Thursday, July 2, 2026

অপেক্ষার নির্জনতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

পাখির বুকের ভেতর অনেক দিন ধরেই একটি অদ্ভুত ইচ্ছে বাসা বেঁধেছে। শহরের কোলাহল, মানুষের ভিড় আর হাজারো দায়িত্বের বাইরে—কোনো এক নির্জন পাহাড়, নদীর ধারে কিংবা জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় একটি রাত কাটাতে চায় সে। সেই রাতের আকাশে থাকবে অসংখ্য তারা, চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর পাশে থাকবে একজন মানুষ—যাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে খুব অপ্রত্যাশিতভাবে।

এই গল্পের শুরু মাত্র ছয় মাস আগে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান। চারদিকে রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, রঙিন শাড়িতে সেজে ওঠা শিক্ষার্থীরা। ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী পাখিও সেদিন শাড়ি পরে এসেছিল। ইতিহাসের ছাত্রী হলেও তার চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য, যা প্রথম দর্শনেই নজর কাড়ে বাংলা সাহিত্যের এক তরুণ শিক্ষকের।

লোকটি দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রেখেছে—সে বিয়ে করবে না। সাহিত্য, বই, গবেষণা আর শিক্ষার্থীদের নিয়েই কাটিয়ে দেবে জীবন।

কিন্তু মানুষের সব প্রতিজ্ঞা কি হৃদয়ের কাছে টেকে?

অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে তিনি পাখির সঙ্গে কথা বললেন।

—"রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, 'প্রেমের আনন্দ থাকে স্বল্পক্ষণ, কিন্তু বেদনা থাকে সারাটি জীবন।' বলো তো, ইতিহাসের ছাত্রী হয়ে প্রেমকে কীভাবে দেখো?"

পাখি একটু হেসে বলেছিল,

—"ইতিহাস শেখায়, মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বাইরের নয়, নিজের ভেতরের।"

সেদিনের সেই কয়েক মিনিটের কথোপকথন দুজনের মনেই অদ্ভুত এক রেখা এঁকে দিয়েছিল।

তারপর সময় চলে যায়।

ক্যাম্পাসে আর দেখা হয় না।

একদিন পাখিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে খুঁজে নেয়।

প্রথমে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা, তারপর বই নিয়ে আলোচনা, কবিতা, ইতিহাস, জীবনদর্শন, রাত জেগে দীর্ঘ কথোপকথন। ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে—তাদের ভাবনার জগৎ আশ্চর্য রকমের মিল।

তবু তাদের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

পাখি বিবাহিত।

আর মানুষটি নিজের প্রতিজ্ঞার কাছে আজও দায়বদ্ধ।

কেউ কারও সীমা অতিক্রম করে না।

তবু কিছু সম্পর্কের জন্ম হয়, যাদের কোনো সামাজিক পরিচয় থাকে না—থাকে শুধু অনুভব।

একদিন গভীর রাতে পাখি লিখল—

"জানো, আমার খুব ইচ্ছে কোনো এক নির্জন জায়গায় তোমার পাশে বসে একটি রাত কাটাই। কোনো দাবি থাকবে না, কোনো স্পর্শের প্রয়োজনও নেই। শুধু গল্প করব, আকাশ দেখব, আর মনে রাখব—জীবনে এমন একটি রাত ছিল।"

অনেকক্ষণ উত্তর এল না।

শেষ পর্যন্ত তিনি লিখলেন—

"ইচ্ছেটা সুন্দর। কিন্তু সুন্দর সব ইচ্ছে পূরণ করা যায় না।"

পাখি লিখল—

"তাহলে তুমি চাও না?"

তিনি দীর্ঘক্ষণ অনলাইনে থেকেও কিছু লিখলেন না।

অবশেষে শুধু একটি বাক্য ভেসে এল—

"চাই বলেই ভয় পাই।"

পাখির চোখ ভিজে উঠল।

সে বুঝল, মানুষটি তাকে অস্বীকার করেনি।

বরং সম্মান করেছে।

ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন রূপ হয়তো এটাই—যেখানে নিজের চাওয়ার চেয়ে প্রিয় মানুষের মর্যাদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তারপরও তাদের কথা হয়।

কবিতা নিয়ে, জীবন নিয়ে, ইতিহাস আর সাহিত্য নিয়ে।

মাঝেমধ্যে পাখি নির্জন পাহাড়ের ছবি পাঠায়।

লিখে—

"একদিন যদি..."

তিনি উত্তর দেন—

"কিছু স্বপ্ন বাস্তবে পূরণ না হলেও হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকুক। সব ভালোবাসার ঠিকানা একসঙ্গে থাকা নয়; কিছু ভালোবাসার ঠিকানা শুধু স্মৃতি।"

আজও তারা অপেক্ষা করে।

কেউ কারও জন্য নয়, বরং এমন এক সময়ের জন্য—যেখানে ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখতে হবে না, আবার ভালোবাসার নামে কাউকে আঘাতও করতে হবে না।

হয়তো সেই নির্জন রাত কোনো দিন আসবে না।

কিন্তু সেই রাতের স্বপ্ন—তাদের দুজনের হৃদয়ে নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকবে, নীরবে, দূরত্ব বজায় রেখেই।

কারণ সব প্রেমের পরিণতি মিলন নয়।

কিছু প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি হলো—সংযম, সম্মান, আর নীরব অপেক্ষা।



অপেক্ষার নির্জনতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন 

Sunday, June 21, 2026

বাঁশঝাড়ের পেত্নী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাঁশঝাড়টা দিনের বেলাতেও কেমন যেন একটা থমথমে ছায়া ফেলে রাখত। সন্ধ্যার পর সেখানে অন্ধকার জমাট বাঁধলে মনে হতো, ওটা আর কেবল গাছের ঝাড় নয়—জীবন্ত কোনো রহস্যের আস্তানা।

ঠিক সেইরকম এক অন্ধকার রাতে নানু আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে বারান্দায় বসতেন। কাঁসার থালায় দুধকলা দিয়ে ভাত মেখে যখন আমাদের মুখে লোকমা তুলে দিতেন, তখনই শুরু হতো আসল জাদু। নানু তার বড় বড় চোখ জোড়া আরও বড় করে বলতেন, "শোন, তোদের বড়ব্বা হারিকেন জ্বালিয়ে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াতেন..."

