নতুন স্কুল, নতুন বেঞ্চ, নতুন গন্ধ—চক আর কাগজের মিশ্র এক অচেনা সকাল। প্রথম দিন প্রথম ক্লাসে ঢুকেই চোখ আটকে গিয়েছিল। বোর্ডে তাকানোর কথা ছিল, অথচ চোখ চলে গিয়েছিল জানালার ধারে বসে থাকা মেয়েটির চোখে। অদ্ভুত শান্ত, অথচ কৌতূহলে ভরা—ঠিক যেন অপরিচিত কোনো নদী, যার দিকে তাকালে নামতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নামার সাহস নেই।
সে ছিল ইংরেজি ম্যাডামের মেয়ে।
প্রথমে
কিছুই হয়নি। নাম জানা হয়নি, কথাও হয়নি। শুধু প্রতিদিন ক্লাসে ঢুকে
অজান্তেই তার বেঞ্চের দিকে তাকানো—এইটুকুই। কয়েকদিন পর ম্যাডাম লক্ষ্য
করলেন, ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। ইংরেজি ক্লাসে উত্তরগুলো ঠিকঠাক আসে,
উচ্চারণে জড়তা নেই। সুনজরটা তখন থেকেই। ম্যাডাম কখনো হাসেন, কখনো বাড়ির কাজ
ভালো হলে খাতায় লাল কালি দিয়ে “Very Good” লিখে দেন।
একদিন ম্যাডাম বললেন,
— আজ বিকেলে আমার বাসায় এসো। একটু গাইড দেব।
বাসায়
গিয়ে দেখা হলো মেয়েটার সঙ্গে। স্কুলের চেয়ে বাসায় সে অন্যরকম—চুল খোলা,
পায়ে শব্দহীন চটি, চোখে একই রকম নীরব আলো। পড়া শেষে খেলনা বের হলো। লুডু,
ক্যারাম, কখনো লুকোচুরি। প্রথম প্রথম কথা কম, পরে হাসি বাড়ে। ছেলেটা বুঝে
যায়—এই হাসিটাই সে প্রতিদিন ক্লাসে খুঁজে ফেরে।
এরপর
দিনগুলো যেন এক সুতোয় গাঁথা। প্রতিদিন ক্লাসে একসাথে বসা, টিফিন ভাগ করে
খাওয়া, বাসায় গিয়ে পড়া—সবই স্বাভাবিক, অথচ অদ্ভুতভাবে বিশেষ। স্কুলের অন্য
ছাত্রছাত্রীরা ফিসফিস করে, চোখাচোখি করে। কেউ বলে, “প্রেমিক-প্রেমিকা!”
তারা দু’জন কিছু বলে না। নাম না দেওয়া সম্পর্কটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।
দুই
বছর কেটে যায় এভাবেই। স্কুলের দেয়ালে নতুন পোস্টার, মাঠে নতুন দাগ, অথচ
তাদের জায়গাটা একই থাকে—একই বেঞ্চ, একই জানালার আলো। কখনো ঝগড়া হয়নি, কখনো
বড় করে কথা হয়নি। শুধু একধরনের নিশ্চুপ টান—যেটা না বলা ভালো, না লুকানো
যায়।
তারপর হঠাৎই সব বদলে গেল।
ছেলেটাকে
অন্য স্কুলে ভর্তি হতে হলো। শেষ দিন সে জানত, কিন্তু বলার সাহস পায়নি।
মেয়েটা জানত কি না, সেটাও জানা হয়নি। শেষ ক্লাসে চোখাচোখি হয়েছিল মাত্র
একবার। কিছু বলার ছিল, অনেক কিছু—কিন্তু ঘণ্টা বেজে উঠেছিল।
এরপর
আর দেখা হয়নি। কোনো রাস্তার মোড়ে নয়, কোনো উৎসবে নয়, এমনকি স্বপ্নেও নয়।
সময় এগিয়েছে, নাম ভুলে গেছে হয়তো, মুখের রেখাও ঝাপসা। তবু কোথাও একটা টান
রয়ে গেছে—অকারণ, অদৃশ্য, অথচ জেদি।
আজও
ইংরেজি বই খুললে প্রথম পাতায় চোখ আটকে যায়। বোর্ডে লেখা কোনো বাক্যের
মাঝখানে হঠাৎ মনে পড়ে যায় জানালার ধারের সেই চোখদুটি। তখন মনে হয়—সব প্রেম
পূর্ণতা পায় না। কিছু প্রেম স্কুলের বেঞ্চেই থেকে যায়, খাতার ভাঁজে, পুরনো
দিনের নীরবতায়।

No comments:
Post a Comment