Wednesday, November 4, 2026

অধিকারহীন মুগ্ধতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

বিকেলটা কেমন যেন ক্লান্তিতে মোড়ানো ছিল। দিনের শেষ আলো ধীরে ধীরে নদীর বুকে মিশে যাচ্ছিল। নদীর ধারে একা বসে আবির আনমনে ফেসবুকের পাতা স্ক্রল করছিল। চারপাশে মানুষের কোলাহল থাকলেও তার মনটা ছিল অনেকটা নিঃসঙ্গ। হঠাৎ স্ক্রল করতে করতে একটি ছবির ওপর এসে থেমে গেল তার আঙুল। ছবিটি স্মৃতির।

সেই চেনা মুখ, শান্ত দুটি চোখ আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মিষ্টি হাসি। কত বছর ধরে এই মুখটি দেখে আসছে আবির! কতবার ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে কত কথা বলেছে, অথচ কখনো বলা হয়ে ওঠেনি।

আবিরের মনে হলো, আজ না হয় কথাগুলো বলা যাক।

সে লিখল—

‘স্মৃতি, আপনার মতো মানুষ সত্যিই খুব কম দেখা যায়। এত বছর ধরে আপনাকে দেখে আসছি, কখনো আপনার চোখেমুখে রাগের ছাপ দেখিনি, দেখিনি কোনো কষ্ট কিংবা দুঃখের প্রকাশ। সব সময় একটা শান্ত, হাসিমাখা মুখ দেখেছি। জানি না, আপনার ভেতরের পৃথিবীটা কেমন, তবে বাইরে থেকে আপনাকে আমার ভীষণ সুন্দর মনের একজন মানুষ বলে মনে হয়েছে।’

কথাগুলো পাঠিয়ে আবির আবার নদীর দিকে তাকাল। খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করেনি। নিছকই মনের মধ্যে জমে থাকা একটি ভালো লাগার প্রকাশ।

কিছুক্ষণ পর মেসেঞ্জারে উত্তর এল।

স্মৃতি লিখেছে—

‘আপনি সুন্দর মনের মানুষ, তাই হয়তো আমাকে এত সুন্দর করে ভাবেন। সবাই অবশ্য বলে, আমি নাকি আমার মায়ের মতো হয়েছি। মা অনেক শান্ত স্বভাবের ছিলেন। কিন্তু জন্মের পর আর মাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি।’

শেষ কথাটি পড়ে আবিরের আঙুল থেমে গেল। এতক্ষণ যে মানুষটিকে সে সব সময় হাসিমুখে দেখে এসেছে, সেই হাসির আড়ালে যে এমন এক শূন্যতা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা তার জানা ছিল না।

জন্মের পর মাকে হারানো—কথাটা আবিরের বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা বিষণ্নতার রেখা টেনে দিল।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিখল—

‘আপনার কথাটা শুনে সত্যিই মন খারাপ হলো। দুঃখিত, আপনার জীবনের এই কষ্টের জায়গাটা আমার জানা ছিল না। তবে আপনার জীবনের গল্পগুলো একদিন শুনতে চাই। শুধু ভালো থাকার গল্প নয়, কষ্টের গল্পগুলোও। মানুষকে জানতে হলে তার হাসির পাশাপাশি নীরবতাকেও জানতে হয়।’

স্মৃতি উত্তর দিল—

‘বলব একসময়।’

ব্যস, সেদিনের মতো কথার ইতি।

কিন্তু সেদিনের সেই ছোট্ট কথোপকথন আবিরের মনে অনেক বড় একটা অনুভূতির জন্ম দিল।

এরপর থেকে মাঝেমধ্যে তাদের কথা হয়। কখনো জীবন নিয়ে, কখনো কাজকর্ম নিয়ে, কখনো খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে। কথার মধ্যে কোনো বিশেষ আয়োজন থাকে না। থাকে না কোনো আনুষ্ঠানিকতা। কখনো দু-একটি বাক্য, কখনো দীর্ঘ আলাপ। তবু সেই কথাগুলোর মধ্যে আবির একধরনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পায়।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত বছরের পরিচয় থাকা সত্ত্বেও আগে কখনো এভাবে কথা হয়নি তাদের। মানুষকে অনেক বছর ধরে চেনা যায়, অথচ তার সঙ্গে মনের পরিচয় হতে কখনো কখনো একটি বিকেলই যথেষ্ট।

