Wednesday, April 29, 2026

মায়ার আবরণে এক চিলতে রোদ-- মোঃ হেলাল উদ্দিন


শহরের ব্যস্ত সিগন্যালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নীলা। চারপাশে গাড়ির হর্ন, মানুষের তাড়া, সময়ের তীব্র চাপ—সবকিছুর মাঝেই সে ছিল অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতায় মোড়া। পরনে কুচকুচে কালো বোরকা, চোখে গাঢ় কাজল। সিগন্যাল ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে উল্টো দিকের একটি রিকশায় বসা আরিয়ানের সঙ্গে হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে যায় তার।

টানাটানা সেই চোখে ছিল এক অজানা অস্থিরতা, যেন বহুদিনের চেনা কোনো অনুভব হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক পলকের সেই দৃষ্টি আরিয়ানকে মুহূর্তেই থমকে দিল। মনে হলো—এই চোখ দুটোকে সে যেন বহু বছর ধরে চেনে। সিগন্যাল বদলে গেল, রিকশা এগিয়ে গেল, কিন্তু ওই এক পলকের দেখা আরিয়ানের মনে গভীর দাগ কেটে রেখে গেল।

নীলা ছিল ভীষণ জেদি। আরিয়ানের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিও তাকে নাড়া দিয়েছিল গভীরভাবে। সেদিনের পর থেকে সে চেষ্টা করতে লাগল সেই অচেনা যুবকটিকে খুঁজে পেতে। হাতে কোনো তথ্য নেই—নাম নেই, পরিচয় নেই—শুধু স্মৃতিতে গেঁথে থাকা একটি অবয়ব। ফেসবুকের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড, লোকেশন সার্চ আর অসংখ্য প্রোফাইল ঘেঁটে কয়েক রাত কাটিয়ে অবশেষে সে খুঁজে পেল আরিয়ানকে। দেরি না করে পাঠিয়ে দিল ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট।

আরিয়ান প্রথমে বিস্মিত হলেও কথোপকথন শুরু হতে বেশি সময় লাগেনি। সে জানত না নীলার জীবনের অন্য পিঠের কথা। নীলা বিবাহিত—তার স্বামী দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে প্রবাসে। বিশাল বাড়ির ভেতর প্রতিদিন সে একা। দেয়ালের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত নীলা আরিয়ানের মধ্যে যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া কিশোরীবেলাকে খুঁজে পায়।

কথার পিঠে কথা জমে। প্রতিদিনের মেসেজ আর গভীর রাতের ফোন কলে তাদের মাঝে তৈরি হয় এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধন। একদিন নীলা স্বীকার করে বলে,

“জানি আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সমাজ একে পাপ বলবে। কিন্তু আমার এই একাকীত্বের মরুভূমিতে তুমি ছিলে এক পশলা বৃষ্টির মতো।”

আরিয়ান জানত—এই সম্পর্কের শেষ আছে, শুরু নেই। নীলার স্বামীর দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে আসছিল। বাস্তবতার কথা তুললেই নীলা বলত,

“ভবিষ্যৎ নেই বলে কি বর্তমানকে বাঁচতে নেই?”

তারা জানত—তারা দুই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা। তাদের ভালোবাসা ছিল বিকেলের শেষ আলোয় লম্বা হয়ে পড়া ছায়ার মতো—দীর্ঘ, অথচ ক্ষণস্থায়ী। সামাজিক স্বীকৃতি নেই, ঘর বাঁধার স্বপ্ন নেই—আছে শুধু এক পশলা ভালো লাগা আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস। কালো বোরকার আড়ালের সেই চোখ দুটো আজও আরিয়ানকে কাঁদায়, তবে সে কান্না কষ্টের নয়—প্রিয় কোনো স্মৃতি হারানোর মধুর বেদনা।

এক গভীর রাতে ফোনের ওপাশে নীলার কান্নাভেজা কণ্ঠ আরিয়ানের বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। আর কয়েকদিন পরই নীলার স্বামী দেশে ফিরবে। তখন এই লুকিয়ে কথা বলা, খুনসুটি আর মেসেজের টুনটুন শব্দ চিরতরে থেমে যাবে।

