Sunday, November 20, 2022

কল্পিত নবান্নে -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আজ নবান্নের দিন। তোমার হাতের সুস্বাদু খাবারে মনটা এক নিমেষেই ভরে গেল। খেতে খেতে মনে হচ্ছিল, কতদিন হলো এমন তৃপ্তি করে পেটপুরে খাই না! আসলেই তো, ইট-পাথরের এই যান্ত্রিক শহরে আমার একাকী বসবাস। বুয়ার হাতের একঘেয়ে রান্না আর মাঝেমধ্যে নিজের অনিচ্ছুক হাতের পাক—এই দুইয়ে মিলে দিন-মাস কেটে যায় ঠিকই, কিন্তু তোমার হাতের সেই চিরচেনা জাদুকরী স্বাদ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে নবান্ন এখন কেবল বইয়ের পাতার উৎসব। শহরের এই ব্যস্ততায় নবান্ন কখন আসে আর কখন যায়, তার হিসেব রাখা দায়।

লোকারণ্য এই শহরের ভিড়ে কেবল তুমিই আমার একমাত্র আপনজন। আমার প্রতিদিনকার খোঁজ নেওয়ার মানুষ। প্রতিদিন ভোরে তোমার ফোনেই আমার ঘুম ভাঙে। আমি কী খেলাম, কোথায় গেলাম, মন ভালো আছে কি না, কিংবা পড়াশোনার কতটুকু অগ্রগতি হলো—সবই যেন তোমার নখদর্পণে। মাঝে মাঝে মনে হয়, দূরত্বের সীমানা পেরিয়ে তুমি সারাক্ষণ আমার ছায়ার মতোই পাশে থাকো।

আজ তুমি নিজ হাতে রান্না করেছ। অথচ আমি জানি, সচরাচর তোমার রান্নাঘরে যাওয়া হয় না। আজ বাড়িতে তুমি একা, পুরো বাসায় যেন তোমার একচ্ছত্র সম্রাজ্য। রান্না করতে করতে ফোনে আমায় বললে, "দুপুরে চলে এসো কিন্তু! আজ নিজ হাতে খাইয়ে দেবো আর সারা বিকেল দুজনে মিলে ঘুরে বেড়াবো।" এমন মধুর আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য কার? তোমার সান্নিধ্য পাওয়ার আনন্দে হৃদয়ে যেন অকাল বসন্তের হাওয়া বয়ে গেল। টেবিলে বাহারি সব পদের আয়োজন দেখে সারা বছরের ভালো-মন্দ না খাওয়ার আক্ষেপ নিমিষেই ধুয়ে মুছে গেল।

বিকেলের সোনাঝরা রোদে তুমি যখন নীল শাড়ি পরে আমার সামনে দাঁড়ালে, মনে হলো আকাশটাই যেন মর্ত্যে নেমে এসেছে। তুমি বললে, "চলো, কোনো সবুজের প্রান্ত থেকে ঘুরে আসি।" তোমার হাতে হাত রেখে যখন রিকশায় উঠলাম, তখন মনের কোণে একটি সুরই বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল— ‘তোমার ইচ্ছেগুলো ইচ্ছে হলে আমায় দিতে পারো, আমার ভালো লাগা ভালোবাসা তোমায় দেবো আরো।’

নীল শাড়ি আর কপালে নীল টিপে তোমাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছিল। খোলা চুলে তুমি যখন বাতাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তোমার ডাগর চোখে আমার দিকে তাকালে, তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে উঠল। মনে হলো, এই মানুষটার জন্যই হাজার বছর বেঁচে থাকা যায়। তোমাকে আমৃত্যু ভালোবেসে নিজের করে আগলে রাখতে হবে। মনে মনে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করলাম, মরণের ওপারেও যেন তোমার দেখা পাই।

ঠিক সেই মুহূর্তেই তোমার এক ধাক্কায় আমার ঘোর কাটল। চোখ মেলে তাকালাম। কিন্তু কই? পাশে তো তুমি নেই! ধুলোমাখা রিকশা নেই, নেই নীল শাড়ির সেই মায়াবী নারী। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, আমি একাকী বসে আছি কংক্রিটের নিস্প্রাণ এক অন্ধকার রুমে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে। বাইরে নবান্নের উৎসব নেই, আছে কেবল যান্ত্রিক শহরের হাহাকার।

আসলে পুরোটাই ছিল আমার এক চিলতে কল্পনা। এক টুকরো মরীচিকা, যা আমাকে ক্ষণিকের জন্য সুখী করেছিল, আর পরক্ষণেই ফেলে দিল এক গভীর শূন্যতায়।

 
 
 কল্পিত নবান্নে -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
 

No comments:

Post a Comment