Showing posts with label মাঝপথের মানুষ. Show all posts
Showing posts with label মাঝপথের মানুষ. Show all posts

Saturday, September 5, 2026

আদ্রিতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ল্যাব সুপারভাইজার আশিক প্রতিদিনের মতো সেদিনও নির্দিষ্ট সময়ে কম্পিউটার ল্যাবে ঢুকেছিল। নতুন চাকরি। মাত্র কয়েকদিন হলো এই ল্যাবে যোগ দিয়েছে। কাজের প্রতি তার এক ধরনের অদ্ভুত মনোযোগ—ল্যাবে ঢুকেই একে একে প্রতিটি ডেস্ক ঘুরে দেখা, শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না খেয়াল করা, কারও কোনো সমস্যা হলে পাশে দাঁড়ানো।

সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।

এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে যেতে যেতে হঠাৎ ল্যাবের একেবারে শেষ প্রান্তের ডেস্কটিতে গিয়ে তার চোখ আটকে গেল।

একটি মেয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে।

মেয়েটিকে আশিক আগে কখনো দেখেনি।

অবশ্য দেখবে কী করে? সে তো মাত্র কয়েকদিন হলো এখানে এসেছে। মেয়েটিও হয়তো আগের দিনগুলোতে অন্য কোনো সময়ে এসেছে, কিংবা কোনো কারণে তার চোখে পড়েনি।

আশিক মেয়েটির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

—তোমার নাম কী?

মেয়েটি চমকে তাকাল। চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়। তারপর খুব নিচু, নরম স্বরে বলল—

—আমি আদ্রিতা।

কণ্ঠস্বরটাও যেন মেয়েটির স্বভাবের মতো—নরম, ধীর, নিঃশব্দ।

আশিক জিজ্ঞেস করল,

—কতদিন হলো এখানে আসছ?

—দুই মাস।

—গত সপ্তাহে তোমাকে দেখিনি।

মেয়েটি একটু থেমে বলল,

—শেষ সপ্তাহে ল্যাবে আসতে পারিনি।

আশিক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু বলল,

—ল্যাব শেষ হলে আমার অফিসে একবার দেখা করে যেও।

মেয়েটি মাথা নেড়ে আবার কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে গেল।

কিন্তু সেদিন ল্যাব শেষ হওয়ার পর আদ্রিতা আর আশিকের অফিসে গেল না।

চুপচাপ চলে গেল।

পরদিন আশিক তাকে কয়েকবার দেখল। কিন্তু ডাকল না। শুধু দূর থেকে দেখল।

কেন জানি মেয়েটিকে দেখে তার মনে হচ্ছিল—এই মেয়েটির নীরবতার মধ্যে কিছু একটা আছে।

কিন্তু সেটা কী?

জানার কোনো কারণও ছিল না, অধিকারও ছিল না।

তবু কৌতূহলটা থেকে গেল।

সপ্তাহের শেষ দিন। এরপর দুদিন ল্যাব বন্ধ থাকবে। তাই সেদিন আশিক আবার আদ্রিতাকে বলল,

—আজ কিন্তু ল্যাব শেষে আমার সঙ্গে দেখা করবে।

এবার আদ্রিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

ল্যাব শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর দরজায় মৃদু শব্দ হলো।

আশিক তাকিয়ে দেখল—আদ্রিতা দাঁড়িয়ে আছে।

—ভেতরে আসো।

আদ্রিতা এসে চুপচাপ একটা চেয়ারে বসল।

কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।

আশিকই নীরবতা ভাঙল।

—তুমি প্রথম দিন আমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে গিয়েছিলে।

আদ্রিতা মৃদু হাসল।

—ভয় পেয়েছিলাম।

—আমাকে?

—না। আসলে... কথা বলতে ভালো লাগে না আমার।

আশিক একটু অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

প্রশ্নটা শুনেই মেয়েটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে কিছু বলল না।

আশিক আবার বলল,

—তুমি সবসময় এত চুপচাপ থাকো কেন?

এবার আদ্রিতা মুখ তুলে তাকাল।

আশিক সেই চোখ দুটো প্রথমবার এত কাছ থেকে দেখল।

টানাটানা চোখ।

চোখের ভেতরে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা।

মুহূর্তের মধ্যেই চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল।

আশিক অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

—আরে! আমি কি কোনো ভুল কথা বললাম?

আদ্রিতা মাথা নাড়ল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—আমার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। তখন আমরা দুই বোন খুব ছোট।

আশিক চুপ করে শুনতে লাগল।

—বাবা থাকলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো। আমি পড়াশোনা করতে চেয়েছিলাম। অনেক দূর যেতে চেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সবকিছু তো ইচ্ছেমতো হয় না।

একটু থেমে আদ্রিতা জানালার বাইরে তাকাল।

—সংসার, দায়িত্ব... তারপর নিজের জীবন। একসময় বুঝলাম, কিছু স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়েই থাকে।

আশিকের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে গেল।

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—তোমার কষ্টের জন্য সত্যিই দুঃখিত। তবে একটা কথা মনে রেখো, জীবনে সব স্বপ্ন পূরণ না হলেও মানুষ তার ভেতরের আলোটা ধরে রাখতে পারে।

আদ্রিতা তাকাল।

মৃদু একটা হাসি ফুটল তার ঠোঁটে।

—সবসময় পারে?

আশিক উত্তর দিতে পারল না।

সেদিন আদ্রিতা চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ আশিক তার অফিসে বসে রইল।

তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

এত সুন্দর একটা মেয়ের চোখে এত দুঃখ কেন?

আদ্রিতার চোখ ছিল টানাটানা, মায়াবী। তার দোহারা গড়ন আশিকের মনে করিয়ে দিত পুরোনো কোনো বাংলা গল্পের চরিত্রকে। দুধে-আলতা গায়ের রং, মুখে এক ধরনের সতেজতা—দেখলে মনে হয় জীবন তাকে এখনো পুরোপুরি ক্লান্ত করতে পারেনি।

অথচ চোখ দুটো বলত অন্য কথা।

চোখ যেন জানত এমন কিছু, যা মুখ জানে না।


এরপর থেকে আশিক আর আদ্রিতার মধ্যে অল্পস্বল্প কথা হতে লাগল।

কখনো কম্পিউটারের কোনো সমস্যা নিয়ে।

কখনো কোর্সের পড়াশোনা নিয়ে।

কখনো একেবারে সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে।

কথা খুব বেশি নয়।

তবু আশিক বুঝতে পারল, তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।

এটা বন্ধুত্ব নয়।

প্রেম তো নয়ই।

তবু কোথাও যেন এক ধরনের আপনত্ব আছে।

আদ্রিতার কোনো প্রয়োজন হলে আশিক সাহায্য করতে চায়। আদ্রিতা কোনো সমস্যায় পড়লে আশিকের মনে হয়, তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।

কিন্তু কেন?

সে নিজেও জানে না।

হয়তো কিছু মানুষকে জীবনে ভালোবাসতে হয় না, বন্ধু বানাতেও হয় না—শুধু তাদের ভালো থাকা কামনা করতে ইচ্ছে করে।

আদ্রিতা ছিল তেমনই একজন।

একদিন কথায় কথায় আশিক জানতে পারল, আদ্রিতা বিবাহিত।

তার একটি ছোট সন্তানও আছে।

সংসারও সুখের।

আশিক অবাক হলো না, বরং এক ধরনের স্বস্তি পেল।

সে মনে মনে বলল—

ভালোই তো। মেয়েটা সুখে আছে।

কিন্তু তারপরও একটা প্রশ্ন তাকে ছাড়ল না।

তাহলে দুঃখটা কোথায়?

একজন মানুষের জীবনে সংসার থাকতে পারে, স্বামী থাকতে পারে, সন্তান থাকতে পারে, হাসি থাকতে পারে—তবু তার ভেতরে এমন কোনো ঘর থাকতে পারে কি, যেখানে কেউ কোনোদিন ঢোকে না?

আশিকের মনে হতে লাগল, আদ্রিতার ভেতরেও তেমন একটা ঘর আছে।

যে ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ।


দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।

কম্পিউটার কোর্সের শেষ পর্যায়।

আর কিছুদিন পর আদ্রিতা চলে যাবে।

আশিক জানে, তারপর হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না।

একদিন ল্যাবে বসে আশিক দূর থেকে আদ্রিতার দিকে তাকিয়ে ছিল।

মেয়েটি কম্পিউটারে কাজ করছে।

মাঝে মাঝে চুল ঠিক করছে।

কখনো কপাল কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে।

কখনো পাশের মেয়েটির সঙ্গে মৃদু হেসে কথা বলছে।

আশিক হঠাৎ ভাবল—

এই মেয়েটা কি সত্যিই সুখী?

তার সংসার আছে।

স্বামী আছে।

সন্তান আছে।

জীবন আছে।

তবু কেন তার চোখে মাঝে মাঝে এমন এক শূন্যতা নেমে আসে, যা কোনো শব্দে ধরা যায় না?

আশিকের মনে হলো, মানুষের সবচেয়ে গভীর দুঃখগুলো বোধহয় বলা যায় না।

কিছু ব্যথা ভাষা পায় না।

কিছু অভিমান কাউকে বলা যায় না।

কিছু স্মৃতি মানুষের সঙ্গে একই ঘরে থাকে, একই বিছানায় ঘুমায়, একই সংসারে হাঁটে—তবু কারও সঙ্গে তার পরিচয় হয় না।

হয়তো আদ্রিতার ভেতরেও তেমন কোনো গল্প আছে।

কিন্তু সেই গল্পের শেষ পাতাটা আশিক পড়তে পারছে না।


শেষ দিনের আগের দিন।

ল্যাব প্রায় ফাঁকা।

আশিক কাজ শেষ করে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে আদ্রিতার কণ্ঠ শুনতে পেল—

—আশিক ভাই...

আশিক ফিরে তাকাল।

—হ্যাঁ?

আদ্রিতা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল,

—আপনি কি আমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবেন?

আশিক অবাক।

—কী কথা?

আদ্রিতা মৃদু হেসে বলল,

—যেটা আপনি অনেকদিন ধরে জানতে চাইছেন।

আশিকের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।

সে বুঝতে পারল—আদ্রিতা তার চোখ এড়িয়ে যায়নি।

সে বুঝেছে আশিকের প্রশ্নগুলো।

তার নীরবতা নিয়ে আশিকের কৌতূহলও সে বুঝেছে।

আশিক ধীরে ধীরে বলল,

—তোমার মনে এত দুঃখ কেন?

আদ্রিতা কিছু বলল না।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে।

কম্পিউটার ল্যাবের কাচের জানালায় শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে।

আদ্রিতার চোখে সেই আলো পড়ে অদ্ভুত এক দীপ্তি তৈরি করল।

কিন্তু সেই দীপ্তির নিচে লুকিয়ে রইল অশ্রু।

অনেকক্ষণ পর সে বলল,

—সব দুঃখের গল্প বলা যায় না, আশিক ভাই।

আশিক নীরব।

—কিছু দুঃখ বললে মানুষ ছোট হয়ে যায়। কিছু দুঃখ বললে সংসার ছোট হয়ে যায়। আর কিছু দুঃখ আছে... যেগুলো বলার মতো মানুষই পাওয়া যায় না।

আশিক ধীরে ধীরে বলল,

—তাহলে আমি?

আদ্রিতা এবার তার দিকে তাকাল।

দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—আপনি হয়তো শুনতে পারবেন। কিন্তু আমার ভয় হয়... শুনলে হয়তো আমার মতো আপনিও এই দুঃখের অংশ হয়ে যাবেন।

আশিকের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে বুঝতে পারল, এতদিন যে নীরবতার দিকে তাকিয়ে ছিল, সেটি কেবল বিষণ্ণতা নয়।

তার ভেতরে একটা গল্প আছে।

একটা অসমাপ্ত গল্প।

একটা ব্যথা।

হয়তো কোনো পুরোনো ক্ষত।

হয়তো কোনো অপূর্ণতা।

হয়তো এমন কোনো সত্য, যা আদ্রিতা নিজের কাছেও পুরোপুরি স্বীকার করতে পারেনি।

আশিক কিছু বলল না।

শুধু বলল,

—তুমি চাইলে বলবে। না চাইলে কোনোদিন বলবে না। আমি জানতে চাই বলে তোমাকে বলতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

আদ্রিতা মৃদু হাসল।

—এই জন্যই হয়তো আপনাকে এতটা আপন মনে হয়।

আশিকও হাসল।

কিন্তু সেই হাসির ভেতর অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা ছিল।


পরদিন আদ্রিতার কোর্স শেষ হলো।

সবাই বিদায় নিচ্ছে।

হাসি, ছবি, শুভেচ্ছা—সবকিছুর ভিড়ে আদ্রিতা একবার আশিকের সামনে এসে দাঁড়াল।

—ভালো থাকবেন।

আশিক বলল,

—তুমিও।

—আমার জন্য দোয়া করবেন।

—সবসময়।

আদ্রিতা চলে গেল।

দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকাল।

আশিক তখনও দাঁড়িয়ে।

তাদের চোখাচোখি হলো।

কোনো কথা হলো না।

কথার প্রয়োজনও ছিল না।

কারণ কিছু সম্পর্ক কথায় তৈরি হয় না।

কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না।

কিছু মানুষ জীবনে আসে খুব অল্প সময়ের জন্য, অথচ তাদের নীরবতা অনেক বছর ধরে মনের ভেতর কথা বলে যায়।

আদ্রিতা চলে গেল।

কিন্তু তার সেই মায়াবী চোখ দুটো আশিকের মনে থেকে গেল।

আর থেকে গেল একটা প্রশ্ন—

আদ্রিতার সেই গোপন ব্যথাটা আসলে কী?

আশিক জানত না।

হয়তো কোনোদিন জানবেও না।

তবু তার মনে হলো, মানুষের জীবনে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য নয়—বয়ে বেড়ানোর জন্য আসে।

আদ্রিতার নীরবতারও হয়তো তেমনই কোনো উত্তর আছে।

আর যদি কোনোদিন, বহুদিন পর, আদ্রিতা ফিরে এসে বলে—

“আশিক ভাই, আজ আমি আমার গল্পটা বলতে চাই...”

তাহলে আশিক হয়তো কোনো প্রশ্ন করবে না।

শুধু চুপচাপ শুনবে।

কারণ সে জানে—

কখনো কখনো একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো সমাধান নয়;

শুধু এমন একজন মানুষ, যার সামনে সে নিজের গোপন ব্যথাটুকু নিরাপদে রেখে যেতে পারে।

আর আশিক হয়তো সেই মানুষটিই হতে চায়।

ভালোবাসার জন্য নয়।

অধিকার পাওয়ার জন্য নয়।

শুধু একজন মানুষের নীরবতার পাশে আরেকজন মানুষের নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য।

কারণ কিছু সম্পর্কের নাম না থাকাই হয়তো তাদের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়।



আদ্রিতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Tuesday, August 25, 2026

শরতের মেঘ ও মায়াবী চোখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নিঝুম রাতের নীরবতা চিরে বারবার দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটাই ভেসে আসছে। তোহা ঘড়ির দিকে তাকাল—রাত তিনটে বাজে। বালিশে এপাশ-ওপাশ করে রাত পার করাটা ইদানিং তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। আর এই রাতজাগা অঘুমের একমাত্র নেপথ্য কারিগর—তুলি।

তুলির চোখের দিকে তাকানো আর আগুনে হাত দেওয়া একই কথা—এ সত্যটা তোহা ভালো করেই জানে। কিন্তু সেই চোখের মোহ এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার কখনোই ছিল না। সেদিন ক্যাম্পাসের করিডোরে যখন তুলি এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল, তখন তার ওই তীক্ষ্ণ, বিদ্ধ করা চাহনি তোহার বুকের ভেতরে কালবৈশাখী ঝড় তুলে দিয়েছিল। ও চোখে চোখ রাখা মানেই যে সর্বনাশের হাতছানি, তা জেনেও তোহা প্রতিবার সেই বিষাক্ত মায়ায় ডুবে যায়। নিজের বুকের ভেতরের অনিয়ন্ত্রিত, বেপরোয়া হৃদস্পন্দন আর ব্যাকুল অস্থিরতাকেই সে ভালোবেসে ফেলেছে।

টেবিলের ওপর হালকা আলোয় তুলির ডায়েরির ফাঁকে লুকিয়ে রাখা স্কেচ খাতাটা খুলে বসল তোহা। খাতার পাতায় তুলির সেই অপার্থিব মায়াবী চোখ জোড়া আঁকা। রাত যতই গভীর হয়, ওই চাহনির মায়াজাল যেন ঘর জুড়ে আরও বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।

দিন পেরিয়ে শহরের বুকে তখন শরতের স্নিগ্ধ আগমন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শিউলি ফোটার দিনগুলোতে তোহা আর তুলির সম্পর্কের সমীকরণটা যেন এক অব্যাখ্যনীয় মায়ায় জড়িয়ে থাকে। ওরা দুজন দূরের নক্ষত্রের মতো—কাছাকাছি আসার অনুমতি নেই, অথচ অদৃশ্য এক টান দুজনকে বেঁধে রাখে একই সুতোয়।

এক নির্জন শরতের বিকেলে ক্লাসের কোলাহল শেষে তোহা আর তুলি পাশাপাশি হাঁটছিল। চারপাশে শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস ছড়ানো, আর মাথার ওপর শরতের আকাশ জুড়ে জমাট বেঁধেছে শুভ্র ও কালো মেঘের আলপনা। দিন ফুরিয়ে আসার গোধূলির নরম আলো এসে পড়েছে তুলির চোখে।

তোহা থমকে দাঁড়াল। নীল আকাশের নির্জন বুকের নিচে, নীরবতার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তোহা তুলির চোখে রেখে দিল তার সমস্ত না-বলা কথা। মুখে ফুটে কিছু বলা হলো না, কিন্তু চোখের ভাষাতেই যেন জমা হলো জমে থাকা সব আবেগ।

তোহা গভীরভাবে অনুভব করল—জীবন তো শেষ পর্যন্ত কিছু অমূল্য স্মৃতি আর দীর্ঘ অপেক্ষার সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। শরতের মেঘের মতো তাদের ভালোবাসার গল্পেও হয়তো কখনো আলোর শুভ্রতা আসবে, কখনো নামবে না-পাওয়ার কালো ছায়া; তবুও তারা একই আকাশের নিচে বেঁচে থাকবে। এই ঘুমহীন রাত, স্কেচ খাতার মায়াবী চোখ আর শিউলিঝরা বিকেলে গোধূলির নীরবতাই তোহা আর তুলির অপ্রকাশিত ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।

শরতের মেঘ ও মায়াবী চোখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Monday, August 24, 2026

শরতের সেই মায়াবী চোখ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

শরতের বিকেলটা এমনিতেই অন্যরকম।

আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে হালকা শীতের আগমনী বার্তা, দূরের মাঠজুড়ে কাশফুলের দোলা। ঈশ্বরদী শহরের ব্যস্ততার মাঝেও সেদিন বিকেলটা যেন অদ্ভুত এক নীরবতায় মোড়া ছিল।

ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল হিমেল।

হিমেল বহু বছর ধরে এই শহরে থাকে। প্রতিদিন কতবার যে এই কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করেছে, তার হিসাব নেই। অথচ সেদিনের আগে কখনো কলেজের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা হয়নি তার।

কেন যেন সেদিন দাঁড়িয়েছিল।

হয়তো কোনো অজানা গল্পের শুরুতেই মানুষকে কোথাও দাঁড় করিয়ে দেয় নিয়তি।

হিমেল অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল কলেজের মূল ফটকের দিকে।

এক তরুণী ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।

দুধে-আলতা মেশানো গায়ের রং। পরনে কাশফুলের মতো শুভ্রতার সঙ্গে হালকা নকশার শাড়ি। কোমর ছুঁয়ে নামা এলোমেলো চুল। আর সেই চোখ—

হিমেল জীবনে অনেক সুন্দর চোখ দেখেছে। কিন্তু এমন চোখ কখনো দেখেনি।

এক পলক দেখেই তার মনে হলো, তামিল কোনো সিনেমার নায়িকা বুঝি শুটিং করতে এসে ভুল করে এই ছোট্ট শহরের কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে গেছে।

মেয়েটি একবার তাকিয়েছিল।

শুধু একবার।

কিন্তু সেই একবারেই হিমেলের পৃথিবী যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

হিমেল তাকিয়েই রইল।

চোখের নেশা কাটিয়ে যখন নিজের চারপাশে ফিরে এল, তখন মেয়েটি আর নেই।

গেটের ভিড়ের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

হিমেল কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিজের মনেই বলল,

— কে মেয়েটা?

সেদিন রাতে ঘুম এলো না।

একটি অচেনা মুখ, অথচ চেনা চেনা এক জোড়া চোখ বারবার মনে পড়তে লাগল।

পরদিন হিমেল খোঁজ শুরু করল।

জানতে পারল, মেয়েটি এই কলেজের ছাত্রী নয়। গ্রামের একটি কলেজে পড়ে। পরীক্ষা দিতে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে এসেছিল।

ব্যস, এতটুকুই।

নাম জানা হলো না।

বাড়ি কোথায় জানা হলো না।

কোন গ্রামের মেয়ে, তাও জানা হলো না।

তবু হিমেলের মনে হলো, সে মেয়েটিকে আবার দেখবেই।

দিন গেল।

পরীক্ষা শেষ হলো।

মেয়েটি আর এল না।

হিমেলও তার খোঁজ পেল না।

কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। যুক্তি যেখানে বলে, ‘ভুলে যাও’, মন সেখানে বলে, ‘অপেক্ষা করো।’

হিমেল অপেক্ষা করতে শুরু করল।

প্রতিদিন বিকেল নামলেই সে কলেজ গেটের কাছে এসে দাঁড়াত। কখনো দশ মিনিট, কখনো আধঘণ্টা। কোনো দিন এক ঘণ্টাও কেটে যেত।

কেউ জানত না সে কীসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।

বন্ধুরা হাসত।

— কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে কী করিস?

হিমেল হেসে বলত,

— এমনিই।

কিন্তু সে জানত, ‘এমনিই’ নয়।

সে অপেক্ষা করছিল সেই মায়াবী চোখের জন্য।

এভাবে কেটে গেল প্রায় এক বছর।

এক বছর পর আবার শরৎ এলো।

আবার আকাশে সাদা মেঘ।

আবার বাতাসে কাশফুলের গন্ধ।

আবার সেই কলেজের গেট।

সেদিনও হিমেল দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ—

চোখ দুটো যেন বিশ্বাস করতে চাইল না।

সামনে সেই মেয়েটি।

একই মায়াবী চোখ।

হিমেলের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।

সে মনে মনে বলল,

‘এবার যদি হারিয়ে যায়?’

কিছুক্ষণ দ্বিধা করে অবশেষে সাহস সঞ্চয় করল।

মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

— একটু শুনবেন?

মেয়েটি থেমে তাকাল।

সেই চোখ।

এক বছর ধরে যে চোখের অপেক্ষায় ছিল হিমেল, আজ সেই চোখ তার সামনে।

মেয়েটি মৃদুস্বরে বলল,

— জি?

হিমেল কিছুক্ষণ কথা খুঁজে পেল না।

শেষ পর্যন্ত বলল,

— আপনার নামটা জানতে পারি?

মেয়েটি একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

— সাথী।

একটি নাম।

মাত্র দুটি অক্ষরের মতো ছোট্ট একটি পরিচয়।

কিন্তু হিমেলের কাছে সেদিন মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দটি বুঝি ‘সাথী’।

সেদিন খুব বেশি কথা হয়নি।

সাথী জানাল, পরীক্ষার জন্য সে শহরে একা থাকছে।

হিমেল শুধু বলল,

— আপনাকে এক বছর আগে দেখেছিলাম।

সাথী অবাক হয়ে বলল,

— এক বছর আগে?

— জি। এই কলেজ গেটে।

— তারপর?

হিমেল একটু হেসে বলল,

— তারপর আপনাকে খুঁজেছি।

সাথী কিছু বলল না।

শুধু চোখের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।

সেদিন বিদায়ের সময় দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ।

তারপর সাথী চলে গেল।

কিন্তু এবার আর সে হারিয়ে গেল না।

কয়েক দিন পর আবার দেখা হলো।

তারপর ফোন নম্বর নেওয়া হলো।

ফেসবুকে বন্ধুত্ব হলো।

আর ধীরে ধীরে অচেনা দুজন মানুষ পরিচিত হতে শুরু করল।

সকালের ‘কেমন আছেন?’ থেকে রাতের ‘ঘুমাবেন না?’—কথার পরিধি বাড়তে লাগল।

সাথী জানল হিমেলের পছন্দের বইয়ের কথা।

হিমেল জানল সাথী বৃষ্টি ভালোবাসে।

সাথী জানল হিমেল চা ছাড়া সকাল শুরু করতে পারে না।

হিমেল জানল, সাথী মন খারাপ করলে খুব চুপ হয়ে যায়।

তারা নিজেদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, অভিমান, স্বপ্ন—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে লাগল।

কখন যে কথার ফাঁকে ফাঁকে ভালোবাসা ঢুকে পড়েছিল, তারা কেউ জানল না।

কেউ কাউকে ‘ভালোবাসি’ বলেনি।

তবু তারা দুজনেই বুঝে গিয়েছিল—

ভালোবাসা সবসময় মুখে বলতে হয় না।

কখনো কখনো ভালোবাসা মানুষের অপেক্ষায় থাকে।

কখনো একটি ফোনকলের ওপাশে থাকে।

কখনো ‘খেয়েছ?’ প্রশ্নটির ভেতরে লুকিয়ে থাকে।

আর কখনো একটি মায়াবী চোখের মধ্যে সারাজীবনের জন্য ঘর বানিয়ে নেয়।

একদিন সাথী হঠাৎ বলেছিল,

— হিমেল, আমাদের এই সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

হিমেল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,

— যেখানে তুমি থাকবে, আমি সেখানেই থাকতে চাই।

সাথী মৃদু হেসেছিল।

— কথাটা খুব সহজে বললে।

— কারণ সত্যি কথাগুলো বলতে বেশি ভাবতে হয় না।

তারপর একদিন হিমেল নিজের পরিবারের কাছে সবকিছু জানাল।

হিমেল সরকারি চাকরিজীবী। ভালো পরিবার। সুনাম আছে।

অন্যদিকে সাথীর বাবাও গ্রামের সম্মানিত মানুষ। পরিবারে ঐতিহ্য ও সামাজিক মর্যাদা আছে।

দুই পরিবারের মধ্যে কথা হলো।

প্রথমে সাথীর বাবা-মা হিমেলকে দেখলেন।

তারপর হিমেলের পরিবার দেখল সাথীকে।

দুই পরিবারের সম্মতিতে সম্পর্কটি পেল নতুন একটি নাম।

বিয়ে।

তারিখ ঠিক হলো শরতের এক দিনে।

যে শরতে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।

বিয়ের দিন সকাল থেকেই আকাশে সাদা মেঘ।

দূরের মাঠে কাশফুল দুলছে।

সন্ধ্যায় হিমেল যখন সাথীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তার মনে হলো—এক বছর আগের সেই বিকেলটা আবার ফিরে এসেছে।

সেই চোখ।

সেই মুখ।

সেই মায়া।

শুধু আজ আর মেয়েটি অচেনা নয়।

আজ সে তার জীবনের মানুষ।

হিমেল মৃদুস্বরে বলল,

— জানো, তোমাকে প্রথম দেখার দিন আমি ভাবিনি তুমি কোনোদিন আমার হবে।

সাথী হাসল।

— আমিও ভাবিনি, কলেজের একটা গেট আমার জীবনের গল্প বদলে দেবে।

হিমেল বলল,

— তোমাকে খুঁজতে গিয়ে বুঝেছিলাম, কিছু মানুষকে পাওয়ার আগে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

সাথী নিচু চোখে বলল,

— আর আমি বুঝেছিলাম, কেউ একজন সত্যিই এক বছর ধরে অপেক্ষা করতে পারে।

বাইরে তখন শরতের বাতাস।

দূরে কাশফুলের সারি।

আকাশে জ্যোৎস্নার আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।

হিমেল সাথীর হাতটা আলতো করে ধরল।

মনে হলো, এক বছর আগে যে গল্পটি একটি মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে শুরু হয়েছিল, আজ সেই গল্প পূর্ণতা পেল।

হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক—

কখনো কখনো মানুষকে ভালোবাসতে শুরু করার জন্য কোনো ঘোষণা লাগে না।

লাগে শুধু এক পলক দেখা।

একটু অপেক্ষা।

কিছু অকারণ কথা।

আর একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলব—এই ভয়।

হিমেল হারায়নি।

সাথীও হারায়নি।

বরং শরতের সেই বিকেলে যে দুটি চোখ একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত একে অপরের জীবনের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেল।


Friday, August 14, 2026

নিশিরাতের কাব্য -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

একটা সময় ছিল, তাওসিফ আর তাসফিয়ার গল্প যেন শেষই হতে চাইত না। দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে রাত নামত, শহর ঘুমিয়ে পড়ত, জানালার ওপাশে চাঁদ তার জায়গা বদলাত—কিন্তু তাদের কথা ফুরাত না।

কখনো খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে শুরু হতো গল্প, আর কখন যে সেই গল্প জীবনের গভীর কোনো অনুভূতিতে গিয়ে পৌঁছাত, তারা নিজেরাও বুঝতে পারত না। অভিমান, স্বপ্ন, ভয়, ভবিষ্যৎ—সবকিছুই তারা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিত।

কিন্তু ইদানীং কেমন যেন বদলে গেছে সব।

কথা হয়, তবে আগের মতো নয়। হুটহাট দু-চারটা কথা, তারপর নীরবতা। কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না—কী হয়েছে? কেন এমন হলো?

অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো অভিযোগও নেই। দূরত্বটা যেন কোনো এক অদৃশ্য সন্ধ্যায় এসে তাদের মাঝখানে বসে পড়েছে।

তাওসিফ মাঝে মাঝে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাসফিয়ার নামটা অনলাইনে দেখলেও মেসেজ লিখতে পারে না। আবার তাসফিয়াও হয়তো একইভাবে অপেক্ষা করে—কিন্তু কেউই প্রথম কথাটা শুরু করতে পারে না।

শ্রাবণের এক বৃষ্টিস্নাত বিকেল।

আকাশটা সকাল থেকেই মেঘে ঢাকা। বিকেলের দিকে হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি। জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ পানি নামছে। তাওসিফ চুপচাপ বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।

তাসফিয়ার মেসেজ।

“আজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম।”

একটা ছোট্ট বাক্য।

কিন্তু তাওসিফের কাছে যেন বহুদিনের নীরবতার দরজা হঠাৎ খুলে গেল।

সে কয়েক সেকেন্ড মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“কী দেখেছ?”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

“বলব না।”

“কেন?”

“বললে তুমি খুব বেশি খুশি হয়ে যাবে।”

তাওসিফ হেসে লিখল—

“তাহলে তো আরও শুনতে ইচ্ছে করছে।”

তারপর শুরু হলো সেই পুরোনো গল্প।

একটা মেসেজ থেকে আরেকটা মেসেজ। হাসি, অভিমান, পুরোনো স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া কথাগুলো—সব যেন একে একে ফিরে আসতে লাগল।

রাত কখন গভীর হয়ে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি।

বিদায় নেওয়ার আগে তাসফিয়া লিখল—

“আজ অনেকদিন পর ভালো লাগল কথা বলে।”

তাওসিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল—

“আমারও।”

আরও কিছু বলতে চেয়েও সে থেমে গেল।

কখনো কখনো কিছু অনুভূতি শব্দে বললে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।


মাঝরাত।

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি।

টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন একটানা কোনো অচেনা কবিতা লিখে চলেছে। দূরে কোথাও মেঘ ডাকছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকে অন্ধকার ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠছে।

তাওসিফ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।

হঠাৎ তার মনে হলো—তাসফিয়া যদি এখন পাশে থাকত!

ভাবনাটা আসতেই সে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।

তারপর কল্পনার ভেতর ধীরে ধীরে তৈরি হলো অন্য এক পৃথিবী।

তাসফিয়া পরেছে নীল শাড়ি।

বৃষ্টিভেজা চুল কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। চোখে সেই চিরচেনা মায়া।

তাওসিফ তার পাশে হাঁটছে।

শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে তারা দুজন গিয়ে বসেছে রাস্তার ধারের ছোট্ট এক টং দোকানে। চারপাশে বৃষ্টি। দোকানের টিনের চাল থেকে ধারার মতো পানি পড়ছে।

দোকানদার দুটো ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।

তাসফিয়া কাপ হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বলল,

—“জানো, বৃষ্টিতে চা খাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ আছে।”

তাওসিফ তাকিয়ে বলল,

—“তোমার সঙ্গে হলে সবকিছুরই আলাদা আনন্দ।”

তাসফিয়া চোখ নামিয়ে নিল।

বৃষ্টির শব্দের আড়ালে লুকিয়ে গেল তার লাজুক হাসি।

চা শেষ হলো।

কিন্তু বৃষ্টি থামল না।

বরং আরও বেড়ে গেল।

ফিরতে গিয়ে দুজনই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর তাসফিয়া হঠাৎ বলল,

—“এভাবে গেলে তো পুরো ভিজে যাব।”

তাওসিফ চারপাশে তাকিয়ে দূরে একটা ছোট্ট কুড়েঘর দেখতে পেল।

—“ওখানে একটু আশ্রয় নিই?”

তাসফিয়া মাথা নাড়ল।

দুজন ছুটে গিয়ে কুড়েঘরটার নিচে দাঁড়াল।

বাইরে তখন শ্রাবণের উন্মত্ত বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, দূরে মেঘের গর্জন আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো—সব মিলিয়ে পৃথিবীটা যেন হঠাৎ তাদের দুজনের জন্য থেমে গেছে।

তাসফিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

তাওসিফ তাকিয়ে ছিল তার দিকে।

কথা ছিল অনেক।

কিন্তু কোনো কথাই মুখে আসছিল না।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

সেই চোখে ছিল বহুদিনের জমে থাকা প্রশ্ন, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা আর না-বলা ভালোবাসা।

তাসফিয়া ধীরে ধীরে বলল,

—“আমাদের এত দূরত্ব কেন হলো, তাওসিফ?”

তাওসিফ মৃদুস্বরে বলল,

—“জানি না।”

—“আমরা তো কোনোদিন ঝগড়াই করিনি।”

—“তবু দূরে চলে গিয়েছিলাম।”

—“আবার কি কাছে আসা যায়?”

তাওসিফ কোনো উত্তর দিল না।

শুধু তাসফিয়ার হাতটা আলতো করে ধরল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি।

মেঘ ডাকছে।

আর সেই শব্দের আড়ালে দুজন মানুষের দীর্ঘদিনের নীরবতা ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে।

তাসফিয়া মাথাটা তাওসিফের কাঁধে রাখল।

তাওসিফ তাকে আরও কাছে টেনে নিল।

সেই মুহূর্তে কোনো প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন ছিল না, কোনো বড় বড় কথা প্রয়োজন ছিল না।

শুধু অনুভব করাই যথেষ্ট ছিল—তারা এখনও একে অপরের কাছে অচেনা হয়ে যায়নি।

চোখে চোখে জমে থাকা কথাগুলো ধীরে ধীরে নীরবতায় মিশে গেল।

তাদের ঠোঁটে ফুটে উঠল বহুদিনের গোপন ভালোবাসার এক কোমল স্বীকারোক্তি।

বাইরে শ্রাবণের বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে নামল।

মনে হলো, আকাশও বুঝি তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প জানে।


হঠাৎ তাওসিফের ঘুম ভেঙে গেল।

জানালার বাইরে সত্যিই বৃষ্টি হচ্ছে।

ঘরটা অন্ধকার।

ফোনটা পাশে পড়ে আছে।

সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল।

স্বপ্নটা এতটাই বাস্তব ছিল যে তার বুকের ভেতর এখনও তাসফিয়ার উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে।

সে ফোনটা হাতে নিল।

স্ক্রিনে তাসফিয়ার নাম।

কিছুক্ষণ দ্বিধা করে একটি মেসেজ লিখল—

“তুমি যে স্বপ্নের কথা বলেছিলে, আজ আমিও তোমাকে একটা স্বপ্নে দেখলাম।”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এল—

“কী দেখেছ?”

