বৃষ্টির রাত। জানালার কাচ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে। দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর ঘরের ভেতর টেবিলের ওপর রাখা মুঠোফোনের পর্দায় জ্বলজ্বল করছে একটি নাম— পাখি।
নামটা দেখলেই একসময় অর্ণবের মুখে হাসি ফুটত। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা জেগে উঠত। পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে সে অপেক্ষা করত একটি ছোট্ট বার্তার জন্য— কী করছ?
আজও নামটা দেখলে তার বুক কেঁপে ওঠে। তবে এখন আর হাসি আসে না। আসে দীর্ঘশ্বাস। কিছু নাম মানুষের জীবনে বসন্ত নিয়ে আসে, আবার সেই নামই একদিন সমস্ত ঋতুকে বিষণ্ন করে দিতে পারে।
অর্ণব মুঠোফোনটা হাতে নিল। পাখির সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল প্রায় তিন মাস আগে।
সেদিন পাখি বলেছিল, — অর্ণব, আমাদের আর কথা বলা উচিত নয়।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রশ্ন করেছিল, — কেন?
— কারণ, এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
— ভবিষ্যৎ নেই বলে কি অতীতটাও মিথ্যা হয়ে যায়, পাখি?
পাখি উত্তর দেয়নি।
সেদিনের সেই নীরবতা অর্ণবকে যতটা কষ্ট দিয়েছিল, তার চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছিল পাখির চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। কারণ মানুষ যখন রাগ করে, তখন তাকে বোঝানো যায়। অভিমান করলে অভিমান ভাঙানো যায়। কিন্তু কেউ যখন নিজের বিবেকের কাছে কোনো সিদ্ধান্তকে ন্যায়সংগত বলে মেনে নেয়, তখন তার সামনে ভালোবাসার সমস্ত যুক্তিই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
অর্ণব সেটাই বুঝেছিল।
তবু সে পাখিকে ভুলতে পারেনি।
পাখির সঙ্গে অর্ণবের পরিচয় হয়েছিল এক বর্ষার বিকেলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল। হাতে কয়েকটি বই, চোখেমুখে বিরক্তি। ছাতা ছিল না। অর্ণব নিজের ছাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল,
— আপনি চাইলে ছাতাটা নিতে পারেন।
মেয়েটি তাকিয়ে হেসেছিল।
— আর আপনি?
— আমি বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসি।
— সত্যি?
— না। তবে অপরিচিত কাউকে বিপদে ফেলে রেখে যাওয়ার চেয়ে বৃষ্টিতে ভেজা ভালো।
পাখি হেসে উঠেছিল। সেই হাসির মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা অর্ণবকে অকারণেই থমকে দিয়েছিল।
পরিচয় থেকে কথা, কথা থেকে বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্ব থেকে কখন যে দুজনের মধ্যে এক অদৃশ্য মায়ার জন্ম হয়েছিল, তা কেউ বুঝতে পারেনি।
তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত। কখনো বই নিয়ে, কখনো জীবন নিয়ে, কখনো মানুষের ভণ্ডামি নিয়ে। পাখি যখন মন খারাপ করত, অর্ণব তার কথা শুনত। অর্ণব যখন নিজের ব্যর্থতা নিয়ে হতাশ হতো, পাখি বলত,
— তুমি জানো, তোমার একটা ভালো দিক আছে?
— কী?
