Sunday, December 28, 2025

শহিদ ওসমান হাদির একমাত্র কাব্যগ্রন্থ “লাভায় লালশাক পুবের আকাশ” -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

শহিদ শরীফ ওসমান বিন হাদির লেখা একমাত্র কাব্যগ্রন্থের নাম “লাভায় লালশাক পুবের আকাশ।”

কাব্যগ্রন্থটি তিনি সীমান্ত শরিফ নামে লিখেছেন।প্রকাশিত হয় — ২০২৪ সালের বইমেলায়। কাব্যগ্রন্থটিতে কবিতা আছে — ৩২টি।

লেখক আসিফ মাহমুদ বইটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তার কাব্যগ্রন্থের কবিতামালায় আলাপ তুলেছেন, মুসলিমদের ঈমানের অংশ আল কুদস নিয়ে, বিবরণ দিয়েছেন নির্যাতনের, দ্রোহ তুলেছেন পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ইয়াহুদীদের প্রতি। আলাপ তুলেছেন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। এই বয়সে এসে কবির বেশ করে মনে পড়লো ছাত্রাবাসের দিনগুলির কথা। একটি কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন–মৃত্যুর পরে তার মায়ের আবদার, বাবাকে নিয়ে আলাপ তুলেছেন অন্য একটি কবিতায়। তার কাব্যগ্রন্থে প্রেম, প্রীতি, ভালবাসাও স্থান পেয়েছে ভীষণভাবে।’

‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’ কবিতায় কবি তাকে হত্যা করার আকুতি জানিয়েছেন। ফুটিয়ে তুলেছেন মুদ্রাস্ফীতি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতি। তিনি বলেছেন, দোজখের ভয়ে তিনি আত্মহত্যা করতে চান না। তাই এই রাষ্ট্র নামক জাহান্নামে তাকে হত্যা করা হোক।

‘মায় মরণের ছবি আঁকে’ কবিতায় তার মায়ের সঙ্গে আলাপ করছেন। মৃত্যুর পরে কবি যেন মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সুরা পাঠ করেন। তবে কবির আকুতি হলো, আলিফের মতো মায়ের শরীরটা বাঁকা হয়ে গেলেও মা যেন আর ক’টা দিন বেঁচে থাকেন। মাটির চুলায় রান্না করেন। মৃত্যু হলে যেন দু’জনের একসঙ্গেই হয়। তাই তো এ কবিতায় মায়ের প্রতি নিদারুণ ভালোবাসা ফুটে উঠেছে।

‘আকসার কয়লা’ কবিতায় গাজার বিমর্ষ চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন—‘মায়েরা বাচ্চাদের পায়ে নাম লিখে রাখছে। যেন লাশ হওয়ার পরে চিনতে পারে’। কবি এই কবিতায় বাইতুল মাকদিসের মুক্তি প্রত্যাশা করেছেন। কবির ভাষায়, ‘আল্লা গো, আদি কেবলা আকসার দোহাই/ গাজার শিশুদের দিকে একটু তাকাও—/ আরশ থেকে ওদের ছেঁড়া কলিজা কি দেখা যায় না?’

‘সার্বভৌমত্ব’ শিরোনামের কয়েক লাইনের কবিতাটি খুব উপলব্ধির। তিনি মায়ের সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্বকে তুলনা করেছেন। তিনি যেমন সব সময় মায়ের আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকতে চান; তেমনই সব সময় মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হোক—এটাই কামনা করেছেন। এই কবিতায় নাগরিকদের অধিকারের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

‘বোডিং’ কবিতায় পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়ার স্মৃতি তুলে ধরেছেন। চৈত্র মাসে রোদের মধ্যে বাবা আসবাবপত্র মাথায় নিয়ে রওয়ানা হয়েছেন ছাত্রাবাসের দিকে। কবি পাঠশালায় হাজির হওয়ার পর পুরোনা শিক্ষার্থীরা ভয় দেখাচ্ছিলেন। কবি আরও বলেছেন, ‘অসুখ হলে ছুটি নাই। কাঁদলে নাম কাটা।’

‘প্রেমোগ্রাফি’ কবিতায় প্রেম বলতে বুঝিয়েছেন, শত লাবণ্যে হৃদয়ে চিড় ধরার প্রত্যাবর্তনের মতো। কবি অর্ধাঙ্গিনীর শূন্য ডিসটেন্সকে প্রেম বলেছেন। তিনি মনে করেন প্রেমের কোনো বিছানা হয় না। প্রেম বলতে বোঝেন একটি প্রতিরোধের আঙিনা। অবৈধ প্রেমকে সাহারা মরুভূমি ও পাপের প্রাসাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তথ্যসূত্রঃ জাগোনিউজ।

 

বই: লাভয় লালসাক পুরের আকাশ
লেখক: ওসমান হাদি
প্রকাশক: দুয়ার

মূল্য: ২০০ টাকা

জীবন পাল্টে দিতে পড়ুন Turning Points -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ড. এ পি জে আবদুল কালামের Turning Points মূলত তাঁর আত্মজীবনের দ্বিতীয় পর্ব, যেখানে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকাল এবং তার পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা, দ্বিধা, সিদ্ধান্ত ও আত্মসমালোচনার বিবরণ তুলে ধরেছেন। Wings of Fire যেখানে স্বপ্ন নির্মাণের গল্প, সেখানে Turning Points হলো স্বপ্ন রক্ষার কঠিন বাস্তবতার দলিল।
 
✦ ‘টার্নিং পয়েন্ট’—একটি দার্শনিক ধারণা
কালামের কাছে টার্নিং পয়েন্ট মানে হঠাৎ সাফল্য নয়, বরং দায়িত্বের মুহূর্ত। তিনি লিখেছেন—
“Life is a difficult game. You can win it only by retaining your birthright to be a person.”
এই উক্তির মাধ্যমে লেখক বোঝাতে চান, জীবনের প্রতিটি সংকট আমাদের মানবিকতা রক্ষা করার পরীক্ষা নেয়। ক্ষমতা, পদ বা সাফল্যের চেয়েও মানুষের পরিচয় বড়—এটাই তাঁর দর্শনের মূল কথা।
 
✦ নেতৃত্ব: ক্ষমতা নয়, দায়বদ্ধতা
রাষ্ট্রপতির মতো সর্বোচ্চ পদেও কালাম নিজেকে জনগণের অভিভাবক হিসেবে দেখেছেন, শাসক হিসেবে নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন—
“Leadership is about taking responsibility, not making excuses.”
এই বক্তব্য বইটির নেতৃত্ব-দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি দেখান, সত্যিকারের নেতা সংকট এলে দায় এড়িয়ে যান না, বরং সিদ্ধান্তের ভার নিজ কাঁধে নেন—যা সমকালীন রাজনীতির জন্যও এক শক্তিশালী নৈতিক বার্তা।
 
✦ ব্যর্থতা ও আত্মসমালোচনা
Turning Points–এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কালামের নির্ভীক আত্মসমালোচনা। তিনি ব্যর্থতাকে গোপন করেননি, বরং তা থেকে শেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়—
“Failure will never overtake me if my determination to succeed is strong enough.”
এই উক্তি ব্যর্থতাকে ভয় নয়, আত্মগঠনের উপকরণ হিসেবে চিহ্নিত করে। বিশেষত শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য এটি গভীর অনুপ্রেরণার উৎস।
 
✦ সিদ্ধান্ত ও নৈতিক সংকট
বইয়ের নানা অংশে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বিভিন্ন নৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটে কালাম কীভাবে নিজের বিবেককে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেন—
“In matters of conscience, the law of the majority has no place.”
এই উক্তির মধ্য দিয়ে কালাম সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও নৈতিক সত্যকে গুরুত্ব দেন—যা তাঁকে একজন রাষ্ট্রনায়ক থেকে দার্শনিকে উন্নীত করে।
 