তাওসিফ জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর লিখল—

“বলব না। বললে তুমি খুব বেশি খুশি হয়ে যাবে।”

ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল—

“তাহলে আজ রাতটা আবার গল্প করেই কাটাই।”

তাওসিফের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

বাইরে তখনও শ্রাবণের বৃষ্টি।

আর গভীর নিশিরাতে, দুই প্রান্তের দুটি মানুষ আবার ফিরে গেল সেই পুরোনো কথার পৃথিবীতে—যেখানে রাত ফুরিয়ে যায়, কিন্তু গল্প ফুরোয় না।

হয়তো কিছু সম্পর্ক কখনো হারিয়ে যায় না।

শুধু কিছুদিন নীরব হয়ে থাকে।

একটা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা, একটা স্বপ্ন কিংবা একটি ছোট্ট মেসেজ—

“আজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম।”

আবার তাদের ফিরিয়ে দিতে পারে সেই অসমাপ্ত কাব্যের কাছে।

সেই কাব্যের নাম—

নিশিরাতের কাব্য।



নিশিরাতের কাব্য -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Thursday, July 2, 2026

অপেক্ষার নির্জনতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

পাখির বুকের ভেতর অনেক দিন ধরেই একটি অদ্ভুত ইচ্ছে বাসা বেঁধেছে। শহরের কোলাহল, মানুষের ভিড় আর হাজারো দায়িত্বের বাইরে—কোনো এক নির্জন পাহাড়, নদীর ধারে কিংবা জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় একটি রাত কাটাতে চায় সে। সেই রাতের আকাশে থাকবে অসংখ্য তারা, চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর পাশে থাকবে একজন মানুষ—যাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে খুব অপ্রত্যাশিতভাবে।

এই গল্পের শুরু মাত্র ছয় মাস আগে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান। চারদিকে রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, রঙিন শাড়িতে সেজে ওঠা শিক্ষার্থীরা। ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী পাখিও সেদিন শাড়ি পরে এসেছিল। ইতিহাসের ছাত্রী হলেও তার চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য, যা প্রথম দর্শনেই নজর কাড়ে বাংলা সাহিত্যের এক তরুণ শিক্ষকের।

লোকটি দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রেখেছে—সে বিয়ে করবে না। সাহিত্য, বই, গবেষণা আর শিক্ষার্থীদের নিয়েই কাটিয়ে দেবে জীবন।

কিন্তু মানুষের সব প্রতিজ্ঞা কি হৃদয়ের কাছে টেকে?

অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে তিনি পাখির সঙ্গে কথা বললেন।

—"রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, 'প্রেমের আনন্দ থাকে স্বল্পক্ষণ, কিন্তু বেদনা থাকে সারাটি জীবন।' বলো তো, ইতিহাসের ছাত্রী হয়ে প্রেমকে কীভাবে দেখো?"

পাখি একটু হেসে বলেছিল,

—"ইতিহাস শেখায়, মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বাইরের নয়, নিজের ভেতরের।"

সেদিনের সেই কয়েক মিনিটের কথোপকথন দুজনের মনেই অদ্ভুত এক রেখা এঁকে দিয়েছিল।

তারপর সময় চলে যায়।

ক্যাম্পাসে আর দেখা হয় না।

একদিন পাখিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে খুঁজে নেয়।

প্রথমে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা, তারপর বই নিয়ে আলোচনা, কবিতা, ইতিহাস, জীবনদর্শন, রাত জেগে দীর্ঘ কথোপকথন। ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে—তাদের ভাবনার জগৎ আশ্চর্য রকমের মিল।

তবু তাদের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

পাখি বিবাহিত।

আর মানুষটি নিজের প্রতিজ্ঞার কাছে আজও দায়বদ্ধ।

কেউ কারও সীমা অতিক্রম করে না।

তবু কিছু সম্পর্কের জন্ম হয়, যাদের কোনো সামাজিক পরিচয় থাকে না—থাকে শুধু অনুভব।

একদিন গভীর রাতে পাখি লিখল—

"জানো, আমার খুব ইচ্ছে কোনো এক নির্জন জায়গায় তোমার পাশে বসে একটি রাত কাটাই। কোনো দাবি থাকবে না, কোনো স্পর্শের প্রয়োজনও নেই। শুধু গল্প করব, আকাশ দেখব, আর মনে রাখব—জীবনে এমন একটি রাত ছিল।"

অনেকক্ষণ উত্তর এল না।

শেষ পর্যন্ত তিনি লিখলেন—

"ইচ্ছেটা সুন্দর। কিন্তু সুন্দর সব ইচ্ছে পূরণ করা যায় না।"

পাখি লিখল—

"তাহলে তুমি চাও না?"

তিনি দীর্ঘক্ষণ অনলাইনে থেকেও কিছু লিখলেন না।

অবশেষে শুধু একটি বাক্য ভেসে এল—

"চাই বলেই ভয় পাই।"

পাখির চোখ ভিজে উঠল।

সে বুঝল, মানুষটি তাকে অস্বীকার করেনি।

বরং সম্মান করেছে।

ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন রূপ হয়তো এটাই—যেখানে নিজের চাওয়ার চেয়ে প্রিয় মানুষের মর্যাদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তারপরও তাদের কথা হয়।

কবিতা নিয়ে, জীবন নিয়ে, ইতিহাস আর সাহিত্য নিয়ে।

মাঝেমধ্যে পাখি নির্জন পাহাড়ের ছবি পাঠায়।

লিখে—

"একদিন যদি..."

তিনি উত্তর দেন—

"কিছু স্বপ্ন বাস্তবে পূরণ না হলেও হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকুক। সব ভালোবাসার ঠিকানা একসঙ্গে থাকা নয়; কিছু ভালোবাসার ঠিকানা শুধু স্মৃতি।"

আজও তারা অপেক্ষা করে।

কেউ কারও জন্য নয়, বরং এমন এক সময়ের জন্য—যেখানে ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখতে হবে না, আবার ভালোবাসার নামে কাউকে আঘাতও করতে হবে না।

হয়তো সেই নির্জন রাত কোনো দিন আসবে না।

কিন্তু সেই রাতের স্বপ্ন—তাদের দুজনের হৃদয়ে নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকবে, নীরবে, দূরত্ব বজায় রেখেই।

কারণ সব প্রেমের পরিণতি মিলন নয়।

কিছু প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি হলো—সংযম, সম্মান, আর নীরব অপেক্ষা।



অপেক্ষার নির্জনতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Wednesday, June 17, 2026

অব্যক্ত গোধূলি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মফস্বলের চেনা সকালগুলো শহরের মতো যান্ত্রিক নয়। এখানে কুয়াশা আর রোদের খেলা শেষ হতে না হতেই বাজারের শোরগোল শুরু হয়, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা চলে নিজের খেয়ালে। সরকারি সোনালী ব্যাংকের ছোট শাখাটিতে যেদিন আবিদ প্রথম পা রাখল, সেদিন তার বুকের ভেতর একটা অচেনা একাকীত্ব জেঁকে বসেছিল। শহরের ব্যস্ততম কর্পোরেট শাখা থেকে বদলি হয়ে এই শান্ত, কিছুটা অলস মফস্বলে আসাটা তার ক্যারিয়ারের জন্য হয়তো নিয়মমাফিক, কিন্তু মনের জন্য ছিল একরকম নির্বাসন।

কিন্তু সেই নির্বাসনের প্রথম দিনটাই বদলে গেল একটা চেনা চাবির গোছার শব্দে আর হালকা সুবাসে।

ম্যানেজারের রুম থেকে বের হতেই আবিদের চোখ আটকে গেল জানালার পাশে বসা ক্যাশ ইনচার্জের চেয়ারটিতে। সেখানে বসে আছেন নবনীতা। প্রথম দেখাতেই যে কারো মনে হবে, মফস্বলের ধুলোবালি আর ফাইলের স্তূপের মাঝে তিনি যেন এক টুকরো স্নিগ্ধ পদ্ম। নবনীতার রূপ কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন নয়, বরং শরৎকালের ভোরের শিউলি ফুলের মতো—যাতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে এক অদ্ভুত আত্মমর্যাদা। তার গায়ের রঙ যেন কাঁচা হলুদের সাথে সামান্য দুধ মেশালে যা হয়, ঠিক তেমন। টানা দুটো চোখ, যাতে মায়া আর পেশাদারিত্বের এক অপূর্ব সহাবস্থান। চুলে সাধারণ একটা খোঁপা, পরনে হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচলটি নিখুঁতভাবে কাঁধে পিন করা।

আবিদ খেয়াল করল, নবনীতার টেবিলের সামনে গ্রাহকদের ভিড়। কেউ টাকা তুলতে এসেছে, কেউ পেনশনের খোঁজ নিতে। নবনীতা অত্যন্ত শান্ত মুখে, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে প্রত্যেকের কাজ করে দিচ্ছেন। তার কথা বলার ধরণ এত চমৎকার যে, মনে হয় যেন ব্যাংকের জটিল হিসেব-নিকেশ নয়, তিনি কোনো কবিতার আবৃত্তি করছেন।

শাখায় কর্মকর্তা বলতে মাত্র কয়েকজন। দু-একদিনের মধ্যেই আবিদ জানতে পারল, তারা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে আবিদ চাকরিতে জয়েন করেছে এক ব্যাচ পরে, তাই সহকর্মী হিসেবে সে নবনীতার এক বছরের জুনিয়র। কিন্তু সম্প্রতি আবিদের পদোন্নতি হওয়ায় এখন দুজনেই সমপদস্থ—সিনিয়র অফিসার। এই সমতাটুকু আবিদের বুকের ভেতর একটা অজানা স্বস্তি এনে দিল। সে মনে মনে ভাবল, অন্তত পদমর্যাদার দেয়ালটা তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করতে পারবে না।

