আমি শহরের এক পুরনো এলাকায় নতুন ফ্ল্যাটে উঠলাম। ফ্ল্যাটটা বড় নয়, তবে নিরিবিলি। চারদিকে নির্জনতা, স্যাঁতসেঁতে বাতাস আর পুরনো কাঠের ফার্নিচারের গন্ধ। সব ঠিকঠাকই চলছিল, যতক্ষণ না আমি ভেসিনের পাশে রাখা ছোট্ট গ্লাসে পড়ে থাকা একটা কালো টিপ খুঁজে পাই।
টিপটা দেখে অদ্ভুত অনুভূতি হয়। মনে হলো, আমি একা নেই। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মাঝেমাঝে মনে হয়, কেউ ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
---
প্রথম কয়েকদিন রাতে ঘুম ভেঙে যেত অকারণে। বাথরুমের দরজাটা একটু খোলা থাকত, কখনো কখনো দরজার নিচ দিয়ে আলো গলে আসত—যা আমি নিভিয়েই রেখেছিলাম। এক রাতে দেখি, আয়নায় কোনো প্রতিফলন নেই আমার। শুধু একটা টিপ আর একজোড়া চোখ যেন আয়নার ভেতর থেকে আমায় দেখছে।
আমি বিষয়টা বাড়িওয়ালাকে জানালে তিনি চুপ করে গেলেন। শুধু বললেন,
“বাড়িটা পুরনো। কারও কারও মনে হতে পারে কিছু আছে…”
আমি বিষয়টিকে কুসংস্কার ভেবে এড়িয়ে গেলাম। কিন্তু সত্যি কি তা এড়ানো যায়?
---
তদন্ত শুরু করলাম। আশেপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বললাম। এক বৃদ্ধা বললেন,
“আগে এখানে এক মেয়ে থাকত। তার স্বামী মারা যায় বিয়ের পরদিনই। মেয়েটা ভেঙে পড়ে। ওকে সবাই ‘বৌদি’ বলে ডাকত। খুব চুপচাপ ছিল। ঠিক যেমন ভালোবাসার অতিরিক্ত গভীরতা মানুষকে পুড়িয়ে ফেলে...”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর?”
তিনি ধীরে বললেন,
“হঠাৎ একদিন সে নিখোঁজ হয়ে যায়। খোঁজাখুঁজি করেও কিছু পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘরে যা পাওয়া গিয়েছিল, তা আজও আমরা ভুলতে পারিনি—বাথরুমের আয়নায় লেখা ছিল রক্ত দিয়ে: ‘সে ফিরে আসবে টিপের ছায়ায়।’”
---
আমি স্থানীয় পুরনো এক ইতিহাসবিদের কাছে গেলাম। তাকে কালো টিপের কথা বলতেই সে থমকে গেল।
“এই রকম এক কালো টিপের কিংবদন্তি আছে,” সে বলল, “কোনো এক কালে, এক নববধূ নিজের স্বামীকে হারিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল। সে আয়নার সামনে বসে প্রতিদিন সেই টিপ পরত, কপালে লাগিয়ে বলত, ‘তুমি ফিরে এসো, আমি এখানেই আছি।’ একদিন সে আয়নার ভিতরেই হারিয়ে যায়। বলা হয়, তার আত্মা সেই টিপের ভেতর বন্দি। যে সেই টিপ ছোঁবে, সে তার গল্পের পরবর্তী চরিত্র হয়ে যাবে।”
আমি ভয় পেলাম। মনে পড়ল—আমি টিপটা একবার ছুঁয়ে ছিলাম।
---
এক রাতে আয়নার সামনে সেই নারীকে আবার দেখলাম। এবার সে স্পষ্ট। চোখে জল, ঠোঁটে বিষণ্নতা।
সে বলল,
“আমি ফিরে এসেছি… কিন্তু কেউ আমাকে শোনেনি। আমার গল্প কেউ লেখেনি। তুমি কি পারবে আমাকে শেষ করতে?”
আমি চুপ করে থাকলাম। সে এগিয়ে এলো, হাতে সেই টিপ।
"এই টিপটা শুধু সাজ নয়," সে বলল, "এটা আমার অভিশাপ। যে এটা ছোঁবে, সে আমার কাহিনী বহন করবে... মৃত্যুর ওপারে, আয়নার অন্যপারে।"
আমি জ্ঞান হারালাম।
---
তিন দিন পর আমার জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে। ডাক্তার বলল, আমি নিজের ঘরের আয়নার সামনে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলাম। মুখে একটাও শব্দ ছিল না, কিন্তু হাতে আঁকা ছিল রক্ত দিয়ে—"শেষ হয়নি এখনো..."
বাসায় ফিরে দেখি—টিপটা নেই।
কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ালে, এখনও মাঝেমাঝে মনে হয়… পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে, চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
অসাধারণ! প্রথম পর্বের রহস্যময়, ভয় আর বেদনার গল্পকে আমরা এখন এগিয়ে নিয়ে যাবো দ্বিতীয় পর্বে — যেখানে প্রধান চরিত্র নিজেই টিপের প্রভাবে নতুন এক অজানা জগতে পা রাখে। এখানে থাকবে অতিপ্রাকৃত ঘটনার বিস্তার, অতীতের ইতিহাস উন্মোচন, আর নতুন এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ছায়া...
