Tuesday, December 13, 2022

কল্প ছবি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


এলো চুল খোঁপায় ফুল
অপলক তোমার দৃষ্টি
কপালে টিপ নাকে নথ
ঠোঁটে তোমার হাসি মিষ্টি।।

কালো শাড়ি হলুদ পাড়
আঙুলের ভাঁজ যেন কারুকাজ।।

তোমার ঐ চোখ ডাকে কারে
মুখের হাসি কি কথা যেন বলে
আমি বুঝিনা পড়িতে পারিনা
শুধু ভেবে মরি কি আমার হলে।।

তোমার স্পর্শে সবুজেরা কথা বলে
আমি ব্যাকুল হয়ে চেয়ে থাকি তোমার পানে।।

তুমি কি ছবি নাকি বনলতা
ছন্দ দিব তুমি যদি হও মোর কবিতা।।

কল্প ছবি 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

২০.০৬.২০১৯

Saturday, December 3, 2022

মাধবীলতা-০১ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

    মাধবীলতা
সময় বড়ই বেরসিক
কোন কিছুই বুঝতে চায় না সে
না বুঝে ভালোবাসা না বুঝে মনের কথা
না বুঝে কারো দুঃখ-ব্যাথা কিংবা মনের জ্বালা।

    মাধবীলতা
সময়ের নেই কোন রোমান্টিকতা
নেই কোন দয়া-মায়া, আনন্দ-বেদনা
না জানে ভালোবাসতে না জানে কাছে রাখতে
না পারে দুঃখ-বেদনা মুছতে না পারে হাসিতে রাখতে।

    মাধবীলতা
সময়ের নেই কোন চিন্তা-চেতনা
নেই কোন আনন্দ-বেদনা হাসি-কান্না
নেই কোন দুঃখ-ব্যাথা কিংবা অশ্রু-কান্না
সময় বুঝে শুধু অবাধ গতিতে তার নিজের ছুটে চলা।

    মাধবীলতা
এটাই কি সময়ের খেলা
এটাই কি নিয়মের বাধনে বাধা
এই মেনেই কি আমাদের জীবনের চলা।

    মাধবীলতা
সময় কেন বুঝে না ভালোবাসা
কেন দিতে চায় না কাছে থাকার অাশা
কেন দেয় না সুখে থাকার অনন্ত প্রত্যাশা।

    মাধবীলতা

আমি উত্তর খুঁজে পাই না
কোন কিছুই খুঁজে পাই না তার কাছে।

    মাধবীলতা
তবু কৃতজ্ঞতা তার কাছে
যেটুকু দিয়ে সে আমাকে অল্পতে।

    মাধবীলতা
এ ক'টা দিন এভাবেই যাক না।

    মাধবীলতা
এভাবেই হোক ক'দিন  আমাদের ভালো থাকা।

সময় বেশি দিন মোদের সাথে এভাবে করো না।

 

 মাধবীলতা-০১  

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মাধবীলতা-০২ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


আজ রাতেও আর ঘুম হলো না
কি যে করি, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না
আমার রাতগুলো যে কেন এমন হয়
কেন যে স্বপ্নগুলো বারবার উকিঁ ঝুঁকি দেয়
মনতো সে কথা বুঝতে পারে না।
মাধবীলতা, তুমি একবার বলোনো
বলো একবার সত্যি করে আমার কানে কানে
ভালোবাস কি তুমি আমায় আগের মতো করে?
তোমার ভালোবাসার জন্য আমার এই বেঁচে থাকা
তোমায় কাছে রাখার জন্য আমার এই সাধনা।
মাধবীলতা, তোমায় ভেবে আমার এই রাত জাগা
তোমায় দেখে দেখে আমার এই সকাল হওয়া
তোমায় দূরে রেখে, পারিনা আমি ঘুমাতে
তাইতো রাত শেষে ভোরের আলোয় খুঁজি তোমাকে
তুমি থেকো না দূরে দূরে, ভালোবেসে এই আমাকে।
মাধবীলতা, ঘুম যে আমার হলো না।

 মাধবীলতা-০২  

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মাধবীলতা-০৩ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

মাধবীলতা
অনেক বেশি মনে পড়ে তোমার কথা
এই রাত, এই চাঁদ আর অপূর্ব আলোকসজ্জা
সকালের হালকা কুয়াশা, বিকালের স্নিগ্ধতা
সারা দিনের আলো ছায়ার লুকোচুরি খেলা
কিছুই আমার ভালো লাগেনা তোমাকে ছাড়া।

    মাধবীলতা
তোমার সাথে ফাঁকে ফাঁকেই হয় কথা
তা নিয়ে এখানে চলে কতো যে রটনা
সে কথা তুমিতো আর জানতে পারো না
সে যাই হোক তা নিয়ে একটুও ভাবিনা
তুমি যে আমার শুধুই আমার মাধবীলতা।

    মাধবীলতা
তোমাকে ছাড়া একা একা এই ঘোরাফেরা
তাতে যে আমার সময় ভালো কাটে না
কি দেখবো প্রকৃতির সৌন্দর্যের খেলা
আর কি-বা দেখবো নিয়ন লাইটের মেলা
তুমি ছাড়া এসব কিছুই যে হেলা-ফেলা।

    মাধবীলতা
বেহুলার বাসর ঘর দেখতে যাবার কথা
সাথে শুনতে যেতে হবে চরের জীবন গাঁথা
যেখানে আছে আনন্দ আর বেদনারা মাখা
যে কথা হাজার বছর ধরে মুখে মুখে শোনা
ভালো কি লাগে এসব দেখা তোমাকে ছাড়া।

