Friday, October 24, 2025

"ক্রাচের কর্নেল" উপন্যাস নয় জীবন্ত ইতিহাস -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

শুরুকথা
শাহাদুজ্জামানের "ক্রাচের কর্নেল" বইটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী জীবনীমূলক গ্রন্থ, যেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী কর্নেল আবু তাহেরকে কেন্দ্র করে ইতিহাস, রাজনীতি ও আদর্শের জটিল চিত্র উপস্থাপন করেছেন।

📖 বই: ক্রাচের কর্নেল
লেখক: ড. শাহাদুজ্জামান
ধরন: জীবনীমূলক প্রবন্ধ, রাজনৈতিক ইতিহাস
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ ২০০৯, মাওলা ব্রাদার্স
পাঠ্য অভিজ্ঞতা: গবেষণাধর্মী, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং মানবিক আবেগে পূর্ণ।


🔍 বইয়ের মূল বিষয়বস্তু

বইটি মূলত কর্নেল আবু তাহেরের জীবন, সংগ্রাম ও মৃত্যুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। কর্নেল তাহের ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন, পরে মুজিবনগর সরকারের অধীনে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (BLF)’ বা ‘সেক্টর-১১’-এর নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধ শেষে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনিয়ম, সামরিক কৌশল এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।
বইয়ে তার বিপ্লবী মনোভাব, জাসদ সংশ্লিষ্টতা এবং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের হাতে মৃত্যুর (ফাঁসি) ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে এক অভিনব ধারায়।

🧠 বিশ্লেষণ ও রিভিউ

✍️ লেখনশৈলী
শাহাদুজ্জামান একজন চিকিৎসক ও সাহিত্যিক, যার লেখায় গবেষণাধর্মিতা এবং সাহিত্যিক সৌন্দর্যের মিশ্রণ রয়েছে।
বইটি প্রথাগত জীবনী নয়; বরং থিয়েটারধর্মী, ডকুমেন্টারি আঙ্গিকে লেখা। এতে সংলাপ, ঘটনা পুনর্নির্মাণ, এবং তথ্যনির্ভর বর্ণনার চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে।
কোথাও কোথাও গল্পের মতো গতিময় আবার কোথাও তা ধীর ও বিশ্লেষণধর্মী।

🏛️ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা
বইটি কেবল একজন ব্যক্তির জীবন নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সামরিক অভ্যুত্থান, জাসদের ভূমিকা, এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতি সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলে।
কর্নেল তাহেরের বিচার ও ফাঁসি নিয়ে যে বিতর্ক এবং নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে, লেখক তা সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন।

🧭 মানবিক ও আদর্শিক দিক
কর্নেল তাহের একজন পঙ্গু হয়েও রাষ্ট্রকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আদর্শিক দৃঢ়তা পাঠককে মুগ্ধ করে।
লেখক তার বিপ্লবী ভাবনা ও মানবিক মূল্যবোধকে এক অনন্য উচ্চতায় স্থান দিয়েছেন।

📚 শেষকথা
"ক্রাচের কর্নেল" কেবল একটি জীবনী নয়—এটি একটি রাষ্ট্র, একটি যুগ, এবং একজন বিপ্লবীর আখ্যান।
শাহাদুজ্জামান বইটিকে কেবল ইতিহাস তুলে ধরার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরির এক মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এটি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে একটি শক্তিশালী ও চিন্তনীয় বই।


Md. Helal Uddin
05.07.2025

Friday, October 17, 2025

'আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র' তবে গরু কিন্তু গরু নয় -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

'আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র' বইটি পড়ে আপনি লেখকের সাথে অনেক ক্ষেত্রে একমত না হলেও আপনি লেখকের মতামতকে ফেলে দিতে পারবেন না।

১. লেখক তার বইটি উৎসর্গ করেছেন "আল্লাহকে"। কারণ হিসেবে তিনি যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন- আল্লাহর সাথে কখনো দ্বিমত পোষণ করা যায় না।

২. একদিন আমাদের আকাশ আমাদের মাথার উপর টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়তে লাগলো। কিন্তু আমাদের রাজা একটিবারও ভাবলেন না----- আকাশের একটি ভাঙ্গা টুকরো, তার মাথায়ও পড়তে পারে।

৩. আমি যখন আমার ভুঁড়ির দিকে তাকাই তখন বুঝতে পারি----- কোথাও কেউ না কেউ না খেয়ে আছে বলেই ভুঁড়িটি হয়েছে। ভুঁড়ি হল ধনী মানুষদের শরীরে জমা ক্ষুধার্ত মানুষদের মাংস।

