বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেসব নাম দীর্ঘ সংগ্রাম, বিতর্ক, সাহস ও প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে, খালেদা জিয়ার নাম তাদের অন্যতম। সামরিক শাসন-পরবর্তী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশ, সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার ভেতর-বাইরে থেকে রাজনৈতিক লড়াই—সব মিলিয়ে তার জীবন এক অনবরত সংগ্রামের দলিল।
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন ছিল অনিচ্ছাকৃত ও আকস্মিক। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। ব্যক্তিজীবনে স্বল্পভাষী, গৃহিণীসুলভ পরিচয় থেকে তিনি অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের মুখ। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। সেই সময় দেশে সামরিক শাসন জেঁকে বসেছে; গণতন্ত্রের কণ্ঠ রুদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে রাজপথে নামা ছিল সাহসিকতারই নামান্তর।
আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। দলীয় বিভাজন, দমন-পীড়ন ও গ্রেপ্তার—সবকিছুর মধ্যেও তিনি আপসহীন অবস্থান ধরে রাখেন। বারবার গৃহবন্দি, সভা-সমাবেশে বাধা—কিছুই তাকে রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি। বিরোধী জোট গঠন ও আন্দোলনের কৌশলে তিনি সময়োপযোগী দৃঢ়তা দেখান। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে সামরিক শাসনের পতন এবং গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে তার নেতৃত্ব ইতিহাসে স্থায়ী আসন পায়।
১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ছিল এই সরকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরা ছিল একটি কাঠামোগত পরিবর্তন, যা রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া সম্ভব হতো না। অর্থনীতি, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিরোধিতা সরকারের কার্যকারিতাকে সীমিত করে। তবু গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে এই সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর বিরোধী দলে থেকেও খালেদা জিয়া ছিলেন আন্দোলনমুখর। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তার নেতৃত্বে আন্দোলন তীব্র হয়—যা শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক সংস্কারে রূপ নেয়। এটি বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থার সংকট মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। একই বছরে নির্বাচনে পরাজয়ের পরও তিনি রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে দলের ভেতর ঐক্য বজায় রাখেন।
২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দেন চারদলীয় জোট সরকারকে। এই মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও সামাজিক সূচকে কিছু অগ্রগতি দেখা যায়। তবে একই সঙ্গে সুশাসন, জঙ্গিবাদ দমন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা উঠে। বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সংঘাতমুখর সম্পর্ক সংসদীয় সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে—যা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে জটিল করে তোলে।
২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থায় খালেদা জিয়ার রাজনীতি এক নতুন পরীক্ষার মুখে পড়ে। গ্রেপ্তার, মামলা ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার সময় তিনি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক—উভয় সংকটে পড়েন। তবু দল পুনর্গঠন ও নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রয়াস অব্যাহত থাকে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তিনি আপসহীন রাজনীতির প্রতীক হিসেবেই দলের ভেতরে সমর্থন বজায় রাখেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘ অসুস্থতা, কারাবাস ও আইনি লড়াই খালেদা জিয়ার সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দেয়। রাজনৈতিক সক্রিয়তা সীমিত হলেও তার উপস্থিতি প্রতীকী শক্তিতে রূপ নেয়। সমর্থকদের কাছে তিনি প্রতিরোধের প্রতীক; সমালোচকদের কাছে তিনি বিতর্কিত শাসনের স্মৃতি। এই দ্বৈততা তার রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন তাই একরৈখিক নয়; বরং তা উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা ও বিতর্কের সমন্বয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গভীরতর করতে ব্যর্থতার দায়ও এড়ানো যায় না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নই দাবি করে। ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান, প্রতিহিংসার চেয়ে সংলাপ এবং ক্ষমতার চেয়ে নিয়ম—এই শিক্ষাই হয়তো তার দীর্ঘ সংগ্রাম থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উত্তরাধিকার।
(মোঃ হেলাল উদ্দিন- শিক্ষক, লেখক ও গবেষক)