✦ শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
কালামের সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিলো তরুণ সমাজ। বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন—
“Dream, dream, dream. Dreams transform into thoughts and thoughts result in action.”
এই উক্তি কেবল প্রেরণামূলক নয়, বরং তাঁর জীবনদর্শনের সারাংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন—জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিক্ষিত, নৈতিক ও স্বপ্নবান তরুণদের ওপর।
 
✦ ভাষা ও রচনাশৈলী
বইটির ভাষা সরল, কিন্তু চিন্তায় গভীর। কোথাও আবেগের অতিরঞ্জন নেই, নেই আত্মপ্রশংসা। বরং রয়েছে এক ধরনের সংযত আত্মদর্শন। বিজ্ঞানী হিসেবে যুক্তিবোধ এবং দার্শনিক হিসেবে মানবিকতা—এই দুইয়ের সম্মিলনেই বইটির সৌন্দর্য।
 
Turning Points কেবল একটি আত্মজীবনী নয়; এটি জীবনের সংকটময় মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নৈতিক নির্দেশিকা। এই বই আমাদের শেখায়—
মানুষ তার পদ দিয়ে নয়, তার সিদ্ধান্ত দিয়েই স্মরণীয় হয়।
ড. এ পি জে আবদুল কালামের এই গ্রন্থ পাঠককে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠতে অনুপ্রাণিত করে।
 
 

বইঃ Turning Points: A Journey Through Challenges
লেখকঃ এ পি জে আবদুল কালাম

'পুনশ্চ ' নিয়ে কিছু কথা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

রবীন্দ্রনাথকে বহুভাবে আবিষ্কার করবার কলা-কৌশল বাঙালি বহুদিন থেকে কখনো এককভাবে কখনো সামগ্রিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ অব্যাহত প্রচেষ্টা ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে আরো মহিমান্বিত ও ঔজ্জ্বল্য দান করেছে।

রবীন্দ্রনাথ সর্বকালে সবসময়ই আধুনিক। স্মৃতিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনি। বিশ্বপ্রকৃতির মাঝে আমরা বারবার রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাই। সর্বপ্রাণবাদের দ্যোতনা তাঁর চিন্তা ও সাধনার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতি থেকে শিশুচিত্তের যে আনন্দ জয় করা যায় সেদিকে রবীন্দ্রনাথ বারবার তাঁর দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছেন।

পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আত্মভোলা শিশুও যে প্রকৃতির মায়ায় ঘর থেকে বের হয়ে এসে আর গৃহে ফিরতে চায়না তার মনের ভাবকে বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গে তিনি উপস্থাপন করেছেন। শিশুদের মনের জগতকে তিনি যেন নিজের মানসচক্ষু দিয়ে দেখতেন। কবির ভাষায়-
তুমি বলো তিনু প্রশ্রয় পায় আমার কাছে
তাই রাগ কর তুমি।
ওকে ভালবাসি,
তাই ওকে দুষ্টু বলে দেখি,
দোষী বলে দেখি নে।

পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ পাঠ করলে রবীন্দ্রনাথের জীবনের শুরু থেকে যৌবনের যে জয়গান এবং কবিতার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের অবিচ্ছিন্ন চিন্তা ও ভাবের খোরাক যুগিয়েছেন। প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ক প্রত্যক্ষ বাস্তবতার আলোকে তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে প্রতিটি কবিতার সারমর্ম আপন মহিমায় পাঠকের জন্য উপস্থাপন করেছেন।

'বাঁশি' কবিতা পাঁচ স্তবকের বিষয়টিতে একেবারে জীবনঘনিষ্ঠ। ধলেশ্বরী নদী তীরে পিসিদের গ্রাম/তাঁর দেওরের মেয়ে/অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক/লগ্নশুভ, নিশ্চিত প্রমান পাওয়া গেল/সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে/মেয়েটা তো রক্ষে পেলে/আমি তথৈবচ।

সাহসহীনতার কারণে এবং মনের দৈন্যের কারণেই হোক নায়ক চরিত্রের ভেতর পলায়নবৃত্তি মনোভাব বারবার উঠে এসেছে। দৃঢ়তা নেই। তারপর সময় ও পারিপার্শ্বিকতার ছাপ এখানে পরিস্ফুট। জগতের সকল পূর্ণতা থেকে যেন সে বহুদূরে। এই যে একজন মানুষের মনের দৈন্য ও সবকিছু না পাওয়ার যে বেদনা তা এ কবিতায় ধ্রুপদী ঢংয়ে এগিয়েছে পাঠকের হৃদয়ের ভেতরে। মন যেন ঢেউ তোলা স্পন্দন। আকাঙ্ক্ষার যেন কোন শেষ নেই।

 
 

বইঃ পুনশ্চ
লেখকঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল্যঃ ২০০ টাকা

Wednesday, December 24, 2025

স্মৃতিতে ওসমান হাদী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


শহীদ ওসমান হাদীর সাথে আমার তেমন বিশেষ কোন স্মৃতি নেই তবু এই লেখা, কারণ তাঁর মৃত্যুটা সবার মতো আমারও মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এই মনের কষ্টকে যদি কিছুটা লাঘব করা যায় তাই কিছু লেখার চেষ্টা।

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদী— কিংবা শহীদ ওসমান হাদী; নামের আগে-পিছে যাই যুক্ত হোক, আমার কাছে সে ছিল কেবলই ওসমান। এক নিঃশব্দ, দৃঢ়চেতা মানুষ। যার আসল নাম মোঃ ওসমান গনি— নামটি তাঁর কফিনে লেখা ছিল, আর সেই নাম নিয়েও যখন অপপ্রচারের কোলাহল উঠেছিল, তখন মনে হয়েছিল— মানুষ মরেও শান্তি পায় না, যদি সে সত্যের পথে হাঁটে।

ওসমানের সঙ্গে আমার পরিচয় শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালের দিকে, পারিবারিক আত্মীয়তার এক নীরব সেতু বেয়ে। সম্পর্কটা ছিলো এমন— ওসমানের বড় বোন আর আমার ছোট বোন দুই জা; মানে ওসমানের বড় ভগ্নীপতি আর আমার ভগ্নীপতি আপন দুই ভাই। সেই সূত্রেই ২০১০ সালের দিকে একবার তাদের বাসায় যাওয়া। সেই যাওয়া যেন ছিল ভবিষ্যতের অনেক স্মৃতির প্রথম দাগ।

ওসমানের ভগ্নীপতির মুখে তাদের ছয় ভাইবোনের গল্প শুনতাম। বিশেষ করে ওমর আর ওসমানের কথা— তাদের শৈশব, সংগ্রাম, সততা, দায়িত্ববোধ। তখন সেসব গল্প শুধু গল্পই ছিল, আজ বুঝি— সেগুলো ছিল ভবিষ্যৎ শহীদের জীবনপাঠের ভূমিকা।

২০১২ সাল। ঢাকা শহরে পড়াশোনার ব্যস্ত সময়েই ওসমান আর ওমর হারায় তাদের বাবাকে। বাবার মৃত্যু ছিল যেন একটি পাহাড় ভেঙে পড়া— একদিকে মানসিক শূন্যতা, অন্যদিকে সংসারের চাপ। সেই শূন্যতা আর চাপ ওসমানের জীবনকে আমূল নাড়িয়ে দেয়। কেননা তার বাবা ছিলো তাঁর জন্য সৃষ্টিকর্তার বিশেষ নিয়ামত যার কারনে ওসমানের এই ওসমান হাদী হয়ে উঠা। পরবর্তীতে তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সে কথার প্রতিধ্বনি আমরা সবাই শুনেছি। অসুস্থতাও তাঁকে পেয়ে বসেছিল, পড়াশোনায় তৈরি হয়েছিল বাধা। তবু ওসমান ছিলেন সেই মানুষ, যে ভাঙে না— ভেঙে নিজেকে গড়ে তোলে। সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেছিল ভালো ফলাফল নিয়ে।

ইংরেজিতে তার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। সেই দক্ষতাই একসময় তার আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। কিন্তু ওসমান কেবল নিজের জন্য বাঁচেনি— সে সবসময় অন্যকে সহায়তা করতে চাইত, পাশে দাঁড়াতে চাইত। তার উদারতা ছিল নীরব, প্রচারবিমুখ।

আমার চিন্তাধারা আর ওসমানের চিন্তাধারা ছিল প্রায় বিপরীত মেরুর। যুক্তিতর্কে সে এতটাই পারদর্শী ছিল যে তার সঙ্গে আমার কথাবার্তা খুব বেশি হতো না। তাই ব্যক্তিগত স্মৃতির ঝুলি খুব ভারী নয়। তবু আজ এই লেখা— কারণ এমন উদার মনের, এমন দৃঢ় বিশ্বাসী মানুষের এভাবে চলে যাওয়া মানা যায় না।

ওসমান কবিতা লিখত। আমিও লিখতাম। কিন্তু আমাদের কবিতার পৃথিবী ছিল আলাদা। আমার কবিতায় ছিল প্রেম, বিরহ, অনুভবের নরম আলো-ছায়া; আর ওসমানের কবিতায় ছিল বিদ্রোহ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা, মুক্তির গান। সে একসময় আমার ‘কবিতার খাতা’ গ্রুপে কবিতা দিত, তারপর একসময় আর দেয়নি— হয়তো তার ভেতরের আগুন তখন অন্য ভাষা খুঁজছিল।

ওসমানের স্মৃতি মনে পড়লেই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার কবিতার বই প্রকাশের সময়টা। সে যখন বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিল, আমাকে জানাল। প্রচ্ছদ পছন্দ করতে বলল। আমি একটি পছন্দ করে দিলাম। পরে ফেসবুকে তিনটি প্রচ্ছদ নিয়ে ভোটের আয়োজন হলো— আমার পছন্দটাই টিকে গেল। আজ যখন তার ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ বইটি চোখে পড়ে, বুকের ভেতর কোথাও যেন ভারী একটা ঢেউ উঠে আসে।

আরও বেশি ভারী লাগে তখন— যখন নিজের মেয়েকে নিয়ে দুষ্টুমি করি। হঠাৎ মনে হয়, একই বয়সী ওসমানের ছেলেটা কোথায় পাবে বাবার আদর, বাবার কাঁধ, বাবার ছায়া? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই— শুধু নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

ওসমানের মেধা, শ্রম আর যোগ্যতা এমন ছিল যে সে চাইলে অনায়াসেই প্রথম শ্রেণির কোনো চাকরি নিয়ে নিশ্চিন্ত, সাজানো জীবন বেছে নিতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। সে বেছে নিয়েছিল বাংলার বুকে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মতো কঠিন, বিপজ্জনক পথ। আর সেই পথই একদিন একটি বুলেট দিয়ে তার আজীবনের স্বপ্নকে থামিয়ে দিল।

তবু সত্য এটাই— ওসমান হাদীকে শারীরিকভাবে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া গেলেও তার চিন্তাকে, তার স্বপ্নকে কেউ হত্যা করতে পারেনি। বরং তার রক্ত সেই স্বপ্নকে আরও বিস্তৃত করে দিয়েছে, আরও দৃঢ় করে তুলেছে।

হে ওসমান হাদী, পরপারে ভালো থেকো।

তোমার শহিদী মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা আল্লাহ কবুল করেছেন।

ইনসাফ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তুমি বুকে লালন করেছিলে— সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই তা একদিন বাস্তবায়ন করবেন।

তুমি নেই, কিন্তু তোমার চিন্তা আজও বেঁচে আছে— আগুনের মতো, আলোর মতো।

স্মৃতিতে ওসমান হাদী — মোঃ হেলাল উদ্দিন