আবিরের স্মৃতির প্রতি ভালো লাগা অবশ্য নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই তার প্রতি একধরনের মুগ্ধতা কাজ করত। স্মৃতির শান্ত স্বভাব, কথা বলার সরলতা, বিনয় আর হাসিমাখা উপস্থিতি তাকে আকৃষ্ট করত। তবে সেই মুগ্ধতা কখনো প্রকাশ করার প্রয়োজন অনুভব করেনি সে।

কিন্তু মানুষের মনের সব অনুভূতি কি আর চিরকাল আড়াল করে রাখা যায়?

আবির জানে, স্মৃতি তার সংসার নিয়ে সুখে আছেন। তার সন্তান আছে, স্বামী আছে, সাজানো একটি পারিবারিক জীবন আছে। সেই জীবনের প্রতি আবিরের যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। সে কখনোই চায় না, তার কোনো অনুভূতি স্মৃতির সুন্দর জীবনে অস্বস্তি কিংবা অশান্তির কারণ হয়ে উঠুক।

তবু কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলো প্রকাশের জন্য অধিকার লাগে না; লাগে শুধু মনের স্বচ্ছতা আর অন্য মানুষটির প্রতি সম্মান।

অনেক ভেবেচিন্তে একদিন আবির নিজের মনের কথাটা জানিয়ে দিল।

সে বলল, স্মৃতির প্রতি তার একটা ভালো লাগা আছে, আছে দীর্ঘদিনের মুগ্ধতা। তবে সেই ভালো লাগার মধ্যে কোনো দাবি নেই, কোনো প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। সে শুধু চায়, তাদের মধ্যে এমন একটি সুন্দর সম্পর্ক থাকুক, যেখানে দুজন মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারবে, একে অন্যের ভালো লাগা ও মন্দ লাগার জায়গাগুলো বুঝতে চেষ্টা করবে।

যে সম্পর্কে ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু অধিকার ফলানোর চেষ্টা থাকবে না। থাকবে মায়া, কিন্তু কোনো বাঁধন থাকবে না। থাকবে আন্তরিকতা, কিন্তু কোনো অস্বস্তি কিংবা জবাবদিহি থাকবে না।

আবিরের আশঙ্কা ছিল, কথাগুলো শুনে হয়তো স্মৃতি অস্বস্তিতে পড়বে। হয়তো আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে না। কিন্তু স্মৃতি বিষয়টি বেশ সহজভাবেই গ্রহণ করল। তার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় আবির স্বস্তি পেল।

ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটি সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হলো।

আবির বুঝতে পারল, সে আসলে এমন একটি সম্পর্কই চেয়েছিল। যেখানে কাউকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকবে না, অথচ মানুষটি নিজের মতো করেই জীবনের গল্পে থেকে যাবে। যেখানে প্রতিদিন কথা না হলেও একধরনের আন্তরিকতা থাকবে। যেখানে কেউ কারও ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা অতিক্রম করবে না, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে দুজন দুজনের কথা শোনার মতো মানুষ হয়ে উঠবে।

আবিরের কাছে এই সম্পর্কের সৌন্দর্য এখানেই।

সে স্মৃতিকে নিয়ে কোনো স্বপ্নের জগৎ তৈরি করতে চায় না। বরং স্মৃতি যে জগতে আছেন, সেই জগতের প্রতি সম্মান রেখেই তার জীবনের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকতে চায়।