দিন যায়। মফস্বলের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো সন্ধ্যার পর পরই টিমটিম করে জ্বলতে শুরু করে। ব্যাংকের ব্যস্ততা শেষ হলে সবাই যার যার নীড়ে ফেরে।

আবিদ আবিষ্কার করল, নবনীতা একাধারে একটি ঘড়ির কাঁটা এবং একটি জলছবি। সে যেমন পেশাদারিত্বে অনড়, তেমনি সংসারী। নবনীতা বিবাহিত, তার একটি চার বছরের কন্যাসন্তান রয়েছে। লাঞ্চের বিরতিতে যখন অন্য অফিসাররা চা-সিগারেটের আড্ডায় মত্ত হয়, নবনীতা তখন ফোনের ওপাশে থাকা গৃহপরিচারিকা বা তার স্বামীর সাথে রাতের রান্নার মেন্যু কিংবা বাচ্চার স্কুলের ডায়রি নিয়ে কথা বলে। তার পৃথিবীটা এক সুতোয় বাঁধা—স্বামী, সন্তান, সংসার আর চাকরি।

আর আবিদ? আবিদ এই শহরে একেবারেই একা। একটা ছোট ছাদযুক্ত বাসা ভাড়া নিয়েছে সে। অফিস শেষ হওয়ার পর যখন মফস্বলের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়, আবিদের ঘরের একাকীত্ব তখন যেন তাকে গিলতে আসে। তার সঙ্গী বলতে কেবল কিছু পুরোনো বই, ডায়েরির পাতা আর কলমের কালি। সে কবিতা লেখে। মনের ভেতর জমে থাকা একরাশ অব্যক্ত কথা সে কাগজের বুকে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে উপশম খোঁজার চেষ্টা করে।

অফিসে প্রতিদিন আবিদ নবনীতাকে দেখে। মন ভরে দেখে। কম্পিউটারের স্ক্রিনের আড়াল থেকে, ফাইলের পাতা ওল্টানোর বাহানায়, কিংবা চা পানের মুহূর্তে। নবনীতার হাসির শব্দটা আবিদের কানে এসে লাগে বসন্তের বাতাসের মতো। যখন নবনীতা কপালে জমে থাকা চূর্ণ অলকগুলো বাম হাতের আঙুল দিয়ে কানের পিঠে গুজে দেয়, আবিদের মনে হয় দুনিয়ার সমস্ত সৌন্দর্য এই একটা ভঙ্গিমার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু আবিদ মন খুলে কথা বলতে পারে না। সমাজ, সংস্কার আর সহকর্মীর মধ্যকার অলিখিত একটা সীমারেখা তাকে আটকে রাখে। নবনীতা যখন কাজের প্রয়োজনে আবিদের ডেস্কে এসে দাঁড়ায়, গম্ভীর গলায় বলে,

 "আবিদ ভাই, এই এলসি ফাইলটা একটু চেক করে দেবেন?"

তখন আবিদ শুধু মাথা নাড়ে। তার মুখের ভাষা যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে হারিয়ে যায়। সে শুধু বোঝে, নবনীতা তার খুব কাছে দাঁড়িয়েও কোটি আলোকবর্ষ দূরের এক নক্ষত্র।

অপেক্ষারও একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সেই অপেক্ষা যখন হৃদয়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে।

এক রাতে বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন আবিদের হৃদয়ের একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সে ফেসবুকে স্ক্রোল করতে করতে আচমকাই নবনীতার প্রোফাইলে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। নবনীতার একটি একক ছবি—নীল শাড়ি পরা, ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেই চেনা স্নিগ্ধ চোখ, ঠোঁটে লেগে থাকা সেই চিরচেনা মায়াবী হাসি।

আবিদের ভেতরের কবিসত্তা আর নিয়মে বাঁধা রইল না। সে ছবিটি ডাউনলোড করল। তারপর টেবিলের ল্যাম্পটি জ্বেলে খাতা কলম নিয়ে বসল। কলমের ডগা দিয়ে ঝরে পড়তে লাগল তার হৃদয়ের সমস্ত নির্যাস। সে লিখল:

 "তুমি যেন মফস্বলের এক চিলতে রোদ,
ফাইলের স্তূপে ঢাকা পড়া এক আলতো প্রমোদ।
 তোমার চোখের ওই শান্ত দিঘির জলে,
 আমার একাকীত্বের নাও ভাসি অবহেলে।
 তুমি অন্য কারোর আকাশ, অন্য কারোর ঘর,
 আমি দূর হতে দেখা এক যাযাবর।"

কবিতাটি শেষ করে আবিদের বুকটা হালকা হলো, আবার এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে আর ভাবল না। মধ্যরাতের সেই মোহগ্রস্ত মুহূর্তে কবিতাটি নবনীতার ইনবক্সে পাঠিয়ে দিল।

পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আবিদের পা কাঁপছিল। যদি নবনীতা রেগে যায়? যদি কথা বলা বন্ধ করে দেয়?

দুপুরের দিকে আবিদের ফোনে মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠল। বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে সে চ্যাটবক্স খুলল। নবনীতা লিখেছে:

 "বাহ্ আবিদ ভাই! আপনি এত সুন্দর কবিতা লেখেন তা তো জানতাম না। ছবিটার সাথে লাইনগুলো দারুণ মানিয়েছে। ধন্যবাদ আপনার এই সুন্দর উপহারের জন্য।"

আবিদের মুখে একটা মলিন হাসি ফুটে উঠল। প্রশংসা! হ্যাঁ, নবনীতা একজন গুণী পাঠকের মতোই কবিতাটির প্রশংসা করেছে। কিন্তু আবিদের মন তাতে ভরল না। কারণ নবনীতা কবিতাটির ভেতরের হাহাকারটুকু দেখল না, বা হয়তো দেখেও না দেখার ভান করল। সে শুধু শব্দের কারুকার্য দেখল, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জলন্ত প্রেমকে স্পর্শ করল না।

এই ঘটনার পর থেকে আবিদের মুগ্ধতা যেন এক তীব্র নেশায় পরিণত হলো। সে এখন শুধু নবনীতাকে দেখেই শান্ত থাকে না, সে নবনীতার সময়ের প্রত্যাশী হয়ে ওঠে। যদি কোনোদিন নবনীতা একটু আগে আসে, কিংবা কোনো ফাইলের জটিলতা নিয়ে আবিদের ডেস্কে এসে বসে একটু বাড়তি সময় কাটায়—আবিদের মনে হয় সেই দিনটাই তার জীবনের সেরা দিন।

আবিদের ডায়েরি এখন শুধু নবনীতার উপমায় ভরা। সে এক জায়গায় লিখল:

 "নবনীতা হলো সেই গোধূলি, যা ক্ষণিকের জন্য আকাশকে রাঙিয়ে দিয়ে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। আর আমি হলাম সেই অন্ধকার, যা প্রতিদিন আলোর প্রত্যাশায় মরেও আবার বেঁচে ওঠে।"

প্রেমের এই অনুভূতি যেমন সুন্দর, তেমনি এর বিরহ বড়ো ভয়ানক। যখন আবিদ দেখে অফিস শেষে নবনীতার স্বামী স্কুটি নিয়ে ব্যাংকের সামনে এসে দাঁড়ায়, নবনীতা মুখে একরাশ ক্লান্তি মুছে চওড়া হাসি নিয়ে স্বামীর পেছনে গিয়ে বসে, তখন আবিদের বুকের ভেতরটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এই বিরহ কোনো ঝড়ের মতো নয় যে সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে; এই বিরহ হলো উইপোকার মতো, যা ভেতর থেকে আস্তে আস্তে একজন মানুষকে খাবে।

আবিদ জানে তার এই চাওয়া কোনোদিন পূর্ণ হবার নয়। সমাজ একে স্বীকৃতি দেবে না, নবনীতার সাজানো সংসারে এর কোনো স্থান নেই। সে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো, যার ভাগ্যে পূর্ণতা নেই, কেবলই ক্ষয়। তবু আবিদের মন মানে না। সে কোনো অধিকার চায় না, সে নবনীতার সাজানো সংসার ভাঙতে চায় না। সে শুধু চায় তার মনের এই জমানো কথাগুলো, এই গভীর অব্যক্ত ভালোবাসা একবার নবনীতাকে মুখোমুখি বসে বলতে।


ব্যাংকের অডিট চলছে। প্রতিদিন রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে সবাইকে। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য অফিসাররা যে যার ডেস্কে ব্যস্ত।

আবিদ তার কেবিন থেকে কাঁচের দেয়ালের ওপাশে তাকাল। নবনীতা ভাউচার মেলাচ্ছে। টেবিলের ল্যাম্পের আলোটা তার মুখে এসে পড়েছে। ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো কিছুটা বুজে আসছে, কিন্তু ঠোঁটের সেই দৃঢ়তা এখনো কমেনি। কপালের টিপটা সামান্য সরে গেছে, যেন একটা চ্যুত নক্ষত্র।

আবিদ এক কাপ কফি নিয়ে নবনীতার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কফির কাপটা আলতো করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, "খুব ক্লান্ত লাগছে? একটু কফি খান।"

নবনীতা চমকে চোখ তুলল। তারপর এক গাল হেসে বলল, "ধন্যবাদ আবিদ ভাই। সত্যি খুব দরকার ছিল।"

আবিদ চেয়ার টেনে বসল। আজ তার বুকের ভেতর এক অন্যরকম সাহস কাজ করছে। সে নবনীতার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে মায়া আছে, কিন্তু সেখানে আবিদের জন্য কোনো ব্যাকুলতা নেই। সেখানে আছে কেবল একজন সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা আর সৌজন্য।

"নবনীতা," আবিদ প্রথমবার তার নামের সাথে 'আপা' বা 'দিদি' কিছুই যোগ করল না।

নবনীতা কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে থামল। কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।

আবিদ জানালার বাইরে তাকাল। মফস্বলের রাত এখন নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও একটা রাতজাগা পাখি ডাকছে। আবিদ মৃদু গলায় বলল, "কিছু কথা থাকে যা বুকের ভেতর জমতে জমতে পাথর হয়ে যায়। সেই পাথরটা বুকের ওপর চেপে বসে থাকলে নিঃশ্বাস নেওয়া যায় না।"

নবনীতা কফির কাপটা নামিয়ে রাখল। তার মুখটা গম্ভীর হলো, কিন্তু চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। সে বলল, "কিছু পাথরকে বুকেই বয়ে বেড়াতে হয় আবিদ ভাই। ওগুলো নামাতে গেলে পায়ের তলার মাটিটাই সরে যেতে পারে।"

আবিদ স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝল, নবনীতা অবুঝ নয়। একজন নারীর মন তার প্রতি তৈরি হওয়া অন্য পুরুষের ভালোলাগার সুবাস ঠিকই টের পায়। নবনীতা কবিতাটির মানে বুঝেছিল, প্রতিদিন আবিদের চেয়ে থাকার অর্থও সে জানে। কিন্তু সে তার সংসারের লক্ষ্মণরেখাটি খুব ভালো করেই চেনে।

আবিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, যা ল্যাম্পের আলোয় ধরা পড়ল না। সে হাসার চেষ্টা করে বলল, "আমি তো কিছু চাচ্ছি না নবনীতা। শুধু সময়ের অপেক্ষা করছি। এমন একটা সময়, যখন আপনি শুধুই একজন শ্রোতা হবেন, আর আমি আমার মনের সব জমানো কথা বলে হালকা হবো।"

নবনীতা উঠে দাঁড়াল। তার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "অডিট শেষ হতে আর দুদিন লাগবে। তারপর একটা রোববার দেখে লাঞ্চের পর আপনাকে আধা ঘণ্টা সময় দেবো। সেদিন অফিসের সহকর্মী হিসেবে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের বন্ধু হিসেবে আপনার সব কথা শুনবো। কেমন?"

নবনীতা চলে গেল। তার শাড়ির খশখশ শব্দ আর চাবির রিংয়ের আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল করিডোরে।

আবিদ একা বসে রইল সেই সুনসান ব্যাংকের আলো-আঁধারিতে। তার মনের অব্যক্ত ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সে আধা ঘণ্টার এক খণ্ড আকাশ পেয়েছে। সে জানে, এই আধা ঘণ্টাই তার সারাজীবনের বিরহ কাটানোর সম্বল হয়ে থাকবে। সে এখন সেই রবিবারের অপেক্ষায়, এক বুক প্রেম আর এক ফোঁটা চাতকের তৃষ্ণা নিয়ে।



Thursday, June 4, 2026

অদেখার আগুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ফেসবুকের নীল পর্দার ওপারে নীল রঙের বাতিটা জ্বলে উঠলেই দুটোর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দোলাচল শুরু হয়। শহরের কোলাহল থেমে যাওয়া নিঝুম রাতে, যখন ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই, চারদিকের নীরবতা ভেঙে মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ওঠে কিছু শব্দ। সেই শব্দগুলোই যেন দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের মাঝে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য মায়াবী সেতু।

একজন ‘নীলকণ্ঠ’, আর অন্যজন ‘মেঘা’। দুটোই ছদ্মনাম। গত ছয়টি মাস ধরে তাদের দিন শুরু হয় একে অপরের ‘শুভ সকাল’ দিয়ে, আর রাত শেষ হয় ইনবক্সের চ্যাটবক্সে সুখ-দুঃখের গল্প বুনে। সকালের প্রথম আলো থেকে রাতের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত—অফিসের ক্লান্তি, বৃষ্টির আনন্দ, প্রিয় বইয়ের আলোচনা কিংবা হঠাৎ মন খারাপের গল্প; সবকিছুই ভাগাভাগি হয় দুজনের মধ্যে।

তারা কেউ কাউকে দেখেনি, কেউ কারও কণ্ঠও শোনেনি। জানে না একে অপরের হাঁটার ভঙ্গি, হাসির ধরন কিংবা চোখের ভাষা। প্রোফাইল পিকচারে নীলকণ্ঠের দেওয়া আছে একটা গিটারের ছবি, আর মেঘার আইডিতে একরাশ কৃষ্ণচূড়া ফুল। যতটুকু পরিচয়, যতটুকু চেনা—সবটাই ওই চ্যাটের কিবোর্ডে টাইপ হওয়া শব্দের ফ্রেমে বন্দী। অথচ প্রতিদিনের ক্লান্তি আর একাকীত্বের মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি না করলে তাদের যেন দিনটাই কাটতে চায় না।

তারা বন্ধু নাকি তার চেয়েও বেশি, কিংবা কেউ কারও প্রেমে পড়েছে কি না—তা নিজেরাও নিশ্চিত নয়। কোনো দিন কয়েক ঘণ্টা মেঘার কোনো খবর না পেলে নীলকণ্ঠ অস্থির হয়ে উঠত। আবার যখন মেঘা ফিরে এসে বলত, "আজ খুব ব্যস্ত ছিলাম", তখন অদ্ভুত এক স্বস্তি নেমে আসত তার মনে। নীলকণ্ঠ রাতে ঘুমানোর আগে ভাবত, “আজ মেঘা মেসেজ দিতে একটু দেরি করল, মেয়েটা কি আমাকে মিস করছিল?”

ওদিকে মেঘাও জানালার বাইরে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ভাবত, “ছেলেটি কি একটু বেশি ভাবছে আমাকে? কথার ফাঁকে ফাঁকে ও যেভাবে আমার সামান্য মন খারাপের কথা বুঝে ফেলে, ও কি আমার ভাবনায় হারিয়ে গেছে?”

কিন্তু তারা কেউই এই গোলকধাঁধার উত্তর খুঁজতে সাহস পেত না। বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে এই ভার্চুয়াল মায়ার শেষ কোথায়, তা তাদের দুজনেরই অজানা। অদেখা সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এই অনিশ্চয়তাই।

সেদিন ছিল এক বর্ষণমুখর রাত। জানালার বাইরে ঝুম বৃষ্টি, আর ইনবক্সে জমে উঠেছে তাদের চিরচেনা কথার মেলা। কথা বলতে বলতে কখন যেন হালকা চালের আলাপটা বেশ গভীরে চলে গেল। কথার সেই গভীরতায় হঠাৎ যেন মেঘার মনে এক অদ্ভুত জড়তা ভর করল। সে একটু গম্ভীর হয়ে টাইপ করল:

 “শুনুন নীলকণ্ঠ, এই যে এক অদেখা আকর্ষণ... এর পেছনে নিজেকে পুড়িয়ে খাক করবেন না প্লিজ। আমি কাউকে এভাবে পোড়াতে চাই না।”

নীলকণ্ঠ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। বুকে এক মৃদু ধাক্কা লাগল। একটি বাক্য কখনও কখনও অনেক দীর্ঘ নীরবতার জন্ম দেয়। তার মনে পড়ল, কয়েকদিন আগেই মেঘা কথায় কথায় বলেছিল, সে নাকি আজকাল একজনকে খুব মিস করে। নীলকণ্ঠ এতদিন মনে মনে নিজেকেই সেই ‘একজন’ ভেবে বসে ছিল। মেঘার এই হঠাৎ দূরত্ব তৈরির চেষ্টা দেখে নীলকণ্ঠের মনে হলো, তবে কি সে ভুল ভাবছিল?

একটু বিষণ্ণ হেসে নীলকণ্ঠ উত্তর দিল:

“তার মানে, আপনি কিছুদিন আগে যাকে মিস করার কথা বলেছিলেন... সেই ব্যক্তিটি আমি নই, তাই তো?”

মেঘা ওপাশ থেকে ‘টাইপিং...’ দেখাচ্ছিল, কিন্তু কোনো মেসেজ পাঠাল না। স্ক্রিনের ওপারে নীরবতা জমতে লাগল। নীলকণ্ঠ আবার লিখল:

“আচ্ছা, আপনি আমাকে পোড়াতে চান না বুঝলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে... আপনি নিজে কি পুড়তে চান?”

