Thursday, January 22, 2026

নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


সেদিন কোচিং সেন্টারে নতুন ম্যাডাম মেহজাবিন রহমানের প্রথম ক্লাস।

ক্লাসে ঢুকেই যেন ঘরটা অন্যরকম হয়ে গেল। শান্ত গলা, পরিমিত হাসি, চোখে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা। বেঞ্চের এক কোণে বসে থাকা ছাত্রটি—আরিয়ান চৌধুরী, ক্লাসের পড়া ভুলে শুধু তাকিয়েই ছিল। সেই প্রথম দেখাতেই, অজান্তেই, তার ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠেছিল।

ক্লাস শেষ হলে আরিয়ান আর দশজনের মতো বেরিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু মনটা রয়ে গেল ম্যাডামের কণ্ঠে, তার চোখের গভীরতায়।

সেদিন রাতেই ফেসবুকে সার্চ—
“Mehjabin Rahman”
রিকোয়েস্ট পাঠানো হলো।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়—রিকোয়েস্টের কোনো উত্তর নেই। কোচিংয়ে সুযোগ পেলেই আরিয়ান সাহস করে বলে,
— “ম্যাডাম, ফেসবুকে একটা রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি…”
মেহজাবিন ভদ্র কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে দেন,
— “আমি স্টুডেন্টদের ফেসবুকে ফেন্ড রিকোয়েস্ট একসেন্ট করি না। আর ম্যাসেঞ্জারেও টেক্সটে কথা বলি না।”

আরিয়ান চুপ করে যায়। অপমান নয়, বরং এক ধরনের কষ্ট নিয়ে।

সবকিছু এভাবেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু এক সন্ধ্যায় বদলে যায় গল্প।

আরিয়ানের ফেসবুক স্টোরিতে একটি ছবি—বৃষ্টিভেজা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছায়া।
ক্যাপশন: “কিছু একাকীত্ব শব্দ চায় না।”

রাত এগারোটায় হঠাৎ ম্যাসেঞ্জারে একটি নোটিফিকেশন—
Mehjabin Rahman:
“ছবিটা সুন্দর। লেখাটাও।”

আরিয়ান বিশ্বাসই করতে পারেনি।
সেই একটুখানি কথাই যেন বাঁধ ভেঙে দিল। কথা হলো—কবিতা নিয়ে, বই নিয়ে, জীবনের ছোট ছোট শূন্যতা নিয়ে। মেহজাবিন জানালেন, তার স্বামী বিদেশে। মাসের পর মাস একা থাকা, দায়িত্বের ভিড়ে নিজের অনুভূতিগুলো চাপা পড়ে থাকা—সব কথা।

আরিয়ান শুনতো। খুব মন দিয়ে। খুব যত্ন করে।
সে এমনভাবে কথা বলতো, যেন শব্দ দিয়েই আগলে রাখতে চায়।

ধীরে ধীরে মেহজাবিন দুর্বল হয়ে পড়লেন।
একাকীত্বের রাতগুলোতে আরিয়ানের কথাই হয়ে উঠলো আশ্রয়।

তারা দেখা করতো না প্রায়ই। কারণ মেহজাবিন একা থাকতেন না—বাচ্চা, শ্বশুর-শাশুড়ি, সংসারের চোখ—সব সময় নজরে রাখতো তাকে।
তবু কোনো কোনো বিকেলে, কোচিং শেষ হলে, একটু দূরে চায়ের দোকানে বসে দু’মিনিট নীরব থাকা—সেটুকুই ছিল তাদের দেখা।

সব সময় কথা বলা যেতো না।
কখনো হঠাৎ কয়েকদিন নীরবতা।
তারপর আবার ফিরে আসা—
— “খুব মিস করছিলাম।”

এই সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না।
ছিল শুধু ভয়, অপরাধবোধ আর অদ্ভুত টান।

একদিন মেহজাবিন নিজেই লিখলেন—
— “আরিয়ান, এটা ঠিক না। আমি জানি।”
আরিয়ান উত্তর দিল—
— “আমি জানি ম্যাডাম। তাই তো এটাকে প্রেম বলি না… অনুভূতি বলি।”

নিষিদ্ধ বলেই হয়তো এই অনুভূতি এত গভীর ছিল।

নিষিদ্ধ বলেই তারা জানতো—এই গল্পের কোনো সুন্দর শেষ নেই।

তবু কিছু গল্প শেষের জন্য লেখা হয় না।

কিছু গল্প শুধু মনে থেকে যায়—

একটি অসম্ভব ভালোবাসার মতো,

একটি নিষিদ্ধ স্মৃতির মতো।

 No photo description available.

নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

চুলের বেগুনী ব্যান্ড -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

সাব্বির সদ্যই ঢাকায় এসেছে পড়ালেখার জন্য। ছোট শহর থেকে আসা ছেলেটা নতুন শহরের কোলাহল, যানজট আর একাকিত্বের ভেতর একটু জায়গা খুঁজে নিচ্ছে নিজের মতো করে। থাকার জন্য একটা পুরনো মেস পেয়েছে, যার একটা রুম ফাঁকা ছিল কিছুদিন ধরে। সাব্বিরকেই দেওয়া হলো সেই রুমটা।

রুমে ঢুকেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় তার। যেন দেয়ালের গায়ে হালকা কোনো সুগন্ধ রয়ে গেছে, জানালার ধারে রাখা পুরনো আয়নায় এখনো কারো চোখের প্রতিচ্ছবি লেগে আছে। টেবিলের এক কোনায় ধুলোমাখা একটা ছোট বাক্স, খুলতেই বের হয়ে আসে একটা বেগুনি রঙের চুল বাঁধার ব্যান্ড। একদম সাধারণ, কিন্তু অদ্ভুত এক কোমল সৌন্দর্যে ভরা।

সেই রাতেই সাব্বির প্রথম স্বপ্নটা দেখে।

স্বপ্নে সে দেখে – জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে, হালকা হলুদ কামিজ পরা, চোখে মায়া আর চুলে বাঁধা সেই বেগুনি ব্যান্ড। মেয়েটা ঘুরে তাকায়, হেসে বলে, "তুমি কি আমার জায়গায় উঠেছো?"

ঘুম ভাঙে, কিন্তু সেই হাসি যেন ভেসে থাকে চোখের সামনে।

এরপর প্রতিরাতেই স্বপ্নে আসে সে মেয়ে। কখনও চায়ের কাপ হাতে বারান্দায়, কখনও রেইনকোট ছাড়া ভিজতে থাকা বৃষ্টিতে, কখনও এক টুকরো চিঠি লিখে রেখে যাচ্ছে টেবিলে — কিন্তু সবসময়ই তার চুলে বাঁধা সেই বেগুনি ব্যান্ড।

সাব্বির ধীরে ধীরে তার প্রতি এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে পড়ে। তার পড়ালেখায় মন বসে না, বন্ধুদের সঙ্গে কথায় তাল মেলে না। সে স্বপ্নে বাস করা একটা অচেনা মেয়েকে ভালোবেসে ফেলে—যার নামও সে জানে না, বাস্তবে যাকে কখনো দেখেওনি।

একদিন হঠাৎ করেই মেস মালিকের স্ত্রী এসে সাব্বিরকে বলে,
"ওই রুমে তো আগে নীলা থাকত, খুব চুপচাপ মেয়ে ছিল। ওর তো ঢাকাতেই কোথাও চাকরি হয়ে গেছে, এখন আর আসে না। তোমার রুমে কিছু রেখে গিয়েছিল বুঝি?"

সাব্বির একটু থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"আপু… নীলা কি… বেগুনি ব্যান্ড ব্যবহার করত?"

"হুম! ওর প্রিয় ছিল ওটা। কী, পেয়েছো নাকি?"

সেই রাতে সাব্বির প্রথমবার নিজের মনের মধ্যে একটা আলো দেখতে পায়। স্বপ্নের মেয়ের নাম এখন তার জানা — নীলা।

সে ভাবে, হয়তো এ ভালোবাসা একতরফা, হয়তো কখনো দেখা হবে না, তবু এই ব্যান্ডের মধ্য দিয়ে সে এক অনন্ত সংযোগ পেয়ে গেছে। সে ঠিক করে, একদিন তাকে খুঁজবেই। সেই নীলাকে — যে স্বপ্নে আসে, বৃষ্টিতে হাসে, আর চুলে বাঁধে বেগুনি ব্যান্ড।

 হিজাবের নিচে মাথার চুল বেধে রাখার জন্যে অবশ্যই এমন কিছু চাই যেটা বেশ লং  টাইমের জন্যে আমাদের হেয়ারকে টাই করে রাখবে।ভেলভেট এই ব্যান্ডগুলো ...

  চুলের বেগুনী ব্যান্ড -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Sunday, January 11, 2026

একটি আনব্লকড ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


ঢাকার ঘিঞ্জি গলির এক চিলতে মেসে যখন আশা প্রথম পা রাখে, তার চোখে তখন কেবল টিকে থাকার লড়াই। মধ্যবিত্ত বাবার কাঁধের ওপর থেকে পড়াশোনার খরচটা নামিয়ে নিতেই পাশের বাড়ির টিউশনিটা সে হাতে নেয়। সেখানেই তার পরিচয় অর্ক-র সাথে, যদিও সেই পরিচয় ছিল দীর্ঘ তিন বছরের এক অদ্ভুত নীরবতার।

​আশা যখন পড়াতে আসত, অর্ক তখন প্রায়ই চা আর বিস্কুটের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকত। তাদের মধ্যে কখনো কোনো কথা হয়নি। অথচ প্রতিবার ট্রে নামিয়ে রাখার সময় চার চোখের পলকহীন একটা মুহূর্ত থমকে থাকত। আশা দেখত অর্কর মার্জিত ভঙ্গি, আর অর্ক দেখত মেয়েটির চোখে লেগে থাকা একরাশ ক্লান্তি আর দায়িত্বের ছাপ। সপ্তাহে চার দিন, এভাবে কেটে গেল তিন-তিনটি বছর।

​বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হলো, অর্কর একটা ভালো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি হয়ে গেল। আশাও টিউশনি ছেড়ে দিল। কিন্তু অর্ক সেই নীরবতাটাকে আর বয়ে বেড়াতে পারছিল না। অনেক খুঁজে ফেসবুকে সে আশাকে ইনবক্স করল। প্রথম প্রথম আশা খুব জড়োসড়ো থাকলেও, ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে কথার পাহাড় জমতে শুরু করল। অর্ক তার সবটুকু আবেগ দিয়ে একদিন বলেই ফেলল— "আমি তোমাকে সেই প্রথম দিন থেকেই ভালোবাসি।"

​এক রাতে তাদের সেই আলাপন ছিল যেন তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো এক কষ্টকর অভিজ্ঞতা। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল, আর ফোনের নীল আলোয় দুই প্রান্তে দুটি মানুষ হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিচ্ছিল। রাত তখন ২টো বেজে ১৫ মিনিট। চারপাশ নিঝুম।

​অর্ক: "আশা, তুমি কি জানো সেই তিন বছর আমি শুধু তোমার পড়ানো শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতাম? এক কাপ চা হাতে তোমার সামনে যাওয়াটা ছিল আমার দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। অথচ আজ যখন সব আছে, তখন তুমি কেন বারবার আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছ?"

​আশা: "অর্ক, আমি একজন বড় মেয়ে যার পেছনে একটা ভাঙাচোরা পরিবার দাঁড়িয়ে আছে। আমার বাবার কাঁধটা এখন খুব ক্লান্ত। আমার ভাইবোনের ভবিষ্যৎ আমার ওপর। আমি যদি এখন আবেগের পিছে ছুটি, তবে ওদের স্বপ্নগুলো মরে যাবে।"

​অর্ক: "আমি তো তোমাকে ছেড়ে যেতে বলছি না! আমি তোমার পরিবারের দায়িত্ব নেব। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে রাজপুত্রী করে না রাখি, অন্তত কখনো চোখের জল পড়তে দেব না।"

​আশা: "ভালোবাসার মানুষটার কাছে ঋণী হয়ে বেঁচে থাকাটা খুব কষ্টের অর্ক। তুমি আমাকে দয়া করবে, কিন্তু আমার আত্মসম্মান তাতে ক্ষতবিক্ষত হবে। আমাদের মাঝে যে সামাজিক আর আর্থিক দেয়াল, সেটা টপকানোর শক্তি আমার নেই।"

​অর্ক: "দেয়ালটা তুমি তুলছো আশা, আমি না! আমি শুধু তোমাকে চাই। প্লিজ, একবার বলো যে তুমিও আমাকে ভালোবাসো। একবার বলো যে তুমি চেষ্টা করবে।"

​আশা চোখের জল মুছে টাইপ করল— "হ্যাঁ অর্ক, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু এই ভালোবাসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।" মুহূর্তেই অর্কর ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল— “You can't reply to this conversation.” আশা তার সিম কার্ডটা খুলে জানালার বাইরে বৃষ্টির আঁধারে ছুড়ে ফেলে দিল।

​ব্লক করে দেওয়ার পর অর্কর জীবনটা যেন এক থমকে যাওয়া ঘড়ির কাঁটা। সে পাগলের মতো আশাকে খুঁজেছে:

​পরদিন সকালেই অর্ক ছুটে গিয়েছিল সেই গলিতে, কিন্তু বাসার মালিক জানালেন, আশা মাসখানেক আগেই মেস ছেড়ে দিয়েছে।

​অফিসের লাঞ্চ ব্রেক চুরি করে সে ক্যাম্পাসে গিয়ে বসে থাকত। লাইব্রেরি, ক্যানটিন বা ডিপার্টমেন্টের করিডোরে অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে আশা যেন এক ফোঁটা জল হয়ে সমুদ্রে মিশে গিয়েছিল।

​অর্ক এখন আর চা খেতে পারে না। চায়ের কাপ হাতে নিলেই সেই পুরনো বিকেলের কথা মনে পড়ে যায়। মাঝে মাঝে সে নিজের অজান্তেই আশার সেই বন্ধ নম্বরে ফোন দেয়, আর ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে— "নম্বরটি আর ব্যবহৃত হচ্ছে না।"

​সময় পেরিয়ে গেছে সাত বছর। অর্ক এখন বড় কর্মকর্তা, কিন্তু আজও একা। সেদিন বনানীতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। সুপারশপের সামনে অর্কর নজর গেল এক মহিলার দিকে। হাতে পুরনো ছাতা, এক হাতে বাজারের ব্যাগ। অর্কর হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

​অর্ক গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গেল। "আশা?"

মেয়েটি চমকে তাকাল। সেই পরিচিত চোখ, তবে তাতে এখন গভীর স্থবিরতা।

"অর্ক? আপনি এখানে?"

​সেদিন কফিশপে বসে সাত বছরের জমানো কথাগুলো বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো এল। আশা জানাল, সে তার ভাইবোনদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। অর্ক আশার হাতটা শক্ত করে ধরল।

"সাত বছর আগে তুমি আমাকে ব্লক করেছিলে আশা, কিন্তু আমার মন থেকে তোমাকে সরাতে পারোনি। এবার কি আমার হাতটা ধরা যায় না?"

আশা এবার আর মুখ ফিরিয়ে নিল না। অর্কর চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল।

​মাসখানেক পর, খুব সাদামাটাভাবে তাদের বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের পর প্রথম বৃষ্টির দিন অর্ক রান্নাঘরে ঢুকল। ট্রে-তে করে দু'কাপ চা আর বিস্কুট নিয়ে সে বারান্দায় গেল।

অর্ক হাসিমুখে ট্রে-টা সামনে ধরল— "সেদিন টিউশনিতে চা নিয়ে আসতাম, কথা হতো না। আজ আমি তোমার স্বামী, আজ কি চা খেতে খেতে সাত বছরের সব গল্প করা যাবে?"

 

​আশা অর্কর কাঁধে মাথা রাখল। যে ভালোবাসা এক রাতে ব্লক হয়ে গিয়েছিল, তা আজ সারাজীবনের জন্য আনব্লক হয়ে গেল।
 
 
 May be an image of one or more people, people smiling and text that says "UT নীরবতা 3 একটি আনব্লকড ভালোবাসা মোঃ হেলালি উদ্দিন"

একটি আনব্লকড ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Sunday, January 4, 2026

খালেদা জিয়ার সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন – মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেসব নাম দীর্ঘ সংগ্রাম, বিতর্ক, সাহস প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, খালেদা জিয়ার নাম তাদের অন্যতম। সামরিক শাসন-পরবর্তী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশ, সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার ভেতর-বাইরে থেকে রাজনৈতিক লড়াইসব মিলিয়ে তার জীবন এক অনবরত সংগ্রামের দলিল।

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন ছিল অনিচ্ছাকৃত আকস্মিক। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। ব্যক্তিজীবনে স্বল্পভাষী, গৃহিণীসুলভ পরিচয় থেকে তিনি অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের মুখ। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। সেই সময় দেশে সামরিক শাসন জেঁকে বসেছে; গণতন্ত্রের কণ্ঠ রুদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে রাজপথে নামা ছিল সাহসিকতারই নামান্তর

আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। দলীয় বিভাজন, দমন-পীড়ন গ্রেপ্তারসবকিছুর মধ্যেও তিনি আপসহীন অবস্থান ধরে রাখেন। বারবার গৃহবন্দি, সভা-সমাবেশে বাধাকিছুই তাকে রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি। বিরোধী জোট গঠন আন্দোলনের কৌশলে তিনি সময়োপযোগী দৃঢ়তা দেখান। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে সামরিক শাসনের পতন এবং গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে তার নেতৃত্ব ইতিহাসে স্থায়ী আসন পায়

১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ছিল এই সরকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরা ছিল একটি কাঠামোগত পরিবর্তন, যা রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া সম্ভব হতো না। অর্থনীতি, শিক্ষা অবকাঠামো খাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক দুর্বলতা রাজনৈতিক বিরোধিতা সরকারের কার্যকারিতাকে সীমিত করে। তবু গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে এই সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ

১৯৯৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর বিরোধী দলে থেকেও খালেদা জিয়া ছিলেন আন্দোলনমুখর। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তার নেতৃত্বে আন্দোলন তীব্র হয়যা শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক সংস্কারে রূপ নেয়। এটি বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থার সংকট মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। একই বছরে নির্বাচনে পরাজয়ের পরও তিনি রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে দলের ভেতর ঐক্য বজায় রাখেন

২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দেন চারদলীয় জোট সরকারকে। এই মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি সামাজিক সূচকে কিছু অগ্রগতি দেখা যায়। তবে একই সঙ্গে সুশাসন, জঙ্গিবাদ দমন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা উঠে। বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সংঘাতমুখর সম্পর্ক সংসদীয় সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেযা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে জটিল করে তোলে

২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থায় খালেদা জিয়ার রাজনীতি এক নতুন পরীক্ষার মুখে পড়ে। গ্রেপ্তার, মামলা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার সময় তিনি ব্যক্তিগত রাজনৈতিকউভয় সংকটে পড়েন। তবু দল পুনর্গঠন নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রয়াস অব্যাহত থাকে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তিনি আপসহীন রাজনীতির প্রতীক হিসেবেই দলের ভেতরে সমর্থন বজায় রাখেন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘ অসুস্থতা, কারাবাস আইনি লড়াই খালেদা জিয়ার সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দেয়। রাজনৈতিক সক্রিয়তা সীমিত হলেও তার উপস্থিতি প্রতীকী শক্তিতে রূপ নেয়। সমর্থকদের কাছে তিনি প্রতিরোধের প্রতীক; সমালোচকদের কাছে তিনি বিতর্কিত শাসনের স্মৃতি। এই দ্বৈততা তার রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন তাই একরৈখিক নয়; বরং তা উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা বিতর্কের সমন্বয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গভীরতর করতে ব্যর্থতার দায়ও এড়ানো যায় না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নই দাবি করে। ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান, প্রতিহিংসার চেয়ে সংলাপ এবং ক্ষমতার চেয়ে নিয়মএই শিক্ষাই হয়তো তার দীর্ঘ সংগ্রাম থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উত্তরাধিকার

 


(মোঃ হেলাল উদ্দিন- শিক্ষক, লেখক ও গবেষক)

Thursday, January 1, 2026

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন: বহুদলীয় গণতন্ত্রের এক অধ্যায় -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া একটি স্বতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম সামরিক শাসন-পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার বিকাশে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য তিনি এমন এক সময়ে রাজনীতির নেতৃত্বে এসেছিলেন, যখন গণতন্ত্র ছিল ভঙ্গুর এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল পুনর্গঠনের অপেক্ষায়

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এই দর্শন ভৌগোলিক স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে রাষ্ট্রচিন্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছে এই চিন্তাধারা দেশের রাজনৈতিক পরিসরে বিকল্প মত বহুত্ববাদকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হয়েছে

গণতন্ত্রের প্রশ্নে খালেদা জিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকর পুনঃপ্রতিষ্ঠা ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেন, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক একই সঙ্গে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সূচনায় তাঁর ভূমিকা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্র সমাজের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বাজারভিত্তিক অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি উন্নয়নের একটি বাস্তবমুখী ধারণা তুলে ধরেন তাঁর শাসনামলে শিক্ষা, যোগাযোগ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ দেশের উন্নয়নচিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করে

নারী নেতৃত্বের প্রশ্নেও খালেদা জিয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি দীর্ঘদিন একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে দৃশ্যমান করেছে

 সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে সময়ের বিচারে তাঁর দর্শনের মূল্যায়ন হবে এই আলোকেতিনি কীভাবে গণতন্ত্রকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছেন

 

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন: বহুদলীয় গণতন্ত্রের এক অধ্যায় -- মোঃ হেলাল উদ্দিন