Md. Helal Uddin

Teacher, Writer & Researcher

Wednesday, May 6, 2026

মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মহাসড়কের ধুলোভেজা বিকেল। দূরে সারি সারি বাস—যেন স্থির নদীর ওপর থমকে থাকা নৌকা। হেডলাইটগুলো জ্বলছে, নিভছে, আবার জ্বলছে—ঠিক যেন অপেক্ষার চোখ।

তাসফিয়া জানালার পাশে বসে মোবাইল তুলে একটা ছবি তোলে। ছবির ক্যাপশনে লিখে—
“কখন যে ঢাকায় পৌঁছাতে পারবো, জানিনা...”

স্টোরি আপলোড হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই আসে—
—“আপনি কোন বাসে আছেন?”

তাসফিয়া একটু থামে। নামটা দেখে চিনতে পারে—তাওসিফ। বহুদিনের ফেসবুক ফ্রেন্ড, অথচ একটাও কথা হয়নি কখনো।
সে ছোট করে উত্তর দেয়—
—“গ্রীণ লাইন।”

ওপাশ থেকে আবার—
—“আপনি কি জ্যামে?”

—“হ্যাঁ। আপনি?”

একটু দেরি করে রিপ্লাই আসে—
—“হুম… তবে ঢাকায় যাচ্ছি না। মাঝপথে নেমে যাবো।”

এই ছোট্ট কথোপকথন—যেন একটা দরজা। অদৃশ্য, অথচ খোলা।

তারপর দিন যায়। কথাও বাড়ে।

প্রথমে খোঁজখবর, তারপর গল্প, তারপর নীরবতাও যেন কথা হয়ে ওঠে।

তাওসিফ শব্দের মানুষ। ব্যাংকের ফাইলের ভেতরে তার দিন আটকে থাকলেও, রাত হলেই সে শব্দে আশ্রয় নেয়। কবিতা লেখে। আবৃত্তি করে। তার শব্দে নদী থাকে, কুয়াশা থাকে, আর অদ্ভুত এক শূন্যতা থাকে—যেটা তাসফিয়ার খুব পরিচিত লাগে।

তাসফিয়া মানুষ গড়ার কাজ করে—শিক্ষক। ক্লাসরুমে তার কণ্ঠ দৃঢ়, কিন্তু নিজের জীবনে সে যেন একটু ভেসে থাকা মানুষ। শাড়ি তার ভালোবাসা—প্রতিটি শাড়ি যেন একেকটা ঋতু। নতুন শাড়ি পরে নতুন জায়গায় গেলে সে ছবি তোলে—আর সেই ছবির নিচে তাওসিফ লিখে ফেলে কবিতা।

“তোমার শাড়ির আঁচলে আজকে বিকেলের রোদ আটকে গেছে—
আমি দূর থেকে শুধু আলোর গন্ধ পাই…”

এমন লাইন পড়ে তাসফিয়া চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় না, কিন্তু পড়ার পর তার ভেতরে কিছু নরম হয়ে যায়।

একদিন তাওসিফ একটা কবিতা লিখলো—

“দেখা হোক কোনো এক অনির্ধারিত দুপুরে—
যেখানে সময় থেমে থাকবে চায়ের কাপের ধোঁয়ায়,
আর আমরা দু’জন—
অচেনা হয়েও পরিচিত হয়ে উঠবো…”

কবিতাটা পড়ার পর তাসফিয়া অনেকক্ষণ কিছু লেখে না। শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত ইচ্ছে জন্ম নেয়—
দেখা করার।

কিন্তু কেউ কাউকে বলে না।

হঠাৎ একদিন—
একটা শপিংমলের ভিড়ে—
দু’জনের চোখে চোখ পড়ে।

যেন গল্পের ভেতর থেকে বাস্তব হঠাৎ বের হয়ে এসেছে।

—“তাসফিয়া?”
—“তাওসিফ?”