কথাটা শোনা মাত্রই আমাদের তলপেটে একটা কঠিন মোচড় দিতো। মুখের খাবার চিবোতে ভুলে গিয়ে আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। পরের লাইনে কী আছে, তা জিজ্ঞেস করতেও বুক কাঁপত। নানু আমাদের মনের অবস্থা বুঝে একটু হাসতেন, তারপর বিশাল এক ভাব নিয়ে বলতেন, "একটু খানি বোস, একটা পান মুখে দিয়ে আসি।"

আমরা তখন প্রমাদ গুনতাম। হায় হায়! গল্পের এই মোক্ষম সময়েই নানুর পান পিপাসা পেতে হলো?

নানু ঘরের কোণ থেকে তার চেনা পানের বাটাটা টেনে নিতেন। তারপর বিখ্যাত হাকিমপুরী জর্দা দিয়ে একটা ঢাউস সাইজের পান মুখে পুরে পুনরায় গল্পের আঞ্জাম দিতেন, "কোথায় যেন ছিলাম?"

আমরা ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিতাম, "বড়ব্বা হারিকেন নিয়ে..."

"হ হ, মনে পড়ছে," নানু জর্দামিশ্রিত পান চিবোতে চিবোতে শুরু করতেন, "তোদের বড়ব্বা যেইনা নদীর পাড়ের ওই বাঁশঝাড়ের নিচে পা বাড়িয়েছেন, অমনি চারপাশটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বন্ধ, হারিকেনের আলোটাও দপ করে একটু কমে গেল। বড়ব্বা ওপরের দিকে তাকাতেই দেখলেন—এক পেত্নী বাঁশঝাড়ের একদম মগডালে বসে আছে! তার কুচকুচে কালো লম্বা চুল ওপর থেকে একদম মাটি পর্যন্ত বিছানো!"

আমরা তখন ভয়ে একজন আরেকজনের গায়ে গা লাগিয়ে লেপ্টে বসতাম। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত। কোনোমতে ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করতাম, "বড়ব্বা... বড়ব্বা ভয় পায়নি নানু?"

নানু তখন পিক ফেলার জন্য একটু থামতেন। মুখে একটা বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে খুব গর্ব করে বলতেন, "আরে না! তোদের বড়ব্বা কি তেমন তেমন লোক? ওনার কোমরে গোঁজা থাকত খাঁটি লোহার একটা ছোরা। ভূত-পেত্নী নাকি লোহা দেখলে যমের মতো ভয় পায়!"

নানু বলতে লাগলেন, "বড়ব্বা এক চুলও না নড়ে গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন, 'কে রে ওখানে? ভালো চাস তো রাস্তা ছাড়!' কিন্তু পেত্নী কি আর অত সহজে শোনে? সে ওপর থেকে এক খিলখিল হাসিতে চারপাশ কাঁপিয়ে তুলল, আর নিজের লম্বা চুলগুলো দিয়ে বড়ব্বার হারিকেনটা আড়াল করার চেষ্টা করল।"

আমরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। নানু বলে চললেন, "বড়ব্বা তখন আর দেরি করলেন না। কোমর থেকে চট করে সেই লোহার ছোরাটা বের করে হারিকেনের আলোয় চকচকে ফলাটা পেত্নীর দিকে তাক করলেন। লোহা দেখামাত্রই পেত্নীর সেই খিলখিল হাসি কান্নায় মোড় নিল। সে এক ঝটকায় তার চুলগুলো গুটিয়ে নিয়ে শাঁ করে বাঁশঝাড়ের ওপারে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিকের বাঁশগুলো মটমট করে এমনভাবে নড়ে উঠেছিল, যেন এখনই ভেঙে পড়বে! কিন্তু তোদের বড়ব্বা বুক ফুলিয়ে, সেই হারিকেন দুলিয়ে দুলিয়ে হেঁটে ঠিক বাড়ি ফিরে এলেন।"

গল্প শেষ হতো, কিন্তু আমাদের বুকের ধকধকানি থামত না। ভাত খাওয়া শেষে যখন শোবার ঘরে যেতাম, জানালার ফাঁক দিয়ে দূরের সেই বাঁশঝাড়ের দিকে তাকালে মনে হতো—সত্যিই বুঝি কোনো এক জোছনা রাতে বা অমাবস্যার অন্ধকারে সেখানে কেউ চুল মেলে বসে আছে।

আজ এত বছর পরও, নানু নেই, সেই শৈশবও নেই। কিন্তু ঘরের কোণে রাখা এই ছোট্ট বাঁশঝাড়ের মিনিয়েচারটার দিকে তাকালে এখনো কানে বাজে নানুর সেই জর্দা চিবানোর আওয়াজ আর খিলখিল করে ওঠা পেত্নীর গল্প।



 বাঁশঝাড়ের পেত্নী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন