে ভাবতে চোখ ঝপসা হয়ে আসছে। সময়তো বেশি হয়নি তবু কেন তার এমন লাগছে, মনে হয় হাজার বছর দেখা হয়নি সবুজের সাথে, কথা হয়নি কখনো দু'জনের। কিন্তু তাতো নয়। সবুজ কি করে, কোথায় আছে সবাই সাথীর জানা। তবু কেন এমন মনে হয়। কেন আজ তার কথা মনে পরতে বৈশাখের রৌদ ঝলমলে আকাশে হঠাৎ জমে যাওয়া মেঘের মতো ঝাপসা হয়ে আসছে সব স্মৃতি। বৈশাখের কালো মেঘে আকাশ ছেড়ে গেলেও কোথাও যেমন একটু সূর্যের আলোর সন্ধান পাওয়া যায় তেমনি সাথীর ঝপসা হয়ে যাওয়া চোখের এক কোনে সবুজের সাথে কাটানো সুখস্মৃতি উকিঁ দিচ্ছে। সে লিখতে শুরু করেছে তার বেদনার চিঠি।

প্রিয় সবুজ,

কেমন আছো?

কতোদিন হলো তোমার সাথে কথা হয়না। দেখা হয়না বহুদিন। সেই কবিতার মতো দেখেছিলাম কবে, কোন বৃহস্পতিবারে, মনে হয় এক কোটি বছর তোমার সাথে দেখা নাই। আসলেই কি তাই? তোমার সাথে শেষ দেখার সময়টা কি এতোদিন হয়ে গেছে।

আচ্ছা, তোমার কি আমাকে মনে পড়ে? নাকি ভুলে গেছো আজ সব। তোমার হৃদয়ে আজ অন্য কোন যুবতীর বাস। যতোদূর জানি তোমার পড়ালেখা এখন শেষ হয়নি। তবে কি ক্লাসের কোন বান্ধবী আজ তোমার প্রেমের নতুন সারথী, যেমন আমাকে রাখতে প্রতিটা ক্লাস পিরিয়ডে একই বেঞ্চে তোমার পাশে।

সবুজ, মনে পড়ে আমাদের প্রথম দেখার কথা? আমি কলেজের ক্লাসরুমে একা বসেছিলাম। কোথা থেকে তুমি দৌঁড়ে এসে আমায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তুমি পাশে বসলে। তোমার ধাক্কায় আমি পরে যাচ্ছিলাম প্রায়, কিন্তু কেমন করে ধরলে। আমার তখন মনে হচ্ছিল কোন ঝড়ো বাতাস আমায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর কোন আপন হাত শক্ত করে আমায় ধরে আছে যেন কোন বিপদ আমায় স্পর্শ করতে না পারে।

একটু স্বাভাবিক হতে অনুভব করলাম কোন এক অজানা ভালো লাগা হৃদয়ে বয়ে যাচ্ছে। সমস্ত শরীরজুড়ে একটা অন্যরকম অনুভূতি বয়ে চলছে। মনে হচ্ছিল এমন একটা শক্ত হাত আমার হাতে ধরা দরকার। কিন্তু আমি তোমার সাথে রাগ করে, কড়া কিছু কথা শুনিয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলাম।

মনে আছে তোমার সেই দিনের কথা। এরপরে কতোবার সরি বলার চেষ্টা করেছিলা। কিন্তু আমি কোন পাত্তাই দিতেছিলাম না। আসলে এটা তোমার প্রতি রাগ থেকে করিনি, শুধু তোমাকে যাচাই করে দেখছিলাম। আমি আবার গানের সেই কথা, বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম, সোনা কিনিলাম নাকি রুপা কিনিলাম, এই ভালোবাসায় বিশ্বাস করিনা। তাই তোমাকে ভালো লাগলেও যাচাই করে দেখছিলাম। যদিও জানতাম না তুমি আমায় ভালোবাস কিনা, নাকি এমনিতেই সেদিন এমন করেছিলা। তবে বুঝতেছিলাম, সেদিনের করা তোমার কান্ড ছিলো পরিকল্পিত।

সবুজ, তোমার সাথে কিছুদিনের মধ্যেই সুন্দর একটা সম্পর্ক হয়ে গেলো। কতো মধুর ছিলো সেই দিনগুলো মনে আছে তোমার। জানি তুমি ভুলতে পারোনি, যেমন ভুলতে পারিনি আমি। তোমার সাথে পাশাপাশি বসে ক্লাস করা, ক্লাসের মাঝে তোমার দুষ্টমি কখনো স্যারের রাগান্বিত চোখ বা ক্লাসের অন্যদের বাঁকা কথা শুনে কাটাতে হয়েছে সবই আমার মনের কোণে জমা রয়েছে, শুধু তুমি নেই আমার মনের মাঝে। আমার মনের ঘরে আজ অন্য পুরুষের বাস।

কেন এমন হলো? কেন তুমি হলে না আমার মনের সেই পুরুষ। না, তোমাকে দোষ দিচ্ছি না আমার দোষ ছিলো। আসলে পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করেছে আলাদা হতে, দুইজনকে দুই প্রান্তে রাখতে। দুইটা বছর কতো আনন্দে কেটেছে। কতো খুনসুটি, কতো মান-অভিমান। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ সবই স্মৃতি।

তোমার চোখে বড় হবার স্বপ্ন। ভর্তি হলে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। আমি রয়ে গেলাম সাধারণ শিক্ষায়। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। তাদের ছেড়ে দূরে যেতে পারিনি। আর তাই হয়তো আজ আমি তোমার থেকে দূরে। চোখের আড়াল হলে নাকি মানুষ মনের আড়াল হয়ে যায় কথাটা তেমন বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু আজ তা সত্যিই আমার জীবনে।

তুমি ব্যস্ত লেখাপড়া নিয়ে। এদিকে বাবা পাত্র দেখতে লাগলো। আমার বিয়ে করার কোন ইচ্ছে ছিলো কিন্তু বাবা মায়ের জোড়াজুড়িতে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে বাধ্য হলাম। আর করারই বা কি ছিলো বলো? তোমার কাছে তো গিয়েছিলাম। আমাকে ধরে রাখার সেই আগ্রহ তখন তোমার ছিলো না। যেমন ছিলো তোমার সাথে দেখা হবার প্রথম দিন কিংবা পাশাপাশি থাকার দিনগুলোতে। তাই আমার জীবনে আগমন ঘটলো,,,,,,

(২)

সজলের কথা মনে হতেই সাথীর ঘোর কেটে গেলো, যেমন বৈশাখের ঝড় হঠাৎ আসে হঠাৎ ই থেমে যায়।

সাথীর বিয়ে হয়েছে প্রায় চার বছর হলো। বেশ সুখেই কাটছিলো তাদের বিবাহিত দিনগুলো। যদিও সজলের চাকুরির কারনে দূরে থাকতে হতো আবার সাথীও পড়ালেখা করতো। কিন্তু সুখের সময়গুলো সাথীর জীবনে বেশি স্থায়ী হতে চায় না। সুখ যেন সাথীর জন্য বালির বাধঁ। বালি দিয়ে বাধঁ দিলে তা যেমন পানিতে ভেসে যায়, তেমনি সাথীর সুখগুলো তার দু'চোখে জলে ভেসে যায় প্রতিনিয়ত। তা নাহলে কেন সব ভুলে বিয়ের পর যাকে নিয়ে সুখের স্বপ্ন দেখছে, সুন্দর দিন কাটাচ্ছে তার সাথেই আবার আলাদা হয়ে থাকতে হচ্ছে। ছোট একটা দুর্ঘটনা কেন সব এলোমেলো করে দিচ্ছে। এমন সব ভাবতে গিয়ে সাথী আবার নীল খামের দিকে তাকায়। সে নীল কলমে নীল বেদনাগুলো লেখা শুরু করে।

প্রিয় সজল,

তুমি কেমন আছো জানি। শুধু জানি না কেন তুমি দূরে আছো। কেন তুমি চাওনা আমি তোমার কাছে থাকি। তোমায় নিয়ে সুখের একটা সংসার করি। কেন তুমি নিজেকে আড়াল করে রাখো। তোমার কাজ, তোমার সারাদিনের ব্যস্ততা তোমায় কি আমার থেকে দূরে রাখে, নাকি শুধুই তোমার ইচ্ছের অভাব। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বাসায় ফিরে ক্লান্ত যখন তোমার শরীর খাটে শুয়ে পরে তখনও কি একবারের জন্য আমার কথা স্মরণে আসেনা তোমার।

তোমার সাথে শেষ কবে কথা হয়েছে ঠিক মনে নেই। কথা বলতে মনের কথা, ভালো লাগা, ভালোবাসার কথা। বিশেষ কোন প্রয়োজনে তুমি কল দেও আর ঐ একটা বা দুইটা কথাই তোমার ফোন কলের দৈর্ঘ্য। একবারের জন্যও জানতে চাওনা আমি কেমন আছি? আমি কেমন করে তোমায় ছাড়া থাকি। কখন জানার প্রয়োজন মনে করো না।

আমি কি ভুল করেছে? কেন আমার সাথে এমন করো। সবার পছন্দে, সবাইকে নিয়েই তো আমাদের বিয়ে, আমাদের সংসার জীবনের যাত্রা। ভালোই তো চলছিলো আমাদের সুখের ছোট সংসার। আমার পড়ার ফাঁকে, তোমার কাজের শেষে জোসনা রাতে দূর আকাশের চাঁদের আলোয় খোলা ছাদে কতো কথা হতো। চাঁদের আলোয় তুমি আমার দিকে তাকিয়ে কতো বার বলতে প্রিয়তমা, 'তুমি আমার জীবনে এই চাঁদের মতো। তোমার আলোয় আমার জীবন আলোকিত। এই আলোয় দেহ দগ্ধ হবার তাপ নেই, নেই ঝলসে যাবার কোন ভয়। এ আলো দেয় প্রেমের উষ্ণতা, দেহ-মনকে করে শিহরিত।' এমন কতো কথা।

কিন্তু আজ তুমি সব ভুলে কেমন করে থাকো আমায় ছাড়া। আজ কি তোমার শিহরিত হতে ইচ্ছে করে না? ইচ্ছে করে আবার কোন জোসনা রাতে ঝিরঝির বাতাসে এক কাপ কফিতে দু'জনে চুমুক দিতে দিতে সুখের স্বপ্ন দেখতে। একটা সুন্দর সংসার গড়তে, যেখানে তুমি আমি আর আমাদের প্রেমের ফসল ফুটফুটে একটা বাবু ঘরের এ কোণ থেকে ও কোণে দৌড়ে বেড়াবে। এমন কোন ভাবনা কি তোমার মনে আর আসে না। আমি কিন্তু প্রতি মুহুর্তে এমন স্বপ্নে আজও বিভোর থাকি।

আমি স্বপ্নে কি জাগরণে সব সময় তোমায় নিয়ে ভাবি। তোমার ভাবনা আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। আমি চাই তুমিই থাকো আমার জীবনসঙ্গী হয়ে, আমার ভালোবাসার দুনিয়ায় তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চাই না। তুমি কি বুঝতে পারো না আমাকে? মানুষের জীবনে নানান ধরনের বাঁধা আসতে পারে, বিপদ হতে পারে, কতো ঘাতপ্রতিঘাতেও তো মানুষ টিকে থাকে। একটা দুর্ঘটনা কি একটা সম্পর্কে শেষ করে দিতে পারে। ঝড়ের রাতে তো কতো গাছ ভেঙ্গে পারে তাই বলে কি বাগান শুণ্য থাকে। সেখানে তো নতুন করে আবার সৃষ্টি হয় গাছের, বাগানের। তেমনি করে সব ভুলে গিয়ে কি আবার এক হতে পারিনা আমরা।