--- লেখক এখানে ভুঁড়ি বলতে পেটের উপরের মাংসকে বুঝাননি। তিনি বুঝিয়েছেন টাকা সমৃদ্ধ ডেবিট কার্ড, কানাডার বেগম পাড়ায় বাড়ি, অন্যের দখল করা জমি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিট, শুল্কমুক্ত গাড়ি, সুন্দর চাকরি, কাবিনের টাকা। বাঙালির জন্য এক স্ত্রী আর এক ভুঁড়িতে তিক্ত থাকা খুবই কঠিন কাজ। (আমার শুধু পেটের উপরেই একটা স্থুল মাংসের ভুড়িই আছে, অন্য কোন ভুড়ি আমার নেই।)

৪. বাঙালি শব্দের উৎপত্তি ব্যাঙ থেকে। ব্যাঙের সাথে আমাদের চারিত্রিক অনেক মিল আছে। ব্যাঙ লাফিয়ে চলে, আমরাও লাফিয়ে চলি। ব্যাঙের আঁধার পছন্দ, আমাদেরও। ব্যাঙের প্রিয় খাদ্য পোকামাকড়, আমাদেরও প্রিয় খাদ্য পোকামাকড়। মানুষদের মধ্যে যারা ক্ষুদ্র ক্ষমতাহীন তাদের আমরা পোকামাকড় ভেবে খেয়ে ফেলি। ব্যাঙ তার ডোবাকে বিশ্ব জ্ঞান মনে করে। আমরাও তাই করি। আমাদের জ্ঞানের বাইরেও যে আরো জ্ঞান থাকতে পারে, সেটা আমরা কখনোই স্বীকার করতে প্রস্তুত নই।

ব্যাঙ যেখানেই বাস করে সেখানেই কাদা তৈরি করে। আমরাও তাই করি। আমাদের জাতীয় ক্রিয়াকর্মের নাম---- কাদা ছোড়াছুড়ি। কারো গায়ে ছুড়ে মারার মত কাদা না পেলে আমরা পেট থেকে কাদা বের করে ছুড়ে মারি।

৫. প্রভু ভক্তিতে কুকুরদের এক সময় খুব সুনাম থাকলেও সম্প্রতি মানুষেরা তাদের এ সুনাম কেড়ে নিয়েছে। কুকুরেরা লক্ষ্য করেছে পৃথিবীর কিছু কিছু এলাকায় মানুষ প্রভুভক্তিতে কুকুরদেরও ছাড়িয়ে গেছে।

কুকুর সমাজ মাননীয়মুক্ত। কুকুরদের কাউকে মাননীয় বলতে হয় না। মর্যাদায় সকল কুকুরই সমান, এটা তাদের প্রতিষ্ঠিত নীতি। তাদের কোন স্যার, স্যালুট ও হরিলুট নেই।

কুকুরের বংশ পরিচয় আছে। তার পূর্বপুরুষ নেকড়ে ছিল। সে হিসেবে তাদের হিংস্র হওয়ারই কথা। কিন্তু মানুষের হিংসতা দেখে তারা থমকে গেছে। তারা দেখেছে যে, এক বছরে মানুষ যত মানুষকে খুন করে তত মানুষ তারা ১০০ বছরেও খুন করতে পারবেনা। এজন্য হিংস্রতাকে তারা বহু আগেই বিদায় জানিয়েছে।

"কুত্তার মত পেটাবো"-- এই বাক্যটি থেকে লেখক কুকুরদের প্রতি আমাদের ভালোবাসার প্রমাণ পান। কোন সমাজে মানুষের সাথে মানুষের আচরণ কেমন হবে তা তিনি টের পান কুকুরদের প্রতি মানুষের আচরণ দেখে। যদি কোন দেশে কুকুর এবং মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে তাহলেই লেখক ধরে নেন সেই দেশটি নিরাপদ।

৬. বনের রাজা সিংহ মৃত্যুর আগে তার শাবকদের গাধা থেকে সাবধান থাকতে বললেন এবং গাধা চেনার পাঁচটি উপায় এর কথা বললেন।

গাধা কোন নির্দিষ্ট প্রাণীর নাম নয়। "গাধা" কিছু গুণাবলীর নাম। একটি বাঘাও হতে পারে, যদি তার ভিতরে গাধার গুণাবলী ফুটে ওঠে।

ক। গাধা যে এলাকায় প্রবেশ করবে, সে এলাকাই তার নিজের বলে গণ্য করবে। এজন্য গাধার সাথে কখনো নিজের এলাকার মালিকানা নিয়ে বিবাদে জড়াবে না।

খ। গাধা বেশিক্ষণ প্রস্রাব না করে থাকতে পারেনা। সে যেখানেই যাবে, সেখানেই প্রস্রাব করবে। আর সবাইকে তার প্রস্রাবের নানা ওষুধি গুণের কথা বর্ণনা করবে। আমি অনেক সিংহকে দেখেছি গাধার কথা বিশ্বাস করে তার প্রস্রাব পান করতে।

