শহুরে কোলাহল ছেড়ে নীলা যখন শান্ত স্নিগ্ধ গ্রামে এসে পৌঁছালো, তখন তার মনে ছিল বিষণ্নতা। বাবার অসুস্থতা আর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আসার কষ্ট তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু সেই বিষণ্নতার মাঝেও নীলা ছিল এক অপূর্ব রূপবতী—দুধে-আলতা গায়ের রঙ আর মায়াবী ডাগর চোখের এক কিশোরী।
স্কুলের
প্রথম দিনটা আবিরের কাছে আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই হতে পারতো। সে
ক্লাসের শান্ত আর মনোযোগী ছাত্র। কিন্তু নীলা যখন ক্লাসে পা রাখলো, আবিরের
বইয়ের পাতায় থাকা জ্যামিতিক নকশাগুলো যেন হঠাৎ অর্থহীন হয়ে গেল। নীলার সেই
দীঘল কালো চুল আর মায়াবী চাহনি আবিরের কিশোর মনে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে গেল।
সেদিন থেকেই আবিরের রুটিন বদলে গেল। স্কুলের পড়া নয়, বরং নীলার এক পলক দেখা পাওয়ার জন্য তার মন ছটফট করতে থাকলো।
আবির
আর নীলার গ্রাম দুটো আলাদা। মাঝে একটা বিশাল মাঠ আর মেঠো পথ। প্রতিদিন
বিকেলে আবির সেই পথ পাড়ি দিয়ে নীলাদের গ্রামের পাশে গিয়ে দাঁড়াত।
আবিরের সাইকেলটা নিয়ে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, যেন খুব সাধারণ কোনো কাজে সেখানে আসা।
নীলাও
জানত আবির আসবে। সে বারান্দায় কিংবা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। দুজনেই
জানত তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ কেউ কারো সামনে আসার সাহস পেত
না।
স্কুলের
ক্লাসরুমেও চলত এক নীরব যুদ্ধ। কলম সচল থাকলেও আবিরের চোখ খুঁজত নীলাকে।
মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হলে নীলা লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে নিত। এই 'চোখের ভাষা'
ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব পৃথিবী। 'ভালোবাসি' শব্দটা কোনোদিন উচ্চারিত হয়নি,
হয়তো হারানোর ভয়ে, কিংবা সেই অপ্রকাশিত ভালোলাগাটাকেই বেশি পবিত্র মনে হতো
বলে।
সময়
কারো জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। গ্রামে
কিশোরীদের পড়াশোনার চেয়ে বিয়ের আলাপটাই দ্রুত ডানা মেলে। আবির যখন
রেজাল্টের আনন্দ আর নীলাকে নতুন করে দেখার স্বপ্ন বুনছিল, তখনই খবর এলো
নীলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
সেদিন
বিকেলে আবির শেষবারের মতো সেই মেঠো পথে গিয়েছিল। নীলাদের বাড়ির উঠোনে তখন
প্যান্ডেল বাঁধার তোড়জোড়। দূর থেকে সে দেখল নীলাকে—লাল শাড়িতে তাকে আরও
বেশি মায়াবী লাগছে, কিন্তু সেই চোখে আজ আর সেই চঞ্চলতা নেই, আছে একরাশ
বিষাদ।
"সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, কিছু ভালোবাসা আজীবন বুকের বাম পাশে এক ফোঁটা নীল কষ্ট হয়ে বেঁচে থাকে।"
নীলা চলে গেল নতুন শহরে, নতুন সংসারে। আর আবিরের কাছে রয়ে গেল স্কুলের সেই পুরনো বেঞ্চ, মেঠো পথ আর এক বুক না বলা কথা। সেই শান্ত গ্রামে আজও বিকেল হয়, কিন্তু সেই কিশোরীর অপেক্ষায় কোনো এক কিশোর আর মেঠো পথ পাড়ি দেয় না। তাদের সেই নীরব প্রেম এখন কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে আছে।

No comments:
Post a Comment