নীলা ফুঁপিয়ে বলে ওঠে,

“মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে সব ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসি। যেখানে কোনো প্রবাস নেই, কোনো একাকীত্ব নেই—শুধু তুমি আছ।”

আরিয়ান শান্ত গলায় উত্তর দেয়,

“নীলা, আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেখানে ভালোবাসার চেয়ে দায়িত্বের ওজন অনেক বেশি। আমি চাইলেই তোমার হাত ধরতে পারি না, আর তুমি চাইলেই সব ছিঁড়ে আসতে পারো না।”

শেষ পর্যন্ত নীলার স্বামীর ফেরার তারিখ চূড়ান্ত হয়। সেদিন শেষবারের মতো তারা দেখা করেছিল সেই চেনা মোড়টায়। কালো বোরকায় ঢাকা নীলার অবয়ব স্থির, শুধু কাজল মাখা চোখ দুটো লোনা জলে ভাসছে। কাঁপা হাতে সে একটি ছোট চিরকুট আরিয়ানের হাতে দিয়ে বলে,

“হয়তো কোনো এক জন্মে আমি শুধু তোমারই ছিলাম। এই জন্মে না হয় তোমার স্মৃতিগুলোকেই সঙ্গী করে নিলাম। ভালো থেকো সেই অচেনা যুবক—যে চেনা হয়েও আজ পর হয়ে যাচ্ছে।”

তারা কেউ কাউকে ব্লক করেনি, আবার কথাও বলেনি। আরিয়ান প্রতিদিন নীলার প্রোফাইল ছবি দেখে, নীলা চুপচাপ আরিয়ানের স্ট্যাটাস পড়ে। মেসেজ নেই, তবু অনুভব আছে—প্রতিটি নিঃশ্বাসে।

মাঝে মাঝে বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসে, আরিয়ান সেই মোড়টায় গিয়ে দাঁড়ায়। সে জানে কালো বোরকা পরা মেয়েটি আর আসবে না। তবু বাতাসে আজও ভাসে সেই টানাটানা চোখের মায়া আর এক অসমাপ্ত ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস। 

ভালোবাসা হয়তো সবসময় মিলনে পূর্ণতা পায় না—কিছু ভালোবাসা অমর হয়, শুধু হৃদয়ের গভীরে থেকে যাওয়ার মধ্য দিয়েই।

 

 May be an image of one or more people

Sunday, April 26, 2026

লকেটের সেই সোনালী ঝিলিক -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আকাশের বয়স তখন একুশ। টিউশনি শেষ করে ফেরার পথে বিকেলটা কেমন যেন মায়াবী হয়ে উঠত। রাস্তার মোড়ে পুরনো লাইব্রেরিটার সামনে সেদিন প্রথম ওকে দেখল সে। মেয়েটির নাম নীলা, সবে ষোড়শীতে পা দিয়েছে।

​নীলা যখন চশমাটা ঠিক করতে করতে সামনের দিকে তাকাল, আকাশের মনে হলো সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। ওর টানাটানা বড় বড় দুটো চোখ, যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা গভীর দিঘি। সেই চোখে এক অদ্ভুত সারল্য, যা একুশ বছরের যুবকের বুকে প্রথমবার এক অজানা ঢেউ তুলল। ওর মাথায় রাশীকৃত কালো চুল, বাতাসের ঝাপটায় যা বারবার কপালে এসে পড়ছে।

​সবচেয়ে নিখুঁত ছিল ওর নাকটি। ঠিক যেন বাঁশির মতো তীক্ষ্ণ আর সুডৌল। হাসলে সেই নাকের পাটা হালকা একটু ফুলে ওঠে, যা দেখে আকাশের মনে হলো এ কোনো মানবী নয়, বরং জীবন্ত কোনো কবিতা। কিন্তু আকাশের নজর আটকে গেল নীলার গলার কাছে। ওর বুকের ওপর ঝুলছে একটি ছোট্ট সোনার লকেট। বিকেলের মরা রোদ সেই লকেটে ঠিকরে পড়ে আকাশের চোখে এসে লাগছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে লকেটটি আলতো করে দুলছে, আর সেই দুলুনি যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করছে আকাশের হৃদপিণ্ডে।