গ। গাধা পৃথিবীর সকল প্রাণীকেই গাধা মনে করে এবং সকলকে একই উপদেশ প্রদান করে।

ঘ। প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র গাধাই যুক্তিবাদী। যে কোন বিষয়কে সে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে। এমন কোন ঘটনা নেই যা "ডানকি লজিক" দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। সাধারণ লজিকের সাথে ডানকি লজিকের পার্থক্য হল--- ডানকি লজিকে মগজের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় লেজ।

ঙ। গাধা খুবই আবেগপ্রবণ প্রাণী। আবেগের বসে সে যে কোন কথা ও শব্দের এক হাজার অর্থ তৈরি করতে পারে। ডানকি ল্যাঙ্গুয়েজে যে কোন বক্তব্যকে সুবিধাজনকভাবে অনুবাদ করা যায়।

৭. শয়তান একসময় ফেরেশতা ছিল। তার নাম ছিল ভিআইপি ফেরেস্তা। সে ছিল মহাবিশ্বের প্রথম গোঁয়ার এবং গোঁয়ার্তুমির ফল যে ভালো হয় না, তা বুঝতে থাকে স্বর্গ হারাতে হয়েছিল।

পৃথিবীর অনেক দেশেই শয়তান এখন স্বর্গের চেয়েও আরামে আছে। শয়তানকে কেউ দেখেছে এরকম প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু তার অস্তিত্ব পৃথিবীর নানা অঞ্চলে মানুষ টের পেয়েছে। শয়তান আমাদের রাস্তাঘাটে প্রায়ই রডের বদলে বাঁশ ঢুকিয়ে দিচ্ছে, বায়ু বেগে সেতু নির্মাণ করে বিল তুলে নিচ্ছে, রেললাইন ঢেলে দিচ্ছে পাথরের বদলে ইটের সুরকি। টেলিভিশন টকশোতে শয়তানকে আমরা প্রায় বক্তৃতা দিতে দেখি। শয়তান বানিয়ে বানিয়ে এমনভাবে সত্য কথা বলে যে, যা শুনে ওই সত্য সম্পর্কে আমাদের আর কোন সন্দেহ থাকে না।

পৃথিবীতে আসার পর শয়তানের প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষকে দরিদ্র ও ক্ষমতাহীন করা। "অভাবে স্বভাব নষ্ট হবে" -- এরকম একটি ধারণা ছিল তার। সে আশা করেছিল মানুষ গরিব ও ক্ষমতাশূন্য হলো হলে বেশি পাপ করবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো এর উল্টো ঘটনা। সে দেখল পাপের জন্য দারিদ্র্যের চেয়ে প্রাচুর্যই বেশি সহায়ক। ক্ষমতাহীন মানুষদের পাপ করার সুযোগ কম। ফলে শয়তান এখন কাউকে নিশানা করলে সে সবার আগে তার হাতে তুলে দেয় টাকা ও ক্ষমতা।

৮. কোন সমাজে ন্যাংটো মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেলে, ওই সমাজে পোশাক পরিধানই অশ্লীল হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনি সমাজে মিথ্যুক ও দালালের সংখ্যা বেড়ে গেলে সমাজে সত্য উচ্চারণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে। "সত্যের মৃত্যু নেই"--- এই কথাটি সত্য নয়। বঙ্গোপসাগরের পাড়ে সত্য এখন বিলুপ্তির পথে।

৯. মানুষ বাঁচে সময়কে খুন করে। কেউ মারা গেছে এর অর্থ হল তার হাতে আর খুন করার মত অবশিষ্ট সময় ছিল না। সফলতাকে আমি বলি সময়ের লাশ। যেমন "ঘি"কে বলি দুধের লাশ। এক গ্লাস ঘি পেতে আমাদেরকে হত্যা করতে হয় অনেক গ্লাস দুধ। আর একটি সফল বছর কাটাতে আমাদেরকে হত্যা করতে হয় অনেক বছর সময়। চিকিৎসক হিসেবে সময়ের সুনাম আছে। সময় সারিয়ে তুলতে পারে শরীর ও মনের অনেক অচিকিৎস্য অসুখ। তবে রূপের সাথে সময়ের শত্রুতা পুরনো। ২০২০ সালে যিনি রূপসী, ২০৩০ সালে তার রূপ নাও থাকতে পারে। সময় থেকে শিক্ষা লাভ করেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শিক্ষক হিসেবে সময়ের নিষ্ঠুরতা অতুলনীয়। সময়ই একমাত্র শিক্ষক, যিনি পাঠদান শেষে তার ছাত্রদের মেরে ফেলেন।