    মাধবীলতা
তুমি ছাড়া আমি যে একা একা
ইচ্ছে করে তোমায় নিয়ে এসব দেখা
তাইতো দূরত্ব ভুলে মনে মনে তোমায় রাখা
আর আমার এই শান্ত নিবির পথ চলা
ওগো আমার মনের মাধবীলতা।

 মাধবীলতা-০৩ 

মাধবীলতা-০৪ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

  মাধবীলতা
বলেছিলাম তোমায় নিয়ে
আজ রাতে চাঁদ দেখবো।
কিন্তু তুমি আসলে না
দেখলে না আজকে চাঁদটা।


    মাধবীলতা
তুমি কি জানোনা
আজ ফাগুনের পূর্ণিমা রাত।
যৌবন দীপ্ত ভরা পূর্ণিমা আজ।
এমন রাত কি বারবার ফিরে আসে?
জানি আমার কাছে  তুমিই চাঁদ,
তুমিই ভরা পূর্ণিমার রাত আমার কাছে।
তবুও না বলে পারিনা,
তাই তোমাকে বলেছিলাম,
আজ রাতে তোমাকে নিয়ে চাঁদ দেখবো,
সারা রাত ছাদে বসে গল্প বলে কাটিয়ে দেব।
কিন্তু তুমি?
তুমি আমার ডাকে সাড়া দিলে না।
তুমি আমার সাথে আসলে না।


    মাধবীলতা
এমন ফাগুনের ভরা পূর্ণিমা,
আর অবাক করা চাঁদের আলো,
তুমি ছাড়া বৃথাই গেলো।


মাধবীলতা
চাঁদ ডুবে যায়, পৃথিবী ঘুমায়,
তুমিও ঘুমের দেশে নিবির শান্তিতে।
আর আমি?
আমি জেগে আছি, না শুধু জেগেই নেই,
একা একা চাঁদ আর চাঁদের আলোয় বসে আছি।
বসে আছি তোমার আসার অপেক্ষায়।
তুমি আসবে, আমার পাশে বসবে,
দু'জনে চাঁদের আলোয় অবগাহন করবো,
এই আশায় বসে আছি, বসে থাকবো,
চাঁদ ডুবে যাবে, পৃথিবী ঘুমাবে,
তবু আমি জেগে থাকবো,
জেগে থাকবো শুধু তোমার আশার অপেক্ষায়।


    মাধবীলতা
শুধু তোমার প্রতিক্ষায়।

 মাধবীলতা-০৪ 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মাধবীলতা-০৫ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

মাধবীলতা
লাগছে খুব একা একা
চারিদিকে এতো লোক
তবু আমারর পাশ ফাঁকা
বিরাজমান শুধু তোমার শূণ্যতা

মাধবীলতা
তুমি ছাড়া সব কিছুই বৃথা
মাঝনদীতে মৃদু বাতাস
মেঘাচ্ছন্ন আকাশে চাঁদ
কোথাও তারার দেখা
তুমি ছাড়া এগুলো ভালো লাগেনা

মাধবীলতা
এমন রাত তুমিহীনা
ঘুম যে আমার আসেনা
তুমি পাশে নেই মন যে মানেনা
কেন যে তোমায় পাশে পাই না
মন যে সেই কথা বুঝেনা

মাধবীলতা
তুমি ছাড়া এই রাত বৃথা
তুমি ছাড়া এই চাঁদ এই পথ
লাগে আমার শুধু একা একা
ওগো মাধবীলতা।


 মাধবীলতা-০৫ 
-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

১০/০৯/২০১৭

Tuesday, November 22, 2022

মন ভালো নেই -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

তুমি কাছে নেই

তাই মন ভালো নেই।

তোমায় পাবো কি পাবো না

তাও আমি জানি না।

এই ভেবে কোন কাজে

মন যে বসে না।

কেন এমন হয়

বারে বারে মনে পরে

শুধু যে তোমায়।

তুমি কোথায়, ওগো তুমি কোথায়!!

 ________________

30/06/2016

Monday, November 21, 2022

বাংলার নবজাগরণে উনিশ শতক -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

বাংলার ইতিহাসে উনিশ শতক হলো একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। নবজাগরণ হলো জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা আর সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের পথ ধরেই ভারত বিভক্তি, সর্বশেষ বাংলাদেশের সৃষ্টি। তাই এই শতক নিয়ে জানার আগ্রহ কম বেশি সবার মাঝে আছে। এই আগ্রহের জায়গা পূরণ করতে 'উনিশ শতকে বাংলার সমাজ-চিন্তা ও সমাজ বিবর্তন ১৮১৮-১৮৩৫' বইটি সহায়ক। বইটি মূলত এ এফ সালাহ্উদ্দিন আহমদ এর পিএইচডির থিসিস। যা ১৯৬৫ সালে ইংরেজিতে এবং বহুবছর পরে বাংলায় অনুবাদ প্রকাশ পায়। বইটিতে বাংলার সমাজে পাশ্চাত্যের প্রভাব, রক্ষণশীলতা ও সংস্কারবাদ, নবজাগরণে বাংলার সংবাদপত্র, সমাজ নীতি, শিক্ষানীতি এই সব বিষয়গুলো অত্যন্ত সুন্দর তথ্য প্রমাণের সাহায্যে তুলে ধরেছেন। নবজাগরণের সূচনা পর্বের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়েছে বইটিতে।
 