এবারও কোনো উত্তর এল না। শুধু দেখা গেল, মেঘা অনলাইনে আছে আর মেসেজটা ‘Seen’ হয়ে পড়ে আছে। সে যেন নীলকণ্ঠকে এক অদ্ভুত উত্তরের অপেক্ষায় ঝুলিয়ে রেখে দিল। ওপারে বসে মেঘা হয়তো নিজের মনের সাথেই যুদ্ধ করছিল; হয়তো উত্তর খুঁজছিল, কিংবা নিজের কাছেই কিছু স্বীকার করতে পারছিল না।

সেই ভারী নীরবতাকে ভাঙল নীলকণ্ঠই। চ্যাটবক্সে শেষবারের মতো আঙুল চালিয়ে কবিসুলভ একটা বাক্য লিখে পাঠাল সে:

  “পাখিদের জানতে হয় উড়তে, আর কবিদের জানতে হয় পুড়তে।”

মেসেজটা পড়েই ওপারে মেঘার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান কিন্তু গভীর হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত টাইপ করল:

“উফ! একদম আটকে দিলেন তো। কথার জালে এভাবে আটকে দেওয়াটা অন্যায়।”

শুধু ওই দুটি শব্দ—‘আটকিয়ে দিলেন’। কিন্তু তার ভেতর কত অনুভূতি লুকিয়ে ছিল, তা কেউ জানেনা। মেঘা হয়তো সত্যিই আটকে গিয়েছিল। কথার জালে, অনুভূতির কাছে, নাকি এমন এক সত্যের সামনে—যা উচ্চারণ করলে সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে যেতে পারত?

নীলকণ্ঠ আর কথা বাড়াল না। মেঘার এই ‘আটকে যাওয়া’র মাঝেই সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পেল। রহস্যটা রহস্যই থাক, মায়াটা আরও একটু গাঢ় হোক। সে বিদায়ের একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাল:

“আজকের মতো তবে আসি। শুভরাত্রি, ভালো থাকবেন।”

ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে নীলকণ্ঠ যখন অন্ধকারের দিকে তাকাল, তখন তার ঠোঁটে একটা স্মিত হাসি। ওদিকে মেঘা ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সে ভাবল, কিছু মানুষকে না দেখেও বোধহয় এতটা গভীরভাবে চেনা যায়।

রাত আরও গভীর হলো, কিন্তু দুই মানুষের ভেতরে জন্ম নেওয়া প্রশ্নগুলো ঘুমাল না। আসলে কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয়না, কিছু অনুভূতির কোনো স্বীকৃতি লাগে না। কিছু মানুষ জীবনে আসে, খুব কাছে চলে আসে, অথচ দূরত্বের সব নিয়ম অক্ষুণ্ণ থাকে।

তারা শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়েছিল কি না, তা আজও জানা যায়নি। কিন্তু সেই রাতের পর দুজনেই বুঝেছিল—অদেখা মানুষও কখনও কখনও হৃদয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান সত্য হয়ে উঠতে পারে। আর কিছু আগুন আছে, যা জ্বলে ওঠে কোনো স্পর্শ ছাড়াই; শুধু কিছু শব্দ, কিছু অপেক্ষা আর কিছু অসমাপ্ত উত্তরের ভেতর।

এক টুকরো অদেখা আকর্ষণ আর উত্তরের অপেক্ষায় থাকা একটা প্রশ্ন নিয়ে তাদের গল্পটা আসলে চলতেই থাকল... পর্দার ওপারে, মনের গভীরে।





অদেখার আগুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Wednesday, May 6, 2026

মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মহাসড়কের ধুলোভেজা বিকেল। দূরে সারি সারি বাস—যেন স্থির নদীর ওপর থমকে থাকা নৌকা। হেডলাইটগুলো জ্বলছে, নিভছে, আবার জ্বলছে—ঠিক যেন অপেক্ষার চোখ।

তাসফিয়া জানালার পাশে বসে মোবাইল তুলে একটা ছবি তোলে। ছবির ক্যাপশনে লিখে—
“কখন যে ঢাকায় পৌঁছাতে পারবো, জানিনা...”

স্টোরি আপলোড হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই আসে—
—“আপনি কোন বাসে আছেন?”

তাসফিয়া একটু থামে। নামটা দেখে চিনতে পারে—তাওসিফ। বহুদিনের ফেসবুক ফ্রেন্ড, অথচ একটাও কথা হয়নি কখনো।
সে ছোট করে উত্তর দেয়—
—“গ্রীণ লাইন।”

ওপাশ থেকে আবার—
—“আপনি কি জ্যামে?”

—“হ্যাঁ। আপনি?”

একটু দেরি করে রিপ্লাই আসে—
—“হুম… তবে ঢাকায় যাচ্ছি না। মাঝপথে নেমে যাবো।”

এই ছোট্ট কথোপকথন—যেন একটা দরজা। অদৃশ্য, অথচ খোলা।

তারপর দিন যায়। কথাও বাড়ে।

প্রথমে খোঁজখবর, তারপর গল্প, তারপর নীরবতাও যেন কথা হয়ে ওঠে।

তাওসিফ শব্দের মানুষ। ব্যাংকের ফাইলের ভেতরে তার দিন আটকে থাকলেও, রাত হলেই সে শব্দে আশ্রয় নেয়। কবিতা লেখে। আবৃত্তি করে। তার শব্দে নদী থাকে, কুয়াশা থাকে, আর অদ্ভুত এক শূন্যতা থাকে—যেটা তাসফিয়ার খুব পরিচিত লাগে।

তাসফিয়া মানুষ গড়ার কাজ করে—শিক্ষক। ক্লাসরুমে তার কণ্ঠ দৃঢ়, কিন্তু নিজের জীবনে সে যেন একটু ভেসে থাকা মানুষ। শাড়ি তার ভালোবাসা—প্রতিটি শাড়ি যেন একেকটা ঋতু। নতুন শাড়ি পরে নতুন জায়গায় গেলে সে ছবি তোলে—আর সেই ছবির নিচে তাওসিফ লিখে ফেলে কবিতা।

“তোমার শাড়ির আঁচলে আজকে বিকেলের রোদ আটকে গেছে—
আমি দূর থেকে শুধু আলোর গন্ধ পাই…”

এমন লাইন পড়ে তাসফিয়া চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় না, কিন্তু পড়ার পর তার ভেতরে কিছু নরম হয়ে যায়।

একদিন তাওসিফ একটা কবিতা লিখলো—

“দেখা হোক কোনো এক অনির্ধারিত দুপুরে—
যেখানে সময় থেমে থাকবে চায়ের কাপের ধোঁয়ায়,
আর আমরা দু’জন—
অচেনা হয়েও পরিচিত হয়ে উঠবো…”

কবিতাটা পড়ার পর তাসফিয়া অনেকক্ষণ কিছু লেখে না। শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত ইচ্ছে জন্ম নেয়—
দেখা করার।

কিন্তু কেউ কাউকে বলে না।

হঠাৎ একদিন—
একটা শপিংমলের ভিড়ে—
দু’জনের চোখে চোখ পড়ে।

যেন গল্পের ভেতর থেকে বাস্তব হঠাৎ বের হয়ে এসেছে।

—“তাসফিয়া?”
—“তাওসিফ?”

দু’জনেই একটু হেসে ফেলে।
সময় তখন খুব কম। কথা হয় অল্প—
তবুও সেই অল্প কথার মধ্যে অদ্ভুত এক স্বাচ্ছন্দ্য।

বিদায়ের আগে তাওসিফ বলে—
“একদিন কফি খাওয়া যেতে পারে…”

তাসফিয়া মাথা নাড়ে—
“হতে পারে।”

তারপর আবার তারা ফিরে যায় নিজেদের জীবনে।
কিন্তু এবার কথাগুলো বদলে যায়।

মাঝে মাঝে কথা হয়—
কিন্তু না বললেও অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।

এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।
বন্ধুত্ব?
ভালোবাসা?
নাকি শুধু অভ্যাস?

তারা কেউই জানে না।

তবুও—
রাতের শেষে দু’জনেই অপেক্ষা করে—
একটা “অনলাইন” দেখার জন্য।


একদিন হঠাৎ তাসফিয়া জানতে পারে—
তাওসিফ যেই “মাঝপথে নেমে যাবো” বলেছিল—
সেটা শুধু বাসের কথা ছিল না।

তাওসিফ আসলে একটা সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসছিল।
একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত, ভাঙা সম্পর্ক।

আর তাসফিয়া?
সে বুঝতে পারে—
সে হয়তো তাওসিফের “শেষ গন্তব্য” না—
বরং সেই “মাঝপথ”—
যেখানে মানুষ একটু থামে, শ্বাস নেয়, আবার এগিয়ে যায়।


তাসফিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। নতুন একটা শাড়ি পরে আছে।
মোবাইলে একটা মেসেজ টাইপ করে—

“আজ কফি খাওয়া যাবে?”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই আসে—

“আজ না…
আমি একটু দূরে যাচ্ছি।”

তাসফিয়া ফোনটা নামিয়ে রাখে।
হাসে। খুব হালকা একটা হাসি।

কারণ সে জানে—
সব গল্পের শেষ একসাথে হওয়া না।
কিছু গল্প শুধু সুন্দরভাবে অসম্পূর্ণ থাকার জন্যই জন্ম নেয়।

আর দূরে কোথাও—
মহাসড়কে আবার বাসের লাইন দাঁড়িয়ে থাকে—
যেন সময় এখনও কোথাও আটকে আছে…

 

 মাঝপথের মানুষ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন