Thursday, January 22, 2026

নীরবতার ভেতর তুমি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

আমি জানি না কেন সেদিন হঠাৎ করে তোমার নম্বরটা খুঁজে বের করলাম।
এক যুগ হয়ে গেছে—এত বছরে মানুষ ভুলে যায়, অভ্যস্ত হয়, নিজেকে বোঝায়। আমিও বোঝাতাম। সংসার, সন্তান, দায়িত্ব—সবই আছে। তবু কিছু রাতে বুকের ভেতর এমন এক শূন্যতা জমে, যার কোনো নাম নেই।

সেদিন বিকেলে আকাশটা খুব শান্ত ছিল। অকারণ শান্ত।
হাত কাঁপছিল ফোন ডায়াল করার সময়। মনে হচ্ছিল—আমি কি কোনো সীমা লঙ্ঘন করছি?
তবু কলটা চলে গিয়েছিল।

রিং গেল।
একবার।
দু’বার।

যখন তুমি “হ্যালো” বললে, আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিলাম।
কারণ তোমার গলা আমার কল্পনার মতো বদলায়নি।
একটু ভারী, একটু ক্লান্ত—তবু চেনা।

“আমি… কেমন আছো জানতে চাচ্ছিলাম।”
এইটুকু বলার জন্য এত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল!

তুমি ভদ্র ছিলে। খুব ভদ্র।
আমিও।

কথা এগোয়নি।
যেন দু’জনেই জানতাম—কিছু কথা আছে, যেগুলো বলা মানেই বিপদ।

ফোনটা কাটার পর অনেকক্ষণ বসে ছিলাম।
ঘরের মানুষজনের কোলাহল, রান্নাঘরের শব্দ—সবই হচ্ছিল, অথচ আমার ভেতরে কেবল একটা পুরোনো বিকেল আটকে ছিল, যেখানে আমি আর তুমি পাশাপাশি হাঁটছিলাম।

দু’দিন পর আবার কথা হলো।

এবার ভয় কম ছিল, দ্বিধা ছিল বেশি।
আমি জানতে চাইলাম—তুমি সুখী কি না।
তুমি জানতে চাওনি আমি সুখী কি না।
হয়তো ভেবেছিলে, প্রশ্নটা করলে উত্তর শোনার সাহস থাকবে না।

আমরা সন্তানদের কথা বললাম, কাজের কথা বললাম, সময়ের অভাবের কথা বললাম।
কিন্তু প্রতিটা কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি শুনছিলাম—
যে মানুষটাকে আমি একদিন অসম্ভব ভালোবেসেছিলাম, সে এখনো কোথাও রয়ে গেছে।

একসময় আমি বলে ফেললাম,
“আমরা কি ভুল মানুষকে বিয়ে করেছি?”

বলেই ভয় পেয়ে গেলাম।
এই প্রশ্নের উত্তর নেই—শুধু ক্ষতি আছে।

তুমি অনেকক্ষণ চুপ ছিলে।
তারপর বললে,
“আমরা হয়তো সঠিকটা করার চেষ্টা করেছি।”

এই কথার মধ্যে কোনো অভিযোগ ছিল না।
কিন্তু শান্ত স্বীকারোক্তি ছিল—ভালোবাসা আর জীবন এক জিনিস নয়।

এরপর আর কিছু বলা যায়নি।
আমি জানতাম, এখানেই থামা উচিত।
কিছু সম্পর্ক দূর থেকেই সুন্দর।

শেষবার কথা বলার সময় আমি বলেছিলাম,
“তোমার কণ্ঠটা শুনে ভালো লাগল।”

তুমি শুধু বলেছিলে,
“তুমিও ভালো থেকো।”

এই ‘ভালো থেকো’-র মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো আশা নেই।
শুধু একরাশ অতীতকে সাবধানে নামিয়ে রাখার চেষ্টা।

ফোন কেটে যাওয়ার পর আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।
বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। আলো জ্বলছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।

শুধু আমার ভেতরে কোথাও একজন দাঁড়িয়ে ছিল—
যে এখনো জানে,
কিছু মানুষ জীবনে ফিরে আসে না,
শুধু একবার নীরবে এসে মনে করিয়ে দিয়ে যায়—
তুমি একসময় খুব গভীরভাবে ভালোবেসেছিলে।

আর সেই স্মৃতিটুকুই
আজীবন চুপ করে বহন করতে হয়।

 কিছুমিছু - #কবিতা নীরবতার ভেতর তুমি মুন্নি নূরুল হুদা ১৪/০১/২০২৫ তোমার সাথে  আমার কোনো গল্প নেই, শুধু কিছু অসমাপ্ত বাক্য, সেই সব কথা মনে এলেই ...

