Sunday, December 28, 2025

শহিদ ওসমান হাদির একমাত্র কাব্যগ্রন্থ “লাভায় লালশাক পুবের আকাশ” -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

শহিদ শরীফ ওসমান বিন হাদির লেখা একমাত্র কাব্যগ্রন্থের নাম “লাভায় লালশাক পুবের আকাশ।”

কাব্যগ্রন্থটি তিনি সীমান্ত শরিফ নামে লিখেছেন।প্রকাশিত হয় — ২০২৪ সালের বইমেলায়। কাব্যগ্রন্থটিতে কবিতা আছে — ৩২টি।

লেখক আসিফ মাহমুদ বইটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তার কাব্যগ্রন্থের কবিতামালায় আলাপ তুলেছেন, মুসলিমদের ঈমানের অংশ আল কুদস নিয়ে, বিবরণ দিয়েছেন নির্যাতনের, দ্রোহ তুলেছেন পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ইয়াহুদীদের প্রতি। আলাপ তুলেছেন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। এই বয়সে এসে কবির বেশ করে মনে পড়লো ছাত্রাবাসের দিনগুলির কথা। একটি কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন–মৃত্যুর পরে তার মায়ের আবদার, বাবাকে নিয়ে আলাপ তুলেছেন অন্য একটি কবিতায়। তার কাব্যগ্রন্থে প্রেম, প্রীতি, ভালবাসাও স্থান পেয়েছে ভীষণভাবে।’

‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’ কবিতায় কবি তাকে হত্যা করার আকুতি জানিয়েছেন। ফুটিয়ে তুলেছেন মুদ্রাস্ফীতি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতি। তিনি বলেছেন, দোজখের ভয়ে তিনি আত্মহত্যা করতে চান না। তাই এই রাষ্ট্র নামক জাহান্নামে তাকে হত্যা করা হোক।

‘মায় মরণের ছবি আঁকে’ কবিতায় তার মায়ের সঙ্গে আলাপ করছেন। মৃত্যুর পরে কবি যেন মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সুরা পাঠ করেন। তবে কবির আকুতি হলো, আলিফের মতো মায়ের শরীরটা বাঁকা হয়ে গেলেও মা যেন আর ক’টা দিন বেঁচে থাকেন। মাটির চুলায় রান্না করেন। মৃত্যু হলে যেন দু’জনের একসঙ্গেই হয়। তাই তো এ কবিতায় মায়ের প্রতি নিদারুণ ভালোবাসা ফুটে উঠেছে।

‘আকসার কয়লা’ কবিতায় গাজার বিমর্ষ চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন—‘মায়েরা বাচ্চাদের পায়ে নাম লিখে রাখছে। যেন লাশ হওয়ার পরে চিনতে পারে’। কবি এই কবিতায় বাইতুল মাকদিসের মুক্তি প্রত্যাশা করেছেন। কবির ভাষায়, ‘আল্লা গো, আদি কেবলা আকসার দোহাই/ গাজার শিশুদের দিকে একটু তাকাও—/ আরশ থেকে ওদের ছেঁড়া কলিজা কি দেখা যায় না?’

‘সার্বভৌমত্ব’ শিরোনামের কয়েক লাইনের কবিতাটি খুব উপলব্ধির। তিনি মায়ের সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্বকে তুলনা করেছেন। তিনি যেমন সব সময় মায়ের আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকতে চান; তেমনই সব সময় মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হোক—এটাই কামনা করেছেন। এই কবিতায় নাগরিকদের অধিকারের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

‘বোডিং’ কবিতায় পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়ার স্মৃতি তুলে ধরেছেন। চৈত্র মাসে রোদের মধ্যে বাবা আসবাবপত্র মাথায় নিয়ে রওয়ানা হয়েছেন ছাত্রাবাসের দিকে। কবি পাঠশালায় হাজির হওয়ার পর পুরোনা শিক্ষার্থীরা ভয় দেখাচ্ছিলেন। কবি আরও বলেছেন, ‘অসুখ হলে ছুটি নাই। কাঁদলে নাম কাটা।’

‘প্রেমোগ্রাফি’ কবিতায় প্রেম বলতে বুঝিয়েছেন, শত লাবণ্যে হৃদয়ে চিড় ধরার প্রত্যাবর্তনের মতো। কবি অর্ধাঙ্গিনীর শূন্য ডিসটেন্সকে প্রেম বলেছেন। তিনি মনে করেন প্রেমের কোনো বিছানা হয় না। প্রেম বলতে বোঝেন একটি প্রতিরোধের আঙিনা। অবৈধ প্রেমকে সাহারা মরুভূমি ও পাপের প্রাসাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তথ্যসূত্রঃ জাগোনিউজ।

 

বই: লাভয় লালসাক পুরের আকাশ
লেখক: ওসমান হাদি
প্রকাশক: দুয়ার

মূল্য: ২০০ টাকা

জীবন পাল্টে দিতে পড়ুন Turning Points -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

ড. এ পি জে আবদুল কালামের Turning Points মূলত তাঁর আত্মজীবনের দ্বিতীয় পর্ব, যেখানে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকাল এবং তার পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা, দ্বিধা, সিদ্ধান্ত ও আত্মসমালোচনার বিবরণ তুলে ধরেছেন। Wings of Fire যেখানে স্বপ্ন নির্মাণের গল্প, সেখানে Turning Points হলো স্বপ্ন রক্ষার কঠিন বাস্তবতার দলিল।
 
✦ ‘টার্নিং পয়েন্ট’—একটি দার্শনিক ধারণা
কালামের কাছে টার্নিং পয়েন্ট মানে হঠাৎ সাফল্য নয়, বরং দায়িত্বের মুহূর্ত। তিনি লিখেছেন—
“Life is a difficult game. You can win it only by retaining your birthright to be a person.”
এই উক্তির মাধ্যমে লেখক বোঝাতে চান, জীবনের প্রতিটি সংকট আমাদের মানবিকতা রক্ষা করার পরীক্ষা নেয়। ক্ষমতা, পদ বা সাফল্যের চেয়েও মানুষের পরিচয় বড়—এটাই তাঁর দর্শনের মূল কথা।
 
✦ নেতৃত্ব: ক্ষমতা নয়, দায়বদ্ধতা
রাষ্ট্রপতির মতো সর্বোচ্চ পদেও কালাম নিজেকে জনগণের অভিভাবক হিসেবে দেখেছেন, শাসক হিসেবে নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন—
“Leadership is about taking responsibility, not making excuses.”
এই বক্তব্য বইটির নেতৃত্ব-দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি দেখান, সত্যিকারের নেতা সংকট এলে দায় এড়িয়ে যান না, বরং সিদ্ধান্তের ভার নিজ কাঁধে নেন—যা সমকালীন রাজনীতির জন্যও এক শক্তিশালী নৈতিক বার্তা।
 
✦ ব্যর্থতা ও আত্মসমালোচনা
Turning Points–এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কালামের নির্ভীক আত্মসমালোচনা। তিনি ব্যর্থতাকে গোপন করেননি, বরং তা থেকে শেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়—
“Failure will never overtake me if my determination to succeed is strong enough.”
এই উক্তি ব্যর্থতাকে ভয় নয়, আত্মগঠনের উপকরণ হিসেবে চিহ্নিত করে। বিশেষত শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য এটি গভীর অনুপ্রেরণার উৎস।
 
✦ সিদ্ধান্ত ও নৈতিক সংকট
বইয়ের নানা অংশে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বিভিন্ন নৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটে কালাম কীভাবে নিজের বিবেককে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেন—
“In matters of conscience, the law of the majority has no place.”
এই উক্তির মধ্য দিয়ে কালাম সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও নৈতিক সত্যকে গুরুত্ব দেন—যা তাঁকে একজন রাষ্ট্রনায়ক থেকে দার্শনিকে উন্নীত করে।
 
✦ শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
কালামের সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিলো তরুণ সমাজ। বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন—
“Dream, dream, dream. Dreams transform into thoughts and thoughts result in action.”
এই উক্তি কেবল প্রেরণামূলক নয়, বরং তাঁর জীবনদর্শনের সারাংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন—জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিক্ষিত, নৈতিক ও স্বপ্নবান তরুণদের ওপর।
 
✦ ভাষা ও রচনাশৈলী
বইটির ভাষা সরল, কিন্তু চিন্তায় গভীর। কোথাও আবেগের অতিরঞ্জন নেই, নেই আত্মপ্রশংসা। বরং রয়েছে এক ধরনের সংযত আত্মদর্শন। বিজ্ঞানী হিসেবে যুক্তিবোধ এবং দার্শনিক হিসেবে মানবিকতা—এই দুইয়ের সম্মিলনেই বইটির সৌন্দর্য।
 
Turning Points কেবল একটি আত্মজীবনী নয়; এটি জীবনের সংকটময় মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নৈতিক নির্দেশিকা। এই বই আমাদের শেখায়—
মানুষ তার পদ দিয়ে নয়, তার সিদ্ধান্ত দিয়েই স্মরণীয় হয়।
ড. এ পি জে আবদুল কালামের এই গ্রন্থ পাঠককে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠতে অনুপ্রাণিত করে।
 