দু’জনেই একটু হেসে ফেলে।
সময় তখন খুব কম। কথা হয় অল্প—
তবুও সেই অল্প কথার মধ্যে অদ্ভুত এক স্বাচ্ছন্দ্য।

বিদায়ের আগে তাওসিফ বলে—
“একদিন কফি খাওয়া যেতে পারে…”

তাসফিয়া মাথা নাড়ে—
“হতে পারে।”

তারপর আবার তারা ফিরে যায় নিজেদের জীবনে।
কিন্তু এবার কথাগুলো বদলে যায়।

মাঝে মাঝে কথা হয়—
কিন্তু না বললেও অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।

এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।
বন্ধুত্ব?
ভালোবাসা?
নাকি শুধু অভ্যাস?

তারা কেউই জানে না।

তবুও—
রাতের শেষে দু’জনেই অপেক্ষা করে—
একটা “অনলাইন” দেখার জন্য।


একদিন হঠাৎ তাসফিয়া জানতে পারে—
তাওসিফ যেই “মাঝপথে নেমে যাবো” বলেছিল—
সেটা শুধু বাসের কথা ছিল না।

তাওসিফ আসলে একটা সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসছিল।
একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত, ভাঙা সম্পর্ক।

আর তাসফিয়া?
সে বুঝতে পারে—
সে হয়তো তাওসিফের “শেষ গন্তব্য” না—
বরং সেই “মাঝপথ”—
যেখানে মানুষ একটু থামে, শ্বাস নেয়, আবার এগিয়ে যায়।


তাসফিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। নতুন একটা শাড়ি পরে আছে।
মোবাইলে একটা মেসেজ টাইপ করে—

“আজ কফি খাওয়া যাবে?”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই আসে—

“আজ না…
আমি একটু দূরে যাচ্ছি।”

তাসফিয়া ফোনটা নামিয়ে রাখে।
হাসে। খুব হালকা একটা হাসি।

কারণ সে জানে—
সব গল্পের শেষ একসাথে হওয়া না।
কিছু গল্প শুধু সুন্দরভাবে অসম্পূর্ণ থাকার জন্যই জন্ম নেয়।

আর দূরে কোথাও—
মহাসড়কে আবার বাসের লাইন দাঁড়িয়ে থাকে—
যেন সময় এখনও কোথাও আটকে আছে…

 

 মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Posted by Md. Helal Uddin at Wednesday, May 06, 2026 No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest
Labels: গল্প, মাঝপথের মানুষ
Md. Helal Uddin
Teacher, Writer & Researcher

Saturday, May 2, 2026

নীল ডায়েরির অমীমাংসিত পাতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নতুন স্কুল, নতুন বেঞ্চ, নতুন গন্ধ—চক আর কাগজের মিশ্র এক অচেনা সকাল। প্রথম দিন প্রথম ক্লাসে ঢুকেই চোখ আটকে গিয়েছিল। বোর্ডে তাকানোর কথা ছিল, অথচ চোখ চলে গিয়েছিল জানালার ধারে বসে থাকা মেয়েটির চোখে। অদ্ভুত শান্ত, অথচ কৌতূহলে ভরা—ঠিক যেন অপরিচিত কোনো নদী, যার দিকে তাকালে নামতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নামার সাহস নেই।

সে ছিল ইংরেজি ম্যাডামের মেয়ে।

প্রথমে কিছুই হয়নি। নাম জানা হয়নি, কথাও হয়নি। শুধু প্রতিদিন ক্লাসে ঢুকে অজান্তেই তার বেঞ্চের দিকে তাকানো—এইটুকুই। কয়েকদিন পর ম্যাডাম লক্ষ্য করলেন, ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। ইংরেজি ক্লাসে উত্তরগুলো ঠিকঠাক আসে, উচ্চারণে জড়তা নেই। সুনজরটা তখন থেকেই। ম্যাডাম কখনো হাসেন, কখনো বাড়ির কাজ ভালো হলে খাতায় লাল কালি দিয়ে “Very Good” লিখে দেন।

