Friday, October 10, 2025

'খোয়াবনামা'য় খোয়াব দেখুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

অবশেষে বহুল আলোচিত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিখ্যাত উপন্যাস 'খোয়াবনামা' শেষ করলাম। ৩৫২ পৃষ্ঠার মোটা বই এটি। এই উপন্যাসে যে তিনি কি করে গেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব! শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো এতো সুস্পষ্ট আর নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা যায়!?

'খোয়াবনামা' শেষ করে আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বসে ছিলাম। প্রচুর মানসিক ধকলের বই এই 'খোয়াবনামা।' পড়তে শুরু করে প্রথমদিকে খুব একটা আগ্রহ পাওয়া যায় নি। দফায়-দফায় ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেছে। যেহেতু এটি বহুল আলোচিত ও বিখ্যাত বই।
অতএব যতই ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটুক, হাল ছাড়া যাবে না। সেই লহ্ম্যে পড়ে গেলাম, অতঃপর লেখক কিভাবে যেন গল্পের ভেতরে ঢুকিয়ে আবিষ্ট করে রাখলেন! আপনি প্রথম অর্ধেক পড়ার পর মূলত পড়ার আনন্দটা পাবেন।
'খোয়াবনামা' উপন্যাসটি ঘিরে রয়েছে ঐতিহাসিক কাহিনি।

খোয়াব মানে-স্বপ্ন। সাধারণভাবে আমরা স্বপ্ন দেখাই বলতে পারি। তৎকালীন জমিদারদের দ্বারা নিপীড়িত জনগণের খোয়াব ছিল যে,একদিন তারা মুক্তি পাবে। ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কাহিনি এই উপন্যাসে বিদ্যমান। তেভাগা আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, জমিদারি প্রথা, প্রেম,গ্রাম্যজীবনের কুসংস্কার, দারিদ্র্যতা এই উপন্যাসের মূল স্তম্ভ।

উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জনপদের একটি বিল, যার নাম কাৎলাহার। কাৎলাহারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে - গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা, গোলাবাড়ির হাট, পালপাড়া, রানীরপাড়া, পারানিরপাড়া ইত্যাদি পল্লীসমূহ। এইসব জনপদে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বিভিন্ন শ্রুতি বা লোককথা, জোতদারি সমাজব্যবস্থা, তেভাগা আন্দোলন, দেশভাগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সংকট এইসব বিষয়গুলো লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাসটিতে। চরিত্রগুলোর মধ্যে খাঁটি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। গল্প বর্ণনার হ্মেত্রে ঔপন্যাসিক গল্প কথকের ভূমিকায় প্রমিত ভাষা আবার কখনো চরিত্রগুলোর ভূমিকায় আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা দুর্দান্ত লেগেছে। গ্রামের মুর্খ মানুষের বিশ্রী, অশ্রাব্য ও অশ্লীল গালিগালাজ উপন্যাসে হুবহু লিখে দেয়া হয়েছে। লেখক এমনভাবে আপনার মনকে ছুয়ে দিবে, তাঁর চরিত্রগুলো দিয়ে এমনভাবে আপনার অন্তর টেনে বের করবে আপনি অদ্ভুত আমেজে চরিত্রগুলোকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হবেন।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কুসংস্কার কীভাবে এই সমাজে রয়ে গেছে সেটাই উপস্থাপিত হয়েছে– মুন্সি, চেরাগ আলী, তমিজের বাপ, বৈকুন্ঠ, শরাফত মন্ডল, কালাম মাঝি, যুধিষ্ঠির, দশরথ কুলসুম, কেরামত, ফুলজান, তমিজ, সখিনা প্রমুখ চরিত্রের মাধ্যমে।

গ্রামের সবার বিশ্বাস কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুরগাছে মুন্সি বাস করে। যে কিনা অনেক আগেই মারা গেছে। কিন্তু পাকুরগাছে বসে সবার কর্মকান্ড সে দেখতে পায়।চেরাগ আলীর সাংকেতিক ভাষায় রচিত খোয়াবনামা বইয়ে সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা আছে। সেই সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা মাঝিপাড়া, কলুরপাড়া, কামারপড়া ও কাৎলাহার বিলের আশেপাশের মানুষ যুগের পর যুগ বিশ্বাস ও লালন করে আসছে। যা মূলত সমগ্র গ্রামবাংলার হাজার বছরের প্রতিচ্ছবি। তবে তা যুক্তিহীন ও বিজ্ঞানহীন। গ্রামীণ মানুষের কুসংস্কার উপন্যাসটিতে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

লেখক এমনভাবে সবকিছু ব্যাখ্যা করেছেন যে, আপনার মনে হবে আপনার চোখের সামনে ঘটনাগুলো ঘটেছে। বৈকুন্ঠ আর কুলসুমের খুনের ব্যাপারটা আমার খারাপ লেগেছে ভীষণ। এই উপন্যাসে আপনি তমিজ নামের এক চরিত্র পাবেন যার মাধ্যমে জোতদারদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার কথা আছে। বিল ডাকাতির আসামি তমিজ পুলিশকে এড়ায়। কিন্তু তাঁর কানে আসে কোথায় কোথায় চলছে তেভাগা, নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে তমিজ বেরিয়ে পড়ে তেভাগার খোঁজে।
গণ জাগরণের বিভিন্ন সময়কে লেখক তুলে ধরেছেন পরম যত্নে।

সবশেষে একটা কথাই বলবো, এ এমন একটা বই যাতে আপনি সবই পাবেন। বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ সমাজ, জোতদার, কৃষক আর মজুর খাটা মানুষের কথা। মূলত উপন্যাসটি পড়লে বুঝতে পারা যাবে আমাদের এ পর্যন্ত আসার অতীত সংগ্রাম এবং ইতিহাস।

বইঃ খোয়াবনামা
লেখকঃ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
মূল্যঃ ৫৫০ টাকা মাত্র।

রিভিউঃ Nusrat Jahan Shammi



No comments:

Post a Comment