ল্যাব সুপারভাইজার আশিক প্রতিদিনের মতো সেদিনও নির্দিষ্ট সময়ে কম্পিউটার ল্যাবে ঢুকেছিল। নতুন চাকরি। মাত্র কয়েকদিন হলো এই ল্যাবে যোগ দিয়েছে। কাজের প্রতি তার এক ধরনের অদ্ভুত মনোযোগ—ল্যাবে ঢুকেই একে একে প্রতিটি ডেস্ক ঘুরে দেখা, শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না খেয়াল করা, কারও কোনো সমস্যা হলে পাশে দাঁড়ানো।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।
এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে যেতে যেতে হঠাৎ ল্যাবের একেবারে শেষ প্রান্তের ডেস্কটিতে গিয়ে তার চোখ আটকে গেল।
একটি মেয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেয়েটিকে আশিক আগে কখনো দেখেনি।
অবশ্য দেখবে কী করে? সে তো মাত্র কয়েকদিন হলো এখানে এসেছে। মেয়েটিও হয়তো আগের দিনগুলোতে অন্য কোনো সময়ে এসেছে, কিংবা কোনো কারণে তার চোখে পড়েনি।
আশিক মেয়েটির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
—তোমার নাম কী?
মেয়েটি চমকে তাকাল। চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়। তারপর খুব নিচু, নরম স্বরে বলল—
—আমি আদ্রিতা।
কণ্ঠস্বরটাও যেন মেয়েটির স্বভাবের মতো—নরম, ধীর, নিঃশব্দ।
আশিক জিজ্ঞেস করল,
—কতদিন হলো এখানে আসছ?
—দুই মাস।
—গত সপ্তাহে তোমাকে দেখিনি।
মেয়েটি একটু থেমে বলল,
—শেষ সপ্তাহে ল্যাবে আসতে পারিনি।
আশিক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু বলল,
—ল্যাব শেষ হলে আমার অফিসে একবার দেখা করে যেও।
মেয়েটি মাথা নেড়ে আবার কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে গেল।
কিন্তু সেদিন ল্যাব শেষ হওয়ার পর আদ্রিতা আর আশিকের অফিসে গেল না।
চুপচাপ চলে গেল।
পরদিন আশিক তাকে কয়েকবার দেখল। কিন্তু ডাকল না। শুধু দূর থেকে দেখল।
কেন জানি মেয়েটিকে দেখে তার মনে হচ্ছিল—এই মেয়েটির নীরবতার মধ্যে কিছু একটা আছে।
কিন্তু সেটা কী?
জানার কোনো কারণও ছিল না, অধিকারও ছিল না।
তবু কৌতূহলটা থেকে গেল।
সপ্তাহের শেষ দিন। এরপর দুদিন ল্যাব বন্ধ থাকবে। তাই সেদিন আশিক আবার আদ্রিতাকে বলল,
—আজ কিন্তু ল্যাব শেষে আমার সঙ্গে দেখা করবে।
এবার আদ্রিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ল্যাব শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর দরজায় মৃদু শব্দ হলো।
আশিক তাকিয়ে দেখল—আদ্রিতা দাঁড়িয়ে আছে।
—ভেতরে আসো।
আদ্রিতা এসে চুপচাপ একটা চেয়ারে বসল।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।
আশিকই নীরবতা ভাঙল।
—তুমি প্রথম দিন আমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে গিয়েছিলে।
আদ্রিতা মৃদু হাসল।
—ভয় পেয়েছিলাম।
—আমাকে?
—না। আসলে... কথা বলতে ভালো লাগে না আমার।
আশিক একটু অবাক হয়ে বলল,
—কেন?
প্রশ্নটা শুনেই মেয়েটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে কিছু বলল না।
আশিক আবার বলল,
—তুমি সবসময় এত চুপচাপ থাকো কেন?
এবার আদ্রিতা মুখ তুলে তাকাল।
আশিক সেই চোখ দুটো প্রথমবার এত কাছ থেকে দেখল।
টানাটানা চোখ।
চোখের ভেতরে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা।
মুহূর্তের মধ্যেই চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল।
আশিক অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
—আরে! আমি কি কোনো ভুল কথা বললাম?
আদ্রিতা মাথা নাড়ল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—আমার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। তখন আমরা দুই বোন খুব ছোট।
আশিক চুপ করে শুনতে লাগল।
—বাবা থাকলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো। আমি পড়াশোনা করতে চেয়েছিলাম। অনেক দূর যেতে চেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সবকিছু তো ইচ্ছেমতো হয় না।
একটু থেমে আদ্রিতা জানালার বাইরে তাকাল।
—সংসার, দায়িত্ব... তারপর নিজের জীবন। একসময় বুঝলাম, কিছু স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়েই থাকে।
আশিকের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তোমার কষ্টের জন্য সত্যিই দুঃখিত। তবে একটা কথা মনে রেখো, জীবনে সব স্বপ্ন পূরণ না হলেও মানুষ তার ভেতরের আলোটা ধরে রাখতে পারে।
আদ্রিতা তাকাল।
মৃদু একটা হাসি ফুটল তার ঠোঁটে।
—সবসময় পারে?
আশিক উত্তর দিতে পারল না।
সেদিন আদ্রিতা চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ আশিক তার অফিসে বসে রইল।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
এত সুন্দর একটা মেয়ের চোখে এত দুঃখ কেন?
আদ্রিতার চোখ ছিল টানাটানা, মায়াবী। তার দোহারা গড়ন আশিকের মনে করিয়ে দিত পুরোনো কোনো বাংলা গল্পের চরিত্রকে। দুধে-আলতা গায়ের রং, মুখে এক ধরনের সতেজতা—দেখলে মনে হয় জীবন তাকে এখনো পুরোপুরি ক্লান্ত করতে পারেনি।
অথচ চোখ দুটো বলত অন্য কথা।
চোখ যেন জানত এমন কিছু, যা মুখ জানে না।
এরপর থেকে আশিক আর আদ্রিতার মধ্যে অল্পস্বল্প কথা হতে লাগল।
কখনো কম্পিউটারের কোনো সমস্যা নিয়ে।
কখনো কোর্সের পড়াশোনা নিয়ে।
কখনো একেবারে সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে।
কথা খুব বেশি নয়।
তবু আশিক বুঝতে পারল, তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।
এটা বন্ধুত্ব নয়।
প্রেম তো নয়ই।
তবু কোথাও যেন এক ধরনের আপনত্ব আছে।
আদ্রিতার কোনো প্রয়োজন হলে আশিক সাহায্য করতে চায়। আদ্রিতা কোনো সমস্যায় পড়লে আশিকের মনে হয়, তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।
কিন্তু কেন?
সে নিজেও জানে না।
হয়তো কিছু মানুষকে জীবনে ভালোবাসতে হয় না, বন্ধু বানাতেও হয় না—শুধু তাদের ভালো থাকা কামনা করতে ইচ্ছে করে।
আদ্রিতা ছিল তেমনই একজন।
একদিন কথায় কথায় আশিক জানতে পারল, আদ্রিতা বিবাহিত।
তার একটি ছোট সন্তানও আছে।
সংসারও সুখের।
আশিক অবাক হলো না, বরং এক ধরনের স্বস্তি পেল।
সে মনে মনে বলল—
ভালোই তো। মেয়েটা সুখে আছে।
কিন্তু তারপরও একটা প্রশ্ন তাকে ছাড়ল না।
তাহলে দুঃখটা কোথায়?
একজন মানুষের জীবনে সংসার থাকতে পারে, স্বামী থাকতে পারে, সন্তান থাকতে পারে, হাসি থাকতে পারে—তবু তার ভেতরে এমন কোনো ঘর থাকতে পারে কি, যেখানে কেউ কোনোদিন ঢোকে না?
আশিকের মনে হতে লাগল, আদ্রিতার ভেতরেও তেমন একটা ঘর আছে।
যে ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ।
দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।
কম্পিউটার কোর্সের শেষ পর্যায়।
আর কিছুদিন পর আদ্রিতা চলে যাবে।
আশিক জানে, তারপর হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না।
একদিন ল্যাবে বসে আশিক দূর থেকে আদ্রিতার দিকে তাকিয়ে ছিল।
মেয়েটি কম্পিউটারে কাজ করছে।
মাঝে মাঝে চুল ঠিক করছে।
কখনো কপাল কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে।
কখনো পাশের মেয়েটির সঙ্গে মৃদু হেসে কথা বলছে।
আশিক হঠাৎ ভাবল—
এই মেয়েটা কি সত্যিই সুখী?
তার সংসার আছে।
স্বামী আছে।
সন্তান আছে।
জীবন আছে।
তবু কেন তার চোখে মাঝে মাঝে এমন এক শূন্যতা নেমে আসে, যা কোনো শব্দে ধরা যায় না?
আশিকের মনে হলো, মানুষের সবচেয়ে গভীর দুঃখগুলো বোধহয় বলা যায় না।
কিছু ব্যথা ভাষা পায় না।
কিছু অভিমান কাউকে বলা যায় না।
কিছু স্মৃতি মানুষের সঙ্গে একই ঘরে থাকে, একই বিছানায় ঘুমায়, একই সংসারে হাঁটে—তবু কারও সঙ্গে তার পরিচয় হয় না।
হয়তো আদ্রিতার ভেতরেও তেমন কোনো গল্প আছে।
কিন্তু সেই গল্পের শেষ পাতাটা আশিক পড়তে পারছে না।
শেষ দিনের আগের দিন।
ল্যাব প্রায় ফাঁকা।
আশিক কাজ শেষ করে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে আদ্রিতার কণ্ঠ শুনতে পেল—
—আশিক ভাই...
আশিক ফিরে তাকাল।
—হ্যাঁ?
আদ্রিতা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বলল,
—আপনি কি আমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবেন?
আশিক অবাক।
—কী কথা?