লেখকের ভাষায়, "এদেশের শিক্ষা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাঠামো বেশ কিছুটা নির্মিত হয়েছে। নতুন আইন ব্যবস্থার ভিত্তিও রচিত হয়েছে। ব্যাপক আকারে যোগাযোগ ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছে। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি হিন্দু ও মুসলমান, এই দুই সম্প্রদায়ের ভিন্নতর প্রতিক্রিয়ার ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদের উন্মেষও ঘটেছিল এই সময়েই। এবং পরিশেষে বাংলার সংবাদপত্রসমূহে এদেশের বিভিন্ন শ্রেণির জনগণের চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হতে শুরু করেছিল।" এ সব কিছুরই বিস্তারিত বিবরণ আছে বইটিতে।
 
 
বইঃ উনিশ শতকে বাংলার সমাজ-চিন্তা ও সমাজ বিবর্তন ১৮১৮-১৮৩৫
লেখকঃ সালাহ্উদ্দিন আহমদ
প্রকাশকঃ জার্নিম্যান বুকস্
মূল্যঃ ৩০০ টাকা।।
20.11.2022

Sunday, November 20, 2022

কল্পিত নবান্নে -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আজ নবান্নের দিনে তোমার হাতের সুস্বাদু খাবারে মনটা বেশ ভরে গেলো। মনে হলো কতোদিন পেটপুরে এমন খাবার খাইনি। আসলেই তাই ইট-পাথরের এই শহরে একা আমার বাস। বুয়ার রান্নায় কেটে যায় দিন মাস। মাঝে মাঝে নিজেকেও রান্নাঘরে যেতে হয়। এই দুই রান্নায় আর যাইহোক তোমার হাতের এমন স্বাদ পাওয়া যায় না। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে নবান্ন এখন বইয়ের পাতায় আর শহরের যান্ত্রিকতায় তা কখন আসে, কখন যায় মনে রাখা দায়। লোকারণ্য এই শহরের ভিড়ে তুমি একমাত্র আমার আপন জন। আমার প্রতিদিনকার খোঁজ নেয়ার মানুষ। সকালে তোমার ডাকে ঘুম ভাঙে, যদিও সেই ডাক মোবাইল ফোনে। আমি কি খেলাম, কোথায় গেলাম, মন ভালো কিনা, পড়াশোনা কেমন চলে কোন খবরই তোমার অজানার বাইরে থাকেনা। মনে হয় যেন তুমি আমার সাথেই থাকো সবটুকু সময়। আজ তুমি নিজ হাতে রান্না করেছো। সচরাচর তুমি রান্না করো না, করতে হয় না। আজ তুমি একা, বাসায় তোমার রাজ্য। রান্না করতে করতে আমায় বললে চলে এসো দুপুর, আমার হাতে তোমায় খাইয়ে সারা বিকেল ঘুরবো। এমন মধুর আমন্ত্রণ পেয়ে ছুটে আসলাম তোমার দ্বারে। তোমায় কাছে পাবার আনন্দে বসন্তের বাতাস হৃদয় ছুয়ে গেল, সাথে বাহারি রান্নার আয়োজন ভুলিয়ে দিলো সারা বছরের ভালোমন্দ না খাবার প্রয়োজন। পড়ন্ত বিকেলে তুমি নীল শাড়িতে দাঁড়ালে আমার সামনে। বললে চলো ঘুরে আসি কোন সবুজ প্রান্তে। হাত বাড়িয়ে তোমার হাতে বেরিয়ে পরলাম পথের পানে। তোমার হাতে হাত রেখে রিক্সায় চড়ে পথ চলতে চলতে মনের মাঝে একটাই সুর ভেসে যাচ্ছিলো, 'তোমার ইচ্ছেগুলো ইচ্ছে হলে আমায় দিতে পারো, আমার ভালো লাগা ভালোবাসা তোমায় দিবো আরো।' তোমায় নীল শাড়ি আর নীল টিপে দারুণ লাগে। খোলাচুলে তুমি যখন বাতাসের বিপরীতে দাড়িয়ে ডাগড় চোখে আমার পানে তাকাও, তখন আমার মনে হয় এই তোমার জন্যই হাজার বছর বেঁচে থাকতে হবে। তোমাকে ভালোবাসতে হবে আমৃত্যু। তোমাকে আমার করে রাখতে হবে। মরণের পরেও তোমায় যেন পাই এই প্রার্থনা করে যাই সৃষ্টিকর্তার কাছে। মনের মাঝে এমন হাজারো ভাবনার মধ্যেই তোমার ধাক্কায় ফিরে তাকালাম। চেয়ে দেখি তুমি পাশে নেই। আমি একা বসে কংক্রিটের এক রুমে।
 
 
 কল্পিত নবান্নে -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
 

Friday, November 11, 2022

ভালোবাসার পাখি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

 সন্ধ্যা ঘনায় সূর্য ডোবে
পাখিরা সব নীড়ে ফেরে
আমার পাখি থাকে দূরে
কেমন করে ফিরাই তারে।

ইচ্ছে করে বুকের মাঝে
রাখি ধরে মোর পাখিটারে।

ও পাখি তুই কেমন করে
থাকিস একা আমায় ছেড়ে
আয়রে ফিরে মোর নীড়েতে
কাটেনা সময় তোর বিরহে।

ইচ্ছে করে উড়ে বেড়াই
আমারা দু'জন এক আকাশে।

এক নীড়েতে থাকবো বলে
ঘর বাধিলাম পাখির সাথে
আজকে পাখি দূরে থাকে
একলা করে আমায় রে।