একদিন ম্যাডাম বললেন,

— আজ বিকেলে আমার বাসায় এসো। একটু গাইড দেব।

বাসায় গিয়ে দেখা হলো মেয়েটার সঙ্গে। স্কুলের চেয়ে বাসায় সে অন্যরকম—চুল খোলা, পায়ে শব্দহীন চটি, চোখে একই রকম নীরব আলো। পড়া শেষে খেলনা বের হলো। লুডু, ক্যারাম, কখনো লুকোচুরি। প্রথম প্রথম কথা কম, পরে হাসি বাড়ে। ছেলেটা বুঝে যায়—এই হাসিটাই সে প্রতিদিন ক্লাসে খুঁজে ফেরে।

এরপর দিনগুলো যেন এক সুতোয় গাঁথা। প্রতিদিন ক্লাসে একসাথে বসা, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, বাসায় গিয়ে পড়া—সবই স্বাভাবিক, অথচ অদ্ভুতভাবে বিশেষ। স্কুলের অন্য ছাত্রছাত্রীরা ফিসফিস করে, চোখাচোখি করে। কেউ বলে, “প্রেমিক-প্রেমিকা!” তারা দু’জন কিছু বলে না। নাম না দেওয়া সম্পর্কটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।

দুই বছর কেটে যায় এভাবেই। স্কুলের দেয়ালে নতুন পোস্টার, মাঠে নতুন দাগ, অথচ তাদের জায়গাটা একই থাকে—একই বেঞ্চ, একই জানালার আলো। কখনো ঝগড়া হয়নি, কখনো বড় করে কথা হয়নি। শুধু একধরনের নিশ্চুপ টান—যেটা না বলা ভালো, না লুকানো যায়।

তারপর হঠাৎই সব বদলে গেল।

ছেলেটাকে অন্য স্কুলে ভর্তি হতে হলো। শেষ দিন সে জানত, কিন্তু বলার সাহস পায়নি। মেয়েটা জানত কি না, সেটাও জানা হয়নি। শেষ ক্লাসে চোখাচোখি হয়েছিল মাত্র একবার। কিছু বলার ছিল, অনেক কিছু—কিন্তু ঘণ্টা বেজে উঠেছিল।

এরপর আর দেখা হয়নি। কোনো রাস্তার মোড়ে নয়, কোনো উৎসবে নয়, এমনকি স্বপ্নেও নয়। সময় এগিয়েছে, নাম ভুলে গেছে হয়তো, মুখের রেখাও ঝাপসা। তবু কোথাও একটা টান রয়ে গেছে—অকারণ, অদৃশ্য, অথচ জেদি।

আজও ইংরেজি বই খুললে প্রথম পাতায় চোখ আটকে যায়। বোর্ডে লেখা কোনো বাক্যের মাঝখানে হঠাৎ মনে পড়ে যায় জানালার ধারের সেই চোখদুটি। তখন মনে হয়—সব প্রেম পূর্ণতা পায় না। কিছু প্রেম স্কুলের বেঞ্চেই থেকে যায়, খাতার ভাঁজে, পুরনো দিনের নীরবতায়।
 
 

নীল ডায়েরির অমীমাংসিত পাতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

Posted by Md. Helal Uddin at Saturday, May 02, 2026 No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest
Labels: আবদ্ধ, গল্প
Md. Helal Uddin
Teacher, Writer & Researcher

নীল জলধির উপাখ্যান -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে মানুষের দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু নীলয় আজ সেখানে দাঁড়িয়েছে নিজের হাহাকার বিসর্জন দিতে। আজ পূর্ণিমা। আকাশের চাঁদটা যেন খুব নিচে নেমে এসেছে, ঠিক যেমনটা কবিতায় বলে— ‘আকাশের চাঁদ মর্ত্যে নামলো, রূপের আঁচল মেলে।’