 

বইঃ Turning Points: A Journey Through Challenges
লেখকঃ এ পি জে আবদুল কালাম

'পুনশ্চ ' নিয়ে কিছু কথা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

 

রবীন্দ্রনাথকে বহুভাবে আবিষ্কার করবার কলা-কৌশল বাঙালি বহুদিন থেকে কখনো এককভাবে কখনো সামগ্রিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ অব্যাহত প্রচেষ্টা ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে আরো মহিমান্বিত ও ঔজ্জ্বল্য দান করেছে।

রবীন্দ্রনাথ সর্বকালে সবসময়ই আধুনিক। স্মৃতিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনি। বিশ্বপ্রকৃতির মাঝে আমরা বারবার রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাই। সর্বপ্রাণবাদের দ্যোতনা তাঁর চিন্তা ও সাধনার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতি থেকে শিশুচিত্তের যে আনন্দ জয় করা যায় সেদিকে রবীন্দ্রনাথ বারবার তাঁর দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছেন।

পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আত্মভোলা শিশুও যে প্রকৃতির মায়ায় ঘর থেকে বের হয়ে এসে আর গৃহে ফিরতে চায়না তার মনের ভাবকে বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গে তিনি উপস্থাপন করেছেন। শিশুদের মনের জগতকে তিনি যেন নিজের মানসচক্ষু দিয়ে দেখতেন। কবির ভাষায়-
তুমি বলো তিনু প্রশ্রয় পায় আমার কাছে
তাই রাগ কর তুমি।
ওকে ভালবাসি,
তাই ওকে দুষ্টু বলে দেখি,
দোষী বলে দেখি নে।

পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ পাঠ করলে রবীন্দ্রনাথের জীবনের শুরু থেকে যৌবনের যে জয়গান এবং কবিতার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের অবিচ্ছিন্ন চিন্তা ও ভাবের খোরাক যুগিয়েছেন। প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ক প্রত্যক্ষ বাস্তবতার আলোকে তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে প্রতিটি কবিতার সারমর্ম আপন মহিমায় পাঠকের জন্য উপস্থাপন করেছেন।

'বাঁশি' কবিতা পাঁচ স্তবকের বিষয়টিতে একেবারে জীবনঘনিষ্ঠ। ধলেশ্বরী নদী তীরে পিসিদের গ্রাম/তাঁর দেওরের মেয়ে/অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক/লগ্নশুভ, নিশ্চিত প্রমান পাওয়া গেল/সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে/মেয়েটা তো রক্ষে পেলে/আমি তথৈবচ।

সাহসহীনতার কারণে এবং মনের দৈন্যের কারণেই হোক নায়ক চরিত্রের ভেতর পলায়নবৃত্তি মনোভাব বারবার উঠে এসেছে। দৃঢ়তা নেই। তারপর সময় ও পারিপার্শ্বিকতার ছাপ এখানে পরিস্ফুট। জগতের সকল পূর্ণতা থেকে যেন সে বহুদূরে। এই যে একজন মানুষের মনের দৈন্য ও সবকিছু না পাওয়ার যে বেদনা তা এ কবিতায় ধ্রুপদী ঢংয়ে এগিয়েছে পাঠকের হৃদয়ের ভেতরে। মন যেন ঢেউ তোলা স্পন্দন। আকাঙ্ক্ষার যেন কোন শেষ নেই।

 
 

বইঃ পুনশ্চ
লেখকঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল্যঃ ২০০ টাকা

Wednesday, December 24, 2025

স্মৃতিতে ওসমান হাদী -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


শহীদ ওসমান হাদীর সাথে আমার তেমন বিশেষ কোন স্মৃতি নেই তবু এই লেখা, কারণ তাঁর মৃত্যুটা সবার মতো আমারও মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এই মনের কষ্টকে যদি কিছুটা লাঘব করা যায় তাই কিছু লেখার চেষ্টা।

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদী— কিংবা শহীদ ওসমান হাদী; নামের আগে-পিছে যাই যুক্ত হোক, আমার কাছে সে ছিল কেবলই ওসমান। এক নিঃশব্দ, দৃঢ়চেতা মানুষ। যার আসল নাম মোঃ ওসমান গনি— নামটি তাঁর কফিনে লেখা ছিল, আর সেই নাম নিয়েও যখন অপপ্রচারের কোলাহল উঠেছিল, তখন মনে হয়েছিল— মানুষ মরেও শান্তি পায় না, যদি সে সত্যের পথে হাঁটে।

ওসমানের সঙ্গে আমার পরিচয় শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালের দিকে, পারিবারিক আত্মীয়তার এক নীরব সেতু বেয়ে। সম্পর্কটা ছিলো এমন— ওসমানের বড় বোন আর আমার ছোট বোন দুই জা; মানে ওসমানের বড় ভগ্নীপতি আর আমার ভগ্নীপতি আপন দুই ভাই। সেই সূত্রেই ২০১০ সালের দিকে একবার তাদের বাসায় যাওয়া। সেই যাওয়া যেন ছিল ভবিষ্যতের অনেক স্মৃতির প্রথম দাগ।

ওসমানের ভগ্নীপতির মুখে তাদের ছয় ভাইবোনের গল্প শুনতাম। বিশেষ করে ওমর আর ওসমানের কথা— তাদের শৈশব, সংগ্রাম, সততা, দায়িত্ববোধ। তখন সেসব গল্প শুধু গল্পই ছিল, আজ বুঝি— সেগুলো ছিল ভবিষ্যৎ শহীদের জীবনপাঠের ভূমিকা।

২০১২ সাল। ঢাকা শহরে পড়াশোনার ব্যস্ত সময়েই ওসমান আর ওমর হারায় তাদের বাবাকে। বাবার মৃত্যু ছিল যেন একটি পাহাড় ভেঙে পড়া— একদিকে মানসিক শূন্যতা, অন্যদিকে সংসারের চাপ। সেই শূন্যতা আর চাপ ওসমানের জীবনকে আমূল নাড়িয়ে দেয়। কেননা তার বাবা ছিলো তাঁর জন্য সৃষ্টিকর্তার বিশেষ নিয়ামত যার কারনে ওসমানের এই ওসমান হাদী হয়ে উঠা। পরবর্তীতে তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সে কথার প্রতিধ্বনি আমরা সবাই শুনেছি। অসুস্থতাও তাঁকে পেয়ে বসেছিল, পড়াশোনায় তৈরি হয়েছিল বাধা। তবু ওসমান ছিলেন সেই মানুষ, যে ভাঙে না— ভেঙে নিজেকে গড়ে তোলে। সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেছিল ভালো ফলাফল নিয়ে।

ইংরেজিতে তার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। সেই দক্ষতাই একসময় তার আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। কিন্তু ওসমান কেবল নিজের জন্য বাঁচেনি— সে সবসময় অন্যকে সহায়তা করতে চাইত, পাশে দাঁড়াতে চাইত। তার উদারতা ছিল নীরব, প্রচারবিমুখ।

আমার চিন্তাধারা আর ওসমানের চিন্তাধারা ছিল প্রায় বিপরীত মেরুর। যুক্তিতর্কে সে এতটাই পারদর্শী ছিল যে তার সঙ্গে আমার কথাবার্তা খুব বেশি হতো না। তাই ব্যক্তিগত স্মৃতির ঝুলি খুব ভারী নয়। তবু আজ এই লেখা— কারণ এমন উদার মনের, এমন দৃঢ় বিশ্বাসী মানুষের এভাবে চলে যাওয়া মানা যায় না।

ওসমান কবিতা লিখত। আমিও লিখতাম। কিন্তু আমাদের কবিতার পৃথিবী ছিল আলাদা। আমার কবিতায় ছিল প্রেম, বিরহ, অনুভবের নরম আলো-ছায়া; আর ওসমানের কবিতায় ছিল বিদ্রোহ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা, মুক্তির গান। সে একসময় আমার ‘কবিতার খাতা’ গ্রুপে কবিতা দিত, তারপর একসময় আর দেয়নি— হয়তো তার ভেতরের আগুন তখন অন্য ভাষা খুঁজছিল।

ওসমানের স্মৃতি মনে পড়লেই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার কবিতার বই প্রকাশের সময়টা। সে যখন বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিল, আমাকে জানাল। প্রচ্ছদ পছন্দ করতে বলল। আমি একটি পছন্দ করে দিলাম। পরে ফেসবুকে তিনটি প্রচ্ছদ নিয়ে ভোটের আয়োজন হলো— আমার পছন্দটাই টিকে গেল। আজ যখন তার ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ বইটি চোখে পড়ে, বুকের ভেতর কোথাও যেন ভারী একটা ঢেউ উঠে আসে।

আরও বেশি ভারী লাগে তখন— যখন নিজের মেয়েকে নিয়ে দুষ্টুমি করি। হঠাৎ মনে হয়, একই বয়সী ওসমানের ছেলেটা কোথায় পাবে বাবার আদর, বাবার কাঁধ, বাবার ছায়া? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই— শুধু নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

ওসমানের মেধা, শ্রম আর যোগ্যতা এমন ছিল যে সে চাইলে অনায়াসেই প্রথম শ্রেণির কোনো চাকরি নিয়ে নিশ্চিন্ত, সাজানো জীবন বেছে নিতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। সে বেছে নিয়েছিল বাংলার বুকে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মতো কঠিন, বিপজ্জনক পথ। আর সেই পথই একদিন একটি বুলেট দিয়ে তার আজীবনের স্বপ্নকে থামিয়ে দিল।

তবু সত্য এটাই— ওসমান হাদীকে শারীরিকভাবে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া গেলেও তার চিন্তাকে, তার স্বপ্নকে কেউ হত্যা করতে পারেনি। বরং তার রক্ত সেই স্বপ্নকে আরও বিস্তৃত করে দিয়েছে, আরও দৃঢ় করে তুলেছে।

হে ওসমান হাদী, পরপারে ভালো থেকো।

তোমার শহিদী মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা আল্লাহ কবুল করেছেন।

ইনসাফ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তুমি বুকে লালন করেছিলে— সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই তা একদিন বাস্তবায়ন করবেন।

তুমি নেই, কিন্তু তোমার চিন্তা আজও বেঁচে আছে— আগুনের মতো, আলোর মতো।

স্মৃতিতে ওসমান হাদী — মোঃ হেলাল উদ্দিন

Wednesday, November 19, 2025

বাংলাদেশ একটি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র: বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

সারসংক্ষেপ (Abstract)

এই গবেষণায় বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের ভূমিকা কতটা প্রভাবশালী এবং সেটি গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণার তথ্য বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন, নীতিপত্র, এবং সরকারি প্রশাসন সম্পর্কিত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে সংগৃহীত। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রশাসন এখনও কেন্দ্রীয়, আমলাতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবাধীন। দুর্নীতি, জবাবদিহিতার অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক চরিত্রকে দুর্বল করেছে। প্রবন্ধে এই সমস্যাগুলোর পেছনের কারণ, বর্তমান অবস্থা এবং সংস্কারের সম্ভাব্য দিকগুলো বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।


ভূমিকা (Introduction)

প্রশাসন রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, নীতি বাস্তবায়ন, ও জনগণের সেবা প্রদানে প্রশাসনের কার্যকারিতা অপরিহার্য। কিন্তু যখন প্রশাসন জনগণের সেবক না হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র হয়ে পড়ে আমলাতান্ত্রিক। বাংলাদেশে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও প্রশাসনিক কাঠামোতে উপনিবেশিক ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা যায় “বিউরোক্রেসি-ডমিনেটেড স্টেট” — যেখানে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই আমলাদের প্রভাব নির্ণায়ক।

এই প্রবন্ধে বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের উৎপত্তি, বিকাশ, বর্তমান রূপ এবং এর প্রভাব গবেষণামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কারের সম্ভাব্য পথনির্দেশও আলোচিত হয়েছে।


গবেষণার উদ্দেশ্য (Objectives of the Study)

১. বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্ধারণ করা।

২. বর্তমান সময়ের আমলাতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ও সমস্যাগুলো সনাক্ত করা।

৩. আমলাতন্ত্রের প্রভাব বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের ওপর বিশ্লেষণ করা।

৪. প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রদান করা।


গবেষণার পদ্ধতি (Methodology)

এই গবেষণায় গুণগত পদ্ধতি (Qualitative Method) অনুসরণ করা হয়েছে। তথ্য সংগৃহীত হয়েছে —

বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যম (যেমন The Daily Star, বাংলাট্রিবিউন, যুগান্তর, কালের কণ্ঠ)

সরকারি প্রশাসন কমিশনের প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক গবেষণা নিবন্ধ (যেমন ResearchGate, Atlantic Council, Transparency International Bangladesh)

প্রাসঙ্গিক একাডেমিক গ্রন্থ যেমন “Modern Bureaucracy and South Asian Governance”

তথ্য বিশ্লেষণে তুলনামূলক ও বর্ণনামূলক পদ্ধতি (Descriptive and Analytical Method) ব্যবহার করা হয়েছে।


তাত্ত্বিক কাঠামো (Theoretical Framework)

ম্যাক্স ওয়েবারের আমলাতন্ত্র তত্ত্ব এই গবেষণার মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি। ওয়েবারের মতে, আদর্শ আমলাতন্ত্রে থাকে —

১. স্পষ্ট নিয়ম ও নীতি,

২. নির্দিষ্ট দায়িত্ববণ্টন,

৩. কর্তৃত্বের স্তরবিন্যাস,

৪. যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ,

৫. ব্যক্তিহীনতা বা Impersonality।

কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেমন বাংলাদেশে, ওয়েবারের এই আদর্শ মডেল রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি, পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে বিকৃত রূপ ধারণ করেছে। এই বিকৃত রূপটিকেই বলা হচ্ছে “আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা”।


বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের ঐতিহাসিক বিকাশ

১. ব্রিটিশ শাসনকাল (১৭৫৭–১৯৪৭): প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ছিল রাজস্ব আদায় ও শাসকের কর্তৃত্ব বজায় রাখা। সাধারণ মানুষ ছিল শাসিত জনগোষ্ঠী, প্রশাসন ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।

২. পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭১): পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রশাসনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ সময় প্রশাসন গণমানুষের সেবার বদলে ক্ষমতাশীল শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে ওঠে।

৩. স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ (১৯৭১–বর্তমান): স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। রাজনৈতিক দলীয় প্রভাব, পদোন্নতিতে পক্ষপাত, এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।


বর্তমান বাস্তবতা ও প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্য

১. কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশে অধিকাংশ নীতি ও সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গৃহীত হয়। উপজেলা বা জেলা প্রশাসন প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখে না। এটি আমলাতন্ত্রের অন্যতম চিহ্ন।

২. আমলাদের একচ্ছত্র প্রভাব

জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাস্তব প্রশাসনিক প্রভাব থাকে আমলাদের হাতে। যেমন — উপজেলা চেয়ারম্যানের চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ক্ষমতা কার্যত বেশি।

৩. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা

প্রশাসনের পদোন্নতি, বদলি বা পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব গভীর। সরকার পরিবর্তন হলে কর্মকর্তাদের অবস্থানও বদলে যায়, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করে।

৪. দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন (২০২4) অনুসারে, বাংলাদেশের সরকারি সেবা খাতে ঘুষ-সংক্রান্ত অভিযোগের হার ৬৮%। এটি প্রমাণ করে যে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা জনগণের কাছে জবাবদিহিমুক্ত হয়ে পড়েছে।

৫. প্রযুক্তি ও ই-গভর্নেন্সের সীমাবদ্ধতা

ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি অনেকাংশে সফল হলেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখনো কাগজভিত্তিক। সরকারি তথ্য পেতে নাগরিককে ফাইল ঘোরানো, দপ্তরে দপ্তরে ঘোরা—এগুলো এখনো সাধারণ ঘটনা।

৬. প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ও অসন্তোষ

২০২৫ সালে “উপসচিব পদে ৫০–৫০ ভাগ কোটা বিতর্ক” প্রশাসনের ভেতরে গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে (সূত্র: বাংলাট্রিবিউন, মার্চ ২০২৫)। এ ধরনের দ্বন্দ্ব নীতি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

৭. নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা

গবেষণা (ResearchGate, ২০২৪) দেখায়, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ৩০% সময়মতো সম্পন্ন হয় না। প্রধান কারণ প্রশাসনিক দেরি, ফাইলজট, এবং দুর্বল তদারকি।


আলোচনা (Discussion)

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয় —

১. গণতন্ত্রের ওপর প্রভাব:

আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রায়ই প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এটি গণতন্ত্রের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২. দুর্নীতি ও জনঅসন্তোষ:

প্রশাসনের অদক্ষতা, ঘুষপ্রথা ও সময়ক্ষেপণ সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। সেবা পেতে ঘুষ দেওয়া এখন সামাজিকভাবে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে গেছে, যা প্রশাসনিক নৈতিকতার চরম অবক্ষয়।

৩. নীতি বাস্তবায়নে অদক্ষতা:

নীতিনির্ধারক ও বাস্তবায়নকারীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা নীতি বাস্তবায়নের বড় অন্তরায়। অনেক উন্নয়ন প্রকল্প কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে এর সুফল জনগণ পায় না।

৪. রাজনৈতিক প্রশাসনীকরণ:

প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে এতটাই সংযুক্ত যে নিরপেক্ষতা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। ভোট, আইন প্রয়োগ ও প্রতিবাদ দমনে প্রশাসনের ভূমিকা প্রায়ই বিতর্কিত হয়।

৫. নৈতিক নেতৃত্বের অভাব:

প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও জনসেবার আদর্শ কমে যাচ্ছে। চাকরি এখন অনেকের কাছে ক্ষমতা ও সুযোগের উৎস হয়ে উঠেছে, সেবার ক্ষেত্র নয়।