ও পাখি তুই আয়রে ঘরে
থাকি সুখে একই সাথে।

   ভালোবাসার পাখি 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

Thursday, November 3, 2022

স্মৃতির লন্ঠন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ইচ্ছেগুলোরা মরে যাচ্ছে

বাস্তবতার নিষ্ঠুর কষাঘাতে

ভাবনাগুলোরা হারিয়ে যাচ্ছে

সময়ের নিরব ব্যবধানে।

ইচ্ছে, স্বপ্ন আর বাস্তবতা

দিনে দিনে সবই হয় আলাদা

পাথরের বোবা কান্নার মতো

কেউ তার দেখা পায়না।

সাপলুডু খেলা হয় নিয়ত

হৃদয়ের সাথে, চোখের জলে

যেতে চাইলেও ফিরতে হয়

বিষবাণে নীলবর্ণ দেহের সাথে।

পরিত্রাণ শব্দটি হারিয়েছে অভিধান

সবখানে শুধু সুখের অবগাহন

জীবন চলবে, পাথরও ভাঙ্গবে

থাকবে না শুধু স্মৃতির লন্ঠন।

 

___________

স্মৃতির লন্ঠন 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন

১৫.০৬.২০১৮

Tuesday, November 1, 2022

শিক্ষা গবেষণাঃ প্রকার, পদ্ধতি ও ধাপসমূহ

শিক্ষা গবেষণাঃ প্রকার, পদ্ধতি ও ধাপসমূহ

শিক্ষা গবেষণা কি

শিক্ষা গবেষণা হল এক ধরণের পদ্ধতিগত অনুসন্ধান যা শিক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের জন্য অভিজ্ঞতামূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করে। সমস্যা সমাধান এবং জ্ঞানের বিকাশে ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করার জন্য এটি যথাযথ এবং সু-সংজ্ঞায়িত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করে।

শিক্ষা গবেষণা বলতে বোঝায় শিক্ষা প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও ভাল বোঝার জন্য ও দক্ষতা উন্নত করার লক্ষ্যে একটি পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা। এটি শিক্ষা সমস্যা অধ্যয়নের জন্য একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

শিক্ষা গবেষণা হল অধ্যয়নের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যা শিক্ষা এবং শেখার প্রক্রিয়া এবং মানবিক গুণাবলী, মিথস্ক্রিয়া, সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরীক্ষা করে। কীভাবে একজন ব্যক্তির সারা জীবন জুড়ে শেখা হয় এবং কীভাবে শিক্ষার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট সব ধরনের শিক্ষাকে প্রভাবিত করে ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ।

শিক্ষা গবেষণার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল শিক্ষাদান এবং শেখার অনুশীলনের উন্নতির সাথে সাথে শিক্ষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান প্রদানের মাধ্যমে জ্ঞানের বিদ্যমান অংশকে প্রসারিত করা। শিক্ষা গবেষকরাও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা, বিকাশ এবং শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিরক্তিকর অভিজ্ঞতার সমাধান খোঁজে।

শিক্ষা গবেষণার প্রকারভেদ

শিক্ষা গবেষণাকে ৩টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন- বর্ণনামূলক গবেষণা, পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত গবেষণা এবং পরীক্ষামূলক গবেষণা। 

১. বর্ণনামূলক শিক্ষা গবেষণা

এই ধরনের শিক্ষামূলক গবেষণায়, গবেষক কেবলমাত্র বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে চান। বর্ণনামূলক গবেষণার মূল বিষয় হল শুধু গবেষণা বিষয়ের অবস্থা এবং বৈশিষ্ট্যগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা।

বর্ণনামূলক শিক্ষা গবেষণায়, গবেষক প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে সমীক্ষা এবং প্রশ্নাবলী সহ পরিমাণগত গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে। সাধারণত, বর্ণনামূলক শিক্ষামূলক গবেষণা একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ। এখানে বর্ণনামূলক গবেষণার কয়েকটি উদাহরণ রয়েছে:

  • শিক্ষার্থীদের সাক্ষরতার মাত্রা বুঝা
  • ছাত্রদের শ্রেণীকক্ষ কর্মক্ষমতা অধ্যয়ন.
  • শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এবং পছন্দের তথ্য সংগ্রহের জন্য গবেষণা।

২. পারস্পরিক শিক্ষা গবেষণা

পারস্পরিক শিক্ষা গবেষণায় দুটি গবেষণা ভেরিয়েবলের মধ্যে পরিসংখ্যানগত সম্পর্কের অন্তর্দৃষ্টি খোঁজে। পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত গবেষণায়, গবেষক দুটি ভেরিয়েবল অধ্যয়ন করেন, যার একটির পরিবর্তনে অপরটিরও ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক পরিবর্তন হয়।

পারস্পরিক সম্পর্কীয় গবেষণা ইতিবাচক, নেতিবাচক বা অস্তিত্বহীন হতে পারে। ধনাত্মক পারস্পরিক সম্পর্ক ঘটে যখন A এর বৃদ্ধি, পরিবর্তনশীল B এর বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়। নেতিবাচক সম্পর্ক ঘটে, যখন A পরিবর্তনশীলের বৃদ্ধির ফলে পরিবর্তনশীল B হ্রাস পায়।

যখন কোনো ভেরিয়েবলের পরিবর্তন অন্যটিতে পরিবর্তন করে না, তখন পারস্পরিক সম্পর্ক অস্তিত্বহীন থাকে। শিক্ষা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত গবেষণার উদাহরণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • ছাত্রদের আচরণ এবং শ্রেণীকক্ষ কর্মক্ষমতা মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করতে গবেষণা।
  • শিক্ষার্থীদের সামাজিক দক্ষতা এবং তাদের শেখার আচরণের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে একটি অধ্যয়ন।