১০. বাংলাদেশে নারী ও গাভীর পর যে প্রাণীটি এখন সবচেয়ে নিরীহ জীবন যাপন করছে, তার নাম শিক্ষক। তিনি সমাজে আছেন কি নেই, তা আমরা আগের মতো টের পাই না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শিক্ষক ছাত্রদের খোঁজখবর নেন। পত্রিকাগুলোই তাকে সংবাদ জানায়। তিনি জানতে পারেন তার ছাত্ররা চাষাবাদ শিখতে বিদেশ যাচ্ছে, সাঁতার শিখতে বিদেশ যাচ্ছে। শিক্ষক হব-- এই স্বপ্ন এখন আর কেউ দেখে না। চাকরির সব পথ যখন রুদ্ধ হয়ে যায়; ব্যাংক, বীমা, বিসিএস, আর্মি, সব রসগোল্লা যখন বন্ধ হয়ে যায় ঠিক তখনই একজন বেকারের গন্তব্য হয়ে উঠে শিক্ষকতা। সরকারি হলে ভালো, অসরকারি হলেও ক্ষতি নেই। একটি স্কুল দেখে তিনি ঢুকে পড়েন এবং কিছুদিন পর দুটি গামছা আর কিছু মুড়ি নিয়ে রওনা শহীদ মিনারের দিকে। বেতনের দাবিতে তিনি আমরণ অনশনে বসেন।

তার ক্ষমতাশূন্য বলে সমাজে তার দামও শূণ্য। নানা অনুষ্ঠানে হেডমাস্টারদের চেয়ে ওসিরা এখন বেশি দাওয়াত পান। কলমের আলোর পাশে যে বন্দুকের আলোকে খুব ম্লান দেখায়, সে বিষয়টি সমাজ ভুলে গেছে।

১১. মানুষের জীবনে সমাজের ভূমিকা কনডমের মত। যা কিছু সৃষ্টিশীল তার সবকিছু আটকে দেয়াই সমাজের কাজ। সমাজ জানে তার ভবিষ্যৎ অনাসৃষ্টিতে। সৃষ্টি প্রিয় শুক্রাণু তার শত্রু। যেখানেই মাথা তুলে দাঁড়ায় সামান্য সৃষ্টি, সেখানেই সমাজ হাজির হয় বাধার বৃষ্টি নিয়ে। সমাজের কালো পর্দা ভেদ করে মানুষ এখন আর আকাশের দিকে তাকাতে পারেনা। তাকে হাঁটতে হয় সারাক্ষণ মাটির দিকে চেয়ে চেয়ে।

১২. গুরু একটি চতুষ্পদ প্রাণী। তার দুটি শিং ও একটি লেজ আছে-- এরকম ধারণার সাথে আমি একমত নাই। ক্ষমতাহীন সকল প্রাণীই গরু। তার পা চারটা থাকতে পারে, আবার দুটিই থাকতে পারে, এমনকি নাও থাকতে পারে। লেজ থাকাটাও জরুরী নয়। জরুরি হলো অন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে তার পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে কিনা। যদি না থাকে তাহলে আক্রমণকারী প্রাণীর কাছে সে গরু।

১৩. আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, আপনি কেমন বাকস্বাধীনতা চান? তাদের জন্য আমার উত্তর হলো: দেখুন, ফ্রান্সের আইনে শূকরের নাম নেপোলিয়ন রাখা যাবে না। শুকরকে আপনি নিউটন ডাকতে পারেন, গান্ধী ডাকতে পারেন, কিন্তু নেপোলিয়ন ডাকতে পারবেন না। আমি চাই এমন বাকস্বাধীনতা, যেটি আমাকে প্যারিসে বসেও একটি শুকরের ছবি আঁকতে দেবে এবং তার নাম রাখতে দেবেন নেপোলিয়ন।

১৪. কিছু মানুষ যোগ-বিয়োগ জানে, আর কিছু মানুষ জানে না। এর একটি ব্যাখ্যা অ্যারিস্টোটল দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন আত্মা তিন প্রকার:

ক। পুষ্টিবাদী ও ভোগবাদী আত্মা। যা সকল উদ্ভিদ ও প্রাণীর ভেতরে অবস্থান করে। এর কাজ হল খাবার জোগাড় করা ও বংশবিস্তার করা। এই আত্মা যার ভেতরে আছে তার সকল চিন্তা রুজি রোজগার, ভোগ-বিলাস ও বিয়ে শাদী নিয়ে। অ্যারিস্টোটল বেঁচে থাকলে দেখতেন বাংলাদেশে এই আত্মার সংখ্যা কোটি কোটি।

খ। সংবেদনশীল আত্মা। যা মানুষ ও নিচু জাতের সকল প্রাণীর ভেতরে অবস্থান করে। এই আত্মার কাজ হল হাঁটাচলায় সাহায্য করা।

গ। যুক্তিবাদী আত্মা। যা ঐশ্বরিক। এরিস্টটলের দাবি, এই আত্মার প্রভাব যার উপরে বেশি সেই যোগ-বিয়োগ জানে।

