নীলিমার ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়িটা টিকটিক শব্দ করছিল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বহু বছর পর অয়ন আর নীলিমা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। অয়ন খেয়াল করল, নীলিমার চোখে আগের সেই চঞ্চলতা নেই, সেখানে এখন এক থিতু হওয়া প্রশান্তি।
অয়ন আলতো করে হাসল। "জানতাম, তুমি আমার চেহারাটা ভুলে যাবে।"
নীলিমা কিছুটা থতমত খেল। অপরাধবোধের সুর নিয়ে বলল, "আসলে সময়টা এত দ্রুত চলে গেল যে..."
"ভুলে তো যাবেই, তাতে আমি অবাক হইনি," অয়ন মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।
নীলিমা জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কেন অবাক হওনি? তবে কি আমায় কোনোদিন ভালোবাসনি?"
অয়ন
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার কাঁচে জমে থাকা বৃষ্টির বিন্দুর দিকে
তাকিয়ে সে বলল, "ভালোবাসা আর প্রয়োজন এক নয় নীলিমা। তুমি সেদিন আমার কাছে
এসেছিলে স্রেফ এক সাময়িক শূন্যতা থেকে। তোমার জীবনে তখন কেউ ছিল না, একটা
আশ্রয়ের খুব দরকার ছিল। আমি শুধু সেই সময়টুকুর সঙ্গী ছিলাম। আমি সেদিনই
বলেছিলাম, সময় পূর্ণ হলে তুমি আমায় ভুলে যাবে।"
নীলিমা
কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো গলায় আটকে গেল। অয়ন আবার বলতে শুরু করল,
"আজ তোমার বুকে অপেক্ষার প্রিয় মানুষ আছে। তোমার ঘর আছে, সংসার আছে। সেই
সুখের ভিড়ে আমার ঝাপসা হয়ে যাওয়া চেহারার স্মৃতি মনে না থাকাই তো
স্বাভাবিক। আর সেটাই ভালো।"
নীলিমার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। ধরা গলায় সে শুধাল, "তাহলে কি আর কোনোদিন মনে রাখব না? একদমই না?"
অয়ন
দরজার দিকে পা বাড়াল। চলে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
"দরকার নেই নীলিমা। কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়াই মুক্তির নামান্তর। তুমি সুখে
থাকো, আমি সেটাই চেয়েছিলাম।"
অয়ন বৃষ্টির শব্দে মিলিয়ে গেল। নীলিমা বুঝতে পারল, কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধু নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলোকিত করার জন্য। অয়ন ছিল সেই মরীচিকা, যে তাকে মরুভূমি পার করে সবুজ বনানীর খোঁজ দিয়ে নিজে হারিয়ে গেছে।

No comments:
Post a Comment