আমি জানি না কেন সেদিন হঠাৎ করে তোমার নম্বরটা খুঁজে বের করলাম।
এক যুগ হয়ে গেছে—এত বছরে মানুষ ভুলে যায়, অভ্যস্ত হয়, নিজেকে বোঝায়। আমিও বোঝাতাম। সংসার, সন্তান, দায়িত্ব—সবই আছে। তবু কিছু রাতে বুকের ভেতর এমন এক শূন্যতা জমে, যার কোনো নাম নেই।
সেদিন বিকেলে আকাশটা খুব শান্ত ছিল। অকারণ শান্ত।
হাত কাঁপছিল ফোন ডায়াল করার সময়। মনে হচ্ছিল—আমি কি কোনো সীমা লঙ্ঘন করছি?
তবু কলটা চলে গিয়েছিল।
রিং গেল।
একবার।
দু’বার।
যখন তুমি “হ্যালো” বললে, আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিলাম।
কারণ তোমার গলা আমার কল্পনার মতো বদলায়নি।
একটু ভারী, একটু ক্লান্ত—তবু চেনা।
“আমি… কেমন আছো জানতে চাচ্ছিলাম।”
এইটুকু বলার জন্য এত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল!
তুমি ভদ্র ছিলে। খুব ভদ্র।
আমিও।
কথা এগোয়নি।
যেন দু’জনেই জানতাম—কিছু কথা আছে, যেগুলো বলা মানেই বিপদ।
ফোনটা কাটার পর অনেকক্ষণ বসে ছিলাম।
ঘরের মানুষজনের কোলাহল, রান্নাঘরের শব্দ—সবই হচ্ছিল, অথচ আমার ভেতরে কেবল একটা পুরোনো বিকেল আটকে ছিল, যেখানে আমি আর তুমি পাশাপাশি হাঁটছিলাম।
দু’দিন পর আবার কথা হলো।
এবার ভয় কম ছিল, দ্বিধা ছিল বেশি।
আমি জানতে চাইলাম—তুমি সুখী কি না।
তুমি জানতে চাওনি আমি সুখী কি না।
হয়তো ভেবেছিলে, প্রশ্নটা করলে উত্তর শোনার সাহস থাকবে না।
আমরা সন্তানদের কথা বললাম, কাজের কথা বললাম, সময়ের অভাবের কথা বললাম।
কিন্তু প্রতিটা কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি শুনছিলাম—
যে মানুষটাকে আমি একদিন অসম্ভব ভালোবেসেছিলাম, সে এখনো কোথাও রয়ে গেছে।
একসময় আমি বলে ফেললাম,
“আমরা কি ভুল মানুষকে বিয়ে করেছি?”
বলেই ভয় পেয়ে গেলাম।
এই প্রশ্নের উত্তর নেই—শুধু ক্ষতি আছে।
তুমি অনেকক্ষণ চুপ ছিলে।
তারপর বললে,
“আমরা হয়তো সঠিকটা করার চেষ্টা করেছি।”
এই কথার মধ্যে কোনো অভিযোগ ছিল না।
কিন্তু শান্ত স্বীকারোক্তি ছিল—ভালোবাসা আর জীবন এক জিনিস নয়।
এরপর আর কিছু বলা যায়নি।
আমি জানতাম, এখানেই থামা উচিত।
কিছু সম্পর্ক দূর থেকেই সুন্দর।
শেষবার কথা বলার সময় আমি বলেছিলাম,
“তোমার কণ্ঠটা শুনে ভালো লাগল।”
তুমি শুধু বলেছিলে,
“তুমিও ভালো থেকো।”
এই ‘ভালো থেকো’-র মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো আশা নেই।
শুধু একরাশ অতীতকে সাবধানে নামিয়ে রাখার চেষ্টা।
ফোন কেটে যাওয়ার পর আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।
বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। আলো জ্বলছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
শুধু আমার ভেতরে কোথাও একজন দাঁড়িয়ে ছিল—
যে এখনো জানে,
কিছু মানুষ জীবনে ফিরে আসে না,
শুধু একবার নীরবে এসে মনে করিয়ে দিয়ে যায়—
তুমি একসময় খুব গভীরভাবে ভালোবেসেছিলে।
আর সেই স্মৃতিটুকুই
আজীবন চুপ করে বহন করতে হয়।
নীরবতার ভেতর তুমি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন
