Wednesday, March 11, 2026

নীরবতা ও একটি আনব্লকড ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


ঢাকার ঘিঞ্জি গলির এক চিলতে মেসে যখন আশা প্রথম পা রাখে, তার চোখে তখন কেবল টিকে থাকার লড়াই। মধ্যবিত্ত বাবার কাঁধের ওপর থেকে পড়াশোনার খরচটা নামিয়ে নিতেই পাশের বাড়ির টিউশনিটা সে হাতে নেয়। সেখানেই তার পরিচয় অর্ক-র সাথে, যদিও সেই পরিচয় ছিল দীর্ঘ তিন বছরের এক অদ্ভুত নীরবতার।

​আশা যখন পড়াতে আসত, অর্ক তখন প্রায়ই চা আর বিস্কুটের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকত। তাদের মধ্যে কখনো কোনো কথা হয়নি। অথচ প্রতিবার ট্রে নামিয়ে রাখার সময় চার চোখের পলকহীন একটা মুহূর্ত থমকে থাকত। আশা দেখত অর্কর মার্জিত ভঙ্গি, আর অর্ক দেখত মেয়েটির চোখে লেগে থাকা একরাশ ক্লান্তি আর দায়িত্বের ছাপ। সপ্তাহে চার দিন, এভাবে কেটে গেল তিন-তিনটি বছর।

​বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হলো, অর্কর একটা ভালো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি হয়ে গেল। আশাও টিউশনি ছেড়ে দিল। কিন্তু অর্ক সেই নীরবতাটাকে আর বয়ে বেড়াতে পারছিল না। অনেক খুঁজে ফেসবুকে সে আশাকে ইনবক্স করল। প্রথম প্রথম আশা খুব জড়োসড়ো থাকলেও, ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে কথার পাহাড় জমতে শুরু করল। অর্ক তার সবটুকু আবেগ দিয়ে একদিন বলেই ফেলল— "আমি তোমাকে সেই প্রথম দিন থেকেই ভালোবাসি।"

​এক রাতে তাদের সেই আলাপন ছিল যেন তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো এক কষ্টকর অভিজ্ঞতা। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল, আর ফোনের নীল আলোয় দুই প্রান্তে দুটি মানুষ হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিচ্ছিল। রাত তখন ২টো বেজে ১৫ মিনিট। চারপাশ নিঝুম।

​অর্ক: "আশা, তুমি কি জানো সেই তিন বছর আমি শুধু তোমার পড়ানো শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতাম? এক কাপ চা হাতে তোমার সামনে যাওয়াটা ছিল আমার দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। অথচ আজ যখন সব আছে, তখন তুমি কেন বারবার আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছ?"

​আশা: "অর্ক, আমি একজন বড় মেয়ে যার পেছনে একটা ভাঙাচোরা পরিবার দাঁড়িয়ে আছে। আমার বাবার কাঁধটা এখন খুব ক্লান্ত। আমার ভাইবোনের ভবিষ্যৎ আমার ওপর। আমি যদি এখন আবেগের পিছে ছুটি, তবে ওদের স্বপ্নগুলো মরে যাবে।"

​অর্ক: "আমি তো তোমাকে ছেড়ে যেতে বলছি না! আমি তোমার পরিবারের দায়িত্ব নেব। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে রাজপুত্রী করে না রাখি, অন্তত কখনো চোখের জল পড়তে দেব না।"

​আশা: "ভালোবাসার মানুষটার কাছে ঋণী হয়ে বেঁচে থাকাটা খুব কষ্টের অর্ক। তুমি আমাকে দয়া করবে, কিন্তু আমার আত্মসম্মান তাতে ক্ষতবিক্ষত হবে। আমাদের মাঝে যে সামাজিক আর আর্থিক দেয়াল, সেটা টপকানোর শক্তি আমার নেই।"

​অর্ক: "দেয়ালটা তুমি তুলছো আশা, আমি না! আমি শুধু তোমাকে চাই। প্লিজ, একবার বলো যে তুমিও আমাকে ভালোবাসো। একবার বলো যে তুমি চেষ্টা করবে।"

​আশা চোখের জল মুছে টাইপ করল— "হ্যাঁ অর্ক, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু এই ভালোবাসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।" মুহূর্তেই অর্কর ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল— “You can't reply to this conversation.” আশা তার সিম কার্ডটা খুলে জানালার বাইরে বৃষ্টির আঁধারে ছুড়ে ফেলে দিল।

​ব্লক করে দেওয়ার পর অর্কর জীবনটা যেন এক থমকে যাওয়া ঘড়ির কাঁটা। সে পাগলের মতো আশাকে খুঁজেছে:

​পরদিন সকালেই অর্ক ছুটে গিয়েছিল সেই গলিতে, কিন্তু বাসার মালিক জানালেন, আশা মাসখানেক আগেই মেস ছেড়ে দিয়েছে।

​অফিসের লাঞ্চ ব্রেক চুরি করে সে ক্যাম্পাসে গিয়ে বসে থাকত। লাইব্রেরি, ক্যানটিন বা ডিপার্টমেন্টের করিডোরে অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে আশা যেন এক ফোঁটা জল হয়ে সমুদ্রে মিশে গিয়েছিল।

​অর্ক এখন আর চা খেতে পারে না। চায়ের কাপ হাতে নিলেই সেই পুরনো বিকেলের কথা মনে পড়ে যায়। মাঝে মাঝে সে নিজের অজান্তেই আশার সেই বন্ধ নম্বরে ফোন দেয়, আর ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে— "নম্বরটি আর ব্যবহৃত হচ্ছে না।"

​সময় পেরিয়ে গেছে সাত বছর। অর্ক এখন বড় কর্মকর্তা, কিন্তু আজও একা। সেদিন বনানীতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। সুপারশপের সামনে অর্কর নজর গেল এক মহিলার দিকে। হাতে পুরনো ছাতা, এক হাতে বাজারের ব্যাগ। অর্কর হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

​অর্ক গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গেল। "আশা?"

মেয়েটি চমকে তাকাল। সেই পরিচিত চোখ, তবে তাতে এখন গভীর স্থবিরতা।

"অর্ক? আপনি এখানে?"

​সেদিন কফিশপে বসে সাত বছরের জমানো কথাগুলো বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো এল। আশা জানাল, সে তার ভাইবোনদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। অর্ক আশার হাতটা শক্ত করে ধরল।

"সাত বছর আগে তুমি আমাকে ব্লক করেছিলে আশা, কিন্তু আমার মন থেকে তোমাকে সরাতে পারোনি। এবার কি আমার হাতটা ধরা যায় না?"

আশা এবার আর মুখ ফিরিয়ে নিল না। অর্কর চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল।

​মাসখানেক পর, খুব সাদামাটাভাবে তাদের বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের পর প্রথম বৃষ্টির দিন অর্ক রান্নাঘরে ঢুকল। ট্রে-তে করে দু'কাপ চা আর বিস্কুট নিয়ে সে বারান্দায় গেল।

অর্ক হাসিমুখে ট্রে-টা সামনে ধরল— "সেদিন টিউশনিতে চা নিয়ে আসতাম, কথা হতো না। আজ আমি তোমার স্বামী, আজ কি চা খেতে খেতে সাত বছরের সব গল্প করা যাবে?"

 

​আশা অর্কর কাঁধে মাথা রাখল। যে ভালোবাসা এক রাতে ব্লক হয়ে গিয়েছিল, তা আজ সারাজীবনের জন্য আনব্লক হয়ে গেল।
 
 
 May be an image of one or more people, people smiling and text that says "UT নীরবতা 3 একটি আনব্লকড ভালোবাসা মোঃ হেলালি উদ্দিন"

নীরবতা ও একটি আনব্লকড ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

No comments:

Post a Comment