নীরবতার ভেতর তুমি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


সেদিন কোচিং সেন্টারে নতুন ম্যাডাম মেহজাবিন রহমানের প্রথম ক্লাস।

ক্লাসে ঢুকেই যেন ঘরটা অন্যরকম হয়ে গেল। শান্ত গলা, পরিমিত হাসি, চোখে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা। বেঞ্চের এক কোণে বসে থাকা ছাত্রটি—আরিয়ান চৌধুরী, ক্লাসের পড়া ভুলে শুধু তাকিয়েই ছিল। সেই প্রথম দেখাতেই, অজান্তেই, তার ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠেছিল।

ক্লাস শেষ হলে আরিয়ান আর দশজনের মতো বেরিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু মনটা রয়ে গেল ম্যাডামের কণ্ঠে, তার চোখের গভীরতায়।

সেদিন রাতেই ফেসবুকে সার্চ—
“Mehjabin Rahman”
রিকোয়েস্ট পাঠানো হলো।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়—রিকোয়েস্টের কোনো উত্তর নেই। কোচিংয়ে সুযোগ পেলেই আরিয়ান সাহস করে বলে,
— “ম্যাডাম, ফেসবুকে একটা রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি…”
মেহজাবিন ভদ্র কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে দেন,
— “আমি স্টুডেন্টদের ফেসবুকে ফেন্ড রিকোয়েস্ট একসেন্ট করি না। আর ম্যাসেঞ্জারেও টেক্সটে কথা বলি না।”

আরিয়ান চুপ করে যায়। অপমান নয়, বরং এক ধরনের কষ্ট নিয়ে।

সবকিছু এভাবেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু এক সন্ধ্যায় বদলে যায় গল্প।

আরিয়ানের ফেসবুক স্টোরিতে একটি ছবি—বৃষ্টিভেজা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছায়া।
ক্যাপশন: “কিছু একাকীত্ব শব্দ চায় না।”

রাত এগারোটায় হঠাৎ ম্যাসেঞ্জারে একটি নোটিফিকেশন—
Mehjabin Rahman:
“ছবিটা সুন্দর। লেখাটাও।”

আরিয়ান বিশ্বাসই করতে পারেনি।
সেই একটুখানি কথাই যেন বাঁধ ভেঙে দিল। কথা হলো—কবিতা নিয়ে, বই নিয়ে, জীবনের ছোট ছোট শূন্যতা নিয়ে। মেহজাবিন জানালেন, তার স্বামী বিদেশে। মাসের পর মাস একা থাকা, দায়িত্বের ভিড়ে নিজের অনুভূতিগুলো চাপা পড়ে থাকা—সব কথা।

আরিয়ান শুনতো। খুব মন দিয়ে। খুব যত্ন করে।
সে এমনভাবে কথা বলতো, যেন শব্দ দিয়েই আগলে রাখতে চায়।

ধীরে ধীরে মেহজাবিন দুর্বল হয়ে পড়লেন।
একাকীত্বের রাতগুলোতে আরিয়ানের কথাই হয়ে উঠলো আশ্রয়।

তারা দেখা করতো না প্রায়ই। কারণ মেহজাবিন একা থাকতেন না—বাচ্চা, শ্বশুর-শাশুড়ি, সংসারের চোখ—সব সময় নজরে রাখতো তাকে।
তবু কোনো কোনো বিকেলে, কোচিং শেষ হলে, একটু দূরে চায়ের দোকানে বসে দু’মিনিট নীরব থাকা—সেটুকুই ছিল তাদের দেখা।

সব সময় কথা বলা যেতো না।
কখনো হঠাৎ কয়েকদিন নীরবতা।
তারপর আবার ফিরে আসা—
— “খুব মিস করছিলাম।”

এই সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না।
ছিল শুধু ভয়, অপরাধবোধ আর অদ্ভুত টান।

একদিন মেহজাবিন নিজেই লিখলেন—
— “আরিয়ান, এটা ঠিক না। আমি জানি।”
আরিয়ান উত্তর দিল—
— “আমি জানি ম্যাডাম। তাই তো এটাকে প্রেম বলি না… অনুভূতি বলি।”

নিষিদ্ধ বলেই হয়তো এই অনুভূতি এত গভীর ছিল।

নিষিদ্ধ বলেই তারা জানতো—এই গল্পের কোনো সুন্দর শেষ নেই।

তবু কিছু গল্প শেষের জন্য লেখা হয় না।

কিছু গল্প শুধু মনে থেকে যায়—

একটি অসম্ভব ভালোবাসার মতো,

একটি নিষিদ্ধ স্মৃতির মতো।

 No photo description available.

নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প -- মোঃ হেলাল উদ্দিন