​সামনে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। রূপালি চাঁদনি যখন ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে আছড়ে পড়ছে, নীলয়ের মনে হচ্ছে সমুদ্রটা আজ কোনো লোনা জলের পাহাড় নয়, বরং এক বিশাল আয়না। সেই শান্ত জলের দর্পণে বারবার ভেসে উঠছে একটি মুখ। চাঁদনী।

​স্মৃতির বালুচর

​নীলয় হাত বাড়িয়ে ঢেউয়ের ঝিকিমিকি ধরতে চাইল। কিন্তু আঙুলের ফাঁক দিয়ে শুধু নোনা জল গলে পড়ল। ঠিক যেমন তিন বছর আগে চাঁদনী গলে গিয়েছিল ওর জীবন থেকে। চাঁদনী এখন অনেক দূরে, হয়তো অন্য কোনো শহরের কৃত্রিম আলোয় সে ব্যস্ত। কিন্তু নীলয়ের কাছে সে আজও সেই লোনা হাওয়ায় মিশে থাকা এক চেনা ঘ্রাণ।

​চারপাশ নিঝুম। শুধু সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। নীলয় বিড়বিড় করে বলল, "জানি হবে না মেটানো কভু, এ যে বিরহের এক কৃষ্ণা।" সত্যি তো, কিছু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য কোনো জল থাকে না।

​পাথুরে নীরবতা

​সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো যখন বালুচরে আছড়ে পড়ছে, নীলয়ের বুকের ভেতরটা তখন বিদীর্ণ হচ্ছে এক তীব্র চিৎকারে। ওর ইচ্ছে করছিল আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে— “তোমায় বড় ভালোবাসি!” কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, যখনই সে মুখ খুলতে চাইল, শব্দরা যেন পাথর হয়ে গলার কাছে আটকে গেল। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ভয় থেকে যে নীরবতার জন্ম হয়েছিল, আজ সেই নীরবতাই তাকে গ্রাস করেছে। সমুদ্র সাক্ষী রইল এক ব্যর্থ প্রেমিকের, যার ঠোঁট দুটো পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে, অথচ হৃদয়ে জ্বলছে দাবানল।

​শেষ প্রহর

​রাত বাড়ে। চাঁদের আলো আরও মায়াবী হয়। নীলয় একা বালুচরে বসে থাকে। সে জানে, এই মায়াবী কায়া কেবলই তার মনের ভুল। চাঁদনী পাশে নেই, তবুও তার অস্তিত্ব এই নোনা জল আর বালুর কণে কণে মিশে আছে।

​ভালোবাসার না বলা কথাগুলো আজ দীর্ঘশ্বাস হয়ে লোনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। নীলয় বুঝল, কিছু মানুষকে আগলে রাখার চেয়েও বেশি কঠিন হলো তাদের ছাড়া বেঁচে থাকা, বিশেষ করে যখন সেই মানুষটিই হয় ‘জগতের সবচেয়ে দামি’ সম্পদ।
 
 
 

নীল জলধির উপাখ্যান -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

 

Posted by Md. Helal Uddin at Saturday, May 02, 2026 No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest
Labels: আবদ্ধ, গল্প
Md. Helal Uddin
Teacher, Writer & Researcher