গবেষণার ফলাফল (Findings)

বিষয় বাস্তব চিত্র প্রভাব

কেন্দ্রীভূত প্রশাসন অধিকাংশ সিদ্ধান্ত কেন্দ্রে নেওয়া হয় স্থানীয় প্রশাসনের অকার্যকারিতা

রাজনৈতিক প্রভাব পদোন্নতি ও বদলিতে দলীয় বিবেচনা নিরপেক্ষতা নষ্ট

দুর্নীতি ঘুষপ্রথা ব্যাপক জনগণের আস্থা নষ্ট

প্রযুক্তি সীমাবদ্ধতা ডিজিটাল প্রক্রিয়া আংশিক কাজের ধীরগতি

নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা প্রকল্প বিলম্ব ও অপচয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত


প্রস্তাবনা (Recommendations)

১. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে হবে, বাজেট ও পরিকল্পনায় স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতা দিতে হবে।

২. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: সেবা প্রক্রিয়াকে অনলাইনে উন্মুক্ত করে নাগরিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

৩. দুর্নীতি দমন: দুদক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

৪. মানবসম্পদ উন্নয়ন: প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা ও নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৫. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন: প্রশাসনকে দলের হাতিয়ার নয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে হবে।

৬. ই-গভর্নেন্স বাস্তবায়ন: ফাইলজট ও সময়ক্ষেপণ রোধে ইলেকট্রনিক অনুমোদন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে।

৭. নাগরিক অংশগ্রহণ: উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট অনুমোদন ও সেবা প্রদানে নাগরিকদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।


উপসংহার (Conclusion)

সব দিক বিবেচনায় বলা যায় — বাংলাদেশ এখনো একটি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। স্বাধীনতা অর্জনের পরও প্রশাসন জনগণের সেবক নয়, বরং ক্ষমতার ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এটিই শেষ কথা নয়। প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছতা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে এই কাঠামোকে গণমুখী করা সম্ভব।

আমলাতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে বিলোপ করা নয়, বরং সেটিকে জনসেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক আমলাতন্ত্রে রূপান্তরিত করা—এটাই সময়ের দাবি। যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জনচাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে বাংলাদেশের প্রশাসন সত্যিকারের “জনগণের রাষ্ট্রযন্ত্র” হয়ে উঠতে পারে।


তথ্যসূত্র (References)

1. Weber, Max. Economy and Society. University of California Press, 1978.

2. Public Administration Reform Commission Report, Government of Bangladesh, 2023.

3. The Daily Star (2024), “Bangladesh’s Bureaucracy Needs Reinvention.”

4. Transparency International Bangladesh (TIB) Report, 2024.

5. Bangla Tribune (2025), “নতুন সংকটে প্রশাসন।”

6. ResearchGate (2024), “Public Policy Implementation Challenges in Bangladesh.”

7. Atlantic Council (2025), “Bangladesh’s Revolution at a Crossroads.”

8. Kalbela (2025), “প্রশাসনে দ্বন্দ্ব ও দক্ষতার সংকট।”

9. Dhaka Tribune (2025), “Bangladesh Bureaucracy Faces Fresh Friction Amid Promotions.”

Wednesday, November 12, 2025

Challenges of Institutionalization: Bangladesh Perspective -- Md. Helal Uddin

 

Challenges of Institutionalization: Bangladesh Perspective

Introduction: Bangladesh is a democratic country. There has some political institution in Bangladesh. For developing democracy in Bangladesh, the more achievement and maintenance of political community become dependent upon the working of political institution and institutionalization of democracy in the political institution.

For institutionalization of democracy in Bangladesh, It faces some challenges. Before the discussion of challenges of institutionalization of democracy in Bangladesh, I discuss what is Democracy? What is democratization? What is institutionalization? After that I discuss the challenges of institutionalization of democracy in Bangladesh. 

Democracy: Generally, democracy means the rule of the people or the rule of the people’s representatives. According to C.F. Strong, “Democracy implies that government which shall rest on the active consent of the governed.”

According to Abraham Lincoln, “Democracy is a government of the people, by the people and for the people.”

Finally, we can say that Democracy means-

  1. Rule of the people,
  2. Popular control,
  3. Political quality and
  4. Responsible government.

Democratization:  Democratization means acceleration of democracy day by day. Other word we can say that, democratization is a process of democratic change.

Institutionalization: Institutionalization is the process by which organization and procedures acquire values and stability. The level of institutionalization of any particular organization or procedure can be measured by its adaptability, complexity, autonomy and coherence.

The first indicator adaptability is based on the argument that the older an organization, the more likely it is to endure longer. In Bangladesh, political parties invoke their past leaders their legacy as a legitimate claim to their power. The Awami League government of Bangladesh headed by Sheikh Hasina made it a law to display the father of nation’s (Sheikh Mujibur Rahman) photo in all government offices. The another party the BNP headed by Khaleda Zia, who is following the same trend by invoking the role and dedication of her late husband Ziaur Rahman, as a basis of legitimacy to her claim to power.

The second indicator of institutionalization is complexity. It is based on the reason that “having multiple functions, or a multi-faced organization, is more likely to endure, and to adjust to change, than a less complex organization” (Din, 1992: 498)

In Bangladesh, the strebgth of AL was based on the charisma and personal appeal of Sheikh Mujibur Rahman. Mujib’s daughter Sheikh Hasina now control the party apparatus as its head. Similarly, Ziaur Rahman, a sector commander in the liberation war of Bangladesh, organized the BNP. Khaleda Zia, the widow of Ziaur Rahman, is now the chairperson of the BNP.

The third indicator for institutionalization is autonomy. According to Huntington, “A political organization that is the instrument of social group: family, clan, class-lacks autonomy and institutionalization.”

    The last measure of institutionalization, according to Dix, is coherence. Coherence refers to the party system rather than an individual party.

  Some important Institutions: To create democracy and institutionalization of democracy there have some institutions in Bangladesh. Such as- 

  1. Leadership: Leadership means who led a party or an organization that is leadership.
  2. Political Party: Political party is an organization of a group of citizen which contained some program and want to take governmental power by the support of the people.
  3. Constitution: Constitution is the way of life of a state. It is an organization.
  4. Parliament: Parliament is the house of representatives.
  5. Pressure group: Pressure group is also an organization. Media, NGO’s Tread Union, Women organization etc. is the pressure group.

Challenges of Institutionalization: In Bangladesh there have some challenges of institutionalization of democracy. Challenges of institutionalization of democracy in Bangladesh are given below:

  1. Separation of power: To ensure institutionalization of democracy in Bangladesh, there has a problem of separation of power. If the establish separation of power we get institutionalization of democracy in Bangladesh. Because, by the separation of power to ensure checks and balance in each organ of government in Bangladesh.
  2. Lack of civilian of arms forces: In Bangladesh there has no control upon the arms forces by the government. For that, some time they interfere in government and its organization. It is another challenge for institutionalization of democracy in Bangladesh.
  3. Lack of accountability of parliament: There has no accountability of the member of parliament of Bangladesh for this cause institutionalization process of democracy in Bangladesh obstructed some time.
  4. Political violence: To achieve institutionalization of democracy there has challenge of political violence. In 1975 assassination of Sheikh Mujib, in 1981, assassination of Zia, by this violence obstructed the process of institutionalization.
  5. Internal problem of political party: Internal problem of political party is a trouble on the way of institutionalization of democracy in Bangladesh.
  6. Lack of education: In the way of institutionalization of democracy in Bangladesh there has a problem to lack of education. Illiterate people can be swayed and manipulated by the politicians for organizing agitation and mass movement and obstruct the institutionalization of democracy.
  7. Un-control Bureaucracy: Bureaucracy is the price of parliamentary democracy but some time it is thereat for democracy. In Bangladesh, we see that Bureaucracy are not control by the government, for this cause bureaucracy is a challenge for institutionalization of democracy in Bangladesh.
  8. Some articles of the constitution: In the constitution of Bangladesh, there have some articles which are the resistance for institutionalization and democracy. Such as the article 70, 55(3) etc of the constitution.
  9. Non-democratic attitudes of political party: In Bangladesh, we see the attitudes of some political elites are not democratic. Where has no democratic practice in political elites, there are institutionalization of democracy is obstructed. So, it is a challenge for institutionalization.
  10. Lack of responsibility of Executive: To ensure institutionalization there responsible executive must have but in Bangladesh, though article 55(3) of the constitution provides the collective responsibility of cabinet to the parliament, but this responsibility cannot be ensured in practice due the article 70 of the constitution.

Evaluation: After the discussion, we can say that in Bangladesh, though there have some challenges on the way of institutionalization of democracy but here established institutionalization of democracy. For this cause that, if the three parliament gained stability effectively in a country, we think that there have done the institutionalization of democracy. But in practice there has no institutionalization of democracy fully in Bangladesh.

Conclusion: Finally we can say that, if we achieve the ideal types of democracy we must ensure the institutionalization of democracy in Bangladesh. For this we should take decision and action effectively to solve the challenges on the way of institutionalization. If we can surpass this challenges, we can get an ideal types of democracy in Bangladesh.