৩. পরীক্ষামূলক শিক্ষা গবেষণা

পরীক্ষামূলক শিক্ষা গবেষণা একটি গবেষণা পদ্ধতি যা গবেষণা পরিবেশে দুটি ভেরিয়েবলের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। গবেষণার ভেরিয়েবলের পরিপ্রেক্ষিতে কারণ এবং প্রভাব নির্ধারণের জন্য এটি পরিমাণগত গবেষণা পদ্ধতি গ্রহণ করে।

পরীক্ষামূলক শিক্ষা গবেষণায় সাধারণত দুটি গ্রুপ জড়িত থাকে- নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ এবং পরীক্ষামূলক গ্রুপ। গবেষক পরীক্ষামূলক গোষ্ঠীতে কিছু পরিবর্তন প্রবর্তন করেন যখন নিয়ন্ত্রণ গ্রুপটি তার স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে।

এই অনুঘটকগুলোর প্রবর্তন গবেষককে পরীক্ষায় ফ্যাক্টরগুলো নির্ধারণ করতে দেয়। পরীক্ষামূলক শিক্ষা গবেষণার মূলে রয়েছে একটি অনুমানের প্রণয়ন। তাই, সামগ্রিক গবেষণা নকশা এই অনুমানকে অনুমোদন বা বাতিল করার জন্য পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের উপর নির্ভর করে।

পরীক্ষামূলক শিক্ষা গবেষণার উদাহরণ

  • একটি স্কুলে সেরা শিক্ষাদান এবং শেখার পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য একটি অধ্যয়ন।
  • পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কার্যকলাপগুলো শেখার প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা বোঝার জন্য একটি অধ্যয়ন।

শিক্ষা গবেষণার গুরুত্ব

  • শিক্ষা গবেষণা, অধ্যয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্র জুড়ে জ্ঞান অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • এটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যবহারিক শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জের উত্তর প্রদান করে।
  • শিক্ষামূলক গবেষণা শিক্ষা, জ্ঞান, দক্ষতা এবং বোঝার উন্নতি করে।
  • শিক্ষাগত গবেষণা আরও কৌশলগতভাবে এবং কার্যকরভাবে শেখাতে এবং নেতৃত্ব দিতে সহায়তা করার জন্য ডেটা দিয়ে আপনাকে শিক্ষাদান এবং শেখার পদ্ধতির উন্নতি করে।
  • শিক্ষা গবেষণায়, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ব্যবহারিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে সাহায্য করে।

শিক্ষা গবেষণা পদ্ধতি

সমীক্ষা/প্রশ্নমালা

সমীক্ষা বা জরিপ হল একটি গবেষণা পদ্ধতি যা একটি নির্দিষ্ট গবেষণা প্রসঙ্গে পূর্বনির্ধারিত দর্শকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যবহৃত হয়। এটি সাধারণত নির্ধারিত প্রশ্নগুলোর একটি সেট যার মাধ্যমে দর্শকদের অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা এবং আচরণ সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি পেতে সাহায্য করে।

এটি সাধারণত কাগজের মাধ্যমে, মুখোমুখি কথোপকথন, টেলিফোন কথোপকথন বা অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিচালিত হতে পারে। সমীক্ষার মাধ্যমে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে, আপনাকে প্রথমে গবেষণার প্রসঙ্গ এবং গবেষণার বিষয়গুলো সনাক্ত করতে হবে যা আপনার ডেটার নমুনার আকার তৈরি করবে।

সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার হল একটি গুণগত তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি যা আপনাকে কথোপকথনে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে উত্তরদাতাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে সহায়তা করে। গবেষণার জন্য সাক্ষাৎকারগুলো কাঠামোগত, আধা-কাঠামোগত বা অসংগঠিত হতে পারে। 

কাঠামোগত সাক্ষাৎকার হল এক ধরনের সাক্ষাৎকার যা একটি পূর্বপরিকল্পিত ক্রম অনুসরণ করে। অর্থাৎ, এটি তথ্য সংগ্রহ করতে নির্ধারিত প্রশ্নগুলোর একটি সেট ব্যবহার করে।

অসংগঠিত সাক্ষাৎকার এক ধরনের অ-নির্দেশক বা অপরিকল্পিত ক্রম অনুসরণ করে। একটি অসংগঠিত সাক্ষাৎকারে যেখানে, গবেষক পূর্বনির্ধারিত প্রশ্নগুলোর একটি সেট ব্যবহার করেন না বরং তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তরদাতাদের কাছ থেকে প্রাসঙ্গিক ডেটা সংগ্রহ করতে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন।

একটি আধা-কাঠামোগত সাক্ষাৎকার হল কাঠামোগত এবং অসংগঠিত সাক্ষাৎকারের মধ্যবর্তী পয়েন্ট। এখানে, গবেষক নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর একটি সেট ব্যবহার করেন, তিনি গবেষণার প্রসঙ্গে কথোপকথনের প্রবাহের জন্য পূর্বনির্ধারিত প্রশ্নগুলোর বাইরেও অনুসন্ধান করেন। এছাড়া অডিও রেকর্ডার, ডিজিটাল ক্যামেরা, জরিপ এবং প্রশ্নাবলী ব্যবহার করে সাক্ষাৎকারের ডেটা সংগ্রহ করা যেতে পারে।