— তুমি কষ্ট পেলেও কাউকে কষ্ট দিতে চাও না।
অর্ণব হেসে বলত,
— এটাই তো আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
পাখি মাথা নাড়ত।
— না, এটা দুর্বলতা নয়। পৃথিবীতে ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে কঠিন সাহস।
সেদিন অর্ণব বুঝতে পারেনি, একদিন এই মেয়েটির কাছেই তাকে নিজের ভালোবাসার জন্য অপরাধীর মতো দাঁড়াতে হবে।
তাদের সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিক নাম ছিল না। কেউ কাউকে ভালোবাসার কথা স্পষ্ট করে বলেনি। তবু পাখির মন খারাপ হলে অর্ণবের অস্থিরতা বাড়ত, অর্ণব অসুস্থ হলে পাখির চোখে উদ্বেগ জমত। একে অপরের দিনলিপিতে তারা এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছিল, যেন আলাদা দুটি মানুষ নয়—একটি অনুভূতির দুটি ভিন্ন নাম।
কিন্তু সব অনুভূতির পরিণতি এক হয় না।
কিছু সম্পর্কের সামনে সমাজ দাঁড়িয়ে যায়, কিছু সম্পর্কের সামনে দায়িত্ব, আর কিছু সম্পর্কের সামনে দাঁড়িয়ে যায় মানুষের নিজের বিবেক।
পাখির সামনে দাঁড়িয়েছিল শেষেরটিই।
পাখির জীবনে অর্ণবের আগেই একজন মানুষ ছিল—রায়হান।
রায়হান তার দীর্ঘদিনের পরিচিত। দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের কথাও অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। পাখি কখনো রায়হানকে ভালোবাসার কথা বলেনি, কিন্তু তার প্রতি দায়িত্ববোধ ছিল। পরিবার তাকে বিশ্বাস করত, রায়হানও তাকে নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেই জীবন সাজাচ্ছিল।
অর্ণবের সঙ্গে পরিচয়ের পর পাখি প্রথমবার বুঝেছিল, কাউকে পছন্দ করা আর কাউকে নিজের মনের গভীরে অনুভব করা এক বিষয় নয়।
সে অর্ণবকে ভালোবেসে ফেলেছিল।
কিন্তু ভালোবাসার এই উপলব্ধি তাকে আনন্দের চেয়ে বেশি অপরাধবোধে ভরিয়ে দিয়েছিল।
রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেই প্রশ্ন করত—
আমি কি ভুল করছি?
যে মানুষটি আমাকে বিশ্বাস করে, তার বিশ্বাস ভেঙে অন্য কাউকে ভালোবাসা কি ঠিক?
আমার হৃদয় কি আমার বিবেকের চেয়েও বড়?
পাখি জানত, অর্ণবকে দূরে সরিয়ে দিলে সে কষ্ট পাবে। আবার অর্ণবের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিলে এমন একজন মানুষকে আঘাত করতে পারে, যে তাকে বিশ্বাস করেছে।
দুই দিকেই কষ্ট। দুই দিকেই প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত পাখি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করবে। অন্তত এমন কোনো পথে যাবে না, যেখানে তার কারণে অন্য কারও বিশ্বাস চূর্ণ হয়।
কিন্তু সে একটি বিষয় বুঝতে পারেনি—নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করা আর অনুভূতির দায় স্বীকার করা এক নয়। আর নীরবে দূরে সরে যাওয়াই সব সময় নৈতিকতার সবচেয়ে সুন্দর সমাধান হয় না।
অর্ণবের সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার দিন পাখি বলেছিল,
— তুমি আমাকে ভুলে যাও।
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ।
— তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?
পাখির চোখ ভিজে উঠেছিল।
— এই প্রশ্নটা কোরো না, অর্ণব।
— কেন? উত্তরটা কি এত কঠিন?
পাখি চোখ নামিয়ে বলেছিল,
— কিছু প্রশ্নের উত্তর জানলেও মানুষ সেই উত্তর অনুযায়ী জীবন চালাতে পারে না।
অর্ণব আর কিছু বলেনি।
সে শুধু একবার পাখির মুখের দিকে তাকিয়েছিল। সেই চোখে সে ভালোবাসা দেখেছিল, কিন্তু ভালোবাসার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভয়টাকেও দেখেছিল।
তারপর দুজন দুটি পথে চলে গিয়েছিল।
একজন নিজের বিবেককে রক্ষা করতে।
অন্যজন নিজের ভালোবাসাকে বুকের মধ্যে সমাধিস্থ করতে।
তিন মাস ধরে অর্ণব নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। অফিস, বই, বন্ধু, লেখালেখি—সবকিছুই করেছে। তবু রাত গভীর হলে তার মনে হয়েছে, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিজের কাছেই ফিরিয়ে দেয়।
আর নিজের কাছে ফিরলেই পাখির কথা মনে পড়ে।
একদিন পুরোনো বইয়ের ভাঁজে সে একটি ছোট্ট কাগজ খুঁজে পেল। পাখির হাতের লেখা।
সেদিন লাইব্রেরিতে অর্ণবের কাছ থেকে নেওয়া বইটি ফেরত দেওয়ার সময় কাগজটা রেখেছিল মেয়েটি।
লেখা ছিল—
“সব মানুষকে ভালোবাসা যায় না, অর্ণব। আবার যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে সব সময় নিজের করে পাওয়াও যায় না। যদি কখনো আমাকে হারিয়ে ফেলো, তবে ভেবো না তোমার ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল। হয়তো আমাদের অনুভূতি সত্যি, কিন্তু সেই অনুভূতিকে ঘিরে থাকা পৃথিবীটা আমাদের মতো সহজ নয়।”
কাগজটি হাতে নিয়ে অর্ণব অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারপর সে হাসল।
এমন এক হাসি, যার মধ্যে আনন্দ ছিল না; ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কান্নাকে লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা।
সে ভাবল, পাখি তাকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু সেই ভালোবাসার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের বিবেককে জয়ী হতে দিয়েছিল।
অর্ণব কি তাহলে পাখির কাছে পরাজিত?
নাকি পাখি নিজেই পরাজিত হয়েছিল নিজের অনুভূতির কাছে?
হয়তো তাদের কেউই জেতেনি।
কারণ কিছু বিচ্ছেদে একজন জেতে না, অন্যজন হারে না। শুধু দুটি মানুষ নিজেদের সিদ্ধান্তের মূল্য সারাজীবন বহন করে বেড়ায়।
সেই রাতেই অর্ণব পাখিকে একটি চিঠি লিখল।
চিঠিটি পাঠাবে কি না, সে জানত না। হয়তো পাঠানোর জন্য নয়, নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলোকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই লিখছিল।
“প্রিয় পাখি,
অনেক দিন তোমাকে কিছু বলা হয়নি। হয়তো আর কখনো বলাও হবে না। তবু আজ মনে হচ্ছে, তোমার বিবেকের আদালতে একবার দাঁড়ানো প্রয়োজন।
তুমি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর অনেকবার ভেবেছি, আমার অপরাধটা কী ছিল? আমি কি তোমাকে বেশি ভালোবেসেছিলাম? তোমার খোঁজ নিতে চেয়েছিলাম বলে? তোমার মন খারাপের কারণ জানতে চেয়েছিলাম বলে? নাকি তোমার জীবনের সমস্ত অনিশ্চয়তার মধ্যেও তোমাকে একটু নিশ্চিন্ত আশ্রয় দিতে চেয়েছিলাম বলে?
পরে বুঝেছি, আমার অপরাধ হয়তো তোমাকে ভালোবাসা নয়। আমার অপরাধ ছিল, তোমার হৃদয়ে আমার জন্য যে জায়গাটা তৈরি হয়েছিল, তাকে আমি ভবিষ্যৎ ভেবে বসেছিলাম। অথচ তুমি সেই জায়গাটাকে অনুভূতি হিসেবেই রাখতে চেয়েছিলে।
তোমার সিদ্ধান্তের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। মানুষকে ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমার পছন্দমতো হতে হবে। তুমি তোমার বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। আমিও আমার অনুভূতির কাছে।
তবে একটা কথা বলি, পাখি—কাউকে কষ্ট না দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে কখনো কখনো আমরা তাকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলি, যে আমাদের সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে। হয়তো তুমি আমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলে, হয়তো নিজেকেও। কিন্তু তোমার নীরবতা আমাকে এমন কিছু প্রশ্ন দিয়ে গেছে, যাদের উত্তর আজও খুঁজে পাইনি।
আমি তোমাকে দোষী করতে চাই না। তোমার কাছে কোনো ব্যাখ্যাও দাবি করছি না। শুধু একবার জানতে ইচ্ছে করে, তুমি যখন নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে, তখন তোমার হৃদয় কি একবারও তোমাকে থামাতে চেয়েছিল?
যদি চেয়ে থাকে, তবে জেনে রেখো—সেই নীরব প্রতিবাদটুকুই আমার কাছে আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে থাকবে।
আর যদি কোনোদিন তোমার মনে হয়, আমাকে ভালোবেসে তুমি কোনো অপরাধ করেছিলে, তবে নিজের প্রতি এতটা নিষ্ঠুর হয়ো না। ভালোবাসা অপরাধ নয়। তবে ভালোবাসার নামে কাউকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার বিশ্বাস ভেঙে দেওয়াও ভালোবাসা নয়। আমাদের গল্পে হয়তো কোনো সুন্দর পরিণতি ছিল না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে অনুভূতিগুলো মিথ্যা ছিল।
আজও তোমার কথা মনে পড়ে। তবে তোমাকে ফিরে পাওয়ার দাবি নিয়ে নয়। শুধু কখনো কখনো মনে হয়, পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ ছিল, যার কাছে আমি কোনো অভিনয় ছাড়াই নিজের মতো করে থাকতে পেরেছিলাম।
ভালো থেকো, পাখি। তোমার জীবনে এমন শান্তি আসুক, যার জন্য তোমাকে আর নিজের হৃদয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না হয়।
ইতি,
তোমার একসময়ের অর্ণব।”
চিঠি লেখা শেষ করে অর্ণব কলমটা নামিয়ে রাখল।
তারপর জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশের এক কোণে মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখা যাচ্ছে।
অর্ণব চিঠিটা ভাঁজ করে ডায়েরির মধ্যে রেখে দিল।
না, সে চিঠিটা পাঠাবে না।
কারণ ভালোবাসার সব কথা প্রিয় মানুষকে শোনাতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কিছু কথা নিজের ভেতরে রেখে দেওয়াই হয়তো একসময় মুক্তি হয়ে ওঠে।
পরদিন বিকেলে অর্ণব শহরের একটি বইয়ের দোকানে গিয়েছিল। বেরিয়ে আসার সময় হঠাৎ সামনের ফুটপাতে পরিচিত একটি মুখ দেখতে পেল।
পাখি।
তিন মাস পর।
দুজনের চোখাচোখি হলো। পাখি প্রথমে থমকে দাঁড়াল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
— কেমন আছ, অর্ণব?
অর্ণব একটু হাসল।
— ভালো আছি। তুমি?
— আমিও।
দুটি ছোট্ট বাক্য। অথচ এই দুটি বাক্যের পেছনে কত রাতের কান্না, কত অপ্রকাশিত কথা, কত অনিদ্রা জমে ছিল, তা শুধু তারাই জানত।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর পাখি বলল,
— তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?
অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।
— কেন এমন মনে হলো?
— কারণ আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— ঘৃণা করতে হলে হয়তো তোমাকে ভুল বুঝতে হতো। আমি তো তোমাকে বুঝতে চেয়েছিলাম, পাখি। হয়তো পুরোপুরি পারিনি।
পাখির চোখ ভিজে উঠল।
— আমি কি খুব স্বার্থপর ছিলাম?
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— মানুষ যখন নিজের বিবেক আর হৃদয়ের মধ্যে আটকে যায়, তখন তার সিদ্ধান্ত সব সময় সুন্দর হয় না। তুমি তোমার কাছে যেটাকে সঠিক মনে হয়েছিল, সেটাই করেছ। কিন্তু তোমার সিদ্ধান্তে আমার কষ্ট হয়েছে—এই সত্যটাও অস্বীকার করতে পারি না।
পাখি মাথা নিচু করল।
— আমি জানতাম, তুমি কষ্ট পাবে। তবু চলে গিয়েছিলাম।
— জানি।
— তাহলে তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ?
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— ক্ষমা করার জন্য সব সময় কাউকে অপরাধী ভাবতে হয় না। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে, আমাদের বদলে দেয়, তারপর চলে যায়। তাদের চলে যাওয়াটা কষ্টের, কিন্তু সেই কষ্টের জন্য তাদের ঘৃণা করতেই হবে—এমন তো নয়।
পাখি চোখ মুছল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— তুমি কি এখনো আমাকে ভালোবাসো?
প্রশ্নটা শুনে অর্ণবের বুকের ভেতর পুরোনো ব্যথাটা আবার জেগে উঠল।
সে চাইলেই বলতে পারত, না, আর ভালোবাসি না।
চাইলেই বলতে পারত, তোমার জন্য আমার সব অনুভূতি শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু মিথ্যা বলে নিজেকে মুক্ত করার অভ্যাস তার ছিল না।
সে পাখির দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভালোবাসা কি সুইচ, পাখি? চাইলেই বন্ধ করে দেওয়া যায়?
পাখি নীরবে কাঁদছিল।
অর্ণব বলল,
— তবে একটা কথা শিখেছি। কাউকে ভালোবাসা আর তাকে নিজের জীবনে পাওয়ার দাবি করা এক বিষয় নয়। তোমাকে ভালোবাসি বলেই তোমাকে আমার জীবনে ফিরে আসতে হবে, এমন কোনো অধিকার আমার নেই।
— আর যদি আমি ফিরে আসতে চাই?
অর্ণব দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— তাহলে আগে তোমাকে নিজের কাছে ফিরতে হবে। নিজের সিদ্ধান্তের কাছে, নিজের দায়িত্বের কাছে, নিজের সত্যের কাছে। শুধু আমাকে ভালোবাসো বলে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ো না। আর কাউকে কষ্ট দিতে হবে বলে নিজের অনুভূতিকে মিথ্যা বলো না। যা-ই করো, সৎভাবে করো।
পাখি আর কিছু বলতে পারল না।
সেদিন তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল কয়েক মিনিট। তারপর পাখি চলে গেল নিজের পথে, অর্ণবও হাঁটতে শুরু করল অন্যদিকে।
কেউ কাউকে ফিরে আসতে বলেনি।
কেউ কাউকে অপেক্ষা করতে বলেনি।
কিন্তু দুজনেই বুঝেছিল, কিছু সম্পর্কের শেষ মানে অনুভূতির মৃত্যু নয়; কখনো কখনো তার অর্থ হলো—অনুভূতিকে সম্মান করে তার ওপর নিজের অধিকার দাবি করা থেকে সরে আসা।
সেদিন রাতে অর্ণব ডায়েরিটা খুলল। পাখিকে লেখা চিঠির নিচে নতুন কয়েকটি লাইন লিখল—
তোমার বিবেকের কাঠগড়ায় আমি নিথর দাঁড়িয়ে,
আমাকে ফাঁসির সাজা শোনাও পাখি—
তোমাকে ভালোবাসার অপরাধে!
লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে অর্ণবের মনে হলো, এত দিন সে পাখির কাছে নিজের অপরাধের বিচার চেয়েছে। কিন্তু আজ বুঝতে পারছে, ভালোবাসার অপরাধে তার কোনো বিচার হওয়ার কথা নয়।
তবু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
কেন মানুষ এমন কাউকে ভালোবেসে ফেলে, যাকে তার জীবনে পাওয়া সম্ভব নয়?
কেন হৃদয় এমন স্বপ্ন দেখে, যার পরিণতি সম্পর্কে বিবেক আগে থেকেই সতর্ক করে দেয়?
আর কেন কিছু মানুষ একে অপরকে সত্যিই ভালোবেসেও একসঙ্গে থাকতে পারে না?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর অর্ণব খুঁজে পেল না।
সে শুধু ডায়েরির পাতায় শেষ একটি বাক্য লিখল—
“পাখি, তোমার আদালতে আমি অপরাধী হতে পারি, কিন্তু আমার হৃদয়ের কাছে আমি আজও নির্দোষ। কারণ আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, তোমার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়; তোমার সুখের অংশ হওয়ার আশায়।”
তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
অর্ণব জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। একসময় বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগত না তার। এখনো লাগে না।
তবু সে জানালা খুলে দিল।
মৃদু বাতাস এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল।
তার মনে হলো, জীবনের সব ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার জন্য আসে না। কিছু ভালোবাসা আসে মানুষকে গভীর করতে, নিজের ভেতরের অন্ধকার চিনতে শেখাতে, আর বুঝিয়ে দিতে—কাউকে ভালোবাসা মানে শুধু তাকে কাছে পাওয়া নয়; কখনো কখনো তার কাছ থেকে দূরে থেকেও তার মঙ্গল কামনা করতে পারা।
অর্ণব চোখ বন্ধ করল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— ভালো থেকো, পাখি। তোমার বিবেক যেন তোমাকে শান্তি দেয়, আর তোমার হৃদয় যেন কখনো ভালোবাসতে ভয় না পায়।
বৃষ্টির শব্দে কথাগুলো হারিয়ে গেল।
কিন্তু কিছু কথা হারিয়ে গেলেও শেষ হয় না। তারা থেকে যায় স্মৃতির ভেতর, দীর্ঘশ্বাসের ভেতর, পুরোনো চিঠির ভাঁজে, কিংবা কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতে লেখা কয়েকটি কবিতার পঙ্ক্তিতে।
আর সেই পঙ্ক্তিগুলোর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে একজন প্রেমিক—যে আজও অপরাধ স্বীকার করে, অথচ অনুতপ্ত নয়।
কারণ তার অপরাধের নাম ভালোবাসা।
আর সেই ভালোবাসার একমাত্র সাক্ষী—তার নিজের হৃদয়।
বিবেকের কাঠগড়ায় ভালোবাসা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

No comments:
Post a Comment