 

Reference Book

  1. S. P. Huntington, Political Order in Changing Societies.
  2. David Beethan, Democracy: A Beginner Guide.
  3. Haroon A. Khan, Party Institutionalization and Democracy in Bangladesh.
  4. J. R. Lewis, Democracy: the Theory and the Practice.
  5. Constitution of Bangladesh. 
     
    Challenges of Institutionalization: Bangladesh Perspective 

Monday, November 10, 2025

শিল্প, সাহিত্য ও সৌন্দর্যবোধের দার্শনিক ভিত্তি “শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য” গ্রন্থটি -- মোঃ হেলাল উদ্দিন


বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রে সৈয়দ আলী আহসান একটি বিশিষ্ট নাম। তিনি কবি, চিন্তাবিদ ও সমালোচক—তিন পরিচয়েই সমানভাবে প্রাজ্ঞ। “শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য” গ্রন্থটি তাঁর নান্দনিক চিন্তা ও শিল্পতত্ত্বমূলক ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। এ গ্রন্থে শিল্প, সাহিত্য ও সৌন্দর্যবোধের দার্শনিক ভিত্তি গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে।


বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য
এই গ্রন্থে লেখক মূলত শিল্পসৃষ্টির অন্তর্গত প্রক্রিয়া, শিল্পীর মানসিক প্রস্তুতি এবং শিল্পের সামাজিক ও মানবিক দায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সৈয়দ আলী আহসানের মতে—
> শিল্প কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়; এটি শিল্পীর চৈতন্যের অন্তর্গত উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ।

তিনি শিল্পবোধকে একটি সচেতন মানসিক অবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে শিল্পী সমাজ, সময় ও মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকেন।

শিল্পচৈতন্যের ধারণা
গ্রন্থটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘শিল্পচৈতন্য’ ধারণার ব্যাখ্যা। লেখকের মতে, শিল্পচৈতন্য হলো শিল্পীর সেই অন্তর্দৃষ্টি, যার মাধ্যমে তিনি বাস্তবতাকে শুধু দেখেন না—অনুভব করেন এবং রূপান্তরিত করেন।

> শিল্পী বাস্তবতাকে অনুকরণ করেন না; তিনি বাস্তবতাকে রূপ দেন নিজের চেতনার আলোকে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি শিল্পকে কেবল বিনোদনের স্তর থেকে তুলে এনে মননশীলতার উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শিল্প, সমাজ ও মানবিক দায়
সৈয়দ আলী আহসান শিল্পকে সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, শিল্পীর দায়িত্ব কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি নয়, বরং মানবিক সত্য ও সামাজিক বাস্তবতাকে নান্দনিক রূপে তুলে ধরা।

> যে শিল্প মানুষের জীবনবোধকে স্পর্শ করে না, সে শিল্প নিছক কারুকার্য মাত্র।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি শিল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

ভাষা ও রচনাশৈলী
গ্রন্থটির ভাষা গভীর, মননশীল ও দার্শনিক হলেও তা যথেষ্ট শৈল্পিক। কোথাও কোথাও পাঠকের মনোযোগ ও ধৈর্য প্রয়োজন হলেও চিন্তাশীল পাঠকের জন্য এটি এক বুদ্ধিবৃত্তিক আনন্দের গ্রন্থ।

মূল্যায়ন
“শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য” বাংলা সাহিত্যসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এটি শিল্প ও সাহিত্যকে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে এবং পাঠককে ভাবনার গভীরে নিয়ে যায়। বিশেষ করে সাহিত্য, দর্শন ও নন্দনতত্ত্বে আগ্রহীদের জন্য বইটি অপরিহার্য।

সৈয়দ আলী আহসানের এই গ্রন্থ আমাদের শেখায়—শিল্প কেবল দেখার বিষয় নয়, উপলব্ধির বিষয়। শিল্প তখনই সত্য হয়, যখন তা মানবচৈতন্যের গভীর স্তর থেকে উৎসারিত হয়ে সমাজ ও মানুষের জীবনের সঙ্গে সংলাপ রচনা করে।

গ্রন্থের নাম: শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য
লেখক: সৈয়দ আলী আহসান
প্রকাশক: বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী
মূল্য: ১২৫ টাকা

Friday, November 7, 2025

তুমি আমার কবিতা -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

তোমায় দেখেছি গোপনে
দেখেছি যতনে
দেখেছি তোমায় হৃদয়ের
গভীর গাহনে।
কতোদিন ভেবেছি আর নয়
গোপন দেখা
আর নয় দূরে দূরে থাকা
তবু হয়নি তা করা
তুমি যা ভাবো, তুমি যা করো
নেই তো মানা
শুধু বলে যাই হৃদয়ের জমানো কিছু কথা
তোমার নয়নে আমি স্বপন দেখেছি
তোমার বদনে আমি মায়া পেয়েছি
তোমার হাসিতে পেয়েছি সুখের ছোয়া
তুমি নয়তো হেলেন, নয়তো বনলতা
তুমি যে শুধু, শুধুই আমার কবিতা

তুমি আমার কবিতা 
 

Friday, October 24, 2025

"ক্রাচের কর্নেল" উপন্যাস নয় জীবন্ত ইতিহাস -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

শুরুকথা
শাহাদুজ্জামানের "ক্রাচের কর্নেল" বইটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী জীবনীমূলক গ্রন্থ, যেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী কর্নেল আবু তাহেরকে কেন্দ্র করে ইতিহাস, রাজনীতি ও আদর্শের জটিল চিত্র উপস্থাপন করেছেন।

📖 বই: ক্রাচের কর্নেল
লেখক: ড. শাহাদুজ্জামান
ধরন: জীবনীমূলক প্রবন্ধ, রাজনৈতিক ইতিহাস
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ ২০০৯, মাওলা ব্রাদার্স
পাঠ্য অভিজ্ঞতা: গবেষণাধর্মী, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং মানবিক আবেগে পূর্ণ।


🔍 বইয়ের মূল বিষয়বস্তু

বইটি মূলত কর্নেল আবু তাহেরের জীবন, সংগ্রাম ও মৃত্যুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। কর্নেল তাহের ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন, পরে মুজিবনগর সরকারের অধীনে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (BLF)’ বা ‘সেক্টর-১১’-এর নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধ শেষে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনিয়ম, সামরিক কৌশল এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।
বইয়ে তার বিপ্লবী মনোভাব, জাসদ সংশ্লিষ্টতা এবং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের হাতে মৃত্যুর (ফাঁসি) ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে এক অভিনব ধারায়।

🧠 বিশ্লেষণ ও রিভিউ

✍️ লেখনশৈলী
শাহাদুজ্জামান একজন চিকিৎসক ও সাহিত্যিক, যার লেখায় গবেষণাধর্মিতা এবং সাহিত্যিক সৌন্দর্যের মিশ্রণ রয়েছে।
বইটি প্রথাগত জীবনী নয়; বরং থিয়েটারধর্মী, ডকুমেন্টারি আঙ্গিকে লেখা। এতে সংলাপ, ঘটনা পুনর্নির্মাণ, এবং তথ্যনির্ভর বর্ণনার চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে।
কোথাও কোথাও গল্পের মতো গতিময় আবার কোথাও তা ধীর ও বিশ্লেষণধর্মী।

🏛️ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা
বইটি কেবল একজন ব্যক্তির জীবন নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সামরিক অভ্যুত্থান, জাসদের ভূমিকা, এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতি সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলে।
কর্নেল তাহেরের বিচার ও ফাঁসি নিয়ে যে বিতর্ক এবং নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে, লেখক তা সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন।

🧭 মানবিক ও আদর্শিক দিক
কর্নেল তাহের একজন পঙ্গু হয়েও রাষ্ট্রকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আদর্শিক দৃঢ়তা পাঠককে মুগ্ধ করে।
লেখক তার বিপ্লবী ভাবনা ও মানবিক মূল্যবোধকে এক অনন্য উচ্চতায় স্থান দিয়েছেন।

📚 শেষকথা
"ক্রাচের কর্নেল" কেবল একটি জীবনী নয়—এটি একটি রাষ্ট্র, একটি যুগ, এবং একজন বিপ্লবীর আখ্যান।
শাহাদুজ্জামান বইটিকে কেবল ইতিহাস তুলে ধরার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরির এক মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এটি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে একটি শক্তিশালী ও চিন্তনীয় বই।


Md. Helal Uddin
05.07.2025

Friday, October 17, 2025

'আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র' তবে গরু কিন্তু গরু নয় -- মোঃ হেলাল উদ্দিন

'আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র' বইটি পড়ে আপনি লেখকের সাথে অনেক ক্ষেত্রে একমত না হলেও আপনি লেখকের মতামতকে ফেলে দিতে পারবেন না।

১. লেখক তার বইটি উৎসর্গ করেছেন "আল্লাহকে"। কারণ হিসেবে তিনি যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন- আল্লাহর সাথে কখনো দ্বিমত পোষণ করা যায় না।

২. একদিন আমাদের আকাশ আমাদের মাথার উপর টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়তে লাগলো। কিন্তু আমাদের রাজা একটিবারও ভাবলেন না----- আকাশের একটি ভাঙ্গা টুকরো, তার মাথায়ও পড়তে পারে।

৩. আমি যখন আমার ভুঁড়ির দিকে তাকাই তখন বুঝতে পারি----- কোথাও কেউ না কেউ না খেয়ে আছে বলেই ভুঁড়িটি হয়েছে। ভুঁড়ি হল ধনী মানুষদের শরীরে জমা ক্ষুধার্ত মানুষদের মাংস।

--- লেখক এখানে ভুঁড়ি বলতে পেটের উপরের মাংসকে বুঝাননি। তিনি বুঝিয়েছেন টাকা সমৃদ্ধ ডেবিট কার্ড, কানাডার বেগম পাড়ায় বাড়ি, অন্যের দখল করা জমি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিট, শুল্কমুক্ত গাড়ি, সুন্দর চাকরি, কাবিনের টাকা। বাঙালির জন্য এক স্ত্রী আর এক ভুঁড়িতে তিক্ত থাকা খুবই কঠিন কাজ। (আমার শুধু পেটের উপরেই একটা স্থুল মাংসের ভুড়িই আছে, অন্য কোন ভুড়ি আমার নেই।)

৪. বাঙালি শব্দের উৎপত্তি ব্যাঙ থেকে। ব্যাঙের সাথে আমাদের চারিত্রিক অনেক মিল আছে। ব্যাঙ লাফিয়ে চলে, আমরাও লাফিয়ে চলি। ব্যাঙের আঁধার পছন্দ, আমাদেরও। ব্যাঙের প্রিয় খাদ্য পোকামাকড়, আমাদেরও প্রিয় খাদ্য পোকামাকড়। মানুষদের মধ্যে যারা ক্ষুদ্র ক্ষমতাহীন তাদের আমরা পোকামাকড় ভেবে খেয়ে ফেলি। ব্যাঙ তার ডোবাকে বিশ্ব জ্ঞান মনে করে। আমরাও তাই করি। আমাদের জ্ঞানের বাইরেও যে আরো জ্ঞান থাকতে পারে, সেটা আমরা কখনোই স্বীকার করতে প্রস্তুত নই।

ব্যাঙ যেখানেই বাস করে সেখানেই কাদা তৈরি করে। আমরাও তাই করি। আমাদের জাতীয় ক্রিয়াকর্মের নাম---- কাদা ছোড়াছুড়ি। কারো গায়ে ছুড়ে মারার মত কাদা না পেলে আমরা পেট থেকে কাদা বের করে ছুড়ে মারি।

৫. প্রভু ভক্তিতে কুকুরদের এক সময় খুব সুনাম থাকলেও সম্প্রতি মানুষেরা তাদের এ সুনাম কেড়ে নিয়েছে। কুকুরেরা লক্ষ্য করেছে পৃথিবীর কিছু কিছু এলাকায় মানুষ প্রভুভক্তিতে কুকুরদেরও ছাড়িয়ে গেছে।

কুকুর সমাজ মাননীয়মুক্ত। কুকুরদের কাউকে মাননীয় বলতে হয় না। মর্যাদায় সকল কুকুরই সমান, এটা তাদের প্রতিষ্ঠিত নীতি। তাদের কোন স্যার, স্যালুট ও হরিলুট নেই।

কুকুরের বংশ পরিচয় আছে। তার পূর্বপুরুষ নেকড়ে ছিল। সে হিসেবে তাদের হিংস্র হওয়ারই কথা। কিন্তু মানুষের হিংসতা দেখে তারা থমকে গেছে। তারা দেখেছে যে, এক বছরে মানুষ যত মানুষকে খুন করে তত মানুষ তারা ১০০ বছরেও খুন করতে পারবেনা। এজন্য হিংস্রতাকে তারা বহু আগেই বিদায় জানিয়েছে।

"কুত্তার মত পেটাবো"-- এই বাক্যটি থেকে লেখক কুকুরদের প্রতি আমাদের ভালোবাসার প্রমাণ পান। কোন সমাজে মানুষের সাথে মানুষের আচরণ কেমন হবে তা তিনি টের পান কুকুরদের প্রতি মানুষের আচরণ দেখে। যদি কোন দেশে কুকুর এবং মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে তাহলেই লেখক ধরে নেন সেই দেশটি নিরাপদ।

৬. বনের রাজা সিংহ মৃত্যুর আগে তার শাবকদের গাধা থেকে সাবধান থাকতে বললেন এবং গাধা চেনার পাঁচটি উপায় এর কথা বললেন।

গাধা কোন নির্দিষ্ট প্রাণীর নাম নয়। "গাধা" কিছু গুণাবলীর নাম। একটি বাঘাও হতে পারে, যদি তার ভিতরে গাধার গুণাবলী ফুটে ওঠে।

ক। গাধা যে এলাকায় প্রবেশ করবে, সে এলাকাই তার নিজের বলে গণ্য করবে। এজন্য গাধার সাথে কখনো নিজের এলাকার মালিকানা নিয়ে বিবাদে জড়াবে না।

খ। গাধা বেশিক্ষণ প্রস্রাব না করে থাকতে পারেনা। সে যেখানেই যাবে, সেখানেই প্রস্রাব করবে। আর সবাইকে তার প্রস্রাবের নানা ওষুধি গুণের কথা বর্ণনা করবে। আমি অনেক সিংহকে দেখেছি গাধার কথা বিশ্বাস করে তার প্রস্রাব পান করতে।

গ। গাধা পৃথিবীর সকল প্রাণীকেই গাধা মনে করে এবং সকলকে একই উপদেশ প্রদান করে।

ঘ। প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র গাধাই যুক্তিবাদী। যে কোন বিষয়কে সে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে। এমন কোন ঘটনা নেই যা "ডানকি লজিক" দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। সাধারণ লজিকের সাথে ডানকি লজিকের পার্থক্য হল--- ডানকি লজিকে মগজের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় লেজ।

ঙ। গাধা খুবই আবেগপ্রবণ প্রাণী। আবেগের বসে সে যে কোন কথা ও শব্দের এক হাজার অর্থ তৈরি করতে পারে। ডানকি ল্যাঙ্গুয়েজে যে কোন বক্তব্যকে সুবিধাজনকভাবে অনুবাদ করা যায়।

৭. শয়তান একসময় ফেরেশতা ছিল। তার নাম ছিল ভিআইপি ফেরেস্তা। সে ছিল মহাবিশ্বের প্রথম গোঁয়ার এবং গোঁয়ার্তুমির ফল যে ভালো হয় না, তা বুঝতে থাকে স্বর্গ হারাতে হয়েছিল।

পৃথিবীর অনেক দেশেই শয়তান এখন স্বর্গের চেয়েও আরামে আছে। শয়তানকে কেউ দেখেছে এরকম প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু তার অস্তিত্ব পৃথিবীর নানা অঞ্চলে মানুষ টের পেয়েছে। শয়তান আমাদের রাস্তাঘাটে প্রায়ই রডের বদলে বাঁশ ঢুকিয়ে দিচ্ছে, বায়ু বেগে সেতু নির্মাণ করে বিল তুলে নিচ্ছে, রেললাইন ঢেলে দিচ্ছে পাথরের বদলে ইটের সুরকি। টেলিভিশন টকশোতে শয়তানকে আমরা প্রায় বক্তৃতা দিতে দেখি। শয়তান বানিয়ে বানিয়ে এমনভাবে সত্য কথা বলে যে, যা শুনে ওই সত্য সম্পর্কে আমাদের আর কোন সন্দেহ থাকে না।

পৃথিবীতে আসার পর শয়তানের প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষকে দরিদ্র ও ক্ষমতাহীন করা। "অভাবে স্বভাব নষ্ট হবে" -- এরকম একটি ধারণা ছিল তার। সে আশা করেছিল মানুষ গরিব ও ক্ষমতাশূন্য হলো হলে বেশি পাপ করবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো এর উল্টো ঘটনা। সে দেখল পাপের জন্য দারিদ্র্যের চেয়ে প্রাচুর্যই বেশি সহায়ক। ক্ষমতাহীন মানুষদের পাপ করার সুযোগ কম। ফলে শয়তান এখন কাউকে নিশানা করলে সে সবার আগে তার হাতে তুলে দেয় টাকা ও ক্ষমতা।

৮. কোন সমাজে ন্যাংটো মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেলে, ওই সমাজে পোশাক পরিধানই অশ্লীল হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনি সমাজে মিথ্যুক ও দালালের সংখ্যা বেড়ে গেলে সমাজে সত্য উচ্চারণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে। "সত্যের মৃত্যু নেই"--- এই কথাটি সত্য নয়। বঙ্গোপসাগরের পাড়ে সত্য এখন বিলুপ্তির পথে।

