নিঝুম রাতের নীরবতা চিরে বারবার দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটাই ভেসে আসছে। তোহা ঘড়ির দিকে তাকাল—রাত তিনটে বাজে। বালিশে এপাশ-ওপাশ করে রাত পার করাটা ইদানিং তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। আর এই রাতজাগা অঘুমের একমাত্র নেপথ্য কারিগর—তুলি।
তুলির চোখের দিকে তাকানো আর আগুনে হাত দেওয়া একই কথা—এ সত্যটা তোহা ভালো করেই জানে। কিন্তু সেই চোখের মোহ এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার কখনোই ছিল না। সেদিন ক্যাম্পাসের করিডোরে যখন তুলি এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল, তখন তার ওই তীক্ষ্ণ, বিদ্ধ করা চাহনি তোহার বুকের ভেতরে কালবৈশাখী ঝড় তুলে দিয়েছিল। ও চোখে চোখ রাখা মানেই যে সর্বনাশের হাতছানি, তা জেনেও তোহা প্রতিবার সেই বিষাক্ত মায়ায় ডুবে যায়। নিজের বুকের ভেতরের অনিয়ন্ত্রিত, বেপরোয়া হৃদস্পন্দন আর ব্যাকুল অস্থিরতাকেই সে ভালোবেসে ফেলেছে।
টেবিলের ওপর হালকা আলোয় তুলির ডায়েরির ফাঁকে লুকিয়ে রাখা স্কেচ খাতাটা খুলে বসল তোহা। খাতার পাতায় তুলির সেই অপার্থিব মায়াবী চোখ জোড়া আঁকা। রাত যতই গভীর হয়, ওই চাহনির মায়াজাল যেন ঘর জুড়ে আরও বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।
দিন পেরিয়ে শহরের বুকে তখন শরতের স্নিগ্ধ আগমন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শিউলি ফোটার দিনগুলোতে তোহা আর তুলির সম্পর্কের সমীকরণটা যেন এক অব্যাখ্যনীয় মায়ায় জড়িয়ে থাকে। ওরা দুজন দূরের নক্ষত্রের মতো—কাছাকাছি আসার অনুমতি নেই, অথচ অদৃশ্য এক টান দুজনকে বেঁধে রাখে একই সুতোয়।
এক নির্জন শরতের বিকেলে ক্লাসের কোলাহল শেষে তোহা আর তুলি পাশাপাশি হাঁটছিল। চারপাশে শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস ছড়ানো, আর মাথার ওপর শরতের আকাশ জুড়ে জমাট বেঁধেছে শুভ্র ও কালো মেঘের আলপনা। দিন ফুরিয়ে আসার গোধূলির নরম আলো এসে পড়েছে তুলির চোখে।
তোহা থমকে দাঁড়াল। নীল আকাশের নির্জন বুকের নিচে, নীরবতার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তোহা তুলির চোখে রেখে দিল তার সমস্ত না-বলা কথা। মুখে ফুটে কিছু বলা হলো না, কিন্তু চোখের ভাষাতেই যেন জমা হলো জমে থাকা সব আবেগ।
তোহা গভীরভাবে অনুভব করল—জীবন তো শেষ পর্যন্ত কিছু অমূল্য স্মৃতি আর দীর্ঘ অপেক্ষার সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। শরতের মেঘের মতো তাদের ভালোবাসার গল্পেও হয়তো কখনো আলোর শুভ্রতা আসবে, কখনো নামবে না-পাওয়ার কালো ছায়া; তবুও তারা একই আকাশের নিচে বেঁচে থাকবে। এই ঘুমহীন রাত, স্কেচ খাতার মায়াবী চোখ আর শিউলিঝরা বিকেলে গোধূলির নীরবতাই তোহা আর তুলির অপ্রকাশিত ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।

No comments:
Post a Comment