​আকাশের হাতপা কাঁপছিল। একুশ বছর বয়সে সে অনেক মেয়েই দেখেছে, কিন্তু এই লকেটের ঝিলিক আর টানা চোখের চাহনি কেন জানি তাকে সম্মোহন করে ফেলল। নীলা হয়তো বুঝতে পেরেছিল কেউ তাকে দেখছে। সে একটু আড়চোখে তাকিয়ে হালকা হাসল। সেই হাসিতে যেন এক হাজারটা বসন্তের ফুল একসাথে ফুটে উঠল।

​নীলা চলে গেল তার রিকশায় চড়ে, কিন্তু একুশ বছরের সেই যুবকটি লাইব্রেরির সামনে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে তখনও বাজছে নীলার গলার চুড়ির রিনরিন শব্দ আর চোখে ভাসছে সেই বাঁশির মতো নাক আর সোনার লকেটের নাচন। ভালোবাসা কি এভাবেই আসে? কোনো ভূমিকা ছাড়াই, শুধু এক পলকের একটু সোনালী ঝিলিক দিয়ে?

​আকাশ জানত না ওর নাম কী, কিন্তু ওই দিন থেকে একুশ বছরের যুবকটি বুঝতে পারল— তার মনের ডায়েরিতে এক ষোড়শী বালিকা স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

May be an image of jewellery 

লকেটের সেই সোনালী ঝিলিক -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Sunday, April 19, 2026

বিস্মৃতির ওপারে সুখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নীলিমার ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়িটা টিকটিক শব্দ করছিল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বহু বছর পর অয়ন আর নীলিমা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। অয়ন খেয়াল করল, নীলিমার চোখে আগের সেই চঞ্চলতা নেই, সেখানে এখন এক থিতু হওয়া প্রশান্তি।

​অয়ন আলতো করে হাসল। "জানতাম, তুমি আমার চেহারাটা ভুলে যাবে।"

​নীলিমা কিছুটা থতমত খেল। অপরাধবোধের সুর নিয়ে বলল, "আসলে সময়টা এত দ্রুত চলে গেল যে..."

​"ভুলে তো যাবেই, তাতে আমি অবাক হইনি," অয়ন মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।

​নীলিমা জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কেন অবাক হওনি? তবে কি আমায় কোনোদিন ভালোবাসনি?"

​অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার কাঁচে জমে থাকা বৃষ্টির বিন্দুর দিকে তাকিয়ে সে বলল, "ভালোবাসা আর প্রয়োজন এক নয় নীলিমা। তুমি সেদিন আমার কাছে এসেছিলে স্রেফ এক সাময়িক শূন্যতা থেকে। তোমার জীবনে তখন কেউ ছিল না, একটা আশ্রয়ের খুব দরকার ছিল। আমি শুধু সেই সময়টুকুর সঙ্গী ছিলাম। আমি সেদিনই বলেছিলাম, সময় পূর্ণ হলে তুমি আমায় ভুলে যাবে।"

​নীলিমা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো গলায় আটকে গেল। অয়ন আবার বলতে শুরু করল, "আজ তোমার বুকে অপেক্ষার প্রিয় মানুষ আছে। তোমার ঘর আছে, সংসার আছে। সেই সুখের ভিড়ে আমার ঝাপসা হয়ে যাওয়া চেহারার স্মৃতি মনে না থাকাই তো স্বাভাবিক। আর সেটাই ভালো।"

​নীলিমার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। ধরা গলায় সে শুধাল, "তাহলে কি আর কোনোদিন মনে রাখব না? একদমই না?"

​অয়ন দরজার দিকে পা বাড়াল। চলে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসল। "দরকার নেই নীলিমা। কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়াই মুক্তির নামান্তর। তুমি সুখে থাকো, আমি সেটাই চেয়েছিলাম।"

​অয়ন বৃষ্টির শব্দে মিলিয়ে গেল। নীলিমা বুঝতে পারল, কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধু নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলোকিত করার জন্য। অয়ন ছিল সেই মরীচিকা, যে তাকে মরুভূমি পার করে সবুজ বনানীর খোঁজ দিয়ে নিজে হারিয়ে গেছে।

 

অপ্রাপ্তির মায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিলেন শফিক সাহেব। মেঘগুলো নিজের ইচ্ছেমতো ভেসে বেড়াচ্ছে, কেউ কাউকে জোর করে ধরে রাখছে না। অথচ মানুষের জীবনে এই সহজ সত্যটা মেনে নেওয়া কত কঠিন।

