Saturday, May 2, 2026

যে প্রেম ছোঁয়নি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 রাইসার জীবনে দ্বিতীয়বার বিশ্বাস শব্দটা আসেনি সহজে। ডিভোর্সের পর সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল—ক্যারিয়ার, সম্মান, আত্মনির্ভরতা। তবু রাতের বেলা জানালার পাশে দাঁড়ালে বুকের ভেতর একটা অপূর্ণ জায়গা হাহাকার করতো। সেই হাহাকার থেকেই কবিতা। শব্দের ভেতর সে নিজের শরীর নয়, নিজের মন খুলে দিত।

আদনানের সাথে পরিচয়টা তাই স্বাভাবিকের চেয়েও আলাদা ছিল। সে কবিতা লেখে না, কিন্তু কবিতা পড়ার সময় শব্দের ফাঁকে ফাঁকে মানুষ খোঁজে। রাইসার কবিতার নিচে তার মন্তব্যগুলো ছিল ছোট, কিন্তু গভীর। “এই লাইনে থেমে গিয়েছিলাম”—এই ধরনের কথা।

ইনবক্সে কথাবার্তা শুরু হয়। প্রথমে কবিতা, তারপর কাজ, তারপর জীবন। রাইসা লক্ষ করে—এই ছেলেটা তাকে জানতে চায়, পেতে চায় না। প্রশ্ন করে, কিন্তু চাপ দেয় না। ধীরে ধীরে সেই সতর্ক দেয়ালগুলোতে ফাটল ধরে।

প্রথম দেখা হয় এক বিকেলে। ক্যাফেতে বসে রাইসা একটু নার্ভাস ছিল, কিন্তু আদনান ছিল স্বাভাবিক। চোখে এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা। সে চোখে চোখ রাখে, কিন্তু দখল নিতে চায় না। সেই না-চাওয়াটাই রাইসার ভেতরে অদ্ভুত আলোড়ন তোলে।

সেদিনের পর কথা আরও বাড়ে। দেখা আরও হয়। কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো হাঁটতে হাঁটতে। একদিন বৃষ্টিতে ভিজে তারা একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়েছিল। রাইসা ঠাণ্ডায় কাঁপছিল। সে মনে মনে চেয়েছিল—আদনান অন্তত হাতটা রাখুক কাঁধে। কিন্তু আদনান শুধু জিজ্ঞেস করেছিল,

“ঠাণ্ডা লাগছে? কফি খাবেন?”

রাইসা অবাক হয়েছিল। বিরক্তও। কিন্তু তখনও সে কিছু বলেনি।

এরপর এক সন্ধ্যায়, রাইসা আর নিজেকে থামাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, সমাজের দৃষ্টি, ভাঙা সংসারের স্মৃতি—সব মিলিয়ে সে চেয়েছিল একটু ছোঁয়া। ভালোবাসার নিশ্চয়তা। সে নিজেই আদনানের কাছে এগিয়ে গিয়েছিল।

আদনান পিছিয়ে যায়নি আতঙ্কে, কিন্তু থামিয়ে দিয়েছিল দৃঢ়তায়।

সে শান্ত গলায় বলেছিল,

“রাইসা আপু, আমি চাই আমাদের সম্পর্কটা আগে মানুষ হিসেবে পাকাপোক্ত হোক। আমি আপনাকে চাই—কিন্তু দখল করে নয়। ছুঁয়ে নয়।”

সেই রাতেই রাইসা কেঁদেছিল। কারণ কেউ তাকে এত সম্মান করে প্রত্যাখ্যান করেনি কখনও।

তবু সম্পর্ক ভাঙেনি সঙ্গে সঙ্গে।

পরের কিছু দিন তারা আবার কথা বলেছে। আবার দেখা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটা দেখা রাইসার জন্য হয়ে উঠেছে পরীক্ষার মতো। সে শাড়ি পরে এসেছে একটু যত্ন করে, চুলে সুগন্ধি দিয়েছে। আদনান প্রশংসা করেছে, কিন্তু হাত বাড়ায়নি।

একদিন সিনেমা হলে অন্ধকারে বসে রাইসা ইচ্ছে করে একটু কাছে সরে এসেছিল। আদনান হালকা করে সিটের হাতলে সরে গেছে। সেই ছোট্ট সরে যাওয়াটা রাইসার বুকে বড় আঘাত করেছিল।

তার মনে হয়েছিল—

“আমি কি তবে অপ্রয়োজনীয়?

আমি কি শুধুই গল্প আর কবিতার মানুষ?”

শেষ দেখা হয় এক বিকেলে। আকাশ ভারী ছিল। রাইসা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি।

সে বলেছিল,

“তুমি জানো, আমি কী চাই। তবু তুমি ইচ্ছে করেই আমাকে ছুঁও না।”

আদনান উত্তর দিয়েছিল,

“কারণ আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”

রাইসা হেসেছিল—কঠিন, তিক্ত হাসি।

“তুমি আমাকে আগেই হারিয়েছ। যে পুরুষ ছোঁয়ার সাহস রাখে না, সে ভালোবাসার দায়িত্বও নিতে পারে না। তুমি ভিতু। কাপুরুষ।”

এই কথাগুলো বলেই সে উঠে চলে যায়। আর ফিরে তাকায়নি।

এরপর ব্লক। নীরবতা। কবিতাগুলো মুছে ফেলা। জীবন আবার আগের মতো সাজানো।

অনেকদিন পর, আদনান এক রাতে একটা পুরোনো স্ক্রিনশট খুঁজে পায়—রাইসার একটি কবিতা। সেখানে লেখা ছিল:

“যে আমাকে ছুঁতে চায় না, সে কি আমায় সত্যিই চায়?”

আদনান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। উত্তর লেখে না।

কারণ কিছু প্রেম ছোঁয়ার আগেই ভেঙে যায়।

আর কিছু মানুষ কষ্ট দিয়ে চলে যায়—শুধু এই কারণে যে, তারা ভালোবাসা আর স্পর্শকে এক করে ফেলেছিল।

 

 

যে প্রেম ছোঁয়নি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

No comments:

Post a Comment