১৫. মানুষ যতটা না বুদ্ধিমান তার চেয়েও বিশ্বাসী। যদি বিশ্বাসের পেছনে সে ভালো কোন কারণ খুঁজে না পায়, তাহলে সে নিজেই কিছু কারণ উদ্ভাবন করে ফেলে। খুব বিপদে না পড়লে সে বুদ্ধিকে বিশ্বাসের উপর স্থান দিতে চায় না। কোন কিছু কারণ অনুসন্ধান একটি পরিশ্রমের কাজ, যা মানুষ সাধারণত করতে চায় না। এর চেয়ে বানোয়াট কোন কুসংস্কারের কাঁধেই দায় চাপানো ভালো।

১৬. অনেক দেশে "পাপের শাস্তি" কুসংস্কারটি বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশের কারো বড় অসুখ হলে প্রতিবেশীরা ধরে নেন এটা "আল্লাহর বিচার"। তাদের ধারণা লোকটি কোন পাপ করেছিল বলেই অসুখে পড়েছে। বড় দুর্ঘটনা বা বিপদ-আপদ এর ক্ষেত্রে এমনটি ধরে নেয়া যায়। কিন্তু সদ্য জন্ম নেয়া অনেক শিশুকে আমি বড় অসুখ ও দুর্ঘটনায় মারা যেতে দেখেছি। একজন শিশু কি এমন পাপ করতে পারে যার জন্য ঈশ্বর তাকে দুনিয়াতে পাঠিয়ে আবার আসমানে ফেরত নেন তা আমার বোধগম্য নয়। সেইন্ট অগাস্টিন দাবি করেছিলেন, শিশুদের পাপ মূলত আদম-হাওয়ার পাপ। আদম হওয়ার পাপ বংশ পরম্পরা শিশুটির মা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে এবং মায়ের দুধ পান করে শিশুটিও সেই পাপে পাপী হয়েছে।
কি অসাধারণ ব্যাখ্যা!!!

ফিলোসফিক্যাল থিওলজিতে একটি প্রপোজিশন আছে এরকম: কোন গাধাকে যদি তার ঈশ্বর সম্পর্কে বলতে বলা হয়, তাহলে সে একটি গাধার বর্ণনাই করবে। কারণ তার ধারণা, তার ঈশ্বর ও নিশ্চয়ই গাধা।

কুসংস্কার গুলোর জন্ম হয় সাধারণত ভয় থেকে। মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সে তার সুবিধাজনক কিছু বিশ্বাস তৈরি করে। এ ভয় প্রাণ হারানোর হতে পারে, ক্ষমতা হারানোর হতে পারে, ফসল হারানো হতে পারে, মান-সম্মান হারানোর হতে পারে, এমনকি হারানোর বদলে প্রাপ্তিও হতে পারে। যেমন খ্রিস্টান নানরা ঐশ্বরিক শাস্তির ভয়ে (শাস্তি এক প্রকার প্রাপ্তি) গোসলের সময়ও বোরকা পড়ে থাকেন। তাদের দাবি বাথরুমে আমাদের আর কেউ না দেখলেও ঈশ্বর দেখেন। এ নিয়ে বার্টান্ড রাসেল একবার কৌতুক করে বলেছিলেন, "তারা বুঝতে চান না যে ঈশ্বরের চোখ বাথরুমের দেয়াল ভেদ করতে পারলেও বোরকার কাপড়ের দেয়াল ভেদ করতে পারে না।"

১৭. মানুষের বিবেচনাবোধও উন্নত নয়। প্রাণী হিসেবে সেই পৃথিবীতে সবচেয়ে হিংস্র। অন্য সকল প্রাণীর ক্ষেত্রে "পাশবিক" শব্দটি ব্যবহার করলেও মানুষ তার হিংস্রতাকে আলাদা করতে ব্যবহার করে "মানবিক" শব্দটি। মানুষের মানবিকতার প্রমাণ আমরা হিরোশিমা, নাগাসাকিতে পেয়েছি। হিটলার, মুসোলীন, চেঙ্গিস খান এরা সবাই মানবিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র।
মানুষের যা ইতিহাস তা মোটামুটি হিংস্রতারই ইতিহাস এবং তার হিংস্র প্রবৃত্তি বিলুপ্ত হবার নয়। মানুষের সবচেয়ে জরুরী বিজ্ঞানটিও, যাকে আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞান বলি, দাঁড়িয়ে আছে ব্যাঙ, ইঁদুর, গিনিপিক ও বানরের লাশের উপর।

