আদ্রিতা,
কিছু মানুষ জীবনে আসে খুব নিঃশব্দে। কোনো ঘোষণা থাকে না, কোনো প্রতিশ্রুতিও নয়। অথচ একসময় টের পাওয়া যায়—মানুষটি আমাদের প্রতিদিনের ভাবনার ভেতর, নীরবতার ভেতর, এমনকি একাকিত্বের ভেতরও কোথাও স্থায়ী হয়ে গেছে।
তুমি তেমনই একজন।
আমি অপেক্ষায় থাকি বহুদূরে, তুমি হয়তো অপেক্ষায় থাকো আরও দূরে। আমাদের মধ্যে হয়তো অনেক পথ, অনেক বাস্তবতা, অনেক অদৃশ্য দেয়াল। অথচ এই দূরত্বের মধ্যেই আমাদের সবচেয়ে আশ্চর্য মিল—আমরা দুজনেই অপেক্ষা করি।
কিসের অপেক্ষা?
তোমাকে পাওয়ার নয়। তোমাকে ছুঁয়ে দেখারও নয়। শুধু কোনো এক নির্জন সময়ে তোমার পাশে বসে মন খুলে কথা বলার। তোমার মনের সেই দরজাটি একবার খুলে যেতে দেখার, যার ওপারে হয়তো জমে আছে অনেকদিনের না-বলা কথা, কিছু অভিমান, কিছু দুঃখ আর অল্প কিছু স্বপ্ন।
আমি সেসব শুনতে চাই।
তোমার সুখের গল্প শুনতে চাই, আবার তোমার দুঃখের নীরবতাও বুঝতে চাই। তুমি যখন হাসো, তখন সেই হাসির আড়ালে কোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে কি না—সেটুকুও জানতে ইচ্ছে করে। কারণ ভালোবাসা বোধহয় শুধু কাউকে সুখী দেখতে চাওয়ার নাম নয়; ভালোবাসা হলো তার অন্ধকারটুকুকেও ভয় না পাওয়া।
কখনো কখনো মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ককে খুব অদ্ভুতভাবে লিখে দেন। যাকে কাছে রাখেন, সে হয়তো হৃদয়ের গভীরে পৌঁছাতে পারে না। আর যে মানুষটি মনের গোপন অলিগলি চিনে ফেলে, তার জন্য বাস্তব জীবনে কোনো সহজ পথ খোলা থাকে না।
তুমি আমার কাছে সেই অসম্ভবের মতো।
তোমাকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছে আছে, কিন্তু তোমাকে পাওয়ার দাবি নেই। তোমার হাত ধরার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু তোমার জীবনের কোনো অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে নেই। তোমার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলতে মন চায়, অথচ জানি—সব ইচ্ছের পূর্ণতা সুন্দর হয় না।
কিছু ইচ্ছেকে অপূর্ণ রাখাও কখনো কখনো ভালোবাসারই একটি রূপ।
সমাজের চোখ আছে, সংসারের দায় আছে, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ব আছে। আমাদের চারপাশে এমন কিছু অদৃশ্য সীমারেখা আছে, যেগুলো অতিক্রম করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু অতিক্রম করার পর যে মানুষগুলো আহত হবে, তাদের মুখ আমরা কীভাবে ভুলে থাকব?
তাই থেমে যাই।
কাছে আসার ঠিক আগেই ফিরে যাই নিজের নিজের জীবনে।
অথচ কী অদ্ভুত—দূরে সরে গেলেই তোমাকে আরও বেশি কাছে অনুভব করি।
তোমার সঙ্গে কয়েকটি কথা কখনো কখনো সারাদিনের ক্লান্তির চেয়েও বড় সুখ হয়ে আসে। একটি ছোট্ট বার্তা, কয়েকটি আন্তরিক বাক্য, কিংবা তোমার নীরবতার মধ্যেও কোনো এক অদৃশ্য সাড়া—এসবই আমার কাছে কখনো কখনো অনেক বড় প্রাপ্তি।
হয়তো এটাই আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মল জায়গা।
এখানে কোনো দাবি নেই।
কোনো হিসাব নেই।
কোনো পাওনা নেই।
শুধু অনুভব আছে।
আর সেই অনুভবের সঙ্গে মিশে আছে এক গভীর দুঃখ—তোমাকে অনুভব করতে পারি, কিন্তু তোমাকে নিজের করে নিতে পারি না।
এই না-পারার মধ্যেই হয়তো আমাদের গল্পের সৌন্দর্য।
তাই আদ্রিতা, আমি এই চিঠির শেষ লিখতে চাই না।
কারণ শেষ মানেই যেন একটি দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। আর আমি চাই না আমাদের না-বলা কথাগুলোর দরজাটি কোনোদিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাক।
কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না। তারা কোনো সামাজিক পরিচয়ের দাবি করে না। তারা শুধু মানুষের মনের ভেতর একটি নীরব আলো জ্বেলে রাখে।
তুমিও তেমন একটি আলো হয়ে থেকো।
দূরে থেকো, তবু মনে থেকো।
যদি কোনোদিন খুব একা লাগে, যদি চারপাশের এত মানুষের মধ্যেও মনে হয়—তোমার কথা সত্যিকার অর্থে শোনার মতো কেউ নেই, তখন মনে করো, কোথাও একজন মানুষ আছে যে তোমার কথার অপেক্ষায় থাকে। তোমার সুখ শুনে যে আনন্দ পায়, তোমার দুঃখ শুনে যার নিজেরও মন ভারী হয়ে আসে।
সে তোমাকে কিছু দিতে চায় না।
শুধু তোমার না-বলা কথাগুলোর জন্য একটু জায়গা দিতে চায়।
হয়তো কোনোদিন তোমার মাথা আমার কাঁধে রাখা হবে না। কোনো সন্ধ্যায় পাশাপাশি হাঁটা হবে না। কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে তোমাকে ছাতা এগিয়ে দিয়ে বলা হবে না—“ভিজো না, অসুস্থ হয়ে যাবে।”
হয়তো কোনোদিন হাত ছুঁয়ে বলাও হবে না—
“তুমি পাশে থাকলে আর কিছুই আমার চাই না।”
তবু কিছু কথা না বলেও সত্যি থাকে।
কিছু ভালোবাসা স্পর্শ ছাড়াই গভীর হয়।
কিছু মানুষ কাছে না থেকেও জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে থাকে।
তোমার জমানো দুঃখ আর আমার বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট হয়তো কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না। তারা আমাদের নিজস্ব অন্ধকারেই নীরবে বেঁচে থাকুক। কারণ সব অনুভূতির পরিণতি প্রয়োজন নেই; কিছু অনুভূতি শুধু অনুভূত হয়েই সুন্দর।
আর আমাদের গল্প?
সে গল্প অসমাপ্তই থাকুক।
কারণ হয়তো পূর্ণতা পেলে আমরা তাকে হারিয়ে ফেলতাম। অসমাপ্ত বলেই সে আমাদের মনে এতটা জীবন্ত।
তাই তোমাকে পাওয়ার কোনো প্রার্থনা করব না।
শুধু প্রার্থনা করব—
তুমি ভালো থেকো।
তোমার মুখের হাসিটুকু অক্ষত থাকুক।
তোমার দুঃখগুলো একদিন একটু একটু করে হালকা হয়ে যাক।
আর কোনো এক নিঃশব্দ রাতে যদি আমার কথা মনে পড়ে, মনে কোরো—দূরত্বের ওপারে কেউ একজন এখনও তোমার মনের কথাগুলো শুনতে চায়।
আমি চিঠিটা এখানেই শেষ করতে পারতাম।
কিন্তু করব না।
কিছু চিঠি শেষ করার জন্য লেখা হয় না;
কিছু চিঠি শুধু প্রমাণ করে—
কেউ একজন কোনো একসময় কাউকে গভীরভাবে অনুভব করেছিল।
তুমিও তাই থেকো—
আমার কাছে নয়,
আমার ভেতরে।
অধরা হয়ে,
অপ্রকাশিত হয়ে,
অসমাপ্ত হয়ে।
অসীমের মতো—
যার কোনো শেষ নেই।
ভালো থেকো, আদ্রিতা।
ইতি,
তোমার দূরত্বের ওপারে অপেক্ষায় থাকা একজন।
আদ্রিতা এবং অপেক্ষা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

No comments:
Post a Comment