অফিসিয়াল সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমার জন্ম ১৯৯০ সালের ১লা জানুয়ারি। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে পৃথিবীর আলো দেখার একটা অন্যরকম আনন্দ আছে কাগজে-কলমে, তবে আমার জন্মের আসল সময়টা লুকিয়ে আছে মায়ের স্মৃতির ধূসর পাতায়। মায়ের ভাষ্য মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর বছর (১৯৮১ সাল) আমার বড় ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল। তার দীর্ঘ আট বছর পর এই পৃথিবীতে আমার আগমন। মাঝে মেজ ভাইয়ের জন্ম। সেই হিসেবে আমার জন্মের প্রকৃত সালটি সম্ভবত ১৯৮৯ সালের শেষের দিককার কোনো এক সময়। তবে দিনক্ষণ বা সালের এই দোলাচল ছাপিয়ে আমার অস্তিত্বের আসল সত্যটি জড়িয়ে আছে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার রামনগর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সাথে।
আজকের আধুনিক যুগের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আর চাকচিক্যের সাথে সেদিনের রামনগর গ্রামের কোনো মিল ছিল না। আমাদের শৈশবে সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, ছিল না কোনো পাকা রাস্তা। পিচঢালা পথের চাদরহীন সেই মেঠো পথেই কেটেছে আমার শুরুর দিনগুলো। সূর্যাস্তের পর যখন চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যেত, তখন আমাদের রাত্রিবেলা পার হতো কুপি কিংবা হারিকেনের টিমটিমে আলোয়। সেই মৃদু আলোর নিচে বসেই চলত আমাদের পড়ালেখা। আর গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন শরীর জুড়িয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতো, তখন যান্ত্রিক এসি বা বৈদ্যুতিক পাখা ছিল কল্পনার অতীত; তালপাতার পাখা আর প্রকৃতির অকৃপণ বাতাসই ছিল একটুখানি স্বস্তি ও ঠাণ্ডা পাওয়ার একমাত্র ভরসা।
আমাদের বংশের ইতিহাস নিয়ে গ্রামের লোকমুখে একটি প্রচলিত কথা আছে। আমার দাদার বাবা, সোনামদ্দি সাহেবের নাকি এককালে অঢেল জমিজমা ছিল। কিন্তু সময়ের আবর্তে আমার বাবা কিংবা চাচারা সেই বৈভব ধরে রাখতে পারেননি। এর পেছনে অবশ্য এক বেদনাদায়ক ইতিহাস আছে। আমার দাদা জয়েনউদ্দিন সাহেব ছিলেন ভীষণ সহজ-সরল ও নিরহংকার একজন মানুষ। তার ওপর, বাবার বয়স যখন মাত্র বছর দশেক, ঠিক তখনই দাদা মারা যান। এত কম বয়সে পিতৃহীন হওয়ায় সংসারের গুরুভার এসে পড়ে বাবার কাঁধে। আর সেই নাবালক বয়সে সংসার চালাতে গিয়েই ধীরে ধীরে আমাদের পারিবারিক সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যায়।
সংসার ও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে বাবা প্রথমে গ্রামেই কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে যখন কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না, তখন এক বুক আশা নিয়ে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। সেখানে শুরুতে তীব্র সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে, কাজ করেছেন রাজমিস্ত্রী হিসেবে। তবে বাবার সততা আর কঠোর পরিশ্রমের ফল তিনি পেয়েছিলেন। একসময় একটি স্বনামধন্য কনস্ট্রাকশন ফার্মে তাঁর স্থায়ী চাকরি হয় এবং দীর্ঘকাল নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে ২০১৫ সালে তিনি সেখান থেকে অবসরে যান।
বাবা জীবিকার তাগিদে ঢাকাতে থাকলেও, রামনগরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে আমাদের চার ভাই-বোনের (আমরা তিন ভাই ও এক বোন) পড়াশোনা এবং পুরো সংসার মা এক শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন। বাবা ঢাকা থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে টাকা পাঠাতেন, মা তাঁর অসাধারণ দূরদর্শিতা দিয়ে তার সর্বোত্তম ব্যবহার করতেন। মা ও বাবা কেবল নিজেদের নাম ও ঠিকানা লিখতে পারার মতো যৎসামান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু শিক্ষার আলো যে কতটা প্রখর হতে পারে, তা তাঁরা মজ্জায় মজ্জায় উপলব্ধি করেছিলেন। মা আমাদের সবসময় কঠোর নিয়মের মধ্যে রাখতেন এবং পড়াশোনাকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গড়ে তোলার প্রেরণা দিতেন। মায়ের তীক্ষ্ণ মেধা আর দূরদর্শিতাই আজ আমাদের এই সুন্দর চলার পথ তৈরি করে দিয়েছে। মা কেবল জন্মদাত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের পরম বন্ধু, অভিভাবক আর জীবনের শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক। আর অন্যদিকে, দূর প্রবাসে বা ঢাকা শহরে একা থাকা বাবা ছিলেন আমাদের কাছে সততা ও নিষ্ঠার এক জীবন্ত ও বড় উদাহরণ।
আমাদের বংশের আদিপুরুষ সেই সোনামদ্দি সাহেব থেকে শুরু করে আজ অব্দি এই বংশে অনেক বিস্তার ঘটেছে। আমার দাদারা ছিলেন দুই ভাই। সেখান থেকে আমার চাচারা হলেন চারজন। আর বর্তমান সময়ে এসে সোনামদ্দির বংশধরের তালিকায় আটজন পুরুষ সদস্য রয়েছেন। মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী এবং বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ ও দোয়ায়, আজ সেই আটজনের মধ্যে আমার অবস্থান আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো। আলহামদুলিল্লাহ। শৈশবের সেই হারিকেনের আলো আর তালপাতার পাখার বাতাস পেরিয়ে আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, তার প্রতিচ্ছবিই হলো আমার এই যাপিত জীবন।

No comments:
Post a Comment