বাড়ি ভর্তি মানুষের শোরগোল। উৎসবের আমেজ চারদিকে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পোলাও-মাংসের সুবাস আর আত্মীয়-স্বজনের হাসাহাসিতে পুরো বাড়ি যেন এক জীবন্ত মেলায় রূপ নিয়েছে। কিন্তু এই উৎসবের জনসমুদ্রের মাঝেও এক টুকরো নির্জন দ্বীপের মতো নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে তরু আর শশী।
তরু আর শশী—সদ্য বিবাহিত এক দম্পতি। বসন্তের নতুন পাতার মতো তাদের সংসারে এখন কেবলই মুগ্ধতার রং। বাড়ির ছাদে বিকেলের ম্লান রোদে বসে তারা মত্ত ছিল নিজেদের একান্ত আলাপে। লোকলজ্জার ভয় বা সময়ের হিসেব—কোনো কিছুই যেন তাদের এই আড্ডার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না।
হঠাৎ গল্পের খেই হারিয়ে শশী বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। তরুর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে মৃদু স্বরে বলে উঠল, “আচ্ছা তরু, তুমি কি সত্যিই জানো আমি কে?”
তরু খিলখিল করে হেসে উঠল। শশীর কাঁধে হাত রেখে মজা করে বলল, “জানবো না কেন? তুমি তো আমার সেই একগুঁয়ে শশী, যাকে নিয়ে আমার ছোট একটি সুখের সংসার।”
শশীর চোখে এবার কোনো হাসির রেখা দেখা গেল না। বরং সেখানে জমাট বাঁধল এক গভীর বিষণ্ণতা। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “না তরু, এই শশীর আড়ালেও আমার একটা আলাদা সত্তা আছে, একটা ধূসর পরিচয় আছে। যা পৃথিবীর কেউ জানে না, এমনকি তুমিও না।”
শশীর কণ্ঠস্বরে এমন এক শীতল গাম্ভীর্য ছিল যে তরু সত্যিই দমে গেল। তার বুকের ভেতর একটা অজানা আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করল। সে বিস্মিত চোখে জানতে চাইল, “তবে তোমার আসল পরিচয় কী শশী? আমাকে বলো।”
শশী দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল তার জীবনের সেই গোপন উপাখ্যান। প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি পাথরের মতো ভারী হয়ে নামছিল। শশী বলল, “আমার আসল নাম ঋতু ঘোষ। আজ থেকে অনেক বছর আগে, যখন আমার বয়স মাত্র দশ, তখন এক অভিমানী সন্ধ্যায় জেদ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। সেই যে ফিরলাম না, আর কোনোদিন ফেরা হলো না।”
একটু থামল শশী। তরু পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে শুনছে। শশী আবার বলতে লাগল, “পথে পথে ঘুরে যখন দিশেহারা, তখন এই বাবা-মা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাঁরাই আমাকে ঋতু থেকে শশী বানালেন, আগলে রাখলেন বুক দিয়ে। আজ আমি যে শশীকে তুমি চেনো, যে প্রতিষ্ঠিত মানুষটাকে তুমি ভালোবাসো, তা কেবল তাঁদেরই অবদান। তাঁদের পরিচয়টাই এখন আমার একমাত্র পরিচয়।”
তরু বাকরুদ্ধ। যে মানুষটার সাথে সে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছে, তার জীবনের এমন এক অতলান্ত অন্ধকার অধ্যায় সে জানত না! সে অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করল, “তোমার আসল বাবা-মা? তাঁরা কি কখনো তোমাকে খুঁজতে আসেননি?”
শশী এক অদ্ভুত শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল, “মা আসতেন। মাঝে মাঝেই পাশের গ্রামে, এমনকি পাশের বাড়ি পর্যন্ত আসতেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া ঋতুকে খুঁজতে। আমি জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতাম মায়ের সেই জীর্ণ চেহারা, আকুল চোখের জল। কিন্তু কখনো সামনে যাইনি। আমি নিষ্ঠুরভাবে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম।”
একথা শুনে তরুর ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে শিউরে উঠে বলল, “তুমি এতটা নিষ্ঠুর কী করে হলে শশী? মা’র সামনে একবারও গেলে না? তুমি তো দেখছি ছোটবেলা থেকেই একটা পাষাণ হৃদয়ের মানুষ!”
তরুর এই হাহাকার শুনে শশী হঠাৎ এক বিকট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসির শব্দে চারদিকের দেয়াল যেন কাঁপতে শুরু করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তরুর তন্দ্রা টুটে গেল।
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল তরু। দেখে জানালার গ্রিল দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে শশীর মুখে। শশী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তার মুখে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। তরুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে অবিশ্বাসের চোখে শশীর দিকে তাকিয়ে রইল। তবে কি এতক্ষণ যা দেখল তা কেবলই একটি দুঃস্বপ্ন? নাকি স্বপ্নের ছলে শশী তাকে জীবনের কোনো নিষ্ঠুর ধ্রুবসত্য জানান দিয়ে গেল?
“এটাই কি তবে শশীর গোপন সত্যি?”—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না তরু। হৃদয়ের স্পন্দন তখনো স্বাভাবিক হয়নি। শশীকে জাগিয়ে জিজ্ঞাসা করবে কি না ভাবতে ভাবতে সে আবার ক্লান্ত চোখে বালিশে মাথা রাখল। বাইরে তখন রাতপাখির ডাক আর ভেতরে তরুর মনে এক অন্তহীন রহস্যের কুয়াশা। গল্পটা হয়তো স্বপ্নই ছিল, কিন্তু তার রেশ রয়ে গেল বাস্তবের চেয়েও প্রখর হয়ে।
'গল্প হলেও স্বপ্ন' সত্যিই।
ReplyDelete