---
ঘটনার পর তিন মাস কেটে গেছে। আমি বাসা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু মুক্তি মেলেনি।
রাতে ঘুমালে একই স্বপ্ন দেখি—এক আয়না, আর তার ভিতরে বৌদির মতো দেখতে আরেকজন, কিন্তু মুখটা পুরো আলাদা। তার কপালেও সেই একই কালো টিপ।
সে শুধু বলে,
“তুমি টিপ ছুঁয়েছো। তুমি এখন আয়নার ঋণী।”
একদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি, ঘরের দেয়ালে আঁচড়ের দাগে লেখা—
“তুমি কি সত্যিই মুক্ত?”
---
ঘটনা থেকে মুক্তি পেতে আমি পুরনো এলাকার এক তান্ত্রিক দোকানে যাই। দোকানের নাম "আয়নার ঘর"। বৃদ্ধ দোকানদার আমার দিকে না তাকিয়ে বলল—
“তোমার চোখে আয়নার ছায়া আছে। তুমি টিপ ছুঁয়েছো, তাই আয়নার ভেতরের ‘তৃতীয় নারী’ এখন তোমার ছায়া চায়।”
আমি বিস্মিত: “তৃতীয় নারী? বৌদি তো একজনই ছিল!”
বৃদ্ধ হেসে উঠল,
“প্রথম নারী সেই নববধূ, যে আয়নার মধ্যে হারিয়ে যায়। দ্বিতীয় নারী, যাকে তুমি বৌদি বলো, সে ছিল তার উত্তরসূরি—যাকে টিপ বেছে নেয়। আর এখন তুমি—তৃতীয় নারী নয়, তৃতীয় বাহক। টিপ তার গল্প বলায় বিশ্বাস করে। আর গল্প কখনো শেষ হয় না, যতক্ষণ না... কেউ শেষ করে দেয়।”
---
সেই রাতে, আমি আবার ঘুমোতে পারলাম না। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই বাতি নিভে গেল। এক ঝলক হাওয়া, আয়নার কাচ কুয়াশার মতো ধূসর হয়ে উঠল।
হঠাৎই, আয়নার ভিতর থেকে হাত বাড়িয়ে এলো এক নারী। ধীরে ধীরে আমি আয়নার দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছিলাম।
চোখ খুলতেই দেখি—আমি আর আমার ঘরে নেই।
আমি আয়নার ভেতরে।
চারদিক কুয়াশা, অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে অস্পষ্ট ছায়া, প্রত্যেকের কপালে টিপ। তারা ফিসফিস করে বলছে—
“তুমি আমাদের শেষ না করলে, আমরাই তোমাকে শেষ করবো।”
---
হেঁটে হেঁটে আমি পৌঁছালাম এক পুরনো ঘরে—একখানা চেয়ারে বসে আছে সেই প্রথম নারী। চোখ ফাঁকা, ঠোঁটে ছোপ ছোপ রক্ত।
সে বলল,
“আমি টিপের স্রষ্টা। একটিমাত্র আবেগ আমাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল—প্রেম। কিন্তু সে প্রতারণা করেছিল। আমি আয়নাকে বানিয়েছিলাম প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে। যারা টিপ ছোঁবে, তারা আমার দুঃখ বহন করবে।”
আমি কাঁপা কণ্ঠে বলি, “তাহলে আমাকে মুক্তি দাও!”
সে হাসে,
“তুমি চাইলে আমাকে থামাতে পারো। শুধু তোমাকে দিতে হবে একটি আত্মা... একটি প্রেম।”
---
সে বলল,
“তুমি যদি কাউকে এই টিপ দাও, আর সে তা ছোঁয়, তাহলে তুমি মুক্ত। তবে সে সেই চক্রে ঢুকে পড়বে।”
আমি ধাক্কা খেলাম—এক নিষ্পাপ কাউকে এই অভিশাপে ঠেলে দিতে হবে?
আমার হাতে তুলে দেওয়া হলো সেই টিপ। কালো, চকচকে, আর অদ্ভুত গরম।
আমি আয়নার বাইরে ফিরে এলাম।
---
আমি এখন আর আগের আমি নই। আয়নার ছায়া আমার চোখে। আমি বুঝে গেছি—এ গল্প আমার একার না, এটা সময়ের গল্প, অভিশপ্ত প্রেমের গল্প।
আমার ডেস্কে রাখা আছে সেই টিপ।
বন্ধুরা আসে, আড্ডা দেয়। একদিন একজন বলল, “এই টিপটা দারুণ সুন্দর! আমি একটু ছুঁই?”
আমি চুপ করে থাকি।
হয়তো আমি আর মুক্তি চাই না।
হয়তো আমি নিজেই এখন আয়নার প্রহরী।
হয়তো…

কালো টিপের ঘ্রাণ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
No comments:
Post a Comment