১৮. "আপনি কী করেন?" এ প্রশ্নটি যিনি করেন তার দিকে আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি। এটি মোটেও নিরীহ কোনো প্রশ্ন নয়। প্রশ্নকর্তা একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রশ্নটি করেন এবং উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত অসৎ। তিনি নিশ্চিত হতে চান আমি তার চেয়ে ক্ষমতাধর কেউ কিনা। এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে তিনি আমার সাথে কেমন আচরণ করবেন।
তিনি যদি বুঝতে পারেন আমি সাধারন গফুর, আমার আয় সামান্য, আমি টেনেটুনে চলি, যাকে পাই তাকেই সালাম দিই, আমার পড়াশোনা কম, কোর্ট-টাই নেই, আমাকে কেউ স্যার ডাকে না, আমার আত্মীয়দের মধ্যে কেউ অস্ত্র বহন করেনা, আমার ব্যাংক হিসাবে খরা লেগেছে, আমাকে চড় দিলে কেউ প্রতিবাদ করবে না তাহলে তিনি খুব খুশি হন। তিনি নিরাপদ বোধ করেন।নিজের কাজে মন দেন। আমার প্রতি তার কোন কৌতুহল থাকে না। আমার ওজন তার কাছে এক লাফে শূন্যে গিয়ে ঠেকে।
কিন্তু যদি টের পান যে আমি বড় ব্যবসায়ী, আমি একটি মন্ত্রণালয় চালাই, একটি জেলার মালিকানা আমার ঘাড়ে, আমি অনেক সমিতির সভাপতি, মানিক মিয়া এভিনিউতে ৩০০ জনের সাথে বকাবকি করি, অস্ত্রের সাথে আমার আত্মীয়তা আছে, টিভি পত্রিকায় আমার প্রশংসা করা হয়, লন্ডন আমেরিকার নিয়মিত দৌড়ঝাঁপ করি, লোকজন আমাকে স্যার ডাকে, আমার নামের আগে মাননীয় বসানো হয়, ব্যাংক হিসাব নয়- আমার নিজেরই একটি ব্যাংক আছে, তাহলে তিনি লাফ দিয়ে উঠেন। চেয়ারে এগিয়ে দেন, হাত বাড়িয়ে দেন, তোলপাড় করে তুলেন চারপাশ এবং মনে মনে অনিরাপদ ও বিপন্ন বোধ করেন। এর কারণ তিনি একটি সংকটে ভোগেন এবং সংকটটি সরল নয়। তিনি একই সাথে ক্ষমতাকে পছন্দ ও ঘৃণা করেন।

১৯. সম্মান একটি সামাজিক রোগ। কোন সমাজে ভালোবাসা কমে গেলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। কোন ব্যক্তি যখন দেখেন যে, তাকে ভালোবাসার কোনো কারণ মানুষের নেই তখন তিনি সম্মান দাবি করেন। সম্মান হলো ভালোবাসার ঘাটতি পূরণের একটি কৌশলমাত্র। এ কৌশল বাস্তবায়নের মানুষ প্রথমে আশ্রয় নেয় ক্ষমতার। ক্ষমতা কী? কাজ করার হারই ক্ষমতা- এরকম একটি সংজ্ঞা পদার্থবিজ্ঞানে পাওয়া গেলেও সমাজের সংজ্ঞা ভিন্ন। সমাজের দিকে তাকালে টের পাওয়া যায় মানুষকে ভয় দেখানোর সামর্থ্যই ক্ষমতা। যারা ভয় দেখানোর সামর্থ্য যত বেশি, তার ক্ষমতাও তত বেশি।
ম্যাকিয়াভেলি তার প্রিন্সকে পরামর্শ দিয়েছিলেন- ভালোবাসা নয়, রাজার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের ভয় অর্জন করা। রাজাকে করতে হবে এমন কাজ যা দেখে মানুষ সর্বদা ভয় পাবে। আমার ধারণা ম্যাকিয়াভেলির এ কৌতুকের ভদ্র রুপই সম্মান।

২০. ইংরেজি "ডক্টর" শব্দটি মূলত ল্যাটিন ভাষার। এর অর্থ হল শিক্ষক বা প্রশিক্ষক। মধ্যযুগের দিকে ইউরোপে যারা ল্যাটিন ভাষা পড়াতেন তাদের একটা লাইসেন্স লাগতো যার নাম ছিল "Licentia Docendi" এর ইংরেজি অনুবাদ হলো "License to Teach". এই লাইসেন্সটিকে ডাকা হতো "Doctoratus" ইংরেজি হলো "Doctorate."
তখনকার দিনে ডক্টরেট দিতেন চার্চের মোল্লারা, যারা বাইবেল পড়াতেন ও ব্যাখ্যা করতেন। চার্চের অনুমতি ছাড়া কেউ ডক্টরেট ডিগ্রী বা শেখানোর লাইসেন্স পেতে না। কিন্তু খ্রিস্টানদের পোপ ১২১৩ সালে ঘোষণা করলেন যে আজ থেকে চার্চের পাশাপাশি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে লাইসেন্স বা ডক্টরেট ডিগ্রি দিতে পারবে। এই ঘোষণার আগেও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাথলিক চার্চের অনুমতি নিয়ে কিছু ছাত্রকে ডক্টরেট ডিগ্রি দিত। কিথ এলান তার "Changing doctoral degrees: an international prespective" বইতে উল্লেখ করেছেন যে, পৃথিবীর প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রী দেওয়া হয় ১১৫০ সালের দিকে, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে।

তখনকার দিনে খ্রিস্টানদের এই ডক্টরেট ডিগ্রী এর মত আরেকটি ডক্টরেট ডিগ্রী মুসলিমদেরও ছিল এর নাম ছিল ইযাজাহ। ডক্টরেট দেওয়া হতো খৃষ্টানদের চার্চ থেকে আর ইযাজাহ দেওয়া হতো মুসলমানদের মাদ্রাসা থেকে। কিন্তু দুটোরই অর্থ ছিল এক- শেখানোর লাইসেন্স। যার ডক্টরেট বা ইযাজাহ আছে, তিনি শিক্ষকতা করতে পারবেন।

১৭ শতকের দিকে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ডক্টরেট ডিগ্রি বা শিক্ষকতা লাইসেন্স এর নাম দিল "Doctorate of Philosophy" ba PhD. ডক্টর অফ ফিলোসফি তে যে "ফিলোসফি" শব্দটি আছে তা মূলত গ্রিক ভাষার শব্দটিকে নির্দেশ করে। এর অর্থ হল Love of Wisedom বা জ্ঞানের প্রতি মোহ। অর্থ বিত্ত, ক্ষমতা ও পদ পদবী নয় যে ব্যক্তির জ্ঞানের প্রতি মোহ জন্মেছে সেই ব্যক্তি পিএইচডি।

২১. ছাগল শব্দটি এ অঞ্চলে বিবর্তিত হয়ে গেছে। এটি আর ছাগলদের দখলে নেই। ছাগলের মাংস--- এমনটি আর বাজারে শোনা যায় না। শোনা যায়-- খাসির মাংস, বকরির মাংস। রেস্তোরাঁয় গিয়ে এখন আর কেউ বলে না আমি ছাগলের মাংস দিয়ে ভাত খাব। মানুষের একটি অংশ "ছাগল" শব্দটিকে নিজেদের করে নিয়েছে। ছাগল শব্দটি শুনলে বা দেখলে তারাই এখন প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা ভাবে মনে হয় আমাকে বলল, জবাব দিয়ে আসি।

বইটি সুখপাঠ্য। বইটি অবশ্যই আপনার ভাবনার জগতকে আঘাত করবে।

বইঃ আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র
লেখকঃ মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
প্রকাশকঃ জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
মূল্যঃ ৫০০ টাকা


Friday, October 10, 2025

'খোয়াবনামা'য় খোয়াব দেখুন -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

অবশেষে বহুল আলোচিত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিখ্যাত উপন্যাস 'খোয়াবনামা' শেষ করলাম। ৩৫২ পৃষ্ঠার মোটা বই এটি। এই উপন্যাসে যে তিনি কি করে গেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব! শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো এতো সুস্পষ্ট আর নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা যায়!?

'খোয়াবনামা' শেষ করে আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বসে ছিলাম। প্রচুর মানসিক ধকলের বই এই 'খোয়াবনামা।' পড়তে শুরু করে প্রথমদিকে খুব একটা আগ্রহ পাওয়া যায় নি। দফায়-দফায় ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেছে। যেহেতু এটি বহুল আলোচিত ও বিখ্যাত বই।
অতএব যতই ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটুক, হাল ছাড়া যাবে না। সেই লহ্ম্যে পড়ে গেলাম, অতঃপর লেখক কিভাবে যেন গল্পের ভেতরে ঢুকিয়ে আবিষ্ট করে রাখলেন! আপনি প্রথম অর্ধেক পড়ার পর মূলত পড়ার আনন্দটা পাবেন।
'খোয়াবনামা' উপন্যাসটি ঘিরে রয়েছে ঐতিহাসিক কাহিনি।

খোয়াব মানে-স্বপ্ন। সাধারণভাবে আমরা স্বপ্ন দেখাই বলতে পারি। তৎকালীন জমিদারদের দ্বারা নিপীড়িত জনগণের খোয়াব ছিল যে,একদিন তারা মুক্তি পাবে। ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কাহিনি এই উপন্যাসে বিদ্যমান। তেভাগা আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, জমিদারি প্রথা, প্রেম,গ্রাম্যজীবনের কুসংস্কার, দারিদ্র্যতা এই উপন্যাসের মূল স্তম্ভ।

উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জনপদের একটি বিল, যার নাম কাৎলাহার। কাৎলাহারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে - গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা, গোলাবাড়ির হাট, পালপাড়া, রানীরপাড়া, পারানিরপাড়া ইত্যাদি পল্লীসমূহ। এইসব জনপদে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বিভিন্ন শ্রুতি বা লোককথা, জোতদারি সমাজব্যবস্থা, তেভাগা আন্দোলন, দেশভাগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সংকট এইসব বিষয়গুলো লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাসটিতে। চরিত্রগুলোর মধ্যে খাঁটি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। গল্প বর্ণনার হ্মেত্রে ঔপন্যাসিক গল্প কথকের ভূমিকায় প্রমিত ভাষা আবার কখনো চরিত্রগুলোর ভূমিকায় আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা দুর্দান্ত লেগেছে। গ্রামের মুর্খ মানুষের বিশ্রী, অশ্রাব্য ও অশ্লীল গালিগালাজ উপন্যাসে হুবহু লিখে দেয়া হয়েছে। লেখক এমনভাবে আপনার মনকে ছুয়ে দিবে, তাঁর চরিত্রগুলো দিয়ে এমনভাবে আপনার অন্তর টেনে বের করবে আপনি অদ্ভুত আমেজে চরিত্রগুলোকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হবেন।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কুসংস্কার কীভাবে এই সমাজে রয়ে গেছে সেটাই উপস্থাপিত হয়েছে– মুন্সি, চেরাগ আলী, তমিজের বাপ, বৈকুন্ঠ, শরাফত মন্ডল, কালাম মাঝি, যুধিষ্ঠির, দশরথ কুলসুম, কেরামত, ফুলজান, তমিজ, সখিনা প্রমুখ চরিত্রের মাধ্যমে।

গ্রামের সবার বিশ্বাস কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুরগাছে মুন্সি বাস করে। যে কিনা অনেক আগেই মারা গেছে। কিন্তু পাকুরগাছে বসে সবার কর্মকান্ড সে দেখতে পায়।চেরাগ আলীর সাংকেতিক ভাষায় রচিত খোয়াবনামা বইয়ে সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা আছে। সেই সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা মাঝিপাড়া, কলুরপাড়া, কামারপড়া ও কাৎলাহার বিলের আশেপাশের মানুষ যুগের পর যুগ বিশ্বাস ও লালন করে আসছে। যা মূলত সমগ্র গ্রামবাংলার হাজার বছরের প্রতিচ্ছবি। তবে তা যুক্তিহীন ও বিজ্ঞানহীন। গ্রামীণ মানুষের কুসংস্কার উপন্যাসটিতে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

লেখক এমনভাবে সবকিছু ব্যাখ্যা করেছেন যে, আপনার মনে হবে আপনার চোখের সামনে ঘটনাগুলো ঘটেছে। বৈকুন্ঠ আর কুলসুমের খুনের ব্যাপারটা আমার খারাপ লেগেছে ভীষণ। এই উপন্যাসে আপনি তমিজ নামের এক চরিত্র পাবেন যার মাধ্যমে জোতদারদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার কথা আছে। বিল ডাকাতির আসামি তমিজ পুলিশকে এড়ায়। কিন্তু তাঁর কানে আসে কোথায় কোথায় চলছে তেভাগা, নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে তমিজ বেরিয়ে পড়ে তেভাগার খোঁজে।
গণ জাগরণের বিভিন্ন সময়কে লেখক তুলে ধরেছেন পরম যত্নে।

সবশেষে একটা কথাই বলবো, এ এমন একটা বই যাতে আপনি সবই পাবেন। বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ সমাজ, জোতদার, কৃষক আর মজুর খাটা মানুষের কথা। মূলত উপন্যাসটি পড়লে বুঝতে পারা যাবে আমাদের এ পর্যন্ত আসার অতীত সংগ্রাম এবং ইতিহাস।

বইঃ খোয়াবনামা
লেখকঃ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
মূল্যঃ ৫৫০ টাকা মাত্র।

রিভিউঃ Nusrat Jahan Shammi



Friday, October 3, 2025

ভালোবাসার প্রকাশ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


 কথায় বলে,

সহজ কথা যায়না সহজে বলা।

ঠিক তাই,

আমি তোমাকে ভালোবাসি

তিন শব্দের সহজ ছোট্ট একটি কথা

বলতে গেলে দরকার অনেক ভাবা।

তবু আমরা বলতে চাই

কিন্তু কেমন করে বলবো নেই তা আমার জানা।

তোমরা বলো, কবি আমি 

তাই একটু অগোছালো আমার চলা।

হাতে ফুল গুঁজে তোমার সামনে দাড়িয়ে

বিশ্ব প্রেমিকের মতো যে বলবো

আমি তোমাকে ভালোবাসি

সেই প্রেমিক আমি হতে পারিনি।

দুই চার লাইন লিখে নিজেকে কবি ভাবলেও

এমন প্রেমিক হওয়া আমার জন্য এতো সহজ নয়।

তাই কলমেই আমার ভরসা।

কলমের কালিতে লিখে দিয়ে যাই

আমার মনের গোপন কথা

তুমি যে আমার অনন্ত ভালোবাসা।

----------------------------------

ভালোবাসার প্রকাশ 

-- মোঃ হেলাল উদ্দিন