আদ্রিতা মৃদু হেসে বলল,
—যেটা আপনি অনেকদিন ধরে জানতে চাইছেন।
আশিকের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।
সে বুঝতে পারল—আদ্রিতা তার চোখ এড়িয়ে যায়নি।
সে বুঝেছে আশিকের প্রশ্নগুলো।
তার নীরবতা নিয়ে আশিকের কৌতূহলও সে বুঝেছে।
আশিক ধীরে ধীরে বলল,
—তোমার মনে এত দুঃখ কেন?
আদ্রিতা কিছু বলল না।
শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে।
কম্পিউটার ল্যাবের কাচের জানালায় শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে।
আদ্রিতার চোখে সেই আলো পড়ে অদ্ভুত এক দীপ্তি তৈরি করল।
কিন্তু সেই দীপ্তির নিচে লুকিয়ে রইল অশ্রু।
অনেকক্ষণ পর সে বলল,
—সব দুঃখের গল্প বলা যায় না, আশিক ভাই।
আশিক নীরব।
—কিছু দুঃখ বললে মানুষ ছোট হয়ে যায়। কিছু দুঃখ বললে সংসার ছোট হয়ে যায়। আর কিছু দুঃখ আছে... যেগুলো বলার মতো মানুষই পাওয়া যায় না।
আশিক ধীরে ধীরে বলল,
—তাহলে আমি?
আদ্রিতা এবার তার দিকে তাকাল।
দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—আপনি হয়তো শুনতে পারবেন। কিন্তু আমার ভয় হয়... শুনলে হয়তো আমার মতো আপনিও এই দুঃখের অংশ হয়ে যাবেন।
আশিকের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে বুঝতে পারল, এতদিন যে নীরবতার দিকে তাকিয়ে ছিল, সেটি কেবল বিষণ্ণতা নয়।
তার ভেতরে একটা গল্প আছে।
একটা অসমাপ্ত গল্প।
একটা ব্যথা।
হয়তো কোনো পুরোনো ক্ষত।
হয়তো কোনো অপূর্ণতা।
হয়তো এমন কোনো সত্য, যা আদ্রিতা নিজের কাছেও পুরোপুরি স্বীকার করতে পারেনি।
আশিক কিছু বলল না।
শুধু বলল,
—তুমি চাইলে বলবে। না চাইলে কোনোদিন বলবে না। আমি জানতে চাই বলে তোমাকে বলতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
আদ্রিতা মৃদু হাসল।
—এই জন্যই হয়তো আপনাকে এতটা আপন মনে হয়।
আশিকও হাসল।
কিন্তু সেই হাসির ভেতর অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা ছিল।
পরদিন আদ্রিতার কোর্স শেষ হলো।
সবাই বিদায় নিচ্ছে।
হাসি, ছবি, শুভেচ্ছা—সবকিছুর ভিড়ে আদ্রিতা একবার আশিকের সামনে এসে দাঁড়াল।
—ভালো থাকবেন।
আশিক বলল,
—তুমিও।
—আমার জন্য দোয়া করবেন।
—সবসময়।
আদ্রিতা চলে গেল।
দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকাল।
আশিক তখনও দাঁড়িয়ে।
তাদের চোখাচোখি হলো।
কোনো কথা হলো না।
কথার প্রয়োজনও ছিল না।
কারণ কিছু সম্পর্ক কথায় তৈরি হয় না।
কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না।
কিছু মানুষ জীবনে আসে খুব অল্প সময়ের জন্য, অথচ তাদের নীরবতা অনেক বছর ধরে মনের ভেতর কথা বলে যায়।
আদ্রিতা চলে গেল।
কিন্তু তার সেই মায়াবী চোখ দুটো আশিকের মনে থেকে গেল।
আর থেকে গেল একটা প্রশ্ন—
আদ্রিতার সেই গোপন ব্যথাটা আসলে কী?
আশিক জানত না।
হয়তো কোনোদিন জানবেও না।
তবু তার মনে হলো, মানুষের জীবনে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য নয়—বয়ে বেড়ানোর জন্য আসে।
আদ্রিতার নীরবতারও হয়তো তেমনই কোনো উত্তর আছে।
আর যদি কোনোদিন, বহুদিন পর, আদ্রিতা ফিরে এসে বলে—
“আশিক ভাই, আজ আমি আমার গল্পটা বলতে চাই...”
তাহলে আশিক হয়তো কোনো প্রশ্ন করবে না।
শুধু চুপচাপ শুনবে।
কারণ সে জানে—
কখনো কখনো একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো সমাধান নয়;
শুধু এমন একজন মানুষ, যার সামনে সে নিজের গোপন ব্যথাটুকু নিরাপদে রেখে যেতে পারে।
আর আশিক হয়তো সেই মানুষটিই হতে চায়।
ভালোবাসার জন্য নয়।
অধিকার পাওয়ার জন্য নয়।
শুধু একজন মানুষের নীরবতার পাশে আরেকজন মানুষের নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য।
কারণ কিছু সম্পর্কের নাম না থাকাই হয়তো তাদের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়।