পর্যবেক্ষণ

পর্যবেক্ষণ হল ডেটা সংগ্রহের একটি পদ্ধতি যা পদ্ধতিগতভাবে প্রাণী, বস্তু বা ঘটনাগুলোর আচরণ এবং বৈশিষ্ট্যগুলো নির্বাচন, দেখা, শোনা, পড়া, স্পর্শ এবং রেকর্ড করে। শ্রেণীকক্ষে, শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রসঙ্গে শিক্ষার্থীদের আচরণ বোঝার জন্য এই পদ্ধতিটি নিতে পারেন।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিগতভাবে গুণগত বা পরিমাণগত হতে পারে। পরিমাণগত পর্যবেক্ষণে, গবেষকের লক্ষ্য উত্তরদাতাদের কাছ থেকে পরিসংখ্যানগত তথ্য সংগ্রহ করা। গুণগত পর্যবেক্ষণে, গবেষকের লক্ষ্য উত্তরদাতাদের কাছ থেকে গুণগত তথ্য সংগ্রহ করা।

শিক্ষা গবেষণার ধাপসমূহ

অন্যান্য ধরণের গবেষণার মতো, শিক্ষাগত গবেষণায় বেশ কয়েকটি ধাপ জড়িত। এই পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করে গবেষককে তথ্য সংগ্রহ করতে এবং গবেষণার প্রেক্ষাপটে উপযোগী বৈধ ফলাফল পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। 

  • প্রথমে গবেষণা সমস্যাটি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা।
  • গবেষণা হাইপোথিসিস তৈরি করুন। গবেষণা অনুমান হল উপলব্ধ প্রমাণের উপর ভিত্তি করে গবেষকের যুক্তিসঙ্গত অনুমান, যা তিনি গবেষণার সময় প্রমাণ করতে চান।
  • গবেষণা পদ্ধতি নির্ধারণ করুন। শিক্ষা গবেষণা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ইন্টারভিউ, সার্ভে বা জরিপ এবং প্রশ্নাবলী।
  • এক বা একাধিক শিক্ষামূলক গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষণা বিষয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন।
  • ডেটা বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা করুন। 
  • একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করুন। গবেষণা প্রতিবেদন পদ্ধতিগত তদন্তের পুরো প্রক্রিয়া এবং গবেষণার ফলাফলের বিবরণ দেয়।

 

 

শিক্ষা গবেষণাঃ প্রকার, পদ্ধতি ও ধাপসমূহ

-- Md. Helal Uddin

Saturday, October 29, 2022

কল্লোল লাহিড়ী'র 'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল' -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

খুলনার কলাপোতা গ্রামের ইন্দুর বিয়ে হলো কলকাতায়। দোজবরে মাতাল এক পুরুষের সঙ্গে। তিন সন্তান নিয়ে অল্পকালেই বিধবা। তারপর পূর্ব পাকিস্তান যেদিন হলো বাংলাদেশ, সেদিনই কলকাতার ছেনু মিত্তির লেনে প্রথম আঁচ পড়লো ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে। এই উপন্যাসে ছেনু মিত্তির লেনের ইন্দুবালা ভাতের হোটেল ছুঁয়ে থাকে এক টুকরো খুলনা আর আমাদের রান্না ঘরের ইতিহাস। যে ইতিহাস ইন্দুবালার জীবনের ইতিহাস। এই ইতিহাসে আছে ভারত বিভক্তি, অখন্ড বাংলার ইচ্ছা, স্বাধীন বাংলাদেশ, আছে নকশাল আন্দোলন, খাদ্যের জন্য আন্দোলন। এই রাজনৈতিক ইতিহাস উপন্যাসে খুবই সামান্য, কেননা এখানে একজন বিধবা নারীর জীবন সংগ্রামের দিকটাই হলো মূল আলোচ্য। কেমন করে বিধবা ইন্দুবালা তিন সন্তান নিয়ে মাথা উঁচু করে টিকে ছিলেন সমাজে, টিকিয়ে রেখেছিলে আমাদের ঐতিহ্য, করেছিল মানুষের সেবা। ইন্দুবালা চরিত্রের এই অসাধারণ বর্ণনা আমাদের সমাজ জীবনকে সুন্দর ভাবে তুলে ধরে।
 
ইন্দুবালা ভাতের হোটেল -- কল্লোল লাহিড়ী 

Monday, October 24, 2022

গণতন্ত্র ঘাটতির বিশ্ববীক্ষণ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

“গণতন্ত্র-ঘাটতি বিশ্ব দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ”

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে রাজনৈতিক আলাপচারিতার বই বরাবরই পছন্দের তালিকায় প্রথম। আর সেই আলোচনা যদি বর্তমান সময়ের রাজনীতি ও গণতন্ত্র কেন্দ্রিক তবে তার প্রতি আগ্রহ বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। শান্তনু মজুমদার স্যারের লেখা বই 'গণতন্ত্র-ঘাটতি বিশ্ব দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ' তেমনই একটা বই। বইটি মূলত স্যারের লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং কয়েকটি সাক্ষাতকারের সমষ্টি, যা বিগত দশকের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো। স্যারের লেখার এবং পড়ানোর একটা বৈশিষ্ট্য হলো যে কোন বিষয়ের আলোচনাকে প্রথমে বিশ্বের প্রেক্ষাপটে, তারপরে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট, সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা করা, যা এই বইয়ের পাঠবিন্যাসেও ফুটে উঠেছে। বইটি প্রকাশ করেছে ‘সময় প্রকাশন’। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ‘ধ্রুব এষ’। বইটির মূল্য ধার্য করা হয়েছে ৪০০ টাকা।

'গণতন্ত্র-ঘাটতি বিশ্ব দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ' বইটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলতেই এই লেখার চেষ্টা। বইটি নিয়ে আলোচনার শুরুতে বইয়ের লেখক শান্তনু মজুমদার স্যার সম্পর্কে যা বলা যায়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং তার গবেষণার আগ্রহের বিষয়ের মধ্য রয়েছে- গণতন্ত্র-ঘাটতি, রাষ্ট্র ও সুশীল সমাজ সম্পর্ক, রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতা, আইডেনটিটি পলিটিক্স, ডিজিটাল ডিজইনফরমেশন এবং দক্ষিণ এশিয়া। তার গবেষণার এই বিষয়গুলোর আলোকেই বইয়ের প্রবন্ধগুলো। উল্লেখ্য, আমি বইয়ের লেখকের সরাসরি ছাত্র হওয়ায় লেখকের নামের পরে স্যার শব্দটি ব্যবহার করেছি।

'গণতন্ত্র-ঘাটতি বিশ্ব দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ' বইটিতে মোট ৪৩টি প্রবন্ধ ও ৭টি সাক্ষাতকার রয়েছে যাকে চারটি অংশে ভাগ করে সাজানো হয়েছে। প্রথম অংশ ‘বিশ্ব’- এ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাজনীতি, ধর্মনীতি, আত্মপরিচয়, গণতন্ত্র, উগ্র জাতীয়তাবাদ এই রকম বিষয়গুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আলোচনা করেছে। এর প্রতিটা লেখাই যেমন তথ্যবহুল, তেমনি নতুন চিন্তার খোরাক। এই অংশের ‘সর্বজনীন সবার্থে রাষ্ট্রের সামার্থ্য বাড়াতে হবে, 'সরকারপ্রধান ও দলীয়প্রধান পৃথককরণ প্রসঙ্গে', 'রক্ত দিয়ে চিন্তা ধুয়ে ফেলার মূর্খতা মিসরে', 'পার্পল স্টেটের গাড্ডায় ওবামা-রমনি', ‘জায়নবাদের বিরুদ্ধে কেন মুখ খুললেন গুন্টার গ্রাস’, ‘মোবারক থেকে মিলিটারি’ সহ অন্যান্য প্রবন্ধগুলোতে পশ্চিমা রাজনীতি, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা বর্ণনার সাথে সাথে আরব, মধ্যপ্রাচ্যের মতো দেশগুলোর রাষ্ট্র, রাজনীতি, গণতন্ত্রের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে গত এক দশকের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সার্বিক একটা চিত্র পাওয়া যায়। যেমন- ‘ট্রাম্পবাজির দুনিয়া’ প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে ট্রাম্পের বিদ্বেষবাদ ও কর্তৃত্ববাদ এবং তিনি বিশ্বকে যেভাবে ‘আমরা’ এবং ‘অপর’ করে তুলে তা একটা শিল্পের রুপ দিয়েছে। প্রবন্ধটিতে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির ধরণ, আইডেনটিটি পলিটিক্স এর স্বরূপ ফুটে উঠেছে। গত দশকের মাঝামাঝি লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হয়ে জেরেমি করবিন লেবার পার্টি এবং ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটা বড় পরিবির্তনের ধাক্কা দিয়েছেন তার বর্ণনা দিয়ে ‘জেরিমি করবিনঃ মানবতার ফেরিওয়ালা’ প্রবন্ধটি লেখা। এই প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে ঐসময়ে ব্রিটেনের রাজনীতি, অভিবাসী প্রশ্নে তাদের অবস্থান, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু প্রভৃতি ফুটে উঠেছে। সিরিয়া সংকট দীর্ঘদিনের, কিন্তু কেন এই সংকট? এই সংকটের সুন্দর একটা নিরপেক্ষ কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে ‘সিরিয়াঃ স্বৈরাচার বনাম সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ’ প্রবন্ধে। সিরিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক বৃহত্ শক্তির মধ্যকার টানাপোড়ন, সিরিরায় শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বিষয়ের একটা স্বরূপ প্রবন্ধটিতে পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয় অংশ 'দক্ষিণ এশিয়া'- তে আঞ্চলিক পরিমণ্ডলের বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তানের রাষ্ট্র, রাজনীতি, গণতন্ত্র এই বিষয়গুলোর বর্ণনা সুন্দর করে তুলে ধরা হয়েছে প্রবন্ধগুলোতে। দু'য়েকটা প্রবন্ধের নাম দেখেই কিছুটা অনুমান করা সহজ। 'কে এই ইমরান খান?', ‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন মোদি?', ‘ইন্ডিয়া, নাকি হিন্দুস্থান, নাকি ভারত', 'লালবিবি সমাচার' এগুলোর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের অবস্থা, ভারতে গণতন্ত্র, আত্মপরিচয়, রাষ্ট্র ও রাজনীতি, আফগানিস্তানের নারী অধিকার, রাষ্ট্র ও রাজনীতির মতো বিষয় বিশ্লেষণ সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। যেমন- ‘‘একাত্তর নিয়ে তিন ‘পাক’ ভাইয়ের ভাবনা’’ প্রবন্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা প্রভৃতি নিয়ে পাকিস্তানি নতুন প্রজন্মের ভাবনার একটা রুপ দেখতে পাই। পাকিস্তানীদের চোখে বাংলাদেশে কোন গণহত্যা হয়নি, এটা ভারতের একটা ষড়যন্ত্র মাত্র। পাকিস্তানি নতুন প্রজন্ম মনে করে, একাত্তরে পাকিস্তানের পাঞ্জাবী সেনারা আসলে গণহত্যা চালায়নি। গণহত্যা চালিয়েছে ভারতীয় পাঞ্জাবীরা। একাত্তরে ভারতের শিখ ধর্মাবলম্বী পাঞ্জাবীরাই আসলে চেহারা ও দৈহিক আকৃতির সুবিধা ব্যবহার করে গণহত্যা চালিয়েছে আর সব দোষ ফেলেছে পাক-পাঞ্জাবী সেনাদের ওপর। মোদির প্রধানমন্ত্রী হবার স্বপ্ন এবং ভারতের ভবিষ্যত রাজনীতি নিয়ে লেখক যে ধারণা এক দশক আগে তার ‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন মোদি?’ এবং ‘ইন্ডিয়া, নাকি হিন্দুস্থান, নাকি ভারত' প্রবন্ধে দিয়েছেন তার বাস্তবরুপ আমরা বর্তমান ভারতের রাজনীতিতে দেখতে পাই। 'লালবিবি সমাচার'-এ আফগান নারীদের করুণ অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত, বঞ্চিত নারীরা কিভাবে এক সময় প্রতিবাদি হয় তা দেখতে পাই, সাথে সাথে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার চিত্রও পাওয়া যাবে।

তৃতীয় অংশ ‘বাংলাদেশ’- এ বাংলাদেশের রাজনীতি, সুশীল সমাজ, গণতন্ত্র, ঢাকার পরিবর্তন এমন কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন। এই ভাগে 'তরুণেরা কেন রাজনীতিবিমুখ', 'সুশীল সমাজের ফয়সালার তালাশ', 'রাজনীতিতে রাজনীতি কোথায়', 'সামাজিক শক্তি ও ধর্মনিরপেক্ষতা', 'গণজাগরণঃ শাহবাগ কি বলছে?', ‘ওদের গোপন কথা বলতে দিন’, ‘মুক্তিযুদ্ধের সবপ্ন ও ডেমোক্র্যাসি ডেফিসিট’, ‘রাজনীতির সুদিন দুর্দিন’ সহ অন্যান্য প্রবন্ধে ঢাকার আগের অবস্থা এবং বর্তমান অবস্থার একটা তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়। ঢাকার সুশীল সমাজের অবস্থান, তরুণ প্রজন্মের বাস্তবতা, রাজনৈতিক অবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের অবস্থান, গণতন্ত্রের সংকট, পরিচয়ের রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রামের চিত্র সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। আর এই অবস্থার বর্ণনায় এক এগারোর পরবর্তিত নতুন করে গণতান্ত্রিক যাত্রার সময়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। বলা যায় গত এক দশকের স্মৃতিচারণ সাথে আছে সার্বিক বিশ্লেষণ। যেমন- 'স্মৃতির শহর ঢাকা' প্রবন্ধে মধ্যবিত্ত বলতে যে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা ও যাবতীয় টানাপোড়নের চিত্র তার পরিবর্তে ফাস্টফুড, শপিং, অযথা ইংরেজি কপচানো এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপস্থিতি যার শুরু হয়েছিলো নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তার একটা সুন্দর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ‘আমরা কেমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চাই?’ প্রবন্ধে দেখতে পাই বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। যেখানে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে একধরনের জমিদার-রায়াত সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয় তা যুক্তি সহকারে দেখিছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন নিয়েও বিস্তর আলোচনা করেছেন এই প্রবন্ধে। ‘কাঁটাবন থেকে ক্যাম্পাস’ প্রবন্ধে ঢাকার এই বিশেষ জায়গাটার মনোমুগ্ধকর বর্ণনা, নশ্বর পৃথিবীতে ধনী-গরীবের ব্যবধান, সাথে সাথে পুঁজিবাদ কিভাবে সর্বত্র গ্রাস করে চলছে তার একটা ধারণাও পাওয়া যাবে।

শেষভাগ ‘সাক্ষাতকার’- এ স্যারের কয়েকটা সাক্ষাতকার রয়েছে যেখানে সমাজনীতি, রাজনীতি, নির্বাচন, অর্থনীতি, ধর্ম, রাষ্ট্রধর্ম, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, মানবতা প্রভৃতি বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। প্রতিটি লেখায় কোন ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার সাহস দেখিয়েছেন। এখানে কয়েকটি প্রবন্ধের নাম ও কয়েকটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু সামান্য আলোচনা করা হয়েছে, যা বইটি সম্পর্কে একটা ধারণা দেয় মাত্র। কিন্তু বইটি পড়লে গত দশকের বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের একটা বাস্তব চিত্র চোখের সামনে সুন্দর করে ফুটে উঠবে।

'গরিবের ঈশ্বর এবং মৌলবাদের ঈশ্বর এক নন' স্যারের এই কথা দিয়েই শেষ করতে চাই। ঈশ্বর সবাইকে সৃষ্টি করেছেন সমান ভাবে, কিন্তু পৃথিবীতে সবাই সমান হতে পারিনি। সবার কাছে ঈশ্বর সমান নয়, ঈশ্বরকে আমরা আমাদের প্রয়োজন মতো ব্যবহার করি।

 


মোঃ হেলাল উদ্দিন

৩৩তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)

helaluddin565@gmail.com

 


বইঃ গণতন্ত্র-ঘাটতি বিশ্ব, দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ

লেখকঃ শান্তনু মজুমদার

প্রকাশকঃ সময় প্রকাশন

মূল্যঃ ৪০০ টাকা।