তোমাকে এতো কথা বলেই বা লাভ কি? তুমি তো মনে করো তোমার অবহেলায় হয়তো আমি অন্য কোথাও যত্ন পাবার স্বপ্নে বিভোর,,,,,,

(৩)

হঠাৎ করেই কলম থেমে গেল সাথীর। আসলেই কি সে অন্য কারো যত্নের স্বপ্নে বিভোর? এমন ভাবনায় মনে পরলো শাওনের কথা।

শাওনের সাথে সাথীর পরিচয় কোন একটা স্বনামধন্য এনজিওতে ভাইভা দেয়ার সূত্রে। সাথীকে দেখে শাওন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো অনেক সময়। কি ভাবছিলো শাওন তখন এটা মনে করতেই সাথী চোখ স্পর্শ করে। আসলেই কি সাথীর চোখ এতো সুন্দর। শাওন বড় কর্মকর্তা। কাজের কতো ব্যস্ততা। সাথে স্ত্রী, সন্তানের দেখাশোনা কতো কি করতে হয় তাকে। এরমধ্যেও সাথীকে নিয়মিত ফোন করে। নানান ধরনের খোঁজ খবর নেয়। প্রথম যেদিন ফোন কলে কথা হয় সেই স্মৃতি মনে করে সাথী কেমন যেন আনমনে হয়ে গেলো। ফোন করে কি সুন্দর করে সাথীর চোখের, চুলের প্রশংসায় বিভোর করে দিলো। জীবনানন্দে কবিতা কোট করে শাওন বলতেছিলো, 'চুল তার কবে কার অন্ধকার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য। ' 'পাখির বাসার মতো দু'টি চোখ তোমার, ঠিক যেন নাটরের বনলতা সেন।' 

সাথীর খুব হাসি পায়। শাওনকে বলে আপনার কি হয়েছে? আমাকে ইমপ্রেস করতে কি সব আবোলতাবোল বকছেন। সাথীর হাসি থামিয়ে দিয়ে শাওন বললো আবোলতাবোল নয়, আমি তোমার চাহনির মায়ায় পরেছি। তোমার মায়ায় ভরা চোখ, গোলাপফোটা ঠোঁটের হাসি আমায় মুগ্ধ করেছে। আমি তোমাতে হারিয়ে যাচ্ছি।

কথাগুলো ভালো লাগে সাথীর। সাথী মনে মনে ভাবতে থাকে কতো সুন্দর করে কথা বলছে শাওন। একজন মানুষ এতো সুন্দর করে মানুষকে হাসাতে পারে, খুশি করতে পারে তা শাওনের সাথে কথা না হলে জানা হতো না সাথীর। তাই নিয়মিত কথা হতে থাকে দু'জনের। কখনো কাজের ফাঁকে, কখনো রাতের আধাঁরে নিঝুম নিস্তব্ধ ক্ষণে সারারাত্রি কথা হতে থাকে। দু'জনার ভালো লাগা, মন্দ লাগা, মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা চাপা বেদনারা বের হতে থাকে শাওন সাথীর ফোনালাপ জুড়ে। ভালোবেসে ফেলে হয়ত দু'জন দু'জনকে কিন্তু কেউ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনা। সময়ের বাস্তবতায় সব কথা বলা যায় না। অনেক কথা বুকের মাঝেই চাপা রাখতে হয়, নিজের ভালো থাকার জন্য কিংবা অন্যকে ভালো রাখার জন্য।

সাথী আবার ফিরে যায় কলেজের সেই সুখময় স্মৃতিতে। সবুজ সাথী কি সুন্দর নামের মিল। বিধাতা মনে হয় এক সাথে থাকার জন্যই সৃষ্টি করেছে। কিন্তু একসাথে থাকা হয়নি বেশি দিন। কিন্তু সজলকে তো সারা জীবনের জন্য চাই। সারাজীবনের সঙ্গী হিসাবেই তো সজল আমার জীবনে আসল বিয়ে করে। তবু কেন একসাথে থাকতে পারছিনা। একটা সুখের সংসার হচ্ছে না। আমি তো চাই সজলকে নিয়েই বাকি জীবনটা পারি দিতে। সাথী এমন সব ভাবতে ভাবতেই নীল খামের দিকে তাকিয়ে লিখতে শুরু করে তার বেদনার নীল কথা।

প্রিয় শাওন,

অনেক দিন থেকেই ভাবছি একটা কথা বলবো কিন্তু কখনো বলা হয়নি। বলতে পারো সাহস হয়নি। হয়তো কখনো বলাও হবে না যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার ভালো লাগায়, মন্দ লাগায়, তোমার যত্নে, ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ। নিজের অজান্তে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। জানি তুমিও আমাকে ভালোবাসো কিন্তু তোমার বাস্তববাদী চিন্তার জগতে শত যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকলেও সংসার রেখে অন্য মেয়ের জীবনে আসতে চাইবেনা। তুমি আমার জীবনে আসো তা আমিও চাইনা। কারন আমিও চাই আমার সজলের সাথেই জীবন পার করি। কিন্তু তার অবহেলা আমায় কষ্ট দেয়। আমায় হৃদয়কে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আমি কি করব বুঝতে পারিনা।

শাওন, তোমার কেয়ারিং, তোমার রোমান্টিকতা আমায় টানে কিন্তু তোমার কাছে যাবো সেই সুযোগও তুমি রাখনি। তুমি এমনই এক সময় আমার জীবনে এসেছো যখন না পারো আমায় গ্রহণ করতে, না পারি আমি তোমার জীবনে যেতে। কেমন এক শাঁখেরকরাতে ফেলে দিলে আমায়। আমি আজ অসহায়। আমার জীবনে কোন সুখ স্থায়ী হতে চায় না। জানিনা আমার জীবনে কি হবে। আজ সব ছেড়ে দিয়েছি বিধাতার হাতে। দেখি তিনি আমায় কি জন্য কি রেখেছেন শেষ পর্যন্ত।

আচ্ছা এতো কথা কেন তোমাকে বলছি। তোমাকে নিয়ে কেন এতো স্বপ্ন দেখি। তুমি তো আমার হবে না বলেই দিয়েছো, আমিও যে বলিনি তা নয়। আমরা তো দু'জনেই চাইনা দু'জনের হতে তবু কেন ভালোবাসি, কেন কাছে আসার স্বপ্নে বিভোর। দিনেরাতে, ক্ষণে ক্ষণে তোমায় ভাবি। জানিনা কেন এমন হলো আমার। দিন কাটে তো রাত কাটেনা, রাত কাটে তো ভোরের সূর্য দেখিনা। এমন কেন হলো বলতে পারো শাওন,,,,,,

সাথী আর ভাবতে পারছে না। কেন লিখছে এই চিঠিগুলো। কারও কাছে তো পাঠানো হবে না কোন একটা চিঠি। তবুও কেন এতো কথা লিখে রাখা। বেদনার নীল আকাশে নীল রঙের কালিতে লেখা চিঠি নীল খামের ভিতর লুকিয়ে কেঁদে যাবে চিরদিন। কারো মনের আকাশে একবিন্দু জায়গা হবে না এই কথাগুলোর।  এমন ভাবতে ভাবতে চোখের দু'ফোটা জল গড়িয়ে পরলো হাতের কলমে আর মনে বেজে উঠলো সেই সুর, 'না, না কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালোবাসা ছাড়া, আমিও তাদেরই দলে বারবার মরে যায় যারা'।

নীল খামে বেদনার চিঠি 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Sunday, November 20, 2022

কল্পিত নবান্নে -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আজ নবান্নের দিনে তোমার হাতের সুস্বাদু খাবারে মনটা বেশ ভরে গেলো। মনে হলো কতোদিন পেটপুরে এমন খাবার খাইনি। আসলেই তাই ইট-পাথরের এই শহরে একা আমার বাস। বুয়ার রান্নায় কেটে যায় দিন মাস। মাঝে মাঝে নিজেকেও রান্নাঘরে যেতে হয়। এই দুই রান্নায় আর যাইহোক তোমার হাতের এমন স্বাদ পাওয়া যায় না। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে নবান্ন এখন বইয়ের পাতায় আর শহরের যান্ত্রিকতায় তা কখন আসে, কখন যায় মনে রাখা দায়। লোকারণ্য এই শহরের ভিড়ে তুমি একমাত্র আমার আপন জন। আমার প্রতিদিনকার খোঁজ নেয়ার মানুষ। সকালে তোমার ডাকে ঘুম ভাঙে, যদিও সেই ডাক মোবাইল ফোনে। আমি কি খেলাম, কোথায় গেলাম, মন ভালো কিনা, পড়াশোনা কেমন চলে কোন খবরই তোমার অজানার বাইরে থাকেনা। মনে হয় যেন তুমি আমার সাথেই থাকো সবটুকু সময়। আজ তুমি নিজ হাতে রান্না করেছো। সচরাচর তুমি রান্না করো না, করতে হয় না। আজ তুমি একা, বাসায় তোমার রাজ্য। রান্না করতে করতে আমায় বললে চলে এসো দুপুর, আমার হাতে তোমায় খাইয়ে সারা বিকেল ঘুরবো। এমন মধুর আমন্ত্রণ পেয়ে ছুটে আসলাম তোমার দ্বারে। তোমায় কাছে পাবার আনন্দে বসন্তের বাতাস হৃদয় ছুয়ে গেল, সাথে বাহারি রান্নার আয়োজন ভুলিয়ে দিলো সারা বছরের ভালোমন্দ না খাবার প্রয়োজন। পড়ন্ত বিকেলে তুমি নীল শাড়িতে দাঁড়ালে আমার সামনে। বললে চলো ঘুরে আসি কোন সবুজ প্রান্তে। হাত বাড়িয়ে তোমার হাতে বেরিয়ে পরলাম পথের পানে। তোমার হাতে হাত রেখে রিক্সায় চড়ে পথ চলতে চলতে মনের মাঝে একটাই সুর ভেসে যাচ্ছিলো, 'তোমার ইচ্ছেগুলো ইচ্ছে হলে আমায় দিতে পারো, আমার ভালো লাগা ভালোবাসা তোমায় দিবো আরো।' তোমায় নীল শাড়ি আর নীল টিপে দারুণ লাগে। খোলাচুলে তুমি যখন বাতাসের বিপরীতে দাড়িয়ে ডাগড় চোখে আমার পানে তাকাও, তখন আমার মনে হয় এই তোমার জন্যই হাজার বছর বেঁচে থাকতে হবে। তোমাকে ভালোবাসতে হবে আমৃত্যু। তোমাকে আমার করে রাখতে হবে। মরণের পরেও তোমায় যেন পাই এই প্রার্থনা করে যাই সৃষ্টিকর্তার কাছে। মনের মাঝে এমন হাজারো ভাবনার মধ্যেই তোমার ধাক্কায় ফিরে তাকালাম। চেয়ে দেখি তুমি পাশে নেই। আমি একা বসে কংক্রিটের এক রুমে।
 
 
 কল্পিত নবান্নে -- মোঃ হেলাল উদ্দিন