বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে মোতাহার হোসেন চৌধুরীর ‘সংস্কৃতি-কথা’ একটি অনন্য ও মননশীল সংযোজন। এটি নিছক সংস্কৃতি-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন নয়; বরং মানুষের জীবন, চিন্তা, সৌন্দর্যবোধ, ধর্ম, নৈতিকতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ঘিরে এক মুক্তবুদ্ধির দার্শনিক অনুসন্ধান। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের আবহে রচিত এই গ্রন্থ বাঙালির চিন্তার জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তার আবেদন আজও অম্লান। প্রাবন্ধিক অন্নদাশঙ্কর রায় গ্রন্থটিকে বাংলা ভাষার একটি ‘বাতিঘর’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন—যে অভিধা গ্রন্থটির মননশীল তাৎপর্যকে যথার্থভাবেই নির্দেশ করে।
সংস্কৃতি কী?
‘সংস্কৃতি-কথা’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান সম্ভবত—সংস্কৃতি আসলে কী? মোতাহার হোসেন চৌধুরীর কাছে সংস্কৃতি কোনো বাহ্যিক আচার, পোশাক-পরিচ্ছদ কিংবা কেবল বিদ্যাশিক্ষার নাম নয়। তাঁর ভাষায়, “সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা।” অর্থাৎ সংস্কৃতি মানুষের জীবনকে কেবল নিয়ন্ত্রিত করে না, তাকে পূর্ণতা দেয়; জীবনকে করে তোলে অর্থবহ, সুন্দর ও আনন্দময়।
এই ভাবনাটিই তিনি আরও গভীরভাবে প্রকাশ করেছেন তাঁর বহুল উদ্ধৃত উক্তিতে—
“এ জীবনে যা না হলে আমরা বাঁচি না, তা–ই আমাদের সভ্যতা, আর যার জন্য বাঁচি তাই সংস্কৃতি।”
সভ্যতা যেখানে মানুষের জীবনধারণের প্রয়োজন মেটায়, সংস্কৃতি সেখানে জীবনের অর্থ ও সৌন্দর্য অনুসন্ধান করে। ফলে সংস্কৃতি মানুষের বেঁচে থাকার উপকরণ নয়, বরং বেঁচে থাকার গভীরতর তাৎপর্য।
ধর্ম ও সংস্কৃতি: দুটি পথ, এক মানবিক অনুসন্ধান:
গ্রন্থটির অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো ধর্ম ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ। তিনি ধর্ম ও সংস্কৃতিকে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিশীলিত করার দুটি ভিন্ন পথ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য—
“ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার এবং কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ধর্মের সামাজিক ভূমিকা এবং সংস্কৃতির ব্যক্তিমানসিক ভূমিকার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। ধর্ম সাধারণ মানুষের জীবনকে বাহ্যিক বিধি-নিষেধ, বিশ্বাস ও পরকালচেতনার মাধ্যমে পরিচালিত করে; অন্যদিকে সংস্কৃতি মানুষের ভেতরে এমন এক বিবেক ও সৌন্দর্যচেতনা সৃষ্টি করে, যা তাকে বাইরের আদেশের অপেক্ষা না করে নিজের অন্তর্গত বোধ দ্বারা পরিচালিত হতে শেখায়।
সংস্কৃতিবান মানুষের কাছে তাই নৈতিকতা কোনো চাপিয়ে দেওয়া বিধান নয়; তা তার অন্তর্গত চেতনার স্বাভাবিক প্রকাশ। প্রেম, সৌন্দর্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে সে জীবনের অর্থ আবিষ্কার করতে চায়।
আদেশ নয়, অনুপ্রেরণার জীবন:
মোতাহার হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতিবান মানুষ আদেশের অনুগত মানুষ নন; তিনি অনুপ্রেরণায় পরিচালিত মানুষ। তাঁর নৈতিকতা ভয়ভিত্তিক নয়, মানবিক চেতনাভিত্তিক। তিনি অন্যায়কে ভয় করেন না শুধু শাস্তির কারণে; বরং অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করেন নিজের বিবেকের তাড়নায়।
এই মানুষ অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে অন্য মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ খুঁজে নেয়। তার কাছে জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতিযোগিতা নয়—বরং অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক, সৌন্দর্যের অনুভব এবং মানবিক আনন্দের অংশীদার হওয়ার একটি সুযোগ।
লক্ষ্য নয়, উপায়েরও মূল্য আছে:
গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক বক্তব্য হলো—লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে লক্ষ্য অর্জনের উপায়ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ মানুষ যে পথে নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছায়, সেই পথই তার চরিত্র নির্মাণ করে। কোনো মহৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনৈতিক বা নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করলে শেষ পর্যন্ত সেই অর্জন মানুষের নৈতিক সত্তাকে সমৃদ্ধ করতে পারে না।
অর্থাৎ সংস্কৃতি শুধু কী অর্জন করছি—এই প্রশ্ন করে না; একই সঙ্গে প্রশ্ন করে, কীভাবে অর্জন করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিজীবন থেকে সামাজিক জীবন—সব ক্ষেত্রেই গভীর তাৎপর্য বহন করে।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মবিকাশ:
মোতাহার হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতিচিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিমানুষের মুক্তি ও আত্মবিকাশ। সমাজ কী বলছে, অন্যেরা কী করছে কিংবা প্রচলিত রীতি কী নির্দেশ করছে—এসবের অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং নিজের প্রতিভা, রুচি ও সৌন্দর্যবোধকে আবিষ্কার করাই তাঁর কাছে সংস্কৃতিমান হওয়ার অন্যতম শর্ত।
তাঁর চিন্তায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কখনো স্বার্থপরতার সমার্থক নয়। বরং নিজের স্বকীয়তাকে বিকশিত করে মানুষকে আরও মানবিক, উদার ও সৌন্দর্যসচেতন করে তোলাই এর লক্ষ্য। তাই ব্যক্তির মুক্তি শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর মানবমুক্তির সঙ্গেই যুক্ত।
মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদের দীপ্তি:
মোতাহার হোসেন চৌধুরী ছিলেন ‘শিখা’ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত—যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের মূল চেতনা ছিল জ্ঞান, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার বিকাশ। সেই মুক্তবুদ্ধির দীপ্তি তাঁর প্রবন্ধে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। অন্ধ অনুকরণ, কুসংস্কার কিংবা প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ না করে তিনি মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর চিন্তায় উদার মানবতাবাদ, যুক্তিবোধ, সৌন্দর্যপ্রীতি এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। দেশি-বিদেশি নানা মনীষীর চিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তাঁর মননকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ক্লাইভ বেল ও বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো চিন্তকের প্রভাব তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভাবনায় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
ভাষা ও শিল্পরীতি:
মোতাহার হোসেন চৌধুরীর প্রবন্ধের আরেকটি বড় শক্তি তাঁর ভাষা ও উপস্থাপনভঙ্গি। তাঁর ভাষা একদিকে মার্জিত ও বুদ্ধিদীপ্ত, অন্যদিকে স্বচ্ছ ও সহজবোধ্য। জটিল দার্শনিক প্রশ্নকে তিনি এমন সাবলীল ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন যে তা নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা হয়ে ওঠেনি; বরং পাঠকের ব্যক্তিগত জীবন ও চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
রচনাশৈলীতে প্রমথ চৌধুরীর মুক্তবুদ্ধি, বৈদগ্ধ্য ও রসবোধের প্রভাবও লক্ষ করা যায়। ফলে তাঁর প্রবন্ধে যুক্তি যেমন আছে, তেমনি আছে সাহিত্যিক সৌন্দর্য; দর্শন যেমন আছে, তেমনি আছে জীবনের উষ্ণতা।
আজকের পাঠকের কাছে ‘সংস্কৃতি-কথা’:
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তি, সামাজিক সম্পর্ক ও জীবনদর্শনের অনেক উপাদান। কিন্তু মানুষ কীভাবে সুন্দরভাবে বাঁচবে, কীভাবে নিজের বিবেক ও সৌন্দর্যবোধকে বিকশিত করবে, কীভাবে মুক্তভাবে চিন্তা করবে এবং কীভাবে মানবিক হয়ে উঠবে—এই প্রশ্নগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
এই জায়গাতেই ‘সংস্কৃতি-কথা’র চিরকালীন গুরুত্ব। গ্রন্থটি সংস্কৃতির একটি সংজ্ঞা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পাঠককে নিজের জীবন, বিশ্বাস, নৈতিকতা ও চিন্তাকে নতুন করে পরীক্ষা করতে শেখায়। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে মানুষকে প্রেম, সৌন্দর্য, আনন্দ, যুক্তি ও মানবিকতার আলোকে জীবনকে দেখার আহ্বান জানায়।
সব মিলিয়ে, ‘সংস্কৃতি-কথা’ বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মননশীল গ্রন্থ, যার আবেদন কেবল তার সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে দর্শনের গ্রন্থ, জীবনবোধের গ্রন্থ এবং আত্মজিজ্ঞাসার গ্রন্থ। যে পাঠক বইটি পড়েন, তিনি কেবল ‘সংস্কৃতি’ সম্পর্কে কিছু ধারণা লাভ করেন না—বরং নিজের জীবনযাপন, চিন্তা ও মানবিকতার অর্থ নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। আর এখানেই মোতাহার হোসেন চৌধুরীর প্রবন্ধের স্থায়ী সার্থকতা।
বই: সংস্কৃতি-কথা
লেখক: মোতাহার হোসেন চৌধুরী

