অয়ন আর নীলার সম্পর্কটা কোনো সংজ্ঞায় বাঁধা ছিল না। তারা কাজিন, কিন্তু তাদের মাঝের টানটা ছিল তার চেয়েও গভীর। ছোটবেলায় তারা ছিল অবিচ্ছেদ্য। এক সাথে টিভি দেখা, রিমোট নিয়ে কামড়াকামড়ি, আর ঝগড়ার পর আবার এক প্লেটে খাওয়া—এসবই ছিল নিত্যদিনের চিত্র।
সবচেয়ে
অদ্ভুত ছিল তাদের সেই সিনেমার সময়গুলো। ড্রয়িংরুমের সেই চওড়া সোফায় বা এক
চেয়ারে গুটিসুটি মেরে বসে যখন তারা সিনেমা দেখত, তখন পর্দা আর বাস্তবের
মাঝের দেয়ালটা মুছে যেত। পর্দার নায়ক-নায়িকা যখন প্রেমে পড়ত, অয়ন আর নীলাও
কিশোর বয়সের অবুঝ আবেগে একে অপরের হাত ধরত, কপালে কপাল ঠেকাত। সেই
রোমাঞ্চকর দৃশ্যগুলো ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব একটা পৃথিবী।
তারপর
জীবন তার আপন গতিতে চলে গেল। নীলার বিয়ে হয়ে গেল অন্য শহরে, আর অয়ন চলে
গেল সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ে। যোগাযোগ থাকল না, শুধু স্মৃতির অ্যালবামে
কিছু ঝাপসা ছবি রয়ে গেল।
আজ
বারো বছর পর স্টেশনে হঠাৎ দেখা। অয়ন ফিরছিল প্রবাস থেকে, আর নীলা হয়তো
কোথাও যাচ্ছিল। কেউ কাউকে চিনতে ভুল করেনি। নীল রঙের শাড়িতে নীলাকে অনেক
বেশি পরিণত আর গম্ভীর লাগছিল, কিন্তু তার চোখে সেই পুরনো চঞ্চলতাটা যেন
এখনো লুকানো।
"অয়ন! তুই এখানে?" নীলার কণ্ঠে সেই পরিচিত সুর।
দুজন
অনেক কথা বলল। হারানো দিনগুলো, প্রবাসের একাকিত্ব, নীলার সংসার—সবই উঠে এল
কথায় কথায়। কিন্তু অবচেতনেই দুজন এড়িয়ে যাচ্ছিল সেই কৈশোরের সেইসব নিষিদ্ধ
মায়ার মুহূর্তগুলোকে।
ট্রেন
আসার সময় হলো। অয়ন ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নীলার সামনে দাঁড়াল। আজ তার মনে এক
বিচিত্র অপরাধবোধ কাজ করছিল। সে নীলার হাতটা আলতো করে ধরে বলল, "নীলা,
ছোটবেলায় কত দুষ্টুমি করেছি, কতবার হয়তো তোকে বিব্রত করেছি... সিনেমার মতো
সেইসব আদিখ্যেতা আর রোমাঞ্চকর স্মৃতির জন্য আজ ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি রে। জানি
না আর দেখা হবে কি না।"
অয়ন একটু ঝুঁকে বিদায়বেলায় নীলার কপালে একটা পবিত্র আদরের চিহ্ন এঁকে দিল। সে ভেবেছিল এটাই হয়তো শেষ।
কিন্তু
নীলা সরে গেল না। তার চোখে তখন জল টলমল করছে, আর ঠোঁটে এক মায়াবী হাসি। সে
অয়নের হাতটা চেপে ধরে খুব কাছে এগিয়ে এল। ফিসফিস করে বলল, "শুধু কপালে
কেন? বড় হয়ে গেছি বলে কি অধিকার বদলে গেছে? আমি গালেও আদর চাই।"
অয়ন
থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো স্টেশনের কোলাহল থেমে গেছে, ট্রেনের
ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। তারা আবার সেই এক যুগ আগের সিনেমার নায়ক-নায়িকা হয়ে
গেছে। অয়ন নীলার দুই গালে আলতো করে হাত রাখল। সেই স্পর্শে মিশে ছিল এক
যুগের দীর্ঘশ্বাস আর অপূর্ণ ইচ্ছা। তারা দুজনেই যেন হারিয়ে গেল সেই
রোমাঞ্চকর ঘোরে।
ট্রেন
ছেড়ে দিল। অয়ন দাঁড়িয়ে দেখল নীলা জানলার পাশে বসে হাত নাড়ছে। ট্রেনটা
ধোঁয়া উড়িয়ে দূরে চলে যাচ্ছে, কিন্তু বাতাসে রয়ে গেছে এক যুগ আগের সেই
পুরনো সিনেমার সুবাস।
এক যুগ পরের রূপালি পর্দা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
No comments:
Post a Comment