সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে মানুষের দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু নীলয় আজ সেখানে দাঁড়িয়েছে নিজের হাহাকার বিসর্জন দিতে। আজ পূর্ণিমা। আকাশের চাঁদটা যেন খুব নিচে নেমে এসেছে, ঠিক যেমনটা কবিতায় বলে— ‘আকাশের চাঁদ মর্ত্যে নামলো, রূপের আঁচল মেলে।’
সামনে
দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। রূপালি চাঁদনি যখন ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে আছড়ে পড়ছে,
নীলয়ের মনে হচ্ছে সমুদ্রটা আজ কোনো লোনা জলের পাহাড় নয়, বরং এক বিশাল আয়না।
সেই শান্ত জলের দর্পণে বারবার ভেসে উঠছে একটি মুখ। চাঁদনী।
স্মৃতির বালুচর
নীলয়
হাত বাড়িয়ে ঢেউয়ের ঝিকিমিকি ধরতে চাইল। কিন্তু আঙুলের ফাঁক দিয়ে শুধু নোনা
জল গলে পড়ল। ঠিক যেমন তিন বছর আগে চাঁদনী গলে গিয়েছিল ওর জীবন থেকে।
চাঁদনী এখন অনেক দূরে, হয়তো অন্য কোনো শহরের কৃত্রিম আলোয় সে ব্যস্ত।
কিন্তু নীলয়ের কাছে সে আজও সেই লোনা হাওয়ায় মিশে থাকা এক চেনা ঘ্রাণ।
চারপাশ
নিঝুম। শুধু সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। নীলয় বিড়বিড় করে
বলল, "জানি হবে না মেটানো কভু, এ যে বিরহের এক কৃষ্ণা।" সত্যি তো, কিছু
তৃষ্ণা মেটানোর জন্য কোনো জল থাকে না।
পাথুরে নীরবতা
সমুদ্রের
উত্তাল ঢেউগুলো যখন বালুচরে আছড়ে পড়ছে, নীলয়ের বুকের ভেতরটা তখন বিদীর্ণ
হচ্ছে এক তীব্র চিৎকারে। ওর ইচ্ছে করছিল আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে—
“তোমায় বড় ভালোবাসি!” কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, যখনই সে মুখ খুলতে চাইল,
শব্দরা যেন পাথর হয়ে গলার কাছে আটকে গেল। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ভয় থেকে
যে নীরবতার জন্ম হয়েছিল, আজ সেই নীরবতাই তাকে গ্রাস করেছে। সমুদ্র সাক্ষী
রইল এক ব্যর্থ প্রেমিকের, যার ঠোঁট দুটো পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে, অথচ
হৃদয়ে জ্বলছে দাবানল।
শেষ প্রহর
রাত
বাড়ে। চাঁদের আলো আরও মায়াবী হয়। নীলয় একা বালুচরে বসে থাকে। সে জানে, এই
মায়াবী কায়া কেবলই তার মনের ভুল। চাঁদনী পাশে নেই, তবুও তার অস্তিত্ব এই
নোনা জল আর বালুর কণে কণে মিশে আছে।
ভালোবাসার
না বলা কথাগুলো আজ দীর্ঘশ্বাস হয়ে লোনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। নীলয় বুঝল,
কিছু মানুষকে আগলে রাখার চেয়েও বেশি কঠিন হলো তাদের ছাড়া বেঁচে থাকা, বিশেষ
করে যখন সেই মানুষটিই হয় ‘জগতের সবচেয়ে দামি’ সম্পদ।

No comments:
Post a Comment