ভালোবাসার নীল নকশা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 ভালোবাসি, তোমাকে অনেক ভালোবাসি
এ কথা হাজার বার বলা যায় মুখে,
কিন্তু ভালোবাসার প্রকাশ?
ভালোবাসি মুখে বললেই হয়ে যায় না।
ভালোবাসা কার্যে প্রকাশ পায়।
তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না,
তুমি আমার দিন রাত, জীবন, কতো কিছু
কিন্তু? তোমার উপর ভরসা রাখি না।,
তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি না,
এরই নাম কি তবে ভালোবাসা?
জানিনা, এখন জানতে ইচ্ছেও করে না।
কারণ, আমার কাছে ভালোবাসা মানে
শৃঙ্খলে আবদ্ধ, বাকরুদ্ধ জীবনের নাম না।
ভালোবাসায় বিশ্বাস থাকার দরকার
বিশ্বাসের মর্যাদা দেয়া দরকার,
ভালোবাসায় স্বাধীনতা থাকা দরকার।
খাঁচায় বদ্ধ করে পাখি পোষার নাম ভালোবাসা না।
খাঁচার বাইরে রেখে ধরে রাখতে পারাটাই ভালোবাসা।
ভালোবাসলে পাখি কখনো উড়ে যায় না,
সে ঘুরে ফিরে তার কাছেই আসে।
কারণ সেই ভালোবাসা অন্য কোথাও পায় না।
ভালোবাসা এমনই হতে হয়,
ভালোবাসা তৈরি হয়, ভালবাসা সৃষ্টি করতে হয়।
ভালোবাসলে বিশ্বাস করতে হয়।
ভালোবাসা হারায় না, হারাতে পারে না।

ভালোবাসার নীল নকশা 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Posted by Md. Helal Uddin at Saturday, May 02, 2026 No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest
Labels: কবিতা, মাধবীলতা
Md. Helal Uddin
Teacher, Writer & Researcher

যে প্রেম ছোঁয়নি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 রাইসার জীবনে দ্বিতীয়বার বিশ্বাস শব্দটা আসেনি সহজে। ডিভোর্সের পর সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল—ক্যারিয়ার, সম্মান, আত্মনির্ভরতা। তবু রাতের বেলা জানালার পাশে দাঁড়ালে বুকের ভেতর একটা অপূর্ণ জায়গা হাহাকার করতো। সেই হাহাকার থেকেই কবিতা। শব্দের ভেতর সে নিজের শরীর নয়, নিজের মন খুলে দিত।

আদনানের সাথে পরিচয়টা তাই স্বাভাবিকের চেয়েও আলাদা ছিল। সে কবিতা লেখে না, কিন্তু কবিতা পড়ার সময় শব্দের ফাঁকে ফাঁকে মানুষ খোঁজে। রাইসার কবিতার নিচে তার মন্তব্যগুলো ছিল ছোট, কিন্তু গভীর। “এই লাইনে থেমে গিয়েছিলাম”—এই ধরনের কথা।

ইনবক্সে কথাবার্তা শুরু হয়। প্রথমে কবিতা, তারপর কাজ, তারপর জীবন। রাইসা লক্ষ করে—এই ছেলেটা তাকে জানতে চায়, পেতে চায় না। প্রশ্ন করে, কিন্তু চাপ দেয় না। ধীরে ধীরে সেই সতর্ক দেয়ালগুলোতে ফাটল ধরে।

প্রথম দেখা হয় এক বিকেলে। ক্যাফেতে বসে রাইসা একটু নার্ভাস ছিল, কিন্তু আদনান ছিল স্বাভাবিক। চোখে এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা। সে চোখে চোখ রাখে, কিন্তু দখল নিতে চায় না। সেই না-চাওয়াটাই রাইসার ভেতরে অদ্ভুত আলোড়ন তোলে।

সেদিনের পর কথা আরও বাড়ে। দেখা আরও হয়। কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো হাঁটতে হাঁটতে। একদিন বৃষ্টিতে ভিজে তারা একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়েছিল। রাইসা ঠাণ্ডায় কাঁপছিল। সে মনে মনে চেয়েছিল—আদনান অন্তত হাতটা রাখুক কাঁধে। কিন্তু আদনান শুধু জিজ্ঞেস করেছিল,

“ঠাণ্ডা লাগছে? কফি খাবেন?”