৯. মানুষ বাঁচে সময়কে খুন করে। কেউ মারা গেছে এর অর্থ হল তার হাতে আর খুন করার মত অবশিষ্ট সময় ছিল না। সফলতাকে আমি বলি সময়ের লাশ। যেমন "ঘি"কে বলি দুধের লাশ। এক গ্লাস ঘি পেতে আমাদেরকে হত্যা করতে হয় অনেক গ্লাস দুধ। আর একটি সফল বছর কাটাতে আমাদেরকে হত্যা করতে হয় অনেক বছর সময়। চিকিৎসক হিসেবে সময়ের সুনাম আছে। সময় সারিয়ে তুলতে পারে শরীর ও মনের অনেক অচিকিৎস্য অসুখ। তবে রূপের সাথে সময়ের শত্রুতা পুরনো। ২০২০ সালে যিনি রূপসী, ২০৩০ সালে তার রূপ নাও থাকতে পারে। সময় থেকে শিক্ষা লাভ করেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শিক্ষক হিসেবে সময়ের নিষ্ঠুরতা অতুলনীয়। সময়ই একমাত্র শিক্ষক, যিনি পাঠদান শেষে তার ছাত্রদের মেরে ফেলেন।

১০. বাংলাদেশে নারী ও গাভীর পর যে প্রাণীটি এখন সবচেয়ে নিরীহ জীবন যাপন করছে, তার নাম শিক্ষক। তিনি সমাজে আছেন কি নেই, তা আমরা আগের মতো টের পাই না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শিক্ষক ছাত্রদের খোঁজখবর নেন। পত্রিকাগুলোই তাকে সংবাদ জানায়। তিনি জানতে পারেন তার ছাত্ররা চাষাবাদ শিখতে বিদেশ যাচ্ছে, সাঁতার শিখতে বিদেশ যাচ্ছে। শিক্ষক হব-- এই স্বপ্ন এখন আর কেউ দেখে না। চাকরির সব পথ যখন রুদ্ধ হয়ে যায়; ব্যাংক, বীমা, বিসিএস, আর্মি, সব রসগোল্লা যখন বন্ধ হয়ে যায় ঠিক তখনই একজন বেকারের গন্তব্য হয়ে উঠে শিক্ষকতা। সরকারি হলে ভালো, অসরকারি হলেও ক্ষতি নেই। একটি স্কুল দেখে তিনি ঢুকে পড়েন এবং কিছুদিন পর দুটি গামছা আর কিছু মুড়ি নিয়ে রওনা শহীদ মিনারের দিকে। বেতনের দাবিতে তিনি আমরণ অনশনে বসেন।

তার ক্ষমতাশূন্য বলে সমাজে তার দামও শূণ্য। নানা অনুষ্ঠানে হেডমাস্টারদের চেয়ে ওসিরা এখন বেশি দাওয়াত পান। কলমের আলোর পাশে যে বন্দুকের আলোকে খুব ম্লান দেখায়, সে বিষয়টি সমাজ ভুলে গেছে।

১১. মানুষের জীবনে সমাজের ভূমিকা কনডমের মত। যা কিছু সৃষ্টিশীল তার সবকিছু আটকে দেয়াই সমাজের কাজ। সমাজ জানে তার ভবিষ্যৎ অনাসৃষ্টিতে। সৃষ্টি প্রিয় শুক্রাণু তার শত্রু। যেখানেই মাথা তুলে দাঁড়ায় সামান্য সৃষ্টি, সেখানেই সমাজ হাজির হয় বাধার বৃষ্টি নিয়ে। সমাজের কালো পর্দা ভেদ করে মানুষ এখন আর আকাশের দিকে তাকাতে পারেনা। তাকে হাঁটতে হয় সারাক্ষণ মাটির দিকে চেয়ে চেয়ে।

১২. গুরু একটি চতুষ্পদ প্রাণী। তার দুটি শিং ও একটি লেজ আছে-- এরকম ধারণার সাথে আমি একমত নাই। ক্ষমতাহীন সকল প্রাণীই গরু। তার পা চারটা থাকতে পারে, আবার দুটিই থাকতে পারে, এমনকি নাও থাকতে পারে। লেজ থাকাটাও জরুরী নয়। জরুরি হলো অন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে তার পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে কিনা। যদি না থাকে তাহলে আক্রমণকারী প্রাণীর কাছে সে গরু।

১৩. আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, আপনি কেমন বাকস্বাধীনতা চান? তাদের জন্য আমার উত্তর হলো: দেখুন, ফ্রান্সের আইনে শূকরের নাম নেপোলিয়ন রাখা যাবে না। শুকরকে আপনি নিউটন ডাকতে পারেন, গান্ধী ডাকতে পারেন, কিন্তু নেপোলিয়ন ডাকতে পারবেন না। আমি চাই এমন বাকস্বাধীনতা, যেটি আমাকে প্যারিসে বসেও একটি শুকরের ছবি আঁকতে দেবে এবং তার নাম রাখতে দেবেন নেপোলিয়ন।

১৪. কিছু মানুষ যোগ-বিয়োগ জানে, আর কিছু মানুষ জানে না। এর একটি ব্যাখ্যা অ্যারিস্টোটল দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন আত্মা তিন প্রকার:

ক। পুষ্টিবাদী ও ভোগবাদী আত্মা। যা সকল উদ্ভিদ ও প্রাণীর ভেতরে অবস্থান করে। এর কাজ হল খাবার জোগাড় করা ও বংশবিস্তার করা। এই আত্মা যার ভেতরে আছে তার সকল চিন্তা রুজি রোজগার, ভোগ-বিলাস ও বিয়ে শাদী নিয়ে। অ্যারিস্টোটল বেঁচে থাকলে দেখতেন বাংলাদেশে এই আত্মার সংখ্যা কোটি কোটি।

খ। সংবেদনশীল আত্মা। যা মানুষ ও নিচু জাতের সকল প্রাণীর ভেতরে অবস্থান করে। এই আত্মার কাজ হল হাঁটাচলায় সাহায্য করা।

গ। যুক্তিবাদী আত্মা। যা ঐশ্বরিক। এরিস্টটলের দাবি, এই আত্মার প্রভাব যার উপরে বেশি সেই যোগ-বিয়োগ জানে।

১৫. মানুষ যতটা না বুদ্ধিমান তার চেয়েও বিশ্বাসী। যদি বিশ্বাসের পেছনে সে ভালো কোন কারণ খুঁজে না পায়, তাহলে সে নিজেই কিছু কারণ উদ্ভাবন করে ফেলে। খুব বিপদে না পড়লে সে বুদ্ধিকে বিশ্বাসের উপর স্থান দিতে চায় না। কোন কিছু কারণ অনুসন্ধান একটি পরিশ্রমের কাজ, যা মানুষ সাধারণত করতে চায় না। এর চেয়ে বানোয়াট কোন কুসংস্কারের কাঁধেই দায় চাপানো ভালো।

১৬. অনেক দেশে "পাপের শাস্তি" কুসংস্কারটি বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশের কারো বড় অসুখ হলে প্রতিবেশীরা ধরে নেন এটা "আল্লাহর বিচার"। তাদের ধারণা লোকটি কোন পাপ করেছিল বলেই অসুখে পড়েছে। বড় দুর্ঘটনা বা বিপদ-আপদ এর ক্ষেত্রে এমনটি ধরে নেয়া যায়। কিন্তু সদ্য জন্ম নেয়া অনেক শিশুকে আমি বড় অসুখ ও দুর্ঘটনায় মারা যেতে দেখেছি। একজন শিশু কি এমন পাপ করতে পারে যার জন্য ঈশ্বর তাকে দুনিয়াতে পাঠিয়ে আবার আসমানে ফেরত নেন তা আমার বোধগম্য নয়। সেইন্ট অগাস্টিন দাবি করেছিলেন, শিশুদের পাপ মূলত আদম-হাওয়ার পাপ। আদম হওয়ার পাপ বংশ পরম্পরা শিশুটির মা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে এবং মায়ের দুধ পান করে শিশুটিও সেই পাপে পাপী হয়েছে।
কি অসাধারণ ব্যাখ্যা!!!

ফিলোসফিক্যাল থিওলজিতে একটি প্রপোজিশন আছে এরকম: কোন গাধাকে যদি তার ঈশ্বর সম্পর্কে বলতে বলা হয়, তাহলে সে একটি গাধার বর্ণনাই করবে। কারণ তার ধারণা, তার ঈশ্বর ও নিশ্চয়ই গাধা।

কুসংস্কার গুলোর জন্ম হয় সাধারণত ভয় থেকে। মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সে তার সুবিধাজনক কিছু বিশ্বাস তৈরি করে। এ ভয় প্রাণ হারানোর হতে পারে, ক্ষমতা হারানোর হতে পারে, ফসল হারানো হতে পারে, মান-সম্মান হারানোর হতে পারে, এমনকি হারানোর বদলে প্রাপ্তিও হতে পারে। যেমন খ্রিস্টান নানরা ঐশ্বরিক শাস্তির ভয়ে (শাস্তি এক প্রকার প্রাপ্তি) গোসলের সময়ও বোরকা পড়ে থাকেন। তাদের দাবি বাথরুমে আমাদের আর কেউ না দেখলেও ঈশ্বর দেখেন। এ নিয়ে বার্টান্ড রাসেল একবার কৌতুক করে বলেছিলেন, "তারা বুঝতে চান না যে ঈশ্বরের চোখ বাথরুমের দেয়াল ভেদ করতে পারলেও বোরকার কাপড়ের দেয়াল ভেদ করতে পারে না।"

১৭. মানুষের বিবেচনাবোধও উন্নত নয়। প্রাণী হিসেবে সেই পৃথিবীতে সবচেয়ে হিংস্র। অন্য সকল প্রাণীর ক্ষেত্রে "পাশবিক" শব্দটি ব্যবহার করলেও মানুষ তার হিংস্রতাকে আলাদা করতে ব্যবহার করে "মানবিক" শব্দটি। মানুষের মানবিকতার প্রমাণ আমরা হিরোশিমা, নাগাসাকিতে পেয়েছি। হিটলার, মুসোলীন, চেঙ্গিস খান এরা সবাই মানবিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র।
মানুষের যা ইতিহাস তা মোটামুটি হিংস্রতারই ইতিহাস এবং তার হিংস্র প্রবৃত্তি বিলুপ্ত হবার নয়। মানুষের সবচেয়ে জরুরী বিজ্ঞানটিও, যাকে আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞান বলি, দাঁড়িয়ে আছে ব্যাঙ, ইঁদুর, গিনিপিক ও বানরের লাশের উপর।

১৮. "আপনি কী করেন?" এ প্রশ্নটি যিনি করেন তার দিকে আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি। এটি মোটেও নিরীহ কোনো প্রশ্ন নয়। প্রশ্নকর্তা একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রশ্নটি করেন এবং উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত অসৎ। তিনি নিশ্চিত হতে চান আমি তার চেয়ে ক্ষমতাধর কেউ কিনা। এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে তিনি আমার সাথে কেমন আচরণ করবেন।
তিনি যদি বুঝতে পারেন আমি সাধারন গফুর, আমার আয় সামান্য, আমি টেনেটুনে চলি, যাকে পাই তাকেই সালাম দিই, আমার পড়াশোনা কম, কোর্ট-টাই নেই, আমাকে কেউ স্যার ডাকে না, আমার আত্মীয়দের মধ্যে কেউ অস্ত্র বহন করেনা, আমার ব্যাংক হিসাবে খরা লেগেছে, আমাকে চড় দিলে কেউ প্রতিবাদ করবে না তাহলে তিনি খুব খুশি হন। তিনি নিরাপদ বোধ করেন।নিজের কাজে মন দেন। আমার প্রতি তার কোন কৌতুহল থাকে না। আমার ওজন তার কাছে এক লাফে শূন্যে গিয়ে ঠেকে।
কিন্তু যদি টের পান যে আমি বড় ব্যবসায়ী, আমি একটি মন্ত্রণালয় চালাই, একটি জেলার মালিকানা আমার ঘাড়ে, আমি অনেক সমিতির সভাপতি, মানিক মিয়া এভিনিউতে ৩০০ জনের সাথে বকাবকি করি, অস্ত্রের সাথে আমার আত্মীয়তা আছে, টিভি পত্রিকায় আমার প্রশংসা করা হয়, লন্ডন আমেরিকার নিয়মিত দৌড়ঝাঁপ করি, লোকজন আমাকে স্যার ডাকে, আমার নামের আগে মাননীয় বসানো হয়, ব্যাংক হিসাব নয়- আমার নিজেরই একটি ব্যাংক আছে, তাহলে তিনি লাফ দিয়ে উঠেন। চেয়ারে এগিয়ে দেন, হাত বাড়িয়ে দেন, তোলপাড় করে তুলেন চারপাশ এবং মনে মনে অনিরাপদ ও বিপন্ন বোধ করেন। এর কারণ তিনি একটি সংকটে ভোগেন এবং সংকটটি সরল নয়। তিনি একই সাথে ক্ষমতাকে পছন্দ ও ঘৃণা করেন।

১৯. সম্মান একটি সামাজিক রোগ। কোন সমাজে ভালোবাসা কমে গেলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। কোন ব্যক্তি যখন দেখেন যে, তাকে ভালোবাসার কোনো কারণ মানুষের নেই তখন তিনি সম্মান দাবি করেন। সম্মান হলো ভালোবাসার ঘাটতি পূরণের একটি কৌশলমাত্র। এ কৌশল বাস্তবায়নের মানুষ প্রথমে আশ্রয় নেয় ক্ষমতার। ক্ষমতা কী? কাজ করার হারই ক্ষমতা- এরকম একটি সংজ্ঞা পদার্থবিজ্ঞানে পাওয়া গেলেও সমাজের সংজ্ঞা ভিন্ন। সমাজের দিকে তাকালে টের পাওয়া যায় মানুষকে ভয় দেখানোর সামর্থ্যই ক্ষমতা। যারা ভয় দেখানোর সামর্থ্য যত বেশি, তার ক্ষমতাও তত বেশি।
ম্যাকিয়াভেলি তার প্রিন্সকে পরামর্শ দিয়েছিলেন- ভালোবাসা নয়, রাজার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের ভয় অর্জন করা। রাজাকে করতে হবে এমন কাজ যা দেখে মানুষ সর্বদা ভয় পাবে। আমার ধারণা ম্যাকিয়াভেলির এ কৌতুকের ভদ্র রুপই সম্মান।

২০. ইংরেজি "ডক্টর" শব্দটি মূলত ল্যাটিন ভাষার। এর অর্থ হল শিক্ষক বা প্রশিক্ষক। মধ্যযুগের দিকে ইউরোপে যারা ল্যাটিন ভাষা পড়াতেন তাদের একটা লাইসেন্স লাগতো যার নাম ছিল "Licentia Docendi" এর ইংরেজি অনুবাদ হলো "License to Teach". এই লাইসেন্সটিকে ডাকা হতো "Doctoratus" ইংরেজি হলো "Doctorate."
তখনকার দিনে ডক্টরেট দিতেন চার্চের মোল্লারা, যারা বাইবেল পড়াতেন ও ব্যাখ্যা করতেন। চার্চের অনুমতি ছাড়া কেউ ডক্টরেট ডিগ্রী বা শেখানোর লাইসেন্স পেতে না। কিন্তু খ্রিস্টানদের পোপ ১২১৩ সালে ঘোষণা করলেন যে আজ থেকে চার্চের পাশাপাশি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে লাইসেন্স বা ডক্টরেট ডিগ্রি দিতে পারবে। এই ঘোষণার আগেও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাথলিক চার্চের অনুমতি নিয়ে কিছু ছাত্রকে ডক্টরেট ডিগ্রি দিত। কিথ এলান তার "Changing doctoral degrees: an international prespective" বইতে উল্লেখ করেছেন যে, পৃথিবীর প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রী দেওয়া হয় ১১৫০ সালের দিকে, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে।

তখনকার দিনে খ্রিস্টানদের এই ডক্টরেট ডিগ্রী এর মত আরেকটি ডক্টরেট ডিগ্রী মুসলিমদেরও ছিল এর নাম ছিল ইযাজাহ। ডক্টরেট দেওয়া হতো খৃষ্টানদের চার্চ থেকে আর ইযাজাহ দেওয়া হতো মুসলমানদের মাদ্রাসা থেকে। কিন্তু দুটোরই অর্থ ছিল এক- শেখানোর লাইসেন্স। যার ডক্টরেট বা ইযাজাহ আছে, তিনি শিক্ষকতা করতে পারবেন।

১৭ শতকের দিকে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ডক্টরেট ডিগ্রি বা শিক্ষকতা লাইসেন্স এর নাম দিল "Doctorate of Philosophy" ba PhD. ডক্টর অফ ফিলোসফি তে যে "ফিলোসফি" শব্দটি আছে তা মূলত গ্রিক ভাষার শব্দটিকে নির্দেশ করে। এর অর্থ হল Love of Wisedom বা জ্ঞানের প্রতি মোহ। অর্থ বিত্ত, ক্ষমতা ও পদ পদবী নয় যে ব্যক্তির জ্ঞানের প্রতি মোহ জন্মেছে সেই ব্যক্তি পিএইচডি।

২১. ছাগল শব্দটি এ অঞ্চলে বিবর্তিত হয়ে গেছে। এটি আর ছাগলদের দখলে নেই। ছাগলের মাংস--- এমনটি আর বাজারে শোনা যায় না। শোনা যায়-- খাসির মাংস, বকরির মাংস। রেস্তোরাঁয় গিয়ে এখন আর কেউ বলে না আমি ছাগলের মাংস দিয়ে ভাত খাব। মানুষের একটি অংশ "ছাগল" শব্দটিকে নিজেদের করে নিয়েছে। ছাগল শব্দটি শুনলে বা দেখলে তারাই এখন প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা ভাবে মনে হয় আমাকে বলল, জবাব দিয়ে আসি।

বইটি সুখপাঠ্য। বইটি অবশ্যই আপনার ভাবনার জগতকে আঘাত করবে।

বইঃ আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র
লেখকঃ মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
প্রকাশকঃ জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
মূল্যঃ ৫০০ টাকা