পাশের টেবিলে বসা তরুণ কলিগ সজীব আজ খুব অস্থির। ওর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা বিয়ে করতে রাজি নয়, আর সজীব চাইছে যেকোনো উপায়ে—পরিবারের চাপে হোক বা আবেগ দিয়ে—মেয়েটিকে রাজি করাতে। সজীবের এই ছটফটানি দেখে শফিক সাহেব মৃদু হেসে বললেন, "সজীব, এক গ্লাস জল যদি তুমি তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পাও, তবেই তার স্বাদ অনুভব করবে। আর যদি কারো মুখে জোর করে জল ঢেলে দাও, সে শুধু দমবন্ধ হয়ে আসার কষ্টই পাবে।"

সজীব অবাক হয়ে তাকালো। শফিক সাহেব ধীরস্থির কণ্ঠে নিজের জীবনের মূলমন্ত্র নিয়ে বলতে শুরু করলেন। "আমার জীবনের একটা বড় নীতি হলো—আমি কখনো কোনো কিছু জোর করে আদায় করতে চাইনি। সেটা পদোন্নতি হোক, কিংবা মানুষের ভালোবাসা। লোকে বলে আমি উচ্চাকাঙ্ক্ষী নই, কিন্তু আমি জানি, জবরদস্তিতে পাওয়া বিজয়ের মধ্যে এক ধরণের পরাজিত আত্মা লুকিয়ে থাকে। জোর করে পাওয়া সঙ্গ সৌন্দর্য হারায়, গভীরতা হারায়।"

তিনি বলতে থাকলেন, "একবার একটা বড় প্রজেক্টের দায়িত্ব আমার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখলাম, কর্তৃপক্ষ অন্য একজনকে সেই জায়গা দিতে চাইছে। আমি চাইলেই ওপর মহলে তদ্বির করতে পারতাম। কিন্তু আমি এক মুহূর্তের জন্যও তা করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যে চেয়ার আমার যোগ্যতার সম্মানে আমায় ডাকবে না, সেই চেয়ারে বসে আমি শান্তি পাব না। ঠিক একইভাবে, অনেক আগে একজনকে খুব ভালোবেসেছিলাম। সে যখন জানালো তার পথ অন্য দিকে, আমি তাকে আটকে রাখার জন্য কোনো নাটকীয়তা করিনি। কারণ আমি জানতাম, শরীর ধরে রাখা যায়, মন নয়।"

কথাগুলো শেষ করে শফিক সাহেব জানালার দিকে ফিরলেন। বাইরে তখন গোধূলির আলো নিভে আসছে, আকাশটা কেমন ঘোলাটে বেগুনী রঙ ধারণ করেছে। সজীব খেয়াল করল, শফিক সাহেবের ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত, ম্লান হাসি লেপ্টে আছে—যা ঠিক সুখের নয়, আবার বিষাদেরও নয়।

"সবাই মনে করে আমি হেরে গেছি, সজীব," শফিক সাহেব ফিসফিস করে বললেন, যেন নিজের সাথেই কথা বলছেন। "কিন্তু তারা জানে না, ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও একটা প্রচণ্ড ক্ষমতা থাকে। যে চলে যেতে চায়, তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে বিদায় করার পর যে নিঃশব্দ হাহাকার জন্মায়, তার চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আর নেই।"

সজীবের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে লক্ষ্য করল শফিক সাহেবের টেবিলের ওপর একটা পুরনো কাঁচের জার। তাতে কোনো প্রজাপতি নেই, কোনো ফুল নেই—শুধু একমুঠো ছাই।

শফিক সাহেব জারের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "তুমি জানো তো, জোর করে কাউকে আগলে রাখলে সে একটা সময় মরে যায়। কিন্তু তাকে যদি তুমি নিজের ইচ্ছায় মরতে দাও, তবে সে তোমার স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকে। আমি কাউকে পাইনি ঠিকই, কিন্তু কাউকে হারাইওনি। কারণ যা আমার ছিল না, তাকে হারানোর শোক আমার সাজে না।"

হঠাৎ অফিসের করিডোরের বাতিটা একবার জ্বলে উঠেই দপ করে নিভে গেল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই শফিক সাহেবের অবয়বটা কেমন ঝাপসা হয়ে এল। সজীবের মনে হলো, শফিক সাহেব যেন এই ঘরের কোনো রক্তমাংসের মানুষ নন, বরং বহু বছর ধরে জমে থাকা কোনো ত্যাগের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

শফিক সাহেব অন্ধকারেই ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলেন, "পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার রহস্য অনেক বেশি গভীর, সজীব। পূর্ণিমার চাঁদকে ছোঁয়া যায় না বলেই মানুষ আজও তার দিকে তাকিয়ে কবিতা লেখে। যেদিন মানুষ চাঁদকে হাতের মুঠোয় আনবে, সেদিন থেকে চাঁদ তার রূপ হারাবে। আদায়ের নেশা ছেড়ে দিতে শেখো, দেখবে জগতটা তোমার পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়েছে—ঠিক যেমন এই ছায়াগুলো এখন আমার পিছু নিয়েছে।"

শফিক সাহেব বেরিয়ে গেলেন। সজীব দেখল, করিডোরের টিমটিমে আলোয় শফিক সাহেবের কোনো ছায়া পড়ছে না। তিনি যেন অন্ধকারের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছেন। সজীব সেই শূন্য ঘরে একা দাঁড়িয়ে রইল, আর তার কানের কাছে বারবার বাজতে লাগল—“জোর করে পাওয়া সঙ্গ সৌন্দর্য হারায়, গভীরতা হারায়... আর যা হারায়, তা কোনোদিন ফিরে আসে না।”

 


 অপ্রাপ্তির মায়া -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Tuesday, April 14, 2026

মানসী স্টুডিও -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

 "মানসী স্টুডিও"—হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের নস্টালজিয়া, না পাওয়া প্রেমের হাহাকার আর প্রযুক্তির বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির এক জীবন্ত দলিল।

 

উপন্যাসটি পড়তে বইয়ের নামের উপড় ক্লিক করুন-

মানসী স্টুডিও

 


 

মানসী স্টুডিও -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Thursday, April 9, 2026

'মানসী স্টুডিও' উপন্যাসের মূল কথা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

সময়টা ২০০০-এর দশকের শুরু। গ্রামবাংলার শান্ত জনপদে তখন প্রযুক্তির প্রথম ছোঁয়া লেগেছে। একদিকে এনালগ ক্যামেরার নেগেটিভ ধোলাই করার সেই ব্যাকুল অপেক্ষা, অন্যদিকে পকেটে নতুন আসা মোবাইল ফোনের এন্টেনা টেনে নেটওয়ার্ক খোঁজার রোমাঞ্চ।

শিবপুর বাজারের একমাত্র ছবি তোলার ঘর 'মানসী স্টুডিও'। এটি কেবল ছবি তোলার জায়গা ছিল না; এটি ছিল এক জোড়া তরুণ-তরুণীর অলিখিত অভয়ারণ্য। ডিগ্রি পড়ুয়া আরিফ আর একাদশ শ্রেণির চঞ্চল মেয়ে নীলা—তাদের প্রেমের সেতুবন্ধন হয়ে দাঁড়ায় একটি নোকিয়া ফোন আর রহমান মিঞার স্টুডিওর সেই অন্ধকার ডার্করুম।

কিন্তু প্রযুক্তির সিগন্যাল কি সবসময় হৃদয়ের টানে স্থির থাকে? সমাজ, পরিবার আর পরিস্থিতির ঝড়ে যখন সেই সিগন্যাল 'আউট অফ নেটওয়ার্ক' হয়ে যায়, তখন অবশিষ্ট থাকে কেবল এক টুকরো ঝাপসা ছবি আর একটি ভাঙা শাঁখা।

দশ বছর পর, যখন পৃথিবী বদলে গেছে, হাতে হাতে স্মার্টফোন আর হাই-স্পিড ইন্টারনেট—তখন সেই পুরনো ডার্করুমের ঝাপসা ছবিটা কি আজও হৃদয়ে রঙ ছড়ায়?

"মানসী স্টুডিও"—হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের নস্টালজিয়া, না পাওয়া প্রেমের হাহাকার আর প্রযুক্তির বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির এক জীবন্ত দলিল।


 মানসী স্টুডিও

মোঃ হেলাল উদ্দিন

'মানসী স্টুডিও' উপন্যাসের কিছু উক্তি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 "লোকে বলে সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সময় যেন এক নিষ্ঠুর লবণ, যা প্রতিদিন আমার ক্ষতটাকে আরও টাটকা করে তোলে। প্রতিটা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে আমি আজও নীলার নূপুরের রিনঝিন আওয়াজ পাই। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় আমি আজও সেই চেনা ঘ্রাণ খুঁজি, যা এক সময় মানসী স্টুডিওর সেই নীল পর্দার আড়ালে আমার অস্তিত্বকে অবশ করে দিত।"

 

“কিছু ঝড়ে শুধু গাছ ভাঙে না, ভেঙে যায় হৃদয়ের সেই সব সূক্ষ্ম তরঙ্গ—যা দিয়ে মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে।”

 

“পৃথিবীতে প্রতিদিন কোটি কোটি ছবি তোলা হয়, কিন্তু কিছু ছবি আছে যা শুধু সিলভার হ্যালাইডের কাগজে নয়, সরাসরি সময়ের বুকের ওপর খোদাই হয়ে যায়। 'মানসী স্টুডিও'র সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের ফ্ল্যাশটি ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে সাহসী আর সুন্দর মুহূর্ত।”

 


 মানসী স্টুডিও
মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Wednesday, April 8, 2026

"মানসী স্টুডিও" উপন্যাসে লেখকের কথা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

"মানসী স্টুডিও" কেবল একটি কাল্পনিক উপন্যাস নয়, এটি একটি সময়ের দলিল। বিংশ শতাব্দীর শেষ আর একবিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই উত্তাল দিনগুলো, যখন প্রযুক্তি আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছিল, সেই সময়টাকে ফ্রেমে বন্দি করার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস এই বই।

আমরা এমন এক প্রজন্মের সাক্ষী, যারা চিঠির যুগ থেকে সরাসরি স্মার্টফোনের যুগে প্রবেশ করেছি। আমাদের কৈশোর আর তারুণ্যের সন্ধিক্ষণে ছিল অ্যানালগ ক্যামেরার রিল আর এনালগ ফোনের সাদাকালো স্ক্রিন। সেই সময়ে একটি ছবি তোলার জন্য ডার্করুমের লাল আলোয় যে প্রতীক্ষা ছিল, কিংবা একটি প্রিয় মানুষের কণ্ঠ শোনার জন্য নেটওয়ার্কের পেছনে যে হাহাকার ছিল—তা আজকের এই 'ইনস্ট্যান্ট' যুগে কল্পনা করাও কঠিন।

শিবপুর বাজার বা মানসী স্টুডিও হয়তো একটি কাল্পনিক নাম, কিন্তু এর ভেতরের আবেগগুলো ধ্রুব সত্য। আরিফ আর নীলার এই গল্পটি আসলে সেই হাজারো নাম না জানা প্রেমিক যুগলের, যাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি ঠিকই, কিন্তু স্মৃতির গ্যালারিতে তারা আজও উজ্জ্বল। প্রযুক্তির বিবর্তনে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু ডার্করুমের সেই মায়া আর প্রতীক্ষার সেই গভীরতা বোধহয় চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি।

এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে আমি বারবার নিজের অজান্তেই সেই পুরনো দিনগুলোতে ফিরে গেছি। যারা সেই সময়টাকে যাপন করেছেন, আশা করি তারা বইটির পাতায় পাতায় নিজেদের খুঁজে পাবেন। আর যারা নতুন প্রজন্মের পাঠক, তারা হয়তো অনুভব করতে পারবেন কেন তখনকার প্রেমগুলো এত বেশি গভীর আর কাব্যিক ছিল।

পরিশেষে, যারা এই পাণ্ডুলিপিটি তৈরিতে এবং উৎসাহ দিয়ে পাশে ছিলেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। পাঠকদের হৃদয়ে 'মানসী স্টুডিও'র জন্য একটুখানি জায়গা হলে আমার এই শ্রম সার্থক হবে।

সবাই ভালো থাকুন, স্মৃতির ডার্করুমে ভালোবাসা বেঁচে থাকুক।

 

 

মোঃ হেলাল উদ্দিন

এপ্রিল, ২০২৬