কখনো স্মৃতির মন খারাপ হলে সে যেন আবিরকে বলতে পারেন। কখনো কোনো আনন্দের ঘটনা ঘটলে নির্দ্বিধায় ভাগ করে নিতে পারেন। কখনো নিজের জীবনের কোনো অজানা গল্প বলতে ইচ্ছে করলে আবির যেন একজন মনোযোগী শ্রোতা হয়ে থাকতে পারে।

আবির জানে, সব মানুষের জীবনে এমন কিছু কষ্ট থাকে, যেগুলো কাউকে বলা যায় না। কিছু শূন্যতা থাকে, যেগুলো কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না। স্মৃতির জীবনে মায়ের না থাকার যে শূন্যতা, সেটি হয়তো কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। তবু সে চায়, স্মৃতির জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসুক, যেখানে পুরোনো কষ্টগুলো কিছুক্ষণের জন্য হলেও আড়ালে চলে যাবে।

সে চায়, স্মৃতি হাসুক। মন খুলে কথা বলুক। নিজের জন্য একটু সময় বের করুক। সংসার, সন্তান, দায়িত্ব আর প্রতিদিনের ব্যস্ততার বাইরে নিজেরও যে একটি আলাদা মন আছে, সেই মনটাকেও একটু গুরুত্ব দিক।

আর আবির?

আবির হয়তো নদীর ধারে বসে কোনো এক ক্লান্ত বিকেলে আবারও স্মৃতির ছবি দেখবে। হয়তো মনে মনে ভাববে, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে জীবনের পথচলা হয় না, পাশাপাশি বসে গল্প করা হয় না, তবু তাদের উপস্থিতি মনের ভেতর একধরনের প্রশান্তি তৈরি করে।

সব ভালো লাগার পরিণতি ভালোবাসার অধিকার হয়ে উঠতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিছু ভালো লাগা দূরত্বের মধ্যেও সুন্দর থাকে। কিছু মুগ্ধতা প্রকাশের পরও পবিত্রতা হারায় না, যদি সেখানে সম্মান, সংযম আর সীমারেখার প্রতি শ্রদ্ধা থাকে।

আবির তাই স্মৃতিকে কোনো সম্পর্কে বাঁধতে চায় না। শুধু চায়, সম্পর্কটির যত্ন নিতে। কারণ তার কাছে স্মৃতি কেবল একজন পরিচিত মানুষ নন; তিনি দীর্ঘদিনের এক নীরব মুগ্ধতার নাম, এক শান্ত বিকেলের অনুভূতি, কিছু নির্ভার কথোপকথনের আশ্রয়।

কোনো একদিন হয়তো স্মৃতি তার জীবনের অনেক অজানা গল্প বলবেন। আবির মন দিয়ে শুনবে। হয়তো কোনো গল্পে হাসবে, কোনো গল্পে বিষণ্ন হবে। কিন্তু কোনো গল্পের শেষেই সে স্মৃতির জীবনে নিজের জন্য আলাদা কোনো জায়গা দাবি করবে না।

কারণ আবির বিশ্বাস করে—

সব সম্পর্কের নাম হয় না, সব অনুভূতির পরিণতি হয় না, আর সব ভালোবাসার গন্তব্য অধিকার হতে হয় না। কিছু মানুষকে শুধু সুন্দরভাবে মনে রাখতে হয়, কিছু সম্পর্ককে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

স্মৃতির প্রতি আবিরের চাওয়াটাও ঠিক তেমন।

স্মৃতি তাঁর নিজের পৃথিবীতে ভালো থাকুন, হাসিখুশি থাকুন। আর সেই পৃথিবীর বাইরে কোথাও একজন মানুষ থাকুক, যে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই তাঁর ভালো থাকার খবর শুনে মনে মনে স্বস্তি পাবে।

হয়তো এটাই আবিরের কাছে অধিকারহীন মুগ্ধতার সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা।


অধিকারহীন মুগ্ধতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন