নীলার ঘরটা সবসময় একটু অগোছালো থাকতো। বইয়ের ওপর বই, আধখাওয়া কফির কাপ, আর জানালার পাশে স্তূপ হয়ে থাকা না পড়া খবরের কাগজ। বন্ধুরা বলতো, "নীলা, একটু গুছিয়ে রাখিস তো!" নীলা হাসত। মনে মনে বলত, ‘একজন আসবে। সে এসে সবকিছু তার নিজের মতো করে সাজিয়ে দেবে। আমার অগোছালো জীবনটা তার ছোঁয়ায় পরিপাটি হয়ে উঠবে।’
সেই একজনের নাম ছিল আরিশ। আরিশের জন্য নীলা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছে। নিজের ক্যারিয়ার, নিজের শখ, এমনকি নিজের ভালো লাগাগুলোকেও সে তুচ্ছ করেছিল আরিশের খুশির কাছে। ভেবেছিল, আরিশ যখন আসবে, তখন তার হাত ধরেই নীলার সব শূন্যতা পূর্ণ হবে।
দশ বছর পর একদিন আরিশ এলো। কিন্তু সে এলো অন্য এক পৃথিবী নিয়ে। তার চোখেমুখে নীলার জন্য কোনো মায়া ছিল না, ছিল কেবল নিজের সাফল্যের গল্প। নীলা অবাক হয়ে দেখল, যে মানুষটার অপেক্ষায় সে নিজের ঘরটা অগোছালো রেখেছিল, সেই মানুষটার ডায়েরিতে নীলার জন্য এক ইঞ্চি জায়গাও নেই। আরিশ তার নিজের গোছানো জীবনে এতটাই মগ্ন যে, নীলার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকুও তার নজরে এলো না।
সেদিন বিকেলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীলা এক অদ্ভুত সত্য আবিষ্কার করল। সে যার অপেক্ষায় নিজের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছিল, সে আসলে কোনোদিন নীলার ছিলই না। মানুষ আসলে বড় একা। কেউ কারো ভাঙা ঘর তিলে তিলে গড়ে দেয় না। বরং কেউ কেউ আসে ঘরটাকে আরও একটু এলোমেলো করে দিয়ে যাওয়ার জন্য।
নীলা আয়নার সামনে দাঁড়াল। অনেকদিন পর নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেখানে এক ক্লান্ত নারী দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারল, এই পৃথিবীতে মানুষ কেবল জন্ম আর মৃত্যুর জন্যই কারো অপেক্ষায় থাকে। জন্মের সময় মা অপেক্ষা করেন, আর মৃত্যুর সময় অপেক্ষা করে কবরের নিস্তব্ধতা। মাঝখানের এই দীর্ঘ পথটা নিজেকেই পাড়ি দিতে হয়।
সেদিন সন্ধ্যায় নীলা প্রথমবার নিজের ঘরটা একা হাতে গোছাতে শুরু করল। পর্দাগুলো টেনে দিল, ধুলোবালি ঝাড়ল। সে বুঝে গেছে, তার ভালো থাকার দায়িত্ব আর কেউ নেবে না। নিজের ভালো থাকাটা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়।

No comments:
Post a Comment