রাইসা অবাক হয়েছিল। বিরক্তও। কিন্তু তখনও সে কিছু বলেনি।

এরপর এক সন্ধ্যায়, রাইসা আর নিজেকে থামাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, সমাজের দৃষ্টি, ভাঙা সংসারের স্মৃতি—সব মিলিয়ে সে চেয়েছিল একটু ছোঁয়া। ভালোবাসার নিশ্চয়তা। সে নিজেই আদনানের কাছে এগিয়ে গিয়েছিল।

আদনান পিছিয়ে যায়নি আতঙ্কে, কিন্তু থামিয়ে দিয়েছিল দৃঢ়তায়।

সে শান্ত গলায় বলেছিল,

“রাইসা আপু, আমি চাই আমাদের সম্পর্কটা আগে মানুষ হিসেবে পাকাপোক্ত হোক। আমি আপনাকে চাই—কিন্তু দখল করে নয়। ছুঁয়ে নয়।”

সেই রাতেই রাইসা কেঁদেছিল। কারণ কেউ তাকে এত সম্মান করে প্রত্যাখ্যান করেনি কখনও।

তবু সম্পর্ক ভাঙেনি সঙ্গে সঙ্গে।

পরের কিছু দিন তারা আবার কথা বলেছে। আবার দেখা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটা দেখা রাইসার জন্য হয়ে উঠেছে পরীক্ষার মতো। সে শাড়ি পরে এসেছে একটু যত্ন করে, চুলে সুগন্ধি দিয়েছে। আদনান প্রশংসা করেছে, কিন্তু হাত বাড়ায়নি।

একদিন সিনেমা হলে অন্ধকারে বসে রাইসা ইচ্ছে করে একটু কাছে সরে এসেছিল। আদনান হালকা করে সিটের হাতলে সরে গেছে। সেই ছোট্ট সরে যাওয়াটা রাইসার বুকে বড় আঘাত করেছিল।

তার মনে হয়েছিল—

“আমি কি তবে অপ্রয়োজনীয়?

আমি কি শুধুই গল্প আর কবিতার মানুষ?”

শেষ দেখা হয় এক বিকেলে। আকাশ ভারী ছিল। রাইসা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি।

সে বলেছিল,

“তুমি জানো, আমি কী চাই। তবু তুমি ইচ্ছে করেই আমাকে ছুঁও না।”

আদনান উত্তর দিয়েছিল,

“কারণ আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”

রাইসা হেসেছিল—কঠিন, তিক্ত হাসি।

“তুমি আমাকে আগেই হারিয়েছ। যে পুরুষ ছোঁয়ার সাহস রাখে না, সে ভালোবাসার দায়িত্বও নিতে পারে না। তুমি ভিতু। কাপুরুষ।”

এই কথাগুলো বলেই সে উঠে চলে যায়। আর ফিরে তাকায়নি।

এরপর ব্লক। নীরবতা। কবিতাগুলো মুছে ফেলা। জীবন আবার আগের মতো সাজানো।

অনেকদিন পর, আদনান এক রাতে একটা পুরোনো স্ক্রিনশট খুঁজে পায়—রাইসার একটি কবিতা। সেখানে লেখা ছিল:

“যে আমাকে ছুঁতে চায় না, সে কি আমায় সত্যিই চায়?”

আদনান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। উত্তর লেখে না।

কারণ কিছু প্রেম ছোঁয়ার আগেই ভেঙে যায়।

আর কিছু মানুষ কষ্ট দিয়ে চলে যায়—শুধু এই কারণে যে, তারা ভালোবাসা আর স্পর্শকে এক করে ফেলেছিল।

 

 

যে প্রেম ছোঁয়নি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

Posted by Md. Helal Uddin at Saturday, May 02, 2026 No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest
Labels: আবদ্ধ, গল্প
Md. Helal Uddin
Teacher, Writer & Researcher
Newer Posts Older Posts Home
Subscribe to: Posts (Atom)

Search This Blog


Md.Helal Uddin
  • Home
  • About Me
  • Contact Me
  • Privacy Policy
  • Facebook Page
  • Facebook Group
  • YouTube Channel

Labels

  • Article (7)
  • অনামিকা (31)
  • অনুকাব্য (10)
  • অনুপ্রেরণার কথা (6)
  • আবদ্ধ (20)
  • আমি কবি হতে চাই (43)
  • কবিতা (115)
  • গল্প (27)
  • জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেল (5)
  • নৈতিকতা মূল্যবোধ ও সুশাসন (5)
  • প্রবন্ধ (38)
  • বঙ্গবন্ধু পাঠ (8)
  • বুক রিভিউ (42)
  • মাঝপথের মানুষ (7)
  • মাধবীলতা (36)
  • মানসী স্টুডিও (4)
  • যাপিত জীবনের কথা (2)
  • শব্দের কারুকাজ: কবিতা লেখার সহজ পাঠ (5)
  • সংবিধানের সহজপাঠ (5)
  • সামাজিক গবেষণা পদ্ধতির সহজপাঠ (10)

Popular Posts

  • একটি গবেষণা প্রস্তাব লেখার পদ্ধতি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
      একটি গবেষণা প্রস্তাব লেখার পদ্ধতি গবেষণা প্রস্তাব হলো একজন গবেষক যে বিষয়ে গবেষণা করতে চায় তার একটি পরিকল্পিত লিখিত রুপ। যেখানে গবেষণার...
  • থিসিস লেখার নিয়ম ও সম্পাদনা পদ্ধতি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
      থিসিস লেখার নিয়ম ও সম্পাদনা পদ্ধতি যে কোন বিষয়ে গবেষণা পরিচালনার শেষ ধাপ হলো থিসিস লেখা এবং তা সম্পাদনা করে জমা দেয়া। থিসিস লেখা ও সম্...
  • অনামিকা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
      অনামিকা কি নাম দিব তোমার অণিমা, তনিমা কিংবা থাকুক না অনামিকা নাম দিয়ে কি-বা হবে তুমি যে তোমার তুলনা।। অনামিকা তুমি জানোনা তোমায় দেখার পর আ...
  • আবদ্ধ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
      কোথাও আলো-বাতাস নেই—এমন একটি বদ্ধ ঘরে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় বসে আছে সুনয়না। বসে আছে বলা ঠিক নয়; জোর করে তুলে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। শেষ বিক...
  • সংবিধানের সহজপাঠ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
      ' সংবিধানের সহজপাঠ ' বইটি পড়তে/ পিডিএফ কপি ডাউনলোড দিতে Click Here

Total Pageviews

Followers

Blog Archive

  • ►  2022 (72)
    • January (6)
    • February (6)
    • March (6)
    • April (6)
    • May (6)
    • June (6)
    • July (6)
    • August (6)
    • September (6)
    • October (6)
    • November (6)
    • December (6)
  • ►  2023 (60)
    • January (5)
    • February (5)
    • March (5)
    • April (5)
    • May (5)
    • June (5)
    • July (5)
    • August (5)
    • September (5)
    • October (5)
    • November (5)
    • December (5)
  • ►  2024 (60)
    • January (5)
    • February (5)
    • March (5)
    • April (5)
    • May (5)
    • June (5)
    • July (5)
    • August (5)
    • September (5)
    • October (5)
    • November (5)
    • December (5)
  • ►  2025 (48)
    • January (4)
    • February (4)
    • March (4)
    • April (4)
    • May (4)
    • June (4)
    • July (4)
    • August (4)
    • September (4)
    • October (4)
    • November (4)
    • December (4)
  • ▼  2026 (50)
    • January (5)
    • February (5)
    • March (10)
    • April (8)
    • May (5)
    • June (5)
    • July (6)
    • August (6)

Contact Form

Name

Email *

Message *

About Me

My photo
Md. Helal Uddin
Teacher, Writer & Researcher
View my complete profile

Blog Archive

Important Links

  • YouTube
  • LinkedIn
  • Facebook
  • Instagram
Md. Helal Uddin. Ethereal theme. Theme images by rami_ba. Powered by Blogger.